Born to be villains part 30
মিথুবুড়ি
কানাডা, অটোয়া!
কানাডার শীতল সকালের নিস্তব্ধতায় টিউলিপের বিস্তীর্ণ প্রান্তর তখনও শিশিরে সিক্ত। শ্বাসে ধোঁয়া মেশানো রূপালি কুয়াশামাখা সকালের স্বচ্ছ বাতাসে ফুলের পাপড়িগুলো প্রেমিকার খোলা চুলের মতে দুলছে। দূরের কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে গিয়ে সূর্যের কোমল আলো একে একে প্রতিটি টিউলিপের গায়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে প্রাণের আভা। সময়ও যেন এই সৌন্দর্যের সামনে ক্ষণিকের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছে।
ডাইনিং স্পেসে শুধু স্পুন, ফর্ক আর চপস্টিকের টুংটাং আর ক্যাচ-খ্যাচ শব্দ। নিস্তব্ধ পরিবেশটাকে এই শব্দটুকুই যা একটু জীবন্ত করে রেখেছে। ডাইনিং টেবিলে রিচার্ড আর এলিজাবেথ ব্যতিত আপাতত আর কেউ নেই। শুধু ডাইনিং রুমটাই নয়, পুরো কটেজ জুড়েই নিঝুম নীরবতা বিরাজ করছে।
টিউলিপ বাগানের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা পাশাপাশি দু’টি কটেজ দুইদিনের জন্য সম্পূর্ণ ভাড়া নেওয়া হয়েছে। পাশের কটেজে উঠেছে ইবরাত, ন্যাসো আর লুকাস। রিচার্ড নিজের আর এলিজাবেথের পার্সোনাল স্পেসের কথা মাথায় রেখেই আলাদা আলাদা কটেজ বুক করেছে। এই কটেজের বারান্দা থেকে পাখির চোখে এক নজরে দেখে নেওয়া যায় বিস্তীর্ণ টিউলিপের নৈসর্গিক রূপ।
এলিজাবেথ প্লেটে কাটাচামচ নাড়তে নাড়তে আড়চোখে রিচার্ডের দিকে তাকাচ্ছে। লোকটা গুরুগম্ভীর মুখে স্পুন আর চপস্টিক ব্যবহার করে অবিচলভাবে খেয়ে যাচ্ছে। রিচার্ডের এই অতি-নিস্পৃহতা এখন এলিজাবেথের কাছে ভীষণ বিরক্তিকর ঠেকছে। পরবাসের মাটিতে টানা বাইরের খাবার খেতে খেতে এলিজাবেথের মুখে যেন চড়া পড়ে গিয়েছিল। একরকম অতিষ্ঠই হয়ে উঠেছিল সে। গত রাতে রিচার্ডের কাছে আলতো করে সেই বিরক্তির কথা প্রকাশ করতেই ম্যাজিক হয়ে গেল। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই এলিজাবেথ অবাক হয়ে দেখল, কিচেন অ্যাপ্রন জড়িয়ে রিচার্ড রান্নাঘরে ব্যস্ত! লোকটার রান্নার স্কিল দেখে এলিজাবেথ রীতিমতো চমকে উঠেছিল। নিজে একটা মেয়ে হয়েও সে কখনো এত নিখুঁতভাবে, একই মাপে পেঁয়াজ কুচাতে পারে না। অথচ রিচার্ড কেবল ইন্টারনেটের সাহায্য নিয়ে, রেসিপি দেখে দেখে তার জন্য খাঁটি বাঙালি খাবার রেঁধে ফেলেছে। আর সেই রান্নার স্বাদ? এককথায় অনবদ্য, মুখে লেগে থাকার মতো। আসলে রিচার্ডের প্রতিটা কাজের পরিচ্ছন্নতা আর দক্ষতার কাছে এলিজাবেথকে বারবার মুগ্ধ হতেই হয়। মাঝেমধ্যে তো তার মনে হয় পারফেকশন শব্দটার সংজ্ঞা বুঝি এই লোকটাকে দেখেই তৈরি হয়েছে।
তবে এই মুহূর্তে তাদের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম মনোহর অভিমানের দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। সকালে রিচার্ডকে কিচেনে অমন ব্যস্ত দেখে এলিজাবেথ একটু সাহায্য করতে ভেতরে ঢুকতে চেয়েছিল, রিচার্ড অমনি বেশ কড়া গলায় ধমক দিয়ে তাকে বের করে দেয়। ব্যস, সেই থেকেই এলিজাবেথ গালের ভেতর বেলুন ফুলিয়ে বসে আছে। রাগ তো হবেই! এভাবে সারাদিন শুয়ে-বসে আর কতক্ষণ কাটানো যায়? লোকটা তাকে কোনো কাজেই হাত লাগাতে দিচ্ছে না। একদম ননির পুতুলের মতো আগলে সাজিয়ে রেখে দিয়েছে।
রিচার্ড অবশ্য এই অভিমানের বিপরীতে সম্পূর্ণ নির্বিকার। সকাল থেকেই তাকে কেমন যেন অতিরিক্ত গম্ভীর দেখাচ্ছে। এলিজাবেথের পাতে লোভনীয় বাঙালি খাবার তুলে দিলেও, নিজে কিন্তু তার চিরচেনা সিদ্ধ খাবারের বৃত্ত থেকে একচুলও বের হয়নি। এলিজাবেথ বারবার আড়চোখে দেখছে, লোকটা কোনো মশলা ছাড়া, তেল ছাড়া কেবলই সিদ্ধ শাকসবজিগুলো কেমন খরগোশের মতো খুঁটে খুঁটে চিবিয়ে খাচ্ছে! রিচার্ডের খাওয়া দেখেই এলিজাবেথের নিজের গা গুলিয়ে উঠছে। অথচ লোকটার মুখে কোনো ভাবান্তর নেই।
বিরক্ত আর অস্বস্তিতে যখন এলিজাবেথের মনটা ছটফট করছিল, তখন হঠাৎ-ই তার দৃষ্টি গিয়ে ঠেকল নিজের গলার ওপর। মোমের মতো মসৃণ ত্বকে গলিত মোমের মতো মিশে আছে একটি চমৎকার টিউলিপ নেকপিস। নেদারল্যান্ডসের ন্যাশনাল টিউলিপ ফেস্টিভ্যালের জাদুকরি দিনে, মাইলের পর মাইল বিস্তৃত টিউলিপের রাজ্যে দাঁড়িয়ে রিচার্ড সযত্নে এটি তাকে পরিয়ে দিয়েছিল।
তাদের এবারের বিশ্বভ্রমণটা ছিল বড্ড এলোমেলো। সাধারণত মানুষ যেভাবে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে ক্রমানুসারে অন্য প্রান্তে ভ্রমণ করে, তাদের ক্ষেত্রে ঘটেছিল ঠিক তার উল্টো। তাদের কোনো নিয়ম নেই, ছক নেই। রিচার্ড বেপরোয়া চিত্তে দিক-বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পৃথিবীব্যাপী ছুটে চলেছে। সুইজারল্যান্ডের পর্ব শেষ করেই তাদের ব্যক্তিগত প্রাইভেট জেটের যান্ত্রিক পাখা ঘুরেছিল রাশিয়ার দিকে। এলিজাবেথ রাশিয়ায় গিয়েছিল মূলত নিজের নাড়ির টানে, জন্মভূমির টানে। মনে মনে আশা ছিল, সেখানে গেলে হয়তো খুঁজে পাবে তার ফেলে আসা অতীত, তার আসল বাবা-মা কিংবা তাদের অস্তিত্বের কোনো গল্প। দেখা মিলবে তার সেই হারানো রাজ্যের, যে রাজ্যের রানি হওয়ার কথা ছিল তার—রানি এলিজাবেথ।
কিন্তু নিয়তির পরিহাস! এই চব্বিশ বছরে অনেক কিছুই বদলে গেছে। সময়ের স্রোতে ইতিহাসের পাতা থেকে চিরতরে মুছে গেছে নভগোরোদ রাজ্যের শেষ চিহ্নটুকুও। আশায় বুক বাঁধা এলিজাবেথ যখন চুরমার হয়ে মুষড়ে পড়েছিল, তা দেখে রিচার্ড আর এক মুহূর্তের জন্যও তাদের ছায়া রাশিয়ার মাটিতে পড়তে দেয়নি। সেদিনই তারা আকাশপথে পাড়ি জমায় দুবাইয়ের উদ্দেশ্যে।
এ পর্যন্ত তারা কম দেশ ঘোরেনি। তবে এত কিছুর মাঝে এলিজাবেথের হৃদয়ে সবচেয়ে মধুর স্মৃতি হয়ে আছে দুবাইয়ের দিনগুলো। সেখানে গিয়ে সে তার বাকেট লিস্টের অবান্তর সব স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছে। আর এই দুঃসাহসিক অ্যাডভেঞ্চারগুলোর পেছনে হাত ছিল কার? সেই বেরসিক, গম্ভীর মানুষটার! যে মানুষটা প্রয়োজন আর কাজ ছাড়া কখনো অন্য কিছুর দিকে মুখ তুলেও তাকাত না, সে-ই কিনা এলিজাবেথের মুখে হাসি ফোটাতে এই কদিনে নিজেকে উজাড় করে দিল! ফার্স্ট ফ্লায়ার, ফার্স্ট গ্লাইডার, মাউন্টেন কার্ট, ট্রোটিবাইক, ক্যানিয়ন সুইং, প্যারাগ্লাইডিং থেকে শুরু করে স্কাই ডাইভিং—মেয়েটার প্রতিটি পাগলামি আর আহ্লাদ সে নির্বাকমুখে পূরণ করেছে।
এলিজাবেথের মাঝে মাঝে মনে হতো, সে কোনো রূপকথার রাজ্যে আছে। আর সেই রাজ্যে বিধাতা তার মতো এক বিষাদকন্যার জন্য পাঠিয়েছেন এক অনন্য স্বপ্নবাজকে। যে লোকটা যেন নিঃশব্দে দায়িত্ব নিয়েছে এই দুঃখী মেয়েটার সব শূন্যতা সুখ দিয়ে ভরিয়ে দেওয়ার, তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে স্পেশাল মানুষ হিসেবে অনুধাবন করানোর।।
একটা সময় ছিল, যখন মায়ের তুচ্ছতাচ্ছিল্য আর প্রিয়জনদের হারানোর শোক এবং আলঝেইমার নামক বিষাক্ত রোগের প্রকোপে মেয়েটি নিজেকে ঘরের এক অন্ধকার কোণে গুটিয়ে নিয়েছিল। অথচ আজ সেই মেয়েটাই মুক্ত পাখির মতো ডানা মেলে উড়ছে গোটা বিশ্বের আকাশে। আর কখনো যদি সেই ডানায় ক্লান্তি নেমে আসে, তবে সে দ্বিধাহীনভাবে ভর করে রিচার্ডের ডানায়। বিশ্বাসের এই আকাশছোঁয়া আকাশটা তাকে ওই গম্ভীর মানুষটাই উপহার দিয়েছে। সে তার স্বামী, তার অন্ধকার জীবনে নেমে আসা এক টুকরো স্নিগ্ধ চাঁদ। যে চাঁদের আলোয় আজ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে তার ভেঙে যাওয়া কাচের মতো বির্বণ জীবন।
স্মৃতির অতলে ডুবতে ডুবতে সে ফিরে গেল সেই রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে। সেদিন আকাশ ছিল মেঘহীন, অসম্ভব রকম উজ্জ্বল নীল। এয়ারফিল্ডের রানওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা হেলিকপ্টারের রোটর ব্লেডগুলো তখন কর্কশ শব্দে ঘুরতে শুরু করেছে, বাতাসে তৈরি হচ্ছে তীব্র কম্পন। তারা দুজনেই তখন ট্যান্ডেম স্কাইডাইভিংয়ের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। গায়ে জড়ানো ভারী হার্নেস আর সেফটি জ্যাকেট। এলিজাবেথের শরীরটা শক্ত করে লেপ্টে ছিল রিচার্ডের চওড়া বুকের সাথে, ব্যাক-টু-ফ্রন্ট পজিশনে তাদের হার্নেসগুলো তখন একে অপরের সাথে চার জায়গায় লক করা। হেলিকপ্টারটি যখন ভূমি ছেড়ে কয়েক হাজার ফুট উঁচুতে উঠে গেল, তখন ওপেন ডোরের বাইরে শুধুই উত্তাল বাতাসের গর্জন। নিচে দিগন্ত বিস্তৃত পৃথিবীটা ছোট হতে হতে ক্যানভাসে রূপ নিয়েছে। জাম্প ডোরের কাছে এসে নিচের দিকে তাকাতেই ভয়ে শিউরে উঠছিল এলিজাবেথ। উচ্চতাভীতি আর বাতাসের ধাক্কায় বার বার চোখ-মুখ কুঁচকে সে মুখ লুকাচ্ছিল রিচার্ডের বুকে। অথচ রিচার্ড ছিল সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন, শান্ত। আকাশ যার নিত্যদিনের খেলার মাঠ ছিল, তার চোখে এই উচ্চতা কোনো ভয়ের উদ্রেক করে না।
“আমার খুব ভয় করছে।” বাতাসের তীব্র শব্দের মাঝেই এলিজাবেথের কণ্ঠ কাঁপছিল।
বিপরীতে বড্ড নির্লিপ্ত এবং ইস্পাতকঠিন শোনালো লোকটার কণ্ঠ, “আমি আছি।”
একটা মাত্র কথা, কিন্তু তার গভীরতা যেন আকাশ ছোঁয়া! তাও এলিজাবেথের বুকের ভেতর আছড়ে পড়া অ্যাড্রেনালিনের ঝড় কমে না। সে নিচের দিকে তাকাতেই পারছিল না। চোখ দুটো বন্ধ করে বলল, “ভয় করছে।”
রিচার্ড পেছন থেকে শক্ত করে এলিজাবেথের পেট জড়িয়ে থাকা হার্নেসের স্ট্র্যাপটা টেনে আরেকটু লক করে নিল। ওর মাথাটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে কানে কানে বলল,
“আমার বুকে মাথা রেখে আপনি উড়ুন।”
এলিজাবেথ গ্রীবা বাঁকিয়ে রিচার্ডের দিকে তাকাল। মেয়েটার চোখে তখনও ভয়, “যদি আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি?”
গম্ভীর লোকটার ঠোঁটের কোণে আলতো হাসি ফুটল,”জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে আমার বুকে আবিষ্কার করবেন।”
“ভয় করছে।”
“আমার চোখে চোখ রাখুন।”
এলিজাবেথ ওপরের স্বচ্ছ নীল আকাশের সৌন্দর্য ভুলে গিয়ে চোখ রাখল একজোড়া সমুদ্র-নীল চোখে।
“ভয়কে জয় করতে শিখুন৷ ডোন্ট ফরগেট ইয়্যু আর কুইন।”
বলেই কোনো পূর্বাবাস না দিয়ে অকস্মাৎ রিচার্ড এলিজাবেথকে নিয়ে হেলিকপ্টারের প্রান্ত থেকে শূন্যে ঝাঁপ দওল। এলিজাবেথ আতঙ্কে চিৎকার করে উঠে। ফ্রি-ফলের প্রথম কয়েক সেকেন্ডে গ্র্যাভিটির টানে তাদের পতনের বেগ তখন ঘণ্টায় প্রায় ১২০ মাইল! বাতাসের প্রচণ্ড চাপ বুকের ওপর এসে আছড়ে পড়ায় কিছুক্ষণের জন্য তো মেয়েটার নিঃশ্বাস বুকের ভেতর আটকে থাকে। রিচার্ড তখন বাতাসে ভারসাম্য বজায় রাখতে টার্মিনাল ভেলোসিটিতে শরীরকে ধনুকের মতো বাঁকিয়ে নিয়েছে, যাতে তারা স্থিতিশীলভাবে ভাসতে পারে। কিছুক্ষণ পর যখন পতনের তুমুল বেগটা এক ধরণের ভাসমান অনুভূতিতে রূপ নিল, তখন ধীরে ধীরে চোখ মেলল এলিজাবেথ। তারা তখন আকাশের নীলের মাঝে ডানা কাটা পাখির মতো মুক্ত পতনে ভাসছে। এলিজাবেথ রিচার্ডের সাথে লক হয়ে অনুভূমিকভাবে ডাইভ করছে, তার পিঠের সাথে মিশে আছে রিচার্ডের শক্ত বুক। চারপাশের মেঘহীন আকাশ আর হু হু করে বয়ে যাওয়া ঠান্ডা বাতাসের স্পর্শে এলিজাবেথ ঘাড় বাঁকিয়ে মুগ্ধ চোখে তাকাল। দেখতে দেখতে বিমুগ্ধ কণ্ঠে বলে উঠল,
“পুরোটা জীবন যদি এভাবে ডানা মেলে পাখির মতো উড়া যেতো।”
রিচার্ড খেয়াল করল এলিজাবেথের চোখের সেই নির্মল মুগ্ধতা। এক টুকরো আলতো হাসি খেলে গেল গম্ভীর লোকটার ঠোঁটে। সে হঠাৎ-ই এলিজাবেথের দুহাত দুটো পাখির ডানার মতো দুই পাশে ছড়িয়ে দিল, যাতে বাতাসকে আরও নিবিড়ভাবে অনুভব করা যায়। অতঃপর এলিজাবেথের আঙুলের ভাঁজে নিজের আঙুল ঢুকিয়ে দিয়ে নিরেট ঠান্ডা স্বরে আওড়াল,
“আমার বুকে মাথা রাখুন। এভাবেই সারাটা জীবন আমার বুকে মাথা রেখে, ডানা ঝাপটানো পাখির মতো উড়ে বেড়ান। আমার খাঁচার আকাশে আপনি মুক্ত।”
এলিজাবেথ সরু চোখে রিচার্ডের দিকে তাকাল, “খাঁচার আকাশে মুক্ত? কথাটা কেমন শোনালো না?”
বড্ড রাশভারী শোনালো লোকটার কণ্ঠ, “আপনি আমার আওতার বাইরে—কথাটা অবিশ্বাস্য নয়?”
এলিজাবেথ মেনে নিল কথাটা। সত্যিই, এই পুরুষটির প্রভাব থেকে তার মুক্তি নেই। অন্তত এই কয়দিনে তার এটাই মনে হয়েছে।
তারা প্রায় সাড়ে চার হাজার ফুট উচ্চতায় নেমে এসেছে। রিচার্ড অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে ডান হাত দিয়ে রিপকর্ড টেনে মেইন প্যারাসুটের পিনটি অবমুক্ত করল। সঙ্গে সঙ্গে পাইলট শু-র টানে পিছনের কন্টেইনার থেকে মেইন প্যারাসুটটি বাতাসে ডানা মেলল। এক ঝটকায় ফ্রি-ফলের তীব্র বেগ কমে গেল, তাদের শরীর অনুভূমিক থেকে সোজা হয়ে উলম্বভাবে বাতাসে ঝুলতে লাগল। চারপাশটা হঠাৎ করেই শান্ত ও নিস্তব্ধতায় রূপ নিল। প্যারাসুটের নিচে শান্ত গতিতে ভেসে থাকার এই সুযোগে, রিচার্ড ক্ষিপ্র গতিতে এলিজাবেথের কোমর ধরে তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে একদম কাছে টেনে আনল। অসীম নীল আকাশের বুকে, ক্যানোপির ছায়ায়, দুই জোড়া হার্নেসের টানটান বাঁধনে আবদ্ধ অবস্থায় রমণীর ঠোঁট কামড়ে ধরে, নিঃশ্বাসের গাঢ়ত্ব তৈরি করে আওড়াল সে,
“লেটস হ্যাভ আ ফ্রেঞ্চ কিস, রেড।”
প্রচণ্ড বেপরোয়া এবং ক্ষিপ্র গতিতে সে আঁকড়ে ধরল এলিজাবেথের ঠোঁট। মেঘহীন আকাশের পটভূমিতে, পৃথিবীর বুক থেকে হাজার ফুট উঁচুতে এলিজাবেথ প্রথমে একটু চমকে উঠল। তবে পরক্ষনেই সমস্ত ভয়, সমস্ত দ্বিধা ভুলে বন্য ছোঁয়ার মাঝে নিজেকে সঁপে দিল। প্রকৃতির এই সুন্দর ক্যানভাসে সে লোকটার ঠোঁটের উষ্ণতার ভাঁজে সায় দিল, সয়ে নিল ভালোবাসার বুনো ও বন্য অনুভূতি।
তারপর? তারপর দুবাইয়ের অধ্যায় শেষ করে তারা পাড়ি জমায় নেদারল্যান্ডসে। সেটাও কেবল এলিজাবেথের একচিলতে ইচ্ছে পূরণের জন্যই। টিউলিপের প্রতি এলিজাবেথের তরুণী মনের বিশেষ টান ছিল। আর সেই টানের মূল্য দিতেই লোকটা তাকে শুধু নেদারল্যান্ডসের টিউলিপ উৎসব দেখিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, তাকে চমকে দিয়ে সোজা নিয়ে এলো কানাডায়—বিশ্বের সবচেয়ে বড় টিউলিপ ফেস্টিভ্যাল উপভোগ করার জন্য! যে মানুষটা সবসময় মেপে মেপে হিসেবি কথা বলে, এলিজাবেথকে ঘিরে তার আহ্লাদ আর আদরের যেন কোনো অন্ত নেই।
তবে এই ভ্রমণের মাঝেই ঘটে গেছে কিছু মজার ঘটনা।
কানাডা আসার পূর্বে তারা গিয়েছিল নেপালে। সেখানে তাদের বাঞ্জি জাম্প করার কথা ছিল। কিন্তু এলিজাবেথ বুদ্ধি করে ন্যাসো আর ইবরাতকে কিছুটা একান্ত সময় দেওয়ার জন্য নিজে সরে আসে। পরবর্তীতে এলিজাবেথ আর রিচার্ড হিমালয় দর্শনে চলে যায়। আর এই ফাঁকেই নেপালের পাহাড়ি উপত্যকায় ঘটে যায় এক নাটুকে কাণ্ড!
ইবরাত খুব করে চেয়েছিল ন্যাসোর সাথে একসাথে বাঞ্জি জাম্প করতে। কিন্তু ন্যাসো বরাবরের মতোই ভীষণ শক্ত। সমাজের চাপিয়ে দেওয়া দায়িত্ব সে হাসিমুখে কাঁধে তুলে নিয়ে পুরো বিশ্ব ঘুরে বেড়াতে পারলেও, নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে ইবরাতের কোনো আবদারকে সে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দিতে রাজি হলো না। ন্যাসোর এই সরাসরি না শুনে ইবরাতের মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়।
অভিমানে বুক ফুলিয়ে ইবরাত তো বলেই বসল,”আপনি না থাকলেও আমি একাই লাফ দেব, আমি একাই একশো।”
যেমন কথা, তেমন কাজ। ইবরাত একা একাই লাফ দিল ঠিকই, কিন্তু সাহসের পারদ উবে গিয়ে মাঝ আকাশেই সে জ্ঞান হারাল! যখন তার জ্ঞান ফিরল, তখন থেকেই শুরু হলো কান্না। একে তো শখ মেটেনি, তার ওপর ন্যাসোর ওই কঠিন আচরণ…. সব মিলিয়ে সে কেঁদেই চলল আর জেদ ধরল, সে আবারও জাম্প করবে। ন্যাসোর কড়া ধমকেও যখন তার কান্না থামানো যাচ্ছিল না, তখন ন্যাসো বাধ্য হয়ে বাচ্চার মতো কাঁদতে থাকা ইবরাতকে শান্ত করার জন্য একটা বুদ্ধি খাটাল। সে ইবরাতকে মোবাইলে বর্তমানে ইন্টারনেটে সবচেয়ে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও দেখাল। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের চূড়ায় উঠে একজন প্রেমিক তার প্রেমিকাকে প্রপোজ করছে। ভিডিওটা দেখিয়ে ন্যাসো একটু চ্যালেঞ্জের সুরেই ইবরাতকে বলেছিল,
“তুমিও যদি এভাবে আমাকে প্রপোজ করতে পারো, তবেই আমি তোমার সাথে বাঞ্জি জাম্পিংয়ে যাব।”
ন্যাসো ভেবেছিল ইবরাত ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাবে। কিন্তু ইবরাত তো দমে যাওয়ার পাত্রী নয়! সে বেশ গর্ব আর আত্মবিশ্বাসের সাথে ন্যাসোর চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল,
“আপনি আমাকে ভিডিও কলে দেখতে না পারলেও, স্ক্রিনে ঠিকই দেখতে পাবেন!”
ইবরাতের সেই কথা যে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হবে, তা ন্যাসো কল্পনাও করতে পারেনি। ন্যাসো হোটেলে ফিরে এসেছিল। ফ্রেশ হতে যাবে, এমন সময় টিভির ব্রেকিং নিউজের হেডলাইনে তার চোখ আটকে গেল। তারপর চোখ তো তার চড়কগাছ! টিভির স্ক্রিন জুড়ে তখন লাইভ দেখানো হচ্ছে ইবরাতকে! নেপালের একটা উচুঁ চায়না টাওয়ারের মাথায় বসে ইবরাত বাচ্চাদের মতো ভ্যাঁ-ভ্যাঁ-ভ্যাঁ করে কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটার মুখের অবস্থা একেবারে দফারফা।
আসলে ন্যাসোকে দেওয়া চ্যালেঞ্জটা জেতার জন্য ইবরাত হন্যে হয়ে একটি উঁচু জায়গা খুঁজছিল। শেষমেশ এই টাওয়ারটা খুঁজে পেয়ে বহু কসরত করে সে একদম চূড়ায় উঠেও পড়েছিল। খাঁটি বাঙালি মেয়ে বলে কথা, গাছে ওঠার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তরতর করে সে ওপরে উঠে যায়। কিন্তু আসল বিপত্তিটা বাধল নামার সময়! ওপরে ওঠা যতটা সহজ ছিল, নামাটা ছিল ঠিক ততটাই কঠিন। তার ওপর ওপর থেকে নিচে তাকালেই ভয়ে মাথা ঘুরে উঠছিল। উপায় না দেখে সে পকেট থেকে ফোনটা বের করে ন্যাসোকে ভিডিও কল দিতে গিয়েছিল—ন্যাসোকে দেখাবে যে সে পেরেছে। কিন্তু হাত ফসকে ফোনটাও নিচে পড়ে যায়। তারপরই শুরু হয় তার তারস্বরে কান্না।
নিচে একটা বাচ্চা খেলছিল। ওপর থেকে কান্নার আওয়াজ পেয়ে সে ওপরে তাকিয়ে ইবরাতকে ওভাবে ঝুলতে দেখে চেঁচামেচি করে লোক জড়ো করে। তারপর মুহূর্তের মধ্যে সাংবাদিকরা চলে আসে এবং লাইভ নিউজ শুরু হয়ে যায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, শেষমেশ ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এসে মই লাগিয়ে ইবরাতকে উদ্ধার করে নামিয়ে আনে। টিভিতে এই নিউজ দেখার পর ন্যাসো পাগলের মতো ছুটে গিয়েছিল অকুস্থলে। এই ঘটনার পর থেকে ইবরাতের ডানপিটে স্বভাবটা একটু হলেও দমেছে।
সেদিনের কথা মনে করে মিটিমিটি হাসছিল এলিজাবেথ। তা লক্ষ করে পাশে বসা গম্ভীর লোকটা খানিক ভ্রু উঁচালো। বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে আওড়ালো,
“সকাল সকাল এমন হাসি নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। ঘুমভাঙা হার্টটা এখনো ওয়ার্ম-আপেই আছে!”
ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গিয়ে সংবিৎ ফিরে পায় এলিজাবেথ। সপ্রশ্নে রিচার্ডের দিকে তাকায়,”হুহ?”
পেপার ন্যাপকিন দিয়ে অতি সংবেদনশীলভাবে ঠোঁট মুছতে মুছতে বাকি কথা সম্পূর্ণ করল সে,”দিনের শুরুতেই যদি হার্ট চুরি হয়ে যায়, বাকি দিনটা চলবে কীভাবে?”
এলিজাবেথ পূর্ণ দৃষ্টিতে রিচার্ডের দিকে ফিরে তাকাল। অনুভব করল মিলিসেকেন্ডের ভেতর তার ভেতরে সুপ্ত ক্রোধ হাওয়া মিঠাই যেমন বাতাসের সংস্পর্শে চুপসে যায়, তেমনি তার ক্রোধও লোকটার এক দর্শনে মিইয়ে গেছে। এলিজাবেথ লোকটার ব্যক্তিত্বময় চিবুকের দিকে তাকিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় বলে উঠল,
“আপনার দিকে তাকালে আমার কি যেন হয়ে যায়। মনেহয় আমি সব ভুলে যাই, কিন্তু আপনাকে ভুলতে পারি না। এটা প্রেম না দহন, মি.কায়নাত?”
নীলকান্তমণির মতো চোখ দু’টো গিয়ে নিবদ্ধ হলো এলিজাবেথের মুগ্ধ দৃষ্টির অন্তরালে। সংযত হাসি ফুটল কালচে ঠোঁটের কোণে!
“আই হ্যাভ সামথিং ফর ইউ, হানি।”
রিচার্ডের কথায় এলিজাবেথের মুগ্ধ দৃষ্টির ঘোরটা ভাঙল। পরক্ষণেই রিচার্ড যখন পকেট থেকে একটা চকচকে রিভলবার বের করে টেবিলে রাখল, এলিজাবেথ চমকে উঠে পিছিয়ে গেল। অস্ফুট স্বরে বলল, “রিভলবার?”
ভয়ার্ত চোখের সেই কম্পনটুকুর দিকে তাকিয়ে রিচার্ডের কণ্ঠ চেরা চাপা হিসহিসানি শব্দ বের হলো, “ফর ইয়োর প্রোটেকশন।”
ভয়টাকে নিমেষেই একপাশে ঠেলে দিয়ে এলিজাবেথ তার নির্ভীক চোখ দুটো রিচার্ডের ওপর রাখল। আলতো হেসে শুধাল, “আপনি আছেন তো।”
রিচার্ড জবাব দিল না। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে, তারপর এলিজাবেথকে টেনে তুলল নিজের মুখোমুখি। ওর চোখের গভীরে চোখ রেখে প্রত্যয়ী কণ্ঠে বলল, “আপনার জন্য আমি আছি৷ কিন্তু আমি চাই, আমার জন্যও আপনি থাকুন। শক্ত থাকুন, লড়ুন, প্রয়োজন শুট করুন।”
“কিন্তু, আমি তো…” এলিজাবেথের কথা শেষ হতে পারল না।
“লেট মি টিচ ইয়্যু, ওয়াইফি…!”
রিচার্ড আলতো পায়ে এলিজাবেথের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। পেছন থেকে সামান্য ঝুঁকে এসে নিজের থুতনিটা রাখল এলিজাবেথের কাঁধে। তারপর পেশাদার ভঙ্গিতে এলিজাবেথের হাতটা তুলে নিল নিজের হাতের মুঠোয়, আঙুলটা বসিয়ে দিল রিভলবারের ট্রিগারে। তারপর নিশানা করল সামনের টেবিলে রাখা একটি সুদৃশ্য ফুলদানি।এলিজাবেথের হাত তখনো থরথর করে কাঁপছিল। অথচ তার ঠিক বিপরীতে রিচার্ডের দৃষ্টি ছিল বরফের মতো স্থির, নিশানা একদম নিখুঁত।
ঠাস করে একটা বিকট শব্দ হলো! ফুলদানিটা ভেঙে চুরমার হয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। আতঙ্কে কেঁপে উঠল এলিজাবেথ। আবারও শব্দ হলো! এভাবে দফায় দফায় চলল বুলেটের গর্জন। সময়ের বহমান স্রোতের সাথে সাথে এলিজাবেথের ভেতরের ভয়টাও ধীরে ধীরে কর্পূরের মতো উড়ে যেতে লাগল। ভয়ে খিঁচে রাখা চোখ দুটো মেলল সে। সেখানে এবার ভয়ের জায়গায় জায়গা নিল তুমুল কৌতূহল আর রোমাঞ্চকর অনুভূতি। রিভলবারের শেষ বুলেটটা যখন চেম্বার খালি করে বেরিয়ে গেল, তখন রিচার্ড হাত নামাল। এলিজাবেথের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে শুধাল, “ফিলিং রিফ্রেশড?”
এলিজাবেথ বুক ভরে জোরে শ্বাস নেয়,”এটা সত্যিই দারুণ থ্রিলিং ছিল!”
রিচার্ড এলিজাবেথকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। শূন্য রিভলবারটি আবারও এলিজাবেথের কোমল হাতের আঁজলায় সঁপে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “এটা সবসময় নিজের সাথে রাখবেন। সামনে আমাদের জন্য অনেক চড়াই-উতরাই অপেক্ষা করছে, অনেক ঝড়ঝাপটা আসবে৷ আমি চাই না আমার অনুপস্থিতিতে কেউ আপনার ক্ষতি করুক। আমার তুলোর পুতুল যেন নিজের ডিফেন্স নিজেই করতে পারে।”
এলিজাবেথের চোখে এবার বিস্ময়ের রেখা, “তুলোর পুতুল?”
রিচার্ড এলিজাবেথের খুব কাছে এগিয়ে এলো। ওর নাকের ডগায় নিজের নাক ছুঁইয়ে গভীর অনুরাগে ফিসফিস করে বলল, “আমার পুতুল। মাত্র্যোশকা।”
হঠাৎ ভয়ংকর বজ্রপাতে যেন অশনিসংকেতের মতো হুড়মুড়িয়ে আকাশ ভেঙে পড়ল। সেইসাথেই টপটপ করে নামল বৃষ্টি। মাথার উপর কোনো কংক্রিটের ছাদ ছিল না, চারপাশটা ছিল কাঁচ দিয়ে ঘেরা। জায়গাটা ছিল বারান্দায়, তাই বাতাসের বেগও ছিল প্রচণ্ড। ঝড়ো হাওয়ায় উথাল-পাথাল হতে লাগল পর্দাগুলো। আর সেই দমকা হাওয়ায় এলোমেলোভাবে উড়ে গেল রুশ রমণীর গোধূলিরঙা কেশরাশি। কিছু চুল গিয়ে অবাধ্যভাবে পড়ল রিচার্ডের ঘোরলাগা চোখে। তবুও চোখের মালিকের চোখের পলক পড়ে না। মুহূর্তটি যেন টাইমলাইনের কোনো ভুল চক্রে থমকে দাঁড়িয়েছে।
সময়ের অবাধ্যতায় দুটো অতল দৃষ্টি একবিন্দুতে এসে থমকে গেল, হারিয়ে গেল নিজস্ব স্বকীয়তা। এলিজাবেথ আজ নিজের সমস্ত আবেগ উজার করে দিয়ে প্রথম পদক্ষেপটি আজ নিজেই নিল। এক কদম এগিয়ে গিয়ে রিচার্ডের পায়ের পাতার ওপর ভর দিয়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল রিচার্ডের ওষ্ঠাধরে। আর এরপর যা ঘটল, তা ছিল বাইরের সেই প্রলয়ংকরী ঝড়ের চেয়েও উন্মত্ত, গতিহীন ও বেপরোয়া! রিচার্ড এক ঝটকায় টেবিল রানারটা টেনে ছুঁড়ে ফেলে দিল। ভেতরের উন্মত্ত হাওয়ার সাথে ছিটকে গিয়ে পড়ল টেবিলের ওপর থাকা সমস্ত জিনিসপত্র। কাচ ভাঙার ঝনঝন শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশ। অথচ, এলিজাবেথ তখনও এক অন্য ঘোরের অতলে তলিয়ে আছে। সে শুধু অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে দেখল বেপরোয়া লোকটা কতটা ক্ষিপ্রতায় হাতের কনুই দিয়ে সবকিছু ফেলে দিচ্ছে। পুরো টেবিলটা শূন্য হতেই রিচার্ড আর একটি মুহূর্তও নষ্ট করল না। এলিজাবেথকে শূন্যে তোলার মতো করে শুইয়ে দিল টেবিলের ওপর। এলিজাবেথের মাথাটা গিয়ে ঠেকল একটি ম্যাটের ওপর। ঘোরের মাঝেই সে দেখল, এলোমেলো সাদা পর্দার সাথে উড়ে যাচ্ছে তাদের শেষ পরিধেয় বস্ত্রটুকুও।
প্রকৃতির মতোই রুক্ষ ও ক্ষিপ্ত শোনাল পুরুষটার
কণ্ঠটা, “আমি বলেছিলাম, আমাকে প্রশ্রয় দিবেন না। নাও, ক্রাই।”
ছুঁচ যেভাবে ফালা ফালা করে ভেতরে প্রবেশ করে, রিচার্ডের আগমনও ছিল ঠিক ততটাই তীব্র ও আকস্মিক। স্বামী রূপী পুরুষটির লাগামহীন ঠোঁট যখন তার গলদেশ জুড়ে তৃষ্ণা মেটাতে লাগল, এলিজাবেথ যন্ত্রণার সুখে কুঁকড়ে উঠল। ধনুকের মতো বেঁকে গেল তার লতানো শরীর। সেই অবাধ্য ঠোঁটের গতি রোধ করতে গিয়ে তার হাত দুটো খামচে ধরল রিচার্ডের চুল। রিচার্ড রমণীর গ্রীবা থেকে মুখ তুলল। লোকটার সমুদ্র-নীল চোখের সমস্ত মুগ্ধতা তখন পুরুষালি চেতনায় তলিয়ে গেছে। রিচার্ড চোখ রাখল এলিজাবেথের অশ্রুসজল চোখে। সেই ভেজা চোখের দিকে চেয়ে, মিলনের অন্তিম মুহূর্তে ফিসফিসিয়ে বলল, “লেটস হ্যাভ আ বেবি, রেড।”
এলিজাবেথ চমকে উঠল। তরঙ্গ খেলে গেল অভ্যন্তরে। কিন্তু পরক্ষণেই সজল চোখ দু’টো সুখের অশ্রুতে ভরে উঠল। রক্ত জমে লাল হয়ে যাওয়া ঠোঁট দুটো কান্নায় ভেঙে পড়ল। সে রিচার্ডের গভীর চোখের দিকে তাকিয়ে নীরবে সম্মতি জানাল। বিপরীতে রিচার্ডের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল অস্পষ্ট হাসির স্পষ্ট ঝলকানি। এবার ভেতরের আদিমতা যেন আরও উগ্র রূপ নিল! এতক্ষণের ইস্পাত-কঠিন নিয়ন্ত্রণ মরচে ধরে ভেঙে পড়ল। সে আবারও রমণীর মাঝে নিজেকে বিলীন করতে যাবে, ঠিক তখুনি এলিজাবেথ বাধা দিল। মেয়েটা কেমন যেন আঁইঢাঁই করছে। বৃষ্টির কারণে বাষ্প জমে কাচ ঝাপসা হয়ে গেলেও, এই উন্মুক্ততা এলিজাবেথকে অস্বস্তি দিচ্ছিল। এলিজাবেথ শুকনো ঢোক গিলে চারপাশে একবার দৃষ্টি বুলাল, তারপর নিজের বর্তমান অবস্থার দিকে তাকিয়ে কুণ্ঠিত কণ্ঠে বলল,
“আনকমফোর্টেবল!”
“ওহ ডার্লিং!”
ঠোঁট কামড়ে ধরল রিচার্ড। খানিকটা বিরক্ত হলো বুঝি!
তবে মেয়েটার অস্বস্তি সে বুঝল। যদিও তার ভেতরের মদমত্ত পুরুষ সত্তাটি তখন থামতে চাইছিল না। রিচার্ড দুই হাতে শব্দ করে একটা তালি বাজাতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারী পর্দাগুলো নেমে এলো চারপাশ থেকে। চারদিক দুর্ভেদ্য বেষ্টনীতে আবদ্ধ হলো, শুধু উন্মুক্ত রইল ওপরের কাঁচের ছাদটি। সেখানে বৃষ্টির ফোঁটা বিরতিহীনভাবে আছড়ে পড়ছে। এর বেশি আর বোঝার মতো অবস্থা তার ছিল না। কীভাবে থাকবে? তখন যে ইস্পাত-কঠিন আত্মনিয়ন্ত্রণ ধ্বংসের শেষ প্রান্তে! রিচার্ড আবারও ডুব দিল রমণীর গলদেশে। এলিজাবেথের ছুটে গিয়ে খামচে ধরতে চাওয়া হাত দুটোর আঙুলের ভাঁজে নিজের আঙুল গলিয়ে দিয়ে সেগুলোকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিল। তারপর তার গ্রীবাদেশে কামনার তাণ্ডব তুলে হিসহিসিয়ে আওড়াল,
“এডজাস্ট ইন এভরিহোয়ার।”
তাণ্ডবলীলার মতোই প্রলয়নাচন নেমে এসেছিল রমণীর সর্বাঙ্গে। ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছিল মেয়েটি, ঠিক যেন কাকভেজা কোনো পাখি শীতার্ত শরীরে কুঁকড়ে যাচ্ছে। পুরুষটির লাগামহীন, বেপরোয়া ছোঁয়ার তীব্রতায় চোখ বেয়ে নেমে এসেছিল সুখের অশ্রু, কানায় কানায় ভরে উঠেছিল তার ডাগরডোগর চোখ দুটি।
ধীরে ধীরে শান্ত হলো চারপাশ, অবসান ঘটল সেই আদিম তাণ্ডবের। ঝড়ের শেষে প্রকৃতির বুকে যেমন গভীর নিস্তব্ধতা নেমে আসে, ঠিক তেমনি শান্ত হয়ে এলো পুরুষটির ভেতরের সমস্ত উগ্রতা আর উন্মাদনা।
স্বচ্ছ কাঁচের জানালার ওপারে তখনও থেমে থেমে বৃষ্টির ফোঁটা আছড়ে পড়ছে। বাইরে প্রকৃতি এখন অনেকটাই শান্ত, কমে এসেছে বৃষ্টির বেগ। রিচার্ডের মেলে রাখা বলিষ্ঠ হাতের ওপর মাথা রেখে শুয়ে আছে এলিজাবেথ। রিচার্ডের অপর হাতটি ভাঁজ করা নিজের মাথার নিচে।
উন্মত্ত প্রেমের জোয়ারে ভেসে যাওয়া ক্লান্ত দম্পতি এখন নিস্পৃহ চোখে বৃষ্টিবিলাস করছে। তাদের চোখে-মুখে শ্রান্তির ছাপ স্পষ্ট হলেও ঠোঁটের কোণে লেগে আছে প্রশান্তির আলো। নীরবতা ভেঙে এলিজাবেথ ফিসফিসিয়ে ডাকল,
“চাঁদ!”
রিচার্ডের চিরায়ত তেজি আর কঠিন অভিব্যক্তিতে কোনো পরিবর্তন হলো না। তবে সে ঘাড় ঘুরিয়ে, খানিকটা ভ্রু কুঁচকে এলিজাবেথের দিকে তাকাল। এলিজাবেথ আগে থেকেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে ছিল তার দিকে। রিচার্ডের ওই কুঁচকানো ভ্রু দেখে মেয়েটার ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি আরও চওড়া হলো। সে পরম আদরে রিচার্ডের নাকে নাক ঘষে আবারও আওড়ালো,
“আমার চাঁদ।”
সেই চুম্বকীয় স্পর্শে রিচার্ডের চোখে আবারও সুপ্ত কামনার আলো জ্বলে উঠল। হঠাৎ-ই সে অতর্কিতে ঝুঁকে পড়ল এলিজাবেথের ওপর, মুখ লুকাতে চাইল তার গলার খাঁজে। এলিজাবেথ আলতো করে কুঁকড়ে উঠল। ভালোবাসার সেই মধুর যন্ত্রণা সহ্য করেই সে মৃদু স্বরে বলল,
“আমি জানি না, এই কথাগুলো আমি আর কতদিন মনে রাখতে পারব। তাই আজ আপনার কাছে একটা কথা বলে যেতে চাই। আপনার কাছে আমার একটা চাওয়া আছে, জান।”
রিচার্ড এলিজাবেথের গলার ভাঁজ থেকে মুখ তুলল। মুহূর্তেই তার চোখের দৃষ্টি গম্ভীর হয়ে উঠল, “উইশেশ?”
“কাইন্ডা।”
রিচার্ড এলিজাবেথের কলারবোনে ছোট ছোট চুমু এঁকে দিতে দিতে ব্যস্ত গলায় শুধালো, “লাইক, হোয়াট?”
“সবকিছু ভুলে যাওয়ার আগে, আমি আমার যমজ বোনকে দেখতে চাই। শুধু একবারের জন্য হলেও!”
কথাটা শুনে আচমকা থমকে গেল রিচার্ড। কামনার রসে ডোবানো চোখে ক্ষণিকের জন্য এক অদ্ভুত শঙ্কার ছায়া ফুটে উঠল। সে কথাটাকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য আবারও এলিজাবেথের ওপর নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে চাইল। কিন্তু এলিজাবেথ তাকে থামিয়ে দিয়ে আকুল হয়ে বলে উঠল,
“আমার মন বলছে, আমার বোন এখনও বেঁচে আছে!”
রিচার্ড আবারও থামল। তবে এবারও সে ইচ্ছাকৃতভাবেই প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যেতে চাইল। ওদিকে এলিজাবেথ তখন নিজের ভাবনার জগতে হারিয়ে গেছে। সে আপন মনেই বলে চলল,
“আচ্ছা, এমনটা করলে কেমন হয়? আমরা যদি ওই শয়তানটাকে খুঁজে বের করি এবং তার সাথে সামনাসামনি খোলাখুলি কথা বলি? আমার কেন যেন মনে হয়, এখানে বড় কোনো ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। সব গল্পের আড়ালেও তো অন্য একটা গল্প থাকে, তাই না? হয়তো সে আসলে যাকে খুঁজছে, আমরাও তাকেই খুঁজচ্ছি! কোনো না কোনোভাবে আমরা একে-অপরের…..
বাক্য মাঝপথেই অসমাপ্ত রয়ে গেল! হঠাৎ করেই রিচার্ডের শান্ত হয়ে আসা মস্তিষ্ক আবার ফিরে গেল তার চিরায়ত পৈশাচিক রূপে। সমুদ্রের অতল গহ্বরে লুকিয়ে থাকা হিংস্র প্রলয়ের মতো, কিংবা কোনো সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো আচমকা ফেটে পড়ল তার ভেতরের আদিম রূপ। চোখ দুটো দাউদাউ করে জ্বলে উঠল গনগনে অগ্নিশিখায়। মিলিসেকেন্ডে মধ্যে সে এলিজাবেথের উন্মুক্ত বক্ষের ভাঁজ থেকে মুখ তুলে, ক্ষিপ্র গতিতে পাশের চেয়ারে পড়ে থাকা নাইফটি তুলে নিয়ে, কোনো দ্বিধা ছাড়াই তা চেপে ধরল এলিজাবেথের গলার খাঁজে। অতঃপর হিংস্র পশুর মতো গর্জে উঠল,
“আই ওয়ার্ন ইয়্যু, আই ওয়ার্ন ইয়্যু! ইন্টিমেসি মোমেন্টে আমাকে অন্য কোনো দিকে ডাইভার্ট করার চেষ্টা করবে না। দ্যান হোয়াই? কেন ওই মাদারফাকারের নাম আসছে? এই জবানে অন্য কোনো পুরুষের নাম কেন আসবে? হোয়াই? ইয়্যু আর মাইন, অনলি মাইন, গট ইট, ড্যামিট?”
এলিজাবেথ থমকে গিয়ে বরফের মতো জমাট বাঁধা, নির্জীব দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রিচার্ডের ওই ক্ষিপ্ত চোখের দিকে। তার অবিশ্বাস্য দৃষ্টির কার্নিশ বেয়ে অজান্তেই এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। পরক্ষণেই তাচ্ছিল্য নিয়ে হেসে উঠল সে,
“অবশেষে আপনার আসল রূপটা বেরিয়ে এলই তবে? আপনি তো সেই ডোমিনেটিং রিচার্ড কায়নাত, যে সামান্য একটা ফোন না ধরার অপরাধে মানুষকে অ্যাসিডে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা করতে পারে! আপনি সেই রিচার্ড কায়নাত, যে….
এলিজাবেথ তার কথা শেষ করার আগেই রিচার্ড সম্বিৎ ফিরে পেল। হুঁশ আসতেই বুঝতে পারল সে কী মারাত্মক ভুল করতে যাচ্ছিল! এক ঝটকায় হাত থেকে নাইফটি দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল সে। কিছুটা থতমত খেয়ে, নিজেকে সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল,
“আই অ্যাম জাস্ট প্লেয়িং লেডি… ইয়্যু নো আই লাভ……
রিচার্ড এলিজাবেথের দিকে এগোতে চাইলে এলিজাবেথ সজোরে ধাক্কা মেরে তাকে সরিয়ে দিল। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে সে চিৎকার করে উঠল,
“আই জাস্ট হেট ইয়্যু!”
নগ্ন শরীরে টেবিল রানারটা জড়িয়েই কাঁদতে কাঁদতে ভেতরে ছুটে গেল এলিজাবেথ। রিচার্ড ওকে আটকাতে গিয়েও আটকালো না। কিছুক্ষণ আগেই সে কী করতে যাচ্ছিল, এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই তার সমস্ত রাগ গিয়ে জমা হলো নিজের ওপর। ক্রোধ সামলাতে না পেরে টেবিলে সজোরে কয়েকটা ঘুষি মারল। চামড়া কেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে এলো, কিন্তু তাতেও ভেতরের আগুন শান্ত হলো না। মনের ভেতর জেগে ওঠা হিংস্র পশুটা তখনও ফুঁসছে।
ফুঁসতে ফুঁসতেই রিচার্ড কোমরে বেল্টটা জড়িয়ে নিয়ে ফোনটা হাতড়ে নিল। সোজা নেমে গেল নিচে, পুলের এক কোণে গিয়ে দাঁড়াল। পকেট থেকে ফোনটা বের করে সরাসরি একটি বাংলাদেশি নাম্বারে ডায়াল করল। ওপাশ থেকে তৎক্ষণাৎ কলটা রিসিভ হলো। তবে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, যে লোকটার কণ্ঠে সবসময় আত্মবিশ্বাস উপচে পড়ে, আজ এই প্রশ্নটা করতে গিয়ে তার গলাও যেন কিছুটা জড়িয়ে আসছিল। এমন নয় যে এই কদিনে সত্যিটা জানার প্রতি তার আগ্রহ জন্মায়নি; জন্মেছে। তবে জীবনে কিছু কিছু বিষয় এমন থাকে, যা মানুষ জেনেও ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে চলতে চায়।
রিচার্ড শক্ত করে ঢোক গিলল। তারপর বুক ভরে শ্বাস নিয়ে, সেদিন রানওয়েতে ডিউটিতে থাকা গার্ডের উদ্দেশ্যে বজ্রকণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“ওয়াজ অ্যানি ডেড বডি সিন দেয়ার?”
“নো, বস।”
বুকের ভেতর ভূমিধসের মতো কি যেন ভেঙে পড়ল। কিন্তু কেন, তা ঠিক জানা গেল না! নিকোটিনের ধোঁয়ায় পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া ঠোঁটের ফাঁক গলে বেরিয়ে এলো প্রলম্বিত শ্বাস। তবে তা স্বস্তির না অস্বস্তির, তাও ঠিক ধরা গেল না।
“ওই বিলেত রাজা, খুব লোভনীয় লাগছে।”
উচ্ছ্বসিত নারী কণ্ঠে রিচার্ড ঘাড় বাঁকিয়ে পিছন ফিরে তাকাল রিচার্ড। দেখতে পেল পাশের কটেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ইবরাত বাচ্চাদের মতো উল্লাসে লাফাচ্ছে। নিচে সুইমিংপুলে স্বচ্ছ পানির ওপর ভেসে আছে ন্যাসো । আর ইবরাত উপর থেকে পুরোটা সময় বৃষ্টিতে ভিজে ন্যাসোকে দেখছে এবং টেংরা মাছের মতো লাফাচ্ছে। আর একটু পরপর যত্তসব উদ্ভট, উদ্ভট নামে গলা ফাটিয়ে ডাকছে। হঠাৎ ইবরাত লাফানো বাদ দিয়ে গান ধরল,
❝ঐ ঐ ঐ আমার ভোলারে
ও আমার পাগলারে….
তুই খাবি কি ঝাঁঝে মরে যাবি!
হায় যতই বল খুলিস,,
না আর কোকা কোলা..
তাই নাম দিয়েছি তোর….
আমি সে-ক্সি পোলা, ওরে সে-ক্সি পোলা
হাই সে-ক্সি পোলা….❞
চারপাশ তখনও বৃষ্টিতে ভেজা। এলিজাবেথের কথা মনে হতেই রিচার্ড দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করল। ইবরাতের গানে ন্যাসোর মধ্যে কোনো হেলদোল নেই৷ সে চিত্তচিরে পানির বুকে ভাসছিল। তবে ইবরাতের সুমধুর গানের গলায় ভেতর থেকে ছুটে এলো লুকাস। এসে সে-ও ইবরাতের গানের সাথে তাল দিল। দু-হাত উপরে তুলে, সাপের মতো শরীর বাঁকিয়ে ঘুরতে ঘুরতেই সে সুরে যোগ দিল,
❝তাই মুন্নি আমার
এতো বদনাম হলো….❞
এবার ইবরাতের গলায় আরও জোর আসে। সে আরও চওড়া সুরে গাইতে শুরু করল,
❝হাঁ হাঁ হাঁ আমি শিলা যে
সেক্সি শিলা যে
খালি দেখলে হবে
খরচা আছে হেব্বি
হাঁ হাঁ হাঁ আমি জিলমি রে
বড় ফিল্মি রে
কোকাকোলা হবে না
যে তোর বিব্বি….❞
উপরে একজন আর নিচে আরেকজন— দুজনেই মত্ত হয়ে নিজেদের মতো নেচে চলেছে। ওদিকে ন্যাসো এতক্ষণে চোখ থেকে সানগ্লাসটা খুলে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর কান থেকে ইয়ারপিসটা খুলতে খুলতে উপরের দিকে উঠে এলো। এতক্ষণ কানে ইয়ারপিস গোঁজা থাকায় ইবরাতের কোনো বকবকানিই তার কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি।
পুল সাইডে উঠে এসে দুজনকে এভাবে নাচতে দেখে ন্যাসো ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল। চোখে-মুখে কিছুটা বিরক্তির আভাস ফুটে উঠলেও সেসবে পাত্তা দিল না সে। তোয়ালে দিয়ে নির্বিকার মাথা আর চুল মুছতে লাগল, যেন ওদের সে দেখেইনি!
ন্যাসোর পরনে তখন কেবল একটা কালো রঙের সুইম শর্টস। শরীরের উপরিভাগের বলশালী, বলিষ্ঠ গঠন পুরো অনাবৃত। পানির ছোঁয়ায় বুকের পেশিগুলোর ভাঁজ আরও চকচক করছিল। সেদিকে চোখ পড়তেই ইবরাত শুকনো ঢোক গিলল। তারপর জিভটা ঠোঁটের ওপর লম্পটের মতো বুলিয়ে ন্যাসোর উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে উঠল,
“উফফ, লোভনীয়!”
‘লোভনীয়’ শব্দটা কানে যাওয়া মাত্রই ন্যাসো তড়িৎ গতিতে দৃষ্টি ঘুরিয়ে ইবরাতের দিকে তাকাল। সোশ্যাল মিডিয়া বলতে তার কেবল একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট আছে। সেখানেও সে বিগত কয়েক বছর ধরে সক্রিয় নয়। অথচ সেখানেও ফলোয়ার্সের সংখ্যা মিলিয়নের ওপর! অ্যাকাউন্টে কেবল তার জিম করা সুগঠিত শরীরের বিভিন্ন ছবি পোস্ট করা! যা আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে কোনো প্রফেশনাল জিম ট্রেইনারের প্রোফাইল।
মাসখানেক আগে হঠাৎ করেই একটি অপরিচিত অ্যাকাউন্ট থেকে তার সব ছবিতে কমেন্টের বন্যা বয়ে যেত। আর প্রতিটি ছবিতে ঘুরেফিরে একটাই শব্দ লেখা থাকত ‘লোভনীয়’, সাথে একটা ঠোঁট কামড়ানোর ইমোজি। একই কমেন্ট রোজ করা হতো, বারবার করা হতো একই প্রতিটি ছবিতে। এমনকি ইনবক্সেও জমা হতো একই মেসেজ। ন্যাসো একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে সেই অ্যাকাউন্টটি ব্লক করে দেয়। আজ এতদিনে সে মেলাতে পারল, সেই অজ্ঞাত আইডিধারী বজ্জাত মেয়েটি আর কেউ নয়, এই ইবরাত!
Born to be villains part 29
“একটা চুমু খাই?”
ইবরাত ন্যাসোর কোমরের হাড়ের ঠিক পাশে, ঠোঁট আকৃতির লাল রঙের ট্যাটুর দিকে ইশারা করল— যা আন্ডারওয়্যারের ওপরের অংশ গলে ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে। পানির ভারে শর্টসটা নাভির কিছুটা নিচে নেমে আসায় আজ সেই গোপন ট্যাটুটি প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
ন্যাসো ইবরাতের দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজের নিচের দিকে তাকাল। ঘটনা হাতেনাতে ধরা পড়ে গেছে বুঝতে পেরে সে দ্রুত শর্টসটা টেনে উপরে তুলে ফেলল। তারপর চোয়াল শক্ত করে চাপা স্বরে বলল,
“ইয়্যু আর জাস্ট ইম্পসিবল, লিটল গার্ল!”
ইবরাত খিলখিলিয়ে হেসে উঠল,”ওখানে চুমু খাওয়ার মতোই ইম্পসিবল বুঝি?”
