Home মেজর ওয়াসিফ মেজর ওয়াসিফ শেষ পর্ব 

মেজর ওয়াসিফ শেষ পর্ব 

মেজর ওয়াসিফ শেষ পর্ব 
ঐশী রহমান

কটেজের নিস্তব্ধ ড্রয়িংরুমে তখন রাত সাড়ে বারোটার নীরবতা। বারান্দার মৃদু আলো এসে পড়েছে ওয়াসিফের ক্লান্ত, তামাটে মুখে। ধারার চোখের নোনাপানি তখনো শুকোয়নি, কিন্তু ওয়াসিফের বুকের ভেতর যে ঝড় বয়ে গেছে, তার আঁচ পেয়ে সে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে চলে গেছে।
ওয়াসিফ বুটজোড়া একপাশে খুলে রেখে ধীর পায়ে শোবার ঘরে ঢুকল। খাটের একপাশে নীল রঙের সুতি ফ্রক পরে ছোট্ট ওয়াসিকা বেঘোরে ঘুমিয়ে আছে। তার গাল দুটোতে এখনো কান্নার হালকা দাগ লেগে আছে, হয়তো বাবাকে না দেখে কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়েছে। ওয়াসিফ বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। পরম মমতায় মেয়ের কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। তারপর আলতো করে এক বছরের ছোট্ট শরীরটাকে বুকের মাঝে তুলে নিল।

বাবার চেনা স্পর্শ পেতেই ওয়াসিকা ঘুমের ঘোরেই একটু নড়েচড়ে উঠে ওয়াসিফের শার্টের কলারটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল, যেন সে অবচেতন মনেই জানত—তার সুপারহিরো বাবা ঠিক চলে আসবে। ওয়াসিফ শক্ত করে মেয়েকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলে ‘ শুভ জন্মদিন আমার মা, আমার এই জীবনের সব পূর্ণতা তুমি, গত একবছর আগে ঠিক এইদিনে তুমি এসেছো জীবনে। তোমাকে অনেক অনেক দোয়া মা, তোমার সুন্দর, সুস্থ জীবন হোক। বাবা আছে তোমার পাশে। বাবা_অনেক অনেক স্যরি মা। অনেক অনেক স্যরি’
ধারা দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিল। তার ভেতরের সব রাগ, সব অভিমান মুহূর্তের মধ্যে কর্পূরের মতো উবে গিয়ে সেখানে এক বিশাল শূন্যতা আর হাহাকার এসে ভর করল। সে এগিয়ে এসে ওয়াসিফের পাশে বসলো, ওয়াসিফ মেয়েকে পুনরায় শুইয়ে দিয়ে চুপচাপ বসে রইলো। ধারা, হাত দুটো নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিল।
“কী হয়েছে আপনার ? আমাকে পরিষ্কার করে বলুন, প্লিজ। আমি আর এই ধোঁয়াশা নিতে পারছি না।” ধারার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল।

ওয়াসিফ একবার ঘুমে বিভোর মেয়ের দিকে তাকিয়ে আবার তাকায় বৌয়ের দিকে। তারপর ধারাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে ঘরের লাগোয়া ছোট বারান্দাটাতে এসে দাঁড়াল। রাতের পাহাড়ি বাতাস তাদের ছুঁয়ে যাচ্ছে। দূরের পাহাড়ের বুকে জোনাকির মতো জ্বলছে দু-একটা আলো।
ওয়াসিফ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধারার মুখটা নিজের দুহাতের অঞ্জলিতে নিল। “মুমতাহিনা, মনে আছে তিন বছর আগের সেই দিনের কথা ? যেদিন কলেজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে তোকে কিডন্যাপ করা হয়েছিল? সেদিন তোকে ফিরে পেয়ে আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছিলাম, কিন্তু একটা কাঁটা আমার বুকে সারাক্ষণ বিঁধত। আমার চারপাশের কেউ একজন এই শত্রুদের পথ দেখিয়েছিল। আমি গত তিনটে বছর একটা দিনের জন্যও শান্তিতে ঘুমাতে পারিনি রে।”
ধারা স্তব্ধ হয়ে শুনছিল। ওয়াসিফ বলতে লাগল, “আজ ওয়াসিকার জন্মদিনের ঠিক আগের মুহূর্তে আমার সোর্স আমাকে কনফার্ম ইনফরমেশন দেয়। আর যখন আমি রেইড দিই… বিশ্বাস কর মুমতাহিনা, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। শশী! যাকে আমি নিজের বোনের মতো বিশ্বাস করেছি, যে আমাদের এই কটেজে কতবার এসেছে, সে শুধু টাকার লোভে আর আমার প্রতি অন্ধ হিংসা থেকে তোর সব ইনফরমেশন ওদের হাতে তুলে দিয়েছিল। আজ তাকে হাতেনাতে ধরেছি।”

ধারার পা দুটো যেন আর মাটির ওপর নেই। শশী আপা? যে মেয়েটা একবার ওয়াসিফের সাথে তাদের বাড়িতে গিয়েছিলো।তার সাথে কত হেসে হেসে গল্প করেছে, সে-ই তার জীবনটা ধ্বংস করতে চেয়েছিল? ওয়াসিফ ধারার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমি মীরজাফরদের ক্ষমা করি না, মুমতাহিনা। আজ শশীর কোর্ট মার্শাল নিশ্চিত করে, তাকে চিরদিনের জন্য খাঁচায় পুরে তবেই আমি তোদের সামনে এসেছি। আজ থেকে আমাদের আর কোনো ভয় নেই। আজ আমি একটু শান্তি তে ঘুমাবো”
ধারার চোখ দিয়ে এবার বাঁধভাঙা পানি গড়িয়ে পড়ল। তবে এ পানি অভিমানের নয়, এক পরম স্বস্তির আর কৃতজ্ঞতার। সে ওয়াসিফের চওড়া বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ওয়াসিফ তাকে শক্ত বাহুডোরে বেঁধে রাখল, যেন এই বুকে পৃথিবীর সমস্ত নিরাপত্তা লুকিয়ে আছে।
পরদিন সকাল।

পাহাড়ি কটেজের ওপর ভোরের আলো সোনা ছড়াচ্ছে। রাতের সব মেঘ কেটে গিয়ে চারপাশটা এক মায়াবী রূপ নিয়েছে। ড্রয়িংরুমে আবার আলো জ্বলে উঠেছে। লুইপা আর সামির তখনো ঘুমে, কিন্তু ধারা আর ওয়াসিফ জেগে।
মেঝের ওপর রাখা হয়েছে সেই সুন্দর করে সাজানো চকলেট কেকটা, যা কাল রাতে কাটাই হয়নি। ফ্রীজে তুলে রাখা হয়েছিলো। ওয়াসিকা ততক্ষণে জেগে গেছে। সে তার বাবার কোলে বসে খিলখিল করে হাসছে আর ওয়াসিফের আর্মি ছাটের সামনের চুলগুলো টেনে ধরার চেষ্টা করছে।
“মেয়ের জন্মদিন কাল শেষ হয়ে গেছে তো কী হয়েছে? মেজর শাহেদ ওয়াসিফের মেয়ের জন্মদিন আজ নতুন করে শুরু হবে” ওয়াসিফ হাসতে হাসতে কথাটা বললো, তার গলায় এখন আর সেই মিলিটারির কঠোরতা নেই, সেখানে এখন কেবলই একজন প্রেমিক পুরুষ আর একজন আদর্শ বাবার কোমলতা।
ধারা একটা সুন্দর কাঁচের প্লেটে কেক কাটার ছুরিটা এনে ওয়াসিফের হাতে দিল। ওয়াসিফ ধারাকে নিজের একদম কাছে টেনে নিল। ওয়াসিকার ছোট্ট হাতটা ধরে তারা তিনজন একসাথে কেকটা কাটল।
“হ্যাপি বার্থডে, আমাদের ওয়াসিকা,” ধারা আর ওয়াসিফ একসাথে বলে উঠল।
ওয়াসিকা করলো কি, ওর বাবা ওকে নিয়ে কেকের দিকে একটু ঝুঁকতেই ছোট্ট গোলগাল হাত দিয়ে বাঘের থাবার মতো ছো মারলো কেকের উপর, এক থাবায় কেকসহ, তার হাতের মুঠোয়, পরবর্তী তে সেই হাত নেড়ে নেড়ে ঝাড়া মারতেই ওর বাবার গায়ে লাগলো বেশি টুকু, মায়ের গায়ে অল্প, আর নিজের গায়ে বাকিটুকু। মেয়ের এই বাচ্চা সুলভ আচরণে পুরো ঘরে হাসির রোল বয়ে গেল। লুইপা আর সামিরও ততক্ষণে হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে এই সুন্দর দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়াল। লুইপার কোলে ছোট্ট আহনাফও যেন এই খুশিতে হাত-পা ছুড়ছে।
সামির মুচকি হেসে ওয়াসিফকে স্যালুট ঠুকে বলল, “স্যার, মিশন সাকসেসফুল!”

ওয়াসিফ হাসিমুখে স্যালুটের উত্তর দিয়ে বলল, “হ্যাঁ সামির, দ্য মিশন ইজ ফাইনালি কমপ্লিট।”
বিকেলের দিকে কটেজের বারান্দায় ধারা আর ওয়াসিফ পাশাপাশি দুটো বেতের চেয়ারে বসে আছে। ওয়াসিকা ওপাশের রুমে কার্পেটের ওপর লুইপার সাথে খেলছে। ধারা ওয়াসিফের কাঁধে মাথা রাখল। ওয়াসিফ তার একটা হাত ধারার কাঁধের ওপর তুলে দিয়ে তাকে নিজের দিকে আর একটু টেনে নিল।
“জানিস মুমতাহিনা,” ওয়াসিফ দূর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “ঝড় না আসলে নাকি শান্তির মূল্য বোঝা যায় না। আজ মনে হচ্ছে, আমার জীবনের সব ঝড় থেমে গেছে। এখন শুধু তোদের নিয়ে বেঁচে থাকার পালা।”
ধারা ওয়াসিফের হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, “আর কোনো ঝড় আমাদের ছূঁতে পারবে না। কারণ আমি জানি, আমার মেজর ওয়াসিফ সবসময় আমাদের আগলে রাখবে।”

পাহাড়ি বিকেলের শান্ত আলোয়, ভালোবাসার এক বুক উষ্ণতা নিয়ে, মেজর শাহেদ ওয়াসিফ আর তার মুমতাহিনার জীবনের এক নতুন, সুন্দর এবং নিরাপদ অধ্যায়ের সূচনা হলো। যেখানে আর কোনো ভয় নেই, কোনো ষড়যন্ত্র নেই—আছে শুধু অন্তহীন ভালোবাসা আর বিশ্বাসের এক অভেদ্য দুর্গ।
রাত তখন বেশ হলো। আচমকা ঘুম ভাঙতেই পাশ ঘুরে দেখে বাবা-মেয়ে গভীর ঘুমে। তাদের কোনো নড়চড় নেই। ধারা করলো কি? মেয়ে কে মাঝ থেকে আলতোভাবে উঠিয়ে ওর জায়গায় শুইয়ে দিয়ে ও চলে গেলো মেয়ের জায়গায়। একহাত আড়াআড়ি ভাবে ওয়াসিফের বুকের উপর রেখে মাথাও রাখলো বুকে। ওয়াসিফ একটু নড়েচড়ে আবার ঠিক হয়ে শুলো। ধারা মাথা তুলে ঘুমন্ত, শান্ত মুখটা দেখে সামান্য হেঁসে কানের কাছে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে।

‘ আমার ভালোবাসা ফিরিয়ে দিয়ে পরে আবার বিয়ে করেছিলেন কেনো আমাকে’?
ওমনি এক ঝটকায় ওয়াসিফ ওকে ঘুরিয়ে নিয়ে ডানপাশে নেয়। ধারা এই কর্মে হতভম্ব, ভেবেছিলো লোকটা গভীর ঘুমে। ওয়াসিফের চোখ বন্ধ, ধারার মতো করে ফিসফিস করে বলে ‘ এর নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই মুমতাহিনা ধারা, তুমি ভালোবেসোছো প্রথম, আমি ভালোবেসেছি তারপর। অতঃপর , আমাদের বিবাহিত জীবনের তৃতীয় বছর চলছে, আমাদের একটা বাচ্চা ও আছে, ঘুমাওওও’
ধারা চেয়ে থাকে ঐ মুখটার দিকে, এই নিয়ে কত শত বার এই প্রশ্নটা করে এলো, জবাব ঐ একটাই। ধারা এবার দু’হাতে ঐ মুখটা চেপে ধরে বলে।
‘ ভালোবাসেন’?
ওয়াসিফ চোখ মেলে তাকায় এবার। ওয়াসিফ নিশ্চিত, এই মেয়ের মাথায় আজ রাতে ভূত চেপেছে। ঘুমাবে না কিছুতেই। ওয়াসিফ মেয়ের দিকে ইশারা করে বলে।

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৪৫

‘ ভালো না বাসলে ঐ চাঁদ কি আমার ঘরে দ্যূতি ছড়াতো’?
এমন উত্তরে ধারার পোষায় না, দাঁত কিড়মিড় করে, বলে।
‘ এই ওয়াসিকার পাপা! ভুংভাং মোটেও করবেন না আমার সাথে। যা জিজ্ঞেস করেছি তার উত্তর দিন’
ওয়াসিফ হাসতে হাসতে বৌকে ঝাপটে ধরে বলতে থাকে। ‘ হয়, হয়, বহুত ভালোবাসি আমি আপনারে। আপনার যদি আরো ভালোবাসার প্রমাণ লাগে তবে চলুন ম্যাডাম, আরেকটা চাঁদ আনি আমাদের ঘরে। দুই দুটো চাদের আলোয়া জ্জ্বলমল করুক আমাদের সংসার’

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here