প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২৬
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না
_”রিত্তিকা, স্ট্যান্ড আপ!”
জিয়ানের গম্ভীর কণ্ঠস্বরে রিত্তিকা ঘুম ঘুম চোখে ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়াল।
জিয়ান কিছুটা কঠোর গলায় জিজ্ঞেস করল,
_”আপনি কি এখানে ক্লাস করতে এসেছেন, নাকি ঘুমাতে এসেছেন? আনসার মি!”
_”ক্লাস করতে এসেছি,” রিত্তিকা নিচু স্বরে জবাব দিল।
_”তাহলে ঘুমাচ্ছেন কেন?”
জিয়ানের এই প্রশ্নে রিত্তিকার মনে মনে খুব রাগ হলো। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
_”যার জন্য করি চুরি, সেই বলে চোর! আপনার সেবা
করতে গিয়েই তো সারারাত জাগলাম, আর এখন ক্লাসে বসে ঘুমাচ্ছি। অথচ আপনিই আবার আমাকে কথা শোনাচ্ছেন! বাহ, খুব ভালো!”
জিয়ান তার বিড়বিড়ানি খেয়াল করে বলল,
_ “কী হলো? যা বলার জোরে বলুন, বিড়বিড় না করে।”
রিত্তিকা তৎক্ষণাৎ নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
_ “নাহ্, কিছু বলিনি আমি।”
_”এখন আমার কী করা উচিত বলুন? আপনাকে কি কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা উচিত, নাকি ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া উচিত?” জিয়ান এমনভাবে কথাগুলো বলছিল, যেন সে রিত্তিকাকে ভড়কে দিয়ে বেশ আনন্দ পাচ্ছে।
কান ধরে দাঁড়ানোর কথা শুনে রিত্তিকার রাগ আরও বেড়ে গেল। সে মনে মনে ভাবল,
_‘ফের কান ধরে দাঁড়াবো!’
জিয়ান ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
_ “আপনার জন্য তো আর পুরো ক্লাসটা নষ্ট করতে পারি না, তাই না? সিট ডাউন! নেক্সট টাইম যেন এভাবে ঢুলতে না দেখি। তাহলে সোজা ক্লাস থেকে বের করে দেবো।” বলেই জিয়ান আর কথা না বাড়িয়ে বোর্ডের দিকে ফিরে আবার লিখতে শুরু করল।
রিত্তিকা বসার সময় মনে মনে গজ গজ করতে লাগল,
_‘আপনাকেও আমি দেখে নেবো, প্রফেসর জিয়ান কায়সার! এসেছেন আমাকে কান ধরে দাঁড় করাতে! হুহ্!’
ক্লাস শেষ হতেই জিয়ান চলে যাওয়ার পর, রিত্তিকা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
_”দেখেছিস তোর ভাই কত বড় খচ্চর! নিজের বউকে সবার সামনে কীভাবে অপমান করল!”
জিয়া একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
_”আচ্ছা বাবা থাম, ভাইয়ের হয়ে আমিই না হয় সরি বলছি।”
_”তোর সরি দিয়ে আমি কি ঘাস খাবো?” বলেই রিত্তিকা আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে গটগট করে ক্লাস থেকে বের হয়ে গেল।
পেছন থেকে জিয়া ডাকল,
_ “আরে দাঁড়া রিত্তি, আমার জন্য একটু…”
”_পা থাকলে আয়, না হলে ঘুম পাড়!” রিত্তিকার রাগ তখন সপ্তমে।
_”বাকি ক্লাসগুলো করবি না?” জিয়া দূর থেকেই চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল।
_”নাহ্, ভালো লাগছে না, বাড়ি যাবো। আর বাকিগুলো খুব একটা জরুরি ক্লাসও না।”
জিয়া আর উপায় না দেখে বলল,
_ “আচ্ছা চল তাহলে।”
বাড়িতে ফিরে রিত্তিকা ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে রইল। কারোর সাথে একটা কথাও বলল না, বিকের হয়ে গেলো তবুও ঘর থেকে এক পা-ও বের হলো না।
বিকেলের দিকে জিয়ান যখন ঘরে ঢুকল,
_রিত্তিকা তার দিকে রাগ সামলাতে না পেরে একটা বালিশ ছুড়ে মারল।
জিয়ান চমকে গিয়ে বলল,
_”এই স্টুপিড মহিলা! বালিশ ছুড়ছ কেন?”
_”বেশ করেছি! আবার ছুড়বো!” বলেই রিত্তিকা বিছানা থেকে আরেকটা বালিশ জিয়ানের দিকে ছুড়ে মারল।
_”হোয়াট ননসেন্স! আরেকবার যদি কিছু ছুড়েছ, তাহলে আমি তোমাকেই ছুড়ে ফেলে দেবো।” জিয়ান চোখ রাঙাল।
রিত্তিকাও কম যায় না। সে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলল,
_”হুহ্! এসেছে আমাকে ছুড়ে মারতে!”
_”দেখবে আমি পারি কি না?”
_”হুম, দেখব।”
জিয়ান আর কথা না বাড়িয়ে ধীরপায়ে তার দিকে এগিয়ে এল। রিত্তিকাও জেদ ধরে একচুল পিছাল না। কিন্তু হঠাৎ করেই জিয়ান কোনো কিছু না বলে রিত্তিকাকে পাঁজাকোলে করে তুলে নিল। আচমকা এই কাণ্ডে রিত্তিকা সামাল দিতে না পেরে জিয়ানের কাঁধ জড়িয়ে ধরল।
_”অসভ্য পুরুষ! কোলে তুললেন কেন আপনি? নামান আমাকে!” রিত্তিকা ছটফট করতে লাগল।
_”হ্যাঁ, নিশ্চয়ই নামাবো তোমাকে। জাস্ট ওয়েট,” জিয়ান একগাল হেসে রিত্তিকাকে নিয়ে সোজা বারান্দার দিকে হেঁটে গেল।
বারান্দার কাছে গিয়ে রিত্তিকা বলল,
_”এখানে নিয়ে এলেন কেন আমাকে? নামান বলছি!”
_”ওই যে তখন তুমি বললে, আমি কী করতে পারি সেটা তুমি দেখতে চাও।”
_”তো বারান্দায় নিয়ে এলেন কেন?” রিত্তিকার কণ্ঠ এবার কিছুটা নরম।
জিয়ান রিত্তিকার চোখের দিকে তাকিয়ে একটু দুষ্টুমির সুরে বলল,
_”তর সইছে না বুঝি তোমার? আমার তো কেমন যেন প্রেম প্রেম পাচ্ছে, তাই নিয়ে এলাম তোমায়।”
রিত্তিকা লজ্জায় ও রাগে লাল হয়ে বলল,
_”এই নির্লজ্জ, বেয়াদব প্রফেসর! ইয়ার্কি মারছেন আমার সাথে? নামান বলছি!”
_”আহ্, তুমি আমার একমাত্র বউ, তোমার সাথে ইয়ার্কি মারতেই পারি। তবে তুমি যা দেখতে চেয়েছিলে, সেটাই দেখাচ্ছি। বেশি কিছু না, জাস্ট এখান থেকে ফেলে দেবো।”
_”ফে… ফেলে দেবেন মানে?” রিত্তিকার চোখ দুটো ভয়ে বড় বড় হয়ে গেল।
_”হুম, টুক করে ফেলে দিই। বেশি ব্যথা পাবে না, জাস্ট কোমরটা ভেঙে যাবে আর কিছু না। অবশ্য পা-টাও ভাঙতে পারে,” জিয়ান গম্ভীর মুখে রসিকতা করল।
রিত্তিকা এবার জিয়ানের শার্ট শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বলল,
_”নাহ্, আমি কিছু দেখব না, নামান আমাকে!”
_”না না, তুমি দেখতে চেয়েছ না? না দেখিয়ে পারি আমি?” জিয়ান বারান্দার ওপর একটু ঝুঁকে পড়ার ভান করল।
_”নাহ্, দেখব না! আমি কি ইচ্ছে করে আপনাকে বালিশ ছুড়ে মেরেছি? না তো! আপনি তখন ক্লাসে আমাকে কান ধরে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন, তাই…” রিত্তিকা প্রায় কেঁদে ফেলার মতো করে বলল।
_”তো তুমি ক্লাসে ঘুমাবে, আর আমি কিছু বলব না?”
_”আমি কি ইচ্ছা করে ঘুমাচ্ছিলাম? আপনার জন্যই তো!”
জিয়ান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
_”আমার জন্য?”
_”তো কী! রাতে জ্বরে পড়েছিলেন, আমিই তো সারারাত আপনার সেবা করলাম। তাই তো ঘুমাতে পারিনি। নামান না আমাকে এবার…” রিত্তিকা মুখটা মলিন করে বলল।
কথাটা শুনে জিয়ানের ভেতরের কঠোরতা এক মুহূর্তে গলে জল হয়ে গেল। সে আর কিছু না বলে রিত্তিকাকে কোল থেকে নামিয়ে আলতো করে পড়ার টেবিলে বসিয়ে দিল।
কিছুটা স্বাভাবিক গলায় জিয়ান জিজ্ঞেস করল, _”ভার্সিটি থেকে এসে কিছু খেয়েছ?”
_”নাহ্,” রিত্তিকা মাথা নিচু করে বলল।
_”পড়তে বসো, আমি আসছি।”
রিত্তিকা কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
_”কোথায় যাচ্ছেন?”
_”কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই আমি,” বলেই জিয়ান দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
রিত্তিকা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বই খুলে পড়তে বসল। কিছুক্ষণ পরই জিয়ান এক প্লেট খাবার হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকল এবং রিত্তিকার ঠিক সামনে এসে বসল।
ভাতের লোকমা নিযে জিয়ান বলল,
_ “হা করো।”
কথাটা শুনে রিত্তিকা চরম অবাক হয়ে জিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল।
জিয়ান আবার বলল,
_ “কথা কানে যায় না? বলছি না হা করতে!”
_”আমি নিজে খেতে পারব,” রিত্তিকা আমতা আমতা করে বলল।
_”জানতে চেয়েছি আমি? যা বলছি তাই করো।”
রিত্তিকা আর কোনো দ্বিমত করল না। চুপচাপ হা করতেই জিয়ান পরম যত্নে তার মুখে ভাতের এক লোকমা তুলে দিল।
চিবোতে চিবোতে রিত্তিকা নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
_”আপনি খেয়েছেন?”
_”নাহ্।”
_”তো আপনি খাবেন না?”
”নাহ্, খিদে নেই।”
এরপর জিয়ান একে একে পুরো প্লেটের খাবার নিজ হাতে রিত্তিকাকে খাইয়ে দিল। পুরোটা সময় রিত্তিকা একটা শব্দও করেনি। তার কাছে পুরো ব্যাপারটা কেমন যেন স্বপ্নের মতো লাগছিল। তাকে এত ভালোবাসায় খাইয়ে দিচ্ছে—এটা সে কিছুতেই বিশ্বাস করে উঠতে পারছিল না।
খাওয়ানো শেষ করে জিয়ান রিত্তিকার ঠোঁটের কোণটা আলতো করে মুছিয়ে দিল। তারপর প্লেটটা হাতে নিয়ে নরম গলায় বলল,
_”পড়তে বসো, আমি প্লেটটা রেখে আসছি।”
জিয়ান ঘর থেকে চলে যাওয়ার পরও রিত্তিকা বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার গাল দুটো লজ্জায় আর ভালোলাগায় লাল হয়ে উঠেছে। বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অচেনা দোলা দিয়ে গেল। যে মানুষটা একটু আগে ক্লাসে সবার সামনে অমন গম্ভীর গলায় বকা দিচ্ছিল, সে-ই আবার আড়ালে এতটা যত্ন নিতে পারে!
টেবিলে বই খোলা, কিন্তু রিত্তিকার মন কিছুতেই পড়ায় বসছিল না। বইয়ের প্রতিটা পাতায় কেবল জিয়ানের ওই গম্ভীর অথচ মায়াবী মুখটাই ভেসে উঠছিল।
খানিক বাদে জিয়ান আবার ঘরে ঢুকল। রিত্তিকার ঠিক পাশে এসে দাঁড়াল।
_”কী হলো? বইয়ের দিকে তাকিয়ে তো আছ, কিন্তু পৃষ্ঠা তো একটাও ওল্টাওনি?”
রিত্তিকা থতমত খেয়ে বলল,
প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২৫
_ “না… মানে, এই তো পড়ছি।”
জিয়ান একটা চেয়ার টেনে রিত্তিকার মুখোমুখি বসল। রিত্তিকার হাত থেকে বইটা আলতো করে নিজের হাতে নিয়ে বলল,
_ কোন চ্যাপ্টারটা কঠিন লাগছিল বলো, আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি।”
তার এমন রূপ দেখে রিত্তিকার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে মনে মনে ভাবল,
_ ‘খচ্চর হলেও, মানুষটা কিন্তু সত্যিই ভীষণ কেয়ারিং!’
