Home শুকনো পাতার নূপুর পায়ে শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১০

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১০

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১০
আয়েশা শেখ

নিয়মের অন্যথা হলো না আজকেও, ঝিলমিলের ক্লাসের সামনে পৌঁছাতে দেরি হয়ে গেল। তবে অন্য দিনগুলোর চেয়ে আজকের খামখেয়ালিপনাটা একটু বেশিই চড়া। লেকচার শেষ হতে আর মোটে পনেরো মিনিট বাকি। ক্লাসের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল, অবয়বে অন্য এক শান্ত রূপ নিয়ে। দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরেছে পিঠের ব্যাগের বেল্ট দুটো। চঞ্চল মেয়েটার সারা শরীরে আজ কেমন যেন এক অদ্ভুত অসাড়তা, নিথর পাথরের মতো স্থির। বারিশ একবার আড়চোখে দরজার দিকে তাকাল, কিচ্ছুটি বলল না।
​বেশ খানিকটা সময় এভাবেই কেটে যাওয়ার পর, ঝিলমিলের ওষ্ঠাধর সামান্য কেঁপে উঠল। অতি মৃদু কণ্ঠে সে শুধাল,

_ “স্যার, আসব?”
​বারিশ মেয়েটার দিকে না তাকিয়েই রাশভারী গলায় জবাব দিল,
_ “আজ পুরো পয়তাল্লিশ মিনিট নষ্ট করেছ। নিয়মানুযায়ী এতবার কান ধরো, তারপর ভেতরে আসার অনুমতি মিলবে।”
_​“আর যদি ওসব না করি?” মেঝের ধূসর রঙের দিকে চোখ জোড়া নিবদ্ধ রেখেই প্রশ্নটা ছুড়ে দিল ঝিলমিল। কণ্ঠস্বর আজ বড্ড অচেনা শোনাল।
​নিজের কাঠিন্য বজায় রেখে বলল বারিশ,
_“তাহলে চলে যেতে পারো।”
​ঝিলমিল সামান্য থামল। তারপর ওভাবেই আলতো করে বলল,
_“আচ্ছা।”
মেঝের দিক থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই একদম যান্ত্রিক পায়ে উল্টো পথে তার হাঁটা শুরু। ক্লাসের ভেতরে বসা ইরানসহ ওর বাকি বন্ধুরা এই দৃশ্য দেখে স্তব্ধ। তবে সবার চেয়ে বেশি ধা’ক্কা খেল বোধহয় ক্লাসের স্যার অর্থাৎ বারিশ নিজে। চঞ্চল মেয়েটার এমন অদ্ভুত আত্মসমর্পণ তার কল্পনাতীত। সে এত অবাক হতো যে, বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠতে না পেরে দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে সপ্তদশীর চলে যাওয়া দেখতে লাগল।
​ভেতরের অস্বস্তিটা যুবককে বেশি সময় স্থির থাকতে দিল না। উপস্থিত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে “এক্সকিউজ মি” শব্দ ছুড়ে দিয়ে সে ক্লাস থেকে বের হয়ে পড়ে। ​করিডোর ধরে দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেল বারিশ। ঝিলমিলের কাছাকাছি পৌঁছেই ওর ডান হাতটা শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে তার পথ আগলে দাঁড়াল। অধৈর্য কণ্ঠে শুধাল,

_“কোথায় যাচ্ছ তুমি?”
​ঝিলমিল ঝটকা মেরে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে অবাধ্যের মতো বলল,
_“হাত ধরবেন না।”
​এমন প্রত্যাখ্যানে বারিশ কিছুটা অপ্রস্তুত ও অস্বস্তিতে পড়ে। গলার স্বর কিছুটা নরম করে জিজ্ঞেস করল,
_“কী হয়েছে? কোনো সমস্যা?”
​ঝিলমিল এখনো নীরব; চোখের মণি দুটো পাথরের মতো মেঝেতেই আটকে আছে।
_​“আমি কিছু জিজ্ঞেস করেছি তোমাকে!” যুবকের কণ্ঠে এবার কিছুটা কর্তৃত্বের সুর।
​এবার দীর্ঘক্ষণ পর মুখ তুলল কিশরী। সরাসরি তাকাল যুবকের চোখের দিকে। নিস্প্রাণ গলায় বলল,
_“কোনো সমস্যা হয়নি।”
​মেয়েটা স্পষ্ট মিথ্যা বলছে। ওর ফ্যাকাশে ঠোঁট আর মলিন মুখচ্ছবি অন্য কিছুর আভাস দিচ্ছে। এই মেয়েটি অন্তত সেই প্রাণবন্ত, ছটফটে কিশরী নয়–যাকে গত দেড় মাসের বেশি সময় ধরে বারিশ প্রতিদিন দেখে আসছে। একটু থমকে যুবক হুকুমের সুরে বলল,
_“ক্লাসে চলো।”

_“আপনিই তো বললেন চলে আসতে।”
​বারিশ এবার আর ওর কোনো যুক্তির তোয়াক্কা না করে, পুনরায় মেয়েটার হাত শক্ত করে ধরে একপ্রকার টেনেই নিয়ে এলো ক্লাসরুমের ভেতর। গম্ভীর গলায় নির্দেশ দিল,
_“নিজের আসনে গিয়ে বসো।”
​ঝিলমিল আর কোনো প্রতিবাদের পথ বেছে নিল না। বাধ্য মেয়ের মতো ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে বসে পড়ল ইরানের পাশের খালি জায়গাটাতে। সঙ্গে সঙ্গেই ইরান তাকে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করে,
_“কী হয়েছে তোর?”
ঝিলমিলের তরফ থেকে কোনো জবাব এলো না। সামনের টেবিলের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে নিথর হয়ে বসে রইল সে।

_“আন্টি বকেছে?” ফের প্রশ্ন করল ইরান। বন্ধুর নীরবতা তাকে ভাবিয়ে তুলছে।
_“কী হয়েছে বলবি তো!” এবার ওর গলার স্বরে কিছুটা তাগাদা।
ইরানের শেষ কথাটি শুনতেই ঝিলমিলের ঠোঁট দুটো আচমকা কাঁপতে শুরু করল। টলমলিয়ে উঠল চোখের কোণ। ভেতরের জমে থাকা কষ্টটা আর চেপে রাখা গেল না। কোনো কথা বলার আগেই দু’হাতে নিজের মুখটা শক্ত করে চেপে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল সে। বান্ধবীর এমন আকস্মিক কান্নায় ইরান নির্বাক! সে আশপাশে তাকিয়ে গলার আওয়াজ যতটা সম্ভব নিচু রেখে ঝিলমিলের কাঁধ ধরে আলতো ঝাঁকুনি দিয়ে বলতে লাগল,
_“কী হয়েছে তোর! বলবি তো। এই ঝিল!”

কান্নার বেগ বাড়ার সাথে সাথে ঝিলমিলের রীতিমতো হেঁচকি উঠতে শুরু করেছে। ক্লাসের সবার নজর এড়াতে সে এবার বেঞ্চের ওপর রাখা ব্যাগের ভেতর মাথাটা গুঁজল, তারপর ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। লেকচারের শেষ দশটি মিনিট এভাবেই কেটে গেল। আর এই শেষ দশ মিনিট বারিশ কী লেকচার দিলো নিজেও বুঝলো না। সমস্ত মনোযোগ যেন ওই একটা কোনায় গিয়ে আটকে গেছে। এই সামান্য সময়ের মধ্যে অবচেতন মনেই তার নজর না হলেও অন্তত একশবার ওই কোনার বেঞ্চটার দিকে চলে গিয়েছে! ​ডেস্কে রাখা সাদা খাতাটার ওপর চোখ পড়লে দেখা যাবে, সেখানে কলম দিয়ে কাটাকুটি করে গুনে গুনে কিছু সংখ্যা লেখা রয়েছে। সংখ্যাগুলো আর কিছুই নয়, ওই কোণার বেঞ্চে মাথা নিচু করে কাঁদতে থাকা মেয়েটা কতবার নিজের চোখের জল মুছল, অবলীলায় তারই এক নিখুঁত হিসাব!
​চঞ্চল মেয়েটার এই আচমকা কান্নার পেছনের কারণ কিছুতেই তার মাথায় এলো না যুবকের। পিরিয়ড শেষের ঘণ্টা বাজতেই বারিশ খাতার সেই পাতাটা ছিঁড়ে ভাঁজ করে পকেটে পুরে নিয়ে, ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেল। কিন্তু কেন এই অস্থিরতা, কেনই বা ওই কান্নার হিসাব রাখা–তার কোনো উত্তর অন্তত এই মুহূর্তে তার নিজের জানা নেই।
ঘণ্টা বাজতেই ইরান আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। ঝিলমিলকে সামলে নিয়ে তড়িঘড়ি করে ওয়াশরুমের দিকে গেল। ততক্ষণে কেঁদে কেঁদে চোখ-মুখ লাল হয়ে ফুলে উঠেছে মেয়েটার।
চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে ইরান অস্থির গলায় শুধাল,

_“ঝিলমিল! এবার তো বল আমাকে, কী হয়েছে? কে বকেছে তোকে?”
_“কেউ বকেনি,” কান্নারাত ভেজা গলায় করুণ সুর শোনাল।
_“তাহলে কাঁদছিস কেন?”
_“চিটার! জারিফ একটা চিটার!” এবার আর কান্না চেপে রাখতে পারল না সে।
_“কী করেছে সে?” ইরানের চোখ দুটো বিস্ময়ে কপালে উঠল।
_“ওর ক্লাসমেট, মুন্নি আপু… আমি আজ যখন কলেজে আসছিলাম, তখন নিজের চোখে দেখলাম ওরা দুজনে কিস করছে। ও আমাকে ঠকালো! অথচ সব সময় বলত ওটা নাকি ওর জাস্ট ফ্রেন্ড।”
বান্ধবীর এই কথা শুনে ইরান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
_“জারিফকে তো আমার প্রথম থেকেই সুবিধার মনে হয়নি। তুই যে কী মনে করে ওর সাথে এসবে জড়াতে গেলি!”

_“তুই জানিস না ইরান,” চোখের জল মুছতে মুছতে ভাঙা গলায় ঝিলমিল বলল,
_“ও নিজের বাসা থেকে টাকা চুরি করে ফুল কিনে আমাকে প্রপোজ করেছিল। সেদিন ওর ওই পাগলামি দেখে আমার ভীষণ মায়া লেগেছিল।”
_“খেলি তো এবার বাঁশ? এখন কী করবি শুনি?” বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনার সুরে জিজ্ঞেস করল ইরান।
_“জানি না,” শূন্য চোখে দেয়ালে তাকিয়ে ধরা গলায় উত্তর দিল সে।
সবগুলো পিরিয়ড শেষ করে যখন ক্লাসরুম থেকে বের হলো, ঝিলমিলের মাথাটা তখনো ঝিমঝিম করছে। করিডোর পেরিয়ে মাঠে রাখতেই সামনে এসে দাঁড়াল জারিফ। ওকে দেখামাত্রই ঝিলমিলের ভেতরের কষ্ট নিমেষে ক্ষোভে রূপ নিল। কোনো কিছু ভাবার বা বলার সুযোগ না দিয়েই সে সরাসরি জারিফের গালে সশব্দে একটা চড় কষিয়ে দিল। ​রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে বলল,

_“জিরাফের বাচ্চা! এই ছিল তোর মনে?”
খোলা মাঠে সবার সামনে এমন চড় খেয়ে অপমানে জারিফের পুরো শরীর রি রি করে উঠল, কান-মাথা গরম হয়ে গেল তার। সে দাঁতে দাঁত চেপে চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে বলল,
_ “ঝিলমিল! সিন ক্রিয়েট করিস না। বাসায় চল, তোকে সব বুঝিয়ে বলছি।”
_​“চুপ কর বেয়াদব! তোর মতো একটা লু’চ্চা, জা’নোয়ারকে বিশ্বাস করাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল!” ঝিলমিল আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারল না, সে দ্বিতীয় চড়টা মারার জন্য হাত তুলল।
​কিন্তু এবার আর সুযোগ দিল না জারিফ। সে ঝিলমিলের হাতটা মাঝপথেই শক্ত করে ধরে ফেলল। এতক্ষণের অপরাধবোধ ঝেড়ে ফেলে সেও এবার তার নোংরা রূপটা বের করে আনল। ঝিলমিলের হাতটা মোচড় দিয়ে ধরে ঝাঁঝালো গলায় বলল,

_ “যা করেছি বেশ করেছি! তোর মতো একটা সাধারণ মেয়ের সাথে যে আমি এতদিন রিলেশন রেখেছি, এটাই তোর ভাগ্য। আন-স্মার্ট কোথাকার! সবসময় ওই ব্যাকডেটেড চিন্তাভাবনা নিয়ে ঘুরিস। একটা হাত ধরলেও তোর দশ রকমের ছুঁই-ছুঁই ভাব শুরু হয়ে যায়! রোমান্স তো দূরের কথা। তাই যা দেখেছিস একদম ঠিকই দেখেছিস, মুন্নি আমার স্ট্যান্ডার্ডের সাথে যায়।”
​ঝিলমিল স্তব্ধ । কত কৌশলে সে ঝিলমিলকে এই ফাদে ফেলেছিল সব কিছু চোখের সামনে ভেসে উঠলো। গত পাঁচমাস ধরে ঝিলমিল আর জারিফের মধ্যে এই সম্পর্ক, তার মুখ থেকে এমন বিষাক্ত কথাগুলো শুনে সে তাকিয়ে রইল অবিশ্বাস্য চোখে। ​চোখের জল উপেক্ষা করে সে তীব্র ঘৃণায় বলল,
_“তাই বলে এভাবে ঠকালি আমায়! এত নাটক করার কী দরকার ছিল, শুরুতেই বলে দিতিস তোর চেহারার আড়ালে এতটা নোংরা একটা মানুষ লুকিয়ে আছে!”
জারিফ ঝিলমিলের চোখের দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দেয়। ওর হাতটা আরও একটু জোরে ঝাঁকিয়ে বলে,

_ “তুই তো মাত্র একটা জিনিস দেখলি ঝিলমিল। আমি তোর ধারণার চেয়েও নোংরা!”
​ওর মুখের ওপর এমন নির্লজ্জ স্বীকারোক্তি শুনে পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল ঝিলমিলের। পরক্ষণেই অপমানে আর ঘৃণায়
গুলিয়ে উঠলো তার পুরো শরীর। চোখের জল মুছে সে চিৎকার করে বলে উঠল,
_“তাহলে আমার সাথে কেন এতদিন ধরে এই ভালোবাসার নাটক করলি? আর এখন আমাকে ক্ষেত বলছিস? শুরুতে তো নিজেই আমার পিছু কু’ত্তার মতো ঘুরঘুর করেছিস! আমি গিয়েছিলাম তোর কাছে?”

কিশরীর এই পাল্টা জবাবে জারিফ আরও একধাপ এগিয়ে চরম নোংরামি প্রকাশ করে বলল,
_“ভেবেছিলাম তুই আমার পাশের বাসার মেয়ে। যখন মন চাইবে, একটু আধটু সুযোগ বুঝে তোকে ভোগ করতে পারব। কিন্তু তুই কি তা একবারও হতে দিয়েছিস? সবসময় তোর ওই সতীপনা!”
​নিজের চরিত্রের ওপর এমন জঘন্য আঘাত আসতেই ঝিলমিলের মাথার ভেতর যেন আগুন জ্বলে উঠল। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সে এক ঝটকায় নিজের হাত মুক্ত করে হিংস্র বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল জারিফের ওপর। ​দুটো হাত বাড়িয়ে সে শক্ত মুঠোয় খামচে ধরল জারিফের মাথার চুল। তারপর সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁকুনি দিতে দিতে চেঁচিয়ে উঠল হিংস্র গলায়,
_“জিরাফের বাচ্চা! আমার শরীর পাওয়ার জন্য তুই এত বড় জাল বিছিয়েছিলি? তোকে তো আমি আজ জ্যা’ন্ত কবর দেব!”

মাঠের তুলকালাম কাণ্ড দেখে মুহূর্তের মধ্যে সেখানে হুলস্থুল পড়ে গেল। ইরান আর ঝিলমিলের বাকি বন্ধুরা তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে ওকে টেনেহিঁচড়ে পেছনের দিকে সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। ওদিকে জারিফের বন্ধুরাও ছুটে এসে ঝিলমিলের শক্ত মুঠো থেকে ওকে ছাড়ানোর জন্য টানাটানি শুরু করল। কিন্তু ঝিলমিলের মাথায় তখন তীব্র জেদ চেপে বসেছে। সবার এত টানাটানির মাঝেও সে জারিফের মাথা থেকে গোছাখানেক চুল নিয়ে তবেই ছাড়ল।
​মাথার যন্ত্রণায় আর এত মানুষের সামনে অপমানে জারিফ এবার রাগে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। পুরো মুখাবয়ব রাগে লাল করে সে এক ঝাড়া মেরে বন্ধুদের হাত ছাড়িয়ে নেয়। ডান হাতটা বাতাসে উঁচিয়ে ঝিলমিলকে একটা জোরলো থাপ্পড় মারার জন্য হিংস্র ভঙ্গিতে তেড়ে আসতে গেল সে। ​তক্ষুনি কোথা থেকে পাথরের মতো কঠিন হাত এসে মাঝপথেই খপ করে চেপে ধরল জারিফের কবজিটা। ঠিক যেন বাতাসের গতিতে এসে কেউ জারিফের সেই হাতটাকে শূন্যে থামিয়ে দিয়েছে।
নিজের হাত অবশ হয়ে যেতে দেখে হতচকিত চোখে পাশে তাকাল জারিফ। চোখের মণি দুটো ভয়ে আর আশ্চর্যে স্থির হয়ে গেল তার। তোতলামো গলায় সে শুধাল,

_“চাচ্চু! তুমি এখানে?”
​বারিশের পুরো অবয়বে তখন এক থমথমে গম্ভীরতা। চোখের চশমাটার আড়ালে থাকা দৃষ্টি জোড়া যেন বরফের মতো শীতল। জারিফের কব্জিতে আঙুলের চাপ বাড়িয়ে দিয়ে সে হিমশীতল স্বরে বলল,
_“এখানে কী হচ্ছে?”
চাচাকে হুট করে কলেজের মাঠে এভাবে দেখে জারিফ পুরোপুরি ভড়কে গেল। নিজের নোংরামি প্রকাশ পেয়ে যাওয়ার ভয়ে সে আমতা আমতা করে নিচু স্বরে বলল,
_“চাচ্চু, তুমি… তুমি চলে যাও এখান থেকে। এটা আমাদের পার্সোনাল ম্যাটার।”

পেছন থেকে চুলোচুলির ধকল সামলে ঝিলমিল তখনও হাঁপাচ্ছিল। জারিফের মুখে এই কথা শুনে সে চিৎকার করে বলে উঠল,
_ “কেন যাবে? আমি তোর চাচাকে তোর সব কীর্তি বলে দেব! ফুপা, ও আসলে…”
​হঠাৎ বজ্রকঠিন ধমকে মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল পুরো মাঠ।
_“স্টপ ইট! একদম চুপ করো তুমি।”
বারিশের কণ্ঠের কঠোর গর্জন এত তীব্র ছিল যে ঝিলমিলের পুরো অস্তিত্ব নিমেষে কেঁপে উঠল! বাকি কথাগুলো গলার মাঝপথেই আটকে গেল।
জারিফের হাতটা ছেড়ে দিয়ে হুকুমের সুরে বলল বারিশ,
_ “ লিভ দিস প্লেস রাইট নাও!”
​চাচাকে আর দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন করার সাহস জারিফের ছিল না। সে আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে বন্ধুদের দলবল নিয়ে চলে গেল দ্রুত।

জারিফ চলে যেতেই বারিশ এবার ঝিলমিলের দিকে নিজের সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেরাল। কোনো কৈফিয়ত বা সান্ত্বনার ধার না ধেরে বরফকঠিন গলায় নির্দেশ দিলেন,
_“আর তুমি, সোজা বাড়ি ফিরে যাও।”
ধমক খেয়ে ঝিলমিল ক্ষোভে আর অভিমানে মাথাটা নিচু করে মাঠের এক কোণে রাখা নিজের সাইকেলটার কাছে চলে যায়। বান্ধবী ইরানকে একটা শুকনো বিদায় জানিয়ে সাইকেলটা নিয়ে গেইটের দিকে এগোতে লাগে সে।

এদিকে বারিশও সোজা পার্কিং জোনের দিকে হেঁটে যায়। গাড়িতে বসার পর থেকেই তার মাথাটা কেন যেন প্রচণ্ড ভনভন করছে। রগ দুটো ছিঁড়ে যাওয়ার মতো ব্যথা। ভেতরে কেমন এক রাগ আর অস্থিরতা কাজ করছে। স্টিয়ারিং হুইলে হাত রেখে কিছু একটা গভীর ভাবনায় ডুবে থাকা অবস্থাতেই সে অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দেয়। গাড়িটা মেইন গেইটের কাছাকাছি তবু তার মনোযোগ রাস্তায় নেই। আর ঠিক সেই অসাবধান মুহূর্তেই হুট করে সামনে চলে আসা ঝিলমিলের সাইকেলের পেছনে সজোরে ধাক্কা লাগিয়ে দিল গাড়িটা। ‘ঠাস’ করে একটা শব্দ হলো। ভারসাম্য হারিয়ে ঝিলমিল শক্ত পিচঢালা রাস্তার ওপর আছাড় খেয়ে পড়ল।
কড়া ব্রেকে গাড়ি থামাল বারিশ। সামনের দিকে তাকিয়ে স্টিয়ারিংয়ে একটা ঘুষি মেরে বিড়বিড় করে চরম বিরক্তিতে বলে উঠল,

_“ফা’কিং হেল!”
ঝিলমিল রাস্তার ওপর ওভাবেই নিথর হয়ে বসে রইল। ওঠার কোনো চেষ্টাই করল না। পৃথিবীর সব অঘটন, সব অপমান বুঝি শুধু তার জন্যই বরাদ্দ! আজ পুরো দিনটা যে এভাবে তাকে দুমড়ে-মুচড়ে দেবে, সে ভাবতেও পারেনি। সে ওভাবেই কতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। ওদিকে সাইকেলটা ছিটকে আরেক পাশে পড়ে গেছে। চেইনটা ছিঁড়ে প্যাডেলের সাথে এমনভাবে আটকে গেছে যে ওটা দিয়ে আর এক কদমও এগোনো সম্ভব নয়।
বারিশ দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে ঝিলমিলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে ওর এই নিস্প্রাণ ভাব দেখে বলে,
_“কী হলো? তুমি কি এভাবেই রাস্তার মাঝখানে বসে থাকবে?”
ঝিলমিল মুখ তুলল না। ওভাবেই বসে থেকে তপ্ত গলায় পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল,
_“থাকলে আপনার কোনো সমস্যা?”
_“ওঠো!” বারিশের কণ্ঠে আদেশ আর বিরক্তির মিশ্রণ।

ঝিলমিল এবার জোর করেই নিজেকে টেনে তুলল। কলেজ ড্রেসের ধুলোবালি না ঝেড়েই সাইকেলটা টেনে সোজা করার চেষ্টা করে। কিন্তু চেইন আর চাকার দশা দেখে বুঝল, ওটা পুরোপুরি অচল। ভেতরের জমে থাকা সমস্ত রাগ এবার ওই জড় বস্তুটার ওপর গিয়ে পড়ল। তীব্র আক্রোশে সাইকেলটা ওখানেই আছাড় মেরে ফেলে দিয়ে পিঠের ব্যাগটা শক্ত করে চেপে ধরে গেইট পার হয়ে হনহন করে সামনের রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করল।
বারিশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়িতে গিয়ে বসে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ধীরে ধীরে গাড়িটা নিয়ে যায় ঝিলমিলের ঠিক পাশাপাশি।
কাচ নামিয়ে গম্ভীর গলায় ডাকে,
_“গাড়িতে ওঠো।”

বারিশের ডাক কানে গেলেও ঝিলমিল যেন পুরোপুরি বধির। সে সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে হনহন করে হাঁটতে থাকল। যুবকের ধৈর্যের শেষ বাঁধটুকুও এবার ভেঙে গেল। সে গাড়িটা ঝিলমিলের গা ঘেঁষে থামিয়ে, ড্রাইভিং সিট থেকে বাঁ পাশের সিটের দিকে ঝুঁকে এক টানে দরজাটা খুলে, ক্ষিপ্র হাতে ঝিলমিলের হাতটা শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে, এক প্রকার জোর করেই ওকে টেনে এনে সিটে বসিয়ে সশব্দে দরজা আটকে দেয়।
দাঁতে দাঁত চেপে বারিশ বলল,
_“ডাকছি শুনতে পাচ্ছ না?”
ঝিলমিলও তখন ক্ষোভে ফুঁসছে। সে সিটের ওপর ছিটকে উঠে বসেই চেঁচিয়ে উঠল,
_“আমি আপনার সাথে যাব না! আপনি তো একবারের জন্যও শুনতে চাইলেন না আপনার ওই লম্পট ভাতিজা আমার সাথে কী অন্যায় করেছে! ও…”
এবারও কথা শেষ করতে দিল না বারিশ। এক হাত স্টিয়ারিংয়ে রেখেই, অন্য হাতে ঝিলমিলের নরম চোয়ালটা শক্ত করে চেপে ধরল সে। ওর মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে পাথরের মতো কঠিন গলায় বলে উঠল,

_“কোনো আগ্রহ নেই আমার এসব ফালতু কথা শোনার। এরপর আর একবার যদি মুখ থেকে কোনো কথা বের করেছ, তাহলে তোমাকে সহ এই গাড়ি আমি সোজা গিয়ে কোথাও এক্সিডেন্ট করব!”
​ঝিলমিলের চোখের মণি দুটো ভয়ে বড় বড় হয়ে গেল। এ যেন এক সম্পূর্ণ অচেনা বারিশ চাচ্চু! এর মধ্যে এতদিনের চেনা সেই ‘বারিশ চাচ্চু’, ‘ফুপা’ কিংবা ‘স্যার’—কেউই নেই। ভীষণ রুক্ষ, গম্ভীর কোনো পুরুষ, যে সত্যি সত্যিই গাড়িটা কোথাও ঠুকে দিতে পারে! ঝিলমিলের খুব বলতে ইচ্ছে করল ‘নিজে গাড়িতে তুলে এনে, আবার এক্সিডেন্টের ভয় দেখাচ্ছে!’ বলল ঠিকই তবে মনে মনে।
চোয়াল চেপে ধরায় ব্যথায় কুঁচকে যায় ঝিলমিলের মুখটা। সে কোনোমতে উচ্চারণ করে,
_“ছা-ছাড়ুন… গালটাই তো গলিয়ে দিলেন আমার!”
বারিশ এক ঝটকায় হাতটা সরিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসে গাড়ি চালানোয় মন দিল। অন্য সময় হলে এভাবে গাল চেপে ধরার জন্য ঝিলমিল চিৎকার করে গাড়ি মাথায় তুলত, কিন্তু এখন তার এই ভয়ংকর রূপ দেখে টু শব্দ করার সাহসও তার হলো না। সে অভিমানে আর ভয়ে জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে কাচের ওপাড়ে তাকিয়ে রইল। অর্ধেক রাস্তা পার হওয়ার পর হঠাৎ করেই ঝিলমিল বলে উঠল,
_“গাড়িটা থামান।”

বারিশ কোনো পাল্টা প্রশ্ন করল না, কেন নামবে তাও জানতে চাইল না। ব্রেক কষে গাড়িটা রাস্তার একপাশে দাঁড় করিয়ে সে সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঝিলমিল কাঁধের ব্যাগটা টেনে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে দরজাটা ধড়াম করে আটকে দেয়। তারপর কাচের ওপর দিয়ে বলল,
_“আমার একটা জরুরি কাজ আছে। আপনি চলে যান।”
এই বলেই সে আর পিছন ফিরে না তাকিয়ে উল্টো দিকের একটা বড় রেস্তোরাঁর দিকে হেঁটে গেল। মনটা তো আজ তার ভেঙে খানখান হয়েই গেছে, তার ওপর দুপুরের এই রোদে মাথাটাও ধরেছে। কে জানে তার মা আজকে বাসায় কী ছাইপাশ রান্না করে রেখেছে! এমনিতেই মেজাজ চড়ে আছে, পছন্দের খাবার না হলে আজকে আর রক্ষা নেই। নিজের মন ভালো করার জন্য সে সোজা গিয়ে রেস্তোরাঁর এসি হলের এক কোণার একটা খালি টেবিলে বসল।
ওয়েটার আসতেই সে একনাগাড়ে মেন্যু কার্ড দেখে বেশ কিছু ভারী খাবারের নাম বলতে লাগল,

_“একটা চিকেন ক্যাশেউ নাট সালাদ, সাথে ক্রিস্পি ফ্রাইড চিকেন, একটা চিজ ব্লাস্ট বিফ বার্গার, লুইজিয়ানা হোয়াইট সস পাস্তা, এক প্লেট চিজ লোডেড ফ্রাইস আর একটা বড় থিক চকলেট ব্রাউনি শেক! ওহ আচ্ছা, সাথে একটা কোল্ড কফি উইথ আইসক্রিমও দিয়ে দেবেন। জলদি!”
​অর্ডার শুনে ওয়েটার কয়েক সেকেন্ড হা করে ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে রইল। একা একটা মেয়ে এতগুলো চিজ আর মিষ্টির ভারী খাবার একসাথে অর্ডার করছে, তাও আবার কোল্ড কফি আর চকলেট শেক দুই কাপ ড্রিংকস একসাথে! মেয়েটার নিশ্চয়ই মাথা খারাপ হয়েছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই একে একে সবগুলো খাবার টেবিলজুড়ে হাজির হলো। ঝিলমিল আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে খেতে শুরু করে দিল। খেতে খেতে যখন আজকের ঘটনা মাথায় আসল তখনই কান্না চলে এলো তার। সে এক হাতে টিস্যু দিয়ে চোখ আর নাক মুছছিল, আর অন্য হাতে চামচ দিয়ে সালাদ আর পাস্তা মুখে পুরছিল। রাগ, দুঃখ আর ক্ষোভ যেন সে চিবিয়ে চিবিয়ে গিলছে!
চিবানো থামিয়ে হঠাৎ সামনের চেয়ারটার দিকে তাকাতেই চমকে উঠল কিশোরী। বারিশ কখন এসে সামনের চেয়ারটায় বসে পড়েছে, সে টেরই পায়নি!

_“এটাই তোমার জরুরি কাজ?”
ঝিলমিল চিবানো বন্ধ করে টিস্যুটা টেবিলে রেখে বলল,
_“আশ্চর্য! আপনি দেখি আমার পিছুই ছাড়ছেন না!”
কোনো উত্তর দিল না যুবক। ঝিলমিল আবারও মন দিয়ে পাস্তায় কাটাচামচ চালায়। বারিশ কোনো কথা না বলে একদম গম্ভীর আর তীক্ষ্ণ চোখে ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তার চোখ একবার ঝিলমিলের মুখের দিকে যাচ্ছে, আর একবার টেবিলভর্তি খাবারের প্লেটগুলোর দিকে। মনে মনে বেশ অবাকই হচ্ছিল সে। কেউ এই চিজ আর মশলাদার খাবারের সাথে একসাথে চকলেট শেক আর কোল্ড কফি খায়? পেট খারাপ হওয়া তো সময়ের ব্যাপার মাত্র!
এভাবে তাকিয়ে থাকায় অস্বস্তি হলো ঝিলমিলের। সেই অস্বস্তি কাটাতে ঝিলমিল অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাঁটাচামচে কিছুটা পাস্তা তুলে ওনার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

_“খাবেন ফুপা?”
_“তাড়াতাড়ি খাবার শেষ করো,” উত্তর না দিয়ে বারিশের রাশভারী গলার হুকুম এলো।
তাড়াতাড়ি না ছাই! একদম পিঁপড়ের গতিতে চিবিয়ে চিবিয়ে খেতে লাগল সে। অনেকটা সময় পার করে সে টেবিলের প্রতিটা প্লেট একদম সাফ করে ফেলল। খাওয়া শেষে যখন সে হাত তুলে ওয়েটারকে ডেকে বিল দিতে চাইতেই, বারিশ পকেট থেকে ছয় হাজার টাকা বের করে ওয়েটারের হাতে গুঁজে দিল। ঝিলমিল বসা থেকে আধপোড়া হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
_“আপনি কেন বিল দিলেন? আমার কাছে বুঝি টাকা নেই? আমি কি…”
সে নিশ্চিত আবার একশো একটা তর্কের ঝুড়ি নিয়ে বসতে যাচ্ছিল, কিন্তু বারিশ মাত্র এক কথায় ওর সব মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ওকে স্তব্ধ করে দিল,
_“আমি না তোমার ফুপা?”

বারিশ আর দীঘির বিয়ের সময় একদম ঘনিয়ে এসেছে। আর মাত্র পাঁচটা দিন। ঝিলমিল আজকাল কলেজে খুব একটা যাচ্ছে না। নিজের আপন ফুপির বিয়ে বলে কথা, তাই এক সপ্তাহ আগে থেকেই সে কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে একপ্রকার ঘরবন্দী হয়ে আছে। ​বারিশও নিজের বিয়ে উপলক্ষে সব কাজ থেকে ছুটি নিয়েছে। কিন্তু এই উৎসবের আমেজও ঝিলমিলের মনের মেঘ কাটাতে পারছে না। জারিফ নামের ওই লম্পটটাকে সে কোনো ভাবেই মাথা থেকে বের করতে পারছে না। এটা অবশ্য ভালোবাসার কোনো টান নয়; ঝিলমিলের ভেতরে আসলে তুষের আগুনের মতো একটা ক্ষোভ জ্বলছে। সে কেবল এটা ভেবেই ছটফট করে আর কষ্ট পায় যে, ওই সস্তা ছেলেটা তাকে এতটা বোকা বানিয়ে ছেড়ে দিল আর সে নিজে কিছুই করতে পারল না!

আজকাল সে বাড়ির ছাদে পর্যন্ত যায় না। সেদিন ছাদে যাওয়ার পর ওই ই’তরটা যেভাবে এসে দাঁত কেলিয়ে বলছিল, ‘সবকিছু মেনে নিলে সে নাকি ঝিলমিলকেও সাইড গার্লফ্রেন্ড হিসেবে রেখে দেবে!’ ভাবা যায়? সে নিজেকে ভাবেটা কী! ওর মতো একটা ব্যবহৃত, সেকেন্ড হ্যান্ড প্রোডাক্টকে ঝিলমিল নিজেই কোনোদিন গ্রহণ করবে না, আর ওই ল’ম্পট কি-না এসে দয়া দেখায়! উফফ… ভাবলেই গা ঘিনঘিন করে ওঠে।
​ঝিলমিল আজকাল বাসায়ও কারও সাথে তেমন একটা কথা বলে না। রুম থেকে নিচে নামা তো ছেড়েই দিয়েছে। তার জগৎ এখন শুধু নিজের বেডরুম আর বেলকনি। সেখানে একা একা বসে সে জারিফকে মনে মনে চব্বিশ ঘণ্টা গালাগালি করে আর নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে জল পড়ে।
​আজকে দুপুরে হঠাৎ একটা কাজে নিজের ফুপি দীঘির রুমের দিকে যেতেই থমকে দাঁড়াল ঝিলমিল। ভেতর থেকে কেমন একটা চাপা ফিসফিসানি আওয়াজ ভেসে আসছে। ঝিলমিল সতর্ক পায়ে, চোরের মতো নিঃশব্দে জানালার পাশে গিয়ে আড়ি পাতে। ​জানালার ভেতরের পর্দাটা পুরোটা টানা ছিল না, তাই হালকা ফাঁক গলে ভেতরের দৃশ্যটা স্পষ্টই দেখা যাচ্ছিল। ঝিলমিল দেখল, ফুপি এক যুবকের শার্টের কলার মুঠো করে ধরে আকুল গলায় বলছে, _“আর পাঁচদিন পর আমার বিয়ে, বুঝতে পারছ তুমি? আচ্ছা, তোমার কি একটুও ভালো লাগে না আমাকে?”

​শার্টের কলারটা যার মুঠোয় বন্দি, সে আর কেউ নয় –তাহসিন! ঝিলমিলের চোখ কপালে উঠে গেল। ফুপি নিজের মায়ের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট তাহসিনের সাথে ফুপি এসব কী করছে!
​তাহসিন বেশ ভদ্র অথচ শক্ত গলায় বলছে,
_“আপনাকে ভালো না লাগার কোনো কারণ নেই ম্যাম। তাই বলে যে আপনাকে বউ হিসেবে ভালো লাগার দুঃসাহস দেখাব, সেটা দয়া করে ভাববেন না।”
_​“আমি এত কিছু জানি না। তুমি আমার সঙ্গে পালাবে!” দীঘির কণ্ঠে একরোখা জেদ।
_​“অসম্ভব, আমি এটা কোনোদিনই পারব না।” তাহসিন সোজা নাকচ করে দিল।
_​“তুমি পারবে। তুমি কেন এত ভয় পাচ্ছ? আমি আছি তো! কিচ্ছু হবে না আমাদের। তুমি অন্য কোথাও গিয়ে অন্য কোনো চাকরি করবে।”
​তাহসিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
_ “আপনি আসলে পরিস্থিতি বুঝতে পারছেন না ম্যাম। স্রেফ আবেগ নিয়ে ভাবছেন সব। আপনার আর আমার সামাজিক অবস্থানের আকাশ-পাতাল ফারাক। আপনার মা আমাকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবেন। এটা ভাবতেও আমার কলিজা কাঁপে!”

​দীঘি ওসব কোনো যুক্তির ধার ধারল না। সে তাহসিনের আরও কাছে ঘেঁষে বলল,
_“আমি এত কিছু শুনতে চাই না। তুমি আমার সঙ্গে পালাবে, ব্যস!”
​ঝিলমিল আর বাকি কথা শোনার জন্য সেখানে দাঁড়াল না। তার পুরো শরীর যেন নিমেষে জমে গেল বরফের স্তূপের। সে উল্টো পায়ে হেঁটে কোনোমতে নিজের রুমে ফিরে এলো।
​ফুপি কি-না নিজের মায়ের অ্যাসিস্ট্যান্টের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে! এই কারণেই এই রাবিশটার প্রতি ফুপির এত অনাগ্রহ ছিল! হায়রে কপাল! ​এখন ফুপি যদি বিয়ের আসর থেকে এভাবে পালিয়ে যায়, তাহলে কী হবে? প্রথমত, এই বনেদী বাড়ির মান-সম্মান এক ফুৎকারে ধুলোয় মিশে যাবে। দ্বিতীয়ত, বারিশ ফুপা বিয়ের পিঁড়িতে বউ হারিয়ে সারাজীবনের মতো দুঃখ পাবে। আর তৃতীয়ত, ঝর্ণা দাদী নির্ঘাত অন দ্য স্পট স্ট্রোক করবেন!

​ঝিলমিল তো এসবের কিছুই চায় না। সে নিজেকে সামলে নিয়ে আবার দরজার দিকে পা বাড়াল—যাই হোক, দাদীমাকে এখনই গিয়ে সব বলে দিতে হবে, যেন ফুপি পালানোর কোনো সুযোগই না পায়।
​কিন্তু দরজার হাতলটা ধরার আগেই হঠাৎ ঝিলমিলের পা দুটো মাটিতে আটকে গেল। জাস্ট থমকে গেল সে। ​ওয়েট, ওয়েট, ওয়েট! বারিশ কে? বারিশ তো জারিফেরই আপন চাচা! জারিফের রক্ত! ওই জারিফ তাকে ঠকিয়েছে, বেইমানি করেছে, আবার কত বড় মুখ করে কটাক্ষ করে আজেবাজে কথা বলেছে! কিছুক্ষন কোনো এক হিসেব কষলো সে। তারপর একদম হুট করেই মুখের ভাবভঙ্গি বদলে গেল তার। ঠোঁটের কোণে আচমকা ভয়ংকর, কুটিল হাসির রেখা ফুটে উঠল। চোখের ভেতরের সব জল যেন এক সেকেন্ডে শুকিয়ে সেখানে এক অদ্ভুত, রহস্যময় চকমকানি খেলা করে গেল।

_“ পচে যাওয়া ডাল নিয়ে কেন পড়ে থাকব, যেখানে আমি পুরো গাছটাই নিজের করে নিতে পারি!”
সে হাতল থেকে হাত সরিয়ে নিল। ফুপি পালাক। একদম ধুমধাম করে পালাক! এই খেলাটা তো এবার দারুণ জমবে। ​ঝিলমিল এবার প্রায় দৌড়ে নিজের ড্রেসিং টেবিলের সামনে এলো। আয়নায় নিজের কান্নায় ফোলা, লাল টকটকে চোখ দুটোর দিকে তাকাল। তবে সেই চোখে এখন আর কোনো দুর্বলতা নেই, আছে কেবল এক চরম জেদ আর গোপন এক হিসাব। ড্রয়ার টেনে একটা স্টাইলিশ ডার্ক সানগ্লাস বের করে চোখে পরে নিল সে। ​ফোনটা হাতে নিয়ে ক্যামেরাটা অন করল। সানগ্লাসের ওপর দিয়ে নিজের সেই নতুন রূপটা ধরে রেখে, দুই আঙুল সামনে তুলে একটা কুল পোজ দিয়ে ‘ভি’ (V) সাইন বানাল। ক্লিক! একটা চমৎকার সেলফি উঠে এলো স্ক্রিনে।
​ইন্সটাগ্রামে স্টোরি অপশনে গিয়ে কোনো ক্যাপশন ছাড়াই, কেবল ব্যাকগ্রাউন্ডে খুজে খুজে একটা গান লাগালো,

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৯

—‘ If you’re done with your ex,
Move on to the next
If you’re done with you ex
Move on to the next…”
মিউজিকটা জুড়ে দিয়ে সে সেলফিটা সরাসরি নিজের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে আপলোড করে দিল। তারপর জারিফের উদ্দেশ্যে বলল,
_“Soon to be your ‘magic mamoni’, baba Jarrif-!”
বেশি করে লাইক কমেন্ট করবেন। নাহলে দেরিতে দেবববব!!!

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here