শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৮
আয়েশা শেখ
ঝিলমিল চেঁচালেও মেহরাজ ছাড়া আর কেউ শুনতে পায়নি। দাদীমা আর আলতাফ চৌধুরী তখন অফিসে। নাজমা বেগম নিজের ঘরে ছেলেকে ঘুম পারাচ্ছে। দীঘিও নিজের রুমে। তবে মেহরাজ শুনলেও ভাতিজির চেঁচানোকে পাত্তা না দিয়ে রুমে চলে গেল।
এদিকে ঝিলমিল যেন একটা আস্ত হেলিকপ্টার! ভোঁ-ভোঁ করে ডানা মেলে সেকেন্ডের মধ্যে নিচে এসে ল্যান্ড করল ও। একছুটে বালির স্তূপের সামনে এসে বারিশের পাশে বসল। নিচে পড়ে থাকা একটা ছোট কাঠের টুকরো কুড়িয়ে নিয়ে বারিশের পেটে মৃদু খোঁচা মেরে বলল,
_“চাচ্চু! বেঁচে আছেন আপনি? এখানে পড়ে গেলেন কীভাবে? এই চাচ্চু!” আরেকটা খোঁচা মারল সে।
বারিশের কোনো সাড়া নেই। ঝিলমিল কাঠের টুকরো ফেলে দিয়ে বারিশকে ঠেলতে শুরু করল,
_“ উঠুন, আমি সাহায্য করছি। দেখি…উহহ, আপনি মানুষ নাকি পাথর। মেহরাজ চাচ্চু…তুমি কী বের হয়ে আসবে? তোমার বন্ধু কিন্তু ম’রে যাচ্ছে!”
বারিশের এই দানবীয় ওজনের বডি একা নাড়াতে গিয়ে ঝিলমিলের নিজেরই দম বেরিয়ে যাওয়ার অবস্থা হলো। সে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ওপরের জানালার দিকে তাকাল। দু’বাড়ির একজনও বের হচ্ছে না! বারিশের দিকে একবার তাকিয়ে আবারও ওপরের দিকে মুখ করে চিল্লানো শুরু করল,
_“ও মেহরাজ চাচ্চু! তোমার প্রিয় বন্ধু এখানে চিতপটাং হয়ে পড়ে আছে! জলদি বের হও, নইলে পরে কিন্তু ডে’ড বডি টানতে হবে!”
মেহরাজ এবার ঘরের জানালার পর্দাটা সরিয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে নিচের দিকে তাকাল। আর তাকানো মাত্রই তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল! দেখল, তার প্রাণের বন্ধু ভেজা বালিতে মাখামাখি হয়ে হাত-পা চারপাশে ছড়িয়ে নিথর হয়ে পড়ে আছে। সে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে ঝড়ের গতিতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যত দ্রুত সম্ভব সেখানে গিয়ে পৌঁছাল।
বারিশের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে ওর অবস্থা দেখে মেহরাজের গলা শুকিয়ে কাঠ। ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
_ “ওর এই অবস্থা কীভাবে হলো?”
ঝিলমিল হাত দুটি উল্টে বলল,
_“মনে হয় ছাদ থেকে পড়ে গেছে।”
_“কিন্তু কীভাবে?” মেহরাজের কণ্ঠে তীব্র অবিশ্বাস আর আতঙ্ক।
_“আরে ধুর চাচ্চু! কীভাবে পড়েছে সেটা পরে ভাবা যাবে, আগে তো বাঁচানোর ব্যবস্থা করো! বেঁচে থাকলে তার থেকেই না হয় সব শুনে নিও।”
মেহরাজ বারিশের পালস পরীক্ষা করতে করতে ঝিলমিলকে বলল,
_“তুই দ্রুত যা! ওদের বাসার সবাইকে ডেকে আন। ফাস্ট!”
চাচার কথা শোনামাত্রই এক ছুটে শেহরিয়ার বাড়ির সবাইকে ডেকে আনল ঝিলমিল। মুহূর্তের মধ্যে হইচই পড়ে গেল পুরো বাড়িতে। তৎক্ষণাৎ বারিশকে উদ্ধার করে হসপিটালে নেওয়া হলো, মেহরাজও সাথে গেল।
ভাগ্যিস সেখানে বালুর স্তূপ ছিল! ভাগ্যিস! নাহলে যে উঁচু সীমানা থেকে ছেলেটা পড়েছিল, তাতে বেঁচে ফিরত কি না সন্দেহ। জ্ঞান ফিরতে বারিশের খুব বেশি সময় লাগল না। ডক্টর পরীক্ষা করে জানালেন, ভাগ্য ভালো হাত ভাঙেনি, তবে মারাত্মকভাবে মচকে গিয়েছে। তাই একটা শক্ত ব্যান্ডেজ করে দেওয়া হয়েছে। পায়েও এখানে-সেখানে একটু-আধটু ছিলে গেছে। সতর্কতাস্বরূপ ডক্টর ওকে একরাত হসপিটালেই অবজারভেশনে থাকতে বললেন।
কেবিনের বেডে আধশোয়া হয়ে আছে ফাইজান বারিশ শেহরিয়ার। দৃষ্টি সামনের দেয়ালের দিকে স্থির। মুখাবয়ব প্রচণ্ড গম্ভীর আর থমথমে। ঝর্ণা শেহরিয়ার ছেলের পাশে বসে আক্ষেপের সুরে বললেন,
_ “তুমি আর কত জ্বালাবে তরঙ্গ? দেশে ফিরেই একটা নতুন কাণ্ড ঘটিয়ে বসলে! তোমার মতো এত বড় ধাড়ি ছেলে ছাদ থেকে কীভাবে পড়ে যেতে পারে?”
মায়ের এতগুলো কথার পিঠে বারিশ একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। করার মতো কথা কি এটা? লজ্জার বিষয় তো! ঝর্ণা বেগম থামলেন না,
_“জারিন পড়ে গেলেও না হয় মানতে পারতাম! তুমি? তুমি কীভাবে…”
চঞ্চল শেহরিয়ার স্ত্রীর কাঁধে হাত রেখে থামিয়ে দিলেন,
_ “আহ, এবার বাদ দাও তো। খারাপ কিছু ঘটেনি, ছেলেটা যে বেঁচে আছে এটাই অনেক।”
_“হতেও তো পারত! এমন আস্ত একটা ছেলে হুট করে কীভাবে ছাদ থেকে টপকে পড়ে যায়, আমার মাথায় আসে না!” ঝর্ণা বেগমের উদ্বেগ যেন কমছেই না।
ফরহাদ শেহরিয়ার ভাইয়ের বেডের কাছে এগিয়ে এসে একটু কৌতুহলী গলায় বলল,
_ “ ভাই, তুই হুট করে ভরদুপুরে ছাদে গিয়েছিলি কী করতে?”
এবার আর নিজের রাগ আর বিরক্তি একটাও ধরে রাখতে পারল না বারিশ। এমনিতেই মেজাজ সপ্তমে চড়ে আছে, তার ওপর এই এক প্রশ্ন বারবার শুনতে শুনতে মাথা ফেটে যাচ্ছে। হঠাৎ খেঁকিয়ে উঠে বলল,
_“নাচতে গিয়েছিলাম! নাচতে নাচতে পড়ে গেছি। হয়েছে? এবার বের হও এখান থেকে। সবগুলো রুম থেকে বের হও!”
তার আকস্বিক গর্জন আর রুক্ষ মেজাজে কেবিনে থমথমে নীরবতা নেমে এল। পরিস্থিতি সামাল দিতে মেহরাজ সবার উদ্দেশ্যে বলল,
_“চাচা, চাচী… আপনারা এবার বাসায় ফিরে যান। আমি ওর সঙ্গে আছি। আপনারা গিয়ে একটু রেস্ট করুন।”
ঝর্ণা বেগম ছেলের রুক্ষ মুখের দিকে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে চলে গেলেন। ফরহাদ তার ছেলে জারিফকে হসপিটালে মেহরাজের সাথে থাকতে বলে নিজে মায়ের সাথে রওনা দিল। তাদের আবার সকাল সকাল অফিসে যেতে হবে। জারিফ কেবিন থেকে বের হয়ে কড়িডোরে গিয়ে বসে।
সবাই চলে যেতেই মেহরাজ বারিশের বেডের কাছাকাছি এগিয়ে আসে। তারপর একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
_ “ঝিলমিল যদি না দেখত, তাহলে তো আরও কয়েক ঘণ্টা ওখানেই বালির মধ্যে পড়ে থাকতি। তুই…
_“কী? কী বললি?”
মনোযোগী হলো বারিশ। ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিটা এবার সোজা এসে ঠেকল মেহরাজের মুখে।
_“বললাম, আমার ভাতিজি ঝিলমিল… ও-ই তো তোকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে চেঁচাতে চেঁচাতে সবাইকে জানিয়েছে। ও না থাকলে তো কেউ জানতেই পারত না।”
বারিশ একটা তপ্ত নিশ্বাস ফেলে আবারও আগের মতো চুপচাপ বসে রইল। মেহরাজ এবার বেডের পাশের টুলটায় বসে আবারও গলা খাঁকারি দিল,
_ “তা ছাদ থেকে পড়লি কীভাবে তুই?”
এবার অগ্নিদৃষ্টিতে মেহরাজের দিকে তাকাল বারিশ।
মেহরাজ দুই হাত তুলে বলল,
_ “দেখ, একদম ওভাবে তাকাবি না! তোর মতো একটা দামড়া ছেলে নিজের বাসার ছাদ থেকে পড়ে গেল! আই মিন, দিস ইজ রিডিকুলাস!”
বারিশের কাছ থেকে কোনো জবাব এলো না। ও পাথরের মতো মুখ করে রইল। বেশ কিছুক্ষণ নিরবতা বিরাজ করল কেবিনে। বারিশ নিজের মচকে যাওয়া হাতটার দিকে তাকাল। তারপর একদম নিচু আর গম্ভীর গলায় বলল,
_“তোর ভাতিজির লীলাখেলা দেখতে গিয়ে আমার বারোটা বেজেছে। ওকে বলে দিস আমার সামনে যাতে না আসে। ধরে আছাড় মারব আমি।”
মেহরাজ আকাশ থেকে পড়ল,
_“মানে? ও আবার কী করেছে?”
_“জানি না।” বিরক্তিতে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে আবার সামনে নিতেই বারিশের পুরো মুখটা আরও কুঁচকে গেল। কারণ সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই মেয়েটা, যার কথা ও মাত্রই মেহরাজকে বলল—যেন ভুলেও ওর চোখের সীমানায় না আসে! ঝিলমিলের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে দীঘি আর নূরজাহান চৌধুরী।
নূরজাহান চৌধুরী এগিয়ে আসতে আসতে উদ্বেগের গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
_“এখন ঠিক আছো বাবা? কীভাবে পড়ে গেলে তুমি?”
আহ! আবার সেই একই প্রশ্ন! বারিশ ভেতরে ভেতরে রাগে ফুঁসে ওঠে। তখনই ঝিলমিল আরও এক কাঠি বাড়িয়ে বলল,
_“তখন আমিও ছাদে ছিলাম দাদীমা। কীভাবে পড়ে গেলেন আপনি?”
ব্যস! মাত্রা ছাড়াল রাগ। বারিশ নিজের অক্ষত বাম হাতটা শক্ত করে মুঠো করল। ও নূরজাহান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে একদম মেপে মেপে বলল,
_“রাজকে সব বলেছি। ওর থেকে শুনে নিও। আমার এখন ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।”
মেহরাজ হা করে মুখ খুলে বলতে চাইল যে বারিশ ওকেও কিচ্ছু বলেনি, কিন্তু তার আগেই বারিশ মেহরাজের উরুতে হাত রেখে শক্ত একটা চিমটি কেটে আড়ালে চোখ রাঙাল। যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করে চুপ মেরে গেল মেহরাজ।
দীঘি মায়ের হাত ধরে বলল,
_ “বলেছিলাম না মা, তেমন কিছু হয়নি। ঠিক হয়ে যাবে, চলো এখন ওকে রেস্ট করতে দিই।”
_“আমি তো ভেবেছিলাম ম’রেই বোধহয় যাবে! আহারে, কেমন করে যে পড়ে গেল!” ঝিলমিল আরও দু-কদম বেডের সামনে এগিয়ে এসে কৌতুহলী গলায় বলল,
_“শুধু কি হাতই মচকেছে চাচ্চু? আর কোথাও কিছু হয়নি?”
বারিশ এবার অবাক হবে নাকি রাগ প্রকাশ করবে, বুঝতে পারছে না! সে মেহরাজের দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ইশারা করল—যেন এদের সবাইকে এক্ষুনি রুম থেকে বের করে। মেহরাজ পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দ্রুত সবাইকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কেবিনের বাইরে নিয়ে যেতে লাগল।
সবাই একে একে বের হয়ে যাচ্ছে, ঝিলমিল একদম সবার পেছনে। ও যখন দরজার কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন বারিশ হঠাৎ গম্ভীর আর ভারী গলায় ডাকল,
_“এই মেয়ে, তুমি শোনো।”
ঘুরে দাঁড়াল সপ্তদশী। মুখে কোনো ভয়ের বালাই নেই, ও উল্টো চোখ বড় বড় করে বলল,
_“জি বলুন, কোনো হেল্প লাগবে চাচু?”
_“হ্যাঁ, একটু এদিকে আসো।”
ঝিলমিল সরলমনে বেডের কাছাকাছি এগিয়ে আসে। মেয়েটা কাছে আসতেই পলক ফেলার আগেই যুবক নিজের বাম হাত দিয়ে কিশরীর ডান হাতের কবজিটা শক্ত করে চেপে ধরে হ্যাঁচকা টানে টেনে আনল নিজের দিকে। অতর্কিত আক্রমণে শরীরের ভারসাম্য রাখতে না পেরে ঝিলমিল তড়িৎ গতিতে নিজের বাম হাত দিয়ে বেডের সাদা চাদরটা খামচে ধরে। মুখটা বারিশের একদম কাছাকাছি চলে এসেছে। বারিশ ঝিলমিলের চোখে চোখ রেখে নিচু কিন্তু বরফশীতল গলায় বলল,
_ “নেক্সট টাইম তোমাকে যদি আবার ছাদে এসে ওভাবে লাফাতে দেখেছি… তবে হাত-পা মচকে এবার আমি হসপিটালে না, তোমাকে সোজা হসপিটালে পাঠাব!”
হিংস্র চেহারার বারিশকে এত কাছ থেকে দেখে ভয়ে ঝিলমিলের হার্টবিট এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে গেল। তোতলাতে তোতলাতে বলল,
_“আ-আমি, মানে… আমি তো ছাদে লাফাই না।”
_“তুমি আর কোনোদিন ছাদেই যাবে না!”
_ “আজব তো! ছাদ থেকে পড়ে আ’হত হয়েছেন আপনি, আর ছাদে উঠতে মানা করছেন আমাকে?”
_“হ্যাঁ, মানা করছি।” বারিশ ওর কবজির ওপর নিজের গ্রিপটা আরেকটু শক্ত করে বলে,
_ “আর একদিনও যদি তোমাকে ওই ছাদে দেখি, তবে তোমার পা দুটো ভেঙে হাতে ধরিয়ে দেব!”
ঝিলমিল সোজা হয়ে দাড়াল। নিজের কবজি থেকে বারিশের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,
_“ হাত ছাড়ুন আগে! আমি ছাদে যাব কি যাব না, সেটা আমার ইচ্ছে! আপনার ভয়ে আমি ছাদে যাওয়া বন্ধ করব কেন? ছাড়ুন বলছি!”
_“যাবে না। আমি বারণ করেছি, তাই যাবে না। আর যদি এরপরও কোনোদিন পা বাড়াও…”
_“গেলে কী করবেন শুনি?”
_“যাবে না ব্যস!” বারিশ আর কোনো যুক্তিতে গেল না, গলার স্বর আরও গম্ভীর করল।
_“আমি কিন্তু সবাইকে সব বলে দেব।”
_“কী বলবে?”
_“বলব, আপনি এখানে বসে বসে শিশু নির্যাতন করছেন!”
_“হোয়াট?” বারিশের চোখজোড়া বিস্ময়ে কপালে উঠল।
_“একটা সাধারণ মেয়ের ছাদে ওঠা নিয়ে আপনি যেভাবে তাকে জোর খাটচ্ছেন এটা কি কোনো আইনের মধ্যে পড়ে? এটা স্পষ্ট নির্যাতন!”
বারিশ আর কোনো কথা বলল না। ও চুপচাপ শুধু মেয়েটার ছটফটানি দেখতে লাগল। নিজের হাতটা মুক্ত করার জন্য সে কী পরিমাণ শক্তি অপচয় করছে! অথচ বারিশ নিজে থেকে মুঠো আলগা না করলে এই মেয়ের পক্ষে হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার কোনো ক্ষমতাই নেই। বারিশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল ঝিলমিলকে। মেয়েটা একটা লাইট পিংক রঙের শার্টের সাথে কালো স্কার্ট পরে এসেছে। শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা, গলায় একটা পাতলা ওড়না জড়ানো। দু-পাশে দুটো বেণি করে চুলগুলো বুকের ওপর ঝুলিয়ে রেখেছে, আর কপালের দু-পাশে কিছু ছোট ছোট চুল। বারিশ কি অযথাই মেয়েটার ওপর নিজের রাগ ঝাড়ছে? ওর ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার পেছনে এই মেয়েটার কী দোষ?
_“ ছাড়ুন এবার, চাচ্চু! হাত ছাড়ুন আমার! ব্যথা লাগছে!”
বারিশ আচমকাই মুঠো আলগা করে ছেড়ে দিল ঝিলমিলের হাত। ঝিলমিল ছিটকে একটু পিছিয়ে গেল। লাল হয়ে যাওয়া কবজিটা অন্য হাত দিয়ে ডলতে ডলতে বারিশ চাচ্চুর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
_“আপনাকে বাঁচানোই আমার ভুল হয়েছে। ওখানেই পড়ে থাকতেন, সেটাই ভালো হতো। আর তার চেয়েও ভালো হতো যদি আপনার ওই ওপর থেকে নিচে পড়ার দৃশ্যটা আমি ফোনে ভিডিও করে রাখতাম! মন খারাপ থাকলে ওটা দেখতাম আর প্রাণ খুলে হাসতাম।”
বারিশের চোখমুখ রাগে কুঁচকে গেল,
_“কী বললে তুমি?”
ঝিলমিল দরজার দিকে আরও কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে মুচকি হেসে বলল,
_“একদম ঠিক বলেছি। আপনার ওভাবে পড়ে যাওয়ার কথা ভাবলেই তো আমার হাসি পায়। আপনি জানেন? আপনাকে হসপিটালে নিয়ে আসার পর আমি পুরো চল্লিশ মিনিট হেসেছি!”
বলেই ঝিলমিল এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না, বারিশের নাগালের বাইরে যেতে এক দৌড়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। পিছন থেকে বারিশ বিছানায় উঠে বসার চেষ্টা করতে করতে চিল্লিয়ে উঠল,
_“এই মেয়ে, কী বললে তুমি? দাঁড়াও! বলছি দাঁড়াও…!”
কেবিন থেকে বের হয়ে করিডোর ধরে হনহনিয়ে হাঁটার সময় আচমকাই জারিফের গায়ের ওপর গিয়ে পড়ল ঝিলমিল। ধাক্কা সামলে নিয়ে জারিফ অবাক হয়ে বলল,
_“কখন এসেছিস?”
_“এই তো একটু আগে।” ঝিলমিল নিজের ওড়নাটা টেনেটুনে সোজা করল।
জারিফ এদিক-ওদিক তাকিয়ে করিডোরের শেষ মাথায় হসপিটালের ওয়াশরুমের নির্জন দিকটায় ইশারা করল,
_“চল, একটু ওদিকে যাই।”
ঝিলমিল ভ্রু কুঁচকে বলল,
_“ওদিকে কেন যাব?”
_“তোকে একটা চুমু দিতে ইচ্ছে করছে।” জারিফ বেশ আবদারের সুরে বলল।
_“আবার শুরু করলে?” ঝিলমিল চোখ রাঙাল,
_ “আমার দেওয়া শর্তটা কি ভুলে গেছ? বিয়ের আগে আমার হাত ছোঁয়া তো দূরের কথা, কাছাকাছিও আসতে পারবে না তুমি।”
_“রাখ তোর ওই ফালতু শর্ত! চল তো ওদিকে…” জারিফ আর কথা না বাড়িয়ে ঝিলমিলের হাত চেপে ধরল।
ঝিলমিল সঙ্গে সঙ্গে এক ঝটকায় নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে শক্ত গলায় বলল,
_“দাদীমা আর চাচ্চু কিন্তু এই হসপিটালেই আছেন। একদম বেশি বাড়াবাড়ি করলে চিৎকার করে সবাইকে জড়ো করব বলে দিলাম!”
জারিফ বেশ বিরক্ত হয়ে হাত দুটো বাতাসে ছুড়ে বলল,
_“ঝিলমিল! ইউ আর মাই গার্লফ্রেন্ড, ফর গড’স সেক!”
_“তাতে কী হয়েছে? আমাদের বিয়ে হয়েছে?”
_“হয়নি তো কী হয়েছে? একদিন তো হবেই। চল না প্লিজ, কেউ দেখবে না।” মিনতি করল জারিফ।
_“যেদিন বিয়ে হবে, সেদিন এসব হবে। এর আগে যদি আবারও এই লাইনে কথা বলো, আমি সোজা ব্রেকআপ করে দেবো।”
ঝিলমিল আর দাঁড়াল না, পা বাড়াল উল্টো পথে। তবে কিছুটা পথ যাওয়ার পর কী ভেবে যেন সে পেছন ফিরে তাকায়। দেখে জারিফ মূর্তির মতো মনমরা হয়ে এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটার এই করুণ মুখটা দেখে ঝিলমিলের মনটা একটু গলল। সে আবার জারিফের কাছে ফিরে এসে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
_“রাগ করলে?”
জারিফ মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অভিমানের সুরে বলল,
_ “তুই আমার রাগের দাম দিয়েছিস কখনো? আসলে তুই আমাকে ভালোই বাসিস না।”
_“ভালোবাসি তো। কিন্তু তার মানে এই না যে হসপিটালের কর্নারে দাঁড়িয়ে এসব নোংরামি করতে হবে।”
_“তুই এই জেনারেশনের মেয়ে হয়েও এমন ব্যাকডেটেড চিন্তাভাবনা করছিস? আই মিন, সিরিয়াসলি? ডু ইউ ইভেন লিভ ইন দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি?”
_“আই ডু লিভ ইন দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি, বেইব। তবে মডার্ন হতে গিয়ে সস্তা হতে পারব না। এবার মুখটা প্যাঁচার মতো না করে রেখে তোমার চাচার সেবা করো গিয়ে।”
পনেরোদিন কেটে গেছে মাঝখানে। ঝিলমিল লিভিং রুমে বসে টিভিতে ডোরেমন দেখছে আর আপনমনে চিপস খাচ্ছে। বিকেল বেলাতে বাসায় তেমন কেউ নেই। তার ছোট ভাই জিহান মেঝেতে গাড়ি দিয়ে খেলছে, আর বোনের দেখাদেখি মাঝেমধ্যে কার্টুনে চোখ রাখছে। নাজমা বেগম, আর শেহরিয়ার বাড়ির জারিফের মা শিউলি আর পাশের বাড়ির আরও একজন মিলে শপিংয়ে গিয়েছে। দীঘিও নিশ্চয়ই বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও ঘুরতে বেরিয়েছে।
অনেকক্ষণ ধরে একই কার্টুন দেখতে দেখতে বোরিং লাগায় ঝিলমিল চ্যানেলটা পাল্টাল। একটা নিউজ চ্যানেল সামনে আসতেই সংবাদ পাঠিকার গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে উঠল,
…বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বহুল আলোচিত ধ’র্ষণ মামলার প্রধান পলাতক আসামির চূড়ান্ত রায় ঘোষণার আগেই, অজ্ঞাত কোনো ব্যক্তির গুলিতে তার মৃত্যু হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, বিচার এড়াতে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায়…”
এতটুকুই শুনতে পেল ঝিলমিল। বাকিটা শোনার আগেই জিহান কান্নাকাটি শুরু করল আবারও সেই কার্টুনের চ্যানেলে দেওয়ার জন্য। ভাইয়ের যন্ত্রণায় ঝিলমিল বাধ্য হয়েই চ্যানেলটা পালটে দিল। তখনই ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল ইরানের কল। ফোনটা কানে ধরতেই ওপাশ থেকে বন্ধু বলল,
_“কালকে কিন্তু ভর্তি হতে যাব। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠবি।”
_“আচ্ছা।”
_“তোর সঙ্গে কে যাবে?”
_“আব্বু যাবে।”
_“ওকে।”
ফোনটা পাশে রেখে আবারও টিভির দিকে মনোযোগ দিল ঝিলমিল। তবে টিভির দিকে তাকিয়ে থাকলেও তার ভাবনাগুলো কেমন যেন অন্য কোথাও হারিয়ে গেছে।
শেহরিয়ার বাড়ির ডাইনিং টেবিলে রাতের খাবারে আজ সবাই একসঙ্গে বসেছে। বারিশের চোট এখন অনেকটাই সেরে উঠেছে, ব্যান্ডেজও খোলা। হাতটা স্বাভাবিকভাবে নাড়াচাড়া করতে পারছে, তবে হুটহাট কোনো ভারী কাজ করতে গেলে ভেতরে একটা মৃদু টনটনে ব্যথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এছাড়া ও এখন একদম ফিট।
খাওয়াদাওয়ার মাঝপথেই হুট করে জারিফ ঝর্ণা শেহরিয়ারের দিকে তাকিয়ে বেশ আদুরে গলায় বলল,
_“দাদীমা, আমাকে একটা নতুন বাইক কিনে দাও না? একদম চাচ্চুরটার মতো।”
ঝর্ণা শেহরিয়ার প্লেট থেকে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন,
_ “কেন, তোর বর্তমান গাড়িটার আবার কী হলো?”
_“ওটা তো পুরোনো মডেল হয়ে গেছে, দাদী! তুমি চাচ্চুর নতুন বাইকটা দেখেছ? দেখতে কী মারাত্মক সুন্দর!”
নাতির এমন আবদারে দাদীমা মৃদু হেসে বললেন,
_“আচ্ছা, ঠিক আছে। তোর বাবাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে পছন্দমতো একটা কিনে আনিস।”
_ “কিন্তু দাদীমা, এই বাইকটার দাম কিন্তু অনেক বেশি।”
_“ কত আর হবে? তোর বাবাকে আমি নিজে বলে দেব, তুই চিন্তা করিস না। তবে শর্ত একটাই—লেখাপড়াটা ঠিকঠাক করতে হবে।”
জারিফ এবার একটু ইতস্তত করে বলল,
_“তুমি যেমনটা ভাবছ, এটার দাম তার চেয়েও অনেক অনেক বেশি।”
_“কত, শুনি?” ঝর্ণা শেহরিয়ার কৌতুহলী হলেন।
জারিফ আড়চোখে বারিশের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বেশ বুক ফুলিয়ে বলল,
_ “প্রায় পঞ্চাশ লাখ টাকার ওপরে!”
কথাটা শোনামাত্রই ঝর্ণা দাদীমা গলার খাবার আটকে মারাত্মক একটা বিষম খেলেন। শিউলি বেগম দ্রুত পানির গ্লাসটা শাশুড়ির দিকে এগিয়ে দিতে দিতে ছেলের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে রাগত গলায় বললেন,
_ “তোর কী মাথা পুরো বিগড়ে গেছে, জারিফ? এতগুলো টাকা খরচ করে তুই একটা মোটরবাইক কিনবি? তোর সাহস তো কম না!”
জারিফ বলল,
_“চাচ্চুও তো কিনেছে, আমি কিনলে কী দোষ?”
ঝর্ণা বেগম কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে নিজের ছেলের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। খানিকটা অবিশ্বাসের সুরে বললেন,
_“তরঙ্গ, তুমি পঞ্চাশ লাখ টাকা দিয়ে এই বাইক কিনেছ?”
তরঙ্গ অর্থাৎ বারিশ প্লেটে চোখ রেখেই নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল,
_“না।”
_“তাহলে কত?”
_“তিপ্পান্ন লাখ পঞ্চাশ হাজার।”
ঝর্ণা শেহরিয়ারের মনে হলো তার রক্তচাপ আচমকা আকাশে উঠে গেছে। তিনি কপালে হাত দিয়ে শিউলি বেগমকে হাঁক ছাড়লেন,
_“বউমা, আমার জন্য বরফ আনো। দ্রুত যাও!”
বারিশের বাবা আর বড় ভাইও এতক্ষণ চুপচাপ খাচ্ছিলেন, তারা দুজনেই চরম অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। শিউলি বেগম তড়িঘড়ি করে ফ্রিজ থেকে বরফ এনে শাশুড়ির মাথায় চেপে ধরলেন। ঝর্ণা বেগম বরফের ঠান্ডায় চোখ জোড়া বন্ধ করে তীব্র আক্ষেপের সুরে বললেন,
_“একটা বাইকের পেছনে তুমি তিপ্পান্ন লাখ টাকা উড়িয়ে দিলে! তোমার মাথা কি আদৌ ঠিক আছে তরঙ্গ? এই টাকাটা যদি ব্যবসায় ইনভেস্ট করতে, তবে এতদিনে দ্বিগুণ লাভ উঠে আসত!”
_“টাকা আমার, শখও আমার। এখানে অন্য কারো কথা বলার সুযোগ নেই, আম্মা।” খেতে খেতে বলল বারিশ।
_“ তাই বলে তুমি এত টাকা দিয়ে বাইক কিনবে? গাড়ি কিনলেও মানা যেত!”
বারিশ এবার খাওয়া থামিয়ে মায়ের দিকে তাকাল,
_“ আমি আমার নিজের টাকায় কিনেছি, এত সমস্যা কোথায় তোমাদের?”
_“ সেটাই…ও ওর নিজের টাকায় কিনেছে বাদ দাও।” চঞ্চল শেহরিয়ার স্ত্রীকে থামাতে চাইলে ঝর্ণা শেহরিয়ার আরও রেগে যায়।
_“ সব সময় আমাকে থামাবে না তুমি। নিজে উপার্জন করে বলে যা খুশি তাই করে বেড়াবে? কেনার আগে আমার কাছে একবার জিজ্ঞেস করারও প্রয়োজন মনে করল না!”
ফরহাদ এবার মায়ের রাগ ভাঙানোর চেষ্টায় বললেন,
_“আম্মা, তরঙ্গ তো আর ছোট নেই। জিনিসটা ওর ভালো লেগেছে, তাই কিনেছে। ছাড়ো এখন।”
ঝর্ণা শেহরিয়ার কিছুতেই শান্ত হলেন না। তিনি মুখ উঁচিয়ে আরও কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু তার আগেই ডাইনিং টেবিল কাঁপিয়ে এক অভাবনীয় কাণ্ড ঘটল। বারিশ আচমকা নিজের খাবারের প্লেটটা সশব্দে ফ্লোরে ছুড়ে ফেলে দিল। ঝনঝন শব্দে থালাটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল, খাবারগুলো ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। সে তীব্র ক্ষোভে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল,
_“আমি আমার টাকা দিয়ে বাইক কিনি কিংবা ড্রেনে ফেলে দিই—সেটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তোমার কী আম্মা? তোমার কী? আই ক্যান ডু হোয়াটএভার আই ওয়ান্ট উইথ মাই মানি! এমন বাইক একটা কেন, পঞ্চাশটা কেনার ক্ষমতা আমার আছে। আমার কোনো বিষয়ে তুমি একদম নাক গলাবে না।”
কথাটা শেষ করে বারিশ এক মুহূর্তের জন্য জারিফের দিকে তাকাল। জারিফ তখনো মুখে হাত দিয়ে মিটিমিটি হাসছে, যেন পুরো টেবিলজুড়ে এই তুলকালামটাই সে দেখতে চেয়েছিল। বারিশ হনহন করে চলে যেতে নিলে শিউলি বেগম দ্রুত গিয়ে তার বাহু চেপে ধরলেন,
_“খাবার ফেলে যেও না ভাই। দুটো খেয়ে যাও।”
_“খিদে নেই আমার আর। ঘুমাব আমি, সকালে উঠে কলেজে যেতে হবে।”
শিউলি বেগম পেছন থেকে আরও কয়েকবার ডাকলেন, কিন্তু সেদিকে বারিশের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। লম্বা লম্বা পা ফেলে নিজের ঘরে ঢুকে সে যত জোরে সম্ভব দরজাটা আটকে দিল। তার পরপরই ঘরের ভেতর থেকে আরও একটা কিছু ভাঙার বিকট শব্দ ভেসে এলো।
ডাইনিং রুমে তখন থমথমে নীরবতা। রাগে কাঁপতে কাঁপতে শিউলি বেগম নিজের ছেলের কাছে গিয়ে এক হাত দিয়ে ওর মাথার চুল মুঠো করে ধরলেন,
_“উঠ তুই এখান থেকে! আর খেতে হবে না তোকে, যা! সব ঝামেলার মূল তুই।”
জারিফ মাথাটা ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,
_“আমি আবার কী করলাম, মম?”
ফরহাদ সাহেবও ছেলের ওপর চটে গিয়ে ধমকে উঠলেন,
_“থাপড়ে তোর তোকে আমি সোজা করে দেব, বেয়াদব! চাচা নিজের উপার্জনের টাকায় এত টাকা দিয়ে বাইক কিনেছে, সেটা দেখে আবার দাদীর কাছে এসে লাগানো হচ্ছে? বাইক তোর পেছন দিয়ে ভরে দেব আমি!”
_“তো পেছন দিয়েই দাও, বাইক পেলেই হলো। এমনিতেও চালানোর সময় বাইক পেছনেই থাকে!”
ছেলের এমন চরম বেয়াদবি দেখে ফরহাদ সাহেব রাগে আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। বেগতিক দেখে জারিফ আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না, দ্রুত ডাইনিং রুম থেকে কেটে পড়ল। নাহলে আজও তার গাল বাবার হাতের চড় খেয়ে লাল হবে। ঝর্ণা শেহরিয়ার তখনো স্তব্ধ হয়ে ছেলের ভেঙে ফেলা প্লেট আর ছড়িয়ে থাকা খাবারগুলোর দিকে তাকিয়ে আছেন। চঞ্চল শেহরিয়ার দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্ত্রীর দিকে তাকালেন,
_“বাসায় একটু অশান্তি না করলে তোমার পেটের ভাত হজম হয় না! সামান্য কিছু টাকার জন্য ছেলেকে এতগুলো কথা শোনাতে হবে? খাও এখন একা একা!”
চঞ্চল সাহেবও খাওয়া অর্ধেক রেখেই টেবিল ছেড়ে উঠে চলে গেলেন।
বারিশ এখন নিজের রুমের জানলায় এসে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের লাইটটা নেভানো, শুধু বাইরের চাঁদের আলো এসে পড়েছে ওর ওপর। রাতের হালকা ঠাণ্ডা বাতাসে ওর অবিন্যস্ত চুলগুলো আলতো করে উড়ছে। ওর এই ঘরের জানালা থেকে ঠিক সোজাসুজি ঝিলমিলের রুমের জানালাটা দেখা যায়। দু-বাড়ির মাঝের দূরত্বটুকু পেরিয়ে বারিশের স্থির দৃষ্টি এখন আটকে আছে ঠিক ওই দিকটাতেই। তবে ঝিলমিলের রুমের জানালাটায় ভারী পর্দা টানা। ভেতরের লাইটটাও বন্ধ হয়ে আছে নিশ্চিত, কোনো আলোর আভা বাইরে আসছে না।
বারিশ সেদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জানালা থেকে ধীর পায়ে সরে আসে সে। সোজা এগিয়ে গেল ঘরের কোণে থাকা নিজের পুরোনো কাঠের আলমারিটার দিকে। পাল্লাটা খুলতেই এক কোণে ধুলোবালি মেখে পড়ে থাকা একটা ভাঙা গিটার চোখে পড়ল।
বারিশ গিটারটা বাইরে বের করে আনে। ভাঙা কাঠের শরীরটার ওপর কিছুক্ষণ শূন্য চোখে তাকিয়ে রইল সে। পরক্ষণেই হাত দিয়ে গিটারের ওপর জমে থাকা ময়লাটুকু ঝেড়ে পরিষ্কার করে আঙুলের ডগা দিয়ে তারে একটা মৃদু টোকা দিতেই নিশুত রাতে টুংটাং করে অদ্ভুত, বিষাদময় শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়। বারিশের মাথার ভেতরটা কেমন যেন ওলটপালট করে উঠল! ওই সুরটা যেন ওর মগজের কোনো এক সুপ্ত যন্ত্রণাকে আচমকা জাগিয়ে তুলল। যুবকের ভেতরের শান্ত রূপটা উধাও হয়ে গেল; তীব্র এক উন্মাদনায় সে গিটারটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ফ্লোরের সাথে কয়েকটা বাড়ি মারল। ভাঙা গিটারটা এবার একদম চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।
বুক ভরে কয়েকটা তপ্ত শ্বাস ফেলে বারিশ ভাঙা টুকরোগুলোকে কুড়িয়ে আবার আলমারির ভেতর একরকম ঠেসে রেখে দিল। পাল্লাটা দড়াম করে আটকে দিয়ে সে সোজা গিয়ে ধপ করে শুয়ে পড়ল বিছানায়। কোনো দিকে না তাকিয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে নিল সে; ঘুমিয়ে পড়া ছাড়া এই তীব্র অস্থিরতা থেকে বাঁচার আর কোনো উপায় নেই ওর কাছে।
ইরানের কথা মতো সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠল ঝিলমিল। চটপট তৈরি হয়েই সে সোজা চলে গেল দীঘির রুমে। ফুপিকে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে ডাকতে ডাকতে বলল,
_“ফুপি, ওঠো তাড়াতাড়ি! আমার সঙ্গে কলেজে যেতে হবে তোমায়।”
দীঘি কম্বলটা আরও ভালো করে গায়ে টেনে নিয়ে চোখ না খুলেই বলল,
_“আমি পারব না। রাতে অনেক দেরিতে বাসায় ফিরেছি, এখন ঘুমোতে দে।”
_“প্লিজ চলো ফুপি। প্লিইইজ!”
_“তোর বাবাকে বল না গিয়ে।”
_“আব্বু তো অনেক আগেই অফিসে চলে গেছে। বলে গেছে কলেজে পৌঁছে কল করতে, তারপর সে নিজে ওখানে আসবে।”
দীঘি পাশ ফিরে শুয়ে বলল,
_“তাহলে ছোট ভাইয়াকে বল।”
_“উঁহু, ও তো এখনো নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে।”
_“আমিও তো ঘুমাচ্ছি ঝিল, কেন সকাল সকাল বিরক্ত করছিস?”
_“তাহলে আমি কি এখন তাহসিন আঙ্কেলের সাথে একা যাব?”
নামটা শোনামাত্রই দীঘি ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। জড়ানো গলায় অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
_“কার সঙ্গে যাবি?”
_“আব্বু তাহসিন আঙ্কেলের সঙ্গে আমাকে যেতে বলেছে। ফুপি, তুমিও সাথে চলো না প্লিজ!”
দীঘি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
_“আচ্ছা চল, আমি রেডি হয়ে আসছি।”
দীঘি দ্রুত তৈরি হয়ে ঝিলমিলকে নিয়ে নিচে নেমে এলো। বাইরে গাড়ির পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তাহসিন। ওদের আসতে দেখেই সে সোজা গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসল। ঝিলমিল পেছনের সিটে গিয়ে বসার সাথে সাথেই দীঘি গিয়ে বসল সামনে, ঠিক তাহসিনের পাশের সিটটায়। গাড়ি স্টার্ট দিল তাহসিন। দীঘি আড়চোখে একবার তাহসিনের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
_“খেয়েছ তুমি?”
_“না,” তাহসিনের সংক্ষিপ্ত উত্তর।
পেছন থেকে ঝিলমিল বেশ উৎসাহ নিয়ে বলল,
_“ফুপি, কলেজের প্রথম দিন তুমি কার সঙ্গে গিয়েছিলে?”
দীঘি পেছনের দিকে তাকিয়ে হাসল,
_“বাবার সাথে।”
ঝিলমিল এবার সামনে ঝুঁকে বলল,
_“তাহসিন আঙ্কেল, তুমি কার সাথে গিয়েছিলে?”
_“একা,” স্টিয়ারিংয়ে চোখ রেখেই শান্ত গলায় বলল তাহসিন।
_“বাহ! আর আমি ফুপির সাথে যাচ্ছি।” ঝিলমিল বেশ গর্বের সাথে বলল।
তাহসিন লুকিং গ্লাসে ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, _“অনুভূতি কেমন তোমার?”
_“খুব ভালো আঙ্কেল!”
গাড়ি যখন কলেজের কাছাকাছি পৌঁছাল, ঝিলমিল তখন মোবাইল বের করে আলতাফ চৌধুরীকে কল দিল এবং জানিয়ে দিল যে তারা পৌঁছে যাচ্ছে। মেয়ের কথামতো আলতাফ সাহেবও অফিস থেকে বের হয়ে কলেজের সামনে চলে এলেন।
কলেজের গেটে গাড়ি থামতেই নিজের বাবাকে দেখতে পেয়ে চট করে গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে চলে গেল ঝিলমিল। তাহসিনও গাড়ি লক করে নামার জন্য উদ্যত হতেই দীঘি শক্ত করে ওর হাত চেপে ধরে থামিয়ে দিল।
_“নামবে না তুমি,” দীঘির গলার স্বর এবার বেশ গম্ভীর।
তাহসিন হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা না করেই প্রশ্ন করল,
_“কেন?”
_“আবার বলছ কেন! তুমি ইদানীং আমাকে এত এড়িয়ে চলো কেন তাহসিন?”
_“আপনি সেটা ভালো করেই জানেন, ম্যাম।”
_“না, আমি জানি না।”
_“এমনি এড়িয়ে চলি। কোনো কারণ নেই।”
_“না, তুমি বলবে কেন এড়িয়ে চলো!”
তাহসিন এবার দীঘির চোখের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, _“আমি চাই না আপনার কোনো আচরণের জন্য আমার চাকরিটা চলে যাক।”
_“আমার জন্য তোমার চাকরি কেন যাবে?”
_“বললাম তো, আপনি সব জানেন।”
_“তার মানে… তুমি আমার অনুভূতি বোঝো?”
_“নাহ।” তাহসিন মুখ ফিরিয়ে নিল।
_“বোঝো তুমি তাহসিন! খুব ভালো করেই বোঝো। আর বুঝেই আমার সঙ্গে এমন করছ।” দীঘি আচমকা তাহসিনকে জড়িয়ে ধরে ধরা গলায় বলল,
_“তাহসিন, আই লাভ ইউ! তুমি কেন আমার সাথে এমন করছ?”
তাহসিন শক্ত হাতে দীঘিকে নিজের থেকে সরিয়ে দিল। কিছুটা রুক্ষ আর পেশাদার গলায় বলল,
_“ম্যাম! আপনি অযথা পাগলামি করছেন। নিজের জায়গাটা একবার দেখুন, আর আমারটাও দেখুন। আমাদের মাঝে কোনো তুলনা হয় না।”
_“চুপ করো তুমি!” দীঘি চিৎকার করে উঠল।
_“আপনি চুপ করুন,” তাহসিনের কণ্ঠস্বর এবার কঠিন শোনাল, _“আপনি যদি আমার সাথে এরপরও এমন আচরণ করেন, তবে আমি পুরো বিষয়টা নূরজাহান ম্যাডামকে বলতে বাধ্য হব।”
বাবার হাত ধরে ঝিলমিল কলেজের আঙিনায় পা রাখতেই আলতাফ চৌধুরী তাকে নিয়ে সরাসরি চলে গেলেন প্রিন্সিপালের কক্ষে। আলতাফ সাহেবকে দেখা মাত্রই প্রিন্সিপাল চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে বেশ উষ্ণভাবে হাত মেলালেন; কারণ তাঁদের পূর্বপরিচয়টা বেশ ভালো। পিয়নের কাছে চায়ের অর্ডার দিয়ে তাঁরা কিছুক্ষণ ঝিলমিলের ভর্তি সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করলেন। এরপর প্রিন্সিপাল নিজেই তাঁদের একাদশ শ্রেণির ভর্তির দায়িত্বে থাকা শিক্ষকের রুমে পাঠিয়ে দিলেন।
করিডোর ধরে বাবার হাত ধরে হাঁটার সময় মেয়েটার চোখে-মুখে ছিল তুমুল উচ্ছ্বাস। সে উৎসুক দৃষ্টিতে চারপাশ দেখছিল, আর কাউকে খুঁজছিল। এই কলেজেরই ভার্সিটি সেকশনে পড়ে জারিফ।
মূলত ওর কাছাকাছি থাকার ইচ্ছা থেকেই ঝিলমিল এখানে ভর্তি হতে চেয়েছে। কিন্তু পুরো ক্যাম্পাসের কোথাও জারিফের দেখা মিলল না।
হাঁটতে হাঁটতে একসময় তারা সেই নির্দিষ্ট কক্ষে এসে পৌঁছাল, যেখানে নতুন শিক্ষার্থীদের ভর্তির কাজ চলছে। সেখানে তখন উপচে পড়া ভিড়। ভিড় ঠেলে সামনে যেতেই আলতাফ সাহেব আর ঝিলমিল দুজনেই যেন আকাশ থেকে টুপ করে পড়ল! কারণ, শিক্ষকের আসনে যিনি গম্ভীর হয়ে বসে আছেন, তিনি আর কেউ নন, মেহরাজের বন্ধু অর্থাৎ তাদের পাশের বাড়ির ছেলে, বারিশ!
কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব? ছেলেটার চোখে চশমা। আর চুলের স্টাইলও বারিশের এমন না যেমনটা এই স্যারের। স্যারের চুল গুলো পেছনের দিকে সেট করে রাখা
বাবা-মেয়ে একে অপরের দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর আবারও চোখ ফেরাল সেই ব্যস্ত যুবকের দিকে। চোখে চশমা এঁটে অত্যন্ত মনোযোগের সাথে সে অভিভাবকদের ফর্ম দেখছে আর শিক্ষার্থীদের ভর্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছে।
কিছুক্ষণ পর ভিড় কিছুটা হালকা হতেই আলতাফ সাহেব ঝিলমিলকে নিয়ে শিক্ষকের টেবিলের সামনের চেয়ার দুটোয় বসলেন। ঝিলমিল একদৃষ্টিতে সেই মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই আসন গ্রহণ করল।
আলতাফ চৌধুরী টেবিলের ওপাশে বসা যুবকের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন,
_“আপনি দেখতে হুবহু আমাদের পাশের বাড়ির বারিশের মতো। মানে, চোখে চশমাটা না থাকলে পুরো ওই অসভ্য ছেলেটার কপিপেস্ট মনে হতো আপনাকে!”
_“তাই নাকি? অসভ্য?” চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে শিক্ষক বেশ কৌতূহল দেখালেন,
_“তা কী কী অসভ্যতামো করে সে?”
_“আরে সে এক চরম অভদ্র! আপনাকে আর কী বলব, একেবারেই বেয়াদব একটা ছেলে।” আলতাফ চৌধুরী যেন মনের ক্ষোভ উগরে দিলেন।
বাবার সুরে সুর মিলিয়ে ঝিলমিলও চট করে যোগ করল,
_ “হ্যাঁ স্যার, বাবা একদম ঠিক বলেছে। লোকটা আমার চাচ্চুর বন্ধু। ভীষণ বাজে ব্যবহার তার। দেখলেই আমার মেজাজ গরম হয়ে যায়। আসলেই একটা আস্ত অসভ্য!”
_“থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ! ওই অসভ্য ছেলেটাই আমি।” স্যার চশমা খুলতে খুলতে বলল। সাথে এতক্ষণ পেছনের দিকে টেনে রাখা চুলগুলো হাত দিয়ে সামনে আনতেই বারিশের অতি পরিচিত অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। তড়িৎ গতিতে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন আলতাফ সাহেব। আর ঝিলমিল ভয়ার্ত একটা মৃদু চিৎকার দিয়ে উঠল; ওর ফর্সা মুখাবয়ব আতঙ্কে লাল হয়ে গেল।
আলতাফ চৌধুরীকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে বারিশও ভদ্রলোকের মতো আসন ছেড়ে দাঁড়াল। হ্যান্ডশেক করার জন্য বাম হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
_“দাঁড়িয়ে পড়লেন কেন? বসুন। আসলে হুট করেই চাকরিটা হয়ে গেল, তাই আগেভাগে জানাতে পারিনি। তবে চিন্তা করবেন না, আজ সন্ধ্যায় বাসায় ফিরেই আপনাদের ওখানে গিয়ে মিষ্টি বিতরণ করে আসব।”
আলতাফ চৌধুরী স্তব্ধ হয়ে বারিশের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কত বড় বেয়াদব হলে হ্যান্ডশেক করার জন্য বাঁ হাত এগিয়ে দেয়! ভদ্রলোকের সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অনুসরণ করে বারিশ নিজের হাতের দিকে তাকাল, তারপর জিহ্বা কেটে বলল,
_“ওহ সরি, সরি!”
এবার সে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল। কিন্তু আলতাফ চৌধুরী যেই হাত মেলাতে নিজের হাতটা বাড়ালেন, বারিশ বিদ্যুৎগতিতে হাতটা টেনে নিয়ে বলল,
_“থাক, বাদ দিন। আপনার হাতে জীবাণু থাকতে পারে।”
অপমানে আলতাফ চৌধুরীর চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠল। বারিশ অবশ্য সেদিকে পাত্তা না দিয়ে মুখে হাসি ঝুলিয়ে বলল,
_“আরে বসুন না!”
আলতাফ চৌধুরী আর এক মুহূর্ত সেখানে থাকতে চাইলেন না। তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বললেন,
_“মামুনি!”
_“জি আব্বু?”
_“চলো এখান থেকে। আমি তোমাকে এর চেয়েও অনেক ভালো কলেজে ভর্তি করাব।”
_“নাহ আব্বু, অসম্ভব! আমি এখানেই ভর্তি হব,” ঝিলমিল একরোখা গলায় বলল।
_“কথা শোনো ঝিলমিল!”
_“এখানে কী সমস্যা আব্বু? এখন তো আরও ভালো হলো, আমার চাচ্চু আছেন এখানে। তাই না চাচ্চু?” শেষের অংশটুকু ঝিলমিল বেশ সংকোচ আর জড়তা নিয়ে বলল, কারণ মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগেই এই লোকটার নামে এক গাদা বদনাম সে নিজের মুখে করেছে।
বারিশ বাঁকা হেসে কন্ঠ নামিয়ে জবাব দিল,
শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৭
_ “একদম ঠিক বলেছ মামুনি। তবে আমার ব্যবহার নিয়ে ভেবো না, এখানে সেটা আরও দ্বিগুণ খারাপ হবে।”
ঝিলমিল ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলল,
_“হিহিহি, কোনো সমস্যা নেই চাচ্চু। আমি মানিয়ে নেব।”
বারিশ ফর্মটা হাতে নিয়ে কলম ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
_“দেখা যাক।”
