Home শুকনো পাতার নূপুর পায়ে শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৫

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৫

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৫
আয়েশা শেখ

_“বারিশ! বলবি তো কী হয়েছে! এমন পাগলামি কেন করছিস?”
আকাশ আবারও বারিশকে ডাকল। বারিশ এবার একপলক ওর দিকে তাকিয়ে ঘুরল পেছনে। ওর চোখ দুটো সোজা গিয়ে ঠেকল স্টেজে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের স্ত্রীর ওপর। মেয়েটাও স্তব্ধ হয়ে বড় বড় চোখে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। বারিশের নজর গেল এবার ঝিলমিলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আলতাফ চৌধুরীর দিকে। তার ভেতরে আবারও রাগ চিলিক দিয়ে উঠল। খটকা লাগল নিজের মনে! আলতাফ চৌধুরীর মেয়ের জন্য কি ও একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করে ফেলছে? বারিশ পরক্ষণেই আবার ঝিলমিলের দিকে তাকাল। মেয়েটা তো এখন অন্য কেউ নয়, ও বারিশের নিজের স্ত্রী! নিজের বিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে কোনো এমন নোংরা কথা বলবে, আর বারিশ শেহরিয়ার তা মুখ বুজে শুনে দাঁড়িয়ে থাকবে? অসম্ভব! যা করেছে ঠিক করেছে।
ঝর্ণা বেগম হন্তদন্ত হয়ে বারিশের পাশ ঘেঁষে এসে দাঁড়ালেন। ছেলের এমন কাণ্ডে তিনি যেমন ক্ষুব্ধ, তেমনই লজ্জিত। কড়া গলায় বললেন,

_“জারিফ কী এমন অন্যায় করেছে যে ওকে সবার সামনে এভাবে মারতে হলো?”
বারিশ মায়ের কথার কোনো উত্তর দিল না। তার চোখ এখনো ঝিলমিলের দিকেই আটকে আছে। ভারী লেহেঙ্গা আর গহনার জাঁকজমকে আজ মেয়েটাকে একদমই চেনা যাচ্ছে না। একটুও বাচ্চা বাচ্চা আর খামখেয়ালি দেখাচ্ছে না।
ছেলের কোনো সাড়া না পেয়ে ঝর্ণা বেগম আবারও ডেকে উঠলেন,
_“তরঙ্গ! কিছু জিজ্ঞেস করছি তোমায়! উত্তর দাও!”
চোখ ফিরিয়ে মায়ের দিকে তাকাল বারিশ। ওর চোয়াল এখনো শক্ত। অত্যন্ত শীতল গলায় খুব সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলো,
_ “অন্যায় করেছে, তাই মেরেছি।”
_“আমিও তো সেটাই জানতে চাইছি, ও ঠিক কী করেছে?” ঝর্ণা বেগম পিছু ছাড়লেন না।
_“তুমি আমার কাছে কৈফিয়ত চেও না আম্মা! আমি অন্তত এই বিষয়ে কাউকে কোনো জবাবদিহি করতে পারব না,” অবাধ্য স্বরে বলল বারিশ।
কথাটা শেষ করেই সে ধীরস্থির পায়ে হেঁটে আবারও স্টেজের দিকে চলে এলো। নিজের ভেতরের সবটুকু ঝড় আড়াল করে ফেলল সে। একদম স্বাভাবিক, শান্ত ও ভদ্র মুখ করে আমন্ত্রিত মেহমানদের সাথে এমনভাবে কথা বলা শুরু করে দিল, যেন একটু আগে এখানে কিচ্ছু ঘটেনি!
নূরজাহান চৌধুরী বারিশের দিকে একটু এগিয়ে এসে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,

_“ হঠাৎ কী হয়েছে বারিশ?”
বারিশ মেহমানদের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে একটা আনুষ্ঠানিক মৃদু হাসি বজায় রেখেই দাদী শাশুড়ীর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে একদম মৃদু আওয়াজে বলল,
_“এটা নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন না করলেই খুশি হবো, দাদীমা।”
নূরজাহান চৌধুরী আর কথা বাড়ালেন না। ঝিলমিলের কোলে থাকা তিন বছরের জিহান বারিশকে স্টেজে আসতে দেখেই খিলখিল করে হাঁসছে। ছোট্ট দুটো হাত বাড়িয়ে বারিশের দিকে প্রায় ঝুঁকে পড়ে আধো-আধো গলায় বলল,
_“বালিশ চাচুউউ, কোলে নেও!”
​মুহূর্তের মধ্যে স্টেজের ওপর উপস্থিত সবাই পুরো থতমত খেয়ে গেল। ঝিলমিল নিজেও বড় বড় চোখ করে তটস্থ হয়ে বারিশের প্রতিক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। ​অবশ্য বাচ্চাটার আর কী দোষ! বারিশ আর আকাশ বিদেশ থেকে ফেরার পর চৌধুরী বাড়িতে বারিশ যতবার গিয়েছে, বাড়ির বড়রা তো ওকে এই বলেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। আকাশের সাথে সাথে বারিশও জিহানের চাচ্চু। তাই দুজনকে একই পাল্লায় মাপে সে। তবে বাকিরা থতমত খেলেও এই কাণ্ডে আলতাফ চৌধুরী মনে মনে বেশ আনন্দ পেলেন। বারিশকে ছোট করার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলেন না তিনি। ​বারিশ আড়চোখে আলতাফ চৌধুরীর সেই মিটিমিটি হাসির দিকে তাকিয়ে নিজের মুখটা আরও গম্ভীর করে ফেলল। তারপর আবার জিহানের দিকে তাকিয়ে নিজের রাগ সামলানোর চেষ্টা করল। ঝিলমিলের কোল থেকে জিহানকে নিজের পেশিবহুল দুই বাহুতে তুলে নিতে নিতে ও বেশ কড়া গলায় বলল,

_ “চাচ্চু নয় জিহান, ভাইয়া বলো। দুলাভাই!”
​বারিশের সুর মিলিয়ে পাশ থেকে আকাশ আর নূরজাহান বেগমও জিহানকে শুধরে দিয়ে বললেন,
_“হ্যাঁ দাদুভাই, উনি এখন তোমার দুলাভাই হন। ভাইয়া ডাকো।”
​কিন্তু জিহান তো সেই বান্দা নয়! সে নিজের গোল গোল চোখ নাচিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
_ “না চাচু। বালিশ চাচু।”
​সুযোগ বুঝে আলতাফ চৌধুরী এবার ফোড়ন কাটলেন। বেশ চওড়া এক চিলতে হাসি মুখে ঝুলিয়ে বললেন,
_ “হ্যাঁ হ্যাঁ বাবা! ও তোমার চাচ্চুই হয়। চাচ্চুই ডাকবে তুমি। চাইলে কাকা বলেও ডাকতে পারো!”
​ফুলে উঠলো বারিশের কপালের রগ! সে ভ্রু কুঁচকে ক্ষ্যাপা চোখে আলতাফ চৌধুরীর দিকে তাকাল। শ্বশুর-জামাইয়ের সেই নীরব যুদ্ধ চলতে চলতেই বারিশ আলতাফ চৌধুরীর চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে থেকে জিহানের উদ্দেশ্যে কামড়ে কামড়ে বলল,
_“ ভাইয়া বলবে আমাকে। মনে থাকবে?”
​জিহান বারিশের রাগ বা গম্ভীর মুখের তোয়াক্কাই করল না। সে উল্টো খুব আয়েশ করে বারিশের গলা জড়িয়ে ধরল এবং তার কোটের কলারটা নিজের ছোট ছোট আঙুল দিয়ে খামচে ধরে আহ্লাদী গলায় বলল,
_ “চাচু, আমাল বালিশ চাচু!”

​পরিস্থিতি দেখে ঝিলমিল এবার আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে ঠোঁট টিপে হাসতে লাগল। আর এদিকে আলতাফ চৌধুরীরও খুশি তখন দেখে কে! ওনার বুক গর্বে ১০ ইঞ্চি ফুলে গেছে যেন! ​বারিশ এবার জিহানকে নিয়ে স্টেজ থেকে সামান্য একটু চিপায়, মেহমানদের চোখের আড়ালে সরে গেল। বাচ্চার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
_“এই শালার ঘরের শালা! ভাই বলবি আমাকে, ভাই! আর একবার চাচ্চু বললে ধরে এখনই মুসলমানি করিয়ে দেব!”
​জিহান একটুও না দমে, উল্টো খুব উৎসাহ নিয়ে চোখের পাতা পিটপিট করে বলল,
_ “দাও।”
​বারিশ বিরক্ত হয়ে চোখ বড় বড় করে বলল,
_“কী দেব, হ্যাঁ?”
ছোট্ট ​জিহান বেশ সহজ-সরল গলায় বলল,

_“মুচলমানি।”
_“ ত্যাঁদর একটা!”
_“ কাকে ত্যাঁদর বলছো? আমার ছেলেকে কোণায় নিয়ে এসে শিশু নির্যাতন করা হচ্ছে?”
_“ নির্যাতনের কী দেখলেন? আসল নির্যাতন তো এখনো শুরুই হয়নি!”
_“ অভদ্র ছেলে! দূরে থাকবে তুমি আমার মেয়ের থেকে।”
_“ কাছে গেলে কী করবেন আপনি?”
_​“কী করব মানে? আমার মেয়ে এখনো নাবালিকা! পুলিশ নিয়ে এসে তারপর মেয়েকে বাড়ি নিয়ে যাবো।”
_​“নিয়ে আসুন। জাতি জানে আপনার পরিবার আমার কাছে জোর করে ওকে বিয়ে দিয়েছে। পুলিশ আবার আমাকে না নিয়ে আপনাদেরই না ধরে নিয়ে যায়!”
_“ হুমকি দিচ্ছো তুমি আমায়!”
_“ ​আপনি আমার ছোটবেলার স্যার! তার ওপর আবার আমার একমাত্র শ্বশুরমশাই! আপনাকে এভাবে হুমকি দেওয়া কি আমার সাজে বলুন? এত বড় বেয়াদব তো আমি নই, স্যার।”
বারিশের এমন গা জ্বালানো কথায় রাগে জ্বলে উঠলেন আলতাফ চৌধুরী।
_“ ফোর-টুয়েন্টি(420)কোথাকার! তিনমাস, জাস্ট তিনটা মাস যেতে দাও। আমি আমার মেয়েকে কিছুতেই তোমার মতো ফোর-টুয়েন্টির সাথে সংসার করতে দেব না।”
আলতাফ চৌধুরীর এমন হুঁশিয়ারিতেও বারিশের চেহারার এক চুলও নড়চড় হলো না। সে ঠোঁটে শয়তানি হাসি ফুটিয়ে বলল,

_ “তাই নাকি স্যার? আচ্ছা, ওই দেখুন দূরে কেমন ধামাকা গান বাজছে… শুনতে পাচ্ছেন?”
বারিশ সাউন্ড স্পিকার থেকে ভেসে আসা গানের চড়া বিটের দিকে ইঙ্গিত করল। এবং আলতাফ চৌধুরীর মুখের ওপর তাকিয়ে নিজের কাঁধ নাচিয়ে রীতিমতো গানের লাইনের সাথে তাল মিলিয়ে একটু সুর করে আউড়ে উঠল,
​“—জামাই আমি হিট!
সবার সাথে ফিট!
বলবে সবাই ছকবাজিতে, জামাই ৪২০…”
​গানটার শেষের লাইনটা বেশ মজা নিয়ে উচ্চারণ করার পর বারিশের মুখের সেই চপলতা নিমেষেই গায়েব হয়ে গেল। চোখের দৃষ্টিতে ফিরে এলো শেহরিয়ার বংশের সেই চেনা অহংকার আর ধারালো ভাব। আলতাফ চৌধুরীর চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং গলায় ও যোগ করল,
_​“দেখা যাক স্যার, শেষ পর্যন্ত কে জেতে… এই হিট জামাই, নাকি তার রেসপেক্টেড শ্বশুর! ওকে? এবার চুপচাপ খাবার দাবার খেয়ে, বায়াস গিয়ে রেস্ট করুন। আমি একটু বউয়ের কাছে যাই…”
বারিশ জিহানকে কোলে নিয়েই স্টেজে ঝিলমিলের পাশে এসে বসল। ওদিকে ঝিলমিল মনের সুখে লাউডস্পিকারে বাজতে থাকা গানটা উপভোগ করছে। গানের তালে তাল মিলিয়ে সে নিজের ওড়নার খুঁট আঙুলে জড়াতে জড়াতে ফিসফিস করে গাইছে,

​ —দুষ্ট ছেলে জামাই সেজে, দেখে আমায় উঁকি দিয়ে,
দেখি তোমায় লাজুক চোখে, আছো তুমি এমন জুড়ে…”
​গানটা গাইতে গাইতেই ঝিলমিলের ঠোঁটে মিষ্টি, আনমনা হাসি ফুটে উঠেছল। অবচেতন মনেই সে পাশে বসা লোকটার দিকে তাকাল। ​আর তাকাতেই বুকের ভেতরের সবটুকু রোমান্টিক অনুভূতি ভ্যানিশ হয়ে গেল! ​হাসিটা ঠোঁটেই জমে পাথর। চোখের সামনে বসে থাকা লোকটা বারিশ! বারিশ চাচ্চু! এটাকে সে কীভাবে জামাই ভাববে! কান্না পায় ঝিলমিলের। এত এত ফ্রেন্ড তার অথচ ইরান ছাড়া কেউ নেই। কত শত রঙিন স্বপ্ন ছিল তার নিজের বিয়ে নিয়ে। নাচবে, গাইবে, বান্ধবীদের নিয়ে হুল্লোড় করবে। অথচ জীবনের সবচেয়ে স্পেশাল দিনে সে কি না একটা হিটলারের পাশে পুতুলের মতো সেজে বসে আছে! ঝিলমিলের ইচ্ছে করল এখনই এই সব ছুড়ে ফেলে দিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠতে। সব ওই জিরাফের জন্য। নাহলে সে জীবনেও দাদীমার কথায় রাজি হতো না।
​ঝর্ণা বেগম নূরজাহান চৌধুরীর কাছে এসে দাঁড়ালেন। যে মানুষটাকে এতদিন আপা বলে ডেকে এসেছেন, আজ তাকে অন্য কোনো সম্পর্কে ডাকতে গিয়েও ওনার গলা আটকাচ্ছে। ভেতরের চাপা ক্ষোভ উগরে দিয়ে ঝর্ণা বেগম বললেন,

_“তুমি কীভাবে এমন একটা কাজ করতে পারলে?”
​নূরজাহান চৌধুরী নিজের শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বললেন,
_“কী করেছি আমি?”
_​“আমি তোমার মেয়েকে চেয়েছিলাম! নাতনিকে নয়! কোথায় আমার ছেলের বউ হওয়ার কথা ছিল তোমার ম্যাচিউর মেয়েটার, আর তুমি তার জায়গায় বসিয়ে দিলে এইটুকু একটা বাচ্চাকে?”
​নূরজাহান চৌধুরী বললেন,
_“তখন ওই পরিস্থিতিতে চৌধুরী বংশের সম্মান রক্ষা করাই আমাদের একমাত্র কাজ ছিল। বিয়ে ভাঙলে আমাদের সাথে সাথে শেহরিয়ারদের মুখও পুড়ত, তা তো তুমি ভালো করেই জানো।”
_​“তাই বলে তুমি পুরো সম্পর্কটাই এভাবে ওলটপালট করে দেবে? বছরের পর বছর ধরে যে প্রতিবেশীসুলভ একটা সুন্দর সম্পর্ক আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে রয়েছে, তা এক পলকেই তুমি এভাবে বদলে ফেললে! এখন তো আমি তোমাকে ঠিকমতো ডাকতেও পারছি না! কী বলে ডাকব তোমায়!”
​নূরজাহান চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।

_ “এসব ঘেঁটে এখন আর কোনো লাভ নেই। যা হওয়ার তা হয়ে গেছে।”
_​“কিচ্ছু হয়ে যায়নি! আমি এই বিয়ে, এই গোঁজামিল দেওয়া সম্পর্ক মোটেও মানি না। এই বিয়ের অনুষ্ঠান মিটতে দাও, আমি খুব দ্রুত ওদের ডিভোর্সের ব্যবস্থা করব। আমার ছেলেকে এই খামখেয়ালি মেয়ের সাথে সংসার করতে দেব না আমি।”
​নূরজাহান চৌধুরীর ঠোঁটের কোণে একটু রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। তিনি বারিশের জেদি আর একরোখা স্বভাবটা খুব ভালো করেই লক্ষ্য করেছেন। তিনি ঝর্ণা বেগমের চোখের দিকে তাকিয়ে সোজাসুজি বললেন,
_​“ডিভোর্স করাবে? বেশ তো, করাও! আমার নাতনিকে নিয়ে ভেবো না, আগে নিজের ছেলেকে মানাও। তোমার ছেলে যদি এই ডিভোর্সে রাজি হয়, তবে করিও ডিভোর্স!”
রিসেপশনের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে ঝিলমিল চেয়েছিল অন্তত একদিনের জন্য হলেও নিজের বাড়ি যেতে, কিন্তু বারিশ তাতে কোনোভাবেই রাজি হয়নি। একই সাথে নূরজাহান চৌধুরীও ঝিলমিলকে চৌধুরী বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। বিয়েটা এমনিতেই একটা বড় ঝামেলার মধ্য দিয়ে হয়েছে, তাই এই মুহূর্তে নাতনিকে আবার বাপের বাড়ি ফিরিয়ে আনা তিনি মোটেও ঠিক মনে করেননি। ওখানেই ওর থাকা উচিত বলে তিনি সিদ্ধান্ত নেন। শেষ পর্যন্ত তারা ঝিলমিলকে শেহরিয়ার ভিলাতেই রেখে, তারা নিজেদের বাড়িতে চলে যায়।

_“আমি বুঝতে পারছি না, আপনি মনে হয় খুব সহজেই এই বিয়ে মেনে নিচ্ছেন! আপনি তো রাজিই ছিলেন না!”
রুমে পা দিতেই ঝিলমিল নিজের ভেতরে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা নিয়ে বারিশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিল। বারিশ তখন কোটের বোতাম খুলছিল।
বারিশ হাত থামিয়ে অত্যন্ত শান্ত চোখে ওর দিকে তাকাল। বলল,
_“না মানার কিছু নেই। আর তুমি তো সব মেনে নিয়েই বিয়ে করেছ। আগে থেকেই পছন্দ করতে নাকি আমায়?”
ঝিলমিল তড়িৎ গতিতে মুখ কুঁচকে, তীব্র অসম্মতি জানিয়ে বলল, _“প্রশ্নই আসে না! আমি তো… আমি জারিফকে জ্বালানোর জন্য রাজি হয়েছি।”
_​“কী বললে?” বারিশের চোখের চাউনি এক পলকে উধাও হয়ে গেল।
​জিভ কাটল মেয়েটা। আমতা-আমতা করে বলল,
_“না.. না মানে…”
​বারিশ ওর দিকে এক কদম করে এগোতে এগোতে বলল,
_“বলো, আমায় বিয়ে করতে এত সহজে কেন রাজি হলে?”
_​“কেন আবার? দাদীমার আদেশ ছিল!” বারিশকে এত কাছে আসতে দেখে ঝিলমিল ঘাবড়ে গিয়ে পেছাতে লাগল।

_​“তুমি যে কত বাধ্য মেয়ে, তা আমার খুব ভালোভাবেই জানা আছে,” ওর প্রতিটা পদক্ষেপের সাথে দূরত্ব কমিয়ে আনল বারিশ, _“বলো, কেন রাজি হলে?”
​ঝিলমিল পেছাতে পেছাতে একপর্যায়ে ধপ করে গিয়ে আটকাল বিছানার পাশে। কিন্তু বারিশের এগিয়ে আসা থামল না। সে ঝিলমিলের ওপর সামান্য ঝুঁকে আসতেই ঝিলমিল আরও পিছিয়ে গেল, যতক্ষণ না বিছানার কাঠের চওড়া হেডবোর্ডের সাথে ওর পিঠ একদম ঠেকে গেল। আর পেছনে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই! লোকটার শরীরের পুরুষালী পারফিউমের সুবাস আর ওর এত ঘনিষ্ঠ উপস্থিতি ঝিলমিলের ভেতরে অস্বস্তি আর দমবন্ধ করা অনুভূতি তৈরি করল। সে নিজেকে অস্বস্তি থেকে বাঁচাতে নিজের নরম দুটো হাত বাড়িয়ে বারিশের চওড়া বুকে হালকা ধাক্কা মারার চেষ্টা করে মরিয়া হয়ে বলতে চাইল,
_“চাচ্চু, বিশ্বাস করুন…”
​কিন্তু কথাটা শেষ হওয়ার আগেই বারিশ খপ করে ওর দুটো হাত একসাথে নিজের এক হাতের মুঠোয় বন্দী করে ফেলে। মেয়েটা চমকে উঠে ওর দিকে তাকাতেই বারিশের সেই ধারালো, গভীর চোখ দুটো খুব নিবিড়ভাবে দেখল ঝিলমিলের কাজল মাখানো ডাগর চোখ, নাক, কাঁপতে থাকা লাল ঠোঁট আর গহনায় মোড়ানো ফর্সা গলা। বিয়ের লেহেঙ্গায় জড়ানো এখনো।
সে ঝিলমিলের চোখে চোখ রেখে অত্যন্ত মৃদু আওয়াজে বলল,
_“হুশশ! এই মুখে আর একটা বার চাচ্চু ডাক শুনলে, তোমার বাচ্চার বাবা হওয়ার প্রসেস খুব শীঘ্রই শুরু করব আমি।”
​তীরের মতো গিয়ে বিঁধল ঝিলমিলের বুকে। লজ্জায়, ভয়ে আর এক অদ্ভুত শিহরণে ওর বুক আর পেট একসাথে মোচড় দিয়ে উঠল। ও জীবনেও ভাবেনি মানুষটার মুখ থেকে এমন কোনো কথা ও শুনবে! সে নিজের স্বামীর সেই নেশাক্ত ও অনমনীয় চোখের দিকে তাকিয়ে অবচেতনেই লজ্জায় চোখ সরিয়ে বিড়বিড় করল,

_“এগুলো কেমন কথা, ছিঃ! আপনি আমার…”
_​“হাজবেন্ড! আমি তোমার হাজবেন্ড!” ঝিলমিল মুখ ফসকে উল্টাপাল্টা কিছু একটা বলে ফেলার আগেই বারিশ ওর চোয়ালটা আলতো করে চেপে ধরে শব্দটা শুধরে দিল।
​মেয়েটা আর একটা শব্দও উচ্চারণ করার সাহস পেল না। সে স্তব্ধ হয়ে, বড় বড় চোখে চুপচাপ লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল। বারিশ ওর চোখের দিকে চেয়ে শেষবারের মতো করে বলল,
_“আমাকে খারাপ হতে বাধ্য করো না। মাথায় থাকবে কী বলেছি?”
​ঝিলমিল কোনোমতে ছোট্ট করে ওপর-নিচ মাথা নাড়াল। পরক্ষনেই
​বারিশ ওর হাত দুটো ছেড়ে দিল। এক ঝটকায় নিজেকে সরিয়ে নিয়ে সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, _“যাও, একটা কাগজ আর পেন নিয়ে আসো। কাল থেকে তোমার রুটিন লিখে দেই।”
_“কীসের রুটিন?”​নিজের হাত দুটো ডলতে ডলতে অবাক হয়ে তাকাল।
​বারিশ ড্রেসিং টেবিলের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে গম্ভীর গলায় বলল,
_ “নিয়ে আসো আগে।”

ঝিলমিল রুমের এক কোণ থেকে কাগজ আর কলম এনে দিতেই বারিশ ড্রেসিং টেবিলের সামনের চেয়ারটায় গিয়ে বসল। কোনো কথা না বলে সে গভীর মনোযোগ দিয়ে লিখতে শুরু করল। প্রায় দশটা মিনিট কেটে গেল। ততক্ষণে ঝিলমিল ওয়াশরুম থেকে কাপড় পাল্টে বের হয়ে এসেছে। ও বের হতেই বারিশ হাতের কলমটা থামাল। কাগজটা ঝিলমিলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে একদম সটান গলায় বলল,
_​“কাল সকাল থেকে এই রুটিনটা অক্ষরে অক্ষরে ফলো করবে। এখন ঘুমিয়ে পড়ো।”
​ঝিলমিল বেশ দ্বিধা আর সংশয় নিয়ে কাগজটা হাতে নিল। কৌতূহল সামলাতে না পেরে ও মনোযোগ দিয়ে পড়া শুরু করল। আর যত এগোতে লাগল, ওর চোখ দুটো বিস্ময়ে তত বড় বড় হতে লাগল, ঠোঁট দুটো আপনাআপনি হাঁ হয়ে গেল! শকড হয়ে সে ধপ করে বিছানার ওপর বসে পড়ল। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে না পেরে ও প্রথম থেকে আবার রিডিং পড়তে লাগল। কাগজে অত্যন্ত স্পষ্ট অক্ষরে লেখা—
​ডেইলি রুটিন ও ডিসিপ্লিন চার্ট:

★​০৪:০০ AM – ০৪:৪৫ AM: ঘুম থেকে ওঠা, ফ্রেশ হওয়া এবং ফজরের নামাজ আদায়।
★​০৪:৪৫ AM – ০৭:০০ AM: কলেজের সিলেবাস অনুযায়ী সকালের পড়া শেষ করা (কোনো ফাঁকিবাজি চলবে না)
★​০৭:০০ AM – ০৮:০০ AM: রান্নাঘরে গিয়ে শুধুমাত্র বারিশের পছন্দ অনুযায়ী সকালের নাস্তা তৈরি ও পরিবেশন।
★​০৮:০০ AM – ০৮:৪৫ AM: নাস্তা শেষ করে কলেজের জন্য রেডি হওয়া।
★​০৮:৪৫ AM: বারিশের সাথে একসাথে গাড়িতে করে কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা।
★​০২:৩০ PM – ০৩:৩০ PM: কলেজ থেকে ফেরা। চেঞ্জ করে বারিশের ব্যবহৃত কলেজের পোশাক নিজ হাতে পরিষ্কার করা (ওয়াশিং মেশিন ব্যবহার নিষেধ)।
★​০৩:৩০ PM – ০৪:৩০ PM: বারিশের জন্য দুপুরের লাঞ্চ স্পেশালভাবে তৈরি করা।
★​০৪:৩০ PM – ০৬:০০ PM: বিকেলে বারিশের কাছে উপস্থিত হয়ে কলেজের পড়া রিভিশন দেওয়া ও পড়া ধরা।
★​০৬:০০ PM – ০৭:০০ PM: মাগরিবের নামাজ ও বারিশের জন্য বিকেলের হালকা নাস্তা/চা তৈরি।
★​০৭:০০ PM – ১০:০০ PM: বারিশের দেওয়া সমস্ত হোমওয়ার্ক ও অ্যাসাইনমেন্ট কমপ্লিট করা।
★​১০:০০ PM: রাতের খাবার বানিয়ে, খাবার খেয়ে সোজা বিছানায় যাওয়া।
​রুটিনে নিচে আরও কী কী কঠিন নিয়মকানুন লেখা ছিল, তা পড়ার ধৈর্য ঝিলমিলের আর থাকল না। ও রাগে ফুসতে ফুসতে কাগজটা বিছানায় আছাড় মেরে বলল,

_​“মানে কী এসবের? আমি এগুলো করব মানে! আপনার এই বিশাল বাড়িতে রাঁধুনি আছে, শেফ আছে, কাপড় ধোয়ার জন্য ওয়াশিং মেশিন আছে! তাহলে আমি কেন এসব করতে যাব, হ্যাঁ?”
​বারিশ অত্যন্ত নির্লিপ্ত গলায় বলল,
_ “সকালেই তোমাকে বলেছিলাম, আমার এখানে থাকতে হলে আমার সব হুকুম মেনে চলতে হবে। তুমি নিজেও মাথা নেড়ে রাজি হয়েছিলে। এখন যদি এগুলো তোমার নিয়মে না কুলায়, তবে স্পষ্ট করে বলো, আমি এখনই তোমায় তোমার বাপের বাড়ি রেখে আসছি।”
​বারিশের এই আল্টিমেটামে ঝিলমিল একদম দমে গেল! সে তখনো বুঝতে পারেনি ও একটা আস্ত জল্লাদের পাল্লায় পড়েছে, আর তার হুকুমগুলো এমন ভয়ঙ্কর হবে! যে মেয়ে নিজের এক গ্লাস পানি নিজে ঢেলে খায় না, সে নাকি এই জলজ্যান্ত খাম্বার জন্য ভোরবেলা উঠে রান্না করতে যাবে! নিজের একটা ওড়নাও কোনোদিন কাচেনি যে মেয়ে, সে এখন এই লোকের গায়ের ঘামে ভেজা কোট-শার্ট ধোবে? ভাবতেই ওর গা রি রি করে উঠল। ​ঝিলমিল সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে জেদি গলায় বলল,
_ “আমি এগুলোর একটাও পারব না! ব্যস!”
​বারিশের মুখের ভাব এক সেকেন্ডে বদলে গেল। সে এক ঝটকায় দ্রুত এগিয়ে এসে ঝিলমিলের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। টেনে দরজার দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
_ “তবে চলো, এখনই চৌধুরী ভিলাতে রেখে আসছি।”
​বারিশের এই একরোখা জেদ দেখে ঝিলমিল এবার সত্যি ভয় পেয়ে গেল। বাড়ি ফিরে গেলে তো সবশেষ! ও যে কারণে বিয়ে করেছে, যা তার উদ্দেশ্য তার কিছুই হবে না। উল্টো জারিফ আরও হাসবে। বিদ্রুপ করবে! আর দাদীমা তো ওকে ঢুকতেই দেবে না। ঝিলমিল ছিটকে নিজের হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল,

_“না, আমি যাব না!”
_​“তাহলে চুপচাপ যা বলেছি, চোখ-কান বন্ধ করে পালন করো,” বারিশের গলার স্বর বরফের মতো ঠান্ডা।
কান্নায় টৈটুম্বুর হয়ে উঠল ​মেয়েটার চোখ দুটো। কম্পিত গলায় অত্যন্ত অসহায়ভাবে বলল,
_“আপনি কেন আমার সঙ্গে এমন করছেন? আমি কেন এগুলো করব বলুন তো? আমি এগুলোর একটা কাজও পারি না… প্লিজ, পড়ালেখা বাদে বাকি সব রুটিন কেটে দিন!”
​বারিশ ওর এই কান্নাভেজা মুখের দিকে এক পলক তাকাল, কিন্তু তার মনের বিন্দুমাত্র দয়া হলো না। সে নিজের হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,

_ “ঘুমিয়ে পড়ো। কালকে ভোর থেকে অনেক কাজ করতে হবে তোমায়। এনার্জি বাঁচাও।”
​কথাটা শেষ করেই বারিশ বেডসাইড ল্যাম্পের সুইচটা অফ করে দিল। এক নিমেষে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল পুরো রুম। তারপর খাটের একপাশে গিয়ে নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়ল।
​ঝিলমিল সেই অন্ধকারের মাঝেই বিছানায় স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। ওর এক হাতে তখনো সেই রুটিনের কাগজটা ধরা। অন্ধকারের মাঝে কাগজটা দেখা না গেলেও, ওটার প্রতিটা শব্দ ঝিলমিলের মনে হচ্ছিল তার স্বাধীনতার ওপর একেকটা মরণ কামড়!

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৪

সে চাইলে এই মুহূর্তে চলে যেতে পারত। কিন্তু জারিফ তো ওর সাথে অন্যায় করেছে! এভাবে অর্ধেক পথ ছেড়ে চলে গেলে জারিফ ওকে আরও জঘন্য কথা শোনাবে! দু’মাস আগেও তার জীবন কত সুন্দর ছিল! ভাবতেই ওর বুকটা ভেঙে আসছে কান্নায়। তখন না ছিল জারিফের থেকে পাওয়া প্রতারণা, আর না ছিল এই রাবিশ!

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here