Home শুকনো পাতার নূপুর পায়ে শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৩

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৩

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৩
আয়েশা শেখ

_“ আপনি না আমার প্রফেসর! আমি আপনার সাথে একই বিছানায় শুতে পারব না।”
_“ এক বিছানায় শুতে না পারলে, পড়ার টেবিলে গিয়ে পড়তে বসো।” বারিশ নিজের ঘড়িটা টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে অত্যন্ত নির্বিকার মুখে জবাব দিল।
ঝিলমিল কপাল কুঁচকে রাগী চোখে তাকাল বারিশের দিকে। গাল ফুলিয়ে বলল,
_“পড়তে বসব কেন? রাত দুটো বাজে, এটা পড়ার সময়?”
শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে ঘুরে তাকাল যুবক। ভ্রু জোড়া সামান্য উঁচিয়ে বলল,
_“ তাহলে কীসের সময়?”
_​“ঘুমোনোর সময়!” ঝিলমিল জোর দিয়ে বলল।
_​“তাহলে ঘুমাও।”
_​“সেটাই তো বললাম, আপনার সাথে আমি এক বিছানায় শুতে পারব না।” ঝিলমিল আবার নিজের যুক্তিতে ফিরে এলো।

​_“ আমিও তো বললাম, শুতে না পারলে টেবিলে গিয়ে পড়তে বসো।” ​বারিশও ঘুরেফিরে আবার সেই একই কথাতেই আসছে! ঝিলমিলের বিরক্তির মাত্রা ছাড়াল।
ঝিলমিল কিছু না বলে বারিশের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইল। তার চোখ-মুখের অভিব্যক্তিই বলে দিচ্ছিল, মনে মনে সে বারিশকে কতবার চিবিয়ে খেয়েছে!
​লোকটা সেদিকে পাত্তা না দিয়ে, বিছানার চাদরটা টেনে একটু ঠিকঠাক করে আরাম করে শুতে শুতে বলল,
_“ হয় চুপচাপ এসে শুয়ে পড়ো নয়তো গিয়ে পড়তে বসো, আমি ঘুমালাম।”
​ঝিলমিল পা ঠুকে রাগে গজগজ করতে করতে বলল,
_“একটাও করব না আমি! না আপনার পাশে ঘুমাব, আর না পড়তে বসব। আমি মেঝেতে ঘুমাব।”
_ “আমার ঘরের মেঝেতে ইঁদুর দৌড়ায়।”
চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল ঝিলমিলের। আঁতকে উঠে বলল,

_“কিহ!”
_​“হ্যাঁ, একটু পরেই দল বেঁধে আসবে,” বারিশ পাশ ফিরে শোয়ার জন্য কোলবালিশটা টেনে নিতে নিতে বেশ আয়েসি টোনে যোগ করল,
_“ওদের সাথে ঘুমোতে চাইলে মেঝেতে শুয়ে পড়ো। ওরা অনেক ভালো, তোমাকে ঠাকুমার ঝুলি শোনাতে শোনাতে ঘুম পারিয়ে দেবে।”
ইঁদুরের নাম শুনে ঝিলমিল আর এক সেকেন্ডও মেঝেতে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেল না। সে ভয়ে আর ঘেন্নায় এক লাফে ধপাস করে পড়ার টেবিলের ওপর উঠে বসল। তারপর চারপাশে কিছু একটা খুজতে খুজতে টেবিলের ওপর থেকেই চেঁচিয়ে বলল,
_ “আপনার রুমে সোফা নেই কেন?”
​বারিশ চোখ না খুলেই শান্ত গলায় বলল,
_ “ছিল, সরিয়ে ফেলেছি।”
​_“কেন?”
_“এমনি।”
_​“নিয়ে আসুন!” ঝিলমিল হুকুমের সুরে বলল।
_​“পারব না।”

মেয়েটা একটু চুপ থেকে পুরো ঘরে চোখ বোলাল। অন্ধকার মেঝেটার দিকে তাকাতেই তার গা শিউরে উঠল তার। ইশশ! এইসবে সে ভয় যতটা না পায় তার চেয়ে বেশি লাগে ঘেন্না! একবার যদি পায়ের উপর দিয়ে যায় ঘেন্নায় সে পা’টাই কে’টে ফেলবে!
সে এবার নিরুপায় হয়ে বারিশের বলল,
_“ তাহলে আমাকে নামিয়ে বিছানায় নিয়ে যান।”
​বারিশ এবার ঘুরে পেছনের দিকে তাকাল। রুমের আবছা আলোয় সে দেখল, ঝিলমিল পড়ার টেবিলের ওপর গুটিসুটি মেরে পা মুড়ে বসে আছে। দৃশ্যটা দেখে সে যেমন অবাক হলো, তেমনি তার ভেতরে হাসিও পেয়ে গেল। তবে মুখে সেই ভাবটা প্রকাশ করল না।
_“কী হলো নিয়ে যান!” বারিশকে চুপ থাকতে দেখে ঝিলমিল আবারও বলল।
_​“কেন, তোমার পা নেই? হেঁটে আসো।”
_​“না, আমি আর এই মেঝেতে পা রাখব না! ছিঃ! আপনার ঘর এত নোংরা! আমাদের বাসায় কখনো ইঁদুর আসে না।” মুখ বাঁকাল মেয়েটা।
​বারিশ এক হাত মাথার নিচে দিয়ে বালিশে হেলান দিয়ে বলল, _“আমাদেরও আসেনি, কিন্তু আজ থেকে আসবে।”

_​“আপনি কি আমাকে বিছানায় নিয়ে যাবেন?” ঝিলমিল রেগে গিয়ে শেষবারের মতো জানতে চাইল।
_​“না, পারব না। নিজের পায়ে হেঁটে আসো। আর তুমি না বললে আমার পাশে ঘুমাবে না? তো টেবিলেই ঘুমাও!” আবার চোখ বন্ধ করে ফেলল লোকটা।
​ঝিলমিল গলা উঁচিয়ে বলল,
_“আচ্ছা, তাহলে আমি আবারও চিৎকার করছি!”
​ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল বারিশ! বলল,
_“চিৎকার করবে কেন? আমি তোমার সাথে কিছু করেছি?”
_​“হ্যাঁ, এই তো ইঁদুরের ভয় দেখিয়ে টেবিলে ঘুমোতে বলছেন! সবাইকে ডেকে বলে দেব।”বেশ চড়া সুরে হুমকি দিল।
​বারিশ বেগতিক দেখে একটু নরম হয়ে বলল,
_ “আচ্ছা, আসবে না ইঁদুর। ওরা আরও পরে আসবে, তুমি নেমে আসো।”
_​“অসম্ভব! আপনি এসে আমাকে নিয়ে যান।”
_​“আমি কীভাবে নেব?”
_​“কোলে নিবেন!” ঝিলমিল অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, যেন এটাই একমাত্র সমাধান।
_​“পারব না। আমি তোমাকে কোলে নিতে গেলে এখন…” বারিশের বাক্যটা মাঝপথেই আটকে গেল।
_​“এখন কী?” ঝিলমিল জানতে চাইল।

​বারিশ ঝিলমিলের আপাদমস্তক একবার দেখল। এলোমেলো চুলে, এই সাধারণ টিশার্ট আর প্যান্টেও মেয়েটাকে এই আবছা আলোয় অদ্ভুত মায়াবী লাগছে। সে চট করে চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল,
_“কিছু না। আমার থেকে দূরে থাকো।”
_​“দূরেই থাকব, আমাকে শুধু বিছানায় নিয়ে বসিয়ে দিন।”
_​“আরে বাবা, আসবে না ইঁদুর! নেমে আসো তো!” বিরক্ত হলো যুবক।
​মেয়েটা আর কথা বাড়াল না। সে লম্বা শ্বাস নিয়ে পুরো বাড়ি মাথায় তোলার জন্য চিৎকার করে উঠল,
_“চঞ্চল দাদাআআআ….”
​_“এইইইই চুপপপপ!”
​বারিশ এক লাফে বিছানা থেকে নেমে দৌড়ে গেল ঝিলমিলের কাছে। এক হাত দিয়ে শক্ত করে ঝিলমিলের মুখ চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
_ “আয় মা, তুই কোলে আয়! তাও চেঁচাস না!”
মুহূর্তেই বারিশ দুই হাত দিয়ে ঝিলমিলকে পাঁজকোলা করে তুলে নিয়ে তাকে আলতো করে বয়ে নিয়ে এসে বিছানার একদম ওপাশের কোণটায় সাবধানে শুইয়ে দিতে দিতে বলল,
_“ স্যারের পাশে শুতে সমস্যা, কিন্তু স্যারের কোলে উঠতে সমস্যা নেই!”
ঝিলমিল এসব না শোনার ভান করে চাদর দিয়ে নিজেকে পুরোপুরি ঢেকে ঘুমিয়ে পড়ল। ​বারিশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানার নিজের অংশটায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। হাত বাড়িয়ে শেষ আলোটুকু নিভিয়ে দেয়, তার চোখের ঘুম উড়ে গেছে। পাশে শুয়ে থাকা মেয়েটার চাদরে ঢাকা অবয়বটার দিকে তাকিয়ে সে বাকি রাতটুকু এপাশ-ওপাশ করেই কাটিয়ে দিল। শত চেষ্টা করেও সে আর ঘুমাতে পারল না।

_​“দিঘি কোথায়?”
​নূরজাহান চৌধুরী গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্নটি ছুড়ে দিলেন তাঁর ব্যক্তিগত অ্যাসিস্ট্যান্ট তাহসিনকে। ছেলেটা মাত্রই ঘুমিয়ে পড়েছিল, চোখে এখনো ঘুমের রেশ লেগে আছে। এই বিশাল বাড়িতেই তার থাকার ব্যবস্থা।
​তাহসিন আমতা আমতা করে বলল,
_“আমি সত্যিই জানি না আম্মা।”
_​“ গত কয়েকদিন ধরে ওকে আমি তোমার সাথে একটু বেশিই কথা বলতে দেখেছি।” নূরজাহান চৌধুরীর তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া তাহসিনের মুখের ওপর স্থির হলো।
​তাহসিন মাথা নিচু করে চুপ করে রইল। সে আসলেই জানে না দিঘি কোথায় গেছে। আর জানলেও নূরজাহান আম্মার সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যা বলার সাহস বা ইচ্ছা কোনোটাই তার নেই। জানলে সে কখনোই তাঁর থেকে এই কথা লুকাত না।
_ “আমাকে বলো তাহসিন! ও কোথায়?”
​_“জানলে অবশ্যই আমি আপনাকে জানাতাম, আম্মা।” তাহসিন বিনীত কিন্তু দৃঢ় গলায় মাথা নিচু করেই বলল।

​কিছুক্ষণ ঘরের ভেতর ভারী এক নীরবতা বিরাজ করল। নূরজাহান চৌধুরী তাঁর চশমাটা ঠিক করতে করতে একটু চুপ করে তাকিয়ে রইলেন তাহসিনের দিকে। সম্ভবত তাহসিনের সততা যাচাই করে নিলেন। এরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
_ “আচ্ছা যাও। ও যোগাযোগ করলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানাবে।”
_​“জি আম্মা, অবশ্যই জানাব।”
​বলেই তাহসিন উল্টো পায়ে নূরজাহান চৌধুরীর ঘর থেকে বের হয়ে এলো। করিডোর ধরে নিচে নেমে সে নিজের রুমে গিয়ে ঢুকল। দরজাটা আটকে দিয়ে বিছানায় বসার পর সে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনটা অন করে কিছু পুরনো মেসেজের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। এরপর দীর্ঘ একটা শ্বাস টেনে ফোনটা বালিশের পাশে রেখে সে লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে আবারও চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করল।

মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। পুরো বাড়ি নিঝুম, কিন্তু আলতাফ চৌধুরীর চোখে ঘুমের একটু রেশও নেই। তিনি বিছানায় শুয়ে ছটফট করছেন আর বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন।
​তার আর তার স্ত্রী নাজমা বেগমের মাঝখানে শুয়ে আছে তিন বছরের ছোট ছেলে জিহান। গোলগাল ফর্সা মুখটা ফুলিয়ে, একটা হাত বাবার গায়ের ওপর তুলে দিয়ে সে একদম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। স্বামীর এই অস্থিরতায় জিহানের ঘুমের যেন ব্যাঘাত না ঘটে, তাই পাশে শুয়ে থাকা নাজমা বেগম এবার একটু বিরক্ত হলেন।
​নাজমা বেগম উঠে বসে সাবধানে জিহানের গায়ের ওপর থেকে হাতটা সরিয়ে কাঁথাটা টেনে দিলেন। তারপর স্বামীর দিকে তাকিয়ে হালকা ধমকের সুরে জানতে চাইলেন,
_“কী ব্যাপার? এপাশ-ওপাশ করছ কেন? মেয়ের চিন্তায় কি আজ সারা রাত না ঘুমিয়ে কাটাবে? তোমার জন্য এবার ছেলেটার ঘুম ভেঙে যাবে তো!”
​আলতাফ চৌধুরী সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলেন।
​নাজমা বেগম একটু নরম হয়ে বললেন,

_ “এত টেনশন করার কী আছে, বলো তো? বিয়েই তো হয়েছে, কোনো অঘটন তো ঘটেনি। আল্লাহ কপালে রেখেছিলেন, তাই হুট করেই সবকিছু এভাবে হয়ে গেল। এখন এসব চিন্তা বাদ দিয়ে ঘুমাও তো!”
​আলতাফ চৌধুরী এবার ছেলের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে খুব ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে বসলেন। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে চিন্তিত গলায় বললেন,
_“অন্য কারো সঙ্গে বিয়ে হলে আমার এত টেনশন হতো না, নাজমা। তুমি এই ছেলেকে চেনো না।”
_​“চিনব না কেন? তোমার প্রিয় ছাত্র ছিল..”
​নাজমা বেগমকে কথা শেষ করতে না দিয়েই আলতাফ চৌধুরী তিক্তস্বরে বলে উঠলেন,
_ “ও শুধু আমার ছাত্র না, ও আমার নিজের হাতে বড় হয়েছে… আমার সেই স্কুলের ছাত্র! ও যখন স্কুলে ছিল, তখন থেকেই আমার জীবন যৌবন একদম শেষ করে দিয়েছিল। আমি খুব ভালো করে জানি ও ভেতর-বাইরে কেমন। এমনিতে সবার সামনে নিজেকে এমনভাবে দেখাবে যেন ও খুব ভদ্র, সভ্য, দুনিয়ার সবচেয়ে ভালো মানুষ! কিন্তু ও হলো চরম লেভেলের একরোখা একটা ছেলে। ও আমাকে এত জ্বালিয়েছে যে ওর কারণে শিক্ষকতাই ছেড়ে দিয়েছি আমি। আল্লাহ জানে আমার মেয়ে এই ছেলের সাথে কীভাবে থাকবে। আমি খুব শীঘ্রই ওদের ডিভোর্সের ব্যবস্থা করব।”
_“ পাগল হয়ে গেছো? যে পরিস্থিতিতেই হোক, আল্লাহ ওদের এক করেছেন! তুমি এসব কথা আর মুখেও আনবে না।”
_“ তুমি বুঝবে না। ঘুমাও।”

আবছা আলো-আঁধারিতে ঘরটা তখনো আচ্ছন্ন। বারিশের চোখে এমনিতেও ঘুম ছিল না। ঘুম আর আসবেও না তার। সে উঠে বসল।
বিছানা থেকে নেমে এসে পাশে থাকা তরুণীর দিকে তাকাল। মেয়েটা একদম নিঃসাড় হয়ে ঘুমাচ্ছে। ​সে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় ডাকল,
_“ এই মেয়ে, ওঠো।”
​ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই, মানবী তখনো গভীর ঘুমে মগ্ন।
_“ ঝিলমিল!”
বারিশ খানিকটা ইতস্তত করে হাত বাড়িয়ে মেয়েটার ওপরে থাকা পাতলা চাদরটা সরিয়ে দিতে চাইল, কিন্তু পরক্ষণেই কী ভেবে হাতটা গুটিয়ে আনে। মনে এক ধরনের দ্বিধা কাজ করছিল ওর। কিন্তু তখনই তার মনে পড়ে গেল, মেয়েটা এখন আর কেউ নয়, তার বিবাহিতা স্ত্রী! নিজের স্ত্রীর ওপর তো তার পূর্ণ অধিকার আছে। এই ভাবনাটা আসতেই সে নিজের মনকে শক্ত করে এক ঝটকায় চাদরটা সরিয়ে দিল।
চাদরটা সরতেই যুবকের চোখের পলক থমকে গেল, বুকটা কেঁপে উঠল অচেনা স্পন্দনে। ঘুমের ঘোরে ছটফট করায় মেয়েটার টিশার্ট আর প্যান্টটা কিছুটা গুটিয়ে ওপরে উঠে গেছে। রুমের মৃদু আলোয় নিমেষেই দৃশ্যমান হলো মেয়েটার ফর্সা, মসৃণ পেট আর নিটোল হাঁটুর অংশ!

​বারিশ শক্তপোক্ত মানুষ হলেও রক্তমাংসের পুরুষ! না চাইতেও তার চোখ জোড়া সেই অনাবৃত শুভ্র ত্বকের ওপর আটকে রইল। সে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছিল। হৃদপিণ্ডের গতিটা আচমকাই অবাধ্য হতে চাইল তার। গলাটা শুকিয়ে আসল কেমন! বারিশ পরক্ষণেই দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিল সে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে, আর কোনো সুযোগ না দিয়ে ঘুমন্ত ঝিলমিলকে পাঁজকোলা করে তুলে নিয়ে সোজা গিয়ে বসিয়ে দিল পড়ার টেবিলের চেয়ারে!
​ঝিলমিল তখনো ঘুমের অতল সাগরে। চেয়ারে বসানোর সাথে সাথেই সে ভারসাম্য রাখতে না পেরে অজান্তেই টেবিলে মাথা নুইয়ে ফেলল। বারিশ হাত বাড়িয়ে ওর কপালে ধরে মাথাটা টেনে সোজা করে দিয়ে বলল,
_ “সোজা হয়ে বসো।”

​সে হাত সরাতেই ঝিলমিল আবার উঁ করে মাথা নুইয়ে দেয়। বারিশ আবার ওর মাথা সোজা করে দেয়। মেয়েটা চোখ না খুলেই আবার এলিয়ে পড়ল। বারিশ আবারও ঠিক করে দিল। এভাবে চার-পাঁচবার মাথা সোজা আর নোয়ানোর খেলা চলল দুজনের মধ্যে। হুট করেই ঝিলমিলের তন্দ্রাটা ভেঙে গেল। ধড়ফড় করে চমকে উঠে সোজা হয়ে বসে চোখ রগড়াতে রগড়াতে এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিজের অবস্থানটা বোঝার চেষ্টা করল সে। বিছানা ছেড়ে সে আবার এই কাঠে তৈরি শক্ত চেয়ারে কীভাবে এলো? সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার দিকে তাকিয়ে সে অবাক হয়ে বলল,
_“কাল রাতে আমাকে আর বিছানায় নিয়ে যাননি?”
​বারিশ পকেটে হাত গুঁজে নির্বিকার গলায় বলল,
_“মনে করে দেখো।”
​ঝিলমিল একটু ভাবল। হ্যাঁ, চঞ্চল দাদার নাম ধরে যখন চিৎকার দিয়েছিল, তখন তো এই লোকটা তাকে কোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল। সে চুলগুলো ঠিক করতে করতে বলল,
_“হ্যাঁ, নিয়ে গিয়েছিলেন তো। তাহলে আমি এখানে কেন আবার?”
_​“আমি নিয়ে এসেছি।”
_​“ভালো করেছেন, কিন্তু কেন?” ঝিলমিল এখনো ঘুমের ঘোরে ঝিমাচ্ছে, চোখ দুটো ঠিকঠাক খুলতেই পারছে না।

_​“পড়তে বসো।”
​লোকটার বলা এই দুটো মাত্র শব্দ যেন ঝিলমিলের মাথায় বজ্রপাতের মতো ঠেকল! এক সেকেন্ডে তার সমস্ত ঘুম উবে গেল চোখ থেকে। ​বারিশ টেবিলের ওপর আঙুল দিয়ে টোকা মেরে বলল, _“ফ্রেশ হয়ে এসে দ্রুত বই নিয়ে বসো। সকাল বেলার পড়া মাথায় ঢোকে বেশি। এই সময় ব্রেইন ভালো কাজ করে।”
ঝিলমিল একদম আহম্মকের মতো চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। সে টেবিলের ওপর থাকা ছোট ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে আরেক দফা ধাক্কা খেল। ভোর চারটা বাজে! এই মাঝরাতে কেউ কাউকে ঘুম থেকে তুলে পড়তে বসায়? ঝিলমিলের কাছে এটা মাঝরাতই। তার মধ্যে আজকে আরও দেরিতে ঘুমিয়েছে!
​রাগে, দুঃখে মেয়েটার চোখে পানি চলে আসার জোগাড়। বলার মতো কোনো ভাষা খুঁজে না পেয়ে সে বলল,
_“আপনি কি ফুপিকে বিয়ে করলেও এমন করতেন?”
​বারিশ খুব শান্ত গলায় জবাব দিল,
_“ ওটা নিয়ে ভাবিনি।”
_​“তাহলে আমার সাথে কেন এমন করছেন?”
_“ কেমন করছি, সেটা না ভেবে চুপচাপ ফ্রেশ হয়ে বই খোলো, নয়তো আমি কী করতে পারি। সেটা প্রমাণ করতে বাধ্য কোরো না। কাল রাতের থাপ্পড় ভুলে গেলে?”
_“ আপনি আমাকে হুমকি দিচ্ছেন?”
_“ ওয়ার্নিং দিচ্ছি। আমি আর একবারও বলব না। যাও ফ্রেশ হয়ে আসো!” এবার একটু শক্ত গলায় বলল বারিশ।

বারিশের সেই গম্ভীর চোখের চাউনি আর শক্ত গলার আওয়াজ শুনে ঝিলমিল আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। সে চেয়ার থেকে নেমে ধপধাপ পা ফেলে ওয়াশরুমে গিয়ে ঢুকল এবং ভেতরের লকটা সশব্দে আটকে দেয়।
দশ মিনিট কেটে গেল… পনের মিনিট… বিশ মিনিট! তরুণীর ভেতর থেকে বের হওয়ার কোনো নামগন্ধ নেই। ​বারিশ এতক্ষণ পকেটে হাত গুঁজে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল। এবার তার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। ওয়াশরুমের দরজার সামনে গিয়ে শক্ত হাতে পরপর কয়েকটা ধাক্কা দিল সে। ভেতরের পরিস্থিতি বোঝার জন্য কান পাতে সে, তবু কোনো সাড়াশব্দ নেই। মেয়েটা কি ভেতরে আবার ঘুমিয়ে পড়ল নাকি? বারিশ দরজায় কড়া নেড়ে এবার ঠান্ডা গলায় হুমকি দিল,
_“ দরজা ভেঙে আমি ভেতরে গেলে কিন্তু তোমার পা দুটোও ভাঙব!”
​এই এক হুমকিতেই কাজ হলো বোধহয়! খট করে শব্দ করে খুলে গেল ওয়াশরুমের দরজাটা। মুখ কালো করে বের হয়ে এলো ঝিলমিল। ওর কপালে আর গালে পানির ফোঁটা ফোঁটা ছিটা লেগে আছে। ​বারিশ এক পলক তার কিশোরী স্ত্রীর দিকে তাকাল। সে পাশ থেকে একটা নরম তোয়ালে টেনে নিয়ে নিজে হাত বাড়িয়ে অত্যন্ত আলতো করে ঝিলমিলের মুখের পানিটুকু মুছে দিতে দিতে বলল, _“গুড গার্ল, যাও এবার আইসিটি বইটা বের করো, আমি কিছু ম্যাথ দিয়েছি ওগুলো সলভ করবে।”

ঝিলমিল এবার বাধ্য মেয়ের মতো টেবিলের বইটা টেনে নিয়ে পড়তে বসল। লোকটার দেওয়া আইসিটির কঠিন ম্যাথগুলো সে খুব মনোযোগ দিয়ে সলভ করতে লাগল। বারিশ কিছুক্ষণ সেই বাধ্য ছাত্রীর দিকে তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই সে নিজেও ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে চলে যায়।
​ঝিলমিল তখনো অঙ্কের গোলকধাঁধায় বুঁদ হয়ে আছে। ঠিক তখনই তার মনোযোগ ভাঙল নিচ থেকে ভেসে আসা একটানা কলিং বেলের শব্দে! সদর দরজার কলিং বেলটা কেউ খুব অধৈর্য হয়ে বাজাচ্ছে। ভোর চারটার এই সময়ে বাড়ির বাকি কেউ এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি। শব্দটা বারবার কানে আসতেই ঝিলমিল কলমটা রেখে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল দরজা খুলতে।
​দরজাটা খুলতেই ঝিলমিল যেন একদম পাথরের মতো জমে গেল! অবশেষে সে তার দেখা পেল! যার কারণে এই বাড়িতে তার পা রাখা, সে এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে। এই বাড়ির একমাত্র নাতি শেহরিয়ার জারিফ!
​ঝিলমিলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ২০ বছর বয়সী ছেলেটা বেশ লম্বা, চিকন-চাকন গড়নের। সে এখন দরজায় হালকা ভর দিয়ে ঝুকে আছে। চোখ দুটো লালচে আর ভারী। জারিফ তার বুজে আসা চোখ দিয়ে খুব কৌতূহলী ও বিভ্রান্ত চোখে ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন বোঝার চেষ্টা করছে সে আসলে বাস্তবে দেখছে নাকি নেশার ঘোরে কোনো ভুল দেখছে।
​জড়িয়ে যাওয়া গলায়, টেনে টেনে বলল,

_ “ঝিলমিল… আমি কি সত্যিই তোকে দেখছি? তুই… তুই দরজা খুলেছিস?”
​ঝিলমিল ঝটপট দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে ধারালো গলায় বলল,
_“না, তোর চাচী দরজা খুলেছে!”
​জারিফ একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে টাল সামলাতে সামলাতে বলল,
_“আমার কোনো চাচী-টাচী নেই, সর তো সামনে থেকে! তা এখানে এসেছিস কেন? তুই না বলেছিলি আমার মুখও আর দেখবি না? তাহলে আবার কী চাস? এই শোন… কেঁদেকেটে কোনো লাভ নেই। আমি তোর মতো কত মেয়ের সাথে এমন টাইমপাস করি, তুই সিরিয়াস হয়ে গেছিস বলে আমার কী দোষ?”
_​“কে কাঁদছে? তোর মতো এই লিকলিকে জিরাফের জন্য আমি কাঁদব? এটা আমার স্বামীর বাড়ি, তাই আমি এখানে এসেছি।”
ঝিলমিল মুখ বাঁকিয়ে জবাব দিল।
​চোখ দুটো পিটপিট করে বলল জারিফ,

_“দিনদুপুরে নেশা করেছিস নাকি?”
_​“এখন সকাল! আর নেশাটা তুই করেছিস, আমি না!”
_​“হাহ্! এখনো আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেই যাচ্ছিস? এই বাড়ির বউ হওয়ার স্বপ্ন দেখে কোনো লাভ নেই। আমার দাদীমা তোকে একদম পছন্দ করে না, সর সামনে থেকে।” জারিফ বিদ্রুপের স্বরে বলল।
_​“তোর বউ হতে এখানে কে ম’রতে এসেছে শুনি?”
_​“এই তো একটু আগেই বললি, এটা নাকি তোর স্বামীর বাড়ি!” জারিফ বাঁকা হাসল।
​ঝিলমিল এবার জারিফের খুব কাছে এগিয়ে গেল। তারপর অত্যন্ত স্পষ্ট ও গম্ভীর গলায় বলল,
_“ঠিকই তো বলেছি। আমি আমার স্বামীর বাড়িতেই আছি। এ বাড়ির ছোট বউ হয়ে! তোর একমাত্র চাচা শেহরিয়ার ফাইজান বারিশের স্ত্রী।”
​কথাটা শুনে আবারও এক চরম তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল জারিফের ঠোঁটে। বলল,
_“ আমার চাচ্চুর তো কাল তোর ফুপির সাথে বিয়ে হয়ে গেছে। আহারে! আমাকে হারিয়ে তুই এতটা পা’গল হয়ে যাবি ভাবিনি। আমি তো তোকে আগেই বলেছিলাম, আমার বাকি গার্লফ্রেন্ডগুলোকে মেনে নিতে পারলে আমার সাথে থেকে যা। তুই-ই তো থাকলি না, ইগো দেখালি!”
​ঝিলমিল এক ঝটকায় হাত উঁচিয়ে জারিফকে থামিয়ে দিল। চোখ দুটো আগুনের গোলার মতো করে বলল,

_ “চোপ বেয়াদপ! নিজের চাচীকে এসব সস্তা কথা বলতে তোর লজ্জা লাগে না? আমি যা বলছি কান খোলে, ভালো করে শোন। কাল আমার ফুপির সাথে নয়, আমার সাথে তোর একমাত্র চাচার বিয়ে হয়েছে। এন্ড নাও, আমি এখন এই বাড়ির ছোট বউ আর সম্পর্কে তোর নতুন চাচী!”
​জারিফের হাত ফসকে গেল দরজার চৌকাঠ থেকে। সে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে চোখ বড় বড় করে বলল,
_ “দেখ, ফাজলামো করবি না ঝিলমিল! আমার চাচ্চু কোন দুঃখে তোর মতো একটা পুচকে মেয়েকে বিয়ে করতে যাবে?”
_​“বাসর ঘর থেকে মাত্র বের হলাম, আর তুই এখনো বলিস বিয়ে করার কথা? তোর সাথে কি আমার এখন ফাজলামো করার সম্পর্ক?” ঝিলমিল কড়া জবাব দিল।
​ঠিক তখনই ওপর থেকে পদশব্দ শোনা গেল। বারিশ ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে ঝিলমিলকে রুমে না পেয়ে নিচে নেমে এসেছে। সিঁড়ি দিয়ে নামতেই যখন সে ঝিলমিলকে সদর দরজায় এই এলোমেলো পোশাকে জারিফের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার মেজাজ বিগরে যায়। সে দ্রুত পায়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে ঝিলমিলকে আড়াল করে ধমকের সুরে বলল,

_“এসব পড়ে রুম থেকে বের হয়েছ কেন?”
​_“তো?”
_​“যাও, রুমে যাও। কাপড় পালটে এসো!” বারিশের কণ্ঠস্বর এবার বেশ কড়া।
​ঝিলমিল পাল্টা কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু বারিশ তাকে থামিয়ে দিয়ে চোখ রাঙিয়ে বলল,
_ “যেতে বলেছি আমি!”
​স্বামীর সেই রাগী চোখের চাউনি দেখে আর দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেল না মেয়েটা। হনহন করে সে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে চলে যেতে লাগল। তবে যেতে যেতেও তার কানে ভেসে এলো জারিফের তীব্র আর্তনাদ মাখানো কণ্ঠস্বর।

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২

_​“চাচ্চু, ও এখানে কেন? আর ও কী আবল-তাবল বলছে? তুমি নাকি ওকে বিয়ে করেছ!”
​বারিশ ভাতিজার নেশাগ্রস্ত চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, _“ও ঠিকই বলেছে।”
_​“মানে!”এবার আস্ত আকাশটা ভেঙে পড়ল জারিফের মাথায়।
_​“মানেটা পরে বুঝিস। আগে বল, কাল সারারাত তুই কোথায় ছিলি?” বারিশের কন্ঠস্বর কঠোর।
​কিন্তু জারিফ তখন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে চিৎকার করে উঠল,
_ “চাচ্চু, ঝিলমিলের সাথে তুমিও পাগল হয়ে গেছ? তুমি ওকে বিয়ে করেছ মানে? দাদীমা জানে এটা? এটা কীভাবে সম্ভব! দাদীমা কোথায়? দাদীইইইই…ওওওও দাদীইইইই…”

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here