Home শুকনো পাতার নূপুর পায়ে শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৬

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৬

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৬
আয়েশা শেখ

— দুই মাস আগে—
আকাশজুড়ে মেঘের ঘনঘটা, পুরো ধরণী ধূসর চাদরে ঢাকা। মেঘের সেই গাঢ় অন্ধকারে বিকালের আলোটুকু ম্লান হয়ে চারপাশটাকে সন্ধ্যার মতো থমথমে দেখাচ্ছে। চৌধুরী ভিলার এক কোণে ঝিলমিলের শোবার ঘরের জানালা। সেই জানালা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ডালপালা ছড়ানো পেয়ারা গাছটা বাতাসে মৃদু দুলছে। জানালায় রাখা ছোট্ট সাউন্ড বক্স থেকে ভেসে আসছে ‘রিমঝিমে ধারাতে’ গানের সুর। বৃষ্টির ছাঁটে ভেজা গাছের একপাশের একটি ডাল একটু পরপরই নেড়ে উঠছে।
​ঠিক সেই মুহূর্তে চৌধুরী ভিলার প্রধান গেটে এসে দাঁড়াল বারিশ। পরনে তার লাল রঙের হাতাকাটা গেঞ্জি আর কালো প্যান্ট। গেট দিয়ে ঢুকেই তার চোখ গেল পেয়ারা গাছটার দিকে। এই সময়ে গাছের ওপর ওটা কে, সেটাই একটু খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করল সে। তবে ওপরের ডালপালায় থাকা মানবীটির কেবল পেছন দিকটাই চোখে পড়ল। পরনে একটা পিঙ্ক কালারের টি-শার্ট আর ফোর-কোয়ার্টার লেডিস জিন্স প্যান্ট। বারিশ আর অহেতুক কৌতূহল বাড়াল না, তার নজর ওখান থেকে সরে এলো। মূলত মেহরাজকে ডাকতেই তার এখানে আসা। ( গল্পে আকাশের নাম পরিবর্তণ করে মেহরাজ রাখা হয়েছে।) তাই সে ধীরপায়ে সদর দরজার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।

এদিকে ঝিলমিল তখন মহাব্যস্ত। ডালের মগজে থাকা এক লোভনীয় পেয়ারা পাড়ার জন্য সে বেশ কিছুক্ষণ ধরে কসরত করছে। ঘরের জানালা গলে এই গাছে চড়েছে সে। বাড়ির কেউ যদি তার এই বান্দরমি একবার দেখে ফেলে, তবে নির্ঘাত ওর ঠ্যাং ভেঙে দেবে। সেই ভয়েই দ্রুত হাত-পা চালাচ্ছে সে। তার ওপর আবার বৃষ্টির ছোঁয়ায় গাছের ডালপালাগুলো বড্ড পিছল হয়ে আছে। একটা পেয়ারা ইতিমধ্যেই কামড়ে ধরেছে ঠোঁটের মাঝে, আর হাত বাড়িয়ে অন্যটি ধরার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। ​ঝিলমিলের বিরক্ত লাগল। যে জিনিসটা নাগালের বাইরে থাকে, সেটাই কেন এত সুন্দর দেখায়? যেমন এই পেয়ারাটা! অসম্ভব সুন্দর দেখতে। এত নিখুঁত আর টসটসে দেখতে! এটাকে আজ পেড়ে ঘরে না ফিরতে পারলে রাতে ওর চোখে কিছুতেই ঘুম আসবে না। জেদ চেপে বসল মাথায়।

ঝিলমিল এবার ডালের একদম শেষ প্রান্তে চলে এসেছে। ভারসাম্য বজায় রাখতে নিজের পায়ের দুটো বুড়ো আঙুলের ওপর সমস্ত ভর ছেড়ে দিল ও। শরীরটাকে যতটুকু সম্ভব প্রসারিত করে পেয়ারাটার বোঁটা হালকা ছুঁয়েও ফেলেছিল। ​কিন্তু ঠিক তখনই অঘটনটা ঘটল। পায়ের নিচের ভেজা ডালটা থেকে আচমকা ফসকে গেল ওর দুটো পা-ই। ভারসাম্য হারিয়ে ডালপালা ভেঙে সোজা নিচের দিকে পড়ে যেতে লাগল সে। মুখে পেয়ারাটা শক্ত করে চেপে থাকায় এই চরম বিপদেও গলা ফেটে কোনো চিৎকার বের হলো না। আসন্ন পরিণতির কথা ভেবে মেয়েটা স্তীব্র আতঙ্কে নিজের চোখ দুটো খিঁচে বন্ধ করে ফেলল মেয়েটা। পড়ে গিয়ে ম’রে গেলে তো গেলোই। তবে হাত-পা ভেঙে যতটুকু অক্ষত থাকবে, বাকিটা ওর মা ভাঙবে।
কিন্তু মাটিতে আছাড় খাওয়ার সেই ব্যথাটা ঝিলমিলের শরীরে অনুভূত হলো না। শূন্যে ভাসতে ভাসতেই আকস্মিকভাবে শক্ত আর প্রচণ্ড বলিষ্ঠ কোনো অস্তিত্বের মাঝে সে থমকে গেল। পতন ঠেকাতে অবচেতনেই ওর দুটি হাত গিয়ে জড়িয়ে ধরল কারোর চওড়া কাঁধ। শূন্যে ঝুলতে থাকা পা দুটোও ছিটকে গিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেষ্টন করে নিল কারোর শক্ত কোমর।
​হঠাৎ নিজেকে এমন নিরাপদ আশ্রয়ে আবিষ্কার করে বন্ধ চোখের মাঝেই ভ্রু কুঁচকে উঠল কিশোরীর। হাতের নিচে নরম মাটি বা গাছের ডালের বদলে অন্য কিছু একটা টের পেয়ে ওটা ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করল সে। আঙুলের স্পর্শে মনে হলো, কোনো মানুষের চওড়া বুক এটা! সংশয় নিয়ে অবশেষে নিজের চোখ মেলে তাকাল ঝিলমিল।

তাকাতেই বিস্ময়ে ওর চোখ দুটি চড়কগাছ হয়ে গেল! চোখের সামনে তার অত্যন্ত সুদর্শন যুবক। যার তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া স্থির হয়ে আছে ঝিলমিলের ওপর। ঝিলমিলের মুখে কা’মড়ে ধরা সেই পেয়ারাটার অন্য প্রান্তটি যুবকের ঠোঁট স্পর্শ করে আছে! যুবকের ভেজা চুলগুলো থেকে দু-এক ফোঁটা জল কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে নিচে। মেয়েটাকে এভাবে বোকার মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে যুবকটি নিজের মুখ বাড়িয়ে ঝিলমিলের ঠোঁটের ফাঁকে থাকা পেয়ারাটা নিজের মুখে নিয়ে এক ঝটকায় ওটা ছুড়ে ফেলে দিল অন্য পাশে।
​গম্ভীর গলায় সে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
_“কে তুমি? পেয়ারা চুরি করছিলে কেন এখানে?”
​ঝিলমিল তখনো ঘোরের মধ্যে। যুবকের প্রশ্ন শুনে সে ঝটপট ওখান থেকে নেমে যেতে চাইল, কিন্তু তখনই খেয়াল করল ওর দুপা তখনো ছেলেটার কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে! লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় লাল হয়ে সে ছটফট করে বলে উঠল,

_“ছাড়ুন! নামতে দিন আমায়।”
​যুবকটি ওকে ছাড়ল না, আরও শক্ত করে ধরে রেখে বলল,
_ “না, আগে বলো কে তুমি? চোর কোথাকার!”
​নিজের বাড়িতে চোর অপবাদ শুনে ঝিলমিলের ভেতরের জেদ চাড়া দিয়ে উঠল। সে গলা উঁচিয়ে বলল,
_“আমি চোর নই! এটা আমার পেয়ারা গাছ।”
​যুবকটি ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
_“তোমার মানে?”
​ঝিলমিল এবার গায়ের জোরে লোকটার কোল থেকে নিচে নেমে এল। পুরো শরীর বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে একাকার। টি-শার্টটা শরীরের সাথে লেপ্টে যাওয়ায় সে একটু অস্বস্তিতে পড়ল। তড়িঘড়ি করে দুহাত আড়াআড়িভাবে নিজের বুকের ওপর ভাঁজ করে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করে একটু ইতস্তত করে বলল,
_“চাচ্চু! আপনি হয়তো আমাকে চেনেন না। আমি ঝিলমিল, মেহরাজ চাচ্চুর ভাতিজি। তবে আমি আপনাকে চিনি। বারিশ… আপনি বারিশ তাই না? না মানে, বারিশ চাচ্চু।”
​যুবকের মুখের গম্ভীর ভাবটা এক পলকে বদলে গেল। চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত জটিলতা ফুটিয়ে সে কিছুটা চড়া সুরে জিজ্ঞেস করল,
_“তুমি কে?”
​ঝিলমিল একটু বিরক্ত হয়েই ঠোঁট উল্টে বলল,
_ “বললাম তো! আমি ঝিলমিল!”

_“তুমি আলতাফ চৌধুরীর মেয়ে?” বারিশের গলায় এবার চরম বিস্ময়। সে খুব অবাক হয়ে ওপর-নিচ খুঁটিয়ে দেখল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই চঞ্চল কিশোরীকে।
​ঝিলমিল নিজের ভেজা চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে বেশ বুক ফুলিয়ে জবাব দিল,
_“হ্যাঁ।”
বারিশ চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেল। কিন্তু নিজের ভেতরের অবাক ভাব সে বুঝতে দিলো না কিশরীকে।
_ “তুমি না ছোট ছিলে?”
_“তো আমি কি এখন বুড়ি হয়ে গেছি?” ​বেশ ঝেঁঝিয়ে উঠে বলল ঝিলমিল।
​বারিশ আর কোনো জবাব দিল না। মুখে কিছু না বললেও তার গভীর চোখের দৃষ্টি তখনো এই মেয়েটার ওপরই স্থির হয়ে রইল।
​ঝিলমিল আর তাকে পাত্তা না দিয়ে হনহন করে ঘুরে মাটিতে ছিটকে পড়া পেয়ারাগুলো একে একে তুলে নিতে লাগল। চারটে পেয়ারা দুই হাত ভরে তুলে নিল। আরেকটা তুলে নিতেই অমনি হাতের ভারসাম্য হারিয়ে আগের গুলো টুপটাপ করে নিচে পড়ে গেল। মেয়েটা বিরক্তি মিশিয়ে পূণরায় সেগুলো তুলতে যেতেই, বাকিগুলো কোল গলে আবারও ঘাসের ওপর ড্রপ খেল। কোনো ভাবেই সে একসঙ্গে সবগুলো তুলতে পারছিল না। ঝিলমিলের কাণ্ডকারখানা বারিশ চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছিল। একপর্যায়ে সে ধীরপায়ে এগিয়ে এসে নিজের বড় এক মুঠোতেই মাটিতে পড়ে থাকা সব কটা পেয়ারা অনায়াসে তুলে নিল। তারপর বেশ হুকুমের সুরে বলল,

_​“ভেতরে যাও। আমি এগুলো নিয়ে দিচ্ছি।”
​ঝিলমিল তড়িৎ গতিতে মাথা ডানে-বামে নাড়িয়ে সোজা বারণ করে দিল,
_“উঁহু, আপনি যান। আমি ওদিক দিয়ে ভেতরে যাব না।”
​ভ্রু ভাঁজ ফেলে গম্ভীর গলায় জানতে চাইল বারিশ,
_ “কেন?”
_​“এমনিতেই বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়েছি, তার ওপর আবার গাছে উঠেছি শুনলে আম্মু একদম কাঁচা চিবিয়ে খাবে!”
​বারিশ একটু অবাক হয়ে চারপাশটা দেখে নিয়ে বলল,
_“তাহলে ঘরে ঢুকবে কীভাবে?”
_​“কেন, এখান দিয়ে!” ঝিলমিল বেশ চটপটে ভঙ্গিতে হাত উঁচিয়ে নিজের শোবার ঘরের খোলা জানালা আর লাগোয়া ছোট বারান্দাটার দিকে ইঙ্গিত করল। যার সহজ মানে হলো—সে আবার ওই পিছল গাছ বেয়েই ওপরে উঠবে! ​বারিশের চোখ এবার কপালে উঠল। বলল,

_“ এসেছিলে কীভাবে?”
​_“এখান দিয়েই!”
_“ বাঁদর!”
_“ কী বললেন?”
_“ কিছু না।”
দূর থেকে ঝিলমিলের মায়ের কন্ঠ ভেসে আসছে। ঝিলমিল তড়িঘড়ি করে পেয়ারা গাছের দিকে যেতে চাইল, তবে বারিশ ওর টি-শার্টের পেছনের অংশ টেনে ধরে বলল,
_“ চুপচাপ মেইন দরজা দিয়ে বাসায় ঢুকবে। চলো আমার সাথে।”
​কথাটা বলেই সে ঝিলমিলকে প্রায় একরকম টেনেহিঁচড়ে সদর দরজার দিকে নিয়ে যেতে থাকে। ঝিলমিল রেগেমেগে চেঁচাতে গিয়েও মায়ের ভয়ে মুখ খুলতে পারে না। গলার স্বর যতটা সম্ভব নামিয়ে ফুসতে ফুসতে বলতে থাকে,

_ “আরে ছাড়ুন! কী করছেন কী? হাতটা ছাড়ুন বলছি!” কিন্তু ওই পাথরের মতো শক্ত হাতের গ্রিপ থেকে নিজেকে মুক্ত করার সাধ্য ওর ছিল না। আলটিমেটালি, চৌধুরী ভিলার মেইন গেট দিয়েই বারিশ ওকে ভেতরে নিয়ে প্রবেশ করে।
​চৌধুরী ভিলার লিভিং রুমে তখন বিকালের চায়ের বেশ একটা জমজমাট আমেজ। সবাইকে চা-নাস্তা পরিবেশন করে নাজমা বেগম সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে ওপরের ঘরের দিকে তাকিয়ে মেয়েকে ডাকছিলেন। তখনই সদর দরজার দিকে চোখ পড়ে আলতাফ চৌধুরীর। মেয়েকে ওই অবস্থায় দেখে তিনি সোফায় বসেই হাঁক ছাড়েন,
_“ওই তো ঝিলমিল!”
​কিন্তু পরক্ষণেই যখন ঝিলমিলের পেছন থেকে ভেজা শরীরে বারিশ ড্রয়িংরুমে পা রাখে, আলতাফ চৌধুরীর মুখের চায়ের চুমুকটা গলায় আটকে যায়। তিনি মারাত্মক বিষম খেয়ে খাশতে খাশতে সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েন।
বারিশ অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে এগিয়ে আসতে আসতে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বলে,
_“কী হলো স্যার? চা কি বেশি গরম?”
​আলতাফ চৌধুরী কোনোমতে কাশি সামলে নিয়ে রুক্ষ স্বরে জিজ্ঞেস করেন,

_“তুমি এখানে? এই অসময়ে?”
_​“এখানে আসতে হলে কি আপনাকে আলাদাভাবে ভিসা-পাসপোর্ট করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আসতে হবে স্যার?” বারিশের এই চটজলদি জবাবে আলতাফ চৌধুরী আরও বিরক্ত হন।
​ঠিক তখনই নূরজাহান চৌধুরী চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে উঠে আসেন। পরম স্নেহে বারিশের চিবুক ছুঁয়ে আদর করে বলেন,
_“ঠিকই তো বলেছে। এখানে আসতে আবার ওর সময়-অসময় কিসের? এটা তো ওর নিজেরও বাড়ি।”
_​“হ্যাঁ, নিজের বাড়িই তো! তা নিজের বাড়ি হলে তো বাংলাদেশে প্লেন থেকে পা রাখা মাত্রই এক দৌড়ে চলে আসার কথা। আসলো তো পুরো দু’দিন পর!” নাজমা বেগম মৃদু অনুযোগের সুরে কথাগুলো বললেন।
বারিশ আর মেহরাজ দু’দিন আগেই কানাডা থেকে পড়াশোনা শেষ করে সাত বছর পর দেশে ফিরেছে। একই দেশের একই ইউনিভার্সিটির পাঠ চুকিয়ে নিজ দেশের মাটিতে ফেরা তাদের। বারিশ নাজমা বেগমের দিকে তাকিয়ে কিছুটা বিনয়ের সাথে উত্তর দেয়,
_“ না, আসলে লং জার্নির পর একটু রেস্ট নেওয়ার খুব প্রয়োজন ছিল, তাই আসা হয়নি।”
​নাজমা বেগম ওর আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বলেন,
_“একেবারে বৃষ্টিতে ভিজে গেছো দেখছি। মেহরাজ ওর ঘরেই আছে, চটপট গিয়ে ওর একটা শুকনো কাপড় নিয়ে বদলে নাও। তারপর ওকে সাথে নিয়ে নিচে এসো। আমি গরম গরম পেঁয়াজু আর আলুর চপ বানিয়েছি, একসাথে বসে খাবে।”
​বারিশ মাথা চুলকে চট করে বলে ওঠে,

_ “উঁহু, নাস্তা পরে হবে। আমি মেহরাজকে নিয়ে একটু ফুটবল খেলতে মাঠে বের হবো।”
​ছেলেটার এই খামখেয়ালি কথা শুনে আলতাফ চৌধুরী আবার চটে ওঠেন,
_ “এই তো, শুরু হয়ে গেল! মেহরাজ কোত্থাও যাচ্ছে না। ভিনদেশ থেকে এসে এখনো চব্বিশ ঘণ্টাও পার করতে পারোনি, এর মধ্যেই আবার বাদরামি শুরু করে দিলে? বয়স তো আর কম হলো না, এখনও কি ছোট বাচ্চাদের মতো ফুটবল খেলার বয়স আছে তোমার?”
​স্বামীর এমন কড়া কথা শুনে নাজমা বেগম পাশ থেকে বললেন, _“আহা, তুমি এমন করছ কেন? ফুটবল তো জোয়ান ছেলেরাই খেলবে, নাকি ঘরের মেয়েরা গিয়ে খেলবে?”
_​“ও খেলুক গিয়ে, মেহরাজ যাবে না।” আলতাফ চৌধুরী নিজের সিদ্ধান্তে অটল।
​বারিশ ওনার দিকে এক পলক চেয়ে বেশ ঠান্ডা গলায় জানতে চায়,
_“আসলেই যাবে না?”
_“না।”
_“সত্যি?”
_“হ্যাঁ, এক কথা বারবার বলতে পারব না।”
_​“ওকে, ফাইন।” বারিশ আর কথা বাড়ায় না। নিজের এক হাতের মুঠোয় থাকা পেয়ারাগুলো সেন্ট্রাল টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখে সে। তারপর দুই হাত দিয়ে নিজের ভেজা চুলগুলো পেছন দিকে ঝাড়তে ঝাড়তে, ভেজা অবস্থাতেই মেহরাজের রুমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়।

কিন্তু সে সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা দেওয়ার আগেই, এক ঝড়ের গতিতে তাকে সজোরে কনুই দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে, ভেজা কাপড়ে পুরো ড্রয়িংরুমের মেঝেতে পানির দাগ ফেলে এক দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যায় ঝিলমিল। পরক্ষণেই ওপর তলা থেকে ধপাস করে ওর ঘরের দরজা বন্ধ হওয়ার চড়া আওয়াজ পাওয়া যায়।
হুট করে বারিশের এমন আকস্মিক আগমনে নাজমা বেগম এতক্ষণ নিজের মেয়ের এই ভেজা কাকের মতো অবস্থাটা খেয়ালই করেননি। লিভিং রুমের বাকি সবার সাথে বারিশও কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে ওপরে তাকিয়ে থাকে ঝিলমিলের এই বন্য কান্ড দেখে।
​বিস্ময়ের ঘোর কাটতেই নাজমা বেগম বলে ওঠেন,
_“আরে! ও না নিজের রুমে ছিল? ভিজে আসলো কোত্থেকে?”
​বারিশ সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে পেছনে না তাকিয়েই অত্যন্ত নিরাসক্ত গলায় জবাব দেয়,
_ “পেয়ারা গাছ থেকে।”
​ব্যস, এইটুকুই! বারিশ মেহরাজের ঘরের ভেতর অদৃশ্য হতেই নিচে লিভিং রুমে শুরু হয়ে যায় ঝিলমিলের মায়ের অবিরাম রেডিওর মতো বকাঝকার সুর।

বারিশ শেষ পর্যন্ত আলতাফ চৌধুরীর কড়া নিষেধ উড়িয়ে দিয়ে মেহরাজকে সাথে নিয়েই মাঠের দিকে রওনা দেয়। আলতাফ চৌধুরী ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেও ওনার সামনে দিয়েই দুই বন্ধু বেরিয়ে পড়ে। ঝিলমিল বকা খাওয়ার ভয়ে ওপরে নিজের ঘরে খিল এঁটে বসে থাকে। একদম রাতের খাবারের ডাক পড়ার পর সে প্রথম নিচে নামার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সোজা ডাইনিংয়ে না গিয়ে সে পা বাড়ায় তার ফুপি দীঘির ঘরের দিকে।
দীঘি তখন নিজের পড়ার টেবিলের সামনে বসে ল্যাপটপে কী একটা জরুরি কাজ করতে ব্যস্ত। ঝিলমিল ঘরে ঢুকেই ফুপির বেডের পাশে রাখা সাইড টেবিলের ড্রয়ার থেকে চকলেটের বক্স থেকে একটা চকলেট বের করে মুখে পুরতে পুরতে বেশ আয়েশ করে বলে ওঠে,
_“তোমার জামাই তো চলে এসেছে ফুপি।”
দীঘি ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
_ “আমার জামাই মানে? কী হাবিজাবি বকছিস?”
_“ঐ যে, বারিশ চাচ্চু!” ঝিলমিল চকলেটের খোসাটা ডাস্টবিনে ফেলতে ফেলতে চোখ নাচাল।
দীঘি এবার ল্যাপটপ থেকে পুরোপুরি মনোযোগ সরিয়ে ঝিলমিলের দিকে ঘুরে বসে। কিছুটা বিরক্ত আর অবাক হয়ে বলে,

_“বারিশ ভাইয়া আবার আমার জামাই হতে যাবে কেন? তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে?”
_“ওমা! তুমি এখনো কিচ্ছু জানো না?” ঝিলমিল দীঘির একদম কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলে,
_“ঝর্ণা দাদী তো কালকেই আমাদের বাসায় এসে আমার দাদীমার সাথে কথা পাকা করে গেছেন। মানে, তোমাদের দুজনের বিয়ের কথা।”
কথাটা শুনে দীঘির ফর্সা মুখটা এক নিমেষে গম্ভীর হয়ে ওঠে। সে তীব্র বিস্ময় নিয়ে ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে জানতে চায়,
_ “মাথা খারাপ হয়েছে তোর? এসব তোকে কে বলল?”
_“সত্যি বলছি ফুপি! আমি নিজের কানে শুনেছি। তোমার সাথে কি আমি এসব ফাজলামো করতে যাব?”
দীঘির মনের ভেতর অদ্ভুত তোলপাড় শুরু হয়েছে। সে নিজের ভেতরের উদ্বেগ চেপে রেখে ধীর গলায় জিজ্ঞেস করে,
_“মা কী বলেছে এই ব্যাপারে?”
_“দাদীমা তো খুব খুশি! মানে উনি একপায়ে রাজি। বলতে গেলে আব্বু বাদে পরিবারের সবাই এই বিয়েতে রাজি।” ঝিলমিল চকলেটের স্বাদটা উপভোগ করতে করতে পুরো ভেতরের খবর ফাঁস করে দেয়।
ভাতিজির মুখে মায়ের সম্মতির কথা শুনে দীঘির কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে আনমনেই বিড়বিড় করে বলে, _“কিন্তু আমি…”
_“তুমি কী ফুপি?”কৌতূহলী চোখে ফুপির মুখের দিকে তাকায় ঝিলমিল।
দীঘি নিজের মুখের কথাটা বলতে গিয়েও মাঝপথে আটকে যায়। চট করে নিজেকে সামলে নিয়ে সে চুপ হয়ে যায়। কারণ এই বাচাল মেয়েটার পেটে কোনো কথা হজম হয় না। এখন যদি নিজের মনের আসল কথাটা এর সামনে একবার মুখ ফসকে বলে ফেলে—তবে এই মেয়ে এক দৌড়ে গিয়ে দাদীমার কানে সব হুবহু তুলে দেবে!

_“কিছু না। যা এখন এখান থেকে, নিজের চরকায় তেল দে।” দীঘি বেশ কড়া গলায় ভাতিজিকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
ঝিলমিল নাছোড়বান্দা, ফুপির হাত ধরে টানতে টানতে বলে,
_“তুমিও চলো ফুপি, একসাথে নিচে গিয়ে রাতের খাবারটা খাবো।”
দীঘি সন্দিহান চোখে তাকিয়ে জেরা করার ভঙ্গিতে বলে,
_“আজ হঠাৎ এত তেল মারছিস কেন আমায়? নির্ঘাত কোনো আকাম-কুকাম করে এসেছিস, তাই না?”
ঝিলমিল দাঁত কেলিয়ে চুরির দায় স্বীকার করার মতো করে বলে,
_“আহা চলোই না! আম্মু যদি মারতে আসে, তুমি একটু বাঁচিয়ে দিও। চলো এবার।”
দীঘিকে সঙ্গে নিয়েই শেষমেশ নিচে ডাইনিং স্পেসে আসে ঝিলমিল। নিচে পা রাখতেই দীঘির বুকের ভেতরটা আচমকা ধক করে ওঠে। খাবার টেবিলে চৌধুরী বাড়ির সবার সঙ্গে স্বয়ং বারিশও উপস্থিত! ফুটবল খেলা শেষে মেহরাজই ওকে জোর করে ধরে এনে ডাইনিং টেবিলে বসিয়েছে। দুই বন্ধু মিলে কোনো কিছু নিয়ে কথা বলছে আর খাচ্ছে। দীঘিকে হুট করে সামনে দেখেই বারিশ বেশ সহজ গলায় বলে ওঠে,

_“কীরে,কেমন আছিস?”
দীঘি নিজের ভেতরের অস্বস্তিটুকু আড়াল করে আমতা আমতা করে জবাব দেয়,
_“ভালো। তুমি কেমন আছ?”
_“ভালো,” বারিশের সংক্ষিপ্ত উত্তর।
ঝিলমিল আর দীঘি দুজনেই গিয়ে টেবিলের খালি আসন দুটোয় বসে পড়ে। একে একে পরিবারের বাকি সবাইও ডাইনিংয়ে এসে নিজ নিজ জায়গায় বসে। টেবিলে চামচ-প্লেটের টুংটাং শব্দের সাথে টুকটাক কথাও চলতে থাকে। নাজমা বেগম হঠাৎ পিছন থেকে এসে ঝিলমিলের কানটা হালকা মুচড়ে দিয়ে রাগতস্বরে বলেন,
_ “এবার আমি ওই পেয়ারা গাছটা কা’টব, তোকে কিছু বলব না।”
_“আহ আম্মু! সবার সামনে এমন ডাইনির মতো চিল্লাপাল্লা করো কেন বলো তো?”
_“একদম মুখে মুখে তর্ক করবি না, চুপচাপ খা এখন,” নাজমা বেগম প্লেটে ভাত বেড়ে দিতে দিতে ধমক দেন।
এতক্ষণ শান্ত থাকা আলতাফ চৌধুরী এবার মেয়ের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলেন,

_ “এসএসসিতে তো কোনোমতে টেনেটুনে পাস করেছ। এইচএসসির শুরু থেকেই কিন্তু একদম মন দিয়ে প্রিপারেশন নিতে হবে। এবার যদি এ+ না আসে, আমি কিন্তু তোমার ওপর খুব রেগে যাবো, বলে রাখলাম।”
ঝিলমিল ভাতের লোকমা মুখে পুরে বেশ তাচ্ছিল্যের সুরে বলে,
_“আগে কলেজে ভর্তি তো হয়ে নেই আব্বু! একদম ফাটিয়ে প্রিপারেশন নেব, দেখো তুমি।”
পাশে বসা মেহরাজ ঝিলমিলের কাছে জানতে চায়, সে কোন কলেজে ভর্তি হতে ইচ্ছুক। ঝিলমিল বেশ চটপটে ভঙ্গিতে শহরের নামকরা একটা কলেজের নাম উল্লেখ করে। চুপচাপ খেতে থাকা
বারিশ ক্ষণিকের জন্য হাতের লোকমাটা মুখের কাছে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। খাওয়া থামিয়ে সে গভীর কোনো ভাবনায় ডুবে পড়ে। তার এই ভাবান্তর দেখে মেহরাজ ডেকে ওঠে,
_ “কী হলো দোস্ত? থামলি কেন?”
_“আর খাবো না। বাসায় ফিরতে হবে আমার,” বলেই বারিশ সবাইকে অবাক করে দিয়ে চেয়ার ছেড়ে সোজা দাঁড়িয়ে, পকেট থেকে টিস্যু বের করে হাত মুছতে মুছতে সে ডাইনিং রুম থেকে বের হয়ে যায়। ওর এই হুট করে চলে যাওয়াটা টেবিলে বসা কাউকে কথা বলার সুযোগই দেয় না।
বারিশ সদর দরজা দিয়ে বের হতেই চৌধুরী ভিলায় প্রবেশ করে তাহসান। মেহরাজ ওকে দরজার কাছে দেখতে পেয়েই চড়া গলায় ডেকে এনে জোর করে খাবার টেবিলে বসিয়ে দেয়। তাহসান অবশ্য প্রথমে বসতে বেশ ইতস্তত করছিল, কিন্তু মেহরাজের নাছোড়বান্দা জেদের কাছে শেষমেশ তাকে হার মানতেই হয়।
দীঘি তাহসানকে টেবিলে বসতে দেখেই চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করে,

_“তুমি আজ এত দেরিতে আসলে যে?”
তাহসান বেশ ভদ্রতার সাথে মাথা নিচু করে উত্তর দেয়,
_“জি ম্যাম, অফিসে আজ কাজের চাপ একটু বেশি ছিল, তাই লেট হয়ে গেল।”
তাহসানের মুখে এই যান্ত্রিক কথাবার্তা শুনে দীঘির মুখটা এমন হলো যেন খুব বিরক্ত হলো তাহসানের কথায়। সে আবারও মনোযোগ দিয়ে খেতে থাকে।

শেহরিয়ার ভিলাতে এসে বারিশ নিজের পরিবারের সবার সঙ্গে পূনরায় খেতে বসেছে। খাওয়া-দাওয়ার একপর্যায়ে সে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলে,
_ “ প্রফেসরের জব নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি।”
কথাটা শোবামাত্রই টেবিলের সবাই আকাশ থেকে পড়েন। ঝর্ণা বেগম হাতের জলের গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখে তীব্র অবাক হয়ে বলেন,
_ “হঠাৎ এই অদ্ভুত সিদ্ধান্ত কেন? শেহরিয়ারদের ছেলে হয়ে তুমি শেষে কিনা প্রফেসরের চাকরি করবে?”
বারিশ নিজের প্লেট থেকে চোখ না তুলেই শান্ত গলায় পাল্টা প্রশ্ন করে,

_“কেন শিক্ষকতা করা কি খুব খারাপ কোনো কাজ?”
_“তাহলে আমাদের এই বিশাল বিজনেস কে দেখবে?”
_“ এত বছর ধরে কারা দেখছে?” বারিশের গলায় অদ্ভুত এক নির্লিপ্ততা।
_“এতদিন যা হয়েছে হয়েছে, এখন থেকে তুমিও পুরো দমে হাল ধরবে।”
_“হ্যাঁ, অবশ্যই ধরব। তবে পার্টটাইম। বিজনেসের পাশাপাশি আমি যেটা করতে চাই, সেটাই করব।”
ঝর্ণা বেগম ছেলের এই মুখের ওপর কথা বলা দেখে রেগেমেগে আরও কিছু বলতে যাবেন, তখনই বারিশ মেজাজ হারিয়ে ডাইনিং টেবিলে সজোরে একটা থাপ্পড় মেরে বসে। থালার চামচগুলো ঝনঝন করে কেঁপে ওঠে তার সেই চড়ের চোটে। বারিশ দাঁতে দাঁত চেপে কড়া গলায় সতর্ক করে দেয়,

_“আমি এই ব্যাপারে আর একটা শব্দও শুনতে চাই না আম্মা! অতীতে আমার ওপর জোর খাটানোর ফলাফল কী হয়েছিল, তা আশা করি তোমরা কেউ ভুলে যাওনি! ডোন্ট রিপিট দ্য সেইম মিসটেক।”
প্লেটের বাকি খাবার ওখানেই ফেলে রেখে চেয়ারটা ঝটকা মেরে পেছনে ঠেলে নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে হনহন করে চলে যায় বারিশ।
ডাইনিং রুমে তখন পিনপতন নীরবতা। ঝর্ণা বেগম নিজের বড় ছেলে আর স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলেন,

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৫

_“দেখলে তো? সাত বছর পার হয়ে গেল, কিন্তু একটুও বদলায়নি!”
লাইক কমেন্ট করবেন বেশি করে। গল্প নিয়ে দু’চার লাইন কমেন্ট করলে কী হয়? এতগুলো শব্দ লিখি আর আপনারা যন্ত্রের মতো একটা শব্দ লিখে চলে যান! পাঠকের সাপোর্ট ছাড়া লেখক লিখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে ভাইইইইই।

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here