Home দুইজনাতেই দুইজনাতেই পর্ব ৩৫ 

দুইজনাতেই পর্ব ৩৫ 

দুইজনাতেই পর্ব ৩৫ 
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

সকালে দ্বিতীর ঘুমটা ভাঙল সাক্ষ্যকে দেখে। তার পাশেই অবস্থানরত থেকে যে ছেলেটা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে সে সাক্ষ্যই। দ্বিতী তাকাল। এক মুহূর্তে সবটা বুঝে উঠে বসল৷ এলোমেলো চুলগুলো হাত খোঁপা করতে করতে বলল,
“ এভাবে তাকিয়ে থাকার কি হয়েছে? কখনো দেখেননি আমাকে? ”
সাক্ষ্য হাসে। সকাল সকাল উঠেও যে মিষ্টি স্বরে কথা বলার মেয়ে দ্বিতী নয় তা তার আগে থেকে জানা। বলল,
“ আপনিও তো আমায় বহুবার দেখেছেন ম্যাম। তবুও তাকিয়ে থাকেন কেন? ”
“ কখন? ”
“ তাকান, তাকান৷ আপনি ও তাকান, আমিও তাকাই। শুধু আপনি তাকান আড়ালেন আবড়ালে আর আমি তাকাই সরাসরিই। আমার সৎসাহস আছে বলে কথা! ”
“ আমার নেই নাকি? ”
“ থাকলে চুরি করে তাকান কেন? ”

দ্বিতী ভ্রু বাঁকিয়ে চাইল যেন। পরমুহূর্তেই চাহনিটা ব্যতিক্রম করে চাইল সাক্ষ্যর দিকে। এগিয়ে একদম সাক্ষ্যর সামনেই হাঁটুতে ভর দিয়ে বসল। অতঃপর সাক্ষ্যর মুখের কাছাকাছি মুখ এনে একদম চোখ নিয়ে শেষ করে দিবে এমন একটা চাহনি ফেলল। বলল,
“ তো? সৎসাহস নেই বলছেন? শিওর?”
সাক্ষ্য বাঁকা হাসল। বউকে কাছাকাছি বসতে দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসেই ভ্রু নাচাল। বলল,
“ আছে বলছেন?”
“ অফকোর্স আছে। দ্বিতী আপনার মতো ছাগল নয় যে শুধু মনে মনে ভালোবাসবে। মুখে বলারও সৎসাহস থাকা লাগে স্যার। ”
সাক্ষ্য আচমকাই চাপা হাসল। বাঁকা ঠোঁট ফুটিয়ে বলল,
“ চলুন, সৎসাহস নিয়ে গেইম খেলি। ইন্টারেস্টেড? ”
“দ্বিতীর বরাবরই সৎসাহস আছে মিস্টার সাক্ষ্য এহসান। বরং নিজের সৎসাহস আছে কিনা তাই যাচাই করে নিন গেইমের মাধ্যমে। ”

সাক্ষ্য বাঁকা হাসল। উঠে দাঁড়িয়ে আড়মোড় ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে বলল,
“ দোখা যাক বরং! কার সৎসাহস বেশি? মিসেস এহসান নাকি মিস্টার এহসান?”
দ্বিতী পাত্তাই দিল না। দায়সারা ভাব নিয়ে বেলকনিতে যেতে যেতে শুধাল,
“ অফকোর্স, মিসেস এহসানেরই হবে।”
সাক্ষ্য শুনে তাকাল। মুখে বেশ আত্মবিশ্বাসি ভাব দ্বিতীর। ঠোঁটে হাসি। সাক্ষ্য তা দেখেই হাসল। যেভাবে মিসেস এহসান বলল তা সাক্ষ্যর কানে বাজল যেন বার কয়ো। নিজেকে স্বগর্বে মিসেস এহসান বোধহয় এই প্রথমই বলল মেয়েটা।

সাক্ষ্য যখন মুখচোখে পানি দিয়ে ফ্রেশ হয়ে এল তখন সকাল সাতটা। বাইরে তখন তুমুল বৃষ্টি৷ শীত শীত বাতাসটা শরীর ছুঁয়ে যেতেই দ্বিতী বেলকনি থেকে বেরিয়ে সাক্ষ্যর উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
“ কাল রাতে না আপনার নিচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার কথা ছিল? বাসায় চলে এলেন কিভাবে? কে ডুকতে দিল হুহ? ”
সাক্ষ্য তোয়ালে তে নিজের ভেজা হাত পা মুঁছতে মুঁছতে আয়েশি ভঙ্গিতে প্রশ্ন ছুড়ল,
“কেন? ডুকতে না দিলে খুশি হতেন? সারারাত দাঁড় করিয়ে রাখার প্ল্যান ছিল নাকি আপনার? ”
“ সারারাত দাঁড়িয়েই বা থাকতেন কেন? ভালো টালো বাসে নাকি আমায় যে আমার জন্য সারারাত দাঁড়িয়ে থাকতেন? ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকে বলেই উত্তরের অপেক্ষায় থাকল৷ দৃষ্টি সাক্ষ্যর মুখের দিকেই। নিশ্চয় সাক্ষ্য এখনই বলবে না যে তাকে ভালোবাসে? দ্বিতী শিউর। তাই চেয়ে উত্তরের অপেক্ষা করতেই সাক্ষ্য বলে উঠল,
“ এদিকে আসুন। সারারাত দাঁড়িয়ে থাকতাম কেন তা উত্তর দিই। ”
দ্বিতী ফের ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ উত্তর দিতে ওদিকে যেতে হবে কেন? ওখান থেকেই বলুন।”
সাক্ষ্য চোখে হাসল। বলল,

“ আপনার না সৎসাহস আছে মিসেস? তো কাছে আসতে ভয় কিসের? ”
দ্বিতী কপাল কুঁচকায়। এই ছেলে খুব ধূর্ত! অন্যদিকে দ্বিতীর মাঝেমাঝে নিজেকে বোকাই মনে হয়। নয়তো এই ছেলেও গোপণে তাকে ভালোবাসে তা এতগুলো দিনেও দ্বিতীকে একটাবার বুঝতে দিল না, আর দ্বিতী সে ছোটকালে যেদিন পছন্দ করেছিল সেদিনই সাক্ষ্য জেনে গেছে।দ্বিতী ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। ভ্রু কুঁচকে কিছু বলতে নিতেই সাক্ষ্যর ফোন বাজল। ফোনটা তুলেই গলা ঝাড়ল সাক্ষ্য। তার পরপরই ওপাশ থেকে শোনা গেল,
“ সাত সকালে কোথায় গিয়েছিস সাক্ষ্য? কথা বলল তোরা নাকি সকালে বেরিয়েছিস? ”
সাক্ষ্য ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। বোন তার কাজের মানুষ। নিজে থেকেই বলে দিয়েছে সকালে বের হয়েছে। আর এইদিকে দ্বিতীর মা যে দেখল রাতে এসেছে এটা কি তার আম্মু পর্যন্ত পৌঁছাবে না? আলবাত পৌঁছাবে। তারপর? সবাই ভাববে ঘরে বউ তুলতেই সাক্ষ্য বউয়ের প্রেমে পিছলে মিথ্যেও শিখেছে।সাক্ষ্য পুণরায় ফোঁস করে শ্বাস তুলে উত্তর করল,

“ আম্মু, কথা বোধহয় টাইম ভুলে গেছে। সকালে নয় রাতে বেরিয়েছিলাম। তোমার বান্ধবীর মেয়ে পাঁচ ছয় বছরের বাচ্চা মেয়ের মতো কান্না শুরু করছিল মায়ের কাছে যাবে বলে। এত কান্না করছিল যে ঘুমাতে অব্দি পারছিলাম না। তাই শেষমেষ না পেরে অদিতি আন্টির বাচ্চা মেয়েকে অদিতি আন্টির কাছেই নিয়ে এসেছি।”
দ্বিতী বিস্ময় নিয়ে চাইল। কি মিথ্যুক! সে মোটেই এত কান্না করেনি। বরং এই লোক নিজে তাকে এনেছে। দ্বিতী কপাল কুঁচকে চাইল। ওপাশ থেকে সাজি আফরোজ কি বলল তা সে শুনল না স্পষ্ট। তবে সাক্ষ্য পুনরায় বলে উঠল,
“ অদিতি আন্টি কিছু মনে করলেও কি আম্মু। আমি তো ইচ্ছে করে আনিনি, উনার মেয়েই এই রাতের বেলায় কাঁদতে কাঁদতে সেন্সলেস হয়ে যাচ্ছিল। ”
ওপাশ থেকে সাক্ষ্যর আম্মু ধমক দিয়ে বলল,
“ অদিতি আন্টি কি সাক্ষ্য? আম্মু বলবে। এতদিন নাহয় ও বাসায় জামাই হিসেবে যাওনি বা তোমরাও সম্পর্কটা নিয়ে হ্যাংলামে করেছো বলে বলিনি। এখন বলছি, অদিতিকে আম্মু বলবে হু? ওর ও তো ইচ্ছে হয় ওর মেয়ের বর ওকে আম্মু বলে ডাকুক?”
সাক্ষ্য ফোঁস করে মায়ের আদেশ মেনে নিয়ে বলল,

“ আচ্ছা। আম্মু ডাকব। ”
“ ভালো। সম্পর্কের প্রতি যত্নশীল হও আরেকটু। স্ত্রীর, স্ত্রীর পরিবার সবার প্রতি। এমন অবহেলায় রাখবে না যাতে তোমার স্ত্রীকে পদে পদে পরিবারকে মনে করে কান্না করতে হয়। ”
সাক্ষ্যর ইচ্ছে হলো কপাল চাপডাতে। সে অবহেলা করেছে? মিথ্যে বললেও আজকাল দোষটা কোন না কোন ভাবে তার উপরেই এসে হাজির হচ্ছে। সাক্ষ্য ওভাবেই জানাল,
“ কি করব বলো? তুমি আমার সাথে একটা ছিঁচকাঁদুনে মেয়ে বেঁধে দিয়েছো আম্মু! সারা জীবন এমন কান্না করলে আমার রুমটাই সমুদ্র হয়ে যাবে আম্মু।”
ওপাশে সাক্ষ্যর আম্মু বোধহয় হেসে উঠল এবারে। জানালেন ঠিক মতো বাসায় ফিরতে। দ্বিকী ততক্ষনে রেগে মুখচোখ লাল করল। চটফট জবাব দিল,
“ আমি কান্না করেছি? কখন ভাই? আপনাকে কখন কেঁদে কেঁদে বলেছি যে আমি আম্মুর কাছে যাব?কখন? শুনুন! আমি যথেষ্ট ম্যাচিউরড। কষ্ট পেলেও না কেঁদে থাকতে পারি। আর সেখানে আপনি আমায় বাচ্চা বললেন কিভাবে?”
সাক্ষ্য ভ্রু নাচায়। প্রশ্ন ছুড়ে,

“ বাচ্চা নয় বলছেন? গুণে গুণে সাড়ে সাত বছরের ছোট হন বুঝলেন দ্বিতীকা তাসনিম? আমার মোটেই এত এইজ ডিফারেন্সে বিয়ে করার ইচ্ছে ছিল না। ”
দ্বিতী চাইল। মুখ ফসকেই এবারে বলে ফেলল,
“ তাহলে কণা? কণা তো আরো ছোট। ওর সাথে বিয়ের কথা ছিল কি করে? ”
সাক্ষ্য এবারে ভ্রু কুঁচকে চাইল। বলল,
“ কে বলল বিয়ের কথা ছিল? ”
“ আমাকে বাচ্চা মনে হয় আপনার? ”
সাক্ষ্য হাসল না। তবে একহাতে বাড়িয়ে দ্বিতীর হাতটা টেনে ধরল। কালকের ফোস্কা পড়ে যাওয়া জায়গাটায় ফোস্কা গলে এখন লাল দগদগে হয়ে আছে। সাক্ষ্য তার পাশেই চুমু বসাল। তারপর বাঁকা হেসেই উত্তর করল,
“ না, বাচ্চা বউ মনে হয় ইদানিং। ”
দ্বিতী ততক্ষনে সরু চাহনিতে তাকাতেই অদিতি আহমেদ ডেকে উঠল নাস্তা করার জন্য। এর আগে দ্বিতীকে একবার বলেও গিয়েছিল যখন সাক্ষ্য ওয়াশরুমে ছিল। এখন ফের আবার ডাকাতে দ্বিতীর মনে পড়ল। বলে উঠল,

“ ঢং কমিয়ে নাস্তা করতে চলুন। আম্মু ডেকে গিয়েছিল নাস্তা করতে..”
সাক্ষ্য হেসে পা বাড়াল। বউয়ের সাথে সাথে খাবার টেবিল অব্দি হাজির হয়েই ওর মনে পড়ল কাল রাতে ফোনে ও অদিতি আন্টিকেই দ্বিতী ভেবে কি বলে ফেলেছিল। শুকনো ঢোক গিলল মুহূর্তে। গলা ঝেড়ে বলল,
“ আম্মু, শুভ সকাল। ”
অদিতি আহমেদ বোধহয় অবাক হলেন। চোখজোড়ায় বিস্ময় নিয়ে চাইলেন সাক্ষ্যর দিকে। আম্মু? শুকনো হেসে উত্তর করলেন,
“ আম্মু? অদিতি আন্টিকে অবশেষে আম্মু বলছো? ”
সাক্ষ্য হেসে ফেলল কিঞ্চিৎ। বলল,
“ আগেই বলা উচিত ছিল। কিন্তু এতকাল আন্টিই ডেকে এসেছিলাম তো তাই। ”
অদিতি আহমেদ হাসলেন। বললেন,
“ যাক তবুও তো বললে আম্মু। আমি তো ভেবেছি কখনো বুঝি আম্মু বলবে না। এখন শান্তি লাগছে। এক ছেলে, এক মেয়ে। সুন্দরই! ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকে চাইল। তৎক্ষনাৎ বলে উঠল,

“ উনি তোমার ছেলে হলো কবে থেকে আম্মু? উনি তোমার বান্ধবীর ছেলে। ”
“ ঐ একইতো। আমার মেয়ের বরও তো হয় তাইনা? তো সে হিসেবেই তো ছেলেই তো আমার দ্বিতী।”
দ্বিতী উত্তর করল না আর। থমথমে মুখ নিয়ে খেতে লাগল। সাক্ষ্য ততক্ষনে চাপা হাসল। দ্বিতীর পাশাপাশি বসেই পায়ের পাতা রাখল দ্বিতীর পায়ের উপরই। অতঃপর আলতো করে পায়ের উপরে স্লাইড করতে করতেই চাইল দ্বিতীর দিকে। দ্বিতী বিরক্ত হলো। খাওয়া থামিয়ে চোখজোড়ায় রাগ নিয়ে চাইতেই সাক্ষ্য হাসল। ফের একই কাজ করতে করতেই আরামে খাবার খাওয়ায় মনোযোগ দিল। যেন সে দ্বিতীর রাগ নিয়ে তাকানোর কারণই জানে না। কিছু জানে না এমন এক ঢং করে ভদ্রভাবে খাবার শেষ করল। অতঃপর চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতেই পায়ের তালুটা যখন দ্বিতীর পায়ের পাতায় ঠিক তখনই টের পেল সূক্ষ্য খোঁচা। খোঁচাটা আরেকটু তীব্র হতেই সাক্ষ্য আর্তনাদ করে উঠল। পাশ ফিরে চেয়ে ঝুঁকতেই দেখল একটু ঝুঁকে থাকা দ্বিতী সোজা হয়ে বসল। বাম হাতের সেফটিফিনটা সযত্নে সরিয়ে নিল জামার আড়ালে। মুখে তখন বিশ্বজয়ের হাসি তার। অদিতি আহমেদ চিন্তিত হয়ে এগিয়ে আসতেই ফের ঝুঁকে দেখল সাক্ষ্যর ফর্সা পা টা। তর্জনী আঙ্গুলে যেখানটায় খোঁচা দিয়েছিল ওখানে হাত বুলিয়ে নিয়ে কিচ্ছু জানে না এমন একটা ভাব ধরে বলে উঠল,
“ আম্মু, টেবিলের নিচে বোধহয় আরশোলা। তোমার বান্ধবীর ছেলের পায়ে কামঁড় দিল বোধহয়। আয়হায়। ”
সাক্ষ্য তখন ভ্রু কুঁচকে চাইল। শুধু ছিঁচকাঁদুনে বউ হলেও মানা যেত। কিন্তু তার বউ তো একাধানে ছিঁচকাঁদুনে, ঝগড়ুটে, অত্যাচারি মহিলা সব!

সাম্য ছেলেটা বরারবই বাউন্ডুলে, বদমেজাজী আর বুদ্ধিশূণ্য একটা ছেলে। ওর জীবন ফাজলামো, হৈ চৈ, মারপিট এসব নিয়েই মেতে থাকে। বন্ধুবান্ধবদের সাথে এ শহর, ও শহর ঘুরে বেড়ানোই তার নেশা। পড়ালেখায় মন দিল কিছুই নেই ছেলেটার। দিলে আছে তার ব্ল্যাক বাইকটা। কিন্তু সাত সকালে তা না পেয়ে পা বাড়াল ছাদে। কার্নিশে দাঁড়িয়েই হুট করেই চোক পড়ল পাশেই থাকা কথার ছোট্ট বিড়ালটাকে। তার পাশেই গুঁটিকয়েক কথার লাগানো ফুলগাছ। কথা রোজ রোজ পরিচর্যা করে গাছগুলোর
একবার হলেও দেখে যায় গাছগুলো। সাম্য কালই দেখেছে কথার গোলাপ গাছটায় গুণে গুণে বারোটা গোলাপ ফুটবে। কথাই গুণেছিল। এবং এতগুলো ফুল ফুটবে ভেবে খুশিও হয়েছিল। কিন্তু সাম্য ফুটন্ত গোলাপ গুলো দেখতে মন চাইছে না। আর যায় হোক, কথা যে যে জিনিসে খুশি হয় তা তার ভালো লাগে না। তাই দুই পা বাড়িয়ে চিলেকোটার ঘরটা থেকে কাঁচি আনল সে।ওখানে গাছগাছালির যত্ন নেওয়ার সবকিছুই রাখা আছে। কথাই রাখে। সাম্য সে কাঁচিটা নিয়ে এসেই চাইল ফুলগুলোর দিকে। গাছভর্তি ফুটন্ত গোলাপ গুলেো দেখলে নিশ্চয় কথা ভীষণ খুশি হতো? কিছুটা সময় চেয়ে থাকত নিশ্চয়? সাম্য আর ভাবল না। একের পর এক ফুটন্ত লাল গোলাপ গুলো নিতে লাগল গাছ থেকে। মনে মনে আওড়াল,

“ কথারানী? তোর শখের ফুল গুলো নেই দেখে কি কষ্ট পাবি? নিশ্চয় টলমল চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকবি ? ইশশ! পা, কষ্ট পা কথা। আমি চাই ই তুই কষ্ট পা । ”
মনে মনে এসব বলতে বলতেই গাছের এগারোটা ফুটন্ত গোলাপ নিজের বাম হাতে নিল সাম্য৷ ইশশ! কি সুন্দর দেখাচ্ছে। পরমুহূর্তেই বারোতম গোলাপটা কাঁটতে নিয়েও সাম্য থেমে গেল। হাত বাড়িয়ে গোলাপটা টান দিয়েও আচমকা ছেড়ে দিল কি বুঝে। সাম্যর হাতটা থেমে গেল কেন জানি। অতঃপর ঐ গোলাপ গাছে রেখে দিয়েই বিড়বিড় করল,
“ কাঁথার বাচ্চা কাঁথা, এটা তোর জন্য রাখলাম। আর যায় হোক এত কষ্ট করে গাছগুলোর পরিচর্যা করিস। এক গোলাপও যদি না দেখতে পাস বেমানান দেখাবে না? তাই রাখলাম এটা। এটার দিকেই নাহয় কিছুক্ষণ চেয়ে থাকিস। ”
অতঃপর তার পরপরই কাঁচিটা রেখে এসে দাঁড়াল সাম্য। হাতের গোলাপ গুলো উলোট পালট করে দেখে মৃদু হাসল সে। তারপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিড়ালটার দিকে চেয়েই মুখ বাঁকিয়ে বলল,

“ কিরে তোর মালিক সাহেবার গাছের ফুল নিয়েছি বলে ওভাবে তাকিয়ে আছিস নাকি হুহ? তো তোর মালিক সাহেবা কোথায়? পড়তে পড়তে অজ্ঞান হয়ে গেছে নাকি? শোন, তোর মালিক সাহেবা হচ্ছে এক নাম্বারের ধুরন্ধর বেয়াদব মহিলা। বুঝেছিস? ওর থেকে দূরেই থাকিস৷ সুযোগ হলে আমার দলেও আসতে পারিস। তোরা সবাই কেন যে ওর জন্য পাগল বুঝি না। ”
বিড়ালটা বোধহয় লেজ নাড়াল কিছু না বুঝেও। সাম্যর দিকে একবার চেয়ে ফের উল্টো ফিরতেই সাম্য ধমক দিয়ে ডাকল,
“ এই বেয়াদব, তোর সাথে কথা বলছি যে দেখছিস না? কথার মাঝে মুখ বাঁকাইয়া চইলা যাচ্ছিস কেন? পুরা বেয়াদব তৈরি হইতাছে কাঁথার থেকে দেখে দেখে।”
সাম্যর জোর গলায় বলা কথাটায় বোধহয় বিড়ালটা ফিরে চাইল। উপর পানে তাকিয়ে সাম্যর মুখে তাকাতেই সাম্য ফের বলল,

“ তুই জানস না? তোর মালিক যে তোরে রাইখা অন্য ছেলের সাথে টইটই করে? জানস কিনা? জানলেও চুপ কইরা বইসা থাকস কেন হুহ? নিজে তো একটা বেয়াদব, পালেও একটা বেয়াদব আবার মিশছেও গিয়ে আরেক বেয়াদবের সাথে।”
বিড়ালটা বোধহয় আর শুনতে চাইল না সাম্যর কথা। কিছুটা বিরক্ত হলো কিনা কিজানি তবে পা বাড়াতে চাইল সামনে ফিরে। সাম্য তখন ঝুঁকে বসল। বিড়ালটাকে জোরপূর্বক ধরে নিয়েই বলে উঠল,
“ তুই জানিস আমি বিড়াল পছন্দ করি না। আমি তোর মালিকরেও পছন্দ করি না। শত্রু ও! বিরক্ত লাগে ওকে। দুই চোখে সহ্য করতে পারি না। ওকে কষ্ট পেতে দেখলে আমার কি যে ভালো লাগে জানিস? প্রতিশোধ প্রতিশোধ! সে প্রতিশোধ নিতে আমি তোরে দুই বছর আগে একবার আমার বন্ধুর বাড়িতে রেখে আসছিলাম। প্ল্যান ছিল জাস্ট দুইটা দিন ঐ মেয়েরে কষ্ট পাইতে দেখব। কেন জানিস? তোর মালিকরে কষ্ট পাইতে দেখতে আমার ভালো লাগে। শান্তি শান্তি। কিন্তু তারপর কি হলো বল তো? আমারে টানা দুইদিন খেতে দেয় নাই আমার বাপ। আমারে এক মাস টাকা দেয় নাই হাত খরচের। তোর মালিকের জন্য তো কথা শুনি, আমি তোর জন্যও সেবার কথা শুনছি। এখন তুই কোথাও চইলা গেলেও দোষ পড়ব আমার উপরেই। ভাববে আমি লুকাই ফেলছি। ”
বিড়ালটা সাম্যকে পছন্দ করে না। বলা চলে সাম্যই বিড়ালটাকে সবসময় দূর দূর করে বলে ওর ধারেকাছেও ঘেষে না। অথচ কথার সাথে ঠিকই চিপকে থাকে। সাম্যকে পছন্দ করে না বলেই বোধহয় বিড়ালটা সাম্যর থেকে ছুটতে চাইল। আঁছড়ও কাঁটল সাম্যর হাতেই। সাম্য মুহূর্তে হাতটা ঝাড়া দিল। বলল,

“ কিরে তুই তো দেখি বেঈমান তোর মালিকের মতোই। কার বাপের খাবার খাস জানোয়ার? আমার বাপের। আর আঁছড় কাটস আমারেই? সাহস কত!”
সাম্য যখন কথাগুলো বলছিল ঠিক তখনই কথা হাজির হলো। ঝুঁকে বসেছে তাদেরই পাশে। ভ্রু কুঁচকে বলে উঠল,
“ ওকে ছেড়ে দে সাম্য। এভাবে ধরে রেখেছিস কেন ওকে? ”
সাম্য চাইল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিড়ালটাকে কথার কোলে ছুড়ে দিয়ে বলে উঠল,
“ তোর বিড়ালটা তোর মতোই। বেয়াদব! অসভ্য। আদব কায়দা শিখাস না নাকি? মানুষকে কষ্ট দেওয়া না দেওয়া শিখাস কিছু? ”
কখা ততক্ষনে নিজের বিড়ালটাকে দুই হাতে নিয়ে বলল,

“ তুই বুঝি খুব আদব কায়দা জানিস সাম্য? ”
সাম্য প্রায় সঙ্গেই কাঁটাযুক্ত গোলাপ গুলো নিয়েই কথার গলায় আলতো চাপ দিয়ে ধরল। চোখ রাঙিয়ে বলল,
“ এই তুই তুই করিস কাকে হুহ? আবার নাম ধরে বলিস? সাহস কত তোর? সম্মান দিয়ে কথা বলবি বুঝলি?বানাচ্ছিস তো তোর মতোই একটা। পুরা কপি। বিড়ালও কিভাবে মানুষকে কপি করে তা তোর বিড়ালরে দেখলেই হয়। ”
কথা চাইল। সাম্য এবারে গলা থেকে হাত সরিয়ে তর্জনী আঙ্গুল তুলে বলল,
“ নেক্সটটাইম তুই করে বললে তোকে আমি ছাদ থেকে ছুড়ে ফেলব কথা। মাইন্ড ইট। ”
সাম্য যখন গলা থেকে গোলাগুলো সহ হাতটা সরিয়ে আনছিল ঠিক তখনই গোলাপের কাঁটায় ছিলে গেল কথার গলার নরম ত্বক। এক হাত গল্য় চেপেই ও উঠে দাঁড়াল। পিছু ফিরতেই সাম্য গলা উঁচিয়ে বলল,
“ এই! দাম কাকে দেখাস তুই? কথা বলছি না আমি তোর সাথে? কথার মাঝে তুই চলে যাওয়ার অনুমতি পাস কি করে? বেয়াদব। তোর বিড়ালটাও তোর মতোই বেয়াদব। কথার মাঝেই মুখ ঘুরাইয়া চইলা যায়।”
কথা চাইল এবারে। চোখে তীব্র অভিমান ফুটিয়ে বলল,

“ কিছু বলবা? ”
“বলব নাকি বলব না আমার ব্যাপার। কিন্তু তোকে তো যাওয়ার অনুমতি দেই নাই আমি। ”
“ ক্লাস আছে আমার। ”
“ কি করবি এত পড়ে? আদব কায়দা তো কিছু শিখিস না। বড়দের রেসপ্যাক্ট করতে পারিস না এখনো অব্দি। ”
কথা ছোট শ্বাস ফেলল। ঠিক এতোটা সময়ে মুখ ঘুরিয়ে দেখল তার গোলাপ গাছটা শূণ্য। বারোটা ফুল ফুটবে বলে যে আশা ধরে তা এক মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। গাছে মাত্র একটা ফুল। একটা! বাকিগুলো কোথায় তা বুঝতে বাকি রইল। সাম্যর হাতের গোলাপ গুলোই ওগুলো। কথা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চোখজোড়া কেমন যেন টলমল করছে তার। ঠোঁট কামঁড়ে কান্না আটকানোর বড্ড চেষ্টা করে সে শুধাল,
“ গোলাপ গুলো কি করেছিল তোমার? কাটলে কেন এগুলো? প্রতিবার আমার শখের জিনিস নষ্ট করে কি লাভ হয় তোমার? কি লাভ হয়? ”
সাম্য চাইল। কথার চোখজোড়া স্পষ্টই টলমল করছেে।যেন কেঁদে ফেলবেে।ফর্সা মুখটা লাল হয়ে এসেছে। সামান্য ফুলের জন্য এমন হয় কারোর? সাম্য ফোঁস করে শ্বাস টেনেই টানটান গলায় বলল,
“ প্রচুর লাভ। তোকে কষ্ট পেতে দেখলে শান্তি লাগে আমি। অসম্ভব রকমের শান্তি। ”
“ এইজন্যই প্রিয় জিনিস গুলোর উপর রাগ উড়াও? আমার রাগ ঐসব জিনিসের উপর উড়াও? হাস্যকর! ”
কথা এই টুকু বলেই তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসল। মনে মনে আওড়াল,“ অথচ তুমি যতি কখনো জানতে পারো তুমি মানুষটাই আমার প্রিয়, তাহলে? তাহলে কি করবে? নিশ্চয়ই কখনো তোমাকে দিয়ে বসবে না, তাই না? নিশ্চয় দিবে প্রত্যাখান, অপমান আর অবহেলা।”
সাম্য কথার মনের কথাগুলো জানতেই পারল না। জানলেও কি বলত? সাম্য উত্তর দিল,
“ রাগ না। এটাও শান্তির জন্যই করি।আবার এটা তোর শাস্তিও ধরে নে। বলেছি না নিহালের সাথে মিশবি না? বলেছি কিনা? অথচ তুই ঠিকই নিহালের সাথে যোগাযোগ করিস। বেঈমান! বড়দের কথার গুরুত্ব দিতে জানিস না বেয়াদব।”
কথা কন্ঠ শক্ত করেই বলল,

“ কথা ঘুরাচ্ছো? গোলাপগুলো নিলে কেন হুহ? আর যদি বলো বড়দের কথা গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে তো আমি বলব, তুমি বয়সেই বড় হয়েছো। আসল বড় হওয়ার দিক দিয়ে তুমি আমার থেকেও ছোট। তুমি এখনো ইমম্যাচিউরড বুঝলে? অপরিপক্ব!শোনো, আমি মিশব। আমার ইচ্ছে কার সাথে মিশব, মিশব না।”
“ ফাইন মিশ। পরে পস্তালে তুই আর তোর মামা আমাকে ধরতে আসবি না। ব্যস। সাবধান করার আছে করছি। ”
কথা হেসে বলল,
“ তোর গোলাপ গুলো নিলে কেন? জবাব দাও। ”
সাম্য নিজেও ত্যাড়া স্বরে বলল,

“ আমার ইচ্ছে, আমি গোলাপ নিব নাকি না নিব। আমার আব্বার বাড়ি, আমার আব্বার ছাদ। আমি নিব। আমার ইচ্ছে। আর কেন নিয়েছি জানিস? ভার্সিটিতে তোর ভাবিকে প্রোপোজ করবো তাই। ও বলেছে বাসার গোলাপ দিয়েই প্রোপোজ করতে হবে। তাই এই গোলাপ দিয়েই করব। বুঝলি?”

দুইজনাতেই পর্ব ৩৪

কথা চাইল। সাম্য তখন ফুলগুলো নিয়ে এগিয়েছে। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। নিজে গাছ লাগিয়ে সে গাছেরই ফুল যখন প্রিয় পুরুষের প্রিয় নারীর কাছে যাবে তখন নিশ্চয় খুব ভালো লাগবে?

দুইজনাতেই পর্ব ৩৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here