Home আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১৫

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১৫

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১৫
সাবিলা সাবি

লন্ডনের গ্র্যান্ড হিলটন হোটেলের বলরুমটা আজ অন্য এক রূপ নিয়েছে। সাদা আর সোনালী রঙের ফুলের সাজে পুরো হলঘরটা ঝাড়বাতির আলোয় ঝলমল করছে। হোটেলের বাইরে নিরাপত্তা রক্ষীদের কড়া নজরদারি, আর ভেতরে অতিথিদের সরব আনাগোনা—সব মিলিয়ে পরিবেশটা আজ দারুণ উৎসবমুখর।
মঞ্চের ঠিক কেন্দ্রে সাজানো হয়েছে বসার জায়গা। লিওন বিয়ে উপলক্ষে পরেছে গাঢ় রঙের একটি শেরওয়ানি, যা তার ব্যক্তিত্বকে আরও জোরালো করে তুলেছে। তার পাশেই হুইলচেয়ারে বসা মায়া যার পরনে মেরুন রঙের লেহেঙ্গা, আর তার শরীরের অলংকারগুলো তার স্নিগ্ধতাকে আরও কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছে। তার চোখেমুখে ফুটে উঠেছে লাজুক আনন্দ। লিওন মায়ার পাশেই দাঁড়িয়ে তাকে দেখছিলো, মায়ার মুখের মিষ্টি হাসি দেখে লিওনের মনে হলো, এই মুহূর্তের জন্য সে কতটা অপেক্ষা করে এসেছে যে মায়া হাসবে প্রাণ খুলে।
মঞ্চের সামনের সারিতে পাশাপাশি বসে আছেন এসিপি, সিআইডি অফিসার রওশন, নোভা, আরিয়ান এবং ইন্টারপোলের আরো কর্মকর্তারা। বিয়ের আয়োজনের স্বাভাবিক আনন্দটুকু তাদের হাসিখুশি মুখগুলোতে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। একে অপরের সাথে টুকটাক কথা বলার ফাঁকে তারা যখন মঞ্চের দিকে তাকাচ্ছেন, তখন তাদের মুখে ছড়িয়ে পড়ছে তৃপ্তির হাসি; তাদের প্রিয় দক্ষ অফিসারের জীবনের এই বিশেষ মুহূর্তটি তারা পুরোপুরি উপভোগ করছেন।

আর্থার হায়াস তার বিজনেস পার্টনারদের সাথে নিয়ে সোফায় বসে আগত অতিথিদের সাথে কুশল বিনিময় করছেন। মঞ্চের এক পাশে লিওনের বোন অ্যামেলিয়া এবং তার স্বামী রুদ্রনীল অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পুরো অনুষ্ঠানের প্রতিটি দিক তদারকি করছেন। মৃদু মিউজিকের সুর আর ফুলের সুবাস পুরো হলঘরের পরিবেশটা আভিজাত্য পুর্ণ করে তুলেছে। কোনো বাধা-বিপত্তি ছাড়াই এক রাজকীয় বিয়ের আয়োজন চলছে কাজী সাহেব বিয়ের প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিয়ে প্রস্তুত হয়ে বসে আছেন।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা তখন প্রায় তুঙ্গে। ঠিক সেই মুহূর্তে এসিপি-র ফোনটা বেজে উঠল। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসা শীতল কণ্ঠস্বরটি শুনতেই এসিপি-র মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কোনো ভূমিকা ছাড়াই কণ্ঠটি একটি নির্দিষ্ট ঠিকানার নাম উচ্চারণ করল এবং যান্ত্রিক গলায় শুধু বলল, “এখানে একটা লাশ পড়ে আছ, আপনারা তাড়াতাড়ি চলে আসুন।”

খবরটা পাওয়ার সাথে সাথে এসিপি, আরিয়ান এবং নোভা-সহ দলের বেশিরভাগ অফিসারের হাসিখুশি মুখ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে উঠল। কোনো কালক্ষেপণ না করে তারা দ্রুত হলরুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। পরিস্থিতি বুঝে রওশনকে দায়িত্ব দেওয়া হলো লিওনের পাশে থাকার জন্য। উৎসবের আমেজটুকু মুহূর্তে থমথমে হয়ে গেল; বাইরের নিরাপত্তা আর ইন্টারপোলের কড়া নজরদারি আগের মতোই বহাল রইল,
ঠিক সেই মুহূর্তে হলের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো একযোগে নিভে গেল—ইভানা তার নিপুণ দক্ষতায় পুরো সিস্টেমটি হ্যাক করে ফেলেছে। নিমেষের মধ্যে আলোর ঝলকানি মিলিয়ে গিয়ে পুরো হলরুম নিরেট অন্ধকারে ডুবে গেল। বাইরে ইন্টারপোলের অফিসাররা তখন মার্ক ও ইভানার সাজানো এক গোলকধাঁধায় দিশেহারা। আর এদিকে, হোটেলের বাইরের চত্বরে থাকা পঞ্চাশ জনেরও বেশি সশস্ত্র গার্ডের মুখোমুখি হলো হিয়া। কোনো শব্দ না করে, চোখের পলকে সে বিষাক্ত গ্যাসের ক্যানিস্টারগুলো ছড়িয়ে দিল বাতাসে। গার্ডরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই গ্যাসের তীব্র প্রভাবে এক এক করে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে লাগল।
হলরুমের ভেতরে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। পরিস্থিতির আকস্মিকতায় আতঙ্কিত অতিথিদের চিৎকারে কান পাতা দায়। লিওন তাৎক্ষণিক নিজের ফোনের ফ্লাশলাইটটা জ্বালাল, একই কাজ করলেন রওশন আর উপস্থিত বাকি অতিথিরাও। আলোর ক্ষীণ রেখায় আতঙ্কিত মানুষের ছায়াগুলো দেয়ালে তখন কম্পমান। লিওন পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরেই নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা তুচ্ছ করে মায়ার হুইলচেয়ারের আরো কাছে গিয়ে ঢাল হয়ে দাঁড়াল, তার প্রতিটি পেশি এখন চরম সতর্ক।

হঠাৎ করেই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে কে একজন বিদ্যুৎগতিতে লিওনের ঘাড়ের কাছে একটা সূচ ফুটিয়ে দিল। তীক্ষ্ণ ব্যথায় লিওন আর্তনাদ করার আগেই,শীতল অনুভূতি তার স্নায়ুগুলোকে অবশ করে দিতে শুরু করল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার শরীর ঝিমিয়ে এল, চোখের সামনে সবকিছু ধোঁয়াটে হয়ে গেলো।
অন্ধকারের অস্পষ্ট আবহে দুজন ছায়ামূর্তিকে দেখা গেল তারা সুনিপুণ দক্ষতায় হিয়াকে সাহায্য করছে। রওশন বা উপস্থিত কেউই কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা লিওনকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল।
হোটেলের পেছনের গলিতে আগে থেকেই ইঞ্জিন চালু রাখা ছিল একটি অ্যাম্বুলেন্স। হিয়া আর তার সহযোগীরা দ্রুত লিওনকে গাড়ির ভেতরে নিয়ে এল। তারা হিয়ার পাশে লিওনকে বসিয়ে দিতেই তার অচেতন মাথাটা আলতো করে হেলে পড়ল হিয়ার কাঁধের ওপর। গাড়ির ভেতর শুধু হিয়া আর চালকের আসনে থাকা ড্রাইভের ছাড়া আর কেউ নেই।

মার্ক আর ইভানা আগেই তাদের নির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে আলাদা গাড়িতে রওয়ানা দিয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সের চাকার কর্কশ শব্দ রাতের নিস্তব্ধতা চিরে শহর ছেড়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলল। গাড়ির মৃদু আলোয় লিওনের নিথর মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল হিয়া। তার কাঁধে লিওনের মাথা—এইটুকু ঘনিষ্ঠতাই তার কাছে সব জয়ের চেয়েও বেশি মূল্যবান। রওশন বা পুলিশের নাগালের অনেক বাইরে, অজানার উদ্দেশ্যে ধেয়ে চলল সেই অ্যাম্বুলেন্স, যেখানে লিওন এখন হিয়ার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে।
হলের বাতিগুলো দপ করে জ্বলে উঠতেই উৎসবের আমেজটা মুহূর্তেই উবে গেল। অতিথিরা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছেন, চোখেমুখে আতঙ্ক আর বিভ্রান্তি। ঠিক যে মঞ্চে একটু আগেই লিওনার্দো বসে ছিল, সেখানে এখন কেবল এক বিশাল শূন্যতা। পুরো হলঘরটা তখন এক ভুতুড়ে নীরবতায় থমথম করছে।

আর্থার হায়াস দ্রুত পায়ে হোটেলের বাইরে বেরিয়ে এসে থমকে দাঁড়ালেন। তার চোখের সামনে বিভীষিকার মতো পড়ে আছে সারি সারি অচেতন গার্ড। ইন্টারপোলের অফিসাররা তখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে, তারা বড় কোনো নিখুঁত ফাঁদে পা দিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে গাড়ির ইঞ্জিন গর্জে উঠল, টায়ারের আর্তনাদে রাস্তা কাঁপিয়ে তারা কিডন্যাপারদের ধাওয়া করতে বেরিয়ে পড়ল। রাতের রাস্তা তখন এক উত্তপ্ত অভিযানের অপেক্ষায়।
ঠিক সেই মুহূর্তেই মায়ার শরীরটা হঠাৎ খারাপ করতে শুরু করল। শিরিন হায়াস আর অ্যামেলিয়া তাকে ঘিরে ধরে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, কিন্তু মায়ার চোখে তখন দিশেহারা আতঙ্ক। ওদিকে রুদ্রনীল তড়িঘড়ি করে বাইরে বেরিয়ে এসে প্রেস মিডিয়াকে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য কল করল। মায়ার শ্বাসকষ্ট ততক্ষণে তীব্র আকার ধারণ করেছে; অসহ্য যন্ত্রণায় সে হুইলচেয়ার থেকে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
আর্থার হায়াস দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে রওশনকে সাহায্যের জন্য চিৎকার করে উঠলেন। রওশন এক মুহূর্ত দেরি না করে মায়াকে ধরে কোলে তুলে নিল এবং দ্রুত হোটেলের ওপরতলার একটি কক্ষে নিয়ে গেল। বিছানায় আলতো করে শুইয়ে দিয়ে সে এক গ্লাস পানি বাড়িয়ে দিল, কিন্তু মায়ার শরীর থরথর করে কাঁপছে, তার হাত কাঁপছে, আর চোখের দৃষ্টিতে গভীর অন্ধকার নেমে আসছে।

মায়া কান্নায় ভেঙে পড়ল। রওশনের হাতটা দুই হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ভাঙা গলায় কোনোমতে উচ্চারণ করল, “প্লিজ, অফিসার রওশন, লিও ভাইয়া কোথায়? কী হয়ে গেল এসব? কারা তাকে নিয়ে গেল? ওনার যদি কিছু হয়ে যায়… আমি শেষ হয়ে যাবো।”
রওশন মায়ার মাথায় আলতো করে হাত রাখল, সান্ত্বনা দিয়ে পরিস্থিতিটাকে কিছুটা সহজ করার চেষ্টা করলো। কিন্তু ভেতরে ভেতরে রওশন নিজেও জানে, সে মিথ্যে আশ্বাস দিচ্ছে। পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ এবং জটিল হয়ে উঠেছে, তা তার অজানা নয়। তবু এই মুহূর্তে মায়াকে একা ছেড়ে দেওয়া কিংবা তার সামনে ভেঙে পড়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। সে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে মায়ার দিকে তাকিয়ে থাকল, যে চাহনিতে সহানুভূতি থাকলেও গভীর উদ্বেগের ছায়া স্পষ্ট।
রওশন মুহূর্তের বিলম্ব না করে এসিপিকে ফোন করল। ওপাশ থেকে এসিপি যে খবর দিলেন, তাতে রওশনের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। কল করে লোকেশনের বলা খুনের সেই খবরটা ছিল পুরোদস্তুর এক সাজানো নাটক—কেবল পুলিশ বাহিনীকে হলরুমের নিরাপত্তা বলয় থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পিত এক চাল। কিডন্যাপাররা প্রতিটি মুহূর্ত আগে থেকেই গুনে রেখেছে, এক ঠান্ডা মাথার নিখুঁত পরিকল্পনা।

এদিকে হোটেলের লবিতে আর্থার হায়াস আর শিরিন হায়াস এক দুঃস্বপ্নের মধ্যে ডুবে গেলেন। উৎকণ্ঠার চোটে আর্থার হায়াসের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে, আর শিরিন হায়াস বারবার অস্ফুট স্বরে দোয়া করছেন। তাদের দুশ্চিন্তা আর আতঙ্ক লবির বাতাসকে ভারী করে তুলেছে—সন্তান হারানোর আশঙ্কায় প্রতিটি সেকেন্ড তাদের কাছে একেকটা যুগের মতো মনে হচ্ছে।
ততক্ষণে খবরটা আগুনের মতো পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। লন্ডনের বড় বড় টিভি চ্যানেলের পর্দায় লাল রঙের স্ট্রিপে ব্রেকিং নিউজ ভেসে উঠছে—‘বিয়ের আসর থেকে অপহৃত সিআইডি অফিসার লিওনার্দো হায়াস’, ‘লন্ডনের বুকে বড় ধরণের নিরাপত্তা ভেদ’। হেডলাইনের পর হেডলাইন দেখে সারা শহরে চাঞ্চল্য আর গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। পুলিশ প্রশাসন নড়েচড়ে বসল, লিওনার্দোকে উদ্ধারের জন্য পুরো লন্ডনে জারি করা হলো রেড অ্যালার্ট। প্রতিটা মোড়ে মোড়ে পুলিশের ব্যারিকেড, চেকপোস্ট, আর আকাশ চিরে চক্কর দিচ্ছে পুলিশের হেলিকপ্টার। শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলোয় তখন এক থমথমে উত্তেজনা, যা সাধারণ মানুষের মনেও জাগিয়ে তুলেছে গভীর শঙ্কা।

টাউন হাউসের ড্রয়িংরুমে দানিয়েল অস্থির পায়ে পায়চারি করছে। টেলিভিশনের পর্দায় ব্রেকিং নিউজগুলো জ্বলছে—‘বিয়ের মণ্ডপ থেকে অপহৃত সিআইডি অফিসার লিওনার্দো হায়াস’। হেডলাইনের প্রতিটি শব্দ তার বুকে তীরের মতো বিঁধছে। সে মরিয়া হয়ে বারবার ভাইপারকে ফোন করছে, কিন্তু প্রতিবারই ফোনের ওপাশ থেকে সেই যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে—‘দ্য কল ইউ আর ট্রাইং টু রিচ ইজ কারেন্টলি নট রিচেবল’।
ভাইপারের সেই শেষ কথাগুলো তার মাথায় বারবার অনুরণন তুলছে—আজ বড় কোনো মিশনে যাচ্ছে সে। আর ঠিক একই সময়ে লিওনার্দোর অপহরণ? দানিয়েল মুহূর্তের মধ্যেই পুরো বিষয়টা বুঝে ফেলল। ভাইপার এখন কোনো এক ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশনের গভীরে ডুবে আছে, যেখানে চাইলেই যোগাযোগ করা অসম্ভব। দানিয়েলের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারছে, আজ রাতে লন্ডনের বাতাসে বড় কোনো ঝড় উঠতে চলেছে। ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, কেবল ভাইপারের পরবর্তী সংকেতের অপেক্ষায়—যে সংকেত হয়তো গোটা পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেবে।

শহরের ব্যস্ত রাজপথ পেছনে ফেলে অ্যাম্বুলেন্সটি তখন দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে গন্তব্যহীন কোনো নির্জনতায়। গাড়ির ভেতরের আবছা নীল আলোয় হিয়া বসে আছে একধারে, তার পুরো মনোযোগ লিওনের অচেতন দেহটার ওপর। লিওনের মাথাটা পরম নিশ্চিন্তে হেলে আছে ভাইপারের কাঁধে। হিয়া স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লিওনের শান্ত, নিথর মুখের দিকে—যে মুখটা ঘিরে এখন পুরো শহর তোলপাড় চলছে। হিয়ার আঙুলগুলো আলতো করে লিওনের শেরওয়ানির হাতাটা স্পর্শ করল, আচমকা সে ঝুঁকে এল লিওনের দিকে; তার ঠোঁটজোড়া ছুঁয়ে গেল লিওনের কপালে। একটা গভীর, শীতল আর তীব্র চুমু। বাইরের অন্ধকার আরও গাঢ় হয়ে এল, কিন্তু হিয়ার মুখে তখন তৃপ্তির হাসি ফুটে আছে।
বাইরের আকাশ চিরে পুলিশের সাইরেনের সেই যান্ত্রিক আর্তনাদ রাতের স্বাভাবিক ছন্দকে চুরমার করে দিচ্ছে। হেলিকপ্টারের প্রপেলারের ঝনঝনানি আর পুলিশের গাড়ির সাইরেনের কান ফাটানো শব্দ লন্ডনের অলিগলিতে অস্থির হাহাকার তৈরি করেছে। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরের সেই বদ্ধ পরিবেশে বাইরের এই শোরগোলের কোনো আঁচ নেই, সেখানে কেবল এক অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা।

হিয়া পাথরের মতো স্থির বসে আছে। সে খুব ভালো করেই জানে, সিআইডির বাঘা বাঘা অফিসার থেকে শুরু করে ইন্টারপোলের চৌকস দল এখন তাকে ধরতে মরিয়া হয়ে হন্যে হয়ে খুঁজছে। কিন্ত তাকে ধরার ক্ষমতা কারো নেই, কারণ সে জানে, এই অন্ধকারের অতল গহ্বরে সে শুধু লিওনকে নিয়ে হারিয়ে যায়নি, বরং লন্ডনের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় বসে সে এখন নিজের এক নতুন খেলা খেলছে।
হিয়া তার পকেটে থাকা ফোনটা বের করল। নেটওয়ার্কের সীমানায় আসতেই ফোনের স্ক্রিনে একের পর এক নোটিফিকেশন ভেসে উঠল—দানিয়েলের অসংখ্য মিসড কলের বার্তা। সে এক চিলতে মুচকি হাসল। ফোনটা সাইলেন্ট মোডে ফেলে সে পুনরায় লিওনের দিকে তাকিয়ে রইলো।

লন্ডনের রাস্তাঘাট তখন পুলিশের সাইরেনের শব্দে থমথমে। প্রতিটি মোড়ে বসানো হয়েছে ব্যারিকেড। অ্যাম্বুলেন্সটি একটি চেকপোস্টের সামনে এসে থামতেই পুলিশের জোরালো টর্চের আলো ভেতরে এসে পড়ল।
হিয়া তখন চরম ব্যস্ত। সে লিওনকে রোগীর বেডে শুইয়ে দিয়ে শরীরটা কম্বল দিয়ে এমনভাবে ঢেকে রেখেছে যে, দেখে মনে হবে সে লাইফ সাপোর্টে থাকা কোনো মুমূর্ষু রোগী। হিয়া তখন চরম দক্ষতায় লিওনের ওপর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সে দ্রুত লিওনের মুখে একটি অক্সিজেন মাস্ক পরিয়ে দিল, যার পাইপ গিয়ে যুক্ত হলো গাড়ির ভেতরের সিলিন্ডারের সাথে। মাস্কের প্লাস্টিক আর টিউবগুলো লিওনের মুখের অনেকটা অংশ ঢেকে ফেলেছে, ফলে বাইরের কারও পক্ষে চট করে লিওনার্দো হায়াসকে চেনা প্রায় অসম্ভব।

হিয়া দ্রুত নিজের ওপর চাপিয়ে নিল একটি সাদা নার্সের অ্যাপ্রন আর গলায় ঝুলিয়ে নিল স্টেথোস্কোপ। চুলে বেঁধে নিল শক্ত একটা খোঁপা, আর মুখে মাস্ক টেনে দিয়ে নিজের চেহারাটা প্রায় পুরোটাই ঢেকে ফেলল।
টর্চের আলো তার মুখের ওপর এসে পড়তেই সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মাস্কের ওপর দিয়ে শান্ত চোখে পুলিশ অফিসারটির দিকে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে কোনো ভয় নেই, আছে কেবল একজন দায়িত্বশীল নার্সের ক্লান্তি আর ব্যস্ততা। পুলিশ অফিসারটি ভেতরে একবার উঁকি দিয়ে লিওনের অসার দেহটা দেখল, তারপর হিয়ার দিকে তাকিয়ে কিছুটা ইশারায় অ্যাম্বুলেন্স ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিল। হিয়া কোনো কথা না বলে মাথাটা সামান্য ঝাঁকাল, যেন সে আসলেই এক ক্লান্ত নার্স। তাদের সন্দেহ করার মতো কিছুই পেল না পুলিশ। ড্রাইভার শান্ত হাতে গাড়ি স্টার্ট দিল। পুলিশের ব্যারিকেড পেরিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটি যখন অন্ধকার গলির দিকে মোড় নিল, হিয়া তখনও নার্সের পোশাকের আড়ালে। এই শহরের বড় বড় অফিসাররা তখনো বুঝতে পারেনি, যাদের তারা হন্যে হয়ে খুঁজছে, তারা চোখের সামনে দিয়েই ধোঁকা দিয়ে বেরিয়ে গেছে। শহরের আলো যখন পেছনে ফিকে হয়ে আসছে।

শহরের কোলাহল আর পুলিশের সাইরেনের শব্দ পেছনে ফেলে অ্যাম্বুলেন্সটি অনেকক্ষণ ধরে ছুটল। লন্ডনের ঝকঝকে রাস্তাগুলো ক্রমে সংকীর্ণ আর অন্ধকার হয়ে এল। শহরতলির এক পরিত্যক্ত টানেলের মুখে এসে গাড়িটি থামল। টানেলটির মুখ লতাপাতা আর ময়লায় এমনভাবে ঢাকা যে, বাইরে থেকে একে কোনো সাধারণ পরিত্যক্ত গুহা ছাড়া কিছুই মনে হয় না।
অ্যাম্বুলেন্সের দরজা খোলার সাথে সাথে বাইরের স্যাঁতসেঁতে শীতল হাওয়া হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে এল। গাড়ি থামার পরপরই হিয়া ফোনের বাটন টিপল। ওপাশে কানেকশন পেতেই তার শীতল কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “আমরা পৌঁছে গেছি।”
মুহূর্তের মধ্যে টানেলের গহীন অন্ধকার চিরে বেরিয়ে এল ছায়ার মতো কিছু মানুষ। তাদের চোখে কোনো বিস্ময় নেই, তাদের দেখলে মনে হবে তারা এই মুহূর্তটির জন্যই অপেক্ষায় ছিল। ড্রাইভার আর ওই লোকগুলো মিলে লিওনকে সাবধানে স্ট্রেচার থেকে তুলে নিল। অক্সিজেনের মাস্কে ঢাকা লিওনের নিথর মুখটা দেখে হিয়ার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল লিওনের বিয়ের সেই দামী শেরওয়ানিটা এখন ধুলোয় মলিন, আর বুকের ওপর হাতটা অবশ হয়ে পড়ে আছে।

হিয়া গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। বাইরেটা কনকনে ঠান্ডা। সে একবার লিওনের শেরওয়ানির কোঁচকানো কলারটা আঙুল দিয়ে আলতো করে সোজা করে দিল, তার চোখে তখনো কোনো অস্থিরতা নেই, বরং এক শীতল মায়া বিরাজমান। সে জানে, এই টানেলের ভেতরেই সে গড়ে তুলেছে তার নিজের এক রাজকীয় কারাগার—যেখানে লন্ডনের আলো আর কোনোদিন পৌঁছাবে না। লোকগুলো লিওনকে নিয়ে টানেলের ভেতরের রাজকীয় আস্ততানার গহীনের দিকে এগিয়ে চলল। এখন থেকে লিওনার্দো হায়াস আর সিআইডি অফিসার নয়; সে ভাইপারের এই অন্ধকার রাজ্যের একমাত্র রাজকীয় বন্দী।
টানেলের ভারী লোহার দরজাটি সরতেই ভেতরের দৃশ্যটি পুরোপুরি চমকে দেওয়ার মতো। বাইরে যেখানে স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারের বিস্তার,ভেতরে সেখানে আধুনিক বিলাসিতা। দেয়ালে সোনালী ফ্রেমের প্রাচীন পেইন্টিং, মেঝেজুড়ে ঘন মখমলের গালিচা, আর সিলিং থেকে ঝুলে থাকা ঝাড়বাতির মৃদু আলোয় পুরো আস্তানাটা লন্ডনের কোনো আভিজাত্যপূর্ণ প্রাসাদের অংশের চেয়ে কম না। আধুনিক এয়ার-কন্ডিশনারের মৃদু গুনগুন শব্দ ছাড়া সেখানে আর কোনো আওয়াজ নেই।

হিয়া এবার তার অভিনয়টুকু পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলল। সে নার্সের সেই সাদা অ্যাপ্রনটা খুলে আলতো করে পাশে ছুঁড়ে ফেলল, সঙ্গে সঙ্গে খুলে ফেলল হাতে থাকা রাবারের দস্তানা। মাস্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই ক্লান্ত নার্সের ছদ্মবেশ মুছে ফেলে সে যেন আবার নিজের স্বরূপে ফিরে এল। তারপর লিওনের পাশে গিয়ে দাঁড়াল, আলতো করে তার মুখের সেই অক্সিজেন মাস্কটা খুলে নিল। নিথর লিওনের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে হিয়ার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক নিষ্ঠুর জয়ের হাসি।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পর লিওনের চোখের পাতা কেঁপে উঠল। আবছা অন্ধকারে চোখ মেলতেই সে বুঝতে পারল, লোহার কোনো চেয়ারে শক্ত দড়িতে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে। মাথাটা প্রচণ্ড ভারি হয়ে আছে, তবু সিআইডির প্রশিক্ষিত মস্তিষ্ক এক পলকেই সজাগ হয়ে উঠল। আশেপাশে সাতজন লোক পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে; তারা নিচু স্বরে ফিসফিস করে কথা বলছে কিছু একটা।

লিওন নড়ল না, অচেতন হওয়ার অভিনয় চালিয়ে গেল। একজন গার্ড পানির গ্লাস হাতে এগিয়ে আসতেই লিওন বিদ্যুৎগতিতে তার পেটে প্রচণ্ড জোরে একটা লাথি মারল। গার্ডটি ছিটকে মেঝেতে পড়ল। এই সুযোগে লিওন চেয়ারসহ উঠে দাঁড়াল। গার্ডরা তাকে ধরার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হলো হাতাহাতি আর ধস্তাধস্তি। এই প্রবল লড়াইয়ের এক পর্যায়ে চেয়ারের কোণায় ঘষা লেগে তার কবজির দড়িটি ছিঁড়ে গেল। সে এখন পুরোপুরি মুক্ত। মুহূর্তের মধ্যে সে বাকি দু’জনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
শুরু হলো রক্তক্ষয়ী লড়াই। লিওন একজন গার্ডের চোয়ালে প্রচণ্ড ঘুসি মেরে তাকে ধরাশায়ী করল। অন্যজন পেছন থেকে জাপটে ধরলে লিওন কনুই দিয়ে তার পাঁজরে সজোরে আঘাত করল। ধস্তাধস্তির মাঝেই লিওন গর্জে উঠল, “কে এনেছে আমাকে এখানে বল? কার এত সাহস?”
মার খেয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা গার্ডটি কাঁপতে কাঁপতে অস্ফুট স্বরে বলল, “ভাইপার… আমাদের বস ভাইপার।”

ভাইপারের নামটা শোনামাত্রই লিওনের রাগের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে গেল। তার চোখ দুটো রাগে জ্বলছে। সে লোকটির কলার চেপে ধরে দেওয়ালে আছাড় মারল।
মারামারি করতে গিয়ে একজন গার্ডের ঘুষিতে লিওনের ঠোঁট কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। তার শেরওয়ানি ছিঁড়ে জরাজীর্ণ অবস্থা, কিন্তু তেজ একটুও কমেনি। আত্মরক্ষার জন্য গার্ডরাও তাকে পাল্টা আঘাত করতে শুরু করল। লিওন একজনকে দেয়ালের সাথে পিষে ধরে চিৎকার করে উঠল, “কোথায় সে? ওকে ডাক! এখনই আমার সামনে আসতে বল ওকে তোদের বসকে!”
পুরো আস্তানায় লিওনের গর্জন প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরতে লাগল। সে ক্ষিপ্ত বাঘের মতো খাঁচার ভেতর পায়চারি করছে আর গার্ডদের একের পর এক আঘাত করছে। তার প্রতিটি ঘুসি মনে হলো ভাইপারের জন্য বরাদ্দ রাখা এক একটি জবাব। সে থামতে রাজি নয়; সে জানে ভাইপার কোথাও না কোথাও থেকে এই দৃশ্য দেখছে। লিওন আবার চিৎকার করে বলল, “সামনে এসো ভাইপার! লুকিয়ে থেকে কী হবে? আজ তোমার আর আমার—যেকোনো একজনের শেষ হবে!”
আস্তানার ভেতরে উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে। লিওন ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছে, কাটা ঠোঁট থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত তার শেরওয়ানির কলার ভিজিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ অন্ধকারের বুক চিরে ধীর পায়ে বেরিয়ে এল তিনটা ছায়ামূর্তি—মার্ক, ইভানা আর ঠিক মাঝখানে ভাইপার।

আলোর রেখা হিয়ার ওপর পড়তেই লিওনের হাতের মুষ্টি আলগা হয়ে গেল। সে পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে হিয়া। তার ভার্সিটির সেই জুনিয়র, যে লুকিয়ে নিয়মিত তার অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করে দিত। সেই হিয়া, যাকে থাইল্যান্ডের ট্যুরে দুই দুইবার বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল লিওন। সেই রাত, যখন তারা জঙ্গলে হারিয়ে গিয়েছিলো আর গাছের ওপর টং ঘরে কাটানো সেই দীর্ঘ রাত—সবকিছু তার চোখের সামনে ভেসে উঠল।
লিওনের স্মৃতিতে হিয়া ছিল সেই শান্ত মেয়েটি, যার দেওয়া অ্যাসাইনমেন্টগুলো সে যত্ন করে বাড়িতে এনে রেখেছে সাত বছর ধরে। কিন্তু এই হিয়া আর সেই হিয়ার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। পুলিশের দেওয়া ভাইপারের বর্ণনার সাথে হিয়ার উলফ-কাট চুল, কালো হুডি, আর ভ্রুর ওপর সেই পরিচিত পিয়ার্সিং হুবহু মিলে যাচ্ছে। লিওনের দৃষ্টি গিয়ে থামল হিয়ার ডান হাতের কব্জিতে। সেখানে থাকা সাপের ট্যাটুটি এখন আগুনের মতো জ্বলছে। এতদিন হিয়া যে ছদ্মবেশে ছিল, তা আজ ভাইপারের রূপ ধরে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

হিয়া লিওনের খুব কাছে এসে দাঁড়াল। ৫ ফুট ৮ ইঞ্চির হিয়া ৬ ফুট ২ ইঞ্চি লিওনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল। মুখে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে হিয়া শান্ত স্বরে বলল, “অবাক হলে, দিলবার? নাকি এখনো বিশ্বাস করতে পারছ না, যাকে এতদিন তুমি তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে খুঁজে বেড়িয়েছ, সে তোমারই আশেপাশে ছিল?”
লিওন হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। একদিকে চোখের সামনে পরিচিত হিয়ার মুখ, অন্যদিকে ভাইপারের নিষ্ঠুর অস্তিত্ব। লিওন ফিসফিস করে বলল, “তুমি? হিয়া… তুমিই সেই কুখ্যাত ক্রিমিনাল ভাইপার?” হিয়া কোনো উত্তর দিল না। শুধু তার হাতের সাপের ট্যাটুটার ওপর হাত বুলাল। তার চোখে এখন নেশা।

লিওন কিছু বলার জন্য পুনরায় মুখ খুলতে উদ্যত হতেই হিয়া তার রক্তমাখা ঠোঁটে কোণে আঙুল রেখে আলতো করে স্লাইড করল। হিয়ার স্পর্শে লিওন স্তব্ধ হয়ে গেল। হিয়া দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল। গার্ডদের দিকে তাকিয়ে তার গলার স্বর বদলে গেল পাথরের মতো শক্ত আর শীতলতায়, “কে আঘাত করেছে ওকে?”
গার্ডদের একজন কাঁপতে কাঁপতে বলল, “মিস্ট্রেস, উনিই তো প্রথমে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, আমরা বাঁচার জন্য ওনাকে আটকানোর জন্য…”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই হিয়া তার হাতের পিস্তল তুলল। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ—টানা পাঁচটি গু*লি চলল। প্রতিটি গু*লির শব্দে আস্তানা কেঁপে উঠল, আর মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল পাঁচজন গার্ড।
মার্ক দ্রুত এগিয়ে এসে হিয়ার হাত ধরে থামানোর চেষ্টা করল, “মিস্ট্রেস, থামুন! ওরা আমাদের টিমের লোক ছিল। সামান্য একটা কারনে ওদের মেরে ফেললেন? এতে আমাদের দলেরই ক্ষতি!”

হিয়া রক্তচক্ষু নিয়ে মার্কের দিকে তাকাল। মার্কের মতো অভিজ্ঞ অপরাধীও হিয়ার সেই চাহনিতে শিউরে উঠে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। হিয়া দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “সামান্য কারণ? ওরা আমার দিলবারের গায়ে হাত দিয়েছে, ওর রক্ত ঝরিয়েছে! আমার কলিজায় আঘাত করার দুঃসাহস দেখানোটা সামান্য নয় মার্ক।”
লিওন একদৃষ্টিতে হিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। সে সম্পূর্ণ স্তম্ভিত। এই কি সেই হিয়া, যে একসময় ভার্সিটিতে সিনিয়রদের সামনে ভয়ে ভয়ে থাকতো? যার কণ্ঠে সবসময় একটা কোমল সুর লেগে থাকত? আজ তার চোখের সামনে হিয়ার যে নিষ্ঠুরতার নগ্ন রূপ ফুটে উঠল, তা লিওনের কল্পনাকেও হার মানাচ্ছে। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু গলার কাছে সব ভাষা আটকে গিয়ে দলা পাকিয়ে গেল।
হিয়া পুনরায় লিওনের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। অদ্ভুত একটা বৈপরীত্য ফুটে উঠলো, এক সেকেন্ড আগেও যে চোখে ছিল মৃত্যুর শীতল নেশা, সেই চোখেই এখন ফুটে উঠল এক গভীর কাতর কোমলতা। আর এই কোমল দৃষ্টি শুধুই লিওনের জন্যে বরাদ্দ। সে লিওনের গালের কাছে হাত নিয়ে এসে আলতো করে স্পর্শ করলো। শান্ত গলায় ফিসফিস করে বলল, “বাজপাখি, তুমি কেন আমাকে এতটা বাধ্য করলে? তুমি তো জানো, আমি তোমাকে তিল পরিমাণ কষ্ট দিতে চাই না। কিন্তু আমার অধিকারের সীমানায় যখন তুমি এভাবে বারবার আঘাত করলে, তখন নিজেকে আগলে রাখতে আমাকে তো নিষ্ঠুর হতেই হতো। তোমার জেদই আজ আমাকে এই পথ বেছে নিতে বাধ্য করল।”

লিওন নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে, হিয়ার এই ভালোবাসা সাধারণ কোনো অনুভূতি নয়। এটা এক ভয়ংকর পাগলামি, যা যেকোনো কিছু নিমেষেই ধ্বংস করে দিতে পারে। হিয়া তার চোখের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে কথা বলছে যেন তারা দুজনে কোনো এক নিরিবিলি রেস্টুরেন্টে বসে গল্প করছে, অথচ চারপাশটা তখনো লা*শে ভরা।
লিওন ঘৃণায় কুঁচকে গেল। হিয়ার এই অদ্ভুত আচরণ, এই চরম পাগলামি তার সহ্যশক্তির বাইরে চলে যাচ্ছে। সে হিয়ার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে কঠোর গলায় প্রশ্ন করল, “আর ইউ সাইকো? তুমি কি পাগল হয়ে গেছ?”

হিয়া কোনো উত্তর দিল না। সে এমন ভাব করলো যেন সে লিওনের এই রাগের কথাগুলো শুনতেই পাচ্ছে না। উল্টো সে লিওনের ক্লান্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল, “তোমার ওপর অনেক ধকল গেছে আজ। তুমি খুব ক্লান্ত। আগে ফ্রেশ হয়ে নাও, তারপর কিছু খাবে তারপর রেস্ট নেবে।”
লিওনের মেজাজ এবার তুঙ্গে পৌঁছে গেলো। সে চিৎকার করে বলল, “হেই লিসেন! নিজেকে কি ভাবো তুমি হ্যাঁ? আমাকে এখান থেকে এখনি যেতে দাও! ভালোই ভালোই। তোমাকে তো আমি দেখে ফেলেছি, তোমার আসল রূপ এখন দুনিয়ার সামনে এক্সপোজ হয়ে যাবে। আইনের হাত থেকে তুমি আর পালাতে পারবে না!”
হিয়া শান্ত মুখে শুধু উত্তর দিলো, “অ্যাজ ইয়োর উইশ”
এরপর সে ধীরস্থিরভাবে লিওনের পায়ের কাছে এক হাঁটু গেঁড়ে বসল। লিওন অবাক হয়ে কিছুটা পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু হিয়া ততক্ষণে লিওনের জুতোর খুলে যাওয়া ফিতেটা পরম যত্ন নিয়ে বাঁধতে শুরু করেছে। ফিতে বাঁধা শেষ করে হিয়া যখন মাথা তুলে লিওনের চোখের দিকে তাকাল, তখন তার স্থির দৃষ্টিতে ফুটে উঠল এক গভীর অধিকার, যেখানে বুঝিয়ে দিলো লিওন কেবল তার একার সম্পত্তি।
হিয়া উঠে দাঁড়িয়ে আবার লিওনের কাটা ঠোঁটের কাছে হাত নিয়ে যেতেই লিওন প্রচণ্ড ঝটকায় তার হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল, “ডোন্ট টাচ মি! আই সেড, স্টে অ্যাওয়ে! তোমার স্পর্শ আমার ঘৃণ্য লাগে।”
হিয়ার চোখটা মুহূর্তের মধ্যে রক্তবর্ণ ধারণ করল রাগে, কিন্তু পরক্ষণেই সে তার চোখের কোণে আবার সেই পরিচিত কোমলতা ফুটিয়ে রহস্যময় হাসল। খুব ধীর এবং শীতল গলায় সে বলল, “খুব দ্রুত, দিলবার… তুমি আমাকে ভালোবাসতে বাধ্য হবে। দেখবে, আমার ভালোবাসার কোনো বিকল্প তুমি খুঁজে পাচ্ছ না।
লিওন দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দিল, “ইন ইয়োর ড্রিমস! আমি কোনোদিনও তোমাকে পছন্দ করব না, নেভার! মায়ার জায়গাটা তুমি কোনোদিন নিতে পারবে না।”

হিয়া একটা রহস্যময় হাসি হাসল, যে হাসিতে তার ভেতরের অন্ধকার আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠল। লিওনের চোখের দিকে তাকিয়ে সে শান্ত গলায় বলল, “তোমার হৃদয়ে কি কখনো মায়ার জায়গা ছিল? খুব বেশি দেরি নেই, খুব তাড়াতাড়ি বুঝতে পারবে,আমি ছাড়া তোমার অস্তিত্বের আর কোনো অর্থই নেই।”
লিওন স্পষ্ট বুঝতে পারল, এই লড়াই কেবল সিআইডি অফিসার আর অপরাধীর মধ্যকার সংঘাত নয়। এটি তার নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ। আর হিয়া? সে সাধারণ কোনো শত্রু নয়, বরং এক ভয়াবহ বিভীষিকা, যে প্রেমের দোহাই দিয়ে তার পুরো অস্তিত্বকে নিজের দখলে নিয়ে নিতে চাইছে।
হিয়া ঘুরে চলে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্ত। লিওন বিদ্যুৎগতিতে তার শেরওয়ানির ভেতর থেকে ছোট হিডেন পিস্তলটি বের করে হিয়ার বুকের একটু ওপরে তাক করল। অথচ হিয়া বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না; তার চোখে ভয়ের কোনো চিহ্ন নেই, বরং প্রশান্তি তার চারপাশটাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
হিয়া শান্ত গলায় বলল, “ডোন্ট টাচ দেয়ার, লিওন। এই জায়গাটা অলরেডি একটা বুলেটের আঘাত সহ্য করেছে। আর হার্ট একদম কাছেই। ভুল করে ওখানে ট্রিগার চাপলে আমার মৃত্যু*র চেয়েও বেশি যন্ত্রণা হবে, কারণ ওই জায়গাটা জুড়ে তো শুধু তোমারই অস্তিত্ব।”

হিয়া এক ঝটকায় নিজের হুডির ফিতে খুলে কাঁধের ওপরের কাপড়টা কিছুটা নিচে নামিয়ে দিল। লিওন দেখল, হিয়ার কাঁধের একটু নিচে একটি গভীর ক্ষতচিহ্ন—যা স্পষ্টত কোনো বুলেটের আঘাতের দাগ। সেই মুহূর্তেই লিওনের মনে পড়ে গেল, এই গু/লিটা সে নিজেই করেছিল। অথচ সেই ক্ষতচিহ্নের ওপরেই নিপুণভাবে খোদাই করা একটি নামের ট্যাটু ‘Leon’।
লিওন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। কতটা বিকৃত মানসিকতা থাকলে কেউ গুlলির ক্ষতের ওপর এমন ট্যাটু করতে পারে!
লিওনের বুকের ভেতরটা এক তীব্র মোচড়ে কেঁপে উঠল। হিয়া তার চোখের দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ হাসল। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “মনে পড়ে সেই দিনের কথা? যেখানে তুমি আমাকে গুলি করেছিলে? সেই বুলেটটা আমার কাঁধ ভেদ করে গিয়েছিল। আমি সেদিন মরিনি, কারণ আমি তোমার দেওয়া সেই ক্ষতটাকে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ধরে রেখেছি।”

কথাটা বলেই হিয়া নিজের গলার লকেটটি দেখাল। যে বুলেটটি তার শরীর ভেদ করেছিল, সেটিকেই সে লকেট বানিয়ে গলায় ঝুলিয়ে রেখেছে। লিওন স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তার হাতের পিস্তলটি ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসার উপক্রম। সে বুঝে উঠতে পারছে না, হিয়া কি সত্যিই উন্মাদ, নাকি তাকে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় সে এমন এক ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নিয়েছে। হিয়ার কাঁধের সেই ট্যাটু আর বুলেটের লকেট দেখে লিওনের মস্তিষ্কে পুরো জট পাকিয়ে গেছে। সে শুধু হতবাক আর হিয়া তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল এক গভীর আবেগে, যেখানে ভালোবাসা আর ঘৃণা একে অপরের সাথে একাকার হয়ে আছে।
লিওনের হাতের পিস্তলটি হিয়ার কাঁধের কয়েক ইঞ্চি নিচেই স্থির হয়ে আছে। বাতাসের ভারী স্তব্ধতাকে চিরে হিয়ার কণ্ঠস্বরটা বিষণ্ণ সুরের মতো আস্তানার দেয়ালগুলোতে প্রতিধ্বনিত হলো। সে বিন্দুমাত্র নড়ল না, বরং লিওনের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে এক করুণ হাসিতে ঠোঁট বাঁকালো।
তারপর খুব ধীরস্থির গলায় বলে উঠল, “আমাকে ঘৃণা করতে গিয়ে তুমি আমার হৃদয়ে বন্দুক ঠেকিয়েছ। আর আমি তোমাকে ভালোবেসে এতটাই উন্মাদ হয়েছি যে, নিজেই দেখিয়ে দেব কোথায় গু/লি করলে সবচেয়ে নিখুঁতভাবে মৃ/ত্যু হবে আমার।

হিয়া নিজের হাত বাড়িয়ে লিওনের কব্জিটা আলতো করে ধরল। লিওন পিস্তলটি নামাতে পারল না, বরং হিয়া নিজেই সেটির নল টেনে নিজের কপালে স্থাপন করল। লিওনের শিরায় রক্ত হিম হয়ে এল। এই প্রথম কোনো অপরাধীর দিকে বন্দুক তাক করে সে এমন এক চরম অস্থিরতায় ভুগছে, যা তার পরিচিত জগতের সম্পূর্ণ বাইরে। তার আঙুল কাঁপছে, বুকের ভেতরটা চিনচিন করে অচেনা এক যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠছে।
একজন দক্ষ সিআইডি অফিসার হিসেবে শত বিপদের মুখেও যে লিওন ছিল হিমশীতল পাথরের মতো অটল, আজ সে হিয়ার চোখের দিকে তাকাতেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। এই অনুভূতিটা তার কাছে একান্তই অপরিচিত, এক গভীর সম্মোহন যা তাকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। সে হিয়ার চোখে ঘৃণা খুঁজল, কিন্তু পেল এক অতলহীন আকর্ষণের গভীর গহ্বর। পিস্তলটি তার হাতে এক প্রচণ্ড ভারী বোঝার মতো মনে হচ্ছে। সে বুঝে উঠতে পারছে না, এটা কি হিয়ার প্রতি তার চরম ঘৃণা, নাকি দীর্ঘ কোনো বছরের জমে থাকা কোনো অবদমিত আকর্ষণ যা আজ তার সমস্ত যুক্তি ও পেশাদারিত্বকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে? হিয়ার কপালে লাগানো সেই শীতল ধাতব নল এখন লিওনের নিজেরই বুকের ওপর চেপে বসেছে।

হিয়া পুনরায় ফিসফিস করে বলল, “ট্রিগারটা টিপলেই তো মুক্তি, দিলবার। আমার ভালোবাসা আর তোমার ঘৃণা—সবকিছুর অবসান ঘটবে এক সেকেন্ডে। কিন্তু পারবে কি? পারবে কি সেই হাত দিয়ে গু/লি করতে, যে হাতের রেখায় আমার নাম লেখা?
লিওন তখন ভাবতে লাগলো, সে কি এমন একজনকে গু/লি করবে, যে মৃ/ত্যুকেও তার ভালোবাসার চেয়ে ছোট মনে করে?
লিওন নিস্তেজ হয়ে পিস্তলটি নামিয়ে নিল। তার কণ্ঠস্বর তখন ক্লান্তিতে ভরা, সে ধীর স্বরে বলল, “তোমাকে মেরে ফেললে আমারই লস। তোমার মাধ্যমেই পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ডের আসল কালপ্রিট দানিয়েলকে হাতের নাগালে পাবো।”
লিওনের এই কৌশলগত উত্তর শুনে হিয়া শান্তভাবে হাসল। তার চোখের চাহনিতে কোনো অস্থিরতা নেই। সে লিওনের উত্তরের গুরুত্ব না দিয়ে পরম মমতায় বলল, “যা খুশি করো, ওসব পরে হবে। এখন তুমি ফ্রেশ হয়ে কিছু খাবে না? কি খাবে বলো আমাকে, আমি সব এনে দিচ্ছি।”
লিওনের বিরক্তির বাঁধ ভাঙল। এই বিরক্তি হিয়ার প্রতি নাকি তার নিজের প্রতি নাকি অন্য কিছু তা সে জানেনা তাই সে চোখ সরিয়ে নিয়ে তীব্র কণ্ঠে বলল, “তোমাকে আমার অসহ্য লাগছে! তুমি কি প্লিজ আমার চোখের সামনে থেকে যাবে?”

হিয়ার চোখ মুহূর্তের জন্য আগুনের মতো জ্বলে উঠল। অপমানে আর রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে পুনরায় নিয়ন্ত্রণ করে নিল। তার চোখের সেই ভয়ংকর দৃষ্টি আবার রূপ নিল শীতল কোমলতায়। সে লিওনের একদম কাছে এগিয়ে এল। হঠাৎ, অতর্কিতে হিয়া তার লম্বা নখ দিয়ে লিওনের ঘাড়ের নির্দিষ্ট একটি পয়েন্টে, যেখানে কারোটিড সাইনাস ও প্রধান রক্তনালীগুলো মস্তিষ্কের সাথে সংযুক্ত, সেখানে জোরে চাপ দিল।
হিয়া তার নখের নেইলপলিশের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিল একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সিন্থেটিক নিউরো-টক্সিন বা চেতনানাশক কেমিক্যাল। নখের সূক্ষ্ম আঁচড় চামড়া ভেদ করে সরাসরি রক্তপ্রবাহে সেই রাসায়নিক ছড়িয়ে দিল। ট্রান্সডার্মাল ডেলিভারি পদ্ধতিতে এটি মুহূর্তের মধ্যে লিওনের রক্তে মিশে তার মস্তিষ্কের ‘গাবা’ (GABA) রিসেপ্টরগুলোকে অকেজো করে দিল। স্নায়বিক সংকেত আদান-প্রদান হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যাওয়ায় লিওনের মস্তিষ্ক তাৎক্ষণিক পেশী নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। চোখের পাতা ভারী হয়ে এল, চারপাশ ঝাপসা হয়ে এল এক মুহূর্তেই। নিজের সমস্ত পেশাদারিত্ব আর প্রতিরোধের চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে, অচেতন হয়ে লিওন ধপ করে হিয়ার ওপর ঢলে পড়ল।
হিয়া খুব সাবধানে লিওনকে ধরে রেখে মার্কের দিকে ইশারা করল। মার্ক আর দুজন গার্ড দ্রুত এগিয়ে এসে লিওনকে জাপটে ধরল। হিয়া শান্ত ভঙ্গিতে নিজের আঙুলগুলো পরিষ্কার করতে করতে মার্ককে নির্দেশ দিল, “ওকে ওপরের রুমের ভেতরে নিয়ে যাও। আমি আসছি।”

মার্ক আর দুজন গার্ড মিলে লিওনকে নিয়ে অন্ধকারের গহ্বরে মিলিয়ে গেল। হিয়া টানেলের মুখে স্থির দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।
আস্তানার গভীরে হিয়ার ব্যক্তিগত কক্ষটি তখন মায়াবী নীল আভা ছড়িয়ে আছে। লিওনকে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে বিছানায়। তার প্রতিটি পেশি এখন গভীর ঘোরের কবলে স্তব্ধ হয়ে আছে।
কক্ষের ভারী দরজাটি নিঃশব্দে আটকে দিয়ে হিয়া ধীর পায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে এল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে মিশে আছে বহু প্রতীক্ষিত এক অধিকারের স্বাদ। এই মুহূর্তে লিওনের শরীরের ওপর অন্য কারো স্পর্শ তার কাছে অসহ্য, এমনকি তার বিশ্বস্ত ছেলে সহযোগী মার্কের স্পর্শও নয়। লিওনের পোশাক পাল্টে তাকে সতেজ করার দায়িত্ব সে নিজের হাতেই তুলে নিয়েছে, কারণ এই অধিকার কেবল তারই।
সে লিওনের সামনে এসে বসল। তার দৃষ্টিতে তখন তৃষ্ণা আর তীব্র অধিকারবোধ স্পষ্ট। কাঁপা কাঁপা হাতে সে লিওনের শেরওয়ানির বোতামগুলো একে একে খুলতে শুরু করল। প্রতিটা বোতাম খোলার সাথে সাথে হিয়ার হৃদস্পন্দন তার নিজের বুকের ভেতর আছড়ে পড়ছে। অবশেষে লিওনের বুক উন্মুক্ত হতেই হিয়া এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সুঠাম দেহের সেই পৌরুষদীপ্ত আবেদন তার নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা অসম্ভব করে তুলল। তার ভেতর তখন আবেগ আর কামনার উত্তাল ঝড়। হিয়া নিজের অস্তিত্বের সমস্ত বাঁধন ছিঁড়ে ফেলার অপেক্ষায়। লিওনের অধরে, বুকে অসংখ্য চুম্বনের চিহ্ন এঁকে দিয়ে তাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য তার প্রতিটি স্নায়ু তীব্র আকুলতায় কেঁপে উঠছে। সে নিশ্চিত হতে চায়, এই অচেতন মুহূর্তেও লিওন কেবল তারই সান্নিধ্যে আছে।

কিন্তু হিয়া নিজেকে সামলে নিল। সে আগে ড্রয়ার থেকে একটি ফার্স্ট এইড বক্স বের করল। অত্যন্ত যত্ন আর আলতো হাতে সে তুলোয় মলম নিয়ে লিওনের কাটা ঠোঁটের ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিল। মলম লাগানোর সময় হিয়া নিচু হয়ে লিওনের সেই ক্ষতের ওপর ফুঁ দিতে লাগল, মনে হলো সে নিজের ব্যথাই অনুভব করছে। সে লিওনের মুখের আদলের প্রতিটি খুঁটিনাটি দেখার চেষ্টা করছে—চোখের পাতা, ভ্রুর ভাঁজ, আর লিওনের গায়ের সেই পরিচিত পুরুষালি ঘ্রাণ। সেই ঘ্রাণ হিয়াকে নেশার মতো আচ্ছন্ন করে ফেলল। উত্তেজনায় আর তীব্র আবেগের চোটে তার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল। সে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে বলে উঠল, “ফা*ক, ড্যাম ইট।”
হিয়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার মস্তিষ্ক, তার বিবেক সবটাই ওই একটা মুহূর্তের আকাঙ্ক্ষায় ধুলোয় মিশে গেল। সে নিজের নিয়ন্ত্রণের বাঁধন ছিঁড়ে ঝুঁকে পড়ল অচেতন লিওনের ওপর। হিয়ার অধর গিয়ে আঁছড়ে পড়লো লিওনের সেই ক্ষতবিক্ষত অধরে।

শুরুটা ছিল আলতো, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সেই চুম্বন রূপ নিল এক তীব্র আর গভীর আবেশে। হিয়া উন্মত্তের মতো চুম্বন করে যাচ্ছে। তার চুম্বনের ভেতর মিশে আছে বছরের পর বছর ধরে জমানো ভালোবাসা, একপাক্ষিক আবেগ আর উন্মাদনা। সে লিওনের অধরকে পুরোপুরি নিজের করে নিতে চাইছে।
চুম্বন পর্ব শেষে হিয়ার বুক তখনো উত্তেজনায় দ্রুত ওঠানামা করছে। নিজেকে কিছুটা স্থির করতে সে একটা কালো কাপড়ের টুকরো দিয়ে নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বেঁধে নিল। এই মুহূর্তে লিওনের শরীরের কোনো অংশ তার চোখের সামনে উন্মুক্ত হতে দেওয়া যাবে না, কারণ তার ভেতরের তীব্র বাসনা যেকোনো সময় তার নিয়ন্ত্রণ নষ্ট করে দিতে পারে। সে চায় না এই সচেতনতা বা সম্মোহন তার গভীর ইচ্ছের পথে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াক।

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১৪

হিয়া অভ্যস্ত হাতে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে লিওনের শেরওয়ানি ও ভেতরের পোশাকগুলো খুলে নিল। এরপর সে পরম যত্নে লিওনকে পরিয়ে দিল একটি সাধারণ কালো টি-শার্ট এবং আরামদায়ক ট্রাউজার। এই পুরো প্রক্রিয়ায় তার প্রতিটি স্পর্শ ছিল লিওনকে নিজের অস্তিত্বের অংশ করে নেওয়ার এক নীরব অঙ্গীকার। পোশাক বদলানোর সময় তার আঙুল যখন লিওনের পেশিবহুল শরীরের সংস্পর্শে আসছিল, তখন হিয়ার স্নায়ুগুলোতে শিহরণ খেলে যাচ্ছিল। সবকিছু শেষে সে এক মুহূর্তের জন্য লিওনের পাশে স্থির হয়ে বসল, তার কানে তখনো লিওনের নিয়মিত নিঃশ্বাসের শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
হিয়া আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। লিওনের নিথর শরীরের পাশে নিজের অস্তিত্বের চিহ্ন রেখে সে দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here