আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১৩
সাবিলা সাবি
শহরজুড়ে এখন একটাই চর্চা—সাংবাদিক এহসান চৌধুরী কোথায় গেলেন? প্রভাবশালী এই সাংবাদিকের হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ার খবরটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। সিআইডির অফিসজুড়ে এখন চরম অস্থিরতা।
পুলিশ শহরের প্রতিটি প্রান্তে হন্যে হয়ে খুঁজছে। পার্কিং লট থেকে শুরু করে শহরের বাইরের নির্জন জঙ্গল—কোথাও বাদ যাচ্ছে না। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কোথাও কোনো চিহ্ন বা সূত্র পাওয়া যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে, পুরো ঘটনাটি খুব ঠান্ডা মাথায় এবং নিখুঁত পরিকল্পনায় ঘটানো হয়েছে।
ভাইপার কতটা ধূর্ত, তা তার প্রতিটি পদক্ষেপেই স্পষ্ট। রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে সে এমনভাবে সব প্রমাণ মুছে ফেলেছে যে, মনে হচ্ছে এহসান চৌধুরী নামের কোনো মানুষ এই শহরে কখনো ছিলই না।
পার্কিং লটের সিসিটিভি ফুটেজগুলো ইভানা আগেই হ্যাক করে নিজের দখলে নিয়েছিল। জঙ্গলের রাস্তায় যে গাড়িটি ফেলে রাখা হয়েছিল, মার্ককে দিয়ে সেটাও সরিয়ে ফেলা হয়েছে অনেক আগেই। এমনকি মাটিতে জমে থাকা রক্তের দাগগুলোও বিশেষ কেমিক্যাল দিয়ে এমনভাবে ধুয়ে ফেলা হয়েছে যে, কোনো ফরেনসিক পরীক্ষাও এখন সেখানে কিছু খুঁজে পাবে না। আর এহসানের শরীরের কথা বললে—সেটা তো সেই রাতেই কুমিরের খালে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে তাকে খুঁজে পাওয়ার আর কোনো উপায় নেই।
সবকিছু নিখুঁত এক চিত্রনাট্যের মতোই সাজানো
হয়েছে। কোনো সাক্ষী নেই, কোনো প্রমাণ নেই, এমনকি কোনো সন্দেহের অবকাশও নেই। হিয়া এখন নিশ্চিন্ত মনে বসে ভাবছে, তার এই অন্ধকার খেলাটা কতটা নিখুঁতভাবে সে পরিচালনা করছে। কিন্তু এই নিখোঁজ রহস্যের জট কি আসলেই খোলা সম্ভব হবে, নাকি এহসান চৌধুরীর অন্তর্ধান চিরকাল এক রহস্য হয়েই থেকে যাবে?
আয়মান খান নিজের সুইটে বসে একের পর এক নিউজ চ্যানেল দেখছিল। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট। গতকালই সাংবাদিক এহসান চৌধুরী তার দেখা হলো।
আয়মান ভাবছে, এহসানের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে হিয়া—অর্থাৎ ভাইপারের কোনো না কোনো যোগসূত্র আছে কি। কিন্তু সে যখনই ঘটনার সময় এবং পরিস্থিতিগুলো মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করছে, তখনই গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। সব কেমন এলোমেলো লাগছে, কোনো কিছুতেই যেনো কোনো হিসেব মিলছে না।
আয়মান আপনমনে বিড়বিড় করতে লাগল, “এটা কীভাবে সম্ভব? এহসান নিখোঁজ হলো ঠিক সেই রাতে, যেদিন ভাইপার সারাটা সময় আমার সাথে ছিল। আমার চোখের সামনেই তো সে সময় কাটিয়েছে। তাহলে ভাইপারের সাথে এহসানের দেখা হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। কিন্তু এহসান গেল কোথায়?”
তার মনের কোণে ছোট একটা সন্দেহের বীজ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। যদিও সে বারবার সেই চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছে। ভাইপারের সাথে এহসান চৌধুরীর শত্রুতা থাকার মতো কোনো কারণ সে খুঁজে পাচ্ছে না।
আয়মান নিজের মনেই প্রশ্ন করল, “শত্রুতা? ভাইপারের সাথে এহসানের কী সম্পর্ক থাকতে পারে? তারা তো একে অপরকে চেনেই না।”
সিআইডির তদন্তে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় আয়মান এখন চরম ধোঁয়াশার মধ্যে সময় কাটাচ্ছে। সে বিন্দুমাত্র আন্দাজ করতে পারছে না যে, সে যাকে এত বড় ডায়মন্ডের ডিল বা ব্যক্তিগত সঙ্গী মনে করে সময় কাটাচ্ছে, সেই ভাইপারই তার অজান্তে তার জীবনের সব পুরোনো হিসেব তিলে তিলে চুকিয়ে দিচ্ছে। আয়মানের বোকামী আর হিয়ার নিষ্ঠুর চাতুর্য এই দুয়ের মাঝখানের ব্যবধানটাই যে কত বড়, তা সে যখন বুঝতে পারবে, তখন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।
অন্যদিকে, হিয়া নিজের ব্যাক্তিগত রুমের সোফায় বসে আছে পা দুটো টেবিলের ওপর তুলে শান্তভাবে ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে। তার ঠোঁটের কোণে জ্বলন্ত একটি মোটা চুরুট, যার ধোঁয়া ধীরলয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘরের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। টিভির পর্দায় এহসানের নিখোঁজ হওয়ার ব্রেকিং নিউজ দেখে তার ঠোঁটে এক নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠল। সে খুব ভালো করেই জানে, পুলিশ আর মিডিয়া তাকে হন্যে হয়ে খুঁজবে ঠিকই, কিন্তু তারা কখনোই সেই অন্ধকারের নাগাল পাবে না, যেখানে বসে ভাইপার তার নিষ্ঠুর খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। তার এই নিখুঁত চালের সামনে সবকিছুই যেন বড্ড অসহায়।
ঠিক একটু পরেই দানিয়েল রাগান্বিত ভঙ্গিতে হিয়ার রুমের দরজায় জোরে নক করল। দরজার ওপাশে তার অস্থিরতা স্পষ্ট, তবে সেটা ভয়ের চেয়ে বেশি বিরক্তি আর রাগের সংমিশ্রণ।
দরজা খুলতেই দানিয়েল ভেতরে ঢুকল। তার চোখেমুখে বিরক্তির স্পষ্ট ছাপ। সে তেতে উঠে বলল, “ভাইপার, খবরটা শুনেছো? সিআইডি আমার নাম জেনে ফেলেছে। এই অকর্মণ্যগুলোর এত সাহস হয় কীভাবে! ওরা আমার একদম কাছাকাছি চলে এসেছে। এখনই যদি এদের না থামাই, তবে এরা আমাদের দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করবে—যা আমার জন্য চরম বিরক্তির কারণ।”
হিয়া তখনো টেবিলের ওপর পা তুলে বসে আছে। হাতে ওয়াইনের গ্লাস আর ঠোঁটে জ্বলন্ত চুরুট। সে খুব শান্ত ভঙ্গিতে ঘুরে তাকাল। দানিয়েলের এই অস্থিরতা দেখে তার ঠোঁটে এক বাঁকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। তার কণ্ঠে বিন্দুমাত্র অস্থিরতা নেই, বরং সেখানে শীতলতা স্পষ্ট। সে খুব ধীরস্থিরভাবে ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, “ওরা আপনার নাগাল পাবে না, বস। ছোটখাটো এই বিষয় নিয়ে এত উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই। আমার মূল খেলা শেষ হতে আর বেশি বাকি নেই। লক্ষ্য পূরণ হলেই আপনি লন্ডন থেকে সরে যাবেন। এখন শুধু ধৈর্য ধরুন, এই বিরক্তিকর পরিস্থিতি আমি নিজেই সামলে নেব।”
দানিয়েল ভ্রু কুঁচকে তাকাল, তারপর গম্ভীর স্বরে বলল, “ভাইপার, তুমি যাই করো না কেন, খুব সাবধানে করো। আমি গত কয়েকদিন ধরে লক্ষ্য করছি, তুমি লন্ডনে আসার পর থেকে, বিশেষ করে ওই অফিসার লিওনের কাছে কেসটা যাওয়ার পর থেকে সবকিছু কেমন যেন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে আমার মনে হচ্ছে।”
লিওনের নামটা কানে আসতেই হিয়ার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। বুকের ভেতরে তীব্র শিহরণ খেলে গেল তার। সে ধীরপায়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে লন্ডনের আকাশ তখন মেঘলা। সে উদাস দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল, “অফিসার লিওন আমার কাজের পথে বাধা নয়,বস। সে আমার এই খেলারই একটা অংশ। আমি আমার কাজ নিখুঁতভাবেই করছি, আমার নিরাপত্তা নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না।”
দানিয়েল আর কথা বাড়াল না। সে জানে, এই জেদি মেয়েকে বোঝানোর সাধ্য কারো নেই। দানিয়েল কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর হিয়া জানালার কাচে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে রইল। দানিয়েল ঠিকই বলেছে, লিওনের উপস্থিতি আসলেই সবকিছুকে জটিল করে তুলেছে। একদিকে বছরের পর বছর ধরে লালন করা প্রতিশোধের দাউদাউ আগুন, অন্যদিকে লিওনের প্রতি তার তৈরি হওয়া এই অতিরিক্ত অবসেসন। এই দুই বিপরীতমুখী আবেগ যে কোনোদিন ভয়াবহ কোনো সংঘর্ষে লিপ্ত হবে, হিয়া সেটা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে। তবুও সে পিছিয়ে আসার পাত্রী নয়।
দানিয়েলের চলে যাওয়ার রেশ কাটতে না কাটতেই ইভানা দ্রুত পায়ে হিয়ার রুমে প্রবেশ করল। তার হাতের খবরের কাগজটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে কোনো একটা অঘটন ঘটেছে। ইভানার গম্ভীর মুখভাব কক্ষের নিস্তব্ধতাকে আরও ভারী করে তুলল। সে পত্রিকাটি হিয়ার টেবিলের ওপর রাখল এবং নিচু স্বরে বলল, মিস্ট্রেস, একটা খবর আছে। সিআইডি অফিসার লিওনের বিয়ের তারিখ ঘোষণা হয়েছে। আগামী সপ্তাহেই বিয়ে। পাত্রী তার ফুফাতো বোন মায়া ক্যাসানোভা।
খবরটা শোনার সাথে সাথেই হিয়ার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল পত্রিকার হেডলাইনের ওপর। হিয়ার পৃথিবীটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। বুকের ভেতরটা তীব্র এক যন্ত্রণায় কেঁপে উঠল। লিওন অন্য কাউকে বিয়ে করছে? তাও আবার মায়া ক্যাসানোভাকে? সে দ্রুত ইভানার হাত থেকে কাগজটা নিয়ে হেডলাইনের দিকে তাকাল। মায়ার হাসিখুশি চেহারার পাশে লিওনের শান্ত মুখটা দেখে হিয়ার মনে হলো চোখের সামনে আগুন জ্বলছে। হিয়া কোনো কথা বলল না, শুধু তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তীব্র রাগ আর অপমানে তার সারা শরীর কাঁপছে। সে ড্রয়ার থেকে আরেকটা সিগারেট বের করে ধরিয়ে নিল। ধোঁয়া ছাড়ার সময় তার চোখগুলো লাল হয়ে গেছে। পকেট থেকে লাইটারটা বের করে সে আগুনের শিখাটা কাগজের ওপর ধরল। তবে সে পুরো কাগজটা জ্বালাল না, খুব ঠান্ডা মাথায় শুধুমাত্র মায়া ক্যাসানোভার ছবির অংশটুকু পুড়িয়ে ছাই করে দিল। ছবিটা পুড়তে দেখে হিয়ার মুখে এক নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠল। ইভানা পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। মিস্ট্রেসের এই ভয়ঙ্কর রূপ তার চেনা, তবু সে খানিকটা আড়ষ্ট হয়ে রইল।
মায়ার ছবিটা দেখতে দেখতে কুঁকড়ে কালো ছাই হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ছবিটা পুরোপুরি পুড়ে লিওনের মুখের অংশটুকুতে পৌঁছানোর আগেই হিয়া দ্রুত হাত বাড়িয়ে জ্বলন্ত জায়গাটা চেপে ধরে আগুন নিভিয়ে দিল। কাগজের পোড়া ছাইয়ের দাগ তার আঙুলে লেগে রইল। হিয়া খুব ধীর অথচ যন্ত্রণাদায়ক স্বরে বলল, “আমার লিওনের দিকে আগুনের আঁচ পর্যন্ত আসতে দেব না আমি। মায়া, তুমি তো কেবল তার ছবির পাশে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস দেখাচ্ছো, আর আমি তাকে আমার বুকের ভেতর আগলে রেখেছি। আমার বাজপাখিকে বিয়ে করার এত শখ তোমার? এই শখ আমি আজীবনের জন্য ঘুচিয়ে দেব। এই শহরে কেউ ওর দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারে না, আর তুমি কি না তাকে দখল করতে চাইছো? তোমাকে শেষ করার জন্য আমার আর আলাদা কোনো মিশনের প্রয়োজন নেই, তুমি নিজেই আজ নিজের মৃত্যু পরোয়ানা লিখে ফেলেছ।
ইভানা পাশে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে দেখছিল। সে জানে, এই মুহূর্তে হিয়ার রাগ কোনো যুক্তি মানবে না। হিয়া তার কুঠার বা পিস্তল নয়, বরং নিজের ধ্বংসাত্মক বুদ্ধিকে ধারালো করে তুলছে মায়াকে লিওনের জীবন থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য।
পরের দিন লিওনার্দোর বাড়িতে এক উৎসবের আমেজ। আর্থার হায়াস হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেছেন, তাই বাড়ির পরিবেশটাও এখন বেশ শান্ত আর স্বস্তির। ড্রয়িংরুমের বড় দেয়ালে মায়ার সাথে লিওনার্দোর একসাথে বড় একটা সুন্দর ছবি টাঙানো হয়েছে, যা আগামী সপ্তাহের বিশেষ দিনটির ঘোষণা দিচ্ছে। বিয়ের কার্ড ছাপানোর কাজও শুরু হয়ে গেছে। পুরো বাড়িতে একটা সাজসাজ রব, আর চারপাশ আনন্দের রঙে সেজেছে। তবে এই আনন্দের আড়ালে যে কোনো এক জায়গায় বড়সড় কোনো বিপদ ওত পেতে আছে, তা বাড়ির কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পাচ্ছে না।
লিওন আজ অফিসে ঢুকল এক প্রশান্ত হাসি মুখে নিয়ে। তার হাতে বিয়ের প্রথম কয়েকটা ইনভিটেশন কার্ড। সে তার সহকর্মীদের ডেস্কের দিকে এগিয়ে গেল। এসিপি থেকে শুরু করে প্রতিটি অফিসারকে সে ব্যক্তিগতভাবে কার্ডগুলো দিতে শুরু করল। সবাই তাকে ঘিরে ধরেছে, কেউ অভিনন্দন জানাচ্ছে, কেউ আবার মজা করছে বিয়ের দাওয়াত নিয়ে। লিওনের চোখেমুখে আজ একটু স্নিগ্ধতা বিদ্যমান, যা তার কাজের জগতের কঠোরতাকে খানিকটা আড়াল করে রেখেছে।
সবাইকে কার্ড দেওয়া শেষ হলে অফিসার রওশন একটু দুষ্টুমির হাসি হেসে বলে উঠল, “স্যার, অবশেষে তাহলে আপনিও নিজের গলায় ফাঁস পরাতে যাচ্ছেন?”
লিওন এক মুহূর্তের জন্য থামল। তার ভ্রু সামান্য কুঁচকে উঠল, সে শান্ত গলায় পাল্টা প্রশ্ন করল, “ফাঁস? মানে?”
রওশন কার্ডটার দিকে ইশারা করে হেসে বলল, “আরে স্যার, বিয়ে মানেই তো হলো সারাজীবনের জন্য গলায় ফাঁস পড়া! সবাই তো ওটাই বলে।”
অফিসের অন্যরাও খিলখিল করে হেসে উঠল। লিওন কোনো তর্ক করল না, কেবল মৃদু হাসল। তার চোখেমুখে কোনো দ্বিধা নেই সে গম্ভীর অথচ মোলায়েম স্বরে বলল, “সময়মতো চলে এসো সবাই। তোমাদের উপস্থিতি আমার কাছে ইম্পর্ট্যান্ট।”
অফিসের সবাই বেশ উচ্ছ্বসিত। নোভা, আরিয়ানসহ বাকিরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় আনন্দ প্রকাশ করল। দীর্ঘদিনের কাজের চাপের মাঝে লিওনের এই বিয়ের আয়োজন তাদের কাছে এক আনন্দের উপলক্ষ হয়ে এল। লিওন অফিসের বাইরে বেরোতেই সবাই কানাঘুষা শুরু করল—লিওনের বিয়েতে তারা সবাই মিলে কী কী আনন্দ করা যায়, তার পরিকল্পনা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল তারা।
অফিস থেকে বেরিয়ে লিওন আকাশের দিকে তাকাল। আজ তার মনটা বেশ হালকা, অথচ মনের গভীরে এক ধরনের অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছে। জীবনসঙ্গী হিসেবে বিয়ের সিদ্ধান্তটা সে এত দ্রুত নিতে চায়নি, বিশেষ করে মায়ার সাথে। কিন্তু বাবার শারীরিক অবস্থার কথা মাথায় এলে তার সব দ্বিধা যেন ফিকে হয়ে যায়। বাবাকে সে অসম্ভব শ্রদ্ধা করে, তাই তার কোনো ইচ্ছাকে উপেক্ষা করার মতো শক্তি লিওনের নেই। বাবার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য মায়াকে বিয়ে করাটাকেই সে এখন নিজের নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করছে। আকাশের বিস্তীর্ণ নীলিমার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে লিওন ভাবল, হয়তো জীবনের সব সিদ্ধান্ত মনের মতো হয় না, কিন্তু পরিবারের শান্তির জন্য অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়।
সন্ধ্যাবেলার লন্ডন শহরটা আলোয় ঝলমল করছে। বিয়ের কেনাকাটা সেরে মায়া শপিং মলের ভেতর থেকে বেরিয়ে ফুটপাতে এসে দাঁড়াল। মলের ভেতরের উজ্জ্বল আলো আর ভিড় থেকে বেরিয়ে বাইরের ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগতেই সে কিছুটা স্বস্তি বোধ করল। লিওন তখন মলের কাউন্টারে শেষ মুহূর্তের বিল মেটাতে ব্যস্ত। মায়া আর ভেতরে অপেক্ষা না করে ফুটপাতে এগিয়ে গিয়ে গাড়িটার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। ব্যস্ত রাস্তার গাড়িগুলোর হেডলাইটের আলোয় শহরটাকে এই মুহূর্তে অন্যরকম সুন্দর লাগছে। সে গভীর একটা শ্বাস নিয়ে লন্ডনের হিমেল হাওয়া আর চারপাশের কোলাহল উপভোগ করছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই এক ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গেল। নিস্তব্ধতাকে চিরে দিয়ে ঝড়ের গতিতে একটা কালো সেডান গাড়ি সোজা মায়ার দিকে ধেয়ে এল। মায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়ির তীব্র ধাক্কায় সে শূন্যে ছিটকে গিয়ে পড়ল ফুটপাতের ওপর। বিকট শব্দে মানুষের আর্তনাদ আর আতঙ্কের রোল পড়ে গেল চারপাশ জুড়ে। গাড়িটি কোনো কিছু তোয়াক্কা না করেই মুহূর্তের মধ্যে সেখান থেকে হাওয়া হয়ে গেল, যেন কিছুই ঘটেনি।
মায়া যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, রাস্তার পিচঢালা পথে রক্তের রেখা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ধাক্কার চোটে তার পায়ের হাড় ভেঙে দুমড়ে-মুচড়ে গেছে, তীব্র ব্যথায় সে নীল হয়ে যাচ্ছে। চারপাশে মুহূর্তের মধ্যে উৎসুক জনতার ভিড় জমে গেল। কেউ ভয়ে চিৎকার করছে, কেউ বা ফোন বের করে সাহায্যের জন্য পুলিশ বা অ্যাম্বুলেন্সকে ডাকার চেষ্টা করছে।
ঠিক তখনই মলের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল লিওন। শপিং ব্যাগগুলো তার হাত থেকে খসে মাটিতে পড়ে গেল। সামনের দৃশ্যটা দেখেই তার হৃৎস্পন্দন এক লহমায় থেমে গেল। স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে, চোখের সামনে মায়ার এই রক্তাক্ত পরিণতি কোনো দুঃস্বপ্নকেও হার মানাচ্ছে।
জনতার ভিড় ঠেলে লিওন যখন একদম মাঝখানে পৌঁছাল, দেখল মায়া যন্ত্রণায় কুঁকড়ে পড়ে আছে। তার পা দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, যন্ত্রণায় মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
“মায়া!” লিওনের আর্তনাদ পুরো রাস্তা কাঁপিয়ে দিল। সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে মায়ার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। তার হাত দুটো থরথর করে কাঁপছে। আশেপাশের ভিড় করা মানুষগুলোকে সে রূঢ় গলায় ধমকে সরিয়ে দিল।
লিওন মায়ার ক্ষতবিক্ষত পায়ের দিকে তাকাল। হাড় ভেঙে যাওয়ার দৃশ্যটা তার নিজের শরীরের ভেতর এক হিমশীতল স্রোত বইয়ে দিল। মনে হলো, পৃথিবীটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেছে। সে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ফোন করল, কিন্তু তার স্থির দৃষ্টি তখনো রাস্তার সেই মোড়ের দিকে আটকে আছে—যেখানে ঘাতক গাড়িটি নিমেষের মধ্যে মিলিয়ে গেছে।
মায়ার কপালে হাত রেখে লিওন ফিসফিস করে বলল, “ভয় পাস না মায়া, আমি আছি।”
মায়ার নিস্তেজ শরীর আর যন্ত্রণার গোঙানি লিওনের মনের সব ধৈর্য এক নিমেষে ভেঙে দিল। মনের ভেতরের অস্থিরতা ততক্ষণে এক তীব্র রাগে রূপ নিয়েছে।
অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের তীক্ষ্ণ শব্দে রাতের লন্ডন শহরটা আরও বিষণ্ণ হয়ে উঠল। দ্রুত গাড়িটি সেন্ট মেরিস হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছাল। খবর পেয়ে লিওনের বাবা-মা হন্তদন্ত হয়ে হাসপাতালে ছুটে এলেন। করিডোরের বাতাসে তখন এক থমথমে পরিস্থিতি। অপারেশন থিয়েটারের দরজার সামনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল লিওন; তার নিথর চাহনিতে এক গভীর সংকেত, যার উত্তর হয়তো সময়ই দেবে।
দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা অস্ত্রোপচারের পর ডাক্তার যখন বেরিয়ে এলেন, তার গম্ভীর মুখ দেখেই সবার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। ডাক্তার খুব নিচু গলায় জানালেন, “আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি, কিন্তু আঘাতটা খুব বেশি গভীর ছিল। মায়ার পায়ের হাড় এবং স্নায়ু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সত্যি বলতে, তার পা পুরোপুরি অকেজো হয়ে গেছে। আমাদের মনে হয় না সে আর কোনোদিন নিজের পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে পারবে।”
ডাক্তারের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই লিওনের মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তার বাবার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল রাগে আর কষ্টে। কিন্তু লিওন? সে এক মুহূর্তের মধ্যে পাথর হয়ে গেল। কাঁচের দেয়ালের ওপাশে আইসিইউতে নিথর হয়ে শুয়ে থাকা মায়ার দিকে তাকিয়ে রইল সে। মনিটরের শব্দ আর মায়ার ফ্যাকাশে মুখটা দেখে তার পুরো শরীর কাঁপছে। ভেতর থেকে এক অসহ্য যন্ত্রণার ঢেউ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সে কোনো কথা বলল না, শুধু শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মায়ার সেই অসার পাদুটির দিকে, যা আর কোনোদিন হাঁটবে না।
লিওনের মনে কোনো সন্দেহের ছিটেফোঁটাও নেই—সে একে রাস্তার এক নিষ্ঠুর দুর্ঘটনা বলেই ধরে নিয়েছে। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় এমন ঘটনা তো প্রায়ই ঘটে, যেখানে কোনো এক বেপরোয়া চালকের ভুলে মুহূর্তের মধ্যে সব তছনছ হয়ে যায়। তার মনের ভেতর ঘাতক ড্রাইভারের প্রতি কোনো ঘৃণা বা আক্রোশ নেই, আছে শুধু এক বিশাল বিষাদ আর হতাশা।
সে ভাবছে, বিধাতা কেন তাদের কপালেই এমন পরীক্ষা লিখলেন? বিয়ের কার্ড ছাপানোর উৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই এই কালো মেঘ কেন নেমে এল? সে নিজেকেই অপরাধী মনে করছে—কেন সে মায়াকে শপিং মলে নিয়ে গেল? কেনই বা কেনাকাটার ফাঁকে তাকে একা ফুটপাতে দাঁড়াতে দিল? এই অপরাধবোধ তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।
লিওন জানালার কাঁচের ওপর কপাল ঠেকিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে না ঠিকই, কিন্তু বুকের ভেতরটা তীব্র যন্ত্রণায় মুচড়ে যাচ্ছে। জীবন যে কতটা ভঙ্গুর, তা আজ সে হাড়েমজ্জায় উপলব্ধি করছে। মায়ার চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাওয়ার কথাটি তাকে এক গভীর স্তব্ধতায় ডুবিয়ে দিয়েছে। সে কেবল ভাবছে, কীভাবে সে মায়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে? এই ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন আর পঙ্গুত্ব নিয়ে মায়াকে সে কোন মুখে সান্ত্বনা দেবে? তার কাছে কোনো উত্তর নেই।
টাউন হাউসের আলিশান কক্ষে হিয়া এখন একদম নিশ্চুপ। সোফার নরম গদিতে শরীর এলিয়ে দিয়ে সে হাতে ধরা ওয়াইনের গ্লাসে ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছে। তার চোখের কোণে তৃপ্তির ঝিলিক, একটু আগে ঘটিয়ে আসা ধ্বংসলীলা তাকে অসীম আনন্দ দিচ্ছে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে মলের সেই মুহূর্ত—গাড়ি দিয়ে মায়াকে যেভাবে রাস্তার ফুটপাতে আছড়ে ফেলল!সে। পাশের অন্ধকার থেকে ইভানা এগিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে, ভয়ে সে বেশ নিচু স্বরেই প্রশ্ন করল, “মিস্ট্রেস, এই কাজটা কি ঠিক করলেন? অফিসার লিওন যদি কোনোদিন জেনে যায় যে মায়ার এই পরিণতির পেছনে আপনি আছেন, তবে সে আপনাকে কোনোদিন ক্ষমা করবে না। ঘৃণা করা তো দূরের কথা, সে হয়তো আপনাকে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করবে।”
হিয়া গ্লাসে রাখা পানীয়র দিকে তাকিয়ে কুটিল হাসি হাসল। তার চোখের দৃষ্টিতে এখন ভয়াবহ উন্মাদনা। ধারালো গলায় সে বলে উঠল, “মেরে ফেলা তো খুব সামান্য কাজ, ইভানা। আমি চাইলে ওকে তখনই শেষ করে দিতে পারতাম। কিন্তু আমার প্রতিশোধ শুধু মায়াকে সরিয়ে দেওয়ার মধ্যে আটকে নেই। আমি চেয়েছি মায়া বেঁচে থাকুক। আমি চাই সে সারাজীবন ওই অচল পা নিয়ে হুইলচেয়ারে বন্দী হয়ে দেখুক যে লিওনকে সে পাবে ভেবেছিল, সে এখন শুধুই আমার।”
হিয়া গ্লাসটা টেবিলে রেখে জানালার বাইরে অন্ধকার শহরের দিকে তাকাল। তারপর সে পুনরায় ফিসফিস করে বলল, “আমি ওকে বাঁচিয়ে রেখেছি একটা উদ্দেশ্যেই। আমি চাই মায়া নিজের চোখে দেখুক, লিওন কীভাবে আমার মায়াজালে আটকা পড়েছে। প্রতিদিন যখন সে দেখবে লিওন আমার হাত ধরে হাঁটছে, তখন তার ভেতর যে হাহাকার তৈরি হবে সেটাই আমার আসল প্রতিশোধ। মৃত্যু তো কেবল একটা মুহূর্তের মুক্তি, কিন্তু আমার দেওয়া এই পঙ্গুত্ব তাকে তিলে তিলে মৃত্যুর স্বাদ দেবে। মায়া বেঁচে থেকে আমার আর লিওনের সম্পর্কের সেই মধুর যন্ত্রণা প্রতিটা মুহূর্তে অনুভব করবে যেই যন্ত্রনা এখন আমি ভোগ করছি।”
হিয়ার এই নিষ্ঠুর দার্শনিকতা শুনে ইভানা এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, হিয়া কেবল লিওনকে চায় না, সে চায় লিওনের সাথে সম্পর্কিত প্রতিটি মানুষকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে তার সেই যন্ত্রণার আনন্দ নিতে।
হিয়া উঠে দাঁড়াল, তার কণ্ঠে এখন কোনো উত্তাপ নেই, আছে শুধু এক বরফশীতল সংকল্প।
দীর্ঘ ২৪ ঘণ্টা পার হয়েছে। হাসপাতালের আইসিইউ-এর নিস্তব্ধ কেবিনে মায়ার জ্ঞান ফিরল। চোখের পাতা মেলার সাথে সাথেই চারপাশের সাদা দেয়াল আর ওষুধের কড়া গন্ধ তাকে নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। মায়া তার অবশ শরীরটা নাড়ানোর একটা ক্ষীণ চেষ্টা করল, বিশেষ করে পাদুটো। কিন্তু শরীরের সেই অংশ থেকে কোনো সাড়া এল না, শুধু এক গভীর শূন্যতা তাকে গ্রাস করে রইল। শত চেষ্টা করেও সে পায়ের একটা আঙুল পর্যন্ত নড়াতে পারল না।হিমশীতল আতঙ্কে তার সারা শরীর কেঁপে উঠল,মায়া বুঝতে পারল, তার পায়ের সাথে জীবনের ছন্দটাও চিরতরে থমকে গেছে। সে আর কোনোদিন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে না। এই ভয়ংকর সত্যটা তাকে ভেতর থেকে পাথর করে দিল। চোখের কোণে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে বালিশে মিশে গেল। বাইরে তখন হাসপাতালের করিডোরের মৃদু গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, কিন্তু মায়ার পৃথিবীটা এক নিমিষেই স্থির হয়ে গেছে—যেখানে শুধু আছে এক অসীম পঙ্গুত্ব আর অন্ধকার ভবিষ্যৎ।
ঠিক সেই মুহূর্তে কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল লিওন। তার পেছনে লিওনের বাবা মাও আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু লিওনের বিষণ্ণ মুখ দেখে তারা আপাতত বাইরেই দাঁড়িয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। লিওন ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বিছানার পাশে চেয়ারে বসে পড়লো। তাকে দেখেই মায়া তীব্র অভিমানে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। নিজের এই অসহায় পঙ্গুত্ব লিওনের সামনে মেনে নেওয়া তার জন্য অসহ্য যন্ত্রণার। লিওন কিছু সময় স্তব্ধ হয়ে বসে রইল, তারপর পরম মমতায় মায়ার বরফশীতল হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। লিওনের হাতের সেই পরিচিত ছোঁয়া পেতেই মায়ার এতক্ষণের চেপে রাখা বাঁধ ভাঙা কান্না আছড়ে পড়ল। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে সে অস্ফুট স্বরে বলল, “সব শেষ হয়ে গেছে লিও ভাইয়া… সবকিছু শেষ হয়ে গেল। আমি… আমি আর কোনোদিন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারব না।”
লিওন মায়ার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে পরম আশ্বাসের সুরে বলল, “একদম ওসব কথা বলবি না, মায়া। তুই আবার হাঁটতে পারবি। আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো ডাক্তার দিয়ে তোর চিকিৎসার ব্যবস্থা করব। যেখানে যেতে হয় নিয়ে যাব, তুই শুধু ভেঙে পড়িস না। তোর কিছু হতে আমি দেব না।”
মায়া তার অশ্রুসজল চোখে লিওনের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে এক বুক অনিশ্চয়তা আর ভয়। সে কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল, “কিন্তু আমার মতো এই পঙ্গু মেয়েকে তুমি তো আর বিয়ে করবে না, লিও ভাইয়া? তাই না বলো? আমাদের বিয়েটা তো আর হলো না… সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।”
কথাটা মায়ার বুকের ভেতর থেকে এক গভীর হাহাকার হয়ে বেরিয়ে এল। তার চোখে এখন শুধু শূন্যতা, কারণ সে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে এমন পরিস্থিতির পরেও কেউ তাকে আগের মতো আপন করে নিতে চাইবে।
মায়ার এমন কথায় লিওন কিছুক্ষণ থ মেরে বসে রইলো। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল অফিসের সবার আনন্দিত মুখ, চারদিকে বিলি করা বিয়ের সেই সুন্দর কার্ডগুলো। সে মায়ার দিকে তাকাল—যে মেয়েটি শৈশব থেকে তাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে এসেছে, আজ সে হাসপাতালের বিছানায় কতখানি অসহায়।
লিওন গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পরম আদরে মায়ার চুলে হাত বুলিয়ে দিল। তার চোখের দৃষ্টিতে তখন কোনো দ্বিধা নেই, আছে কেবল অটল প্রতিজ্ঞা। সে শান্ত কণ্ঠে বলল, “সবাইকে কার্ড দেওয়া শেষ, পুরো পৃথিবী এখন জানে এই সপ্তাহেই আমাদের বিয়ে হবে। আর হ্যাঁ, বিয়েটা এই সপ্তাহেই হবে, মায়া।”
মায়ার বড় বড় চোখ দুটো বিস্ময়ে আরও বড় হয়ে গেল। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির পরেও লিওন তার সিদ্ধান্ত থেকে বিন্দুমাত্র নড়েনি। মায়া নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না। বড় বড় চোখে লিওনের দিকে তাকিয়ে সে অস্ফুট স্বরে বলল, “সত্যি বলছ লিও ভাইয়া? কিন্তু আমার এই অবস্থা… সবাই কী বলবে?”
লিওন মায়ার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল, “তোর মনে আর কোনো সংশয় রাখিস না। তুই আমার কাছে কী, তা তুই ভালো করেই জানিস। মায়া, তোর এই শারীরিক পরিস্থিতি কখনোই আমাদের বিয়ের পথে বাধা হতে পারে না। আম তোকে ছোট থেকেই স্নেহ করি। আমি তোর জীবনসঙ্গী হতে চেয়েছি, শুধু সুস্থ সময়ের জন্য নয়—জীবনের প্রতিটি প্রতিকূলতায় আমি তোর পাশে থাকব।”
লিওনের দৃঢ়তায় মায়ার চোখের জল এক নিমেষে আনন্দের অশ্রুতে রূপ নিল। সে লিওনের হাতের ওপর নিজের হাতটা আলতো করে রাখল। কিন্তু সে কি জানে, লিওনের এই মানবিকতা আর গভীর দায়িত্ববোধের আড়ালে কোন এক অদৃশ্য ঝড় ঘনিয়ে আসছে? লিওন তার এই অটল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মায়াকে আগলে রাখতে চাইছে ঠিকই, কিন্তু নিয়তি তাদের জন্য কী লিখে রেখেছে, তা তাদের অগোচরেই থেকে গেল।
লন্ডনের সেই হাসপাতালের খবর বাংলাদেশের বাড়িতে পৌঁছাতেই মুহূর্তের মধ্যে সব আনন্দ ফিকে হয়ে গেল। লিওনের বড় বোন অ্যামেলিয়া, যে তার স্বামী রুদ্রনীল ভুঁইয়ার সাথে ঢাকায় থাকেন, খবরটা শোনার পর
থেকেই পাথর হয়ে গেছে। সে তো তার ছোট ভাইয়ের বিয়ের আনন্দঘন দিনগুলোর অপেক্ষায় দিন গুনছিল, প্রিয় ভাই আর মায়াকে বরণ করে নেওয়ার কতশত পরিকল্পনা ছিল তার মাথায়! কিন্তু মায়ার এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর তার সব স্বপ্নকে এক নিমিষে ধূলিসাৎ করে দিল।
অ্যামেলিয়ার হাত থেকে ফোনটা কখন পড়ে গেল, সে নিজেও টের পেল না। রুদ্রনীল ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল, কিন্তু তার মুখেও তখন সান্ত্বনার কোনো ভাষা নেই। কক্ষের ভেতরটা তখন এক গা ছমছমে স্তব্ধতায় ঢাকা। অ্যামেলিয়ার চোখের সামনে বারবার ভাসছে মায়ার সেই হাসিখুশি মুখটা; কত স্বপ্ন ছিল তাকে নিয়ে, কত সাজগোজের পরিকল্পনা ছিল—সব যেন এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ঢাকার এই শান্ত বাড়িতেও এখন শোকের মাতম। লন্ডনের সেই হাসপাতালের অন্ধকার হাজার মাইল পেরিয়ে ঠিক তাদের কক্ষের কোণায় এসে থমকে দাঁড়িয়েছে।
অ্যামেলিয়া মুহূর্তের জন্যও দেরি করল না; দ্রুত লন্ডন যাওয়ার ফ্লাইট বুক করে ফেলল। রুদ্রনীল ভুঁইয়াও স্থির করলেন যে, এই বিপদের দিনে তিনি স্ত্রীর পাশেই থাকবেন। রুদ্রনীল বাংলাদেশের একজন বড় মাপের বিজনেস টাইকুন, যার ব্যবসার বিস্তার শুধু দেশেই সীমাবদ্ধ নয়—লন্ডন, দুবাই আর আমেরিকা জুড়ে তার ইমপোর্ট-এক্সপোর্টের বিশাল সাম্রাজ্য।
পরদিন সকালেই অ্যামেলিয়া এবং রুদ্রনীল ভুঁইয়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের লাউঞ্জে বসে ছিলেন লন্ডনের ফ্লাইটের অপেক্ষায়। অ্যামেলিয়ার চোখের কোণে পানি চিকচিক করছিল। সে ভাঙা গলায় রুদ্রনীলের দিকে তাকিয়ে বললো, “আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না যে আমার ভাইটার জীবনে এমন একটা বিপর্যয় নেমে এল! মায়ার জন্য আমার বুক ফেটে যাচ্ছে, মেয়েটা এই বিয়ের জন্য কত কী স্বপ্ন দেখেছিল।”
রুদ্রনীল পরম মমতায় অ্যামেলিয়ার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরলো। শান্ত স্বরে বললো, “অ্যামেলি ডার্লিং, ভেঙে পড়লে চলবে না। আমাদের চেয়েও বড় ঝড়টা যাচ্ছে লিওনার্দোর ওপর দিয়ে। আমাদের দ্রুত সেখানে পৌঁছানো প্রয়োজন। এমন দুঃসময়ে পরিবারের সবার একজোট হয়ে থাকাটাই এখন সবচেয়ে বড় শক্তি।”
বিমান যখন রানওয়ে ছেড়ে মেঘের রাজ্যে পাড়ি দিল, অ্যামেলিয়া জানালার বাইরের অসীম নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার মনে দুশ্চিন্তার পাহাড়—লন্ডনে পৌঁছানোর পর তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে? অ্যামেলিয়া তখনো জানতো না, লন্ডনের মাটিতে পা রাখার সাথে সাথেই সে এমন এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি হতে চলেছে, যার সাথে তার কোনো পূর্বপরিচয় নেই। সেখানে পরিস্থিতির রং বদলে গেছে অনেক আগেই, যার অদৃশ্য সুতোয় জড়িয়ে আছে এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্র।
এদিকে হিয়া আয়মান খানকে ফোন করল। সে অত্যন্ত শান্ত গলায় জানাল, সব জটিলতার অবসান ঘটিয়ে সে সেই আলোচিত ‘ব্লু স্টার ডায়মন্ড’ ফেরত দিতে চায়। সে পরিষ্কার জানিয়ে দিল, এই সাক্ষাতের সময় সে একাই আসবে এবং আয়মানের হোটেলের ব্যক্তিগত সুইটেই দেখা করবে।
হিয়ার এমন প্রস্তাবে আয়মান খান বেশ প্রফুল্ল হয়ে উঠল। এই দুদিন ধরে হীরাটি হাতছাড়া হওয়ার যে আক্ষেপ তার মনে ছিল, তা মিটতে চলেছে ভেবে সে বেশ উত্তেজিত। বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সে তার বাবা আসাদ খানকে ফোন করল।
আয়মান তার বাবাকে ফোনে জানাল, “বাবা, ভাইপার শেষ পর্যন্ত সেই ‘ব্লু স্টার ডায়মন্ড’ ফেরত দিতে রাজি হয়েছে। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় সুযোগ। তুমি দেরি না করে দ্রুত লন্ডনে চলে আসো, আমাদের সামনাসামনি বিষয়টি নিয়ে কথা বলা খুব জরুরি।”
আয়মান ভাবতেও পারেনি যে, এই ডায়মন্ড ফেরতের প্রস্তাবটি আসলে একটি সূক্ষ্ম ফাঁদ। হিয়া সুকৌশলে আয়মান এবং তার বাবাকে লন্ডনে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছে। আসাদ খান একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী; তিনি পরিস্থিতির গুরুত্ব আঁচ করতে পারলেন। কোনো ঝুঁকি না নিয়ে তিনি দ্রুত লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। তিনি জানতেন না, লন্ডনের সেই হোটেলের সুইটে পৌঁছানোর পর তাদের জীবনে ঠিক কী ধরনের ঝড় অপেক্ষা করছে।
আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১২
লন্ডনের মাটিতে হিয়া নিজের ইচ্ছামতো দাবার ছক সাজাচ্ছে। একদিকে মায়ার মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় লিওনের পরিবার দিশেহারা, অন্যদিকে হিয়ার প্রলোভনে পা দিয়ে আয়মান খান ও তার বাবা আসাদ খান নিজেদের অজান্তেই জড়িয়ে পড়ছেন এক ভয়ংকর জালে। ব্যবসার মোড়কে হীরা ফেরতের যে প্রস্তাব হিয়া দিয়েছে, তার আসল উদ্দেশ্য যে কতটা গভীর, তা কারোই আঁচ করার ক্ষমতা নেই। সবাই এখন লন্ডনের দিকেই ছুটছে। লিওন, পুরো শহরটা ধীরে ধীরে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ এই মানুষগুলোর কেউই জানে না যে, লন্ডন শহরটা এখন আর তাদের কারো জন্যই নিরাপদ নয়। হিয়া পর্দার আড়াল থেকে সবাইকে নাচাচ্ছে। পরিস্থিতির এই সমীকরণে শেষ পর্যন্ত কে জিতবে আর কে হারবে, তার উত্তর লুকিয়ে আছে হিয়র আগামী পদক্ষেপগুলোর ভেতরেই।
