আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১৬
সাবিলা সাবি
নীলচে আলোর সেই গোপন আস্তানার ভেতর দিয়ে সময়টা থমকে ছিল, কিন্তু টানেলের গভীরে ভোরের আলো এসে পৌঁছাতে শুরু করেছে। আস্তানার কার্নিশ দিয়ে ভোরের হালকা সোনালী আভা চুইয়ে পড়ছে, যা টানেলের দেয়ালের কৃত্রিম নীল আলোর তীব্রতাকে কিছুটা মলিন করে দিয়েছে। রাত পেরিয়ে সকাল হয়েছে, কিন্তু এই আস্তানার ভেতর রাত আর দিনের পার্থক্য কেবল আলোর তীব্রতায়, বাস্তবতায় নয়।
লিওনের মস্তিষ্কের গভীরে জমে থাকা অস্পষ্ট ঘোর ধীরে ধীরে কেটে যেতে শুরু করল। তার চোখের পাতা কাঁপল খনিকটা, তারপর ভারী হয়ে খুলে গেল। ঝাপসা দৃষ্টি পরিষ্কার হতেই সে বুঝতে পারল, সে এক অপরিচিত নীল আলোয় ঘেরা কক্ষে শুয়ে আছে।
হঠাৎ করেই তার চেতনা পুরোদমে ফিরে এল। তার শরীরের প্রতিটি স্নায়ু সতর্ক হয়ে উঠল। সে বিছানা থেকে এক ঝটকায় উঠে বসল, কিন্তু নিজের দিকে তাকাতেই তার কপালে ভাঁজ পড়ল। সে নিজের পরনে দেখল একটা কালো সাধারণ টিশার্ট এবং ট্রাউজার। তার শেরওয়ানিটা গা থেকে উধাও।
লিওনের চোখজোড়া মুহূর্তের জন্য বড় হয়ে উঠল। বিস্ময় আর সন্দেহে তার চোয়াল শক্ত হয়ে শক্ত হলো। কারো স্পর্শ তার শরীরে? তার অগোচরেই কেউ পোশাক বদলে দিয়েছে? এই চিন্তাটা তার শরীরের ভেতরটায় অস্বস্তি আর ঘৃণার জন্ম দিল।
কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিল। তার ভেতরে থাকা সিআইডি অফিসারটি চোখের পলকে জেগে উঠল। সমস্ত চিন্তা ঝেড়ে ফেলে সে দ্রুত বিছানা থেকে নেমে এল। কোনো দ্বিধা বা ভয়ের লেশমাত্র নেই তার চোখে; এখন সেখানে কেবল আগুনের মতো জ্বলছে এক গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। সে জানত, এই ঘরটা সাধারণ কোনো কারাগার নয়, এটা একটা ছক। আর সেই ছক ভেঙে বেরোতে হলে তাকে প্রতিটি ইঞ্চি খুঁটিয়ে দেখতে হবে। শিকারি যখন বাঘের গুহায় থাকে, তখন তার প্রতিটি পদক্ষেপ হয় নিখুঁত—লিওন এখন ঠিক সেটাই করছে।
লিওনের প্রতিটি নড়াচড়া ছিল নিখুঁত আর হিসেবি। তার কাছে এই বদ্ধ কক্ষটি এখন আর কেবল একটি কারাগার নয়, বরং ক্রাইম সিন। লিওন তার শরীরের প্রতিটি পেশিকে টানটান করে রাখল, যেকোনো মুহূর্তের বিপদের জন্য সে সদা প্রস্তুত। সে বুঝতে পারছে, এই দেয়ালগুলো হিয়ার সাইকোপ্যাথিক খেলার সাক্ষী, আর তাকে এখান থেকে বেরোতেই হবে সেটা করাও দয়ার নয়, নিজের যোগ্যতায়।
লিওন কক্ষের এক কোণ থেকে অন্য কোণে ধীর পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। প্রথমেই সে দেওয়ালগুলো খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে শুরু করল। কোনো লুকানো ক্যামেরা, মাইক্রোফোন বা গোপন সুইচ আছে কি না তা বোঝার জন্য সে আঙুল দিয়ে দেওয়ালের প্রতিটি খাঁজ অনুভব করল। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি প্রতিটি ইটের জয়েন্টের ফাটলকে স্ক্যান করছিল।
এরপর সে গেল সেই ভারী দরজাটির কাছে। লকটা ঠিক কী ধরনের মেকানিজম বা প্রযুক্তিতে কাজ করছে, তা বুঝতে সে আঙুল চালাল দরজার ধাতব ফ্রেমের ওপর। এরপর দরজার ওপারে কোনো পায়ের শব্দ বা গার্ডের ফিসফিসানি শোনা যায় কি না, তা বুঝতে সে কান পাতল সেখানে। কোনো শব্দ কি তাকে বাইরের দুনিয়ার কোনো ক্লু দেবে?
সবশেষে তার নজর গেল বিছানার পাশের ড্রয়ারের দিকে। সেখানেই হিয়া তার ফার্স্ট এইড বক্স আর অন্যান্য ব্যক্তিগত জিনিস রেখেছিল। লিওন প্রতিটি ড্রয়ার, প্রতিটি কোণা তন্নতন্ন করে খুঁজল। কোনো চিরকুট, কোনো চাবির টুকরো, বা এমন কোনো সূত্র কি আছে যা হিয়া ভুলে রেখে গেছে?
প্রতিটা কোণ চষে ফেলার সময় লিওনের হৃদস্পন্দন ছিল স্থিতিশীল—একজন পেশাদার অফিসারের মতোই ঠান্ডা। তার বাদামী চোখের দৃষ্টিতে এখন আর কোনো বিভ্রান্তি নেই, আছে কেবল এই নরক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার অদম্য জেদ। হিয়া তাকে বন্দি করতে পারে, কিন্তু তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাকে বন্দি করা অসম্ভব।
কক্ষের ভারী দরজাটা কোনো শব্দ না করেই খুলে গেল। সেই অতি পরিচিত যান্ত্রিক আওয়াজ, যা লিওনের স্নায়ুতে চাপ সৃষ্টি করে। একজন সার্ভেন্ট ট্রে হাতে ঘরে ঢুকল। সাথে সাথেই উজ্জ্বল বৈদ্যুতিক আলো জ্বলে উঠল পুরো রুম জুড়ে।
লিওন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। কৃত্রিম সেই তীব্র আলোর ঝলকানিতে তার চোখের পাতা কেঁপে উঠল। জানালার অস্তিত্বহীন এই বদ্ধ কুঠুরিতে সে ভুলেই গিয়েছিল যে বাইরে এখন সকাল। পৃথিবীর কোথাও ভোরের আলো ফুটেছে, পাখিরা ডানা মেলছে—অথচ এখানে সময় স্থির হয়ে আছে কোনো এক অন্ধকার গোলকধাঁধায়।
সার্ভেন্টকে দেখামাত্রই লিওনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সিআইডি সত্তাটি গর্জে উঠল। তার কণ্ঠস্বরে চাপা একটা তীক্ষ্ণ হুংকার ফুটে উঠলো “হিয়াকে ডাকো! কোথায় সে? ওর সাথে আমার জরুরি কথা আছে!”
সার্ভেন্টটি লিওনের এমন উগ্র মেজাজ দেখে কিছুটা ইতস্তত বোধ করল। কাঁপা কাঁপা গলায় সে নিচু স্বরে উত্তর দিল, “মিস্টার, মিস্ট্রেস এখন জিমে আছেন। তিনি একটু পরেই আসবেন। তার আগে আপনি বরং সকালের খাবারটা খেয়ে নিন।”
লিওন সার্ভেন্টের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। উত্তেজনায় তার চোয়াল পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে, কিন্তু তার ভেতরের সিআইডি অফিসারটি ততক্ষণে ঠান্ডা মাথায় ছক কষতে শুরু করেছে। সে ভালো করেই জানে, এই কারাগারের চার দেয়াল ভাঙতে হলে কেবল ক্ষিপ্রতাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ইস্পাতের মতো মানসিক ও শারীরিক দৃঢ়তা। হিয়া যে সাইকোপ্যাথিক ধাঁধায় তাকে জড়িয়েছে, তা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য এখন নিজের রক্তে প্রয়োজন নতুন করে প্রাণশক্তি সঞ্চয় করা। দুর্বল শরীরে এই বাঘের ডেরা থেকে বের হওয়া অসম্ভব।
একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লিওন সার্ভেন্টের রেখে যাওয়া খাবারের ট্রের দিকে এগিয়ে গেল। ট্রের খাবারগুলো বেশ পুষ্টিকর। যা দেখে মনে হলো তাকে কেবল বাঁচিয়ে রাখার জন্য নয়, তাকে সচল রাখার জন্য এক বিশেষ ভোজন আয়োজন। হিয়া হয়তো চাইছে লিওন সুস্থ থাকুক, তার খেলার উপযুক্ত থাকুক।
লিওন আর কোনো কথা বলল না, কোনো প্রশ্নও ছুড়ল না। শান্তভাবে সে খাবার মুখে তুলল। প্রতিটি গ্রাসের সাথে তার জেদ কেবল বাড়ছে। সে খাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি গোগ্রাসের সাথে সে নিজের ভেতরের আগ্নেয়গিরিটাকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে। সে মনে মনে শপথ করল—হিয়া হয়তো তাকে শেকলে বেঁধেছে, কিন্তু এই শেকল ভাঙার শক্তিটাও সে হিয়ার দেওয়া খাবারের মাধ্যমেই অর্জন করবে।
খাবার শেষ করে লিওন ঘরের বদ্ধ পরিসরে পায়চারি শুরু করল। হাতের তালুতে তালু ঘষে সে নিজের অস্থিরতাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। কিন্তু তার তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক স্থির ছিল না; সে দেয়ালের প্রতিটি জয়েন্ট, সিলিংয়ের কোণ আর দরজার মেকানিজম, সবকিছুই নিরাসক্ত চোখে মেপে নিচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে নিঃশব্দে দরজাটা খুলে গেল। ঘরের নিস্তব্ধতাকে চিরে ঘরে ঢুকল হিয়া। তাকে দেখে মনে হলো কোনো অশুভ ছায়া সশরীরে হেঁটে এল। পরনের কালো ট্যাংক টপ আর ঢিলেঢালা জিন্স তার শরীরকে এক মারকুটে লুক দিয়েছে, আর ঘাড় পর্যন্ত ছাঁটা উলফ কাট চুলে তাকে লাগছে প্রচণ্ড বিপজ্জনক।
উজ্জ্বল নিয়ন আলোয় তার হাতের স্নেক ট্যাটুটা সাপের মতো ফণা তুলে মনে হলো লিওনের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু লিওনের চোখ আটকে গেল হিয়ার কাঁধের ঠিক নিচে, যেখানে তার নিজের ছোঁড়া বুলেটের ক্ষততে তার নামের অক্ষরের ট্যাটুটা গভীরভাবে খোদাই করা।
হিয়ার স্থির দৃষ্টির ওপর ভ্রুর পিয়ার্সিংয়ের ঝিলিকটা শাণিত ছুরির মতো বিঁধছিল। তার চোখে তৃপ্তি ছিলো,সে তার পোষা বাঘটিকে খাঁচায় বন্দি করে তার ছটফটানি উপভোগ করছে।
লিওনের ভেতরটা তখন জ্বলছে, শরীরের প্রতিটি পেশিতে একটা প্রচণ্ড বিস্ফোরণের অপেক্ষায় টানটান হয়ে আছে। হিয়া ধীর পায়ে এগিয়ে এল।লিওনের ঠিক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, সেই পরিচিত বাঁকা হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে সে শান্ত গলায় বলল, “সার্ভেন্ট বলল তুমি নাকি খুব অস্থির হয়ে ছিলে, আমাকে দেখার জন্য ছটফট করছিলে? কী হলো লিওন, হিয়াকে কি খুব বেশি মিস করছিলে?”
হিয়ার কণ্ঠস্বরের শীতলতা লিওনের কানে সিসার মতো বিধলো। লিওনের চোখের চাহনিতে তখন ঘৃণা আর ক্রোধের আগুন। সে হিয়ার দিকে এক কদম এগিয়ে গিয়ে দাঁত চেপে বলল, “একটা কথা বলো তো হিয়া, আমার বিয়ের দিন আমাকে কিডন্যাপ করে আনলে, ভালো কথা! তুমি চেয়েছো অন্য কারো সাথে আমার বিয়ে না হোক—তাও বুঝলাম। কিন্তু তুলে এনে আসলে তুমি কী চাইছো? ব্ল্যাকমেইল করে আমাকে বিয়ে করতে চাও?”
হিয়া স্থির দৃষ্টিতে লিওনের চোখে চোখ রাখল। ঠোঁটের কোণে তার বিদ্রূপের এক চিলতে হাসি। শান্ত স্বরে সে বলল, “ব্ল্যাকমেইল? সেটা করতে চাইলে অনেক আগেই করতাম। আমি জানি জোর করে বা ভয় দেখিয়ে অন্তত তোমার মতো বাজপাখিকে পোষ মানানো যায় না। আমি তোমাকে বিয়ে করব, কিন্তু সেটা হবে তোমার নিজের ইচ্ছায়। সময়ের অপেক্ষায় আছি। আমি জানি, একটা সময় আসবে যখন তুমি নিজে থেকেই আমার কাছে আসবে। শুধু বিয়েই নয়, আমার বাচ্চার বাবাও তুমি হবে।”
কথাটা শেষ হতেই লিওনের ধৈর্য বাঁধ ভাঙল। সে হিয়ার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, “অসভ্য মেয়েমানুষ! তোমার মুখে কি কোনো লাগাম নেই? এই নোংরা কল্পনাগুলো করার সাহস তুমি কীভাবে পাও?”
হিয়ার মুখে কোনো বিরক্তি নেই, বরং সেখানে শীতল একটা প্রশান্তি। সে লিওনের এই রাগের ভেতর দিয়েই তার জয়কে উপভোগ করছে।
লিওন ঘৃণা আর অস্বস্তিতে কুঁকড়ে উঠে নিজের টিশার্টের দিকে তাকালো। সে শক্ত গলায় জিজ্ঞাসা করল, “এই টিশার্ট কার? আমি অন্যের ব্যবহৃত কোনো জিনিস কখনোই গায়ে জড়াই না।”
হিয়া মৃদু হেসে লিওনের সামনে এগিয়ে এল। অন্তত নিচু গলায় বলল, “স্মেলে বুঝতে পারছো না এটা কার?”
লিওন অবজ্ঞার স্বরে বলল, “আমি কি মানুষের শরীরের গন্ধ শুঁকে থাকি নাকি?”
হিয়া তার চিবুকটা একটু এগিয়ে দিয়ে বলল, “সব মানুষের না, তবে আমার ঘ্রাণটা তো চেনা উচিত তোমার। এটা আমারই টিশার্ট। আর ডোন্ট ওরি, অন্য কেউ তোমার পোশাক চেঞ্জ করে দেয়নি, আমি নিজের হাতেই তোমাকে এই টিশার্ট আর ট্রাউজার পড়িয়েছি।”
লিওনের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে বলল, “হোয়াট?!”
হিয়া শান্তভাবে জানাল, “রিল্যাক্স। আমি চোখ ব্লাইন্ডফোলড করে রেখেছিলাম, কিছুই দেখিনি। তবে… হ্যাঁ, তোমার ঠোঁটে একটু তীব্র চুমু খেয়েছি।”
কথাটা শোনার সাথে সাথে লিওনের মাথাটা মনে হলো চক্কর দিয়ে উঠল। এই নিয়ে দুবার! এই ঘটনা ঘটলো। লিওন গর্জে উঠে বললো “তোমার কি কোনো লজ্জা নেই? এভাবে একটা অচেতন পুরুষের ওপর ফায়দা লুটতে তোমার ঠোট কাঁপল না?”
হিয়া নির্বিকারভাবে বললো, “অন্য কোনো পুরুষের নয়, আমার একান্ত পুরুষের ঠোঁটে আমি চুমু খেয়েছি। আর অচেতনের ফায়দা বলছো? সময় হলে তুমি নিজেই আমাকে চুমু খাওয়ার জন্য পাগল হয়ে থাকবে।”
লিওনের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে দাঁত চেপে বলল, “আমাকে এখান থেকে যেতে দাও হিয়া। আমি তোমাকে ওয়ার্নিং দিচ্ছি শেষবারের মতো!”
হিয়া এক পা এগিয়ে এসে লিওনের টিশার্টের কলার শক্ত করে ধরল। তাকে একদম নিজের কাছে টেনে এনে চোখে চোখ রেখে বলল, “আমি না চাইলে এখান থেকে এক পা-ও নড়ার ক্ষমতা নেই তোমার।”
হিয়া সরে আসার আগেই লিওন বিদ্যুৎগতিতে হিয়ার জিন্সের বেল্ট লুপে আঙুল ঢুকিয়ে তাকে নিজের কাছে হ্যাঁচকা টানে টেনে আনল। হিয়া চমকে গেল খানিকটা। লিওন হিয়ার মুখের একদম সামনে নিজের মুখ নিয়ে এসে ঠান্ডা গলায় বলল, “চ্যালেঞ্জ একসেপ্টেড। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমি এখান থেকে বের হবোই।”
লিওনের উষ্ণ নিশ্বাস হিয়ার ত্বকে এসে আছড়ে পড়ছে। তার পুরুষালি উপস্থিতির তীব্রতায় হিয়ার শরীরের স্নায়ুগুলো অবশ হয়ে আসছে। তার শরীর খানিকটা কাঁপছে, তার সাইকোপ্যাথিক দম্ভ লিওনের এই ছোঁয়ার কাছে মুহূর্তের জন্য নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসেছে।
লিওন হিয়ার বেল্ট লুপ ছেড়ে দিয়ে তাকে এক ঝটকায় অনেকটা দূরে ঠেলে দিল। হিয়া টাল সামলে দাঁড়িয়ে পড়ল, তার বুকের ভেতর তখন শ্বাস-প্রশ্বাসের অস্বাভাবিক দ্রুত গতি। লিওনের সেই প্রচণ্ড পৌরুষের স্পর্শ আর তার চ্যালেঞ্জের তীব্রতায় হিয়ার নিজেরই নিয়ন্ত্রণ ধসে পড়ার উপক্রম। সে গভীর একটা শ্বাস নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করল, কণ্ঠে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার ব্যর্থ চেষ্টা করে জিজ্ঞেস করল, “খাবার খেয়েছিলে?”
লিওন এক মুহূর্ত দেরি না করে উপহাসের হাসি হাসল। চোখের দৃষ্টিতে প্রখর ঘৃণা। সে ঠান্ডা গলায় বলল, “কেনো? তুমি কি ভেবেছিলি আমি না খেয়ে না খেয়ে নাটক করবো আর ইমোশনাল ব্লাকমেইল করে বলবো আমি খাবো না, এক ফোঁটাও পানিও পান করবো না, আমাকে এখান থেকে যেতে না দিলে, এটা ভেবেছিলে?”
হিয়ার ঠোঁটে ফুটে ওঠা সেই রহস্যময় হাসিতে অদ্ভুত তৃপ্তি ফুটে উঠলো। লিওনের এই আগ্নেয়গিরির মতো রাগ তাকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করলো না বরং ভেতর থেকে ঘোরলাগা নেশায় মেতে তুললো। সে আরও একটু এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, “ইউ নো হোয়াট? তুমি একদমই চাইল্ডিশ। আর বিশ্বাস করো, তোমার এই চাইল্ডিশ জেদটুকু আমি ভীষণ ভালোবাসি। তোমার এই অবাধ্যতা, এই ঘৃণা আমার প্রতি, আমার আকর্ষণকে আরও হাজার গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।”
লিওন এক মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গেল। তার চোয়াল ঝুলে পড়ার উপক্রম। সে নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল, “আল্লাহ! এটা কি মেয়ে নাকি অন্য কোনো প্রজাতির প্রাণী?”
লিওনের অবাক হওয়া চাহনি দেখে হিয়া আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল। লিওন বুঝতে পারছে, সে একজন সাধারণ মানুষের সাথে নয়, বরং এমন এক নারীর সাথে লড়ছে যার কাছে ভালোবাসা আর পাগলামির মধ্যে কোনো ফারাক নেই।
লিওনের সাথে সেই উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের পর হিয়া কক্ষ থেকে বেরিয়ে এল। নিজের শরীরের ভেতরে জমে থাকা আগ্নেয়গিরিটাকে শান্ত করতে সে সরাসরি বাস্কেটবল কোর্টের দিকে পা বাড়াল। প্রতিটি ড্রিবলিংয়ে বলের শব্দতে লিওনের প্রতি তার অমোঘ অধিকার আর জেদকে আরও উসকে দিচ্ছিল। প্রতিটা শট—একদম লক্ষ্যভেদী যা লিওনকে নিজের আয়ত্তে রাখার সেই নিষ্ঠুর নেশারই প্রতিফলন। তার মনোযোগ তখন বাস্কেট আর বলের ছন্দে, কিন্তু প্রতিটা বাস্কেটের সাথেই মনে পড়ছে লিওনের সেই আগুনের মতো জ্বলন্ত চাহনি—যা তাকে দুর্বল করার বদলে বরং আরও বেশি নেশাতুর করে তুলছে।
কিছুক্ষণ খেলার পরই ইভানা দ্রুত পায়ে এগিয়ে এল। ইভানার চোখেমুখে কিছুটা উদ্বেগ স্পষ্ট সে নিচু স্বরে জানাল, “মিস্ট্রেস বস আপনাকে এখনই দেখা করতে বলেছেন।”
বলটা এক হাতে ড্রিবল করতে করতে হিয়া মুহূর্তের জন্য থামল। দানিয়েলের নাম শুনেই তার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে খুব ভালো করেই জানে দানিয়েল কেন ডেকেছে। লিওনকে এভাবে তুলে আনার ঘটনা এবং তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে হয়তো দানিয়েলের নতুন কোনো আপত্তি বা প্রশ্ন আছে। হিয়া বলটা ইভানার দিকে ছুড়ে দিয়ে তোয়ালে দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে বলল, “যাচ্ছি বাইকটা রেডি কর ইভানা।”
সে আর কোনো কথা না বলে সোজা শাওয়ারের দিকে রওনা দিল। গরম পানির ঝাপটা তার শরীরের ওপর পড়তে পড়তে সে ভাবতে লাগল, দানিয়েলকে কীভাবে সামলাতে হবে। শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়েও তার মনে কেবল একটাই চিন্তা—লিওন। দানিয়েল হয়তো বাধা হয়ে দাঁড়াবে, কিন্তু লিওনকে নিজের করে পাওয়ার জেদ থেকে হিয়াকে সরানোর ক্ষমতা কারো নেই। শাওয়ার শেষ করে হিয়া নিজেকে তৈরি করতে শুরু করল টাউন হাউসে পা বাড়ানোর জন্য।
অন্যদিকে সিআইডি অফিসের পরিস্থিতি তখন বেশ থমথমে। টেবিলজুড়ে লিওনের শেষ কিছু লোকেশন আর সিসিটিভি ফুটেজের প্রিন্টআউট ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, কিন্তু কোনোটিই কোনো কাজের সুতো খুঁজে দিচ্ছে না। এসিপির কপালে চিন্তার ভাঁজ, তিনি ফাইলটা টেবিলে আছড়ে ফেলে বললেন, “পুরো শহর তন্নতন্ন করে খুঁজলাম, অথচ লিওনার্দোর কোনো হদিস নেই! ভাইপার কেন তাকে টার্গেট করল? এর পেছনে মোটিভটা কী?”
অফিসার রওশন চশমাটা ঠিক করতে করতে একটু ইতস্তত করে বলল, “স্যার, আমার মনে হয় লিওন স্যারের বিয়েটাই আসল ঝামেলা। স্যার তার কাজিন মায়াকে বিয়ে করতে যাচ্ছিলেন, হয়তো সেটা ভাইপারের সহ্য হয়নি।”
এসিপি ভ্রু কুঁচকে তাকালেন, “বিয়ে? তাতে ভাইপারের কী মাথাব্যথা? ও তো একজন ক্রিমিনাল, ও কি সমাজসেবা করছে নাকি?”
রওশন গলা নামিয়ে বলল, “আরে স্যার, আপনি জানেন না! ভাইপার তো স্যারকে আগে দুবার লাভ লেটার পাঠিয়েছিল। আমার তো মনে হয়, স্যারকে তুলে নিয়ে গিয়ে ও নিজেই বিয়ে করে ফেলতে চায়!”
এসিপি এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে রওশনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হতাশায় কপালে হাত দিয়ে বললেন, “তুমি কি বলতে চাও রওশন আমাদের শহরের সবচেয়ে ভয়ংকর ক্রিমিনাল আসলে একজন আশি’র দশকের সিনেমার মতো পাগলি প্রেমিকা? এটা অসম্ভব!”
এসিপি নিজের চেয়ারে হেলান দিয়ে দৃঢ় গলায় বললেন, “লিওন ওসবের ধার দিয়েও যাবে না। ও লন্ডনের সেরা সিআইডি অফিসারের অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে, ওর মানসিক শক্তি আর ট্রেনিং কোনো অপরাধীর হাতে শেষ হওয়ার মতো নয়। আমার বিশ্বাস, লিওন অবশ্যই বেরিয়ে আসবে। আর একবার যদি ও ফিরে আসে, ওই ক্রিমিনালটার খেল খতম করে দেবে!”
রওশন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলল, “স্যার, আপনি লিওন স্যারকে চেনেন, কিন্তু ভাইপারকেও হালকাভাবে নেবেন না। ক্রিমিনালদের যদি কোনো অ্যাওয়ার্ড থাকত, তবে নির্ঘাত ভাইপার সেটাই পেত। ওর ক্রাইমগুলোও নিখুঁত শিল্পের মতোই!”
এসিপির এখন হাসি পাবে নাকি কান্না, তা বুঝতে পারছেন না। রওশনের অদ্ভুত যুক্তি আর ভাইপারের পাগলামি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতিটা কেমন গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে। তিনি শুধু জানেন, সময় ফুরিয়ে আসছে, আর লিওনকে উদ্ধার করতে হলে তাদের ভাইপারের চেয়েও স্মার্ট কোনো চাল চালতে হবে।
এটাকে মেফেয়ারের সেই অভিজাত টাউন হাউসে হিয়ার বাইকের ইঞ্জিনের গর্জনটা এসে স্তব্ধ হয়ে গেল। কালো চামড়ার জ্যাকেট গায়ে হিয়া যখন হাউজের ড্রয়িং রুমের ভেতর পা রাখল, দানিয়েল তখন জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিল। সে ঘুরে তাকাল না, কিন্তু হিয়া জানত সে তার উপস্থিতি টের পেয়েছে। দানিয়েল হিয়াকে এত ভালো চেনে যে, অন্ধকারের মাঝেও তার পায়ের শব্দ তাকে বলে দেয় কে আসছে।
দানিয়েল সরাসরি ঘুরে দাঁড়িয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠল, “ইউ আর আউট অফ ইয়োর মাইন্ড! তুমি কি পাগল হয়ে গেছ হিয়া? একটা সিআইডি অফিসারকে তুলে আনলে? তাও আবার বিয়ের আসর থেকে? তুমি কি ভেবেছ সিআইডি পুরো লন্ডন শহর তছনছ করে ফেলবে না এই মুহূর্তে?”
হিয়া নির্বিকার। সে একটা চেয়ার টেনে বসল। দানিয়েল আরও ক্ষিপ্ত হয়ে এগিয়ে এসে বললো, “আমার সাথে চালাকি করো না। ওই অফিসার লিওনার্দো তোমার ভার্সিটির সিনিয়র ছিল, থাইল্যান্ডে তোমার যাওয়ার ঘটনাও আমি জানি। তুমি কেন বারবার ওর পিছু নিচ্ছো?”
দানিয়েল গলার স্বর নামিয়ে আনল, তবে তাতে হুমকির সুর আরও গাঢ় হলো। “তোমার আসল লক্ষ্য ভুলে গেছো? আয়মান খান আর আসাদ খান এখনো লন্ডনে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তোমার প্রতিশোধের কথা ছিল তাদের ওপর, আর তুমি এখন এক সিআইডি অফিসারকে নিয়ে পড়ে আছো! এটা কি কোনো ছেলেমানুষি খেলা?”
হিয়া এবার মাথা তুলল। তার চোখে কোনো দ্বিধা নেই, আছে অদম্য একটা জেদ। সে ঠান্ডা গলায় বলল, “বস, আমি আমার কাজ দুটোই একসাথে করব। লিওনকে হ্যান্ডেল করার ক্ষমতা আমার আছে, আর আয়মান খানদেরও আমি ছাড়ছি না।”
দানিয়েল হিয়ার একদম কাছে এসে দাঁড়াল, “আমি জানি, তোমার ওকে মেরে ফেলার কোনো উদ্দেশ্য নেই। তাহলে আসল কারণটা কী? কী চাও তুমি অফিসার লিওনের কাছে?”
হিয়া চুপ করে গেল। দানিয়েলের এই প্রশ্নটা ঠিক জায়গায় আঘাত করেছে। দানিয়েল হিয়ার চিবুকটা একটু উঁচিয়ে ধরল, তার দৃষ্টিতে সতর্কবার্তা স্পষ্ট। “আবেগ কখনো ভালো নয়, হিয়া। এটা কোনো সাইকোপ্যাথিক খেলায় জেতার মাধ্যম হতে পারে না। আবেগে গা ভাসিয়ে তুমি নিজেকেই ধ্বংস করছ। এই পাগলামির জন্য তোমাকে অনেক বড় মাসুল দিতে হতে পারে, যা তুমি নিজেও কল্পনা করতে পারছ না।”
হিয়া দানিয়েলের হাতের ঝাপটা সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন লিওনের সেই অবাধ্য চাহনি আর তার নিজের সংকল্প। সে কোনো উত্তর না দিয়ে বেরিয়ে আসার জন্য পা বাড়াল। দানিয়েল জানে, হিয়া এখন এমন এক নেশায় মত্ত যা থেকে তাকে ফেরানো কঠিন।
সন্ধ্যা নামতেই টানেলের আস্তানার কক্ষে নীল আলো আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। লিওন দরজার পাশে ওত পেতে দাঁড়িয়ে ছিল। একজন সার্ভেন্ট ট্রেতে সন্ধার খাবার নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই লিওন বিদ্যুৎগতিতে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে সার্ভেন্টের গলা চেপে ধরে সে নিজের পকেট থেকে কৌশলে বের করা একটি ধারালো ধাতব টুকরো তার ঘাড়ের কাছে বসিয়ে দিল।
লিওনের দৃষ্টিতে তখন খুনের নেশা। চোয়াল শক্ত করে, কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে সে বলে উঠল, “মেইন ডোরের পাসকোডটা বল! এক সেকেন্ড দেরি করলে তোর জীবন শেষ।”
সার্ভেন্টার ভয়ে তখন দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। সে কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল, “আমি… আমি বলতে পারব না! মিস্ট্রেস আমাকে মেরে ফেলবেন!”
লিওন ধারালো টুকরোটি আরও একটু চেপে ধরল, চামড়া ভেদ করে সামান্য রক্ত গড়িয়ে পড়ল। “হিয়া তোকে মারবে কি না জানি না, কিন্তু আমি এই মুহূর্তে তোকে মেরে ফেলতে পারি। পাসকোড বল!”
অসহায় সার্ভেন্ট শেষ পর্যন্ত পাসকোডটি বলে দিল। লিওন কোনো সময় নষ্ট না করে গার্ডের ঘাড়ের পেছনে একটা শক্তিশালী আঘাত করল, লোকটা মুহূর্তের মধ্যে জ্ঞান হারিয়ে মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়ল।
লিওন কক্ষের বাইরে পা রাখল। করিডোরে তখন আরও তিনজন গার্ড পাহারা দিচ্ছিল। লিওনকে দেখামাত্র তারা অস্ত্র হাতে তেড়ে এল। কিন্তু লিওনের অসামান্য সাহস আর ক্ষিপ্রতা দেখে তারা দ্বিধায় পড়ে গেল। হিয়া তাদের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে রেখেছে—লিওনের গায়ে যেন আঁচড়ও না লাগে, সামান্য টোকা লাগলেও ভাইপারের হাত থেকে তাদের বাঁচার কোনো পথ নেই। এই দ্বিধাই তাদের দুর্বল করে দিল। তারা লিওনকে নিবৃত্ত করার বদলে বারবার পিছিয়ে যেতে লাগল, যা লিওনের জন্য হয়ে উঠল একটা মোক্ষম দারুণ সুযোগ।
লিওন কোনো দ্বিধা না করে একের পর এক আক্রমণ শুরু করল। তার প্রতিটি ঘুষি আর লাথিতে গার্ডদের হাড়ের মড়মড় শব্দ শোনা যাচ্ছে। করিডোরটা কিছুক্ষণের মধ্যেই রক্তে ভিজে উঠল। গার্ডরা নিজেদের বাঁচাতে গিয়েও লিওনের ওপর পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করতে সাহস পাচ্ছিল না, আর এই দোটানাই তাদের পরাজয় নিশ্চিত করল।
বিক্ষত শরীরে, রক্তমাখা হাতে লিওন করিডোরের শেষ প্রান্তে পৌঁছাল। মেইন ডোরের সামনে এসে সে সার্ভেন্টের কাছ থেকে পাওয়া সেই চার ডিজিটের পাসকোডটি দ্রুত টিপল। একটি যান্ত্রিক আওয়াজ হলো। ভারী স্টিলের দরজাটি খুলে যেতেই বাইরের শীতল বাতাস লিওনের শরীরে এসে লাগল। সে বেরিয়ে এল ততক্ষণে। পেছনে পড়ে রইল রক্তাক্ত গার্ডরা, আর নীল আলোর সেই আস্তানাটা। লিওন এখন মুক্ত, কিন্তু সে জানে, হিয়ার এই খেলা এখানেই শেষ নয়।
লিওন মুক্ত বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার পেশাদার মন মুহূর্তের জন্যেও বিশ্রাম নিতে প্রস্তুত ছিল না। হঠাৎ মাথার ওপর এক তীক্ষ্ণ ডানার ঝাপটার শব্দে তার দৃষ্টি ওপরে গেল। একটি বিশাল সোনালী রঙের ঈগল গোল হয়ে চক্রাকারে উড়ছে, ঠিক মনে হচ্ছে ওপর থেকে তার প্রতিটা গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে।
লিওনের স্মৃতিতে মুহূর্তেই ভেসে উঠল সেই দিনটা, অফিসের ডেস্কে রাখা সেই রহস্যময় চিরকুট, তার ঘরের বারান্দার ফেলে যাওয়া চিরকুট সবটাই ছিলো এই ঈগলের কাজ। এই ঈগলটার মাধ্যমেই হিয়া পুরো শহরজুড়ে লিওনের ওপর নজর রাখতো। এটা কেবল একটা পাখি নয়, এটা হিয়ার একটি চলমান সিসিটিভি ক্যামেরা।
প্রতিশোধের আগুন আর তীব্র ঘৃণায় লিওনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে কোনো দ্বিধা না করেই নিজের কোমর থেকে পিস্তলটা বের করল। ঈগলের প্রতিটি ঘূর্ণন লিওনের দৃষ্টির সাথে পাল্লা দিচ্ছে। সে পিস্তলের সেফটি ক্যাচ খুলল আর অব্যর্থ নিশানায় ঈগলটির দিকে রিভলবার তাক করল। তার আঙুল ট্রিগারে স্থির এক সেকেন্ডের ব্যবধানেই সে এই উড়ন্ত গুপ্তচরটিকে গুলি করে ঝাঁঝরা করে দেবে। পিস্তলের নল থেকে বের হওয়া সেই বুলেট ঈগলটির বুক চিরে ফেলার অপেক্ষায়।
অন্যদিকে হায়াস ম্যানশনের পরিবেশটা শ্মশানের মতোই নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। মায়ার অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। লিওনের চলে যাওয়ার পর থেকে সে নিজের পৃথিবীটাকেই হারিয়ে ফেলেছে। তার কক্ষের মেঝেতে ছড়িয়ে আছে লিওনের ব্যবহার করা কিছু জিনিসপত্র, আর সেই জিনিসগুলো আঁকড়ে ধরেই সে সারা রাত পার করে দিচ্ছে। চোখের জল ফেলতে ফেলতে মায়ার চোখের তলা ফুলে গেছে, গালের রং ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। সে খাবার তো দূরের কথা, নিয়মিত যে ওষুধগুলো খাওয়ার কথা, সেগুলোর দিকেও তাকাচ্ছে না। তার জগত এখন কেবল লিওনের চিন্তায় বন্দি।
লিওনের বোন অ্যামেলিয়া বারবার মায়ার কাছে গিয়ে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু মায়ার কান্নার আওয়াজ থামানোর মতো কোনো সান্ত্বনা নেই।
পাশেই ড্রয়িংরুমে রুদ্রনীল তখন অস্থির হয়ে পায়চারি করছে। সে তার ব্যক্তিগত সব নেটওয়ার্ক আর সোর্সগুলোকে কাজে লাগিয়ে দিয়েছে। লন্ডনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ জংশন, সিসিটিভি নেটওয়ার্ক, এমনকি আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইনফর্মারদের কাছেও সে খবর পাঠিয়েছে। রুদ্রনীলের কণ্ঠস্বরে তখন শুধুই দৃঢ়তা বাজায় রয়েছে। সে নিজের শ্যালককে যেকোনো মূল্যে উদ্ধার করতে চায়। সে ফোনে কড়া গলায় নির্দেশ দিচ্ছে, “শোনো, ভাইপারের যে আস্তানা বা তার মুভমেন্টের খবর আগে আমাদের কাছে এসেছিল, সেই প্রতিটি স্পট আবার চেক কর।
আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১৫
কোনো ক্লু যেন মিস না হয়। লিওনকে উদ্ধার করা ছাড়া আমি ফিরছি না বাংলাদেশে।”
রুদ্রনীল জানে, ভাইপারের সাথে লড়াই করা মানে বাঘের গুহায় পা রাখা। কিন্তু মায়ার চোখের জল আর পরিবারের এই করুণ অবস্থা তাকে থামতে দিচ্ছে না। সে তার নিজের বিশ্বাসযোগ্য লোকগুলোকে দায়িত্ব দিয়েছে যেন তারা ভাইপারের প্রতিটি সম্ভাব্য গোপন ডেরায় তন্ন তন্ন করে তল্লাশি চালায়।
