ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১৬
নওরিন কবির তিশা
সময়ের চাকা অতি দ্রুত আবর্তিত হয়ে বিগত কয়েকটি দিনের খোলনলচে বদলে দিয়েছে। উগ্র, বেপরোয়া, খামখেয়ালি আরাভের মাঝে এক অভাবনীয় পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, যা প্রত্যক্ষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আনোয়ার খান নিজেই আজ পরম বিস্ময়ে স্তব্ধ। যে ছেলেকে শাসন আর ক্ষমতার দাপট দিয়েও কখনো বশ করা যায়নি, সেই ছেলে কাল রাতে স্বয়ং পিতার সম্মুখে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় ঘোষণা করেছে—আজ থেকে সে পলিটিক্স আর ক্লাবের মোহ ত্যাগ করে পারিবারিক ব্যবসায় যোগদান করবে।
আনোয়ার খান মনে মনে বেশ ভালো করেই অনুধাবন করতে পেরেছেন, এই অসম্ভব অলৌকিক পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে তিয়াশা নামক সেই তেজস্বী মেয়েটা। ফলশ্রুতিতে, অবচেতনভাবেই তিয়াশার প্রতি ওনার অন্তরের এক কোণে গভীর স্নেহ ও শ্রদ্ধাবোধের জন্ম হয়েছে। আজ আরাভের কর্মজীবনের প্রথম প্রভাত। ঊষালগ্নেই শয্যা ত্যাগ করেছে ও।
তিয়াশা সবেমাত্র ফজরের নামাজ শেষ করে, বারান্দার রেলিং ধরে;দূর অন্তরীক্ষের পানে চেয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ঠিক তখনই কক্ষের ভেতর হতে ভেসে এলো আরাভের গভীর কণ্ঠস্বরের আহ্বান,,
— সুইটহার্ট, একটু ভেতরে আসবে?
তিয়াশা ললাটে কিঞ্চিৎ বিরক্তির রেখা ফুটিয়ে ধীর চরণে কক্ষে প্রবেশ করল। তবে ভেতরে পা রাখতেই ওর চোখের মণি জোড়া বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল। সম্মুখের আয়নায় দৃশ্যমান পুরুষটি যেন এক সম্পূর্ণ অচেনা সত্তা! চিরচেনা সেই কালো লেদার জ্যাকেট আর অবিন্যস্ত অলকগুচ্ছের উগ্র রূপ আজ বিলীন। আরাভের সুগঠিত, দীর্ঘ সুপুরুষ অবয়বটি আজ আবৃত একখানা চমৎকার ফিটিং নীল ফরমাল শার্ট আর গাঢ় প্যান্টে।
চুলগুলো নিখুঁত পরিপাটি করে পেছনে আঁচড়ানো। প্রাতঃকালের এই স্নিগ্ধ আলোয় ওর তীক্ষ্ণ চোয়াল আর পৌরুষদীপ্ত সৌন্দর্য হতে ছড়িয়ে পড়া অপার্থিব দ্যুতিতে তিয়াশা নিজের অজান্তেই ক্ষণিকের তরে পুরোপুরি বাকরুদ্ধ হয়ে রইল।
আরাভ আয়নায় তিয়াশার এহেন মুগ্ধ ও বিভ্রান্ত চাউনি লক্ষ করে ঠোঁটের কোণে মৃদু একটু হাসির রেখা ফোঁটালো। ও ঘুরে দাঁড়িয়ে টাইটা হাতে নিয়ে বলল,,
— আজকে তোমার স্বামীর অফিসের ফার্স্ট ডে, জানেমান! ভুলে গেলে বুঝি?
তিয়াশা চট করে নিজের চোখের পলক ফেলে অবয়বে সেই চেনা শীতলতা ফিরিয়ে এনে ভ্রু যুগল কুঁচকে বলল,,
— তো? আমি কী করতে পারি তাতে?
আরাভ এক কদম এগিয়ে এসে চোখ টিপে বলল,,
— কী আর করবে? ফার্স্ট ডে-তে একটু হাজব্যান্ড কেয়ার দেখানো তো বউ হিসেবে তোমার লিগ্যাল ডিউটি, সুইটহার্ট।
— দুঃখিত, আপনার ওসব আদিখ্যেতা করতে আমি পারব না।
তিয়াশা মুখ ঘুরিয়ে যেই না পাশ কেটে সরে যেতে উদ্যত হলো, অমনি আরাভ চিতার ন্যায় ক্ষিপ্রতায় ওর হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টানে ওকে সরাসরি নিজের শক্ত, চওড়া বক্ষদেশের ওপর এনে আছড়ে ফেলল। আকস্মিকতায় তিয়াশার ওড়নাটা সামান্য সরে গেল। ও তীব্র অস্বস্তিতে নাক সিটকে আরাভের বুক থেকে নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে বলল,,
— ছাড়ুন! কী শুরু করেছেন সকাল সকাল? অসভ্য একটা!
আরাভ ওর ছটফটানিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে নিজের শক্ত বাহুবন্ধন আরও একটু দৃঢ় করল। ওর মুখের খুব কাছে ঝুঁকে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,
— এত পালাই পালাই করো কেন, বউ? নিজের স্বামীর স্পর্শ কি এতটাই অসহ্য লাগে?
তিয়াশা রাগে ফুঁসে উঠে বলল,,
— হ্যাঁ লাগে! আপনার মতো একজন জবরদস্তিকারীর সান্নিধ্য আমার প্রতিটা সেকেন্ডে দম বন্ধ করে দেয়। দয়া করে আমায় মুক্ত করুন।
আরাভ এবার তিয়াশার তীব্র প্রত্যাখ্যানের জবাবে রাগল না, বরং একখানা মায়াবী বক্র হাসি ফুটিয়ে টাইটা তিয়াশার কোমল হাতের মুঠোয় গুঁজে দিল। অতঃপর ভরাট কন্ঠে বলল,,
— মুখের কথায় তো অনেক দেমাগ দেখাও, বউ। অন্যের টাকায় হিরোগিরি দেখানো সহজ,তাই নিজের টাকায়ই হিরোগিরি করবো আজ থেকে। সো, আজকে থেকে আমার এই নতুন জার্নিটার শুরুতে অন্তত এই টাইটা নিজের হাতে একটু বেঁধে দাও। এটুকুর দায়িত্ব তো তিয়াশা চৌধুরী নিতেই পারে, তাই না?
আরাভের কণ্ঠস্বরের গভীরতা তিয়াশার ভেতরকার সমস্ত জেদকে ক্ষণিকের তরে অবশ করে দিল। বখাটে পুরুষের শান্ত, সংকল্পবদ্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে ওর প্রত্যাখ্যানের ভাষা যেন হারিয়ে গেল। তিয়াশা এক বুক দীর্ঘশ্বাস চেপে অত্যন্ত ধীর ও কম্পিত হাতে টাইয়ের সিল্কের কাপড়টা আরাভের শার্টের কলারের নিচ দিয়ে গলিয়ে দিল।
আরাভ একবিন্দু নড়ল না; প্রস্তরমূর্তির ন্যায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ও কেবল তিয়াশার আনত মুখের ওপর নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রাখল। তিয়াশা বড্ড সাবধানে, ওর শরীরের স্পর্শ এড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে নটটা বাঁধতে লাগল। অতঃপর টাইয়ের নটটা টেনে সামান্য শক্ত করতেই আরাভ হঠাৎ তিয়াশার চিবুকটা এক আঙুলে আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। ও দৃষ্টি জোড়া সরাসরি তিয়াশার ডাগর নেত্রে নিবদ্ধ করে কিঞ্চিৎ নিচু স্বরে বলল,,
— থ্যাঙ্কস, সুইটহার্ট। আই মাস্ট সে, তোমার চয়েস কিন্তু দারুণ। টাইটা একদম পারফেক্ট হয়েছে।
তিয়াশা চট করে ওর হাত থেকে নিজের মুখটা সরিয়ে নিয়ে এক কদম পিছিয়ে গেল। গাল দুটো লজ্জা ও রাগের সংমিশ্রণে আরক্তিম করে;ওষ্ঠাধর বাঁকিয়ে বলল,,
— বেশি খুশি হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমি শুধু এমনিই করলাম। দেখি, কতদিন আপনার এই জেন্টলম্যান সেজে থাকার নাটক বজায় থাকে।
আরাভ মুচকি হাসল, যেন তিয়াশার এই তপ্ত বাক্যবাণ ওর কাছে পরম অমৃতের মতো ঠাওর হয়েছে। ও ড্রেসিং টেবিল থেকে নিজের দামি ঘড়িটা হাতে পরতে পরতে বলল,,
— নাটক নয় বউ, দিস ইজ রিয়েল। তোমাকে পাওয়ার জন্য এই আরাভ খান নিজেকে রি-মেক করতেও পিছপা হবে না। তবে হ্যাঁ, দিনশেষে তোমার ওই ইগোটা ভেঙে আমার বুকেই তোমাকে ফিরতে হবে, ওয়ান ডে ইয়্যু উইল।
তিয়াশা দুই হাত বুকের ওপর শক্ত করে বেঁধে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,,
— দ্যাট ইজ ইম্পসিবল, মিস্টার আরাভ খান। তিয়াশা চৌধুরী কোনোদিন কোনো সাইকোর প্রেমে পড়বে না।
— লেটস সি, ওয়াইফি! সময় কিন্তু বড্ড অদ্ভুত জিনিস, কখন কার খোলনলচে বদলে দেয় কেউ জানে না।
আরাভ পারফিউমটা সামান্য স্প্রে করে নিয়ে কোটের কলারটা ঠিক করল। অতঃপর তিয়াশার দিকে চেয়ে চোখ টিপে অত্যন্ত ফুরফুরে মেজাজে বলল,,
— উইশ মি লাক, জানেমান! আজ থেকে তোমার স্বামী রিয়েল হিরো হওয়ার জার্নি শুরু করছে।
বলেই আরাভ নিজের ব্রিফকেসটা তুলে নিয়ে অত্যন্ত ভদ্র ভঙ্গিতে কক্ষ ত্যাগ করল। ও চলে যেতেই তিয়াশা এক মস্ত বড় নিশ্বাস ছেড়ে খাটের কিনারায় বসে পড়ল। বুকের ভেতরের ধকধকানিটা তখনো থামেনি ওর। এই অবাধ্য ভিলেনটা যে সত্যি সত্যি ওর একটা কথায় নিজের সমগ্র লাইফস্টাইল এভাবে বদলে ফেলবে, তা তিয়াশা নিজের স্বপ্নেও কখনো কল্পনা করতে পারেনি।
সদ্য উদীয়মান প্রভাতী নরম রৌদ্র ছটা রুদ্রদ্বীপের ঘরের জানালায় এসে লুটিয়ে পড়েছে। টেবিলে স্তূপীকৃত কেস ফাইলের জটিল সমীকরণ থেকে চোখ সরিয়ে ও যখন ক্লান্তিতে দুই হাত কপালে চেপে ধরল, ঠিক তখনই ঘরের দরজায় মৃদু করাঘাত হলো। এক হাতে চায়ের কাপ আর অন্য হাতে নিজের ওড়নার প্রান্ত চেপে চোখেমুখে এক অদ্ভুত চঞ্চলতা আর দ্বিধার দোলাচলে জড়সড় ভঙ্গিতে কক্ষে প্রবেশ করল নয়নিকা। রুদ্রদ্বীপ চোখ মেলে নয়নিকাকে দেখে অবয়বের ক্লান্তিটুকু অতি সন্তর্পণে আড়াল করে স্বভাবসুলভ মৃদু হাসল। ও কিছুটা সোজা হয়ে বসে শুধাল,,,
— কী ব্যাপার নয়ন? হঠাৎ এই সময়ে চায়ের কাপ হাতে? সূর্য কি আজ পূর্বের বদলে পশ্চিমে উঠল নাকি?
নয়নিকা ওষ্ঠাধর কিঞ্চিৎ বাঁকিয়ে, গাল দুটো ফুলিয়ে টেবিলের ওপর চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখল;রুদ্রর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বেশ অভিমানের সুরে বলল,,
— উফ রুদ্র ভাই! আপনি সারাক্ষণ শুধু খোঁচা দিয়ে কথা বলেন কেন বলুন তো? কাল রাত ধরে দেখছি আপনি এই গুমোট ঘরে ফাইলপত্র নিয়ে মাথা খারাপ করছেন, তাই নিজের হাতে স্পেশাল এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এলাম। আর আপনি কিনা…!
রুদ্রদ্বীপ চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে এক চুমুক দিয়ে নয়নিকার ফোলানো গালের দিকে চেয়ে ঈষৎ হেসে বলল,,
— চা টা কিন্তু দারুণ হয়েছে, নয়ন। থ্যাঙ্কস ফর দিস। তা হঠাৎ ভাইয়ের প্রতি এত কেয়ারিং দেখানোর আসলো রহস্যটা কী, শুনি?
নয়নিকা এবার সুযোগ বুঝে রুদ্রর বড্ড কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। ওর ডাগর চক্ষুদ্বয় রুদ্রর চোখের ওপর স্থির করে অত্যন্ত আকুল ও নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,,
— রহস্য-টহস্য কিছুই না। আচ্ছা রুদ্র ভাই, আপনি এই যে দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা শুধু এই কেস, সেই কেস আর ক্রাইম নিয়ে মেতে থাকেন, আপনার কি নিজের জন্য একটুও সময় নেই? আপনি কি কখনো এই যান্ত্রিক জীবনের বাইরে গিয়ে অন্য কিছু ভাবেন না?
নয়নিকার এই অপ্রত্যাশিত গভীর প্রশ্নের হেতু রুদ্রদ্বীপের প্রখর মস্তিষ্কের অগম্য রইল না। ও চায়ের কাপটা টেবিলের এক কোণে সরিয়ে রেখে, চশমাটা সামান্য ঠিক করে অত্যন্ত বাস্তববাদী কণ্ঠে বলল,,
— শোন নয়ন, আমার প্রফেশনটাই এমন। যখন কোনো নিরপরাধ পরিবার ন্যায়বিচারের আশায় পথ চেয়ে থাকে, তখন একজন ডিউটি অফিসারের কাছে নিজের ব্যক্তিগত ভালোলাগা বা অবসরের কোনো স্থান থাকে না। মাই ডিউটি ইজ মাই ফার্স্ট প্রায়োরিটি।
রুদ্রর এই কঠোর পেশাদারী ও পরোক্ষ দূরত্বের জবাবে নয়নিকার বুকটা ক্ষণিকের জন্য এক অজানা অভিমানে দুমড়ে-মুচড়ে গেল। ও বুঝতে পারল, এই কঠোর কর্তব্যপরায়ণ পুরুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় পৌঁছানো বড্ড কঠিন। তবুও ও নিজের ভেতরের দুর্বলতাটুকু আড়াল করে, এক চিলতে ম্লান হাসি ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে চঞ্চল ভঙ্গিতে বলল,,
— বুঝেছি মি. সিরিয়াস অফিসার! আপনার ওই ডিউটির দোহাই আর শেষ হবে না। তবে একটা কথা মাথায় রাখবেন, এই রোবটের মতো লাইফস্টাইলের মাঝেও কেউ একজন কিন্তু আপনার ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গোনে। বেশি রাত করবেন না আজ, কেমন?
কথাটা শেষ করেই নয়নিকা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না, নিজের লাজুকতা লুকাতে দ্রুত পায়ে কক্ষ ত্যাগ করল। রুদ্রদ্বীপ ওর প্রস্থান পথের দিকে চেয়ে এক গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। নয়নিকার এই একতরফা অনুভূতির তীব্রতা হয়তো ও বোঝে, কিন্তু কিশোরী বয়সের এই নিছক আবেগকে লায় পেতে দেয়া ওর মত কঠোর দায়িত্ববান অফিসারের ধাঁচে নেই যে!
চৈত্রের তীব্র দাবদাহ শেষে বৈশাখের আবাহন ঘটলেও প্রকৃতির সেই রুদ্রভৈরব রূপের বিন্দুমাত্র উপশম ঘটেনি। মধ্যাহ্নের প্রখর রৌদ্রালোকে চারপাশ যেন এক অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে, ভ্যাপসা গরমে নগরজীবন ওষ্ঠাগত। এমনই এক ক্লান্তিকর দ্বিপ্রহরে আদ্রিতাকে বাধ্য হয়ে বাড়ির বাইরে পা রাখতে হয়েছে। ওর এক বান্ধবীর আকস্মিক অসুস্থতার কারণে আজ ওর টিউশনি পড়ানোর গুরুদায়িত্বটি আদ্রিতার স্কন্ধে এসে চেপেছে।
তপ্ত রাজপথ বেয়ে আদ্রিতা যখন দ্রুত চরণে হেঁটে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই দিকবিদিক কাঁপিয়ে তীব্র শব্দে দুটি বখাটে যুবকের স্পোর্টস বাইক আচমকা ওর পথ আগলে দাঁড়াল। আদ্রিতা চমকে উঠে থমকে দাঁড়াল,আশপাশে জনমানবের উপস্থিতি বড্ড কম। বাইক আরোহী যুবকেরা আড়চোখে আদ্রিতাকে অবলোকন করে অত্যন্ত নোংরা ইঙ্গিতে শিস বাজিয়ে বিকৃত রসিকতা শুরু করল। অপমানের তীব্র লজ্জায় ও আতঙ্কে আদ্রিতার ফর্সা মুখশ্রী নিমেষেই বিবর্ণ হয়ে উঠল।
ঠিক তখনই, দূর রাজপথের বুক চিরে উল্কার গতিতে ধেয়ে এলো কুচকুচে কালো রঙের আরেকটি ভারী বাইক। বখাটেদের কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই সেই বাইকটি সশব্দে ব্রেক কষে ওদের একদম মুখোমুখি এসে থামল। নবীন সেই আরোহী অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে বাইক থেকে নেমে নিজের ব্ল্যাক হেলমেটটি সরাল। সম্মুখের চেনা অবয়বটি দৃশ্যমান হতেই আদ্রিতা সামান্য ঢোক গিললো,লোকটি সাইদ। আরাভের বন্ধু চিনতে বিলম্ব হলো না মোটেও!
সাইদ নিজের হাতঘড়িটা সামান্য ঠিক করে, বখাটেদের দিকে চেয়ে হিমশীতল কন্ঠে বলল,,
— হোয়াট ইজ গোয়িং অন হিয়ার, ব্রো? কোনো প্রবলেম? চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এই শহর ছাড়া হতে না চাইলে, এক্ষুনি চোখের সামনে থেকে… গেট লস্ট!
সাইদকে চিনতে মোটেও দেরি হয় নি ওদের। স্বনামধন্য শিল্পপতির একমাত্র ছেলে কিনা! আর বড় পরিচয় সে এলাকার বাপ খ্যাত আরাভের বন্ধু। তাই ওর এহেন মারাত্মক গম্ভীর কণ্ঠস্বরের প্রভাবে বখাটে যুবকদের পরান পাখি উড়াল দেওয়ার উপক্রম। ওরা আর এক সেকেন্ডও বিলম্ব না করে বাইক স্টার্ট দিয়ে তীব্র গতিতে উল্টো পথে পালিয়ে বাঁচল।
আদ্রিতা তখনো ভয়ার্ত হরিণীর ন্যায় এক কোণে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল। সাইদ হেলমেটটা বাইকের ট্যাংকের ওপর রেখে, ধীর পায়ে আদ্রিতার মুখোমুখি এসে দাঁড়াল; গম্ভীর চাউনিতে কিছুটা ধমকের সুর তুলে শুধাল,,
— এই! এই ভরদুপুরে এই জনমানবহীন রাস্তায় একা একা কী করছ তুমি? মাথা ঠিক আছে তোমার?
আদ্রিতা নিজের ওড়নার প্রান্তটা শক্ত করে চেপে ধরে, তোতলামি সামলে অবরুদ্ধ কণ্ঠে বলল,,,
— ট-টিউশনি পড়াতে যাচ্ছিলাম। বান্ধবী অসুস্থ, তাই ওর বদলে…!
সাইদ ওর কথা শেষ করতে না দিয়েই নিজের হেলমেটটা পুনরায় হাতে তুলে নিল এবং অত্যন্ত কড়া-কর্তৃত্বপূর্ণ গলায় নির্দেশ ছুঁড়ল,,
— স্টপ ইট! আর কোনো এক্সকিউজ দিতে হবে না। জাস্ট গেট অন মাই বাইক।
আদ্রিতা মহাবিস্ময়ে দু-পা পিছিয়ে চোখ জোড়া কপালে তুলে বলল,,
— হোয়াট? আপনার বাইকে উঠব? কেন?
সাইদ এবার কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে এক পা এগিয়ে এসে কড়া গলায় ধমক দিয়ে বলল,,
— এই মেয়ে এতো কথা কেন? এতো পাকা তো গুন্ডাদের সামনে কাঁপছিলে কেন? এই রোদে আর একটা সেকেন্ডও বাইরে দাঁড়ানোর সময় কিংবা ইচ্ছা কোনটাই নেই আমার। সো, চুপচাপ সেখানে উঠে বসো। আই উইল ড্রপ ইউ অ্যাট ইওর ডেস্টিনেশন। নো মোর কোশ্চেনস!
সাইদের এই চরম আধিপত্যশীল ও গম্ভীর ধমকের সামনে আদ্রিতার ভেতরের সমস্ত প্রতিবাদ যেন মুহূর্তেই জল হয়ে গেল। এমনিতেই ও ভীতু প্রকৃতির তার উপর এমন ধমক! ও আর কোনো বাকবিতণ্ডায় না জড়িয়ে, এক বুক দুরুদুরু কাঁপন নিয়ে বড্ড সাবধানে সাইদের বাইকের পেছনের সিটটায় গিয়ে বসল। মুহূর্তেই বাইকের গর্জন তুলে চাকা ঘোরালো।
আচ্ছা তা বেশ অনেকটাই দূরত্ব বজিয়ে বসেছে। বলতে গেলে বাইকের একদম শেষ প্রান্তে সে। চলতি পথে লুকিং গ্লাসে এক ঝলক ওর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে ভ্রু কুঁচকালো সাইদ। তবে নিজের ব্যক্তিত্বের ভারিক্কি বজায় রেখে বলল না কিছুই।
ব্যবসায়িক নথিপত্রের স্তূপাকার জটিল সমীকরণের মাঝে বসে আরাভের নিজের মস্তিষ্কটাই এখন এক মহা অগ্নিকুণ্ড বলে ঠাওর হচ্ছিল। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই সুপ্রশস্ত খাস কামরার ভেতরেও ওর দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। বিগত ছয় ঘণ্টার মাঝে জীবনটা যেন কোন এক যান্ত্রিক চক্রে আবর্তিত হতে শুরু করেছে। ফাইলের পর ফাইল সই করা, লভ্যাংশের হিসাব মেলানো আর এই টাই-কোটের আভিজাত্য—সব মিলিয়ে বড্ড বেশি হাঁপিয়ে উঠেছিল ও।
নিজের অবিন্যস্ত চুলগুলো এক হাত দিয়ে পেছনে ঠেলে দিয়ে তীব্র বিরক্তি ও ক্লান্তিতে ওঁ সোফার কুশনে মাথাটা এলিয়ে দিল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে বক্র হাসির রেখা। স্বগত অনুভবে মনে মনে আওড়ালোলো,,
— বউ গো! তোমার একটা কথায় কি থেকে কি হয়ে গেল! আমি নাকি অফিসে বসে ফাইল ঘাটছি! ভাবা যায়!
ঠিক তখনই দরজায় মৃদু করাঘাত করে ফাইল হাতে প্রবেশ করলেন প্রবীণ সেক্রেটারি মিস্টার জামান। আরাভ তৎক্ষণাৎ নিজের অবয়বের বিরক্তিটুকু অতি সন্তর্পণে আড়ালে ফেলে, চেয়ারে সোজা হয়ে বসে অত্যন্ত মার্জিত স্বরে শুধাল,,
— ইয়েস, মিস্টার জামান? নেক্সট কোনো শিডিউল আছে নাকি এখন?
মিস্টার জামান বিনীত ভঙ্গিতে ফাইলটা টেবিলের ওপর রেখে বললেন,,
— স্যার, আগামীকালের বোর্ডের মিটিংয়ের প্রেজেন্টেশনটা একবার চেক করার ছিল। আপনি যদি কাইন্ডলি একটু চোখ বুলিয়ে নিতেন।
আরাভ একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে ফাইলটা নিজের দিকে টেনে নিল। কলমটা হাতে ঘুরিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর কণ্ঠে বলল,,
— ওকে, লিভ ইট হিয়ার। আমি আধঘণ্টার মধ্যে এটা কমপ্লিট করে দিচ্ছি। আর শুনুন, আজকের পর থেকে আমার ক্যাবিনের বাইরের সিকিউরিটি একটু টাইট রাখবেন। আই ডোন্ট লাইক এনি আননেসেসারি নয়েজ হোয়াইল ওয়ার্কিং।
মিস্টার জামান মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন,,
— অবশ্যই স্যার। আপনার এই ডেডিকেশন দেখে আনোয়ার স্যার কিন্তু ভীষণ খুশি হয়েছেন।
ওনার প্রস্থানের পর আরাভ কলমের ক্যাপটা খুলল। ফাইলের পাতায় চোখ রাখতেই তিয়াশার সেই আরক্তিম, জেদি মুখটা ওর স্মৃতির ক্যানভাসে ভেসে উঠল। ও মুচকি হেসে আপন মনেই বিড়বিড়ালো,,
— হিরো হওয়াটা যে এতটাই বোরিং জানলে হয়তো এই লাইনে আসতামই না, ওয়াইফি! বাট হোয়াট এভার, যেহেতু চ্যালেঞ্জটা তুমি করেছ, সো ফিনিশিংটাও মারাত্মক লেভেলের হবে, জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ!
সন্ধ্যা নামার মুখে পশ্চিম দিগন্ত জুড়ে তখন রক্তিম আলোর শেষ ছটা। তিয়াশা বারান্দার রেলিংটা শক্ত করে ধরে উদাসীন নেত্রে চেয়ে ছিল সেই আবিররাঙা নীলিমার পানে। গৃহের নিঃসঙ্গতা যখন ওকে গ্রাস করতে উদ্যত, ঠিক তখনই ওদের অল্পবয়সী পরিচারিকাটি এসে জানাল বাইরে একজন তিয়াশার সঙ্গে দেখা করতে চায়,আকার-বর্ণনায় তিয়াশার আর বুঝতে বাকি রইলো না যে ওপর মানবীটি আদ্রিতা।
ও চমকে উঠে তড়িঘড়ি ড্রইংরুমে ছুটে গেল। সত্যি সত্যিই আদ্রিতাকে এই অসময়ে দেখে ওর বুকটা এক অজানা আশঙ্কায় দুরুদুরু কেঁপে উঠল। ও আদ্রিতার হাত দুটো চেপে ধরে ব্যাকুল কণ্ঠে শুধাল,,
— আদ্রু! এই সন্ধ্যায় তুই এখানে? এনিথিং রং?
আদ্রিতা তখনো কিছুটা হাঁপাচ্ছিল, তবে ও তিয়াশাকে আশ্বস্ত করে ড্রইংরুমের সোফাটায় বসল এবং চারপাশটা একবার ভালো করে পরখ করে নিয়ে বলল,,
— রিলাক্স তিয়ু, কোনো বিপদ হয়নি। আমি দুপুরে টিউশনি করাতে গিয়েছিলাম, সেখান থেকে ফেরার পথেই আঙ্কেল মানে তোর বাবা আমাকে কল করেছিলেন। তোর কাছে যেহেতু কোনো ফোন নেই, তাই আঙ্কেল আমার সাথে কন্টাক্ট করেছেন। একটা ভীষণ ইম্পর্ট্যান্ট ইনফরমেশন আছে।
বলেই আদ্রিতা ওর ব্যাগ থেকে নিজের সেলফোনটি বের করে চটজলদি তাহের চৌধুরীর নম্বরে ডায়াল করে ফোনটি তিয়াশার কানের কাছে ধরল। ওপাশ থেকে পিতার অতি পরিচিত, স্নেহমাখা কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই তিয়াশার চোখের কোণ সিক্ত হলো। ও রুদ্ধকণ্ঠে বলল,,
— বাবা! আমি তিয়াশা বলছি।
তাহের চৌধুরী আর সময় নষ্ট না করে বললেন,,
— মা, মন দিয়ে শোনো। রুদ্রদ্বীপের সোর্স আজ কনফার্ম করেছে যে, আরাভ তোমাকে যে আপত্তিকর ছবি দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করছে, সেগুলোর মেইন ডাটা ও ওর একটা পার্সোনাল পেনড্রাইভে সেভ করে রেখেছে। খুব সম্ভবত ওটা ওর নিজের রুমের কোনো স্পেশাল স্পেসে রেখেছে। আমাদের লিগ্যাল অ্যাকশন আর রেইড সফল করতে হলে ওই ডিভাইসটা আমাদের ভীষণ প্রয়োজন, মা। তুমি কি কোনোভাবে ওটার সন্ধান করতে পারবে?
পিতার এই চাঞ্চল্যকর তথ্যে তিয়াশার সর্বাঙ্গে এক বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলে গেল। ও নিজেকে শক্ত করে, চারদিকের দেয়ালগুলোকে অবলোকন করে অত্যন্ত দৃঢ় ও নিচু কণ্ঠে জবাব দিল,,
— আমি চেষ্টা করব, বাবা। আরাভ এখন ফ্যামিলি বিজনেসে জয়েন করেছে, ও প্রায় সারা দিনই বাইরে থাকে। সো,কষ্ট কম হবে।
তাহের চৌধুরী ওপাশ থেকে আশ্বস্ত করে বলল,,
— খুব সাবধানে মা। রুদ্রদ্বীপ ব্যাকআপ নিয়ে একদম রেডি আছে। তুমি গ্রিন সিগন্যাল দিলেই আমরা অ্যাকশনে যাব।
তিয়াশা আর কথা বাড়ালো না। কোন মতে ‘জ্বী বাবা’ বলে ফোনটা রেখে দিল। যেকোনো মুহূর্তে যে কেউ এখানে উপস্থিত হতে পারে, তাই এখন বাড়তি কথা বলাটা নিহাতই বোকামি। ও আদ্রিতার সাথেও খুব বেশি গল্পে জড়ালো না। দু’একটা প্রয়োজনীয় কথা বলেই ওকে বিদায় জানালো।
অফিসের প্রথম দিনের মস্ত বড় ধকল আর যান্ত্রিকতার বেড়াজাল শেষে গাড়িটি রাজপথে নামতে নামতে, সন্ধ্যা ঘনীভূত হয়ে রজনীর আঁধার গ্রাস করেছে তিলোত্তমা নগরীকে। মহানগরের চিরচেনা তীব্র যানজটের আবর্তে পড়ে একসময় স্থবির হয়ে রইল আরাভের দামি কালো ক্রাউন গাড়িটি।
ক্লান্তির চরম সীমায় আরোহণ করে আরাভ পেছনের ব্যাকসিটে নিজের চওড়া শরীরটা এলিয়ে দিল। কোটের টাইটা সামান্য আলগা করে ও যখন অবসন্ন দুই চোখ সবেমাত্র বুজেছে, ঠিক তখনই গাড়ির বন্ধ জানালার কাঁচে আলতো করাঘাতের শব্দ হলো।
আরাভ চোখ মেলে তাকাল। জানালার ওপাশে বারো-তেরো বছরের এক ছিন্নমূল বালিকা একরাশ সুবাসিত ফুলের ডালি আর বেলী ফুলের গাজরা হাতে আকুল নেত্রে দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভার বিরক্ত হয়ে কাঁচ নামিয়ে মেয়েটিকে ধমক দেওয়ার সুরে বলল,,
— এই, সরো এখান থেকে! জ্যামের মধ্যে বিরক্ত কোরো না।
— স্টপ ইট!
আরাভের হঠাৎ এমন গম্ভীর ও রাশভারী ধমকে ড্রাইভার চমকে উঠে চুপ হয়ে গেল। গাড়িবারান্দার ম্লান আলোয় ওই তাজা ফুলগুলোর দিকে তাকাতেই আরাভের তপ্ত মনের মণিকোঠায় মুহূর্তেই ভেসে উঠল তিয়াশার আরক্তিম, জেদি আর মায়াবী মুখচ্ছবি। আরাভ জানালার কাঁচটা পুরোপুরি নামিয়ে মেয়েটির দিকে চেয়ে মৃদু হেসে মার্জিত স্বরে বলল,,
— তোমার ডালির সব ফুল আমাকে দিয়ে দাও। কত দেব বলো?
মেয়েটি মহাবিস্ময়ে ওর দিকে চেয়ে রইল। আরাভ আর কোনো হিসাব না করে পকেট থেকে কয়েকখানা চকচকে নোট ওর হাতে গুঁজে দিয়ে সমস্ত ফুল আর গাজরাগুলো নিজের পাশে সিটের ওপর রাখল।
কিছুক্ষণের মাঝে যানজট কমতেই গাড়ি পুনরায় ধীর গতিতে চলতে শুরু করল। আরাভ পরম যত্নে এক ছড়া শ্বেতশুভ্র বেলী ফুলের গাজরা নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। সুবাসিত সেই তীব্র ঘ্রাণ নাসিকায় পৌঁছাতেই ওর ঠোঁটের কোণে এক ভুবনমোহিনী, খাঁটি ভালোবাসার বক্র হাসি ফুটে উঠল। ও একটি লাল গোলাপ নিজের কোটের পকেটে গুঁজে রেখে আনমনে ফিসফিসিয়ে উঠল,,
ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১৫
— যে খাঁচায় তোমাকে বন্দি করতে চেয়েছিলাম, সেখানে এখন আমি নিজেই বন্দী হয়ে চাবি তোমার হাতে তুলে দিয়েছি,বিবিজান। জীবনে তো অনেক হারালাম এবার না হয় তোমাকে ভালোবেসে তোমার কাছেই হেরে গেলাম।
