অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩১
রুপা
শেহনাজ সরকারের কথা শুনে চুপ করে আছে পুষ্প। রমনীর গলার কাছে কান্না দলা পাকিয়ে আসছে; আপ্রাণ চেষ্টা করছে যেন কান্না বেরিয়ে না আসে, সে ঢোক গিলল। শেহনাজ সরকার সেদিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে আবারো জিজ্ঞেস করলেন—
– “আচ্ছা সবকিছু বাদ, সব আমি সামলে নেব। তুই শুধু আমাকে এতটুকু বল—আর্যকে ছেড়ে তুই খুশি থাকবি তো? তোর খুশি থাকা, ভালো থাকার জন্য তোদের আলাদা করতে চাইছি আমি! তাই বল, আর্যকে ছাড়া ভালো থাকবি তুই? তুই যেটা চাইবি সেটাই হবে!”
পুষ্প এবার চুপ করে থাকল না। সে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলল—
– “আমার চাওয়ায় কী হবে, ফুফুমণি? উনি তো ডিভোর্স চান। এই সম্পর্ক থেকে মুক্তি চান উনি!”
– “যদি আর্য ডিভোর্স না চায়, তাহলে দিবি না?”
শেহনাজ সরকারের কথায় ভেজা চোখে একপলক মাথা তুলে শেহনাজ সরকারের দিকে তাকাল রমনী। কত সহজ সেই দৃষ্টি; যেন সেই চোখ বলছে, সে তো ডিভোর্স চায় না, সে তো সংসার করতে চায় সরকার সাহেবের সাথে। সেই দৃষ্টিতে তাকিয়ে হয়তো পুত্রবধূরূপী মেয়ের মনের কথা বুঝতে পারলেন তিনি। জিজ্ঞেস করলেন—
– “তোকে এত অপমান-অবহেলা করল, গায়ে পর্যন্ত হাত তুলল—তোর রাগ নেই ওর ওপর?”
পুষ্প এবার নিজের ভেতরের ঝড় আটকে শান্ত কণ্ঠে বলল—
– “ফুফুমণি, উনি তো বিয়েটা নিজের ইচ্ছায় করেননি; তুমি জোর করেছ বলে আমাকে বিয়ে করেছেন। তার ওপর আমি ওনার চেয়ে অনেক ছোট। তুমি বলো, কোন ছেলে তার চেয়ে অর্ধেক বয়সী মেয়েকে বউ হিসেবে স্বীকার করবে? আর উনি আমাকে অপমান-অবহেলা করেছেন কারণ উনি আমাকে বউ হিসেবে মানেন না—তাই। আর গায়ে হাত তোলার কথা বললে, ওটা আমার দোষেই তো মেরেছে। আমাকে তো আগে বারণ করেছিল আলমারিতে হাত না দিতে। আমি কথা না শুনে হাত দিয়েছি, এমনকি ওনার পার্সোনাল ডায়েরিও হাতে নিয়েছি, তাই তো মেরেছে। যদিও আমি ইচ্ছে করে ডায়েরিটা নিইনি, মেঝেতে পড়ে গিয়েছিল তাই তুলে নিয়েছি। কিন্তু উনি তো সেটা জানেন না।”
পুষ্পর কথা শুনে অবাক হলেন শেহনাজ সরকার। তিনি সেটা প্রকাশ না করে শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন—
– “তুই রেগে নেই আর্যর ওপর? এত কিছুর পরেও আর্যর পক্ষ নিচ্ছিস?”
– “পক্ষ নিচ্ছি না, সত্যি বলছি। যদি রাগ করার কথা বলো, হ্যাঁ—আমি অনেক রেগে আছি। উনি আমাকে মেরেছেন সেজন্য না, দোষ আমার ছিল তাই মেরেছেন। উনি আমাকে অনেক কথা শুনিয়েছেন, আমার চরিত্রে আঙুল তুলেছেন। আমি কী করেছি যে উনি আমার চরিত্রে আঙুল তুলেছেন?”
– “তোর চরিত্র নিয়ে কথা বলেছে? আচ্ছা, আমি আসার আগে কী কী হয়েছিল—সব আমাকে খুলে বল।”
পুষ্প শেহনাজ সরকারের কথা মতো সবকিছু শুরু থেকে বলতে শুরু করল। যেভাবে হুট করে এসে ডায়েরি কেড়ে নিয়ে চড় মারল, ইভানকে জড়িয়ে তার চরিত্রে আঙুল তুলল—সব শুনে শেহনাজ সরকারের বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, তার ছেলে এই মেয়ের প্রতি দুর্বল হয়ে গেছে। তাই ইভানের সাথে বিয়ের কথা শুনে আগে ইভানকে মেরেছে, তারপর আবার রুমে এসে রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে পুষ্পকেও মেরেছে। তিনি ভেবে নিলেন এবার যা করার উনাকেই করতে হবে; শুধু পুষ্প ওনার সঙ্গ দিলেই হবে। তিনি এবার পুষ্পকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন—
– “আর্যর সাথে সংসার করতে চাস নাকি আলাদা হতে চাস? চিন্তা করিস না, তুই সংসার করতে না চাইলে জোর করব না। কিন্তু তুই যদি আর্যর সাথে থাকতে চাস, তাহলে আর্যকে অনেক পরীক্ষা দিতে হবে। তাকেও ঠিক ততটাই কষ্ট ভোগ করতে হবে, যতটা তোকে দিয়েছে—যাতে পরেরবার তোকে কষ্ট দেওয়ার আগে হাজার বার ভাবে।”
প্যারিসের বিখ্যাত নামী হোটেল ‘রিটজ প্যারিস’-এর বিলাসবহুল লাক্সারি রুমের বারান্দায় নরম তোশকের আরামদায়ক সোফায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছে আর্য। আর্যর প্যারিসে আসার আজকে দুইদিন। এই দুই দিনে আর্যর দিন অফিস এবং সাইট ভিজিট করে যেমন-তেমন ভাবে কেটে গেলেও, রাতে দামি হোটেলের লাক্সারি রুমে প্রবেশ করলেই শুরু হয় অশান্তি। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে গোলগাল, ফর্সা, মায়াবী একটা মুখ—ঘুম আর চোখে ধরা দেয় না। খেতে গেলেও পুষ্পর কথা মনে পড়ছে, মেয়েটা খেয়েছে তো? ঘুমাতে গেলে ঘুম আসে না, মেয়েটা কী করছে? ভালো আছে তো, নাকি আবারো আড়ালে বসে কাঁদছে? সব ভাবনার মাঝেই এক দণ্ড শান্তি নেই আর্যর।
আর্য কাজ শেষ করে ল্যাপটপের সাটার বন্ধ করে হাই তুলে উঠে দাঁড়াল। বারান্দার একদম রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। পকেট থেকে সিগারেট বের করে নিজের নিকোটিনের ধোঁয়ায় পোড়া ঠোঁটের মাঝে চেপে ধরে দেশলাই জ্বালিয়ে এক টান মারতেই ধোঁয়ার কুণ্ডলী বের হয়ে চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল। আর্যর সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই, সে একমনে সিগারেট টানছে—নিজের ভেতরের অস্থিরতা কমানোর এক করুণ চেষ্টা মাত্র। আর্য সিগারেট শেষ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল—
– “ফ্লাওয়ার, হোয়াই ডোন্ট ইউ পিকিং মাই কল? আই এম ওয়ারিড এবাউট ইউ!”
আর্য আবারো পকেট হাতড়ে নিজের ফোন বের করে ডায়াল প্যাডে ঢুকে কল করল নিজের বাংলাদেশি নাম্বারে, যেটা পুষ্পর কাছে রেখে এসেছিল। কিন্তু বরাবরের মতোই শূন্য ফলাফল, কেটে গেল—কেউ রিসিভ করল না। ফোনের স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে ২২২৫ ডায়াল কল! অবাক হওয়ার বিষয় হলেও সত্যি, আর্য পুষ্পর সাথে কথা বলার জন্য, তার কণ্ঠ শোনার জন্য দুই দিনে দুই হাজারের বেশি কল করেছে। কিন্তু অপর পাশ থেকে কোনো রেসপন্স আসেনি।
আর্য রুমে গিয়ে আলমারি খুলে নিজের কাপড়ের বাজের ভেতর থেকে বের করল একটা সাদা মেয়েদের ওড়না। এই ওড়নাটা পুষ্পর আসার সময় পুষ্পর গলা থেকে নিয়ে এসেছিল। প্যারিসে আসার পরে আর্যর অস্থিরতা কমানোর একমাত্র মাধ্যম এটি। রাতে পুষ্পর কথা মনে পড়ে যখন অশান্তি-অস্থিরতায় ঘুম আসে না, তখন এই ওড়নাটার ঘ্রাণ নিয়ে নিজেকে শান্ত করে সে। ওড়নাটা জড়িয়ে পুষ্পর ঘ্রাণ নিয়ে, পুষ্পর কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমায় সে; নাহলে ঘুম তার চোখের ধারেকাছেও আসে না।
আর্য ঠিক করে নিয়েছে, এখান থেকে ফিরে তার ‘ফ্লাওয়ার’কে তার অতীত-বর্তমান সবকিছু জানিয়ে পূর্ণ বউয়ের অধিকার দিয়ে আগলে নেবে, বুকে টেনে নেবে। আগে করা অন্যায়ের জন্য তার ফ্লাওয়ার যা শাস্তি দেবে, সব মাথা পেতে নেবে। সে বুঝে গেছে, অনেক আগে থেকে না চাইতেও সে মেয়েটার মায়ায় পড়ে গেছে। ভালোবাসা যেমনই হোক, কিন্তু মায়া বড়ই ভয়ংকর—একবার কারো মায়ায় জড়ালে সেই মায়া থেকে আর নিস্তার নেই।
আর্য ওড়নাটা নাকের কাছে এনে মুখ ডুবিয়ে দিয়ে ঘ্রাণ টেনে নিল। বেলি ফুলের সাথে মেয়েলি শরীরের মিষ্টি ঘ্রাণ তীব্রভাবে ভারি করল নাসারন্ধ্র। বিড়বিড় করল—
– “পিপল বিকাম ড্রাগ-অ্যাডিকটেড, বাট আই অ্যাম বিকামিং অ্যাডিকটেড টু ইউ, মাই লিটল ফ্লাওয়ার।”
– “নেশা নাকি মানুষকে ভুলিয়ে রাখে, তুমি তার চেয়েও ভয়ংকর—নেশাও তোমাকে ভোলাতে ব্যর্থ। কী করব বলো? অনেক পালিয়েছি তোমাকে হার্ট করেছি, তারপরেও তোমার মায়ায় পড়ার হাত থেকে নিজেকে আটকাতে পারিনি। আমি চাইনি তোমার মায়ায় পড়তে, কিন্তু আই প্রমিস—এবার তুমি যা চাইবে তাই হবে। সবকিছু করব শুধু তোমার জন্য।
আর্য বিড়বিড় করতে করতে গুনগুন করে উঠলো—
– “শুধু তুমি চাও যদি সাজাবো আবার নদী, এসেছি হাজার বার… শুধু তোমারই জন্য, সবটুকু অবহেলা, মুছে ফেলে দেবো আজ থেকে, শুধু তোমারই জন্য।”
আর্য প্যারিসে যাওয়ার পর দুই দিন সব স্বাভাবিকভাবেই চলছে। পুষ্প প্রতিদিন শেহনাজ সরকারের সাথে কলেজে যায়, আবার ওনার সাথেই বাড়িতে আসে। পুষ্প শেহনাজ সরকারকে বলেছে সে ডিভোর্স চায় না, কিন্তু যদি আর্য ডিভোর্স চায়—পুষ্প বাধা দেবে না, বিনা বাক্যে ডিভোর্স পেপারে সই করে দেবে। শেহনাজ সরকারও পুষ্পর কথা মেনে নিয়েছেন। তিনি বুঝতে পারছেন পুষ্প আর্যকে ভালোবেসে ফেলেছে, কিন্তু সে জোর করে অধিকার খাটিয়ে রাখতে চাইছে না। একদিকে পুষ্প ঠিক; কারণ অধিকার তার ওপরই খাটানো যায় যে অধিকার দেয়, কিন্তু আর্য সেই অধিকার পুষ্পকে দেয়নি।
কিন্তু এবার শেহনাজ সরকার ঠিক করে নিয়েছেন, আর্য বিজনেস ট্রিপ থেকে ফিরে আসলে যা করার উনি করবেন। তার আগে ওনার ছেলেকে বোঝাবেন, ভালোবাসার মানুষ কষ্ট দিলে, অপমান-অবহেলা করলে কেমন লাগে! যে কষ্ট পুষ্প পেয়েছে, সেই একই কষ্ট আর্যকেই পেতে হবে। যাতে পরেরবার পুষ্পকে অপমান-অবহেলা করে, আঘাত করে কথা বলার আগে তার রুহ কেঁপে ওঠে।
আজকেও পুষ্পকে শেহনাজ সরকার নিতে এসেছিলেন কলেজ থেকে। কিন্তু গাড়িতে বসে বাড়িতে যাওয়ার আগে হঠাৎ জরুরি ভিত্তিতে শেহনাজ সরকারকে একবার কোর্টে যেতে হচ্ছে, ওনার জুনিয়রের কাছ থেকে একটা কেসের ফাইল কালেক্ট করার জন্য। শাশুড়ি-বউমা দুজন এখন গাড়িতে করে কোর্টের দিকেই যাচ্ছে। পুষ্প হিজাব খুলে গলায় ঝুলিয়ে রেখেছে—শেহনাজ সরকারই খুলে দিয়েছেন যাতে গরম কম লাগে। হঠাৎ শেহনাজ সরকারের নজরে পড়ে পুষ্পর গলায় লালচে-খয়েরি কিছুটা বেগুনি একটা ছোপ দাগ। সেটার দিকে তাকিয়ে শেহনাজ সরকার ডাকলেন—
– “পুষ্প?”
পুষ্প এতক্ষণ আনমনে সিটে হেলান দিয়ে দৃষ্টি বাইরে রেখে গাড়ি চলাচল দেখছিল। এবার দৃষ্টি ওনার দিকে ঘুরিয়ে জবাব দিল—
– “হুম!”
– “গলায় কোনো পোকায় কামড় দিয়েছে? ওষুধ লাগাসনি কেন? দেখ তো, এখনো দাগ থেকে গেছে!”
শেহনাজ সরকারের কথায় হাত আপনা-আপনিই সেই কামড়ের জায়গায় চলে গেল। পুষ্প বুঝতে পারছে না গলায় কীসে কামড়েছে, কিছুতেই মনে করতে পারছে না। দুই দিন আগে কথা বলার সময় শেহনাজ সরকার দাগটা খেয়াল করেছিলেন। পুষ্পর কাছে জিজ্ঞেস করলে পুষ্প মনে করতে পারে না, তাই অমনি বলে দিয়েছিল পোকা কামড়েছে। উনি সেদিন অ্যান্টিসেপটিক লাগিয়ে দিয়েছিলেন, বলেছিলেন পুষ্পকে আবারো লাগিয়ে নিতে। কিন্তু পুষ্পর মনে ছিল না। পুষ্প এবার শেহনাজ সরকারের দিকে তাকিয়ে বলল—
– “ফুফুমণি, ঠিক হয়ে গেছে। ওষুধ দিতে হবে না আর।”
– “ঠিক হয়নি, দেখ—এখনো দাগ থেকে গেছে।”
– “আচ্ছা, বাড়িতে গিয়ে লাগিয়ে নেব।”
শেহনাজ সরকার আর কথা বাড়ালেন না। এর মধ্যে গাড়ি কোর্টের সামনে চলে আসায় শেহনাজ সরকার পুষ্পকে গাড়িতে বসতে বলে নেমে কোর্টের ভেতরে চলে গেলেন। পুষ্প গাড়িতে বসে জানালা দিয়ে মুখ বের করে চারপাশ দেখতে লাগল। দুই-তিনজন মিলে উকিলের সাথে কথা বলছে, মানুষ বেরুচ্ছে, আবার অনেক মানুষ ঢুকছে। মহিলা উকিলের পরনে সাদা শাড়ির ওপরে কালো কোট, কারো হাতে ফাইল। পুরুষ উকিলের পরনে কালো স্যুট-প্যান্ট। হঠাৎ ড্রাইভারের ডাকে ধ্যান ভাঙল পুষ্পর—
– “বউমণি, কিছু খাবেন? আমি নিয়ে আসব নাকি?”
পুষ্প হেসে মাথা নেড়ে বলল—
– “আমি খাব না দাদু! আর তোমাকে কতবার বলেছি আমাকে ‘পুষ্প’ ডাকবে, আমি তোমার নাতনি, বুঝেছ?”
বয়স্ক লোক হাসলেন। নাম রহিম মিয়া, বয়স ষাটের কাছাকাছি, সরকার বাড়ির অনেক পুরনো ড্রাইভার। পুষ্প ওনাকে ‘দাদা’ ডাকে, উনিও পুষ্পকে নাতনির মতো স্নেহ করেন। তবুও পুষ্প সরকার বাড়ির বড় ছেলের বউ, সেই হিসেবে ‘বউমণি’ ডাকেন। কিন্তু যতবার ডাকেন, পুষ্প ভুল শুধরে দিয়ে ‘পুষ্প’ ডাকতে বলে। উনি হেসে বললেন—
অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩০
– “আচ্ছা পুষ্প দিদিভাই, তুমি বসো। আমি কিছু খাওয়ার জন্য নিয়ে আসি।”
পুষ্প কিছু বলল না, হেসে মাথা নেড়ে সায় জানাল। রহিম মিয়া গাড়ির দরজা খুলে নেমে যেতেই কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা লোক কল করে বলল—
– “মেয়েটা একা, এখন কী করব?”
