উন্মাদনা পর্ব ৪৯
কায়নাত খান কবিতা
‘অন্যের খাওয়া মাল আমি খাই না, বোকাচন্দ্র!”
‘আবার মিথ্যা বলছেন তো?’
‘বলে না কে?’
অভীর ঠোঁটের কোণে ভেসে উঠে এক রহস্যময় হাসি।
কথাটা শুনেই আনন্দীর চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। এতদিন ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ যেন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তার। ভুল যদি হয়ে থাকে, তবে সেটা কি শুধু তার একার? অভী কি সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিল?একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে সে অভীর একেবারে মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়।
‘মানছি সেদিন আমি মিথ্যা স্বাক্ষী দিয়েছিলাম। মানছি আপনি স্নেহার গায়ে হাত তুলেননি। মানছি সবটা ওর সাজানো নাটক ছিলো। কিন্তু বাচ্চাটি? সেটা ও ছিলো অভী। ওটা তো নাটক ছিলো না। যেদিন জেল থেকে বের হলেন, সেদিন থেকে আমার পিছু নিলেন। স্নেহার সাথে মিশতে না করলেন। আমাকে সবার থেকে আলাদা রাখলেন। কিন্তু বাচ্চা তো ছিলো অভী!’
আনন্দীর কণ্ঠ কেঁপে উঠে। প্রতিটি প্রশ্নের সঙ্গে বছরের পর বছর জমে থাকা যন্ত্রণা বেরিয়ে আসতে থাকে। অভী তার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনল। তারপর খুব হালকা করে হেসে টেবিলের ওপর রাখা সিগারের প্যাকেট থেকে একটি সিগার বের করে। আগুন ধরিয়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ভাসিয়ে শান্ত গলায় বলল,
‘তুই মিথ্যা স্বাক্ষী না দিলে আজ আমাগো কাহিনিটা অন্য রমক হইতো। আমি শুরু থেকেই জানতাম তোকে ব্রেন ওয়াশ করা হইছিলো। বাচ্চা নিয়ে নাটক সবই আমার জানা। কিন্তু আমি যদি বলি তুই কী বিশ্বাস করতি ওটা আমার না?’
আনন্দী এক মুহূর্তও দেরি করল না।
‘কখনোই করতাম না!’
অভী নিঃশব্দে মাথা নেড়ে মৃদু হেসে বলল,
‘এই জন্য তোরে কিছু বলি না। আসলে আনন্দী…!’
বাকিটুকু আর মুখে আনল না সে।হাতে ধরা সিগারটা মেঝেতে ফেলে পায়ের নিচে পিষে ফেলে দেয়। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আনন্দীর সামনে দাঁড়াল। দু’হাত তুলে অত্যন্ত কোমলভাবে তার দুই গাল স্পর্শ করল।চোখের গভীরে অদ্ভুত এক ক্লান্তি নিয়ে বলল,
‘’তোরে আমি শুরু থেকেই ভালোবাসি আনন্দী। যেদিন বের হইছি, সেদিনই তোরে বিয়া করার ইচ্ছা ছিলো। কিন্তু ভয় হইতো। তোরে হারানোর ভয়। তোর কোনো আইডিয়া নাই তুই কীসের মধ্যে জড়ায়ছোস! আমি না থাকলে কোনো এক ড্রেনে তোর লাশ ভাসতো।’’
অভীর কণ্ঠে এবার কোনো রাগ ছিল না। ছিল শুধু চাপা আতঙ্ক আর বহুদিনের অপ্রকাশিত সত্যের ভার।কিন্তু তার কথাগুলো আনন্দীর কাছে আরও বড় এক ধাঁধায় পরিণত হলো।সে কপাল কুঁচকে অভীর চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।এই মানুষটাকে সে আসলে কোন পরিচয়ে চিনবে?অপরাধী?নাকি রক্ষাকর্তা?
২০২২ সালের সেই একটি মিথ্যা সাক্ষ্য অভীর স্বপ্ন, তার ক্যারিয়ার সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছিল। অথচ আজ, এতগুলো বছর পর দাঁড়িয়ে সেই মানুষটিই বলছে, আনন্দী তার ইচ্ছের বিরুদ্ধেই কোথাও নেই। বরং এতদিন সে বেঁচে আছে অভীর অদৃশ্য সুরক্ষার বলয়ে।তাহলে অপরাধটা কার?আনন্দীর?নাকি সেই অদেখা মানুষগুলোর, যারা তাকে পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্ত করেছিল?অভী নিজেই তো বলল, শুরু থেকেই সে জানত আনন্দীর ব্রেন ওয়া’ করা হয়েছিল।তাহলে যারা এই ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে ছিল, তাদের বিরুদ্ধে সে কোনো পদক্ষেপ নিল না কেন?
আর স্নেহা?ভিডিওটা যে সাজানো ছিল, সেটা আনন্দী পরে জেনেছে। অভী কখনো স্নেহার গায়ে হাত তোলেনি, এটাও সত্য।কিন্তু স্নেহার গর্ভধারণ?মেডিকেল রিপোর্ট তো নিজের চোখেই দেখেছিল সে।তাহলে সেই সন্তানের পরিচয় কী?
জেল থেকে বেরিয়েই অভী কেন তাকে সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিল? কেন স্নেহার সঙ্গে যোগাযোগ নিষিদ্ধ করল? কেন তাকে অদৃশ্য এক নজরবন্দি জীবনে আটকে রাখল?এত অপমান, এত মানসিক নির্যাতন, এত প্রশ্নের পরও,কীভাবে সেই একই মানুষ দাবি করে, সে নাকি আনন্দীকে রক্ষা করে এসেছে?
প্রতিটি উত্তরের ভেতর যেন লুকিয়ে আছে আরও দশটি নতুন প্রশ্ন।অভীকে যতই বুঝতে চায় আনন্দী, মানুষটা ততই তার কাছে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে।মনে হয়, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির ভেতরে যেন একসঙ্গে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ বাস করে। একজন ধ্বংস করে, আরেকজন প্রাণপণ আগলে রাখে।
‘আমি টায়ার্ড অভী। আর নিতে পারছি না আপনাকে। এক এক সময় এক এক কথা বলেন। আমি মাঝে মাঝে বুঝি না, আপনি আসলে কী বলেন! এক সময় মনে হয় আমি দোষি। আরেক সময় মনে হয় আপনি দোষি। আমি কী করবো কিছু বুঝে উঠতে পারছি না অভী!’
কথাগুলো বলতে বলতে আনন্দীর কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো। বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা প্রশ্ন, অপরাধবোধ আর বিভ্রান্তি যেন একসঙ্গে বেরিয়ে এলো তার বুকের ভেতর থেকে।অভী ধীরে ধীরে তার এলোমেলো চুলগুলো কানের পেছনে সরিয়ে দিল। তারপর গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
‘একদিন সময় আইবো। সবটা পানির মতো পরিষ্কার হইবো। কিন্তু আমি সেদিন থাকবো না!’
কথাটা শুনে আনন্দীর বুকের ভেতর হঠাৎ করেই মোচড় দিয়ে উঠল।কেন এমন হলো?সে নিজেও জানে না।
যে মানুষটাকে এতদিন ঘৃণা করে এসেছে, তার মুখে এমন কথা শুনে কেন বুকটা ভারী হয়ে উঠল?কিছুক্ষণ নীরব থেকে খুব আস্তে ডাকল,
‘অভী?’
‘হুম!’
‘সত্যি করে বলুন তো! ২০২২ সালে কী হয়েছিলো? আমরা যেটা জানি সেটাই? নাকি আরো এমন কিছু রয়েছে যেটা আমাদের অজানা?’
প্রশ্নটা শুনে অভী কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল।তারপর আলতো করে আনন্দীর গালে একটি চুমু রেখে তাকে নিজের কাছে টেনে নিল।মৃদু স্বরে বলল,
‘সব সত্যি জানতে নেই বউ! কিছু সত্যি লুকিয়ে থাকা ভালো।’
কথাটা শুনেই আনন্দীর চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
এ কণ্ঠস্বর।এ যেন অভীর পরিচিত কণ্ঠ নয়।অভী তো সবসময় একটু টেনে, অশিক্ষিত ঢঙে কথা বলে। অথচ এই কণ্ঠ ছিল স্থির, ভারী আর অদ্ভুত রকম আত্মবিশ্বাসী। যেন একই শরীরে অন্য এক মানুষের উপস্থিতি।কপাল কুঁচকে সে ধীরস্বরে জিজ্ঞেস করল,
‘আপনার কষ্ট এমন?’
আনন্দীর চোখে জমে ওঠা প্রশ্নগুলো যেন অভী স্পষ্টই বুঝতে পারল।সে ধীরে ধীরে আনন্দীর কোমর ছেড়ে তাকে খাটে বসিয়ে দিল। তারপর পরিবেশটা হালকা করার চেষ্টা করে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
‘হিসাব অনুযায়ী আজকে ইন্টু বিন্টু করার রাত! শুরু করি?’
আনন্দী সঙ্গে সঙ্গে চোখ রাঙিয়ে বলল,
‘খবরদার।’
‘ why সোনামনি?’
‘ অসভ্য!’
‘ জাহান্নামী!’
এক ঝটকায় অভীকে ধাক্কা দিয়ে খাট থেকে নিচে ফেলে দিল আনন্দী। তারপর পাশে থাকা একটি বড় বালিশ তুলে তার দিকেই ছুড়ে মেরে গম্ভীর গলায় বলল,
‘নিচে ঘুমান!’
কথাটা বলেই বিজয়িনীর ভঙ্গিতে পুরো খাট নিজের দখলে নিয়ে কাঁথা টেনে শুয়ে পড়ে সে।অভী মেঝেতে বসে কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে আনন্দীর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বালিশটা হাতে তুলে নিল। কিন্তু পরক্ষণেই কী মনে করে আবার উঠে দাঁড়াল।কোনো শব্দ না করেই ধীরে ধীরে খাটে উঠে আনন্দীর একপাশে শুয়ে পড়ে।ঠিক তখনই হঠাৎ করে পুরো ঘর অন্ধকারে ডুবে গেল।
বিদ্যুৎ চলে গেছে।অপ্রস্তুত অন্ধকারে আনন্দীর বুক ধক করে কেঁপে উঠে। মুহূর্তের জন্য তার নিঃশ্বাসও যেন আটকে গেল।ঘরের বাইরে দূরের কুকুরের ডাক, জানালার ফাঁক গলে ভেসে আসা রাতের বাতাস আর অন্ধকারের নিস্তব্ধতা সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত আবহ তৈরি হয়।
অভীও চুপচাপ শুয়ে রইল।এটাই ছিল তাদের জীবনের প্রথম রাত যেদিন তারা একই বিছানায়, একই ছাদের নিচে পাশাপাশি শুয়ে আছে।কিন্তু দু’জনের মাঝখানে যেন অদৃশ্য এক দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে।কেউ কোনো কথা বলছে না।
উন্মাদনা পর্ব ৪৮
শুধু নীরবতা দু’জনের হয়ে কথা বলে চলেছে।কিছুক্ষণ পর অভী খুব আস্তে, প্রায় শব্দহীনভাবে একটু একটু করে আনন্দীর দিকে সরে আসতে লাগল।
আনন্দী পিছনে না ফিরেই, অন্ধকারের দিকেই তাকিয়ে কর্কশ গলায় বলল ‘ কাছে আসার চেষ্টা করলে জায়গা মতো লাথি পড়বে! ‘
