Home প্রিয় জারুলফুল প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৪

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৪

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৪
সাদিয়া সাদু

রাত একটা ছুঁই ছুঁই করছে ।সারা বাড়ি ফাঁকা , এক এক করে সকল মেহমান বিদায় নিয়েছে । মেহমান বিদায়ের সাথে সাথে খান বাড়ির সকলেও নিদ্রায় শায়িত হলেন।‌ শুধু দু তলার কর্ণারের রুমটায় ড্রিম লাইটের হলদেটে আলো দেখা যাচ্ছে ।
অন্ধকার রুম , শুধু জানলার ফাঁক দিয়ে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলদে আলো মেঝেতে একটা সরু রেখা এঁকে দিয়েছে । মাথার উপরে ফ্যানটা মৃদু শব্দে ঘুরছে। তার সাথে তাল মিলিয়ে দিগন্তের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে ‌ । একটু পর পর দাঁত খটমট করে নিজের উগ্ৰ রাগটাকে চেপে রাখার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । জারুল এর লতানো কোমড়টা চেপে দেয়ালের সাথে ঠেসে ধরে। সাথে হাতের কব্জি টা ধরে দাঁতে দাঁত খিচে বলে ।
_’তুই কি ভাবছিস তোকে আমি এখন আদাবর করবো ! হাআ , তুই হলি নর্দমার কীট। তোর মতো নর্দমার কীট কে আমি পুনরায় নিজের সাথে জড়িয়ে নিজই, নিজের নামে পাপের খাতা ভারী করবো ? কক্ষনো না,তোকে নর্দমায় মানাই । ‘

দিগন্তের শক্তপোক্ত খসখসে হাতে ধরে রাখা কব্জিটার চামড়া জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে । জারুল নাকমুখ খিচে রাখলেও দিগন্তের কথায় কুঁচকানো মুখটা শিথিল করে নামিয়ে ফেললো । দিগন্তের রক্তিম চোখের দিকে তাকিয়ে একটু গা জ্বালানো হাসির দিয়ে বলে ।
_” আমি নর্দমার কীট হলে , আপনি নর্দমা। ‘
জীব খসে বেড়িয়ে পড়া কথাটাতে তড়িৎ বেগে চটে গেলো দিগন্ত, কোমড়ের হাতটা সঙ্গে সঙ্গে গালে উঠে এসেছে । গাল দুইটা চেপে ধরে মাথাটা দেয়ালের পিঠে লাগিয়ে রাগে হিসহিসিয়ে দাঁতে পিষে বলে ।
_’ তুমি এইটা চরিত্র হীন নারী । তোর চরিত্রে সাথে আমার চরিত্রের পাল্লা দিচ্ছিস ? তোর সারা অঙ্গে কলঙ্ক আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে , তোকে ছোঁয়াতে তো আমার গায়েও লেগে পড়ছে তোর কলঙ্ক। ‘
গালে চাপা হাত দু’টো সরিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে জারুল । কয়েক সেকেন্ড চেষ্টা করে সফল ও হয়েছে । দিগন্ত নিজের হাত সরিয়ে এনেছে । জারুল ছাড়া পেয়ে একটু একটা শ্বাস ফেলে ফের বলে ।
_’ যে পুরুষের আত্মসম্মান নাই তার আবার কলঙ্কের ভয় কিসের ।’
জারুল এর একেকটা গা জ্বালানো কথায় বারংবার তেতে উঠছে দিগন্ত । এইবার রাগে গজগজ করে জারুল কে এক হাতে চেপে ধরে গলার নীচে মুখ ডুবিয়ে জোড়েসড়ে কামড় বসায় দিগন্ত ‌। জারুল দুই হাতে ঠেলিয়ে সরানোর চেষ্টা করছে কিন্তু দিগন্ত সে কামড়ে চেপে রেখেছে । পাক্কা ৪০ সেকেন্ড পড় ছেড়ে দেয় । কামড়ের জায়গা থেকে গড়াগড়ি র*ক্ত পড়তে ।
দিগন্ত একটু বাঁকা হেসে বলে ।

_’ নে নর্দমার মতো কাজ করেই ফেললাম। তোর এতো তেজ কতদিন ধরে রাখতে পারিস আমি দেখবো । ‘
একটু নীরব থেকে পুনরায় বলে ‌ ।
_’ তোকে কে বিয়ে করেছে তার সাথে আমি দেখা করতে চাই । আই মিন তোর জামাই এর সাথে। শুনলাম তোর একটা ছয় বছরের মেয়ে আছে? বাই এনি চান্স মেয়েটা কি আমার ? ‘
গোলগোল চোখে তাকালো জারুল । এতোক্ষণের ঠাণ্ডা হৃদয়ে উথালপাথাল ঘূর্ণিঝড় শুরু হয়েছে । তার মেয়ের কথা জানলো কি করে ? মেয়েটাকে যদি কিছু করে বসে ‌ ? না না মেয়েটা তার প্রাণ , এই মেয়েটার জন্যেই সে সমাজের মানুষের এতো কটুক্তি কথা শুনেও বেঁচে আছে । মেয়েটার কিছু হলে সেও বাঁচবে না ।
জারুল ফাঁকা ঢোঁক গিলে মন টাকে শক্ত করে , মনে কিছুটা সাহস জোগিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলে।
_’মমিষ্টার খান , আপনি দিবা স্বপ্ন দেখছেন । আমার মেয়ে কি করে আপনার মেয়ে হতে যাবে। আপনি তো আজ এনগেজড হয়েছে এখনি বাচ্চা কীভাবে সম্ভব ? ‘
জারুল অতিরিক্ত টেনশন কথা সব এলোমেলো করে ফেলছে কি থেকে কি বলে দিয়েছে নিজেও জানে না । সে আড় চোখে একবার তাকিয়ে দিগন্তের হাতের ফাঁক দিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে আসে ‌।

গভীর রাতে দুইজন নরনারী এই গুপন কথোপকথন সব শুনেছে দীনা বেগম । এতোক্ষণ যাবত দরজার আড়াল থেকে দাঁড়িয়ে ছেলের আর বাড়ির কাজের মেয়ের সকল কথা শোনেছে । কিন্তু তার কানে যে কথা টা বাড়ি খাচ্ছে সেটা হলো , দিগন্তের বলা কথাটা , বাই এনি চান্স মেয়েটা কি আমার ? ‘ দীনা আনমনেই বলে উঠে ‌ ।
‘ কোনোভাবে কাজের মেয়েটার সাথে আমার ছেলের অবৈধ সম্পর্ক নেই তো । সে বাচ্চাটা আমার ছেলের নয়তো।’
নিজে কথা ভেবে নিজেই গেমে জর্জারিত। গায়ে জড়ানো পাতলা সুতি কাপড়ের আঁচল দাঁড়া নিজের ঘামার্ত চেহারাটা মুছে নিজের কক্ষে পা রাখে ।

সকাল ৮ টা তড়িঘড়ি ঘরে খান মহল থেকে বেড়িয়ে যায় ‌ জারুল । দীনা পিছু ফিরে ডাকলেও যাওয়ার পথেই বলতে থাকে ।‌
_’ খালাম্মা আমার মেয়ে ব্যথা পাইছে । খেলতে গিয়ে কপাল কেটে গেছে আমি পড়ে এসে কাজ গুলো করে দিবো , আপনি রেখে দেন । ‘
তার বের হওয়ার ঠিক আধঘন্টা পর বের হয় দিগন্ত । দিগন্ত আজ প্রথম অফিসে যাবে সেই সুবাদে একটু আগেই বেরিয়ে পড়েছে সে ।
তাদের দুইজনকে আগপিছু বের হতে দেখে এক রহস্যময় হাসি দিয়ে সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে জিসা। হাতে রাখা আমের জুসে চুমুক দিচ্ছে আর হেসে অনামিকায় চকচক করা স্বর্ণের আংটি টা। তাকাচ্ছে জিসা । তার পাশে পান চিবুতে চিবুতে বসে জহুরা , ৭৫ বছরে সাদা ফকফকা শরীরের চামড়াটা কুঁচকে গেলেও মনের দিক থেকেই এখনো তিনি তর তাজা যুবতী ‌ । ফর্সা ঠোঁট দুইটা লাল টকটক আয়ূ আছে , সেই ঠোঁট দুটো চেপে নাতনিকে কিছু একটা ইশারা করতেই‌ । অপর পাশ থেকে জিসা আশ্বাস দেয় । চোখ দুই বন্ধু করে বোঝায় সব ঠিকঠাকই আছে ‌ ।

বালিতে চিকচিক করা জির্ণশীর্ণ , ফ্লোরে পড়ে আছে ছোট্ট দিয়ার নিথর দেহটা । জায়গাই জায়গাই র*ক্তের দাগ পড়ে গেছে ।
জারুল হুরমুরিয়ে প্রবেশ করে বস্তির পাশে । জারুল বস্তীর পাশেই বাসা নিয়ে মা আর মেয়েকে নিয়ে তাকে । বস্তির এই রাস্তা দিয়েই তাদের যাতায়াত করতে হয় । দিয়া এই রাস্তা দিয়েই যাচ্ছিলো দুর থেকে কেউ দৌড়ে এসে দিয়ার উপর পড়তেই দিয়া পড়ে যায় , তাৎক্ষণিক তার মাথাটা গিয়ে লাগে রাস্তায় পড়ে থাকা ইটের উপর।
জারুল বাচ্চাদের থেকে কথাগুলো শোনে ডুকরে উঠে। মেয়ের চিকন চাকন ছোট্ট দেহটা কোলে নিয়ে রিক্সায় উঠে । অনেক রক্তক্ষরণ হয়েছে মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে আছে । ‘ মামা একটু তাড়াতাড়ি যান । ‘
রিক্সা মামার কে কথাটা বলে মেয়ের মুখটা চেপে ধরে বুকে ।
মিনিট দশেক এর মধ্যে চলে আসে হাসপাতাল । রিক্সা থেকে নামতেই সামনে দাঁড়ায় জিসা । ঠোঁটের কোণে লেগে আছে একটা বিশ্রী হাসি । জারুল কটমটিয়ে তার দিকে এক পলক তাকিয়ে সাইট কেটে হাসপাতালের ভেতর চলে যায় । জরুরী বিভাগে নিয়ে এসে শুইয়ে দেয় ,‌নার্সকে কিছু টাকা দিয়ে আবারো বাহিরে আসে ‌ ।
জিসার মুখোমুখি দাঁড়ায় ‌। জিসার ঠোঁটের কোণে লেগে আছে হাসি । জারুল সেই দিকে দাঁত চেপে তাকায় । জিসা একটু জোকে বলে ‌।

_’ কেমন লাগলো ? নাপা দিয়েছি , আমার রাস্তায় আসলে এন্টি বায়োটিক দিবো ।‌’
কথাটা শেষ করার সাথে সাথে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে গালে চড় বসায় জারুল । কাজ করা শক্ত হাতের চড় পড়তেই , তাৎক্ষণিক পাঁচ আঙ্গুলের ছাপ বসে যায় ফর্সা গালে । জিসা ক্ষুধার্ত বাঘের ন্যায় ধারালো চাহনি দেয় । হাতটা আপনা আপনি গালে চলে যায় । জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে গালটা।‌
জারুল তার লাল মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাত চেপে ধরে বলে ।
_’ তুই তো রক্ষিতা, নিজের গোপন ভিডিও ছবি দিয়ে ছেলেদের প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করিস । ‘
জিসা আগুনের ন্যায় তাকায় জারুলের দিকে । জারুল তার চাওয়ার স্টাইল দেখে হুংকার ছাড়ে ।
_’ আমার মেয়ের দিকে চোখ দিলে চোখ তুলে ফেলবো আমি।‌ তুই ও জানিস আমিও জানি কার বাচ্চা জন্ম দিয়েছি আমি , বাঘের বাচ্চা । সে যদি বিন্দু পরিমাণ এর টের পায় তোকে ছিঁড়ে খাবে । তোর মনে ডর ভয় নাই ?’
জিসা এখনো গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । জারুল আর দাঁড়ায় না চুপচাপ বড় বড় পা ফেলে স্থান ত্যাগ করে ।
জিসা এখনো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে ।

জারুল পুনরায় মেয়ের কাছে আসলে সামনে পড়ে দিগন্ত । ডাঃ মাহিন দিগন্তের খুব কাছের বন্ধু তার সাথে দেখা করতেই আসছে মূলত । জারুল কে এইখানে দেখে একটু অবাক ও হলো দিগন্ত।
জারুল ঘাবড়ে যায় । মেয়েকে দেখলে দিগন্ত হাজারো প্রশ্ন করবে। জিসা আজ এত-বড় একটা কাজ করেছে পরবর্তীতে যে এর থেকেও ভয়ঙ্কর কিছু করবে না তার কোনো ভরসা পাচ্ছে না জারুল । এতো বড় বড় কথা বলে আসলো যদি সেই কথার রাগে কোনো কিছু করে । হাজারো চিন্তাধারা মাথায় কিলবিল করছে জারুল এর ।
দিগন্ত এক পলক তাকায় জারুলের ভাবান্তর মুখের দিকে। নির্বাক তাকিয়ে ডাক্তারের পাশের চেহারা বসে । জারুল এর হাবভাব দেখছে সে ।
জারুল কাঁপা কাঁপা পায়ে ডাক্তারের কাছে বসে ।
_’ আপনার মেয়ের হৃদরোগ আছে । আগেও একবার বলেছি , আপনি মেয়ের চিকিৎসা নিয়ে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না , তার হাথে আজ এতো রক্তপাত হলো । এইভাবে চলতে থাকলে আপনার মেয়েকে বাঁচানো সম্ভব হবে না । ‘

গম্ভীর মুখে কথা বলে থামে ডাঃ মাহিন ।
ডাক্তারের কথা শোনে চোখে পানি ছেড়ে দেয় জারুল , সে আর কিই বা করতে পারবে ।
মাহিন এর কথা শোনে তাৎক্ষণিক প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় দিগন্ত ‌ ।
_’ মেয়েটার কি জন্মগত হৃদরোগ।’

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৩

__’হুম , মেয়েটার বাবাও সেই রোগে আক্রান্ত ছিলো । ‘
দিগন্ত অগ্নি চোখে তাকায় জারুল এর দিকে। দিগন্তের রক্তিম চোখ দেখে ভয়ে শোকনো ঢোঁক গিলে জারুল
_’ মেয়েটা কি আমার ? আমার রোগ এবং রক্তের সাথে ম্যাচ কিভাবে ?’
জারুল অস্পষ্ট স্বরে বলল। কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায় ।

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here