ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২১
নওরিন কবির তিশা
হন্তদন্ত হয়ে প্রাপ্ত ঠিকানা অনুযায়ী ছুটে এসেছে তিয়াশা। কৃষ্ণকালো অম্বরের বুক চিঁড়ে প্রভাতী কমলাভ রশ্মির বিচ্ছুরণ শুরু হয়েছে সবে। চরাচরের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে সুমিষ্ট স্বরে ফজরের আযান ধ্বনিত হচ্ছে চারিধারে। চারিপাশের এই জাগতিক শুদ্ধতার মাঝে তিয়াশার কলিজাটা যেন এক অজানা আশঙ্কায় দুলছে। আদ্রিতার দেওয়া সেই চরম আকস্মিক ও হৃদয়বিদারক সংবাদটি শ্রবণমাত্রই ও হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে কাউকেই কোনো কিছু না জানিয়ে, কেবল এক জোড়া অবশ চরণে ভর করে ও তীব্র বেগে ছুটে এসেছে এই সুবৃহৎ বেসরকারি হাসপাতালের সিংহদ্বারে।
চটজলদি পদক্ষেপে হাসপাতালের মূল ফটক পার হতেই এক গুমোট ও হিমশীতল পরিবেশ অভ্যর্থনা জানালো ওকে। নিজের ওষ্ঠাধর শক্ত করে চেপে ধরে, ভেতরের অবাধ্য কান্নাটুকু আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টায় রিসিপশনের দিকে ধাবিত হলো ও। অতঃপর দুরুদুরু বক্ষে সেখান হতে আরাভ খানের নাম উল্লেখপূর্বক কাঙ্ক্ষিত কেবিনের নম্বর ও ঠিকানা সংগ্রহ করে ধীর চরণে লিফট পার হয়ে নির্দিষ্ট ফ্লোরের সেই ভিআইপি কেবিনের সম্মুখে এসে দাঁড়াল।
সেখানে আনোয়ার খানের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী আর কিছু রাজনৈতিক নেতাকর্মীর ভিড়। তিয়াশাকে চিনে উপস্থিতি সকলে। তাই লোকজন সমীহ নিয়ে ওকে ভেতরে যাওয়ার পথ ছেড়ে দিল।কেবিনের সুউচ্চ কাঠের দরজার মাঝখানে বসানো স্বচ্ছ কাঁচের ওপারেই নিবদ্ধ হলো তিয়াশার প্রখর ও ব্যাকুল নেত্র জোড়া। সম্মুখের শ্বেতশুভ্র শয্যায় নিথর, নিস্পন্দ হয়ে শুয়ে আছে এই শহরের একদা দাপুটে ও দুর্ধর্ষ পুরুষ আরাভ খান। ললাট জুড়ে জড়িয়ে আছে ধবধবে সাদা ব্যান্ডেজ, যার এক কোণে সামান্য রক্তিম আভা উঁকি দিচ্ছে। ওর সেই চিরচেনা উগ্রতা, অহংকার আর বাহুবলের দাপট আজ এক কৃত্রিম অক্সিজেন মাস্কের নিচে সম্পূর্ণ স্থবির। ও কি বেঁচে আছে, নাকি মৃত্যুর হিমশীতল পরশ ওকে গ্রাস করেছে—তা বলা বড় দায়!
তিয়াশা যখন কাঁচের গায়ে নিজের কম্পিত হাত দুটি রেখে পাথরের মূর্তির ন্যায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, ঠিক তখনই লঘু পদক্ষেপে ওর দুই পাশে এসে দাঁড়াল আদ্রিতা আর সাঈদ। ওদের আননেও একরাশ মেঘের ছায়া, রাতের পরিকল্পনার সমাপ্তি যে এমন এক বীভৎস বাস্তবতায় রূপ নেবে, তা ওদের কল্পনাতেও ছিল না।
সাঈদ প্রলম্বিত নিঃশ্বাস ত্যাগ করে আদ্রিতা কে তিয়াশার সামলানোর ভার দিয়ে প্রস্থান করল। আদ্রিতা এগিয়ে এসে আলতো হাতে জড়িয়ে ধরল তিয়াশাকে। কাছের জনের সঙ্গ পেতেই হু হু কেঁদে উঠলো তিয়াশার অন্তর;শ্রাবণের মেঘ ভাঙা অবিরল ধারার ন্যায় দুই অক্ষিপট বেয়ে অশ্রুর বন্যা নেমে এলো। এতদিনের পুঞ্জীভূত অভিমান, ইগো আর জেদের কঠিন বরফ আজ এই হাসপাতালের হিমশীতল করিডোরে এসে এক নিমেষে গলে জল হয়ে গেল।
ও আদ্রিতার বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে অবরুদ্ধ কণ্ঠে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। থরথরিয়ে কাঁপছে ওর ক্ষীণ কায়া।আদ্রিতা পরম মমতায় তিয়াশাকে নিজের বাহুডোরে আগলে নিয়ে করিডোরের এক কোণে থাকা সুপ্রশস্ত সোফাটায় বসাল। ওর পিঠে হাত বুলিয়ে অত্যন্ত সান্ত্বনার ছলে বলল,,
— শান্ত হ, তিয়াশা! নিজেকে এভাবে ভেঙে ফেলিস না, দোস্ত। ডক্টর বলেছেন ও জাস্ট আন্ডার অবজারভেশন। ইন্টারনাল ইনজুরি তেমন একটা সিরিয়াস নয়। তুই যদি এভাবে রিয়্যাক্ট করিস, তবে আঙ্কেল-আন্টি এখানে এলে পরিস্থিতি আরও কমপ্লিকেটেড হয়ে যাবে।
তিয়াশা নিজের সজল চোখ দুটো মুছে নিয়ে, কাঁপানো ওষ্ঠাধর কামড়ে ধরে ব্যাকুল কণ্ঠে শুধাল,,
— কিন্তু ওনার এই অবস্থা কীভাবে হলো, আদ্রু? কালকেও তো নিউজ দেখছিলাম একটা ব্রিফিংয়ে অংশগ্রহণ করেছেন উনি। হঠাৎ মাঝ রাতে এমন!
— এটা রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সংঘাত। কখন কি ঘটে, বলা দায়! মোদ্দা কথা সাইদ ভাইয়ের কাছ থেকে যতটুকু জানতে পারলাম আরাভ ভাই, অলওয়েজ তোর চিন্তায় মশগুল থাকতো। এক্সট্রা সিকিউরিটি ও কখনো ইউজ করে নাই। এমনিতেই কিছুদিন আগে নির্বাচন হয়েছে শত্রুর অভাব নেই। তার উপর, ঘরের লোক হয়ে তুইও যদি এমন করিস!
কান্না তোপে ভেঙ্গে আসতে চাইলো তিয়াশার কণ্ঠস্বর। আদ্রিতার এই চিরন্তন সত্য বাক্যবাণটি হৃদয়ের সজোরে আঘাত করেছে ওর।নিজের অবাধ্য অশ্রুধারাকে সংবরণ করার ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়ে ও কাতর কণ্ঠে বলল,,
— কিন্তু আদ্রু, আমি তো ওনাকে ঘৃণা করতে চেয়েছিলাম। ওনার ওই জবরদস্তিমূলক অতীতকে আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না।
আদ্রিতা তিয়াশার দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে বড্ড মর্ডান অথচ বাস্তববাদী টোনে বলল,,
— জেদ আর আত্মসম্মানের মাঝে একটা সূক্ষ্ম দাগ থাকে, তিয়াশা। তুই নিজেকে আড়াল করতে গিয়ে আসলে নিজের অনুভূতিটাকেই হ’ত্যা করছিলি। আরাভ ভাইয়ের শুরুর মেথড ভুল ছিল, কিন্তু ওনার ভালোবাসার শুদ্ধতা তো আজ এই ব্যান্ডেজের রক্তিম আভার মতোই স্পষ্ট। এখন আর অতীত নিয়ে পোস্ট-মর্টেম করে লাভ নেই, দোস্ত। জাস্ট অ্যাকসেপ্ট দ্য রিয়্যালিটি।
তিয়াশা কোনো প্রত্যুত্তর করতে পারল না, কেবল এক বুক নিঃসীম হাহাকার ওর কণ্ঠরোধ করে দিল।এমন সময় করিডোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে সেখানে উপস্থিত হলো আরাভের বন্ধু মহল—আবির, রাফসান,আরিয়ান আর সাঈদ। ওদের কারো হাতে ফলের ঝুড়ি, কারো চোখে ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ। তিয়াশাকে ওমন বিধ্বস্ত অবস্থায় সোফায় উপবিষ্ট দেখে ওরা ক্ষণকালের জন্য থমকে দাঁড়াল। অতঃপর একে একে সালাম ঠুকলো,
— আসসালামু আলাইকুম, ভাবী।
তিয়াশা শূন্য দৃষ্টি মেলে ওদের দিকে চাইল। লোকলজ্জা আর জড়তার ঊর্ধ্বে গিয়ে ও কোনোমতে ওষ্ঠাধর নাড়িয়ে অত্যন্ত ক্ষীণ কণ্ঠে সালামের জবাব দিল,,
— ওয়ালাইকুম আসসালাম।
রাফসান তিয়াশার এই সকরুণ দশা দেখে কিঞ্চিৎ সান্ত্বনার সুরে বলল,,
— ভাবী, আপনি একদম প্যানিকড হবেন না। ও বড্ড শক্ত জান, আমাদের ছেড়ে এত সহজে কোথাও যাবে না। আপনি এসেছেন, এখন দেখবেন ও খুব জলদি রেসপন্স করবে।
ওরা আর তিয়াশাকে বিব্রত না করে ধীর পদক্ষেপে একটু দূরে গিয়ে বসলো।
বেশ কিছুক্ষণ পর…..
কেবিনের দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রবীণ চিকিৎসক। ওনার অবয়বে পূর্বের গাম্ভীর্য কিছুটা শিথিল, ওষ্ঠাধরে এক চিলতে আশ্বাসের ক্ষীণ রেখা।সাঈদ হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে গিয়ে ব্যাকুল কণ্ঠে শুধাল,,
— ডক্টর, আরাভের কন্ডিশন এখন কেমন? ও কি রেসপন্স করছে?
ডক্টর হক মৃদু হেসে বললেন,,
— মিরাকলি পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে। হি ইজ আউট অফ ডেঞ্জার নাও। তবে ওনার পালস রেট এখনও কিছুটা ফ্লাকচুয়েট করছে। আপনারা চাইলে একজন ওনার সাথে দেখা করতে পারেন, বাট ডোন্ট মেক অ্যানি ক্রাউড।
‘জ্ঞান ফিরেছে’ শব্দবন্ধটি শ্রবণগোচর হওয়ামাত্রই তিয়াশা আর কারো অনুমতির অপেক্ষা করল না, নিজের সামাজিক জড়তা কিংবা লৌকিকতার সমস্ত শিকল এক ঝটকায় ছিন্ন করে ও ঝড়ের বেগে কেবিনের দ্বার উন্মুক্ত করে ভেতরে প্রবেশ করল। তীব্র সে গতি স্তিমিত হলো শ্বেতশুভ্র শয্যার কিনারায় এসে। সম্মুখের দৃশ্য দেখে ওর হৃৎস্পন্দন যেন ক্ষণিকের তরে থমকে গেল।
আরাভের মুখে তখনো জড়িয়ে আছে সেই প্লাস্টিকের অক্সিজেন মাস্ক, ললাটের শুভ্র ব্যান্ডেজের এক কোণে তাজা র/ক্তের ম্লান দাগটি এখন আরও বেশি স্পষ্ট। তবে ওর সেই প্রখর চক্ষুদ্বয় এখন উন্মুক্ত। তিয়াশাকে ওমন আলুথালু বেশে, অশ্রুসিক্ত নয়নে হুট করে কক্ষের মাঝে আবির্ভূত হতে দেখে আরাভের নেত্রজোড়া বিস্ময়ে বিস্ফোরিত হলো।
তিয়াশা নিজের ভেতরের সমস্ত অভিমান আর জেদের পাহাড়কে এক নিমেষে ধূলিসাৎ করে দিয়ে অবুঝ বালিকার ন্যায় শয্যার ওপর আছড়ে পড়ল। ও আরাভের অক্ষত চওড়া বক্ষপঞ্জরে নিজের মুখ গুঁজে দিয়ে এতদিনের পুঞ্জীভূত কান্না উগরে দিল। থরথরিয়ে কাঁপতে থাকা তিয়াশাকে নিজের বুকের মাঝে ফিরে পেয়ে আরাভ সমস্ত শারীরিক যন্ত্রণা ভুলে গেল।
ও বড্ড ক্লিষ্ট হস্তে তিয়াশার পিঠে নিজের ডান হাতখানা রাখল। অক্সিজেন মাস্কের আড়ালেও, ওর ওষ্ঠাধরের কোণে এক পরম তৃপ্তির মলিন হাসি ফুটে উঠল। ও অত্যন্ত ধীরহস্তে নিজের মুখের মাস্কটি সামান্য সরিয়ে বড্ড ভাঙা, ক্ষীণ স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল,,
— হেই, রিল্যাক্স জান! আই অ্যাম অ্যালাইভ। তুমি কাঁদছ কেন বলো তো?
থামার কোনো লক্ষণ নেই তিয়াশার। ও তখনো অবুঝের মতো আরাভের বক্ষপঞ্জরে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে চলেছে, যেন আজ এই বক্ষ-খাঁচার নিরাপদ আশ্রয়টুকু ছেড়ে দিলে চরাচরের কোনো এক প্রলয় এসে ওকে চিরতরে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।আরাভ নিজের বাম হাতের স্যালাইনের সূঁচটার তীব্র টান উপেক্ষা করে, অলৌকিক এক শক্তিবলে তিয়াশার কাঁধ দুটি আলতো করে চেপে ধরল।
ওর দীর্ঘাঙ্গ শরীরটা যন্ত্রণায় কিঞ্চিৎ কুঁকড়ে গেলেও ওষ্ঠাধরে সেই চেনা হাসিটা ফুটিয়ে ক্লিষ্ট স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল,,
— হেই, জাস্ট স্টপ ইট, তিয়াশা! তুমি কি আমাকে বাঁচাতে এসেছ, নাকি এই কান্নার তোড়ে হার্ট অ্যাটাক করিয়ে মারতে এসেছ বলো তো? এমন করলে তো আমার পালস রেট আরও ফ্লাকচুয়েট করবে, সুইটহার্ট!
আরাভের ওমন রসিকতাভরা, ক্ষয়াটে কণ্ঠস্বর শ্রবণমাত্রই তিয়াশা ঝটকা দিয়ে ওর বুক থেকে মাথা তুলল। ওর ডাগর চোখের কোণে তখনো শ্রাবণের অবিরল ধারা, নাকের ডগাটি যন্ত্রণার তীব্র লালিমায় আরক্তিম। ও নিজের অবিন্যস্ত ওড়নাটা একহাতে শক্ত করে চেপে ধরে, ভেতরের সমস্ত অপরাধবোধ আর জমানো জেদ উগরে দিয়ে ঝাঝালো কণ্ঠে বলল,,
— মিস্টার খান, আপনি বড্ড বেশি নিষ্ঠুর! আপনার এই খামখেয়ালি আর বেপরোয়া ভাবটার জন্য আজ আপনার এই অবস্থা। কেন আপনি নিজেকে নিয়ে এতটা কেয়ারলেস?
আরাভ এক পলক তিয়াশার ওই অভিমানী মুখশ্রী পর্যবেক্ষণ করল। ওর আধবোজা চোখের মণি জোড়ায় তখন এক মহাসমুদ্র জয় করার পরম তৃপ্তি। ও বড্ড ধীর পায়ে তিয়াশার একখানা কাঁপতে থাকা হাত নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিয়ে, নিচু ও আর্দ্র স্বরে বলল,,
—বাট একদিক আজ থেকে ভালোই হয়েছে কিন্তু,জানেমান।
তিয়াশা নির্বোধের ন্যায় বলল,
— মানে?
— মানে এই যে,কতদিন পর তোমাকে দেখলাম। তুমি নিজ থেকে এসেছো। অজ্ঞাতসারেই আমার বক্ষে নিজের জায়গা বুঝে নিয়েছো। ট্রাস্ট ম্যি জানু,আজ যদি এই লেদারের জ্যাকেটটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে আমার বুকটা ঝাঁঝরা হয়ে যেত, তবুও এই আরাভ খানের কোনো আক্ষেপ থাকত না। কারণ আমি জানতাম, আমার এই নিথর দেহটা দেখার পর হলেও তোমার ওই পাথুরে মনের কঠিন ইগোটা ভেঙে চুরমার হতে বাধ্য হতো। তুমি আসতেই!
তিয়াশা এবার এক আদিম জড়তায় নিজের ওষ্ঠাধর কাঁমড়ে ধরে মুখটা সামান্য ঘুরিয়ে নিল; অত্যন্ত মৃদু স্বরে আওড়াল,,
ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২০
— চুপ করুন! বড্ড বেশি কথা বলেন আপনি।
আরাভ আর কথা বাড়াল না। ও পরম মমতায় তিয়াশার রেশম কোমল চুলগুলোর মাঝে নিজের আঙুল ডুবিয়ে দিয়ে এক বুক তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
