ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২১ (৩)
নওরিন কবির তিশা
অশনি ঘূর্ণিঝড়ের ন্যায় চারিদিক প্রবল গতিতে ঘূর্ণায়মান তিয়াশার। অনাকাঙ্ক্ষিত সত্যগুলো হজমে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে তাকে। ধূম্র জালের ন্যায় ওর চতুর মস্তিষ্ক আষ্টেপিষ্টে বেঁধে ফেলছে সহস্র রহস্যের জট। জ্ঞান সীমানার পরিধি অনুসারে জয়নব ম্যাম বহুকাল যাবত তাদের প্রাথমিক বিদ্যালয় এর প্রধান শিক্ষিকা পদে নিযুক্ত একজন একাকী রমণী। অবশ্য তার অতীত জীবন সম্বন্ধে ধোঁয়াশা রয়েছে।
তবে ধোঁয়াশার অন্তরালে এহেন বিস্ফোরক সত্যের অবস্থান ঘুনাক্ষরেও কল্পনা করেনি ও। প্রচন্ড মানসিক চাপে মাথা ব্যথা শুরু হওয়ার জোগাড়। পারিবারিক সমস্যা থাকতেই পারে। তবে, স্বাভাবিক সে ঘটনাটাকে এমন বীজগণিতীয় জটিল সমীকরণে পরিণত একমাত্র তিয়াশার মস্তিষ্কই করতে পারে।
কক্ষের দক্ষিণে অবস্থিত প্রশস্ত ঝুল বারান্দায় একাকী দাঁড়িয়ে তিয়াশা। অস্তরবির লালিমা গ্রাস করেছে নীল দিগন্ত। সূর্য্যি মামার পাটে নামার তোড়জোড়ে তৎপর আকস্মিক কক্ষ হতে নির্গত মৃদু গুঞ্জনে তিয়াশা জলদি পদক্ষেপে কক্ষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল। দুপুরে একটা কড়া ডোজের মেডিসিন নেওয়ার পর থেকেই আরাভ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। ও জেগেছে কিনা, তা দেখার জন্যই মূলত তিয়াশার এহেন দ্রুততর আগমন।
তবে কক্ষে প্রবেশ করতেই ওর ডাগর চক্ষুদ্বয় বিস্ময়ে কিঞ্চিৎ সংকুচিত হলো। শয্যার এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক সম্পূর্ণ অপরিচিত, অল্পবয়সী ও বেশ রূপসী এক তরুণী। পরনে নার্সের শ্বেতশুভ্র পোশাক। তিয়াশাকে ওমন অতর্কিতে ঘরে ঢুকতে দেখে মেয়েটি কিছুটা থতমত খেয়ে নিজের অ্যাপ্রনটা টেনে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তিয়াশা নিজের ওষ্ঠাধর শক্ত করে চেপে, কণ্ঠে একরাশ গাম্ভীর্য ফুটিয়ে শুধাল,,
— কে আপনি? এখানে কী করছেন?
মেয়েটি মৃদু হেসে অত্যন্ত বিনয়ী সুরে জবাব দিল,
— ম্যাডাম, আমি আনোয়ার স্যারের রেফারেন্সে এসেছি। আরাভ স্যারের প্রপার মেডিসিন আর ড্রেসিংয়ের জন্য উনি আমাকে পার্মানেন্টলি অ্যাপয়েন্ট করেছেন।
কথাটি বলতে বলতে নার্সটি যেভাবে শয্যাশায়ী আরাভের সুঠাম অবয়বের পানে এক অদ্ভুত মুগ্ধ নেত্রে চাইল, তা তিয়াশার প্রখর দৃষ্টি এড়াল না। বুকের ঠিক মাঝখানটায় কেমন যেন এক তীব্র মোচড় দিয়ে উঠল ওর। এক অজানা, অযাচিত অধিকারবোধ আর পরশ্রীকাতরতা মুহূর্তেই গ্রাস করল তিয়াশার সর্বাঙ্গ;জেদি গলায় ও বলল,,
— ওনার চিকিৎসার জন্য আমি একাই যথেষ্ট। কোনো এক্সট্রা নার্সের প্রয়োজন নেই এই ঘরে। আপনি এখন আসতে পারেন, আমি ওনাকে নিজেই দেখে নেব।
তিয়াশার এমন অগ্নিশর্মা ও চড়া কণ্ঠস্বরে আকস্মিক অবচেতনার সমাপ্তি ঘটিয়ে চোখ মেলে চাইল আরাভ। অবশ্য,আদতেও অবচেতন ছিল কিনা বলা দায়! কক্ষে দৃষ্টি বুলিয়ে পরিস্থিতি অনুধাবন করে প্রখর চক্ষুদ্বয়ে এক চিলতে দুষ্টু হাসির রেখা খেলে গেল। ভাঙা, ক্ষীণাভ কণ্ঠেই ও বাঁকা হেসে নার্সটির দিকে চেয়ে বলল,,
— আরে না না! আপনি কেন যাবেন? আপনি থাকুন। আমার বউ তো বড্ড জেদি, ও নিজের খেয়াল রাখতেই ব্যস্ত, আমার পরোয়া ও কবেই বা করল! আপনিই বরং আমার মেডিসিনের চার্টটা মেইনটেইন করুন।
আরাভের এমন খামখেয়ালি আর উস্কানিমূলক বাক্যে তিয়াশার ললাটে রাগের তীব্র লালচে আভা ফুটে উঠল। ও এক জোড়া জ্বলন্ত দৃষ্টি আরাভের পানে নিক্ষেপ করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,,
— জাস্ট স্টপ!
আরাভ বিছানায় সামান্য নড়েচড়ে বসে, তিয়াশার ওই অগ্নিশর্মা মুখশ্রী পরম তৃপ্তিতে অবলোকন করতে করতে মনে মনে হাসল। তবুও মুখে স্বাভাবিকতা বজায় রেখে বলল ,,
– এত রাগের কি আছে? এমনিতেই তো তুমি আমার কোনো কেয়ার করো না। আমার কোন ব্যাপারেই তোমার কোন মাথাব্যথা নেই।
তিয়াশা ক্ষুব্ধ দৃষ্টি হেনে চাইলো আরাভের পানে।আরাভ সদ্য ভূমিষ্ঠ বাচ্চাদের মতো নিষ্পাপ মুখ করে বললো,,
– আমি আবার কি করলাম?
– আপনাকে বলেছি না চুপ থাকতে! এত বেশি কথা বলেন কেন আপনি?
আরাভ মুখে কুলুপ আঁটলো। তিয়াশা কোনোমতে নিজের শত মাত্রার তুঙ্গে চড়া মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে নার্স’টির দিকে চাইলো। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে সঙ্গে সঙ্গে মাথা নুইয়ে নিলো মেয়েটি। কণ্ঠস্বর খাঁদে নামিয়ে বলল,,
– আমার কিছু করার নেই, ম্যাম। আনোয়ার স্যার কিংবা আরব স্যারের নির্দেশনা ব্যতীত আমি কোথাও যেতে পারবো না।
তিয়াশা এক কদম এগিয়ে এলো, যথাসম্ভব মার্জিত স্বরে দাম্ভিকতার সহিত বলল,,
– আর আমি মিসেস আরাভ খান। আপনাকে নির্দেশ করছি এক্ষুনি রুম ছেড়ে বেরিয়ে যেতে। নয়তো….।
কথার ইতি না টেনেই থামলো তিয়াশা। প্রলম্বিত শ্বাস টেনে বলল,,
– জ্ঞানীর জন্য ইশারায় যথেষ্ট। আশা করি বুঝেছেন?
মেয়েটি আর কথা বাড়ানোর সাহস করলো না। ত্রস্ত পায়ে জলদি স্থান ত্যাগ করলো সে।মেয়েটি চলে যেতেই তিয়াশার অগ্নি দৃষ্টি আরাভের পানে নিবদ্ধ হলো,
– কি হলো? ও দিকে ঘুরে শুয়ে আছেন, কেনো? এদিক ফিরুন। বলুন, আগে যেনো কি বলছিলেন?
আরাভ বেচারা কাচুমাচু ভঙ্গিতে বলল,,
– ক- কই? কি বলছিলাম?
তিয়াশা ওর দিকে তেড়ে এসে বলল,,
– এ্যাহ? নাটক করবেন না একদম। খুব শখ তাই না? যুবতী মেয়েদের সান্নিধ্যে থাকার? তাহলে আমাকে বিয়ে করেছিলেন কেন? অসভ্য-ইতর-বদমাইশ লোক একটা!
গালাগালির চূড়ান্তে ওর কথা লাগাম টানল আরাভ,,
– ওই,ওই সুইটহার্ট ওই? কি বললে আবার বলো? এখন কি বলতে চাইছো তোমার কাছ থেকে আমি নিজের স্বামীর অধিকার গ্রহণ করি?
– অফকোর্স…!
আর কথা বাড়াতে পারল না তিয়াশা। মোক্ষম সময়ে জব্দ করেছে আরাভ। কথার মর্মার্থ বুঝে লাজুকতা কিংবা অস্বস্তিরা বেষ্টন করলো তাকে। চটজলদি পদক্ষেপে কক্ষ ত্যাগ করল ও। পিছে পড়ে রইল আরাভের দুষ্টুমি মিশ্রিত চাপা হাসি।
সায়াহ্নের সমাপ্তি ঘোষণা করে তিমিরে ঢাকা পড়ছে চারপাশ। রজনীর আগমণে, কিচিরমিচির শব্দ তুলে নীড়ে ফিরছে পাখির দলবল। আদ্রিতা ঝুল বারান্দার দোলনায় বসে আনমনে কি যেন ভাবছিলো। এমন সময় হুটহাট ওর মুঠোফোনটি তীব্র কম্পনে সজাগ হয়ে উঠল। স্ক্রিনে সাঈদের নাম ভাসতে দেখে ও কিছুটা বিস্মিত হয়েই কলটা কানে নিল। ওপাশ থেকে কোনো ভূমিকা ছাড়াই সাঈদের গম্ভীর ও চড়া কণ্ঠস্বর ভেসে এল,,
— নিচে আসো আদ্রিতা, আমি তোমার বাসার গেটের সামনে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
আদ্রিতা বড্ড অবাক হয়ে জানালার কাঁচ গলে নিচে তাকানোর চেষ্টা করল, তবে অন্ধকারে কিছুই দৃশ্যমান হলো না। ও কিঞ্চিৎ কুণ্ঠিত স্বরে শুধাল,,
— এখন? এমন সময় হঠাৎ কী কারণে নিচে যাব, বলুন তো?
সাঈদ ওপাশ থেকে এক তীব্র ধমক দিয়ে বড্ড মেজাজি কন্ঠে বলল,,
— এই মেয়ে! তোমাকে কি আমি এখানে প্রেম-আলাপ করতে ডাকছি? কাজের কথা আছে বলেই আসতে বলেছি, চুপচাপ নিচে এসো!
এমন কড়া ধমক শুনে আদ্রিতার ফর্সা ললাট জুড়ে রাগের আভাস ফুটে উঠল। তবুও এক অজানা কৌতূহল আর দোলাচল বুকে চেপে ও ধীর পায়ে নিচে নেমে মেইন গেটের বাইরে এসে দাঁড়াল। ব্ল্যাক পালসার বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাঈদ আদ্রিতাকে দেখামাত্রই পকেট থেকে একটা ছোট্ট প্যাকেট বের করে ওর দিকে এগিয়ে দিল।
আদ্রিতা ভ্রু কুঁচকে বললো,
– এতে কি?
– নিতে বলেছি?
ফের চড়া ধমকের কপালের ভাঁজরেখা উবে গিয়ে ভয়েরা খুঁটি গাড়লো। দ্বিধান্বিত হাতে প্যাকেটটা খুলে দেখল, সেখানে তারই হারিয়ে যাওয়া ব্রেসলেটটা। ল্যাম্পপোস্টের হলুদাভ আলোয় জ্বলজ্বল করছে রুপোলি অলঙ্কারটা। গতকাল হাসপাতাল থেকে ফেরার পর থেকেই লাপাত্তা ছিলো সেটা। দুশ্চিন্তার সমাপ্তি ঘটতেই প্রসরিত হাসির রেখা ফুটলো ওষ্ঠাধর প্রান্তে। কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে সাইদের দিকে চেয়ে বলল,
— এটা তো আমার। হারিয়েই গিয়েছিল! থ্যাংক …..
সাইদ ওর কথা শেষ করতে না দিয়েই চট করে বাইকে উঠে স্টার্ট দিল। হেলমেটের গ্লাসটা নামানোর আগে ও বাঁকা হেসে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,,
— ধন্যবাদ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই, মিস। আগেই বলেছি, প্রেমে আলাপ করতে ডাকিনি যে সবসময় পাশে দাঁড়িয়ে ভয় পেয়ে কাঁপবে! ভালো থেকো।
কথাটা শেষ করেই সাইদ তীব্র গতিতে বাইক ছুটিয়ে অন্ধকারের মাঝে বিলীন হয়ে গেল। আদ্রিতা নিজের হাতের ব্রেসলেটটার দিকে চেয়ে খুশি হওয়ার পরিবর্তে সাইদের প্রস্থান পথের আঁধারে চেয়ে অনুশোচনায় দগ্ধ হলো।
নৈশভোজে আজ উপস্থিত থাকতে পারেনি বাড়ির মধ্যমণি আরাভ। অবশ্য কারণটা অজ্ঞাত নয় অসুস্থতার দরুন বার বার সিঁড়ি ভাঙ্গা সম্ভব নয় তার পক্ষে। যার কারনে জীবনে প্রথমবার তিয়াশার নিজ হাতে আনা খাবার হয়তো ভাগ্যে জুটতে চলেছে তার। বিস্তার কক্ষের বিশাল নৈঃশব্দ্য ভাঙছে ঘড়ির কাটার টিকটিক ধ্বনি। জানান দিচ্ছে রাত দশটার।
আকস্মিক কারো পদচারনার শব্দে নিস্তব্ধতা সম্পূর্ণরূপে বিদীর্ণ হলো। বদ্ধ আঁখিযুগল মেলে আরাভ দেখল তার একান্ত ব্যক্তিগত রমনীটি ট্রেতে খাবারের পসরা সাজিয়ে কক্ষের দিকে এগিয়ে আসছে। হৃদয় জুড়ানো দৃশ্য। তিয়াশা কক্ষে প্রবেশমাত্র খাবারগুলো বেড সাইড টেবিলে রাখলো। বেশ শব্দ করেই। আরাভের দিকে আড়দৃষ্টি নিক্ষেপ পূর্বক বললো,,
– আপনার স্যুপ।
আরাভ তাকিয়েও তাকালো না। তিয়াশা অক্ষ ত্যাগ করার পূর্বে একঝলক পিছে চাইলো। আরাভের এহেন নির্জীবতা উদ্বিগ্ন করলো তাকে। কিঞ্চিৎ উদ্বিগ্নভরে ও এগিয়ে এসে বলল,,
– কি হয়েছে? অসুস্থ লাগে?
আরাভ যেন এই মুহূর্তটারই অপেক্ষা করছিল। ও চোখ নািয়েই কিঞ্চিৎ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল,
— অসুস্থ তো হবই না! নার্সটা কত যত্ন করে আমাকে ওষুধ খাইয়ে দিত, ড্রেসিং করে দিত। কিন্তু কার যেন সহ্য হলো না! তাকে তো তাড়িয়ে দেওয়া হলো। এখন আমার কী হবে? আমি হাত নাড়িয়ে খেতে পারছি না, ব্যথায় ম’রে যাচ্ছি, আর কারও কোনো খবরই নেই!
তিয়াশা বুঝতে পারল আরাভ ইচ্ছে করেই ওকে শোনানোর জন্য এই সমস্ত ন্যাকামি করছে। ও চোখ জোড়া সরু করে বলল,
— মিস্টার খান, আপনার এই আদিখ্যেতা এবার বন্ধ করুন তো! হাত নাড়িয়ে কথা বলতে পারছেন, ঝগড়া করতে পারছেন, আর খাওয়ার সময় হাত চলছে না? নাটক করার একটা সীমা থাকে!
আরাভ মুখটা আরও করুণ করে বলল,
— নাটক করছি না তিয়াশা, সত্যিই বড্ড লেগেছে। তুমি তো নার্সটাকেও রাখতে দিলে না। তাহলে এখন কী করে খাব? তুমিই বলো, কী চাচ্ছ তুমি?
তিয়াশা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেড সাইড টেবিল থেকে বাটিটা তুলে নিল। রাগী মুখে বলল,,
— চাচ্ছি যে আপনি চুপচাপ এই স্যুপটা গিলুন!
— চামচটা মুখে তুলে দেওয়ার মতো মানুষ কই এ ঘরে?
আরাভ এবার চতুর হেসে চোখের ইশারা করল। তিয়াশার ঝগড়া করার ইচ্ছা কিংবা শক্তি নেই মোটেও। ও আর কথা না বাড়িয়ে শয্যার পাশে এসে বসল। চামচে করে খানিকটা স্যুপ তুলে আলতো করে ফুঁ দিয়ে আরাভের মুখের সামনে ধরল। গম্ভীর সুরে বলল,
— নিন, মুখ খুলুন। আমি আপনাকে খাইয়ে দিচ্ছি। আর একটাও বাজে কথা বললে কিন্তু বাটি সুদ্ধ ফেলে রেখে চলে যাব!
আরাভ পরম তৃপ্তিতে তিয়াশার মুখের দিকে চেয়ে স্যুপের প্রথম চুমুকটা নিল। মিষ্টি হেসে বলল,,
– একটু প্রেম নিয়ে বললেই তো হয় মেরি জান। সবসময় কি ঝগড়া করতে ভালো লাগে বলো? আমরা এমন ঝগড়া করলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কি হবে?
তিয়াশা মেজাজ হারিয়ে বললো,,
– ফালতু কথা বন্ধ করবেন? নইলে কিন্তু!
আরাভ ঠোঁটে তর্জনী ঠেকিয়ে, মুখে কুলুপ আঁটলো।
সায়াহ্নের সেই তিক্ত বিদায়ের পর কেটে গেছে বেশ কিছু ঘণ্টা। ঘরের কোণে নিভু নিভু আলোয় আদ্রিতা স্তব্ধ হয়ে বসে আছে, আর ওর তপ্ত অশ্রু ফোঁটায় ভিজে চলেছে সাইদের ফিরিয়ে দেওয়া সেই রূপোলি ব্রেসলেটটা। বুকের ভেতরটা এক অজানা অপরাধবোধে তোলপাড় করা মাত্রই ও কাঁপতি হাতে বারবার সাঈদের নম্বরে ডায়াল করে চলল।
কিন্তু ওপাশ থেকে প্রতিবারই সেই যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর জানিয়ে দিচ্ছে-‘নম্বরটি ব্যস্ত আছে’। আদ্রিতার বুঝতে বাকি রইল না যে, সাইদ ওকে চিরতরে ব্লক লিস্টের অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। তীব্র অনুশোচনায় দগ্ধ হতে হতে ও শূন্য দৃষ্টিতে জানালার ওপারে তাকাল; সাইদের ওই চড়া ধমকের আড়ালে থাকা নিঃস্বার্থ সত্তাটা ও কেন আগে বুঝতে পারল না, এই আফসোসটাই এখন ওকে তিমিরের মতো গ্রাস করছে।
পরের দিনের রৌদ্রোজ্জ্বল মধ্যাহ্ন। তিয়াশাকে আজ অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় কিছু নথিপত্রের তাগিদে একবার কলেজে যেতেই হয়েছিলো। সেখান থেকে হন্তদন্ত হয়ে ফিরেই ও ধীর পায়ে দুপুরের খাবার নিয়ে আরাভের কক্ষে প্রবেশ করল। আরাভের ক্ষতগুলো এখনো পুরোপুরি শুকায়নি, তাই গতকালের মতোই তিয়াশা বাধ্য মেয়ের মতো শয্যার পাশে বসে তাকে পরম যত্নে খাইয়ে দিতে লাগল।
ঘরের ভেতরের পরিবেশটা আজ বেশ শান্ত। খাওয়ানোর শেষ পর্যায়ে, চামচটা বাটিতে রেখে তিয়াশা যখন পানির গ্লাসটা আরাভের দিকে এগিয়ে দিল, ঠিক তখনই আরাভ ওর চোখের দিকে চেয়ে অত্যন্ত গম্ভীর ও কৌতূহলী স্বরে শুধাল,,
– তুমি ফরিদা খানকে আগে থেকে চিনতে?
কথাটা শোনামাত্রই তিয়াশা ভ্রু কুঁচকে বিস্ময়ভরা কণ্ঠে পালটা প্রশ্ন করল,,
– ফরিদা খান? কোন ফরিদা খান?
আরাভ তিয়াশার এমন বিভ্রান্ত মুখচ্ছবি অবলোকন করে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বিছানায় সামান্য সোজা হয়ে বসে শান্ত গলায় বলল,,
– গতদিন যে বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা হাসপাতালে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন, তিনিই ফরিদা খান। কিন্তু তোমার কাছে শোনার কারণ, তোমার তাকানোর ধরনটা আমার নরমাল লাগেনি।
আরাভের মুখ থেকে এই বিস্ফোরক তথ্যটি শোনা মাত্রই তিয়াশার মাথায় চট করে জয়নব ম্যামের কথা খেলে গেল। ও নিজের বিস্ময় চেপে রাখতে না পেরে থতমত খেয়ে বলল,,
— উনি! উনি ফরিদা খান? কিন্তু উনি তো আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা, জয়নব ম্যাম! আমরা তো ওনাকে জয়নব নামেই চিনি।
আরাভের ওষ্ঠাধরে এবার এক চিলতে তাচ্ছিল্য আর বিষাদের হাসি ফুটে উঠল। ও জানালার ওপারে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে মৃদু স্বরে বলল,,
– তাহলে সময়ের সাথে সাথে উনি নিজের নামের পরিচয়টাও বদলে ফেলেছেন!
– মানে?
আরাভ নিস্পৃহ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালো,,- কিছু না। যাই হোক তুমি খেয়ে নিও। বেলা হয়েছে অনেক।
রহস্যের জট ছাড়ালেও পুরোপুরি বোধগম্য হওয়ার উপযুক্ত হলো না প্রাপ্ত তথ্য। তিয়াশা প্রচন্ড ধাক্কা খাওয়া সত্ত্বেও বাধ্য মেয়ের মাথা নাড়িয়ে বেরিয়ে গেল কক্ষ ছেড়ে।
কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে আদ্রিতার মনটা কোনোমতেই শান্ত হতে চাইল না। বুকের ভেতর কালবৈশাখী ঝড়ের মতোল ওলটপালট করে দেওয়া অনুশোচনা আর সাইদের ওই রুক্ষ অথচ যত্নশীল আচরণ ওকে ঘরে টিকতে দিল না। ও তড়িঘড়ি করে একটা সাধারণ সালোয়ার-কামিজ গলিয়ে, ধুকপুক করতে থাকা বুকটা চেপে ধরে দ্রুত পায়ে ক্লাবের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
বিকেলের পড়ন্ত রোদ তখন ক্লাবের মাঠের সবুজ ঘাসের ওপর এসে পড়েছে। ক্লাবের বিশাল লোহার গেটের সামনে এসে আদ্রিতা কিছুটা থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ভেতর থেকে ছেলেদের চ্যাঁচামেচি আর ক্যারাম বোর্ডের গুটির ঠকঠাক আওয়াজ ভেসে আসছে। আদ্রিতার মতো একটা শান্ত, মার্জিত মেয়ে সচরাচর এই সমস্ত জায়গায় একা আসে না। নিজের ওড়নাটা শক্ত করে আঙুলে পেঁচিয়ে ও কিছুক্ষণ ইতস্তত করল। তারপর গভীর একটা শ্বাস নিয়ে গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা কমবয়সী ছেলেকে ইশারায় ডাকল।
ছেলেটি আদ্রিতাকে দেখে কিছুটা অবাক হয়ে এগিয়ে এলে ও কিঞ্চিৎ কুণ্ঠিত স্বরে বলল,
— ভাইয়া, ভেতরে সাইদ আছে? ওকে একটু ডেকে দিতে পারবেন? বলবেন বাইরে কেউ একজন দেখা করতে এসেছে।
ছেলেটি মাথা নাড়িয়ে ভেতরে চলে গেল। খানিক বাদে ক্লাবের ভেতর থেকে সাইদ ধীর পায়ে বেরিয়ে এল। পরনে তার কালো টি-শার্ট, চুলগুলো কিছুটা অবিন্যস্ত। দূর থেকে আদ্রিতাকে দেখেই ওর ঘন ভ্রু যুগল কুঁচকে একাকার হয়ে গেল। ও দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে আদ্রিতার ঠিক মুখোমুখি দাঁড়াল। ওর অবয়ব জুড়ে চিরচেনা সেই গাম্ভীর্য আর মেজাজি ভাব।
সাইদ আদ্রিতাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বরাবরের মতো চড়া গলায় ধমক দিয়ে বলল,,
— এই মেয়ে! তুমি এখানে কী করছ? মাথা খারাপ হয়েছে তোমার? একটা মেয়ে একা একা ছেলেদের ক্লাবের সামনে এভাবে দাঁড়িয়ে আছে, কোনো সেন্স আছে তোমার?
অন্য দিন হলে সাইদের এমন কড়া ধমকে আদ্রিতার চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ত, ভয়ে ও ওখানেই কুঁকড়ে যেত। কিন্তু আজ আদ্রিতা দমল না। ও নিজের ডাগর চক্ষুদ্বয় সোজা সাইদের চোখের ওপর রাখল। বিন্দুমাত্র না কেঁপে, অত্যন্ত শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,,
— ধমকাবেন না মিস্টার। প্রশ্নের উত্তর দিন আগে।
সাঈদ আদ্রিতার এই আকস্মিক পরিবর্তনে এবং পাল্টা জবাবে থমকে গেল। ওর চোখের পলক যেন থমকে রইল কিছু ক্ষণ। ও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,,
– কি প্রশ্ন?
আদ্রিতা এক কদম এগিয়ে এল,,
– কাল ভুল বুঝে চলে এলেন। আমি আপনাকে ধন্যবাদটুকুও দিতে পারিনি। তারপর রাতে যখন বারবার কল করলাম,আপনি আমাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ব্লক করে দিলেন। কেন বলুন তো?
সাঈদ এবার মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে একটু রুক্ষ স্বরে বলল,,
– ইচ্ছা।আমার যা ভালো মনে হয়েছে, করেছি। এতে আপনার এত মাথাব্যথার কী কারণ, মিস আদ্রিতা?
আদ্রিতা এবার আর নিজের আবেগ লুকাতে পারল না। ও এক কদম আরও এগিয়ে এসে সাঈদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অভিমানী সুরে বলল,
– ইচ্ছা বললেই হলো? আপনি সবসময় এমন কেন করেন? যখন-তখন ধমক দেবেন, কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ব্লক করে দেবেন, এটা কেমন ভদ্রতা?
সাঈদ আদ্রিতার এমন অনর্গল আর সাহসী কথাবার্তা শুনে মনে মনে বেশ অবাক হলো। চেনা আদ্রিতার এই অচেনা রূপ ওর ভেতরের মেজাজি ভাবটাকে মুহূর্তেই যেন জল করে দিল। ও একটু আমতা-আমতা করে ললাট হাতড়ে বলল,
– ধুর! আপনার ব্রেসলেট আপনি ফেরত পেয়েছেন, ব্যস ঝামেলা খতম। আর ধমক তো দেবই! হুট করে এই ছেলেদের ক্লাবের সামনে এভাবে আসতে আপনার একটুও ভয় করল না?
– নাহ।
সাইদ কি ভেবে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে চুলে হাত বোলালো। এক অদ্ভুত মিষ্টি নীরবতা জেঁকে বসল দুজনের মাঝে। সাঈদের এই অপ্রস্তুত ভঙ্গি দেখে আদ্রিতার মনটা এক অজানা ভালোলাগায় ভরে উঠল। ও আকাশের পানে চেয়ে দেখল, সায়াহ্নের আলো ফুরিয়ে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। আদ্রিতা এবার নরম সুরে বলল,
– আচ্ছা, অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। এবার বাসায় যেতে হবে। টাটা।
– টা টা মানে?
– মানে,চলে যাচ্ছি।
– একা একা যাবে নাকি? সাহস তো বেশ বেড়েছে। দাঁড়াও চুপচাপ।আমি বাইকটা স্টার্ট দিচ্ছি, পৌঁছে দিচ্ছি তোমাকে।
আদ্রিতা আর কোনো আপত্তি করল না। এক অদ্ভুত ভালোলাগা আর প্রশান্তি যেন গ্রাস করল ওর পুরো মনটাকে। সাইদ ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ওর ব্ল্যাক পালসার বাইকটা স্টার্ট দিল। আদ্রিতা আলতো পায়ে এগিয়ে গিয়ে ওর পেছনে দূরত্ব বজায় রেখে বসল।
বাইকটা যখন ক্লাবের গেট পেরিয়ে মূল রাস্তায় এসে পড়ল, তখন সায়াহ্নের শীতল হাওয়া আদ্রিতার কপোল ছুঁয়ে যাচ্ছিল। সাঈদ হেলমেটের কাঁচটা সামান্য তুলে সামনে তাকিয়েই একটু চড়া গলায় বলল,
ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২১ (২)
— এই মেয়ে, হ্যান্ডেলটা শক্ত করে ধরে বসো। পরে আবার বলবে সাইদ ভাই স্পিডে বাইক চালিয়ে ফেলে দিয়েছে!
আদ্রিতা মৃদু হেসে সাঈদের কাঁধের কাপড়টা আলতো করে টেনে ধরল। ফিসফিসিয়ে বলল,,
— আমি কোনো কমপ্লেন করব না, আপনি চালান।
পুরোটা পথ আর কোনো কথা হলো না, শুধু এক মিষ্টি নীরবতা আর বাইকের মৃদু গর্জন সঙ্গী হয়ে রইল তাদের।
