Home প্রেমসুধা সিজন ২ প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮৮

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮৮

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮৮
সাইয়্যারা খান

সময়টা গড়িয়ে দুপুরে পড়েছে অথচ আবহাওয়া বা উষ্ণতা কোনটাই বুঝা যাচ্ছে না৷ বৈরী আবহাওয়া দেখে সবাই চিন্তিত হলেও তায়েফা খুব খুশি। ফ্লাইট ক্যান্সেল হলেই যেন তার শান্তি। তৌসিফ ফোন ঘাটতে ঘাটতে বোনের এরূপ কথা শুনে শুধু মুচকি হাসলো। শব্দ করে কোনকালেই ততটা হাসা হয় না তবে পৌষের ভাষ্যমতে সে নাকি ওকে ফেলে দিয়ে খুব মজা নিয়ে হেসেছিলো। তৌসিফেরও ঝাপসা মনে আছে তবে পুরোপুরি না। তুহিন গোসল সেরে তখন এসেছে। এসেছে দুটো মিনিট পার হয় নি সে চেঁচাতে লাগলো,
“চলেই তো যাব, না খেয়ে মারবে নাকি? আজ না ফুপাতো বোন রান্না করলো? কই গেলো ও? কোন চিপায় গিয়ে আটকা পড়লো?”
ওর কণ্ঠস্বর এতই উঁচু যে শোনা গেলো ঘরজুড়ে। তায়েফা ধমক দিলো। তুহিন থামলো না বরং গলার স্বর উঁচু করে ডাকতে লাগলো,

“পৌষ! অ্যাঁই পৌষ!”
“গোসলে বোধহয়।”
তৌসিফ সাড়াশব্দ না পেয়ে বললো। পৌষের সাথে দেখা হয় নি কয়েক ঘন্টা। রান্নাবান্না করছিলো তায়েফার সাথে। তৌসিফ দুলাভাইয়ের সাথে কথাবার্তা বলছিলো। তুহিন কপাল কুঁচকে মুখ বাঁকা করে তৌসিফের পাশে বসলো। বসেও রইলো না সে। মাথাটা ধপ করে তৌসিফের কোলে দিয়ে পা লম্বা করে টানটান করে দিলো। ঘ্যানঘ্যান করলো আবারও,
“ক্ষুধা লেগেছে আমার। না খায়িয়ে মা’রবে ফুপাতো বোনের বাচ্চা।”
তায়েফার যেন কিছু মনে পড়লো। চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে এলো তার। তৌসিফের বাহু ধরে নরম স্বরে বললো,
“পৌষের পড়াশোনা কতদূর রে তুসু?”
“চলছে আপা। অনার্স করছে এরপর মাস্টার্স। পরে যদি চায় তাহলে পিএইচডি করবে।”
“মাথা করবে আপা, মাথা। ঐ পৌষ শুধু মাথা ফাটাতে যায় ভার্সিটিতে।”
তুহিন কথার মাঝে কথা বলায় তায়েফা রাগ দেখালো। কান মুচড়ে বললো,
“তুই ঘরে যা। আমার কথা আছে তুসুর সাথে।”
“আমিও শুনব।”
“না তুই শুনবি না। যা ঘরে যা।”
“আচ্ছা, মাঝে কথা বলব না।”
“তবুও তুই যা।”
“আহা, থাকুক ও আপা।”
তৌসিফ ভাইয়ের পক্ষে বলায় তুহিন রয়ে গেলো। তায়েফা তৌসিফের মাথায় হাত বুলালো কিছুক্ষণ। একটু রয়েসয়ে বললো,

“পড়াশোনা কোনদিন সংসারে বাঁধা হয় না তুসু। আমাকে তোর দুলাভাই পড়ায় নি? আব্বা মাস্টার্স করাতে বলেছিলো তাকে। উনি আমাকে তা করিয়েন। তোর দুলাভাই এই বয়সেও আমাকে বলে আমি চাইলে যাতে কিছু করি। আমার সংসার কোনদিন বাঁধা হবে না। পৌষের সুন্দর বয়স। তোর সাথে কত মানানসই। দিনকাল এখন ভালো বল? এখন একটু নিজেদের নিয়ে ভাব৷ বাচ্চাকাচ্চা নিতান্তই আল্লাহর রহমত। রহমত হাত পেতে নিতে হয় তুসু। সময় সবসময় এক থাকবে না। আমি যাব দেশে, তোর বাচ্চা একদম ঝরঝরা করে দিয়ে তবে এখানে ফিরব। প্রয়োজনে পৌষকে এখানে নিয়ে চলে আসব। আমার কাছে থাকবে। তুই আসবি, যাবি। তোর কাছে অনেক অপশন আছে। তুই ভেবে দেখ। ভাবিস না এই বয়সে এসে আপা আমার সংসার নিয়ে কেন পড়ে আছে। সকল সিদ্ধান্ত তোদের একান্ত ব্যক্তিগত। আমি বড় বোন, আম্মু তো নেই তাই নিজের বুঝ থেকে তোকে বলছি। ইরার পর কিন্তু আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম। আমার বয়স বেড়েছিলো ফলাফল দেখ।”
বোনের কথার আগা থেকে গোড়া পুরোটাই শুনলো তৌসিফ। বুঝলোও। মাথা নেড়ে বললো,

“বুঝেছি আপা।”
“বুঝলে হবে? ভাবতেও তো হবে। পৌষের সাথে কথাবার্তা বল। আমি আজ ওকে বুঝিয়ে বলব।”
তৌসিফ তড়িৎ বেগে মানা করলো। বলে উঠলো উদ্বিগ্ন হয়ে,
“ওকে এসব বলো না। এমনিতেই ও চিন্তায় থাকে। ওকে প্রেশার দিও না পরে এটা নিয়ে ভাবতেই থাকবে। দেখা যাবে, আমাকে নিয়ে জোর করে ডাক্তার দেখাবে। আগেও এমনই করেছে।”
তায়েফার মুখ জুড়ে হাসি খেলে গেলো। প্রশ্ন করলো,
“পৌষ প্রস্তুত। কথা বলেছিলি ওর সাথে?”
তৌসিফ ক্ষুদ্র শ্বাস ফেললো। বললো,
“একদম প্রথম থেকেই বলেছিলাম। ও শোনার পর থেকেই পূরণ করতে মরিয়া আপা। ডক্টর দেখানোর কথাও তুলেছিলো। আমি কোনমতে থামিয়েছি।”
“একবার নাহয়… ”
বোনকে থামিয়ে দিলো তৌসিফ। বললো,

“কি বলবে, ডক্টর দেখাতে তাইতো? কিন্তু কেন দেখাব আপা? সময় কি ফুরিয়ে গেলো? শুধু শুধু ওকে এত কষ্ট আমি কেন দিব? ওর মা হওয়ার সময় ফুরিয়ে যায় নি। শুরুই হলো কিছু সময় ধরে।”
বোনের সাথে খুবই নরম স্বরে কথা বলছিলো তৌসিফ। এদিকে কোলে মাথা দিয়ে থাকা তুহিন পানি ছাড়া গিলেছে সেগুলো। তারও তো বাবু চাই। ওই ইনি, মিনির মতো মেয়ে বাবু চাই। পলক রাজি হচ্ছে না। এবার তো ওকে একা ফেলে রেখে এসেছে তুহিন। শিক্ষা কি পেয়েছে আদৌ ও? পায় নি বোধহয়। পেলে কি আবারও যোগাযোগ করতো পিয়াসীর সাথে? তুহিন ভাবলো অনেকিছু।

গোসলটা সেরে এসেই মাথায় হাত চেপে পৌষ বসে আছে অনেকক্ষণ যাবত। ঔষধপাতি তো বাদ যেতে দেয় নি তৌসিফ তবুও কেন এই মাথা ঘুরানি? এই লোক শুনলে এই শেষ সময়ে না আবার যাওয়া বাতিল করে ডক্টর দেখাতে নিয়ে যায়। পৌষ সন্দিহান মনে আয়নায় নিজেকে দেখলো। খুবই চিন্তিত ও। আজ খুব খারাপ লাগছে। ভেতর থেকে অস্থির লাগছে। গতরাতেও তো কত সুন্দর সময় কাটালো দু’জন তবে কি তার কারণেই এই মাথা ঘুরানি আর বমি? পৌষ একুল-ওকুল ভেবে ভেবে আস্ত করে শুয়ে পড়লো। শরীর ভালো লাগছে না। আবারও মাথা কেমন ভনভন করছে।
মাথাটা বালিশে দিয়েছে মিনিট দুই হবে ওমনিই দরজায় দাঁড়ানো তুহিনের চিৎকার ওর শান্তি হরন করলো। তুহিন বাইরে থেকে সমান তালে চেঁচাচ্ছে, হুমকি ধামকি দিচ্ছে,
“আসলে কানের তালা খুলে দিব একদম৷ না খেয়ে মারবে আমাকে? পৌষ রে, তারাতাড়ি বের হউ। কুটনি, শয়তান ফুপাতো বোন কোথাকার।”
অতঃপর দরজায় ধুমধাম শব্দ হলো। পৌষ গায়ে ওরনা দিয়ে উঠে দরজা খুলতেই তুহিন ভিজে একাকার হলো। পৌষের হাতে পানির গ্লাস। দরজা খুলে তুহিনের মুখ বরাবর ছুঁড়েছে। তুহিন বড় বড় মুখে চেঁচাচ্ছিলো বিঁধায় পানি কিছুটা মুখেও ঢুকেছে। মুখের পানিটুকু গিলেছে ও। পৌষ দাঁত চেপে বললো,

“অশান্তি একটা!”
“একদম চাপা ভেঙে দিব। তর্ক করে মেয়ে।”
“আমি থোবড়াই উড়িয়ে দিব একদম।”
তৌসিফ ঘটনা দেখেছে। উঠে আসতে আসতে এতকিছু ঘটে গেলো। তুহিন দুই পা এগিয়ে আসতে নিলেই ফ্লোরে থাকা পানিতে ধপ করে পড়লো পিছলে। পড়েই চেঁচালো,
“মেঝভাইয়া! মেঝ ভাইয়া, তোমার বউ আমাকে ফেলে দিয়েছে।”
ওকে চিৎপটাং হতে দেখে দরজা ধরেই হাসতে লাগলো পৌষ। আঙুল তাক করে ভেঙালো,
“একদম উচিত শিক্ষা হয়েছে।”

টেবিলে উপস্থিত সকলে। মিস্টার কিবরিয়াও কাজ রেখে আজ বাসায় লাঞ্চ করছেন। পৌষ দুই প্লেট সার্ভ করেই তায়েফার হাতে দিতে চাইলো একবার। ওর ভালো লাগছে না কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলো আজই তো শেষ অতঃপর এত বড় সংসার আর কোথায় পাবে পৌষ? সেই তারা দু’জনের সংসারে ফিরে যাবে যেখানে মাঝেমধ্যে তুরাগের বাচ্চারা আসে, ইদানীং জুটেছে তুহিন। এই নমুনাটাকে একটু আগেই উচিত শিক্ষা দিয়েছে পৌষ। তৌসিফ ধরে টেনে তুলেছে। ইহান কোমড় চেপে দিয়েছে এতক্ষণ। কোমড়ে ব্যথা পেলেও মুখটা খুব চলছিলো ওর।
টেবিল ভর্তি সুস্বাদু খাবার। বিরিয়ানির সাথে ভাতও করা হয়েছে। ইলিশের কোরমা, করল্লা ভাজি চিংড়ি দিয়ে, বিফ মালাই, সালাদ সাথে ঘন ডাল। এই ডালটাও পৌষ করেছে। সবাই বেশ পছন্দ করে। সবাইকে বেড়ে দিয়ে পৌষ যখন বসলো তখন পাশে থাকা তুহিনের মাথাটা বিগড়ে গেলো বোধহয়। ও হাত বাড়ালো পৌষের প্লেটে। পৌষ কিছু বলার আগেই তুহিন পৌষের পাত থেকে আলু তুলে নিলো। উপস্থিত সকলে দেখলো দৃশ্যটা। প্রহর গুনছিলো যু’দ্ধ লাগার তবে আশ্চর্যজনক ভাবে তা ঘটলো না৷ পৌষ নিজের প্লেট থেকে বেছে আলু তুহিনের প্লেটে দিলো আবার ডিশ থেকেও দুটো দিয়ে বললো,

“বিকেলে আবার খেয়ে যাবেন।”
তুহিন খেতে খেতে মাথা নেড়ে বললো,
“বক্সে করে নিয়ে নিও। গাড়িতে খাব।”
এই এক জায়গায় পৌষের আদর পায় তুহিন। এই মেয়ে খাওয়াতে পছন্দ করে। এত আদর করে তুলে তুলে খাওয়াবে যে ওকে অপছন্দ করা মানুষও বোধহয় একটু নরম হবে। এর কারণটা কি? হয়তো খাবারের কষ্ট তাকে শিখিয়েছে অন্যকে খাওয়ানো অথবা অভ্যাস হয়েছে চাচার বাচ্চা পালতে যেয়ে। পৌষ খাওয়ার মাঝেই মিস্টার কিবরিয়ার প্লেটে নজর দিলো। হাত বাড়িয়ে তার নিতে বললো,
“দুলাভাই, আজ ডায়েট বাদ। বিরিয়ানি একটু খেয়েছেন। ভাত নিবেন এখন।”
“রাতে খাই? এখন তো পেট অর্ধেক ভরে গিয়েছে।”
” পুরোটাতো ভরে নি দুলাভাই। চিন্তা নেই, আপনার ভুড়ি বাড়লেও আপা আপনাকেই পছন্দ করবে।”
মিস্টার কিবরিয়ার হাসি শোনা গেলো। পৌষ সুন্দর মতো ভাত সহ বাকিসব একটু একটু তুলে দিলো। এই মেয়ে এত সুন্দর সার্ভ করে যা দেখলেই খেতে মন চায়। কখনো অতিরিক্ত ঠেসে কিছু দিবে না৷ মার্জিন, গোছানো তার হাত। ইহান, ইরা নিজেরাই তুলে খাচ্ছে। তৌসিফের প্লেটে ডাল দিলো পৌষ আগ বাড়িয়ে। এটা দেখেই তুহিন খোঁচালো,

“আমাকেও দাও।”
“বিরিয়ানির সাথে?”
“হুঁ।”
পৌষ দিলো। তৌসিফ খেতে খেতে দেখলো। তার ছোট ভাই কতটা হিংসুটে হলে তার বউ তাকে ডাল দিয়েছে এটা দেখে নিজে বিরিয়ানির উপরই ডাল নিলো। এমন অদ্ভুত খাবার সে কোনদিন খায় নি। তুহিন আয়েশ করেই খেলো। তৌসিফ পৌষের প্লেট দেখে বললো,
“খাচ্ছো না কেন হানি?”
“খাচ্ছিই।”
“আমি দেখতে পাচ্ছি না।”
বলেই নিজে বিফ মালাই দিলো একটু। দেখা গেলো পৌষ বিফটাই খেলো। বিরিয়ানি ওভাবেই প্লেটে রয়ে গেলো। আর কিছুতেই পেটে ঢুকবে না। বেশ অস্থির লাগছে। তৌসিফ এতক্ষণে লক্ষ্য করলো পৌষের অস্থিরতা। কপাল কুঁচকে তাকালো একবার। পরক্ষণেই নিচু হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“কোন সমস্যা হচ্ছে?”
“ভালো লাগছে না।”
“আজই চলে যাব হানি।”
“হুঁম।”
“তুমি খাবে না আর?”
পাশ থেকে তুহিন জিজ্ঞেস করলো। পৌষ নিজের প্লেট দেখে বললো,
“মন চাইছে না।”
“আমি খেলাম তাহলে।”

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮৭ (২)

পৌষের এঁটো প্লেট নিয়ে নিলো তুহিন। প্লেটে থাকা গোস্তটুকু আবার সুন্দর মতো তৌসিফের প্লেটে দিলো। উপস্থিত সকলে বিষয়টা খুব স্বাভাবিক নজরে দেখলো কারণ বিগত দুই মাসে তারা বুঝে গিয়েছে তুহিন পৌষের ঠিক কতটা ন্যাওটা কিন্তু পৌষ বিষয়টা মোটেও পছন্দ করলো না। ভাবলো দেশে ফিরে কথা বলবে এই বিষয়ে।

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here