Home সিকান্দার শাহ্ সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩৪

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩৪

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩৪
Raiha Zubair Ripti

রাতের শেষ প্রহরে ফজরের আজান ভেসে আসতেই সিকান্দার শাহ্ ঘুম থেকে উঠে বসল। ওজু করে মসজিদে গিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করে কাঁধে কোদাল নিয়ে ক্ষেতের দিকটায় গেলো। পেছন পেছন রহিমুদ্দিন মিয়া, শফিক সাহেব,রাশেদ, জামালসহ গ্রামের কয়েকজন মানুষ কোদাল-লাঙল নিয়ে হাজির হলো। জমিটার দিকে তাকালে মনে হয় বহু বছর কেউ চাষ করেনি। আগাছা কোমর ছুঁয়েছে, কোথাও শক্ত মাটি, কোথাও ঝোপঝাড়। সিকান্দার প্রথম কোদালটা চালাল জমির বুকের ওপর। শক্ত মাটিতে কোদাল আটকে গেল। সে আবার কোদাল তুলল। আরও জোরে আঘাত করল। এবার একটু মাটি উঠে এলো। এই প্রথমবার সে কোদল হাতে নিয়ে কাজ করছে। আগে কখনো করে নি। মামাদের দেখেছে করতে। দুপুরের রোদ তখন মাথার ওপর আগুন হয়ে জ্বলে উঠলো।

সিকান্দারের কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। আশ্চর্য ভাবে তবুও তার মুখে ক্লান্তির কোনো ছাপ নেই। তার এই এক কোদাল দেখেই রহিমুদ্দিন মিয়া নিজের কোদাল তুলে নিলেন। তারপর রশিদ তারপর জামালও। তারাও সিকান্দার কে সাহায্যা করলো। প্রথম দিনটা শুধু আগাছা পরিষ্কার করতেই কেটে গেল।কোদাল চালাতে চালাতে হাতের তালুতে লাল ফোস্কা বের হয়েছে সিকান্দারের। তারপরও বান্দা থামলো না। পরদিন গ্রামের একজন কৃষক নিজের বলদ এনে দিলেন। লাঙলের ফলায় শক্ত মাটি ফেটে যেতে লাগল। এরপর মই টেনে বড় বড় ঢেলা গুঁড়ো করা হলো। চারপাশে ছোট ছোট আইল তুলে দেওয়া হলো, যেন বৃষ্টির পানি জমিতে ধরে রাখা যায়। ধানের জমিতে পানি ধরে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কাজ করতে করতে সবার গা ঘামে ভিজে গেল। এরপর তৈরি হলো বীজতলা। আগে থেকে বেছে রাখা ভালো মানের আমন ধানের বীজ পানিতে ভিজিয়ে অঙ্কুর বের করা হয়েছিল। সেই বীজ নরম মাটিতে ছিটিয়ে দেওয়া হলো। কয়েক দিনের মধ্যেই সবুজ চারা মাথা তুলে দাঁড়াল। রোপা আমন চাষে আগে বীজতলায় চারা তৈরি করে পরে মূল জমিতে রোপণ করা হয়। প্রতিদিন ভোরে সিকান্দার গিয়ে চারাগুলো দেখত। কোথাও পোকা ধরেছে কি না, কোথাও পানি কমে গেছে কি না সব নিজ হাতে দেখাশোনা করত। এদিকে মূল জমিতে পচা গোবর মিশিয়ে দেওয়া হলো। বৃষ্টি শুরু হওয়ায় জমি ধীরে ধীরে কাদায় ভরে উঠল। ভোর থেকেই সেদিন জমিতে সবাই নেমে পড়ল। হাঁটুসমান কাদায় দাঁড়িয়ে সারি ধরে একজন একজন করে চারা রোপণ করছে। জামাল কে জমিতে গাদাগাদি করে চারা রোপণ করতে গেলে সিকান্দার বলে উঠলো,

” দূরত্ব ঠিক রাখো জামাল। বেশি গাদাগাদি করলে ফলন কমে যাবে। ”
সন্ধ্যা নামার আগেই চার বিঘা জমি সবুজ চারায় ভরে উঠল।দূর থেকে মনে হচ্ছিল, সবুজ রঙের এক বিশাল চাদর মাটির বুকে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। সিকান্দারের স্বপ্নের চার বিঘা জমি। বাড়ি ফেরার পথে সিকান্দার আজ মোড়ল বাড়িতে গেলো। যার থেকে জমি বর্গা নিয়েছিল। ফসল অর্ধেক সিকান্দারের আর অর্ধেক মালিকের। লোকটা বয়স্ক ছেলেপেলে নাতি নাতনিরা থাকে বরিশাল শহরে। বাড়িতে তার সে আর তার স্ত্রী থাকে। বছরে কখনো মনে হলে ঈদে একবার করে আসে বাড়িতে। তা না হলে আসে না। সিকান্দার কে দেখেই তিনি স্নেহতুর গলায় কাঁধে হাত রেখে বললেন,
” আরে বাবা! আইছো? শুনলাম চার বিঘা জমিডার কাম নাকি অনেক দূর আগাইয়া ফেলছো! ”
সিকান্দার সালাম দিয়ে হাসল।
” আলহামদুলিল্লাহ চাচা। গ্রামের সবাই পাশে না থাকলে এত দ্রুত কিছুই করা সম্ভব হতো না।
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন,
” হ, মানুষজন তো তোমারে খুবই পছন্দ করে। আল্লাহ তোমারে এমনেই ভালো রাখুক বাবা। বাবা, একটা কথা কই? ”
” জি, বলুন। ”

” তুমি আর তোমার বউডা কতদিন আর রহিমুদ্দিন মিয়ার বাড়িত থাকবা? নিজের একটা ঠাঁই না থাকলে সংসার সংসার লাগে নাকি?
সিকান্দার ভাবুক হলো। কর্মের ব্যবস্থা হলো। এখন একটা থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।
” সত্যি বলতে, আমিও একটা ছোট ঘরের কথা ভাবছি। ”
বৃদ্ধ তখন লাঠিতে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে উঠলেন।
” আমার লগে আহো তুমি। ”
সিকান্দার তাঁর সঙ্গে হাঁটতে লাগল। বাড়ির সামনের দিকে একটু উঁচু একটা ফাঁকা জায়গায় এসে বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে গেলেন। চারপাশে দু-একটা আমগাছ, সামনে খোলা মাঠ। জমির থেকে কয়েক গজ ধূরে বয়ে গেছে একটা সরু লম্বা নদী। যার কলকল ধ্বনি সিকান্দার শুনতে পারছে। লাঠির আগা দিয়ে জায়গাটা দেখিয়ে বললেন,
” এই জমিডা দেখতাছো? এইহানে কেডাও থাকে না। খালি পইড়া থাকে। ”
সিকান্দার চারদিকে তাকিয়ে বলল,

” জায়গাটা খুব সুন্দর। ”
বৃদ্ধ হেসে বললেন,
” আমার আর বুড়ির তো বয়স হইছে। পোলাপান কেউ গ্রামে আইব না। তাই জমিডা বেইচা দিতে চাইতেসি। ”
সিকান্দার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠলো,
” শতাংশ কত করে চাচা? ”
” শতাং ৪৫ করে তুমি নিলে ৪০ করে রাখবো। সাত শতাংশ আছে এইহানে। ”
সিকান্দার জমির দাম এত কম শুনে চমকে উঠলো। এই সাত শতাংশ জমির মোট দাম হয়তো সিকান্দারের একদিনের রোজগার ছিলো। যদিও এটা তো গ্রাম। বিদ্যুৎ আসে নি। কোনো আধুনিকতার ছোঁয়া নেই। তার উপর খরা চলছিলো। সেজন্য বোধহয় এত কম দাম। সিকান্দার সাথে সাথে রাজি হয়ে গেল। বলল,
” চাচা জমিটা আমি কিনতে চাই। ”
” আচ্ছা নিয়া লও তয়। তোমাদের মতো ভালো মানুষ পাশে থাকলে হেইডা আমারই সৌভাগ্য। ”

সিকান্দার একটা অসাধ্য কাজ করেছে। কী তা পরে বলবো। আজ আকাশ টা মেঘলা। ধান লাগানোর পর অন্য বাকি সবাই সন্ধ্যার আগ দিয়ে বাড়ি ফিরে গেলেও সিকান্দার বাড়ি ফিরতো একেবারে এশার নামাজ শেষে। মুনতাহার বেশ চিন্তা হয় সিকান্দার কে নিয়ে।
সিকান্দার এখন তার ক্ষেতের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। একবার আকাশের দিকে তাকাল। কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে সূর্যের শেষ আলো চার বিঘা জমির ওপর এসে পড়েছে। তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শান্তি নেমে এলো। এখন সার দিতে হবে, আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। সিকান্দার কখনো ভাবে নি তাকে কোনোদিন কৃষি কাজ করতে হবে। তবে তার বেশ ভালো লাগছে। নতুন নতুন অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। সিকান্দার বড় বড় প্রজেক্ট, ক্লায়েন্ট, মিটিং, বাদ দিয়ে এখন লাঙল সার তুলে নিয়েছে। ব্যপারটা মন্দ নয়। দূরে বাতাসে দুলতে থাকা ছোট ছোট ধানের চারাগুলোর দিকে তাকিয়ে সিকান্দার সারে দিতে শুরু করলো। আজ কেউ আসে নি বাকি জমিতে। সিকান্দার সার দেওয়া শেষ করে কাঙ্ক্ষিত একটি জায়গায় চলে গেলো। তার ছোট্ট একটি স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে।

আজ নাদিম অফিস থেকে লাঞ্চ করার জন্য খুব ফ্রেশ মুডে বের হয়েছিল। তবে ইলার মুখটা দেখেই বেশ গম্ভীর হয়ে গেলো। তার একে ওপর কে এতদিন ধরে দেখতো না। আজ চোখাচোখি হলো। নাদিম রেগে ছিলো ইলার উপর। ঐ যে তাদের বাসা থেকে চলে যেতে হয়েছে মুনতাহা কে সেজন্য। তবে এখন অবশ্য সেই রাগটা কিছুটা গলে গিয়েছে। তবে ইলার গলে নি। ইলা নাদিম কে দেখেও না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছিলো। এই ছেলে তাকে যা নয় তাই বলেছে সেদিন। ইলারা কি কোটিপতি? তার বাবা চাকরি হারিয়ে পথে বসলে কি এই ছাগল নাদিম তাদের খরচ বহন করতো? তবে নাদিমের একটা কথায় সে থেমে গেলো। নাদিম যখন বলল,
” সিকান্দার আর মুনতাহার খোঁজ পেয়েছি। কেউ কি যাবে আমার সাথে তাদের দেখতে? ”
ইলার চোখ মুখের ভঙ্গিমা পাল্টে গেলো। মুনতাহার খোঁজ পেয়েছে নাদিম! সত্যি! ইলা পেছন ফিরে বলল,
” সত্যি খোঁজ পেয়েছেন? কিভাবে পেলেন? ওদের ফোন তো বন্ধ। ”
” সুনেহরার মাধ্যমে পেয়েছি। সিকান্দার আর মুনতাহা নাকি সুনেহরার বান্ধবী শিফাদের মামা বাড়িতে,মোহনগঞ্জে। ”

” আমি যাব। আমি যাব। আমাকে নিয়ে যাবেন? ”
নাদিম হাই তুলে বলল,
” একদিনে চলে আসার মতো পথ না। আপনার বাসা থেকে কি এলাও করবে আপনাকে আমার সাথে। পরে যদি দোষারোপ দেয় আপনাকে নিয়ে আমি ভেগে গেছি তখন? ”
ইলা বাঁকা চোখে তাকালো।
” আমাকে মানা করবে না। বাবা মা-ও চিন্তিত মুনতাহা আর সিকান্দার ভাইয়াকে নিয়ে। তাদের খবর পেলে তারাও স্বস্তি পাবে। ”
” বেশ তবে কবে যাব বলে দিব। রেডি হয়ে থাকবেন। অফিসে ছুটির জন্য আবেদন করেছি। দেখি গ্রান্টেড হয় কি না। নইলে কোনো এক বৃহস্পতিবার রাতে রওনা দিব। ”
” ঠিক আছে জানিয়ে দিবেন তাহলে আমি রেডি হয়ে থাকবো। ”
কথাটা বলে ইলা চলে যেতে নিলে নাদিম পিছু ডেকে বলে,
” ও হ্যালো মিস ঢিলা খবরটা ঠিক কিসে দিব? কবুতরের পায়ে চিরকুট লিখে? ”
ইলা পিছু ফিরে বলল,

” আপনি আগে আমাকে ব্লক করেছেন। আগে আপনি আনব্লক করুন। তারপর আমি করবো। ”
নাদিম দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে নাদিম সেদিন ইলাকে সব জায়গা থেকে ব্লক করেছিল। সেটা দেখে ইলাও করেছিল। কিন্তু নাদিম তো তার পাঁচ মিনিট পরই আনব্লক করে দিয়েছিল। গাধী হয়তো আর আনব্লকই করে নি।
” চেক করুন। ”
” কী? ”
” আপনার মাথা আমার মণ্ডু। ”
নাদিম হাঁটা ধরলো লাঞ্চ করার জন্য। ইলা ফোনটা ব্যাগ থেকে বের করে নাদিম কে আনব্লক করে দেখলো নাদিম আগেই হয়তো আনব্লক করেছিল তাকে। অসভ্য জউরা ব্যাডা। কোন সাহসে তুই ব্লক করবি? তাই ইলাও করেছিল।
সেলিম মির্জা মাথায় আইস কিউবের ব্যাগ চেপে সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছেন। কপালের রগ ফুলে উঠেছে। গত কয়েক মাস ধরে একের পর এক ধাক্কা সামলাতে সামলাতে তিনি যেন ভেতর থেকে ভেঙে পড়েছেন। সিকান্দার চলে যাওয়ার পর থেকেই কোম্পানির চাকা যেন তাল হারিয়ে ফেলেছে। বহু বছরের পুরোনো, অভিজ্ঞ কর্মীরাও একে একে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। তাদের শূন্যতা পূরণ করতে মোটা অঙ্কের বেতনে বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগ দিয়েছিলেন সেলিম মির্জা। ভেবেছিলেন, তখনও ভেবেছিলেন টাকা দিয়ে সবকিছু কেনা যায়। কিন্তু বাস্তবতা যে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

একটি প্রকল্প কোনোমতে সফল হলেও পরপর কয়েকটি বড় প্রকল্প ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হলো। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় কোটি কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ গুনতে হয়েছে কোম্পানিকে। সিকান্দারের থেকে কেড়ে নেওয়া টাকা পয়সা আর গয়না গাটি গুলো বিক্রি করে দিতে হয়েছে কোম্পানির কর্মীদের বেতন। বিদেশি ক্রেতারা একের পর এক চুক্তি বাতিল করতে শুরু করল। কেউ নতুন অর্ডার দিচ্ছে না, আবার কেউ চলমান কাজও অন্য প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে নিচ্ছে। বোর্ড মিটিংয়ে প্রতিদিন একই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসছে
“সিকান্দার শাহ্ না থাকলে এই প্রতিষ্ঠান আদৌ আগের জায়গায় ফিরতে পারবে?”
কেউ উত্তর দিতে পারছে না। সিকান্দার যখন দেশের বাহিরে ছিলো তখনো তার এই কোম্পানির কোনো সমস্যা হলে সেলিম মির্জা তাকে জানাতো। সিকান্দার না চাইতেও দাদির হাহাকার শুনে সেই সমস্যার সমাধান বের করে দিত। এখন তো ছেলের সাথে যোগাযোগ নেই। মাকেও কাজে লাগাতে পারবে না। ছেলেকে বের করে দিয়েছে। ছেলের জীবন টা দূর্বিষহ করে দিয়েছে। সিকান্দার কে সে এই ভয়েই হারাতে চাইতো না। স্বর্থ জড়িয়ে ছিলো নিজের।

দক্ষ কর্মী টাকা দিয়ে পাওয়া যায় ঠিকই,কিন্তু একজন দূরদর্শী মানুষ যে একই সঙ্গে পরিকল্পনা করে, সংকট সামলায়, সিদ্ধান্ত নেয় এবং বিদেশি বায়ারদের আস্থা ধরে রাখতে পারে তাকে টাকা দিয়ে তৈরি করা যায় না। আর সেই মানুষটা কেবল সিকান্দার শাহ্। সিকান্দার শাহ্ পৃথিবীতে একজনই। তার মতো কেউ হতে পারবে না। তবে এই চিরন্তন সত্য টা মানতে নারাজ সেলিম মির্জা। সে এবার অর্নবের দিকে ক্ষ্যাপা চোখে তাকালো। অর্নব আর সিমরান এসেছে নেপাল থেকে কদিন আগেই। সব শোনার পরও সিমরানের ভেতর কোনো ভাবান্তর দেখা গেলো না। সে কেবল নিজেকে আর নিজের সংসার টাকে নিয়ে ভাবতে চায়। তবে অর্নবের খারাপ লাগছে মুনতাহার জন্য। সে সত্যি ভালোবেসেছিল মুনতাহা কে। তার বাবা মা ওমন না করলে মুনতাহাকেই বিয়ে করতো। কারন মুনতাহা সিমরানের থেকে সব দিক দিয়ে এগিয়ে। রূপে গুনে পড়াশোনা সব কিছুতেই। সিমরান এইচএসসি ফেল করেছে। সুন্দর ফিগার নেই। কিছুটা খাটো,কিছুটা মোটা। চেহারা গুলুমুলু,বোকা তবে গায়ের রং ফর্সা। আর মুনতাহা সব দিক দিয়ে বেস্ট ছিলো। তার ফিটনেস,চেহারা,কথাবার্তার ধরন এডুকেশনাল রেজাল্ট গায়ের রং। যাকে বলে একজন পারফেক্ট নারী। সেই পারফেক্ট নারী জুটেছে তারই সৎ ভাইয়ের ভাগ্যে। সেটাই তার মানতে ইগোতে লাগে। বাবার চাহনি দেখে অর্নব বলল,

” আমার দিকে তাকিয়ে আছো কেনো ওভাবে? ”
সেলিম মির্জা আইস কিউবের ব্যাগটা ছুঁড়ে মারলো অর্নবের দিকে। সবচেয়ে বেশি টাকা পয়সা খরচ করেছে এই ছেলের পেছনে। লাক্সারি জীবন দিয়েছে। সেই ছেলেই কি না অপদার্থ হলো! আর যেই ছেলেকে কানাকড়ি দেয় নি। ছোট থেকে নিজের খরচ নিজে চালানোর চেষ্টা করেছে সেই ছেলেই নায়ক হয়ে বের হয়েছে।
” কাল থেকে অফিসে যাবি। অফিস সামলাবি। আমার পক্ষে সম্ভব না অফিস রাজনীতি দুটে একসাথে সামলানোর। তোকে লাক্সারি জীবম দিয়েছি আজীবন আমার টাকা পয়সায় বসে বসে খাওয়ার জন্য না। অফিসটাকে কিভাবে দাঁড় করাবি জানি না। কিন্তু তোকে দাঁড় করাতেই হবে। ”
” তুমি জানো আমি ভাইয়ার মতো সব পারুয়া ছেলে না। তুমি কেনো বের করে দিছো তাহলে তাকে? তুমি তো জানতে ভাইয়া ছাড়া তুমি অচল। জানার পরও নিজের পায়ে নিজে কোড়াল মেরেছো। এখন ভোগ করো। আমি পারবো না সামলাতে। ”

” পারতে হবে। না পারলে তোকেও বের করে দিব। শালাহ সব কয়টা নিমকহারাম। ”
সেলিম মির্জা ফুঁসতে ফুঁসতে রুমে আসলেন। ছোট মেয়েকে ফোন দিয়ে মেয়ের খোঁজ খবর নিতে গিয়ে কথা বলার ছলে মেয়ের মাধ্যমে জানতে পারলো সিকান্দার নাকি মোহনগঞ্জে। শফিকের সুমুন্দির বাড়ি। শফিকের নাম শুনেই জ্বলে উঠলো তেলে বেগুনে। রাজনৈতিক কারনে তাকে কদিন দৌড়াদৌড়ি করতে হবে এদিক ওদিক। এই দৌড়াদৌড়ি শেষ হলেই সে মোহনগঞ্জে যাবে। আর গিয়েই সিকান্দার কে উচিৎ একটা শিক্ষা দিয়ে আসবে।
চাষবাসের কাজ প্যান্ট শার্ট পড়ে করা যায় না। কিন্তু সিকান্দারের লুঙ্গি পড়তে অস্বস্তির চেয়ে ভয় বেশি করে। বাজার থেকে লুঙ্গি কিনে আনলেও সে পড়ে নি এতদিন। এই ভয়ে যে কখন একটা উত্তর দক্ষিণা বাতাস উঠে আসে। আর সিকান্দারের লুঙ্গি কোমর থেকে উঠে মাথায় এসে যায়। বা গিট খুলে ধপাস করে খুলে পরে যায়। তখন তো মানসম্মান সব শ্যেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এই প্যান্ট টাউজার পরেও তো সবসময় কাজ করা যায় না কাদাতে।
মুনতাহা সিকান্দার কে লুঙ্গি হাতে নিয়ে ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,

” কী ভাছেন ওতো? ”
সিকান্দার মুনতাহা কে দেখে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল,
” ভাবছি লুঙ্গি পরবো নাকি পরবো না। আমি তো কখনো লুঙ্গি সেভাবে পড়ে বেশিক্ষণ থাকি নি। মামা দের বাড়িতে গেলে গোসল খানায় লুঙ্গি নিয়ে ঢুকলেও রুমে এসে সাথে সাথে পাল্টে ফেলছি। ”
” কেনো? কেনো? কি সমস্যা লুঙ্গি তে হু? সবাই তো দিব্যি পড়ে লুঙ্গি। ”
সিকান্দার গম্ভীর মুখে বলল,
” লুঙ্গি খুবই রিস্কি একটা পোশাক। বিশ্বাস করা যায় না। এরা বিশ্বাসঘাতকের মতো। কখন বাতাসে উড়ে যাবে, আবার কখন একটু টান লাগলে বা গিট খুলে পড়ে যাবে। কোনো ঠিক নেই। আমি এসব ঝুঁকি নিতে চাই না। ”
মুনতাহা হাসতে হাসতে জবাব দিলো,
” তাতে কি সমস্যা আপনি তো আন্ডারওয়্যার পড়বেনই। ”
সিকান্দার চোখ মুখ কুঁচকে বলল,

” সো হোয়াট? তারপরও খুলে গেলে আমার লজ্জা করবে। মাঠে কত লোক থাকে হিসেব আছে? ”
” এ্যাহ! আপনি না বিদেশে ছিলেন? ”
” তো? এক সেকেন্ড বাই এনি চান্স কি আপনি মিন করছেন আমি বিদেশে ছিলাম বলে আন্ডারওয়্যার পড়ে ঘুরে বেরিয়েছি? দ্যিস ইজ ঠু মাচ মন। আমি ওমন ধারার ছেলে নই। ”
” আচ্ছা বাবা,এখন যান লুঙ্গি পড়ে আসুন। আমি আপনার ভয় দূর করে দিচ্ছি। ”
” কিভাবে? ”
” আগে আসুন পরে। আমি দেখাচ্ছি কিভাবে। ”
সিকান্দার লুঙ্গি পরে আসলে মুনতাহা কালো সুতো এনে সিকান্দারের কোমরে বেঁধে তারপর সেই সুতো লুঙ্গির উপর দিয়ে টাইট করে বেঁধে দিয়ে বলল,
” নিন মশাই এবার নিশ্চিন্তে থাকুন গিট খুলে গেলেও লুঙ্গি খুলবে না।”
সিকান্দার সেই সুতোর দিকে তাকিয়ে চিন্তিত স্বরে বলল,
” বাতাস আসলে যদি উড়ে যায় লুঙ্গি তখন? ”
” চেপে ধরে রাখবেন লুঙ্গি। তা না হলে কাছা দিবেন। ”
” কাছা মানে? ”
” আরে ঐ যে লুঙ্গি সামনে থেকে দু পায়ের মাঝখান দিয়ে নিয়ে পেছনে গুঁজে রাখে। ”
সিকান্দার সরু চোখে তাকালো। তারপর কোদাল হাতে করে বেরিয়ে যেতে নিলে মুনতাহা জিজ্ঞেস করে,
” আপনি ইদানিং কিন্তু অনেক রাত করে বাড়ি ফিরেন। এত রাত অব্দি ক্ষেতে থাকার কি মানে? তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবেন। ”

সিকান্দার আচ্ছা বলে হাঁটা ধরলো। ধান ক্ষেতের আইল দিয়ে মিষ্টি কুমড়োর গাছ লাগিয়েছিল। বেশ অনেক গুলো কুমড়ো বড় হয়েছি। সিকান্দার সেগুলো তুলে বড় বেতের ঝুড়িতে রাখছিল। জামাল বাজারে নিয়ে যাবে। ঠিক তখনই কয়েকজন অনুসারী নিয়ে সেখানে হাজির হয় পীর সাহেব। দূর থেকেই ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলে,
“এই যে শহুরে সাহেব! তুমি নাকি কোটি কোটি টাকার মালিক আছিলা, এখন দেখো কপাল! লুঙ্গি পইরা কামলার কাম করতাছো। আল্লাহর গজব না হইলে এই অবস্থা হয়?”
সিকান্দার কোনো উত্তর দিল না। মাথা নিচু করে নিজের কাজ করতে লাগল। এই পাগল ছাগলের সাথে কথা বললে তার মেজাজ খারাপ হবে। সিকান্দারের এই চুপ থাকাতেই যেন আরও উৎসাহ পেয়ে গেল পীর।
“মানুষরে ধোঁকা দিয়া সাধু সাজো! তুমি আসছো বইলাই নাকি বৃষ্টি হইছে? আল্লাহর রহমত নিজের নামে চালাইতাছো! শিরক করো তুমি। ”
সিকান্দার এগিয়ে এলো এবার। পীরের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
” আমি প্রথমবার ছেড়ে দেই। বড়জোড় হলে দ্বিতীয় বারও ছেড়ে দেই। কিন্তু তৃতীয় বার ছাড়ি না। প্রথম দেখা,দ্বিতীয় দেখায় আপনাকে কিছু বলি নি। আজ তৃতীয় দেখায় মুখে লাগাম টেনে কথা না বললে আমি আমার রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হব। তখন কিন্তু তার দায়ভার আমার উপর চাপাবেন না। আমি আপনাকে সতর্ক করছি আগে থেকেই। ”

পীর সাহেব হো হো করে হেসে উঠল।
“কী করবা কি তুমি? মারবা আমারে ? তুমি নিজেরে কি ভাবো? ”
” নাথিং। ”
” নাঠিং মাথিন কি কও হু? তুমি তো একটা ভণ্ড! মানুষরে ভুল বুঝাইয়া নিজের ভক্ত বানাইতাছো।”
সিকান্দারের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
“শেষবারের মতো বলছি চুপ হয়ে যান। নাহলে..”
পীর এবার এক পা সামনে এসে বুক ফুলিয়ে বলল,
“না হলে কী করবা? মারবা? মারো! দেখি কত বড় বাপের ব্যাটা তুমি! আমায় গায়ে একটা ফুলের টোকা লাগলে এই গেরামের সবাই তুমারে টাইনা ছিড়ে ফেলবো। কি ভুল কিসু কইসি? ”
পীরের সাথে আসা কিছু পীরের কথায় সায় জানালো। মানে সিকান্দার পীরের কিছু করলে তারা সিকান্দার কে ছেড়ে দিবে না। গ্রামবাসী দের সায় জানানোর মাঝেই সবাইকে চমকে দিয়ে সিকান্দার তার ডান হাত দিয়ে এক প্রচণ্ড থাপ্পড় বসিয়ে দিলো পীর সাহেবর বাম গালে। পীর চড়ের টাল সামলাতে না পেরে কয়েক হাত দূরে ছিটকে পড়লেন। মুখ থুবড়ে পড়তেই রক্তের সঙ্গে দুটো মাড়ির দাঁত মাটিতে টুপ করে পড়ে গেল। পীর সাহেব নিজের মুখ চেপে ধরে বিস্ফারিত চোখে রক্তমাখা দাঁত দুটো দেখতে লাগলেন। আশপাশের লোকজনও হতভম্ব। কেউ বিশ্বাসই করতে পারছিল না একটা থাপ্পড়ে একজন মানুষের দুটো দাঁত পড়ে যেতে পারে! সিকান্দার গ্রামবাসীর দিকে তাকাতেই তারা পিছিয়ে গেলো। তারা কিছু করবে না সিকান্দারের।
সিকান্দার পীরের পাঞ্জাবির কলার চেপে বলল,

” আরো বাজে কথা বলবেন আমার সামনে আমার নামে? শহুরে ছেলে আমি জিম করি। বডি ফিটনেস তো দেখছেন? বলুন মাশা-আল্লাহ।”
পীর ভয়ে ভয়ে বলল, “মা..মাশা-আল্লাহ। ”
সিকান্দার পীরের ভয়ার্তক চেহারাটার দিকে একবার তাকিয়ে বলল,
” এক চড়ে দুটো দাঁত খুলে আসছে আপনার। আর একটা চড় মারলে আপনার চেহারার মানচিত্র বদলে যাবে ড্যাম শিওর। চোখের জায়গায় নাক আর নাকের জায়গায় চোখ বসে যাবে। তাই লাস্ট বার আবার ওয়ার্নিং করলাম। গেট দ্য হেল আউট অব মাই সাইট! ডোন্ট ইউ এভার স্প্রেড লাইজ অ্যাবাউট মি অ্যাগেইন! আদারওয়্যাইজ আই’ল কিল ইউ, ব্লাডি বাস্টার্ড!”
তার বজ্রকণ্ঠে আশপাশের সবাই কেঁপে উঠল। পীর সাহেব ইংরেজির একটি শব্দও বুঝলেন না। সিকান্দার তাকে ছেড়ে দিতেই কোনো রকমে দাঁত দুটো মাটি থেকে উঠিয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে চেয়ারম্যান বাড়ি দৌড় লাগালো। চেয়ারম্যান তখন সবে শহর থেকে আসছে। বিশ্রাম নেওয়ার জন্য রুমে ঢোকার পথে পীরের গলার আওয়াজ পেলো। চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে বলছে,

” চেয়ারম্যান সাহেব, দেহেন কী করসে ঐ সিকান্দার! এক চড়ে আমার দুইডা দাঁত ফালাইয়া দিসে। ডরের চোটে একটা কথাও কইতে পারি নাই। চড় মাইরাই থাইমা থাকে নাই। আমার পাঞ্জাবির কলার ধইরা ইংরেজিতে কিসব জানি চিৎকার কইরা কইতেছিল, আমি তো অর্ধেকও বুঝি নাই। তবে এইটুকু বুঝছি ভালো কথা কইতেছিল না আমারে। গালিই দিতেছিল হয়তো। বুকটা কাইপা উঠছিল তখন। মনে হইছিল আর এক মুহূর্ত দাঁড়াইলে জানে মাইরাই ফালাইবো!আল্লাহ গো বেডার শইল্লে কি শক্তি। আবার কয় বেডা বলে জিম ফিম করতো। আরেকটা চড় মারলে নাকি আমার মুখের মানচিত্র একেবারে ভচকায় যাইবো গা। আমি ডরে বাঁচি না,হাছাই যদি আমার চেহারা ভচকায় দেয়,তাই দৌড়াইয়া পালায় আইসি। কি খাইয়া ওমন হাতির লাহান শক্তি বানাইসে। এক চড়েই আমার দুইটা দাঁত ফেলায় দিসে জাউরায়। ”
পীরের কান্না আর অভিযোগের শব্দ পাশের ঘর থেকেই শুনতে পেল বিনোদিনী। কৌতূহল নিয়ে সে দাসীকে ডেকে জিজ্ঞেস করল,

“ওভাবে কেঁদে কেঁদে কী বলছে রে পীর?”
দাসী হেসে উত্তর দিল,
“এক চড়ে পীরের দুইটা দাঁত ফেলায় দিসে। সেই বিচার দিতেছে বাবুর কাছে।”
পীর কে চড় মেরেছে শুনে বিনোদিনী হেঁসে উঠলো। এই বেটাকে কেউ মেরেছে চড়! ”
” তা কে মেরেছে শুনি? গ্রামের কার এত বড় সাহস হলো? ”
দাসী নির্ভার গলায় বলল,
” সিকান্দার শাহ্ মারছে। ”

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩৩

মুহূর্তেই বিনোদিনীর মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। চোখের দৃষ্টি কেমন যেন স্থির হয়ে রইল। আজও একবার সিকান্দারের নাম তার ঠোঁট ছুঁয়ে গেল সেদিনের মতো। দাসী চলে যেতেই বিনোদিনী ধীরে ধীরে জানালার দিকে তাকালো। তারপর ধীরে ধীরে নিজের আঙুলে থাকা আংটিটা ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
” আপনাকে একবার দেখতেই হচ্ছে তবে। কেউ আমার অসমাপ্ত কাজ ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ভাবে করে দিলে আমার আবার ভালো লাগে। ”

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here