Home তোমার আমার গল্প তোমার আমার গল্প পর্ব ২৩

তোমার আমার গল্প পর্ব ২৩

তোমার আমার গল্প পর্ব ২৩
noorayn

আরহাম লাগাতার আলিশাকে কল করে যাচ্ছে কিন্তু এই ধানিলঙ্কা তো তাকে ব্লক করে রেখেছে।
আরহামের রাগে শরীর জ্বলছে। একবার শুধু বাড়ি ফিরুক তারপর চাপকে সোজা করবে এই বেয়াদব মেয়েকে।
আরহামের ভাবনার মাঝেই ডাক পড়লো আদির –
“আরহাম হয়েছে তোর?”
“কেন?”
“কেন আবার কি?তোর ধ্যান কোথায়? সময় দেখ, তোর মেইন পারর্ফোমেন্সের সময় চলে এসেছে। এখন স্টেজে যেতে হবে।”

–আরহাম এর হুশ ফিরলো যেন। আলিশার টেনশেনে সে খেয়ালই করেনি সময়ের।
সে আদিকে বললো –
“আমি আসছি। তুই যা।”
“জলদি আয়।” – বলেই আদি বেড়িয়ে গেলো।
–এদিকে, আরাফের গান মাত্র শেষ হয়েছে। সবার অপেক্ষা এখন তাদের ড্রিম বয় “আরহাম মেহতাব খান” এর জন্য।
–আরহামের জন্য স্টেজ আবার রেডি করা হচ্ছে কারন এখন মেইন পারর্ফোমেন্স হবে।
ইতিমধ্যে, ইভেন্ট অর্গানাইজর এসে মাইক হাতে নিয়ে বললো –
“হ্যালো, এভরিওয়ান। আশা করি, আমাদের আজকের শো আপনাদের সকলকে আনন্দিত করতে পারছে।”
–দর্শক সবাই যেন হ্যাঁ ধ্বনিতে সায় জানালো।
অর্গানাইজার আবারও বললো –
“একটু পরেই স্টেজে আসছেন, স্টার ওফ টুনাইট – রকস্টার আরহাম মেহতাব খান।”
আরহামের আগমনের বার্তা শুনে দর্শকদের মাঝে যেন এক আলাদা আমেজ দেখা দিলো। সবাই একসাথে হৈ-হুল্লোড় করে উঠলো। চারিপাশ মুখোরিত হলো আরহাম-আরহাম ধ্বনিতে।

–একটু পরেই স্টেজে উঠলো আরহাম। এবার তার পড়নের কাপড় আগের চেয়ে ভিন্ন।
সে মাইক্রোফোন হাতে চিল্লিয়ে বললো –
“হ্যালো রাজশাহী ওনান্স এগেইন।”
আরহামের এন্ট্রিতে পরিবেশ যেন ভিন্ন রূপ ধারন করলো।
আরহাম গিটারের টিউন চেক দিতে দিতে লাফিয়ে বললো –
“আপনারা সবাই রেডি তো আজ রাতের জন্য?”
আরহামের আগমনে সকলের আমেজ যেন আগের চেয়ে দ্বিগুন হারে বেড়ে গেলো – সবাই একসাথে উড়াধুরা বললো – “আরহাম আরহাম আরহাম”
নিজের ফ্যানদের পাগলামো দেখে আরহামের ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসি খেলে গেলো। সে পাশে নিজের ট্যাকনিকাল টিমকে ইশারা করতেই তারা সকল আলো নিভিয়ে আরহামের উপরের স্পটলাইট অন করলো।
“আমি তবে শুরু করছি। আপনারাও কিন্তু আমার সাথে সুর মেলাবেন।”
–অন্ধকার হয়ে এলো স্টেজে – মেইন ফোকাস লাইট এখন আরহামের উপর। সে আস্তে আস্তে গিটারে সুর তুলছে…
সে নিজের গান শুরু করার আগেই তার কানে এসে ঠেকলো হাজারো ফ্যানদের গানের তাল। আরহাম হেসে গিটারের সুর আরও জোড়ালো করলো।

রাত প্রায় ১০ টা….
–আলিশা এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে টিভির দিকে – যেখানে এখন আরহামের কনসার্টের লাইভ টেলিকাস্ট দেখাচ্ছে।
আরহামের জনপ্রিয়তা দেখে আলিশা অনেক খুশি। এই দিনের জন্য কতই না পরিশ্রম করেছে আরহাম। তার প্রতি মুহুর্তের সাক্ষী আলিশা। তবে না সে আরহামকে ফোন দিবেনা আর না তো তাকে কোনো শুভেচ্ছা জানাবে।
–এতো সময় পরও আলিশার রাগ একটুও কমেনি কারন এই গন্ডার তার বাবুকে আনওয়ান্টেড বলেছে। এটা মনে পড়তেই আলিশা রাগে সাথে সাথে টিভি বন্ধ করে দেয়।
ইতিমধ্যে, আধাঘন্টা পেড়িয়ে গেছে কিন্তু আলিশা এখনো সেই একইভাবে বেডে বসে আছে। একটু পরপর শুধু ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে।

–আলিশা এখন বেজায় কনফিউজড – সে আরহামকে মাফ করবে কি করবেনা এই নিয়ে। একবার ভাবছে থাক, এবারের মতো করে দিবে আবার ভাবছে না একদমই করবেনা। এই গন্ডারের একটা শিক্ষার প্রয়োজন আছে। কিন্তু কালকের মতো স্পেশাল দিনে সে কিভাবে রেগে থাকবে? – তা ভেবেই আলিশা কূল পাচ্ছেনা।
-আগামীকাল আলিশার জন্য অনেক স্পেশাল দিন কারন কাল আরহামের ২১তম জন্মদিন।
এই জন্য আলিশা বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে।
–শেষমেশ সে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হলো যে – কেবল কালকের জন্য মাফ করে দিবে আরহামকে তারপর কালকের দিন শেষ হতেই আবার রেগে যাবে।
যেই ভাবা সেই কাজ – আলিশা আরহামকে সকল জায়গা থেকে আনব্লক করলো।

–আয়শা একটু আগেই আলিশার জন্য খাবার নিয়ে এসেছিলো কিন্তু আলিশা তেমন কিছুই খায়নি।
আয়শা এই নিয়ে অনেক বকেছে আলিশাকে। সন্ধ্যায় এতোবার করে বলেছে এই মেয়েকে হসপিটাল যেতে কিন্তু না মহারানী কথা শুনলে তো।
এক দফা বকাবকি শেষ করে খাবার হাতেই ফিরে যেতে হলো আয়শাকে।
–এদিকে, মায়ের সামনে নিজেকে শক্ত দেখালেও আলিশার পেইন যেন বাড়তেই আছে। এটা সে ভয়ে মাকে বলেনি নাহলে তাকে মাম্মা আরও বকা দিতো।
–ওইদিকে, আয়শা গিয়ে শাইনার কাছে আলিশার নামে নালিশ নিয়ে বসেছে।
আয়শার অভিযোগ শুনতে শুনতে শাইনা হেসে ফেললো।
তা দেখে আয়শা শুধালো –
“আপা তুমি হাসছো?”
“আয়শা দেখ, প্রেগন্যান্সিতে এসব হবেই। আরশাদের সময় তুই নিজেও এমন করতি। এখন পুতুল তোরই সেই গুন রপ্ত করেছে।”
“আপা! তুমি এখনো সেই আগের কথা নিয়ে পড়ে আছো?”
–দুজন নিজেদের গল্পে মগ্ন হলো।
এদিকে, আলিশার সহ্যর সীমা যেন পেড়িয়ে যাচ্ছে।

রাত প্রায় ১১.৩০ বাজে….
আরহামের কনসার্ট মাত্রই শেষ হয়েছে।
সুপারভাইসার আরহামের কাছে এসে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। তারা যতটুক আশা করেছিলেন তার চেয়েও দ্বিগুন সাকসেসফুল হয়েছে আজকের প্রোগ্রামটা।
–আরহামের টিম এখন সব প্যাক আপ করছে।
শো হিট হওয়ার কারনে নেহা খুশি মনে বারবার বলতেই আছে –
“ইট হোয়াজ এ ফ্যানটেস্টিক শো।”
নিধিও তাতে সায় জানিয়ে বললো –
“জনতার ভিড় দেখেছিস? এমন ভিড় আগে আর কোনো সিঙ্গারের কনসার্টে হয়নি।”
আরাফ সব গুছিয়ে নিতে নিতে বললো –
“আমাদের রকস্টার ‘আরহাম মেহতাব খান’ বলে কথা। সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই অলরেডি ট্যাগ দিতে শুরু করেছে এ.এম.কে স্টুডিও আর বিশেষ করে আরহামকে।”

–সব কথার মাঝেও আরহামের মন যেন অন্য কোথাও আটকে আছে। তার লিশার সাথে পুরা একদিন কথা হয়নি।
আরহামের এমন নিরস মুখ দেখে কাহাফ তার পিঠ চাপড়ে বললো –
“হেই ব্রো? এতো হিট শো দেওয়ার পরও মুড অফ করে রেখেছিস কেন?”
“কিছু না। এমনিতেই।”
১২ টা বাজতে আর খুব বেশি সময় বাকি নেই…
আরহাম জানে আলিশা যতই রাগ করে থাকুক না কেন? কিন্তু তার জন্মদিনে তো তার লিশা আর রেগে থাকবেনা। তা ভাবতে ভাবতেই ফোন হাতে নিলো আরহাম।
কিন্তু আলিশাকে কল করার আগেই নেহা তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো রেস্ট রুমের দিকে।
আচমকা এমন হাত টেনে ধরাতে আরহাম বেজায় বিরক্ত বোধ করলো – “উফ, কি করছিস নেহা? হাত ছাড় আমার।”

“চুপচাপ চল।”
বাকি সবাইও তাদের পিছু নিলো।
রেস্টরুমে ঢুকতেই আরহাম অবাক হয়ে তাকালো –
পুরা রুম ডেকোরেশন করা আর সামনের টেবিলে একটা বড় কেক রাখা হয়েছে। আরহাম বিষ্ময়ে কিছু বলার আগেই কানে এসে ঠেকলো বন্ধুদের মিলিত স্বর –
“হ্যাপি বার্থডে আওয়ার চকলেট বয়।”
“এসব কবে করলি তোরা?”
নেহা জবাব দিলো –
“তুই যখন গানে ব্যাস্ত ছিলি তখনই।”
আরহাম আবার জিজ্ঞেস করলো –
“তোরা তো আমার সাথেই ছিলি?”
“হ্যাঁ, তবে এসব ডেকোরেশনের দায়িত্ব নেহা নিয়েছিলো আর কেক এর দায়িত্ব নিধি।” (আদি)
আরহাম দুই হাত মেলে সবার উদ্দেশ্য বললো –
“সবাই এদিকে আয়।”
তার বলতে দেরি তবে সবার ঝাপিয়ে পড়তে দেরি হয়না।
গ্রুপ হাগ শেষে নেহা বলে উঠলো –
“চল, কেক কেটে নেই।”
আরহাম তাতে সায় দিয়ে সবার সাথে কেক কাটলো।
এসব করতে করতেই অনেকটা সময় কবে পেড়িয়ে গেলো সে টেরই পায়নি।

আলিশার ব্যাথা যেন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তার ওয়াটার ব্রেক শুরু হয়েছে। কাউকে যে ডাকবে সেই শক্তিও তার মধ্যে অবশিষ্ট নেই। শেষে আওয়াজ করতে না পেরে আলিশা বহুকষ্টে পাশের সাইড টেবিল থেকে ল্যাম্প ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো।
–আয়শা আর শাইনা লিভিং রুমে বসে গল্প করছিলো। আলিশার রুম থেকে হঠাৎ এমন আওয়াজ আসাতে দুজনেই থমকে গেলেন। তারা তাড়াহুরা করে সেদিকে গেলে কানে আসে আলিশার আর্তনাদ। তারা দ্রুত পা চালিয়ে রুমে প্রবেশ করতেই দেখলো – আলিশা ব্যাথায় কাতরাচ্ছে। তার চোখমুখ নীল হয়ে এসেছে ব্যাথায়।
আয়শা মেয়ের এমন অবস্থা দেখে যেন নড়তেও ভুলে গেলেন।
শাইনা দৌড়ে আলিশার কাছে গিয়ে তাকে ধরলো –

“পুতুল কি হয়েছে তোর?”
“অ..অনেকক ব্যাথা করছে…আহহহহহ…”
শাইনা খেয়াল করতেই দেখতে পেলো যে আলিশার ওয়াটার ব্রেক শুরু হয়েছে। তিনি ঘাবড়ে গেলেও তা প্রকাশ না করে শক্তভাবে আয়শাকে ডেকে বললেন –
“আয়শা জলদি এদিকে আয়। পুতুলনের ওয়াটার ব্রেক শুরু হয়েছে।”
আয়শার যেন হুশ ফিরলো।
সে জলদি আলিশার কাছে গিয়ে কান্না করতে করতে বললো –
“আপা এমন কেন হচ্ছে? এখনো তো সময় হয়নি…”
“এসব ভাবার সময় নেই এখন আয়শা। ওকে জলদি হসপিটাল নিতে হবে।”
আয়শা যেন নিজের মধ্যে নেই। এটা বুঝতে পেরে শাইনা শুধালেন –
“তুই ওকে সামলা। আমি গাড়ি বের করতে বলছি।
–শাইনা দৌড়ে নিচে গিয়ে গার্ডকে বললো – জলদি গাড়ি বের করতে। এমন পরিস্থিতি হবে কেউ তা ভাবতেও পারেনি। এরমধ্যে বাসায় কোনো পুরুষ মানুষ নেই।

–নিচ থেকে এসে শাইনা বেগম আগে গেলেন মেহরোজা আক্তারের রুমে।
এতো রাতে বড় বউকে নিজ কামরায় দেখে মেহরোজা আক্তার ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলেন – “কি হলো বড় বউ? এতো রাতে এখানে? আর এমনভাবে দৌড়াচ্ছো কেন?”
শাইনা তড়িঘড়ি করে বললেন –
“আম্মা, পুতুলের সময় এসে গেছে। আমরা ওকে নিয়ে হসপিটাল যাচ্ছি…”
মেহরোজা আক্তার এই নিয়ে আঁতকে উঠলেন।
“কি হই গেলো আমার পরির? আমিও যাবো।”
“আম্মা পাগলামি করবেন না, এখন এসবের সময় নেই। আর আপনার শরীর ও ভালো নেই।”
“আমি যাবো কইসি মানে যাবো। তুমি আমাকে আটকাবেনা কইয়া দিলাম।”
“আম্মা বোঝার চেষ্টা করুন, এখন সঠিক সময় নয়। আপনি সুমার সাথে থাকেন আমি ওকে বলে যাচ্ছি। ও আপনার খেয়াল রাখবে। – বলেই বেড়িয়ে গেলেন শাইনা বেগম।
–পরিস্থিতি নাগালে নেই বুঝতে পেরে মেহরোজা আক্তারও আর তেমন কিছুই বলেন নি। সুমার (সার্ভেন্ট) সাহায্য ওযু করে নামাযে বসে গেলেন তিনি।
শাইনা সাথে করে মেইড নিয়ে এসেছে আলিশার রুমে…

“মিনু তুই বাবুর জন্য যা যা লাগে সব একটা ব্যাগে করে নিয়ে ফেল। আর কায়সার (ড্রাইভার) গাড়ি বের করেছে কিনা দেখ।”
আলিশার ব্যাথা বাড়তেই আছে। সে আয়শার বুকে মুখ গুজে সমানে চিল্লিয়ে যাচ্ছে। আয়শা মেয়ের এমন আর্তনাদে কান্না করতে করতে বললেন –
“আপা আমার মেয়েটা অনেক কষ্ট পাচ্ছে।”
“আয়শা, নিজেকে শক্ত কর। আর আলিশাকে ধর, ওকে গাড়িতে নিয়ে যেতে হবে।
“পুতুল আমার মা, একটু কষ্ট কর। এখন উঠতে হবে মা।
“আম..আমি পারছিনা…”
“আয়শা ওকে ধর, যা করার আমাদেরই করতে হবে।”
আয়শা আর শাইনা অনেক কষ্টে আলিশাকে তুলতে সক্ষম হয়।
এরমধ্যেই মিনু এসে খবর দেয় –
“বড় ম্যাডাম, গাড়ি আইসে।”
“ব্যাগ নিয়েছিস?” (শাইনা)
“জ্বী।”
“সুমাকে বলে আয় আম্মার খেয়াল রাখতে।”
“আমি কইয়া আইসি। বড় ম্যাডাম আমি লগে যামু?”
“চল, আমরা একাহাতে সব সামলাতে পারবোনা। সাহায্যের প্রয়োজন পড়বে।”

–আয়শা আর শাইনা মিলে আলিশাকে গাড়িতে উঠতে সক্ষম হলো। আলিশার এখনো পুরাপুরি লেবার পেইন উঠেনি তবে ওয়াটার ব্রেক হওয়া শুরু করেছে আর ব্যাথা বাড়তেই আছে…
“মা আমি মরে যাচ্ছি…প্লিজ মা কিছু কর..র…আহহহহ..”
আয়শা মেয়েকে বুকে নিয়ে শান্তনা দিচ্ছেন আর নিজেও সমানে কান্না করছেন -“আলিশা, জানবাচ্চা আমার। এসব বলেনা মা। আর একটু অপেক্ষা করো। আমরা এক্ষুনি পৌছে যাবো।”
শাইনা ডাঃ নিলুফারকে কল দিয়ে সব জানালেন। তিনি শাইনাকে আশস্ত করে বললেন – তিনি দ্রুত হসপিটালে আসছেন।

আরহাম বারবার নিজের ফোনের দিকে তাকাচ্ছে।
১২ টা পেরিয়ে গেলেও আলিশা একবারও তাকে কল করে উইশ করেনি এবং কি বাড়ির কেউই করেনি! কেবল নীলিমা আর আরশাদ উইশ করেছে ভিডিও কল দিয়ে আর তাদের পাশে তখন বাবা আর ছোট বাবা ছিলো বলে তারাও করেছে নাহলে বোধহয় তারাও করতোনা।
-সবাই কি তবে তার বার্থডে ভুলে গেলো?
এসব ভাবতে ভাবতেই তার ফোনে কল আসলো দাদির।
আরহাম এবার মুচকি হাসলো। সবাই ভুলে গেলেও তার বুড়ি ভুলেনি।
কিন্তু কল রিসিভ করতেই যেন সে থমকে গেলো।
এটা কি শুনলো সে?
–আরহাম চটজলদি সবার মাঝ থেকে উঠে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে…
আচমকা এমন করাতে বাকি সবাই যেন বোকা বনে গেলো।
নেহা পিছন থেকে সমানে ডেকে যাচ্ছে –
“এই আরহাম কি হয়েছে?”
আরাফ আরহামের পিছু নিতে নিতে সবার উদ্দেশ্য বললো –
“তোরা থাক। আমি দেখছি।”

হসপিটালে পৌছানোর পর ডাঃ নিলুফার আলিশার কন্ডিশন দেখেই বলে দিলেন যে নরমাল ডেলিভারি হবে…
তিনি দ্রুত নার্সদের নির্দেশ দিলেন যাতে এক্ষুনি ও.টি রেডি করা হয়।
কিছুক্ষন পর…
আলিশাকে ও.টি তে নেওয়া হবে। ভয়ে তার কান্না থামার নাম নিচ্ছেনা। সে আয়শাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতেই আছে –
আয়শা মেয়েকে সাহস দিচ্ছেন বারবার –
“আমার মা, একটু শক্ত হও।”
শাইনা আলিশার হাত ধরে বললেন –
“একটু পর, দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সুখ তোর কোলে থাকবে। তোর সন্তান। তখন দেখবি, তোর সব ব্যাথা নাই হয়ে যাবে।”
“অনেক ভয় করছে আমার।”
“কিছু হবেনা মা। আমরা সবাই আছি তোমার পাশে।”
আলিশা ঢুকরে কেঁদে বারবার একই কথা বলে যাচ্ছে –
“আরহাম কোথায়? আমার ওকে লাগবে।”
আরহামের কথা শুনতেই শাইনার খেয়াল হলো – এতকিছুর মাঝে আরহাম কেই জানানো হয়নি এই ব্যাপারে।
তাও আলিশার ভয় কমাতে মিথ্যা আশ্বাস দিলো – “আরহাম আসছে।”
‘কখন আসবে?”

“এখনই চলে আসবে, তুই নির্ভয়ে ভিতরে যা।”
আলিশা কান্না করতেই আছে। তার এই মুহূর্তে আরহামকে অনেক বেশি দরকার।
দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে ডাক্তার তাড়া দিলেন –
“আলিশা এমনিতেই দেরি হয়েছে অনেক। এখন আর দেরি করলে বাবুর ক্ষতি হবে।”
বাবুর কথা শুনে আলিশা যেতে রাজী হলো।
— আলিশা যেতেই শাইনা বেগম আরহামকে কল দিলেন কিন্তু তার ফোন নট রিচেবাল আসছে।
১ ঘন্টা পর…
ডাক্তার আলিশাকে বারবার বলছেন –
“আলিশা জোড়ে পুশ করো।”
“আলিশা প্লিজ ট্রাই…”
“আর একটু আলিশা…”
আলিশা আর পারছেনা। তার শরীরে আর কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই। সে ব্যাথায় চিৎকার করছে।
“আহহহহহহহ….”
“আমি…মরে যা..বো…”

ডাক্তার নিলুফারের বড্ড মায়া লাগছে আলিশার প্রতি। বয়সই বা কত তার। এখনই বাচ্চা নেওয়া ঠিক হয়নি। কিন্তু এই সময়ে এতোকিছু ভেবে লাভ নেই তাই আলিশাকে সাহস দিয়ে বললেন-
“বি ব্রেভ গার্ল আলিশা। হয়ে গেছে আরেকটু কষ্ট করতে হবে।”
আলিশার কানে যেন কোনো কথায় যাচ্ছেনা এখন।
“প্লিজ আলিশা পুশ করো…”
এদিকে ও.টি এর বাইরে আয়শা আর শাইনার অবস্থা খারাপ।
কোনো পরিকল্পনা ছাড়া এভাবে সব হয়ে যাবে তারা ভাবতেও পারেনি। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, আরহামই নেই এখানে।
আয়শার প্রেশার লো হয়ে গিয়েছে। একদম ভেঙে পড়েছে সে। শাইনা তাকে আগলে নিয়ে সাহস দিয়ে যাচ্ছে –
“আয়শা শান্ত হও। পুতুলের কিছু হবেনা।”
“আমার মেয়েটা এখনো অনেক ছোট আপা।”
“নিজেকে সামলাতে হবে এখন। আমাদের উপর অনেক দায়িত্ব আছে। এভাবে ভেঙে পড়লে হবেনা।”
এদিকে, শাইনার ফোনে বারবার কল আসছে – মেহরোজা আক্তার আর ইতালি থেকে সবাই বারবার খোজ নেওয়ার জন্য সমানে কল দিয়ে যাচ্ছে।

–আলিশা দিস ইজ দা লাস্ট টাইম। এবার জোড়ে পুশ করবে…
আলিশা যেন হার মেনে নিয়েছে। তার এই ছোট শরীর এতো দখল আর নিরে পারছেনা।
” পারবো..না…”
“আলিশা যতো দেরি হবে বাবুর লাইফ রিস্ক ততই বাড়তে থাকবে। প্লিজ ট্রাই…”
“আলিশা প্লিজ, ডু ইট…”
“বেবির হার্টবিট কমে আসছে আলিশা…”
“প্লি..জ সেভ মাই বে..বি…”
“আমরা চেষ্টা করছি তবে তোমাকেও আমাদের সাথে কো-অপরেট করতে হবে। প্লিজ ট্রাই ইউর বেস্ট…আরেকবার পুশ করো…”

আলিশা নিজের বাচ্চার জন্য শেষবারের মতো সর্বশক্তি দিয়ে পুশ করলো…
এবার যেন কাজে হলো। দুনিয়া আলোকিত করে আগমন ঘটলো একটি ছোট্ট প্রানের।
নিজের অংশের মিহি কান্নার আওয়াজ ধীরে ধীরে কানে এসে ঠেকলো আলিশার। এত কষ্টের মাঝেও যেন এক চিলতে সুখ অনুভব হলো তার। একেই হয়তো বলে মাতৃত্বের সুখ।
ডাক্তার হাতে ছোট্ট তুলতুলে নবজাতক কে ধরে আলিশার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন –
“কনগ্রেচুলেশন গার্ল। তুমি পেরেছো।”
–আলিশার চোখের সামনে বাবুকে এনে এক ঝলক দেখাতেই সে বিড়বিড় করে বললো – “মিনি গন্ডার…”
তারপর চোখের সামনে সব অন্ধকার; জ্ঞান হারিয়েছে সে।
–একটু পরেই বেবীকে ক্লিন করে ছোট টাওয়ালে পেচিয়ে ও.টি এর বাইরে আনা হলো।
–দূর হতে, নার্সের হাতে ছোট্ট প্রানটিকে দেখে হুহু করে কেঁদে উঠলেন শাইনা এবং আয়শা। খান বাড়িতে মেলা বছর পর ছোট প্রানের দেখা মিলেছে। তারা দ্রুত এগিয়ে এসে বাবুকে কোলে নিতে গেলে ঠিক তৎক্ষনাৎ কানে এসে ঠেকলো কারও চিৎকার। কেউ একজন পিছন থেকে সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে –
“আগে আমি নিবো…”
–আওয়াজ অনুসরণ করে তারা পিছে ফিরে তাকাতেই দেখতে পেলো আরহামকে – যে এখন হাঁটুতে হাত রেখে হাঁপিয়ে যাচ্ছে।
–শাইনা আর আয়শা অবাক হয়ে গেলো আরহামকে এই সময়ে এখানে উপস্থিত দেখে। আরহাম এখানে কেমনে!!
তাদের ভাবনার মাঝেই আরহাম এগিয়ে এলো। তার পিছে পিছে আরাফ ও আসছে।

–আরহাম কাছে এসেই বাবুর দিকে ইশারা করে নার্সকে বললো-
“আমাকে দিন…”
নার্স ভ্রু কুচকে বললো – “আপনি কে?”
আরাফ পিছন থেকে জবাব দিলো –
“যে বাচ্চাটি এখন কোলে নিয়ে আছেন তারই বাপ।”
–নার্স অবাক হয়ে তাকালো আরহামের দিকে। এই পুঁচকে ছেলেটা কিনা বাচ্চার বাপ! এদিকে বয়স ৪০ পেড়িয়ে গেলেও তার এখনো বিয়েই হয়নি। নার্সের জীবনের হিসাব নিকাসের মাঝে আরহাম আবারও রুক্ষ স্বরে বললো –
“কি হলো দিন।”

–নার্স বাবুকে এগিয়ে দিলে ; আরহাম বেশ ভয়ে ভয়ে হাত বাড়ালো কোলে নেওয়ার জন্য। সে বেশ সাবধানে নিজের ছোট্ট অস্তিত্বকে হাতে নিতেই যেন কারেন্টে শক এসে লাগলো তার গায়ে। কেঁপে উঠলো তার হৃদস্পন্দন – তার বুকটা কেমন ধরফর করছে। মনে হচ্ছে, সে এখানেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। এমন কেন লাগছে? আরহাম ছোট্ট শরীরটাকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরতেই তার মনে হলো – যেন দুনিয়ার সব সুখ তার বুকে এসে ঠেকেছে। এতো সুখ এতো? এতো শান্তি? কই আগে কোনোদিন তো এমন অনুভুতি হয়নি। সে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে নিজের ছোট্ট অংশের দিকে। হঠাৎ চোখ থেকে এক ফোটা অস্রুকনা গড়িয়ে পড়লো তার নিজের অজান্তেই।
আচমকা হাতের উপর পানি দেখতে পেয়ে আরহাম থমকে গেলো – কিসের পানি এটা? আরহাম নিজেই যেন নিজের উপর অবাক। সে কি কান্না করছে! না তো, আরহাম তো শত ব্যাথা পেলেও কাঁদেনা তাহলে আজ এই অস্রুকনা কেন?
তার অন্তর যেন ভিতর থেকে চেঁচিয়ে জবাব দিলো –
“সুখের অস্রু।”

–বাচ্চাকে কোলে নিয়েই এবার নার্সের উদ্দেশ্য জিজ্ঞেস করলো – “আমার লিশা, ঠিক আছে?”
–নার্স বুঝলো, হয়তো বাচ্চার মায়ের কথা জিজ্ঞেস করছে।
তাই তিনি উত্তর দিলেন –
“ঠিক আছে তবে জ্ঞান হারিয়েছেন উনি। একটু পরেই কেবিনে শিফ্ট করা হবে।”
জ্ঞান হারানোর কথা শুনে আরহামের বুক ছেঁত করে উঠলো। সে তড়িঘড়ি জিজ্ঞেস করলো –
“জ্ঞান হারিয়েছে কেন?”
“নরমাল ডেলিভারিতে তীব্র ব্যাথার কারনে এটা হয়ে থাকে। তবে সিরিয়াস কিছু নয়। একটু পরেই জ্ঞান ফিরে আসবে।”
–আরহামের জানে যেন পানি আসলো।
তন্মধ্যে, আরাফ কাছে এসে বললো –
“এই এদিকে দেখা, কি বাবু হয়েছে?”
–আরাফের কথায় যেন সবার ধ্যান ভাঙলো। এতক্ষনেও কেউ জানেনা কি বাবু হয়েছে?
–আরহাম নিজেও আবার তাকালো নিজের কোলে থাকা ছোট্ট প্রানটার দিকে।
আয়শা নার্সকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলেন –
“আমার নাতিন এসেছে নাকি নাতি?”
নার্স মুচকি হেসে জবাব দিলেন –
“আপনাদের ঘরে রাজপুত্রের আগমন ঘটেছে।”
–আরহাম আবার তাকালো বাবুর দিকে। তার মানে আলিশার মিনি গন্ডার এসেছে। এটা ভাবতেই তার ঠোঁটজুড়ে তৃপ্তির হাসি খেলে গেলো।
শাইনা আরহামের কাছে এসে বাবুকে চেয়ে বললেন –

“এদিকে দে আমার নাতিকে। শুধুই নিজে নিয়ে রাখলেই কি হবে?”
–আরহাম এগিয়ে দিতেই বাবুকে কোলে নিলেন শাইনা বেগম।
“এটা তো পুরাই আরহামের চেহারা।”
আয়শাও নাতির চেহারা দেখে তাতে সায় দিয়ে বললেন –
“হ্যাঁ আপা, এই যেন আমাদের ছোটবেলার আরহাম।”
শাইনা এবার নাতিকে আয়শার দিকে এগিয়ে দিলেন –
“আয়শা, এবার তুই কোলে নে তোর ছোট আলিশার ছোট ছানাকে।”
-আয়শা পরম আদরে আগলে নিলেন নিজের নাতিকে। এটা উনার মেয়ের অংশ। কোলে নিয়ে আবারও কেঁদে উঠলেন তিনি।
শাইনা আয়শার কাধে হাত রেখে শুধালেন –
“আয়শা আবার কান্না করছিস কেন? দেখ, আমরা দাদি/নানি হয়ে গেছি। আজ তো আমাদের খুশি হওয়ার দিন।”
আরাফ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য বললো –

“হ্যাঁ, আন্টি বুড়ি হয়ে গেছেন আপনারা।”
“চুপ বদমাশ ছেলে, দুষ্টমি হচ্ছে?”
আরাফ হাসছে।
–ছোট থেকে আরহামের বন্ধু হওয়ার সুবাধে শাইনা এবং আয়শার কাছে আরাফ তাদের নিজ ছেলের মতোই আপন।
–এতোকিছুর মাঝে শাইনার হঠাৎ খেয়ালে আসলো যে তিনি এখনো কাউকে সুখবরই দেননি তাই ফোন হাতে নিতে নিতে ব
বললেন – “দাড়া আরশাদদের সুখবর দেই।”

তোমার আমার গল্প পর্ব ২২ (২)

শাইনা প্রস্থান করতেই আয়শা আরহামকে তাড়া দিয়ে বললেন –
“আরহাম বাবা, তুমিও তোমার দাদিকে ফোন দিয়ে নিজে সুখবর জানাও। উনি নিশ্চিত অনেক চিন্তা করছেন।”
আরহাম সায় দিয়ে ফোন হাতে চলে গেলো অন্যদিকে।

তোমার আমার গল্প পর্ব ২৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here