মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫১ (২)
jannatul firdaus mithila
Bombardier Global 7500 রেঞ্জ মডেলের বিলাসবহুল প্রাইভেট জেট! যার গায়ে গোটা গোটা রাশিয়ান অক্ষরে অঙ্কিত — দ্য শ্যাডো মনস্টার। সফেদ রঙা মেঘেদের রাজ্যে আধিপত্য নিয়ে উড়ছে জেটটি। পাইলট দু’জন বড্ড মনোযোগী। ককপিটে দক্ষ কায়দায় চালাচ্ছেন কন্ট্রোল ইয়োক।
ককপিটের ঠিক পেছনে অবস্থিত ছোট্ট গ্যালি(কিচেন)। সেথায় টুকটাক শোর তুলে কর্মে মত্ত দক্ষ শেফ। তার ঠিক বাইরে — প্রশস্ত মূল কেবিনের আরামদায়ক আসনে গা এলিয়ে বসে আছে মাহি। রমণীর পেলব মুখখানায় জমেছে রাজ্যের আঁধার। হাতদুটো আলগোছে বেঁধে রাখা বুকের সনে। ক্ষুদ্র মাথাটা সামান্য কাত করে রাখা, চোখদুটোর অনিমেষ দৃষ্টি গিয়ে ঠেকেছে জানালার বাইরে। সম্মুখেই একখানা পালিশ করা কাঠের ছোট্ট টেবিল, সেথায় সযত্নে সাজিয়ে রাখা খাবার-দাবার। পাশে ক্রিস্টাল গ্লাস, মোমবাতি স্ট্যান্ডে জ্বলছে ব্লু-লাইট পারফিউমড ক্যান্ডেল। তা হতে ব্যাপিত স্যান্ডেল-উডের সুবাসে জুড়িয়ে যাচ্ছে তন-মন। সপ্তদশী নির্বিকার। খাবারগুলো ঠান্ডা হয়েছে অবহেলায়, তবুও তার উদ্বেগ নেই সে-সবে। ক্ষনে ক্ষনে বুক চিঁড়ে বার করছে দীর্ঘ নিশ্বাস।
অন্তঃকোণ ব্যস্ত অনিশ্চিত জীবনের হিসেব মেলাতে। মূল কেবিনের ঠিক বাঁপাশের সম্পূর্ণটা জুড়ে বানিয়ে রাখা মিনি-বার কাউন্টার! ডিসপ্লেতে স্বচ্ছ ক্রিস্টালের গ্লাস, রেফ্রিজারেটরে সাজিয়ে রাখা সারি সারি পানীয়, বিদেশি এলকোহল, পার্শ্ববর্তী শেলফে বোঝাই করে রাখা বিভিন্ন শুকনো স্ন্যাক্স। কাউন্টারের সম্মুখে বিছিয়ে রাখা একখানা কাঠের টুল। সেথায় দম্ভী কায়দায় বসে আছে মুগ্ধ। একহাতে ধরে রাখা রেড ওয়াইনের কালচে সবুজ বোতল, অন্য হাতের তর্জনী এবং মধ্যমার ফাঁকে আঁটকে রাখা জ্বলন্ত ক্রুটস নিকারাগুয়ান সিগার! মুখ ভর্তি করে মাদক গিলছে রূঢ় মানব। মাঝেমধ্যে লম্বা লম্বা টান বসাচ্ছে সিগারের শেষ ভাগে! তার ক্ষীণ সরু দৃষ্টি কেমন নিষ্পলক ভঙ্গিতে আঁটকে আছে অদূরে বিষন্ন চিত্তে বসে থাকা মাহি’র পানে। রমণী ভুলক্রমেও তাকাচ্ছে না এদিকে। হয়তো বেয়াদব লোকটার সনে চোখাচোখি হবার ভয়েই এহেন উদ্বেগ তার! মুগ্ধ থামল। রেড ওয়াইনের সম্পূর্ণ বোতল শূন্য করে থামল সে। নিরবে, নিভৃতে পরক্ষনেই ধারালো দাঁতের রুষ্ট চাপায় পিষ্ট করল নিজ পিয়ার্সিং করা নিম্নাংশের ঠোঁট। পেট উগড়ে একখানা লম্বা ঢেকুর তুলে, অত্যন্ত শান্ত অথচ ভরাট গলায় ডাকল,
“ সিগনোরা!”
কপাল কুঁচকায় মাহি! তিতিবিরক্ততায় মুখটা ঘুরিয়ে রাখল আরেকটু। যুবকের শীতল দৃষ্টি তা নির্বিকারে দেখে গেল। হাতে থাকা শূন্য বোতলটা কাউন্টারের ওপর শব্দ করে তুলে রেখে, পরপরই আরেকটা স্ট্রং হুইস্কির বোতল নিলো হাতে। ধারালো দাঁতের চাপায় বোতলের ক্যাপটা আঁটকে রেখে একটানে তা খুলে এনে, অন্যত্র ছুঁড়ে ফেলে মুগ্ধ। রয়েসয়ে উঠে দাঁড়াল বসা ছেড়ে। পায়ে গতি টেনেছে মহাশয়, এগোচ্ছে সপ্তদশীর পানে। তা বোধহয় শঙ্কায় একটু-আধটু টের পেলো মাহি। তড়িঘড়ি করে ক্ষুদ্র বদনখানি সিঁটিয়ে দিলো জানালার দ্বারে। যুবক গম্ভীর! মুখভর্তি তরল নিয়ে নাড়াচ্ছে কন্ঠার উঁচু হাড়। পায়ের গতি মাহি’র সন্নিকটে এসে থামতেই বলিষ্ঠ মানব ঘটায় আরেক কান্ড! কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়াই তক্ষুনি নিজ পাহাড়সম দেহটা এলিয়ে দিলো মেয়েটার পাশে। এহেন অতর্কিত কান্ডে খানিক দুলে ওঠে মাহি। তৎক্ষনাৎ ঘাড় বাকিয়ে তিতিবিরক্ত মেজাজে তাকায় মুগ্ধের পানে। দাঁত খিঁচে বলে ওঠে,
“ ভালোমতো বসতে পারেন না অভদ্র লোক? যখন-তখন গায়ের শক্তিটুকু দেখাতেই হবে! তাই না?”
বক্র হাসি ঝুললো মুগ্ধের বাদামী ওষ্ঠপুটের রেখায়। মেয়েটাকে আরেকটু জ্বলাতে ইচ্ছে করে নিজ দেহখানা টেনে আনে আরও কাছে। এরূপ কান্ডে মহাবিরক্ত মাহি। শক্ত মুখে চোয়াল নাড়ল তক্ষুনি!
“ আবারও শুরু করলেন আপনার অসভ্যতামো? আশেপাশে কতগুলো সিট ফাঁকা পড়ে আছে। আপনার দৈত্যের মতো দেহটা সেখানে গিয়ে মেলে দিন না! তা না করে কেনো শুধু শুধু আমার দিকে চেপে বসছেন?”
মুগ্ধ নিরুত্তাপ! ঠোঁটের কোণে সিগার চেপে টানলো জোরালো নিশ্বাস। মুখভর্তি সিগারের কলুষিত ধোঁয়া নিয়ে থম মে’রে বসে রইল দু-পল। অতঃপর দৈবাৎ শক্তিতে আনমনেই কাত হলো তার ঘাড়। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিজোড়া সহসা তাক হলো মানবীর পেলব মুখপানে। অতঃপর ঠোঁটের কোণে শ্লেষাত্মক ভাবভঙ্গি ফুটিয়ে, মুগ্ধ আচমকা ফুঁ দিয়ে বসল মাহি’র মুখের ওপর। তক্ষুনি সিগারের উৎকট গন্ধে নাক-মুখ কুঁচকে আসে বেচারির। গুলিয়ে উঠে গা! তড়িঘড়ি করে মুখটা অন্যত্র ঘুরিয়ে তাকাল মাহি। দম খিঁচে ঝাঁঝাল কন্ঠে আওড়াল,
“ অসভ্য, জানোয়ার লোক একটা! কবে যে মুক্তি পাব আমি!”
সহসা গা দুলিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসিতে ফেটে পড়ে মুগ্ধ। হাসতে হাসতে চুমুক বসায় হুইস্কির বোতলে। অল্প একটু তরল গিলে আনমনে বলে ওঠে,
“ এক উপরওয়ালা বাদে, তোকে আমার কাছ থেকে কেউ মুক্ত করতে পারবেনা বান্দীর মেয়ে! ইভেন তোর মৃ ত্যুও না।”
নাক-মুখ কুঁচকে বসে আছে মাহি। তাকাচ্ছে না মুগ্ধের দিকে। তা বোধহয় সহ্য হলো না মুগ্ধের। সহসা ডানহাতখানা বাড়িয়ে দিলো সপ্তদশীর লতানো কোমরে। সেথায় হাতের আদলে একখানা শক্ত বেষ্টন তৈরী করে, হেঁচকা টানে মেয়েটাকে টেনে আনলো বড্ড কাছে। খানিক বাদে নিজ দৃঢ় চোয়ালটা আলতো করে ঠেকাল মাহি’র মসৃণ কাঁধে। অত্যন্ত প্রশান্তিময় কন্ঠে শুধালো,
“ খাবার খাচ্ছিস না কেনো সিগনোরা?”
ঝাঁঝ লেপ্টালো মাহি’র মুখে। কন্ঠায় বাড়ল তেজ। খেঁক খেঁক করে বলে উঠল,
“ খাবো না আমি এসব! অলিভ অয়েলে কিসব ঘাসপাতা রেঁধেছে। দেখে মনে হচ্ছে আমাকেই গিলে খাবে এরা। নিয়ে যেতে বলুন এসব সেদ্ধ ঘাসপাতা। এগুলো খেয়ে নিজের অতো সাধের জিহব্বার মান-সম্মান নষ্ট করতে পারব না আমি।”
সহসা দুষ্ট হাসির প্রলেপ ছড়ালো মুগ্ধের ঠোঁটের কোণে। দৃষ্টিজোড়া অর্ধনিমীলিত। সপ্তদশীর কোমর বরাবর চেপে রাখা হাতখানার জোর বাড়াল রূঢ় মানব। আঙুল গুলো খামচে ধরল রমণীর জামার একাংশ। তার বাহাতে তখনো হুইস্কির বোতল চেপে রাখা। রয়েসয়ে বোতলের মুখটা কেমন আলগোছে বেঁকে এলো মেয়েটার গায়ের ওপর। ঠিক পরপরই মাদকীয় তরলটুকু জলপ্রপাতের ন্যায় রমণীর কাঁধ হতে গড়িয়ে নামল বদনের একপাশে। এরূপ কান্ডে স্থবির মাহি! সর্বাঙ্গ কাঁপছে ক্ষনে ক্ষনে। বুকের ওঠানামার গতি বড্ড জোরালো তার। চোখদুটো ঢেকেছে নিজেদের পর্দায়। ওদিকে যুবক অস্থির বোধহয়! মস্তিষ্ক জুড়ে কেবল চলছে অবাধ্য আচ্ছন্নতা। কাঁচের বোতলটা পরিপূর্ণ রূপে শূন্য হতেই, তা অস্থিরতায় অদূরের কাউন্টারের গায়ে ছুঁড়ে ফেলে মুগ্ধ। মুহুর্তেই ঝনঝনিয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হলো অবহেলিত বোতলটা। রূঢ় মানব এবার খানিক বেঁকে বসল। বাহাতের আগ্রাসী থাবায় আচমকা টেনে ধরল সপ্তদশীর কাঁধ ঢাকা কাপড়টুকু। এদিকে প্রস্তরখন্ডের ন্যায় দৃঢ় মানবী। অনুভূতিশূন্যের চাদরে মুড়েছে তার অভিব্যক্তি। রূঢ় মানবের হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর বিন্দুমাত্র ব্যর্থ প্রয়াস নেই তার মধ্যে! মুগ্ধ মত্ত নিজ কাজে। আগ্রাসী থাবার জোরে ছিঁড়েছে রমণীর কাঁধ ঢাকা কাপড়ের অংশটুকু। উম্মুক্ত হয়েছে মাখনের ন্যায় মসৃণ কাঁধ। সহসা ঠোঁট কামড়ে কান্না সংবরণ করল মাহি। ঘৃণ্য চিত্তে মুখ ঘোরালো অন্যত্র। বিপরীতে, রমণীর মসৃণ কাঁধ হতে চোয়ালটা কেমন নড়ে উঠল মুগ্ধের। সেথায় এবার পরশ লেপ্টালো তার তীরের ফলার ন্যায় খাঁড়া নাকের ডগাটার। গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে সে স্পর্শ! যে স্পর্শের গভীরতায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও কেঁপে ওঠছে মাহি। স্পষ্ট টের পাচ্ছে মানবের বেপরোয়া অস্তিত্ব! মুগ্ধ ঘোর আচ্ছন্নতায় ডুবেছে যেন। দু’হাতে মেয়েটাকে পাশ দিয়ে জড়িয়ে ধরে দাঁত বসালো মসৃণ কাঁধে। তৎক্ষনাৎ ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে ব্যথাতুর ধ্বনি বেরিয়ে এলো সপ্তদশীর। তা কর্ণকুহরে পৌঁছালেও থামেনি মুগ্ধ। উল্টো কন্ঠে ঢের আচ্ছন্নতা ঢেলে আওড়াল,
“ ঘাসপাতা না খাস, তবে চর্বিযুক্ত ভীষণ টেস্টি কিছু দিলে খাবি সিগনোরা?”
সহসা ঘোর ভাঙল মাহি’র। কপালের চামড়ায় ভাঁজ পড়ল সন্দিগ্ধ। সে-ই সন্দিগ্ধতার ছাপ বোধহয় কন্ঠাতেও নামল তার।
“ আর সে-ই টেস্টি ‘ কিছুটা ’ কী?”
মুহুর্তেই রমণীর কাঁধ হতে মুখ তোলে মুগ্ধ। চোখদুটো ক্ষীণ করে নিয়ে শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরল সপ্তদশীর চোয়াল। অতঃপর মুখটা ঘুরিয়ে আনলো নিজের দিকে। মুখাবয়বে সে-কি দুষ্টভাব ফুটিয়ে চোখ টিপে আওড়াল,
“ এই যে! আমি। ভীষণ টেস্টি! তুই চাইলে টেস্ট করে দেখতে পারিস।”
তড়াক দৃষ্টে অগ্নি লেপ্টালো মাহি’র। দাঁতগুলো শব্দ তুলল কটমট। ক্ষুদ্র পেলব মুখখানায় দেখা গেল রাগের পরিতুষ্টি। দু’হাতে তক্ষুনি রূঢ় মানবের রুক্ষ বক্ষ ভাঁজে সজোরে ধাক্কা দিয়ে, মানবী কেমন গজগজ করতে করতে শুধালো,
“ অসভ্য লোক! আমার এতোটাও কু’দিন আসেনি, যার জন্য আপনার মতো ষাঁড়কে গিলতে হবে!”
হতভম্ব বনে গেল মুগ্ধ! বিস্ময়ে দুরত্ব বাড়ল দু-ঠোঁটের। কন্ঠায়ও বোধহয় ফুটে উঠল হতবাকতার ছাপ।
“ ওয়েট ওয়েট! আর ইউ্য ট্রায়িং টু সে — আমি ষাঁড়?”
তৎক্ষনাৎ প্রতুত্তর দিলো না মাহি। গম্ভীর মুখে নির্বিকারে উঠে দাঁড়াল বসা ছেড়ে। দৃষ্টি তাক করল অদূরে। সেথায় দৃশ্যমান হলো একখানা ভিন্ন দরজার। মাহি’র কৌতূহলী মন। যুবক কাঙ্ক্ষিত প্রশ্নের সঠিক উত্তরের অপেক্ষায় অপেক্ষায়িত জেনেও, সে ঠোঁট নাড়িয়ে সন্দিহান কন্ঠে আওড়াল,
“ ওদিকে কিসের দরজা ওটা?”
রূঢ় মানব চোয়াল শক্ত করল তৎক্ষনাৎ। এক ঝটকায় মাহি’র বাহাতের নরম তুলতুলে কব্জিসন্ধি আঁকড়ে ধরে, খানিক ঝাঁকিয়ে চিড়বিড় কন্ঠে শুধালো,
“ তোকে যা জিজ্ঞেস করেছি আগে তার উত্তর দে! তুই কি আমায় মুখের ওপর ডিরেক্টলি ষাঁড় বললি?”
শান্ত মাহি। অবিশ্বাস্যের ন্যায় আলগোছে হাত উঠিয়ে রাখল রূঢ় মানবের সদ্য ক্লিনশেভ করা দৃঢ় চোয়ালে। ঠোঁটের কোণে আচমকা ফোটালো এক চিলতে মুচকি হাসির রেশ। এহেন কান্ডে যারপরনাই হতবাক মুগ্ধ! বেভুলার ন্যায় ভুলে বসল দিনদুনিয়া। ছেড়ে দিলো নিজের রূঢ় ভাবস্রোত। অজান্তেই আলগা হলো তার শক্ত হাতের মুঠো। মাহি নিস্পৃহ! আগের মতো মুখভঙ্গি বজায় রেখে অত্যন্ত নরম কন্ঠে শুধালো,
“ বলুন না বিস্ট! ওদিকে কি আছে?”
এক অদৃশ্য মোহজালে আটকা পড়েছে মুগ্ধ। পোষ্যের ন্যায় হুট করেই পোষ মানল সপ্তদশীর। এক বাক্যেই প্রতুত্তর করল,
“ প্রাইভেট স্যুট! মানে বেডরুম।”
ফের চমৎকার হাসল মাহি। যে হাসিতে মুহুর্তেই অন্তঃকোণের কোনো এক জায়গায় চিনচিন করে উঠল মাফিয়া বিস্টের। মস্তিষ্ক হলো নড়বড়ে। পাহাড়সম দেহে নামলো উদ্ভট অসারতা। মানবী কেমন পা বাড়াল সেদিকে। পেছন থেকে তার কব্জিসন্ধিতে টান বসালো মুগ্ধ। হতবুদ্ধির ন্যায় আওড়াল,
“ আমাকে ছেড়ে কোথায় যাচ্ছিস সিগনোরা?”
মাহি তৎক্ষনাৎ পিছু ঘুরল না। রয়েসয়ে ঘাড় বাঁকায় সামান্য। ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে আলতো করে শুধালো,
“ একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি। আপনি বসুন। একটু পরেই ডেকে নিবো আপনাকে। ওকে?”
ভীষণ ভাবে পোষ মেনেছে রূঢ় মানব। হতবিহ্বলের ন্যায় ঘাড় করল কাত। ছেড়ে দিলো রমণীকে। এ সুযোগটা বড্ড দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগায় মাহি। তড়িঘড়ি করে প্রাইভেট স্যুটের পানে এগিয়ে এসে, দু’হাতে নব ঘুরিয়ে ঢুকে পড়ল কক্ষে। অতঃপর দরজাটা আলগোছে লাগিয়ে দিলো ভেতর থেকে। লকে খানিকটা শব্দ হলো তখন। লাগল বড্ড জোরালো! সে শব্দে খানিক বিচলিত হলো মুগ্ধ। মেয়েটা আবার ভুল করে নিজেকে লক করে ফেললো না তো? এহেন ভাবনায় তড়িঘড়ি করে ছুটে আসে মুগ্ধ। দরজার নবটা অনবরত ঘোরাতে ঘোরাতে চাপড় বসালো কাঠের দরজার গায়ে। কন্ঠে অস্থিরতা ঢেলে শুধালো,
“ পিচ্চি! পিচ্চি! দরজাটা লাগিয়ে দিলি কেনো? গেটটা খোল। তুই কি ভুল করে আটকা পড়ে গিয়েছিস?”
ওপাশ নিস্তব্ধ! মুহুর্তেই উদ্বেগী হলো মাফিয়া বিস্ট। তৎক্ষনাৎ ছুটে এসে সিটের পাশের কাঠের প্যানেলে রাখা কালো স্যাটেলাইট ফোনের রিসিভারটি তুলে ঠেকাল কানের পাশে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সংযুক্ত হলো লাইন। স্যুটে থাকা ফোনটা রিসিভ হতেই রূঢ় মানবের অস্থির কন্ঠ একনাগাড়ে আওড়ায়,
“ সিগনোরা? সিগনোরা আর ইউ্য ওকে? তুই… ভেতরে আটকা পড়ে গিয়েছিস না-কি? দেখ..দেখ, একদম ভয় পাস না ওকে? আমি আছি তো। আমি এক্ষুণি আসছি। তুই একদম ভয় পাবি না ওকে?”
অস্থির যুবকের কথাটা শেষ হবার ঠিক পরপরই ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো সপ্তদশীর রূঢ় কন্ঠ!
“ এতো নাটক করতে হবে না আপনার। আমি স্বেচ্ছায় দরজা লাগিয়েছি। যেন আপনার কাছ থেকে দূরে থাকতে পারি, একা থাকতে পারি! আপনার সান্নিধ্য আমার অসহ্য লাগে এটা মুখ ফুটে বললেও যেহেতু কাজ হয়না,তাই হালকা ড্রামা করে চলে এসেছি।”
থমকায় মুগ্ধ। ডুবলো বেঘোরে! পথিমধ্যে কল কেটে দেয় সপ্তদশী। অথচ রূঢ় মানব ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। তার বলিষ্ঠ হাতদুটো হুট করেই কাঁপছে। পাদু’টোর শক্ত হাড় টলমল! সেথায় বেশিক্ষণ ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না মুগ্ধ। হুট করেই দাম্ভিকতার পাহাড় ভেঙে গুড়িয়ে পড়ল প্রশস্ত সিটের গায়ে। কনক্রিটের আস্তরণে বন্দী থাকা হৃদয়টা বোধহয় কিছুক্ষণ আগেও রমণীর একটুখানি স্পর্শে পুলকিত হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছিল, অথচ এখন? সেথায় ফের নামল আমাবস্যা। ঘোর আমাবস্যা। অন্য সময় হলে হয়তো রূঢ় মানব তেজ দেখাত। রাগে ফেটে পড়ত। অথচ এবার তার উল্টোটাই ঘটল যেন। সে কি আঘাত পেলো? অন্তঃকোণে চোট লেগেছে তার? সুদর্শন মুখখানা ওমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল কেনো? বাদামী ঠোঁটদুটো হুট করেই বিড়বিড়ালো,
“ মিথ্যে? অভিনয়? আবেগ নিয়ে অভিনয়? নিজ কার্যসিদ্ধির জন্য সামান্য অভিনয় কি করে করলি বান্দীর মেয়ে? তবে কী আমি ভুল ছিলাম তোর সম্বন্ধে? বিশ্বাসঘাতকের ঔরস্যে সবসময় বিশ্বাসঘাতক জন্মায় না — কথাটা কি আবারও ভুল প্রমাণিত হলো? তুই সত্যিই তবে শিখে গেলি অভিনয় করা?”
কলকাতা ; শোভাবাজার।
সন্ধ্যা প্রায় হলো বলে। জমিদার বাড়ির সুবিশাল সদর দরজা ঠেলে ভেসে আসছে ভারী ডিজেলের ইঞ্জিনের গম্ভীর গর…র.. গররর… গর্জন। জমিদার বাড়ির নিরবতাকে গ্রাস করেছে এহেন তীব্র শব্দ। তক্ষুনি অন্দরমহল ছেড়ে গটগটিয়ে বেরিয়ে আসেন গৃহকর্তা — হিমাংশু রায়। গায়ে জড়ানো একখানা সফেদ রঙা কুর্তা, পরনে ধূতি। গম্ভীর অভিব্যাক্তি বজায় রেখে পাদু’টো বাড়িয়েছেন মধ্যবয়স্ক। বাড়ির সূদুর পথ ধরে বিশাল ফাঁকা অঙ্গনের এগোতে এগোতে কন্ঠ উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ এসব কি হচ্ছে এখানে? গেটের বাইরে এতো ট্রাক কিসের?”
তৎক্ষনাৎ কোত্থেকে যেন ছুটে এলেন মালি সাহেব। ভয় জড়িত কন্ঠে নতজানু হলেন খানিক।
“ কর্তা বাবু! ট্রাকভর্তি কইরে কাপড়চোপড় এসছে।”
ভড়কান হিমাংশু রায়। দৃষ্টিতে বিভ্রান্তি লেপ্টে তাকালেন মালি’র পানে। বিস্ময়াবিষ্ট কন্ঠে অস্ফুটে আওড়ালেন,
“ কিহ? কিসের কাপড়? কে এনেছে এতকিছু?”
“ তাতো কইবার পারিনে কর্তা বাবু। তাদের জিজ্ঞেস করলে যদি জানা যায়…!”
“ তাহলে দাঁড়িয়ে দেখছিস কী? যা…গিয়ে জিজ্ঞেস কর। কে আনলো এত কাপড়চোপড়।”
কর্তার এহেন আদেশে মুহুর্তেই পগারপার হলেন মালি সাহেব। কাঁধে ঝুলিয়ে রাখা মলিন গামছাটা দুপাশ দিয়ে আঁকড়ে ধরে ছুটলেন গেটের দ্বারে। ওদিকে হিমাংশু রায় অটল। চেয়ে আছেন একদৃষ্টে। মালি কি যেন খুসুর-পুসুর করছে ট্রাক ড্রাইভারের সাথে। ফেরার নাম-গন্ধটিও নেই। অতি-আগ্রহে হিমাংশু রায় নিজেই এগোলেন দু-কদম। পথিমধ্যে ব্যগ্র কায়দায় সম্মুখ হতে ছুটে এলেন মালি সাহেব। হাঁপাতে হাঁপাতে চেপে ধরলেন নিজ বুক। তা দেখে বিরক্ত হলেন হিমাংশু রায়। দাঁত খিঁচে ধমকে উঠেন পরপরই,
“ পরে হাঁপা! আগে বল। কে পাঠালো এসব?”
নিজেকে কোনমতে সামলালেন মালি। হাঁপাতে হাঁপাতেই বললেন,
“ অধীর দাদাবাবু!”
সহসা বিস্ফোরিত রূপ ধারণ করল গৃহকর্তার চোখদুটো। অবিশ্বাস্যের ছাপ ফুটলো মুখাবয়বে। অস্ফুট কন্ঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো,
“ অধীর!”
“ আরে আস্তে ঢোকান মশাই! এতো তারাহুরো করে কি করবেন বলুন তো? ময়লা যাতে না লাগে ওদিকে ধ্যান রাইখেন।”
অন্দরমহলের প্রশস্ত অঙ্গন পরিপূর্ণ হয়েছে কাপড়চোপড়ের রেকের স্তুপে। তবুও যেন শেষ হলোনা! বাইরে দাঁড়িয়ে আছে আরও দুটো ট্রাক। গম্ভীর মুখে সবটা দেখে যাচ্ছেন হিমাংশু রায়। তার বিচক্ষণী মস্তিষ্ক কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেনা ঘটনাপ্রবাহ। যে-ই অধীর এক নম্বরের নারী বিদ্বেষী, সে-ই অধীর-ই কি-না মেয়েদের এতো এতো কাপড়চোপড় পাঠিয়েছে? কিন্তু কেনো? কার জন্য পাঠিয়েছে এসব? নিজ ভাবনায় মত্ত মধ্যবয়স্ক। ঠিক তখনি অন্দরমহলের দোতলা হতে ভেসে এলো কারো রিনরিনে উচ্ছ্বসিত কন্ঠ!
“ এতোকিছু? এগুলো কার বাবা?”
তক্ষুনি ঘাড় উঁচায় হিমাংশু রায়। মেয়েকে দেখে ঠোঁটের কোণে ঝোলালেন জোরপূর্বক এক টুকরো হাসি। মেয়েটা কেমন ছুটন্ত প্রজাপতির ন্যায় করিডরে ছুট লাগাল। ধুপধাপ শব্দ তুলে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো নিচে। নির্মল পাদু’টো তার, অতি দ্রুততার সাথে বাবার সন্নিকটে এসে দাঁড়াল। কৌতুহলী মেজাজে ফের প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ বললে না বাবা? এসব কি? এতো কাপড়চোপড় কার জন্য এসেছে?”
হিমাংশু রায় খানিক মৌন রইলেন। অস্বস্তির জেরে বুকের কাছে আঙুল ঝুলিয়ে কেবল আওড়ালেন,
“ অধীর পাঠিয়েছে।”
নিরুর কানদুটোর পাশ দিয়ে বোধহয় এক্ষুণি একপ্রকার ভোলতা ছুটে গেল। কেমন ভো ভো আকারে শোনালো কথাটা। হতবুদ্ধির ন্যায় তাকিয়ে থাকা সপ্তদশী ফের অস্ফুটে জিজ্ঞেস করল,
“ ক-কে পাঠিয়েছে?”
বুক চিঁড়ে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন হিমাংশু রায়। দৃঢ় দৃষ্টে তাকালেন মেয়ের। নিরুর চোখদুটোর কার্নিশে জমেছে মৃদু অশ্রু। কাঁপছে তার ক্ষুদ্র তনু। মধ্যবয়স্ক মেয়ের সুখে অন্ধ হলেন ফের। দু’হাত উঠিয়ে আলগোছে রাখলেন মেয়ের গালে। অতঃপর বেশ ঠান্ডা গলায় শুধালেন,
“ অধীর পাঠিয়েছে। তোর জন্য!”
হৃদ কোণে দোল লাগল সপ্তদশীর। এক টুকরো প্রাপ্তির স্পর্শে ভেঙে এলো ক্ষুদ্র তনু। চোখদুটো বাঁধ ভাঙল ইতোমধ্যেই। হিমাংশু রায় কেবল চেয়ে দেখলেন মেয়ের খুশী। তার চোখদুটোও কেমন ছলছল করছে। তবে তা কেনো? তা হয়তো বড্ড অজানা।
রাত ৮টা বেজে ৩৫ মিনিট!
নেতাজি সুভাসচন্দ্র বোস — ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের ব্যস্ত রানওয়েতে ১০ মিনিট হলো ল্যান্ড হয়েছে — দ্য শ্যাডো মনস্টারের প্রাইভেট জেট। এয়ারক্রাফটের সিঁড়ি বেয়ে সগৌরবে নামছে মাফিয়া বিস্ট। নিজের সে-ই চিরচেনা খোলসে! গায়ে কালো রঙা ওভারকোট, ভেতরে কালো শার্ট। মুখ ঢাকা কালো রঙা ফুল মাস্কে, মাথার ওপর কালো রঙা গোলাকার টুপি! দু’হাত পকেটে গুঁজে রাখা তার, মাস্কের ওপর দিয়ে ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে রাখা জ্বলন্ত সিগার। পিছুপিছু নামছে মাহি। ভীতসন্ত্রস্ত কদম তার, এদিক ওদিক তাকাচ্ছে সর্তক দৃষ্টে। অন্যমনস্ক হয়ে নামার দরুন আচমকা রমণী খানিক হোঁচট খেল সিঁড়ির ওপর। কন্ঠে ফুঁড়ে অস্ফুটে বেরুলো মৃদু চিৎকার! আশ্চর্য! মেয়েটার ওমন চিৎকার শুনেও ফিরে তাকায়নি মুগ্ধ। উল্টো নির্বিকারে এগোচ্ছে সম্মুখে। মাহি তড়িঘড়ি করে নেমে এলো। দ্রুততার সাথে কদম মেলাতে চাইলো রূঢ় মানবের সাথে। কিন্তু বালাইষাট! লোকটার পায়ের যা গতি! তা যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। মাহি কোনপ্রকার হাঁটতে লাগল। মাত্র কয়েক মিনিট হাঁটার পরপরই মুগ্ধ নির্বিকারে গিয়ে উঠে বসল, আগে থেকেই প্রস্তুত করে রাখা হেলিকপ্টারে। তা দেখে থমকায় মাহি! হেলিকপ্টারে চড়তে গেলে ভীষণ ভয় হয় তার।
উঠতে গেলে হোঁচট খায় বারবার! সপ্তদশী দাঁড়িয়ে রইল কিয়তক্ষন। অস্থিরতায় কচলাচ্ছে হাত। ঠিক তখনি মুগ্ধ নিরবে নেমে এলো হেলিকপ্টার থেকে। গটগটিয়ে দু-কদমে এগিয়ে এসে দাঁড়াল মাহি’র মুখোমুখি। অতঃপর কোনরূপ বাক্য ব্যয়ে এক ঝটকায় কাঁধে তুলে নিলো মাহি’কে। এহেন কান্ডে মোটেও প্রতিক্রিয়া দেখায়নি মাহি। উল্টো চুপচাপ পড়ে রইল লোকটার কাঁধে। মুগ্ধ এগোচ্ছে! ধীরলয়ে হেলিকপ্টারের কাছে এগিয়ে এসে, অতি যত্নে তুলোর সাদৃশ মানবীকে বসিয়ে দিলো আসনে। পরপরই নিজ গা হতে একটানে খুলে নিলো ওভারকোটটা। মেয়েটাকে হতবাকতার সাগরে ডুবিয়ে দিয়ে, তা আলতো করে জড়িয়ে দিলো মাহি’র গায়ে। হতভম্ব মাহি কেবল যাচ্ছে সব। রূঢ় মানবের মুখো অভিব্যক্তি অদৃশ্য। আসনের পাশ হাতড়ে একখানা বড় ইয়ারপিস বের করে এনে আলগোছে তুলে দিলো মাহি’র দু-কানে। পরমুহূর্তে নিজেও উঠে এলো হেলিকপ্টারে। বোকা মানবী পূর্বের ঘটনার জের ধরে সরে যেতে চাইলেই আচমকা টান পড়ল তার লতানো কোমরে। শক্তপোক্ত হাতখানা হেঁচকা টানে তাকে মিশিয়ে নিয়েছে নিজ রুক্ষ বক্ষপিঞ্জরে। এহেন কান্ডে হতবুদ্ধির ন্যায় ভাব ধরল মাহি। মুখাবয়বে অবিশ্বাস্য ছাপ ফুটিয়ে মাস্ক পরিহিত লোকটার মুখের দিকে তাকাতেই, রূঢ় মানব একহাতে নিভৃতে তার ক্ষুদ্র মাথাটা চেপে ধরল নিজ বুকের বাঁপাশে। পরক্ষণেই গম্ভীর কন্ঠে আদেশ ছুঁড়ল,
“ টক-অফ!”
ইঞ্জিন চালু হলো পরপরই। সঙ্গে নিরব যত্ন বাড়ল নির্দয় মানবের। একহাতে শক্ত করে জড়িয়ে রাখল মাহি’কে। অন্যহাত ধীরলয়ে বুলিয়ে দিলো মেয়েটার মাথার ওপরে। এহেন এক টুকরো শান্তিতে চোখের কোণে অশ্রু জমলো মাহি’র। অন্তঃকোণে নামল অদ্ভুত দ্বন্দ্ব! এটা কী সেই লোক? প্রথমবার হেলিকপ্টারে চড়ায় ভয়ে যার গায়ের দিকে সামান্য ঠেলে বসেছিল মাহি, যিনি বলেছিল — তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিবে। আজ কি-না সে-ই মানুষটাই এমন নিবিড়ভাবে আগলে রেখেছে তাকে? একি বাস্তব? না-কি এক টুকরো ভ্রম?
জমিদার বাড়ির সুবিশাল সম্মুখ অঙ্গন। যেথায় বানানো হয়েছে ব্যাক্তিগত হেলিপোর্ট! গুড়গুড় করছে আকাশের কালো মেঘের দল। মাঝেমধ্যে গর্জন তুলছে বেশ! তবে এসবের মাঝে যা বড্ড কানে বাজছে তা হলো — অদূর থেকে ছুটে আসা একখানা কালো রঙের হেলিকপ্টারের তুমুল গর্জন। সে গর্জনে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে আশেপাশের বাসিন্দারা! উৎসুক জনতার ন্যায় ভীড় জমিয়েছে জমিদার বাড়ির আশেপাশে। আকাশের বুক চিঁড়ে ধীরলয়ে নামছে হেলিকপ্টারটি। আবির্ভাব ঘটাচ্ছে জমিদার বাড়ির সুবিশাল সম্মুখ অঙ্গনে। বাড়ির লোকজন কেমন বিস্ময় নিয়ে দেখে যাচ্ছে সবকিছু। হুট করে কে এলো এভাবে? তাও আবার অনুমতি ছাড়া? গৃহকর্তা গম্ভীর মানব। দু’হাত কোমরের পিঠে বেঁধে রেখে দাঁড়িয়ে আছেন দুয়ার পানে। থামল হেলিকপ্টার! থামল তার দ্রুত বেগে চলন্ত পাখাগুলো। এরইমধ্যে হেলিকপ্টার থেকে নেমে আসেন এক রূঢ় মানব। যার বাহ্যিক বেশভূষা দেখে মুহুর্তেই মানবকে চিনে ফেললেন হিমাংশু রায়। হতবাক কন্ঠে আওড়ালেন,
“ অধীর!”
তক্ষুনি বেশ ক’জোড়া বিস্ফোরিত দৃষ্টি একযোগে তাক হলো হিমাংশু রায়ের ওপর। অথচ হিমাংশু রায় কেমন হা করে তাকিয়ে আছে অদূরের রূঢ় মানবের পানে। তিনি যত্রতত্র পা বাড়ালেন। খুশি মনে কয়েক কদম এগোতেই হুট করেই দেখতে পেলেন — রূঢ় মানব হাত বাড়িয়েছে হেলিকপ্টারের ভেতরে। মুহুর্ত ব্যয়ে যুবকের বাড়ন্ত হাতের ওপর নেমে এলো একখানা ফর্সা মসৃণ নারী হাত!তক্ষুনি থমকে গেলেন সকলে। থমকালেন হিমাংশু রায়। তার অক্ষিপুটের সম্মক্ষেই বেরিয়ে এলো এক ভিন্ন সপ্তদশী।
নতুন শাড়ীর ঢের থেকে দেখেশুনে একখানা লাল পাড়ের সাদা শাড়ি গায়ে জড়িয়েছে নিরু। বসেছে মালা গাঁথতে। সদ্য বাগান থেকে ছিঁড়ে আনা ফুটন্ত গাদাঁ ফুলগুলো দিয়ে চমৎকার মালা গাঁথতে ব্যস্ত সে। গুনগুনিয়ে মনের সুখে গাইছে…..
“ ক্ষনিকও আলোকে….! ”
ঠিক তখনি কোত্থেকে যেন ছুটে এলো এক নির্বোধ বালক। হাঁপাতে হাঁপাতে নিরুর সন্নিকটে এসে আওড়াল,
“ নিরু দি! অধীর দা এসেছে।”
একমুহূর্ত! ঠিক একমুহূর্ত লাগল কথাটা বোধগম্য হতে। নিজেকে সামলে রমণী কেমন ইতস্তত কন্ঠে ফের জিজ্ঞেস করল,
“ কি বললে?”
বালক আবারও মুখ খুলল। ব্যস্ত তার কন্ঠ!
“ অধীর দা এসেছে।”
বিস্ময়-বিহ্বলে চোখদুটো গোল গোল হয়ে গেল নিরুর। বুকটা কাঁপতে লাগল বেশ। সর্বাঙ্গে নামল মৃদু ঝংকার। অন্তরে নামল অদ্ভুত হাওয়া! মানবী শুকনো ঢোক গিলল ক্ষনে ক্ষনে। নিজেকে কোনমতে আশ্বস্ত করে তক্ষুনি উঠে দাঁড়ায় সে। হতবুদ্ধির ন্যায় কি করবে, না করবে ভাবতে ভাবতে আচমকা মস্তিষ্কে টনক নড়ল — বরণের কথা। ওমনি ব্যস্ত কায়দায় ছুটল নিরু। ছুটলো মন্দিরের পথে।
ভীত-সন্ত্রস্ত মাহি! অচেনা পরিবেশ, অচেনা কতগুলো মুখ। কেমন বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার পানে। মেয়েটা কুন্ঠা গেল একপ্রকার। ভয়ে ভয়ে হেলিকপ্টার থেকে নামতে গেলেই বোধহীনের ন্যায় পা গেল ছুটে। আর ওমনি বোকা মানবী পড়ে যেতে উদ্যোত হলো। তবে ভাগ্যিস শক্তপোক্ত হাতের মালিক তার হাতখানা ধরে রেখেছিল! নয়তো এতক্ষণে বিপত্তি ঠিক বাধঁত। মেয়েটা পড়তে পড়তে বাঁচল যেন। পড়ে যাবার ভয়ে হুট করেই আঁকড়ে ধরল মুগ্ধের বাহুবন্ধন! তা আড়দৃষ্টে পরোখ করল যুবক। মেয়েটাকে ধরে ধরে সটানভাবে দাঁড় করিয়ে, নিশ্চুপ ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল কিয়তক্ষন। ঠিক পরপরই তার কে জানে কি হলো! সে এগিয়ে এসে আচমকা মেয়েটাকে কাঁধে তুলে নিলো ফের। এদিকে তার এহেন উটকো কান্ডে যতটা না অবাক মাহি, তারচেয়েও দ্বিগুণ হতবাক জমিদার বাড়ির প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি মানুষ।
“ আহারে দেখ দেখ! কতবড় হতভাগিনী হলে, দীর্ঘ ৮টা বছর ধরে যেই বেখেয়ালি পুরুষের নামে প্রতিদিন নিজ সিঁথিতে সিঁদুর পরে আসছে, শেষে কি-না সে-ই বেখেয়ালি পুরুষ ফিরল তো ফিরল তবে একেবারে সোহাগ করে বউ নিয়েই ফিরল! আমোলো জা! ইশশ্!”
প্রতিবেশীদের হুটহাট কানাঘুঁষায় মুহুর্তেই থমকায় নিরুর ছুটন্ত পদযুগল। বুকটা কেঁপে ওঠে ধ্বক করে! বিস্ময়, বিভ্রমে দৃষ্টি হয় এলোমেলো! দু’হাতে সাজিয়ে রাখা আরতি’র কাসার থালাটা কেমন কেঁপে উঠল অজান্তেই। আলতা রাঙা পাদু’টো টলমল হলো তার। জিভের ডগা গেল শুকিয়ে! শঙ্কিত বিজড়িত চিত্তে কদম দু’খানা আনমনে প্রতিবেশীদের নিকট ঘুরতে গেলেই একজোড়া শক্তপোক্ত হাত এসে তক্ষুনি আঁকড়ে ধরে সপ্তদশীর নরম বাহু। ফের ভড়কায় নিরু। তড়াক চোখে চায় ঘাড় বাকিয়ে। দৃষ্টি আটকালো কানাই দা’র ভঙ্গুর মুখপানে। ওমন গোমড়ামুখো লোকটা কী কাঁদতে চাইছে? চোখদুটো ওমন ছলছলে কেনো? নিরু জিভ ঠেলল ঠোঁটের কোণে। খানিক দোনোমোনো করে যে-ই না কিছু আওড়াবে তার পূর্বেই কর্ণকুহরে পৌঁছাল কানাই দা’র মোটা কন্ঠ!
“ ঘরে যা নিরু!”
দৃষ্টিতে সন্দিগ্ধতা লেপ্টে গেল নিরুর। কাঞ্চা সোনার ন্যায় পেলব মুখখানায় ছেয়ে গেল হতবাকতা। সে-ই হতবাকতার ছাপ বোধহয় নামলো কন্ঠাতেও!
“ কেনো? শুনলাম অধীর দা এসেছে। আমি না গেলে তাকে বরণ করবে কে? হাত ছেড়ে দাও কানাই দা! তাকে বরং করার অধিকার আমি বিনে অন্য কারোর নেই।”
কানাই দা’র চোখদুটো অলক্ষ্যে নিজেদের দৃষ্টি লুকলো। তা দেখে নিরুর অভ্যন্তরীণ শঙ্কা বাড়ল বৈ কমল আর না। সে উদগ্রীব। তক্ষুনি জোরপূর্বক ছাড়িয়ে নিলো নিজ বাহু। লম্বাটে ছিমছাম গড়নের কানাই দা’কে একপ্রকার উপেক্ষা করে তড়িঘড়ি করে পা চালালো অন্দরমহলের বাইরে। কানাই দা’র উৎকন্ঠা বেড়ে গেল সহসা! তিনি ত্বরিত বেগে শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়ালেন। বোনকে আগ বাড়িয়ে সর্তক করে বললেন,
“ যাস না নিরু! সহ্য হবে না তোর।”
বোকা সপ্তদশী বুঝল না ওমন মোটা বাক্য! কানাই দা’ পিছু নিয়েছে — এই ভয়ে শাড়ি ধরেই ছুট লাগালো মেয়েটা। গায়ের জোরে ছুটছে সে, ঠোঁটের কোণে একটুকরো প্রাপ্তির হাসি। সামান্য অশ্রুজড়িত চোখদুটো তার চিকচিক করছে প্রিয় মানুষটাকে মন ভরে দেখার জন্য! রমণীর ছোটার কায়দা সে-কি বেগতিক! আঁচলখানা খসে কখন যে ঠাঁই পেয়েছে ধূলোপড়া জমিনে, সে খবর থোড়াই আছে তার। ব্যস্ত রমণীর ছুটন্ত পদযুগল ততক্ষণে রুখ টানল জমিদার বাড়ির সদর দরজায়। বাইরে থেকে হেলিকপ্টারের তীব্র গর্জন ভেসে আসছে। সে-ই সঙ্গে বাড়ছে নিরুর হৃৎস্পন্দন। সামনে থেকে সকলকে একপ্রকার ঠেলেঠুলে বোকা মানবী মুখ বার করে দাঁড়াল বাইরে। আনমনে হাতের থালাটা ঠিকঠাক করতে করতে দৃষ্টিজোড়া যে-ই না তাক হলো সম্মুখে, ওমনি কোথাও যেন অদৃশ্য বজ্রপাত ঘটল। নিরুর মনে হলো বজ্রপাত তার মাথার ওপরেই পড়েছে। সর্বাঙ্গে নামল অসারতা! হৃৎস্পন্দন থেমে গেল হুট করে। চোখদুটো ডুবল ঘোর বর্ষায়। হাত থেকে অবহেলায় খসে পড়ল কাসার থালাটা। ঘোলাটে দৃষ্টিযুগল তার, এখনো দেখে যাচ্ছে,
“ ঐ যে তার বেখেয়ালি পুরুষটা এগিয়ে আসছে! মানুষ যেখানে সঙ্গে করে নিয়ে আসে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, সেখানে তার কাঁধে ঠাঁই পেয়েছে এক ভিন্ন রমণী!”
বুকের মধ্যিখানে চৌচির অবস্থা নিরুর। টলমল সর্বাঙ্গ! ততক্ষণে রূঢ় মানব এগিয়ে এসেছে। তার কাঁধে ঝুলে আছে ভিন্ন এক মেয়ে। যুবক এগিয়ে এসে দাড়াঁল একমুহূর্ত। সম্মুখে অতো মানুষকে পথরোধ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দিলো এক বিকট ধমক।
“ সাইড দেয়ার কথা আলাদা করে বলতে হবে?”
তক্ষুনি দু’ধারে সরে গেলেন সবাই। তবে হতভম্বের ন্যায় সম্মুখে দাঁড়িয়ে রইল নিরু। মেয়েটা বোধ হারিয়েছে বোধহয়। রূঢ় মানব দাঁত খিঁচে তাকাল তার পানে। চাইলো আরেকবার দিবে ধমক। কিন্তু তার পূর্বেই পাশ থেকে মেয়ের হাত টেনে ধরলেন হিমাংশু রায়। টেনে পাশে আনলেন মেয়েকে। পথ মেয়ে অভ্যন্তরে প্রবেশ করল মুগ্ধ! তার পিছু চেয়ে রইল কতগুলো ভঙ্গুর দৃষ্টি!
তিনতলার কাঠের করিডর দিয়ে হাঁটছে মুগ্ধ। এগোচ্ছে বেশ পুরনো এক কামরার দিকে। কাঁধে মাহি! নড়চড় নেই তেমন। রূঢ় মানব করিডরের একদম কর্নারের রুমের সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন। কাঁধ থেকে আলগোছে মাহি’কে নামিয়ে দিয়ে, প্যান্টের পকেটে গুঁজলেন হাত। সেখান থেকে একখানা চাবি বের করে এনে দরজায় লাগিয়ে রাখা তালাটার বুকে ঢুকিয়ে দিলেন পরপরই। মুহূর্তেই খট করে খুলে গেল তালাটা। মুগ্ধ নির্বিকারে খুলল দুয়ার। উম্মুক্ত করল কক্ষ। সপ্তশীর নেত্র গিয়ে আটকালো রাজকীয় ধাঁচের কক্ষের অভ্যন্তরে। সে-কি সৌন্দর্য তার! হতবিহ্বলতায় নিজে নিজেই কক্ষে ঢুকল মাহি। এদিক-ওদিক ঘুরে দেখতে দেখতেই হুট করে মুগ্ধ করল আরেক কান্ড। মেয়েটাকে ভেতরে রেখে দুয়ার দিয়ে দিলো বাইরে দিয়ে। এহেন কান্ডে ভড়কায় মাহি! তড়িঘড়ি করে পিছিয়ে এসে চাপড়ায় দুয়ার। বলে বেশকিছু! তবে মুগ্ধ প্রতিত্তোর করেনি। উল্টো বাইরে দিয়ে তালা লাগিয়ে দিলো কক্ষের।
দোতলার রাজকীয় কামরার বিশাল কাউচে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে মুগ্ধ! ফুঁকছে সিগার। তার সম্মুখেই দাঁড়িয়ে আছে হিমাংশু রায়, তার গিন্নি এবং নিরুপমা। কেউ কাঁদছে, কেউ বিস্ফোরিত, কেউ রাগান্বিত! হিমাংশু রায় কেমন মেজাজ খিঁচে বলে ওঠেন,
“ এটা কি করলে তুমি অধীর? কেনো করলে এসব? তুমি জানতে না নিরুর কথা? যেখানে আমার মেয়ে বিগত ৮টা বছর ধরে তোমার অপেক্ষায় সিঁথিতে সিঁদুর পরে আসছে, সেখানে তুমি ওকে কি প্রতিদান দিলে?”
দৈবাৎ শক্তিতে ঘাড় কাত করে মুগ্ধ! ঠোঁটের কোণ হতে সিগারটা নামিয়ে এনে আচমকা দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ কথায় আছে — অল্প বয়সে পাকিলে বা*ল, কাদঁতে হবে চিরকাল। ওমন বাল-পাকনা মেয়ে পয়দা করতে গেলেন কেনো বান্দীর ছেলে?
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫১
সঠিক সময়ে সঠিক জিনিস ইউজ করতে পারেন নাই? না-কি দাম বেশি ছিল বলে কিনতে পারেননি? তখন ঐসব ইউজ করতে জানলে, আজ আর এসব বুলশিট দেখতে হতো না। যে-ই বয়সে মানুষ পুতুল দিয়ে খেলেই কূল পায়না, সে-ই বয়সে আপনার মেয়ে সিঁথিতে সিঁদুর পরেছে। এটা ওর বাল পাকনামি, আবেগ নয়! এখন আপনার মেয়ের বাল-পাকনামি আমার ঘাড়ে চাপাতে আসেন কোন সাহসে? চিনেন আমায়? একেবারে টোটলা ধরে টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলব।”
