Home মৌটুসী মৌটুসী পর্ব ৪

মৌটুসী পর্ব ৪

মৌটুসী পর্ব ৪
ঋতস্বিনী মাহবিশ

​বিকেলের সূর্যটা টিনের চালের ওপর হেলে পড়েছে। হালকা বেগুনি আর কমলা রঙের আভা ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিমের আকাশে, যা এই কলোনির পুরোনো ইটের দেয়ালগুলোর গায়ে বিষণ্ন সুন্দর এক রূপ এনে দিয়েছে। বাতাসের গতি এখন একটু কম। শীতের আমেজ মাখা এই স্নিগ্ধ বিকেলে পরিবেশটা একটু বেশিই নিঝুম, শান্ত।

​ছমেদ আলীর আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে থাকা পেয়ারা গাছটার ডালপালা থেকে কিছু শুকনো পাতা ঝরে পড়ছে গাছটির তলায়। আর সেখানেই বসেছে চড়ুইয়ের ছোট্ট এক সাম্রাজ্য। মাটির ওপর এলুমিনিয়াম আর মাটির ছোট ছোট হাঁড়ি-পাতিল দিয়ে সংসার পেতে বসেছে সে। আজকের মেনু তার বেশ জাঁকালো; ইটের কুচি দিয়ে গরুর মাংস রান্না করছে, পাশের একটা মাটির হাঁড়িতে লাল বানু বেগমের আজকে রান্না করা ডাটার অবশিষ্ট অংশগুলো কেটে কেটে বানিয়েছে মাছের ঝোল, পড়ে থাকা পেয়ারা গাছের শুকনো পাতা দিয়ে শাক ভাজা, এমন নানা পদ। চড়ুই খুব নিবিষ্ট হয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে খুন্তি দিয়ে তরকারি নাড়ছে আর একমনে বিড়বিড় করে বলছে, ‘এই যে দিলাম একটু হলুদ, একটু ঝাল, এবার মাংসটা সেদ্ধ হোক।’ একেবারে যেন পৃথিবীর সেরা রাঁধুনি সে, সাথে এক নিবিষ্ট সংসারী বধুয়া।
​এমন সময়ই একজোড়া কালো স্যান্ডেল পরা নাদুস-নুদুস পা এগিয়ে অবলীলায় চড়ুইয়ের যত্ন করে রান্না করা মাংসের হাঁড়িটা লাথি মেরে উল্টে দিল। ইটের কুচিগুলো ছড়িয়ে পড়ল সবদিকে। চড়ুই ভ্রু কুঁচকে কৌতুহলী দৃষ্টিতে মাথা উঁচু করে তাকাল।
​সামনে দাঁড়িয়ে আছে মাসুম। ঠোঁট বেয়ে খিটখিটে ত্যাড়া হাসির ঝঙ্কার নামছে তার। শরীরটা বয়সের তুলনায় একটু বেশিই রিষ্টপুষ্ট হওয়ায় হাসির সাথে সাথে পুরো শরীর দুলে উঠছে। সেই সাথে দুই হাতে বড়সড় দুটো ছানার মিষ্টি তার, মিষ্টির ঝোল গড়িয়ে পড়ছে হাতের কোণ বেয়ে।
​মুহূর্তেই চড়ুইয়ের ফুরফুরে মনটা বিষিয়ে উঠল। চোয়াল শক্ত হয়ে এল। রাগী কণ্ঠে একপ্রকার চেঁচিয়ে উঠল সে,

“এই, তুমি আমার খাবার ফেলে দিলে কেন?”
​মাসুম চড়ুইয়ের কথায় পাত্তা না দেওয়ার ভঙ্গিতে ডান হাতের মিষ্টিটা মুখে পুরে মুখ বিকৃত করে চিবোতে লাগল তা। চিবোতে চিবোতেই অস্ফুট স্বরে বলল, “ইচ্ছা হইছে তাই।”
​চড়ুই একইভাবে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর মাটি থেকে ইটের কুচিগুলো হাঁড়িতে তুলে নিয়ে চট করে দাঁড়িয়ে পড়ল। মাসুম তখন বাঁ হাতের মিষ্টিটা মুখে দিতে যাবে, কিন্তু আচমকা চড়ুই ওর হাত থেকে মিষ্টিটা ছিনিয়ে নিয়ে দূরে মাটিতে ছুড়ে মারল।
​মাসুমের চোখ কপালে। বড় বড় চোখে একবার মাটিতে লেপ্টে যাওয়া মিষ্টিটার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠল সে, “ওই চুটকি-পুঁটকির বাচ্চা! তুই আমার মিষ্টি ফেলে দিলি কোন সাহসে?”
​চড়ুইও একদম ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভাব নিয়ে ঘাড় নাচিয়ে সেই একটা এটিটিউড নিয়ে বলল, “ইচ্ছে হয়েছে তাই!”

​মাসুম কিছুক্ষণ থমকে তাকিয়ে রইল চড়ুইয়ের দিকে। তারপর হঠাৎ করেই হুহু করে হেসে উঠল। তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “একটা নষ্ট হইছে তো কী হইছে? আব্বায় পুরা এক কেজি মিষ্টি নিয়া আইছে!”
​বলেই এক দৌড়ে ঘরে চলে গেল মাসুম। মিনিট খানেকের মাথায় পুরো মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে চড়ুইয়ের সামনে এসে একটা একটা করে মুখে পুরে চড়ুইকে দেখিয়ে দেখিয়ে খেতে লাগল।
​কিন্তু চড়ুইয়ের সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। সে মাসুমের এসব বালখিল্যতায় পাত্তা না দিয়ে মাথা নুইয়ে আবার তার রান্নায় ডুবে গেল। কিছুক্ষণ পর মেহেরুন ঘর থেকে বেরিয়ে আঙ্গিনার দৃশ্য দেখে মেজাজ গেল তার চটে। এগিয়ে এসে আচমকা মাসুমের পিঠে দুম করে এক কিল বসিয়ে দিল সে। হাত থেকে মিষ্টির প্যাকেটটা কেড়ে নিয়ে ধমকে উঠল,
“কোন আক্কেলে গোটা প্যাকেট নিয়ে বইছস! একবারেই এতটি মিষ্টি খাইলে বাঁচবি তুই? এমনিতেই দিন দিন তো হইতাছস হাতি! যা! হাত-মুখ ধুয়ে আয়।”

​মাসুম ভোঁতা মুখে বাথরুমের দিকে হাঁটা দিল।
​এদিকে চড়ুই ঠোঁট টিপে হাসছে। কয়েকবার নিচু স্বরে বিড়বিড় করতেও ছাড়ল না, “হাতি, মাসুম হাতি।”
​ভেতরের ঘরে জানালার পাশে সেলাই মেশিনে কাপড় সেলাই করছিলেন লালবানু বেগম। মেশিনের খটখট শব্দ ছাপিয়ে বারান্দা থেকে ভেসে আসা মেহেরুনের কড়া গলার আওয়াজ তাঁর কানে এল। চড়ুই বাইরে একা খেলছে ভেবে একটু চিন্তিত হয়েই তিনি সেলাই থামিয়ে উঠে এলেন। বারান্দায় এসে দেখলেন, আঙ্গিনায় চড়ুই একাই নিজের মনে খেলছে, আশেপাশে আর কেউ নেই।
​শীতের আবেশ গাঢ় হতে শুরু করেছে, হিমেল হাওয়া বইছে। চড়ুইয়ের পরনে কেবল একটি পাতলা ফুলহাতা গেঞ্জি। কোমর সমান চুলগুলো কিছুটা আলুথালু হয়ে পিঠে পড়ে আছে। তিনি ঘর থেকে একটা মোটা সোয়েটার আর চিরুনি নিয়ে এসে ডেকে উঠলেন চড়ুইকে,
“পাখি! এনো আও নানু।”

​চড়ুই খেলা থামিয়ে উঠে দৌড় দিল বারান্দার দিকে। ভদ্রমহিলা সোয়েটারটা পরিয়ে দিলেন তাকে। তারপর চুলে চিরুনি করে একটা আঁটসাঁট খোপা করে দিলেন। এইটুকু বয়সেই চুলে খোপা, ভাবা যায়? হ্যাঁ যায়। মৌটুসী তার শখের রাজকন্যার প্রতিটা জিনিস মনের মতো করে সাজিয়ে তুলেছে।
খোপার আদলে ছোট্ট মুখটার সৌন্দর্য কয়েকগুণ বেড়ে গেল যেন। অর্ধচন্দ্রাকৃতি কপালটা টান টান হয়ে রইল। লালবানু বেগম মুগ্ধ নয়নে দেখলেন নাতির উপচে পড়া সৌন্দর্য। চোখ, নাক, ঠোঁট, ভ্রু প্রত্যেকটা এখনই তাক লাগানোর মতন। টুকটুকে চিকন ঠোঁট দুটো থেকে এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি যেন সরতেই চায় না। একদিকে আবার নাতির এমন সৌন্দর্য নিয়ে তিনি বেশ শঙ্কিতও বটে। মেয়েদের এত সুন্দরী হতে নেই, একটু মানানসই হলেই চলে। অতিনিয়ত সুন্দরীদের ভাগ্য যেন খুব একটা সহায় হয় না; একটা অর্জনের বিনিময়ে তাদের দুটো হারাতে হয়। নিজ জীবনে তো আর কম অভিজ্ঞতা নেই তার!
​লালবানু বেগম নিজেও এককালে এমন চোখ ধাঁধানো সুন্দরী ছিলেন। তার টুকটুকে সৌন্দর্য দেখে দাদাজান সখ করে নাম রেখেছিলেন, লালবানু। অবশ্য ছেলে-মেয়েরাও তার মতনই হয়েছে। শ্যামলা, খাটো বাপের মতন তেমন একটা নয়।
​এসব নানান ভাবনার মাঝেই ভদ্রমহিলা চড়ুইয়ের সারা মুখে আদরে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
“মাটি দিয়ে খেলো না নানু। কাপড়ে ময়লা লাগব। এমনই খেলনাপাতি নিয়া খেল।”

​শিকদার বাড়ির সুপ্রশস্ত কিচেন এখন কর্মচঞ্চল। আশার উপস্থিতিতে রান্নাঘরের পরিবেশটাই বদলে গিয়েছে যেমন। সাধারণত এখানে নিয়োজিত পরিচারিকাদের হাতেই বাড়ির খাবার রান্না হয় প্রতিদিন, কিন্তু আশা বেড়াতে আসলে সে নিজেই রান্না করে। আজও তাই হচ্ছে, তিনজন পরিচারিকার মাঝে দুজনকে ছুটি দিয়ে সে নিজেই বড় ভাই আর ছোট বোনের পছন্দের খাবার রান্নায় ব্যস্ত। ধোঁয়া ওঠা কড়াই থেকে বড় রুই মাছ ভাজার সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে কিচেন জুড়ে।
​এমন সময় রান্নাঘরে প্রবেশ করল বীর, হাতে একটা বড় প্লাস্টিকের ট্রাক্টর। খেলনাটা তার তুলনায় বেশ বড়, চোখেমুখে দারুণ উত্তেজনা তার। বীর সোজা আশার কাছে গিয়ে হাত ধরে টান দিয়ে বলল, “ফুপুমনি, এসো! আমাল সাথে খেলা কলবে চলো।”
​আশা কড়াইতে মাছ ভাজতে ভাজতে খুন্তিটা নামিয়ে একটু পেছনে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, “সোনা বাবা, ফুপুমনি এখন তো রান্না করছি। এখন কিভাবে খেলব বলো?”
​”তাহলে সাফান চাচ্চুকে আসতে বলো!”
​”সাফওয়ান চাচ্চু দাদুনকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছে বাবা। তুমি বরং আরোয়া ফুপুমনির সাথে খেলো, যাও।”

​বীর মুখ গোমড়া করে ফেলল। “আলোয়া ফুপুমনি তো লেডি হচ্ছে, বলল, বাইলে যাবে। এখন খেলবে না।”
​আশা একটু অবাক হলো। একটু আগেই না ফিরল সে? এখন আবার কোথায় যাবে? আশা পরিচারিকাকে চুলা দেখতে বলে বীরকে নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল। আরোয়াও ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে নেমেছে। আশা জিজ্ঞেস করল,
“আরোয়া, কোথায় যাচ্ছিস?”
​”বাইরে আপু।”
​”কিছুক্ষণ আগেই না ফিরলি! এখন আবার বাইরে কেন?”
​”কিছুক্ষণ আগে তো ফিরলাম ভার্সিটি থেকে। এখন ভালো লাগছে না ঘরে বসে থাকতে। একটু মাইন্ড ফ্রেশ করতে হবে।”
​”মাইন্ড ফ্রেশ করবি তো বীরকে নিয়ে ছাদে যা। খোলা আকাশের নিচে বসলে ভালো লাগবে।” স্বাভাবিকভাবেই বলল আশা।
​কিন্তু আরোয়া তা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারল না। কিছুটা অসহিষ্ণু হয়ে খিটখিট করে বলে উঠল,
“আপু, সমস্যা কি? আমি কি একটু নিজের মতো চলতে পারব না?”
​আশা অবাক হলো বোনের এমন আচরণে। শীতল চোখে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“আরোয়া! কথা কোন দিকে মোড় নিচ্ছে বুঝতে পারছিস?”
​আরোয়া যেন খুব বিরক্ত। চোখ-মুখে বিরক্তি প্রকাশ করেই শান্ত গলায় বলল,
“সরি আপু! বাট আমার ফ্রেন্ডরা অপেক্ষা করছে আমার জন্য। আমাকে যেতে হবে। অনুমতি দিলে যাই?”
​আশা আর কথা বাড়াল না, শুধু ছোট করে বলল,
“যা।”

​আশা আরোয়ার পিছুটানহীন চলে যাওয়ার দৃশ্যে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মেয়েটা স্বাধীনতা পেতে পেতে দিন দিন একটু বেশিই একরোখা হয়ে উঠছে। ওরই বা দোষ কী—জন্মের পর থেকেই মা-হারা, কিশোর বয়সেই মাথার ওপর থেকে বাবার ছায়াও সরে গেল। বড় বোন হিসেবে আশা নিজেও তো এখানে স্থায়ী নয়, ছোট বোনের পাশে থাকতে পারছে না। আবার এক বড় ভাই একা কত দিক সামাল দিবে? তাকে একটু সাহস দেওয়ারও তো কোনো ভরসার হাত নেই। এখন একটু মানসিক স্বস্তির জন্য আরোয়া যদি বাইরের জগতের বন্ধু-বান্ধবদের কাছেই ভিড় জমায়, তবে তার দায়ভারটা কি শুধুই তার? আশা নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। এই বিশাল অট্টালিকা ওপর থেকে চাকচিক্যময় হলেও, ভেতরটা কেবলই নীরব শূন্যতায় ছেয়ে আছে।
​বীরের কথায় ভাবনার সুতোয় টান পড়ল আশার।
​”যাই, আমি তাহলে ভুবনেল সাথে খেলি!”

বলেই পা বাড়াল বীর। কিন্তু তৎক্ষণাৎ আশা আটকে দিল তাকে। দুই বাহুতে আদুরে হাত রেখে বুঝিয়ে বলল,
“বীর, বাবা আমার! ভুবনকে মাত্রই ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি। এখন উঠালেই কান্না জুড়ে দিবে। আমাকে আর রান্না করতে দিবে না। তুমি একটু টাইটানের সঙ্গে খেলো! ফুপুমনি একটু পরেই আসছি। যাও।”
​বীর মন খারাপ করে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে তার ঘরে চলে গেল। বীরের নিজস্ব একটা সুন্দর ঘর আছে। দেয়ালজুড়ে তার পছন্দের কার্টুন এবং মহাকাশের স্টিকার। সিলিং থেকে ঝুলছে রঙ-বেরঙের তারা আর ছোট ছোট প্লেনের মডেল। এছাড়া সারা ঘরের এখানে-সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে দেশি-বিদেশি নানান খেলনা। সব থেকে বেশি রিমোট কন্ট্রোল প্লেন আর গাড়ি। এখানেও আভিজাত্যের কোনো কমতি নেই যেন।
​ঘরের একপাশে রাখা একটা বেবি টেন্ট হাউস, বীর হামাগুড়ি দিয়ে সেই টেন্টের ভেতর ঢুকে গেল। ভেতরে নরম বিছানার ওপর আয়েশ করে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে টাইটান—গোলগাল, বাদামী বর্ণের একটা পার্সিয়ান বিড়াল। বীরের একাকিত্বের একমাত্র সঙ্গী। বীর নিজেও তার পাশে হাত-পা গুটিয়ে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। বীরের উপস্থিতি লক্ষ্য করে টাইটান একবার চোখ পিটপিট করে তাকাল তার দিকে। বীরের মলিন মুখখানা দেখে শুধাল,

“মেওওও।” (কী হয়েছে বীর?)
​বীর কোনো কথা বলল না। ঠোঁট উল্টে চোখ বুঁজে নিল সে। টাইটান কী বুঝল কে জানে? সে উঠে বীরের দিকে এগিয়ে এসে ওর শরীর ঘেঁষে শুয়ে পড়ল। বীর এবার টাইটানের উষ্ণ নরম লোমে মুখ লুকিয়ে অভিমানী গলায় বিড়বিড় করল, “আমাল সাথে কেউ খেলে না, টাইটান!”
​বীরকে পাঠিয়ে দিয়ে আশার মন কাজে স্থির হতে পারছে না। বীরের মলিন মুখখানা চোখে ভাসছে বারবার। অগত্যা সে পাশে দাঁড়িয়ে সবজি কাটতে থাকা পরিচারিকা সালমাকে বলল, “সালমা, তুমি যাও, বীরের সাথে খেলো যাও। আমি বাকি কাজ সামলে নিচ্ছি।”
​সালমা মাথা নেড়ে হাতের কাজ রেখে চলে গেল রান্নাঘর থেকে। আশা কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে রান্নায় মন দিল। বেশ কিছুক্ষণ পর তরকারিতে ঝোল দিয়ে চুলার আঁচ কমিয়ে দিয়ে ভাবল বীরের কাছ থেকে একটু ঘুরে আসবে।
​আশা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গুটি পায়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠল। করিডোর দিয়ে হেঁটে বীরের ঘরের দরজার কাছে পৌঁছাতেই পা দুটো থমকে গেল তার। সরাসরি ঘরের ভেতরে না ঢুকে দরজার আড়ালে দাঁড়াল সে। ভেতর থেকে যা শুনল তাতে রক্ত হিম হয়ে এল আশার।
​ভেতর থেকে সালমার কর্কশ কণ্ঠের ধমক ভেসে আসছে। কিছু একটা নিয়ে বীরকে খুব বকাবকি করছে সে, সাথে এটা-ওটা শব্দ করে আছড়ে কাজ করছে। যেই আদরের রাজপুত্রের সাথে বাড়ির কেউ উঁচু গলায় একটা কথা বলে না অব্দি, তাকে কিনা এভাবে ধমকাচ্ছে বাড়ির সামান্য এক পরিচারিকা! এই কি তবে বীরের জগতের আসল রূপ? তাদের আদরের রাজপুত্র কি তবে এই নিঝুম বাড়ির চার দেয়ালের ভেতরে প্রতিদিন এভাবেই বাজে ভঙ্গিতে শাসন আর অবহেলার মধ্য দিয়ে বড় হচ্ছে?

​সন্ধ্যা গড়িয়ে ছয়টা নাগাদ শোরুম থেকে বেরিয়ে কাঁচা বাজার হয়ে বাড়ির পথে রওনা হলো মৌটুসী। শীতের এই সময়ে সন্ধ্যাটা যেন একটু দ্রুতই নামে, চারিদিকে ঘন কুয়াশার হালকা চাদর জমতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই।
​এদিকে চড়ুই হাত-পা ধুয়ে বিছানার ওপর বাবু হয়ে বসেছে, সামনে খোলা একটা বই। পিঠ সোজা করে, ভ্রু কুঁচকে সে এমনভাবে বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছে যে, যে কেউ তাকে দেখে প্রথম সারির অত্যন্ত মনোযোগী স্টুডেন্ট বলে ভাববে।
​অথচ পড়াশোনার ‘প’ টাও না করে সে বইয়ের রঙিন ছবিগুলোতে মত্ত। পাতা উল্টে উল্টে ছবি দেখছে আর নিজের ভাষায় বিড়বিড় করে বর্ণনা দিচ্ছে সেগুলোর।
​এদিকে লালবানু বেগম নামাজ শেষ করে একটা ব্লাউজ আর সুঁই-সুতার কৌটা নিয়ে খাটের পাশের দেয়ালে হেলান দিয়ে মাটিতে বসে পড়লেন। বয়স হয়েছে, দৃষ্টি এখন আর আগের মতো স্বচ্ছ নয়। চশমাটা নাকের ডগায় বসিয়ে কয়েকবার ব্যর্থ চেষ্টার পর অবশেষে সুতাটা সুঁইয়ের ছিদ্র দিয়ে পার করতে সক্ষম হলেন তিনি। তারপর শুরু হয়ে গেল কাজ, সেলাই করা নতুন ব্লাউজে বোতাম লাগানো।
​ভদ্রমহিলা বহু বছর ধরে এই সেলাই কাজ করে আসছেন। এলাকায় দর্জি হিসেবে ভালো নাম-ডাকও আছে তার। টেইলার্সের থেকে মজুরি একটু কম রাখায় খদ্দেরের অভাব নেই। মাঝে মাঝে তো কাজের চাপে সিরিয়াল দিয়েও রাখা লাগে। তবে শুরুর দিকে শখের বশে যা শুরু করেছিলেন, এখন সংসারের হাল ধরতে সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে মূল ভরসা।

​একসময় অবশ্য দিনগুলো এমন ছিল না। ছামেদ আলী পেশায় ছিলেন কারেন্ট মিস্ত্রি। তার রোজগারে অভাব ছিল না, বেশ সচ্ছলভাবেই কেটে যেত তাদের সংসার। তখন লালবানুর এই সেলাই থেকে হওয়া আয় দিয়ে শখের বাড়তি খরচগুলো মিটে যেত। কিন্তু ভাগ্য যে কখন কোন মোড় নেবে, তা কেউ জানে না।
​দু-তিন বছর আগে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় সব এলোমেলো হয়ে গেল। কাজ করতে গিয়ে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটে বড় এক দুর্ঘটনার শিকার হন ছামেদ আলী। বহু কষ্টে তাকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও, শরীরের বাঁ পাশটা চিরতরে অবশ হয়ে যায়। মুখের এক পাশ বেঁকে গেছে। দীর্ঘকাল ধরে তিনি এখন সম্পূর্ণরূপে শয্যাশায়ী এবং অক্ষম এক মানুষ। নিজের ছোট্ট কাজটুকু করার ক্ষমতাও আজ আর তার নেই।
​সেই দিন থেকেই শুরু হয়েছে তাদের নতুন করে জীবনযুদ্ধ। ছামেদ আলীর ব্যয়বহুল চিকিৎসা, ওষুধের খরচ, সংসারের খরচ—কত কিছু। কেবল এই সেলাইয়ের সামান্য টাকা দিয়ে এতো কিছু সামলানো সম্ভব? সংসারে ঢুকে গেল ঋণ। সংসারের হাল ধরতে হলো মৌটুসীকেও। আয়ের উৎস হিসেবে টিউশানিকে বেছে নিয়েছিল সে। তবে কিছু দিক বিবেচনা করে মাস তিনেক আগে টিউশানি বাদ দিয়ে এই শোরুমের কাজটা নেওয়া।
​মৌটুসী ঘরে এসে ঢুকল, এক হাতে বাজারের ব্যাগ, অন্য হাতটা ক্লান্তিতে কিছুটা ঝুলে আছে। তার ঘরে ঢোকার শব্দ পেতেই চড়ুই মাথা ঘুরিয়ে তাকাল দরজার দিকে। মৌটুসীকে দেখেই সে ‘মাম্মা’ বলে উঠে খাট থেকে এক লাফে নেমে দৌড়ে গিয়ে মৌটুসীর কোমর জাপটে ধরল।
​মৌটুসী বাজারের ব্যাগটা একপাশে নামিয়ে রেখে এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল চড়ুইয়ের সামনে। মেয়ের নাকে নাকে ঘষে বলল,

“আমার মাম্মাটা কি করছিল?”
​চড়ুই গাল ভরে হেসে বলল,
“পড়াশোনা করছিল, মাম্মা।”
​”মাশাআল্লাহ! তাহলে তো গিফট দিতে হয় চড়ুই পাখিকে!”
​মৌটুসী এবার সোয়েটারের পকেট থেকে দুইটা ‘নক’ চকলেট ওয়েফার বের করে ধরল।
“কি এগুলো?”
​চকলেট দেখেই চড়ুইয়ের ছোট ছোট চোখের কুচকুচে কালো মণি জোড়া হেসে উঠল যেন। সে ঠোঁট চেপে হাত বাড়িয়ে মৌটুসীর হাত থেকে সেগুলো খপ করে লুফে নিল। তারপর ওর দিকে তাকিয়ে নিজ ভঙ্গিতে দুবার ভ্রূ নাচাল। মৌটুসী হেসে ডান গাল এগিয়ে দিল, চড়ুই টুপ করে সেখানে চুমু খেল। এবার মৌটুসী বাঁ গালটাও এগিয়ে দিল, সেখানেও ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল চড়ুই। মৌটুসীও পাল্টা আদরে ভরিয়ে দিতে লাগল চড়ুইয়ের সারা মুখ।
“যাও মাম্মা, বসে খাও। আমি হাত-মুখ ধুয়ে আসি।”
​চড়ুই মহাখুশিতে চকলেট নিয়ে ফের বিছানার দিকে ছুট দিল। মৌটুসী এবার লালবানু বেগমের দিকে তাকাল। ভদ্রমহিলা নিবিষ্ট মনে নিজ কাজ করে যাচ্ছেন। মৌটুসী কিছুটা শাসনের সুরে বলল,
“আম্মা, তোমাকে না বলছি রাতের বেলায় কাজ না করতে। এমনি চোখে কম দেখছ, এখন কি একেবারে না দেখবার ইচ্ছা আছে?”

​লালবানু বেগম চশমার ওপর দিয়ে একবার তাকিয়ে মাথা ঝাঁকালেন। “কিছু হইব না। জীবনে তো কম মসিবত নাই! এত মুসিবতের মাঝে আল্লাহ আর নতুন কোন মসিবত দিব না, বিশ্বাস আছে খোদার উপরে।”
​মৌটুসী ফোস করে ফাঁকা নিশ্বাস ছাড়ল। বুঝল মায়ের মেজাজ এখনো চটে আছে। তাই আর খুঁঁচাখুঁজি করল না সে। বাজারের ব্যাগটা নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে হাত-মুখ ধোয়ার জন্য নিঃশব্দে বাথরুমে ঢুকে গেল।
​ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে প্রতিদিনের মতোই কেক বানানোর প্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে বসে পড়ল মেঝেতে। ঠান্ডার জন্য প্লাস্টার করা মেঝেজুড়ে মোটা একটা কার্পেট বিছানো হয়েছে। ফলে নিচ থেকে তেমন হিম উঠে না। চড়ুইকেও বই-খাতা নিয়ে সামনে বসিয়ে দিল। তারপর ওকে পড়া বুঝিয়ে দিয়ে নিজে লেগে পড়ল কেকের ব্যাটার তৈরিতে। কালকে দুটো কেকের অর্ডার আছে। একটা এক পাউন্ড ও একটা দুই পাউন্ডের।

দুটোই ভ্যানিলা ফ্লেভারের বলে আলাদা করে ব্যাটার তৈরি করার ঝামেলা নেই। চড়ুই উচ্চশব্দে পড়ছে, মূলত একটা বাংলা ছড়া মুখস্থ করছে সে। ভুল হলে মৌটুসী হাতের কাজ করতে করতেই সংশোধন করে দিচ্ছে তা। ব্যাটার তৈরি হয়ে গেলে সেগুলো দুটো মাপের পাত্রে বসিয়ে ওভেনে ঢুকিয়ে দিল মৌটুসী। তারপর সব গুছিয়ে নিজেও একটা চাকরি সহায়িকা বই নিয়ে চড়ুইয়ের পাশে বসে পড়ল। গত বছর অনার্স শেষ হয়েছে তার, তারপরই কলেজ নিবন্ধনের একটা সার্কুলার প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে আবেদন করে প্রিলিতেও উত্তীর্ণ হয়েছে মৌটুসী। সামনে রিটেন আছে, তারই প্রস্তুতি চলছে তার। ভাগ্যক্রমে এই চাকরিটা পেয়ে গেলে জীবনের এই পথচলা অনেকটাই সহজ হবে! মনে মনে এই প্রত্যাশা করে বইয়ের পাতায় ডুব দিল সে।

মৌটুসী পর্ব ৩

এক ধ্যানে পড়ার মাঝে হুট করেই যেন কিছু একটা মনে হলো চড়ুইয়ের। চট করে বই থেকে মুখ তুলে মৌটুসীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“মাম্মা, আমার না একটু মিষ্টি খেতে মন চাইছে। সাদা সাদা মিষ্টি।”

মৌটুসী পর্ব ৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here