Home প্রিয় জারুলফুল প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৯

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৯

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৯
সাদিয়া সাদু

বিয়ের তারিখ ঠিক হওয়ার পর থেকে জিসার উপচে পড়া খুশি যেনো দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে । মুখে লেগে থাকা মুচকি হাসি যেনো সরছেই না ।
জহুরার বিয়ের সম্বন্ধ পাকাপোক্ত করার পর থেকেই জিসা যেন উন্মত্ত উল্লাসের এক অদৃশ্য ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। তার অধরের কোণে ঝুলে থাকা বিজয়োল্লাসের হাসিটুকু কোনোভাবেই মিলিয়ে যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে, বহু বছরের লালিত লোভ আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা আজ বাস্তবতার দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে।
কখনো দুই বাহু প্রসারিত করে ঘরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে নেচে বেড়াচ্ছে, কখনো সুর মিলিয়ে গাইছে কল্পিত জয়ের গান। কখনো আবার নিজের মাকে সঙ্গে নিয়ে উল্লাসে ঘুরপাক খেতে খেতে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জাল বুনছে। মাকে নিয়ে রুমের চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে নিম্ন স্বরে বলছে ‌।

_’ আমার দীর্ঘদিনের বাসনা পূরণ হতে যাচ্ছে আম্মু। ফাইনালি আমি দিগন্ত খানকে নিজের করে পাবো তার সাথে খানদের অর্ধ শতাধিক কোটি টাকার ফ্ল্যাট ।’
মেয়ের কথায় চোখ দুইটা চিকচিক করে উঠলো নাসিমার তার চোখের গভীরে ভাসছে এক নির্মম লোভের দীপ্তি। খান পরিবারের শতকোটি টাকার সম্পদ, অগণিত জমিজমা, ব্যবসা, প্রভাব-প্রতিপত্তি—সবকিছু । খান বাড়ির একমাত্র উত্তারাধিকার দিগন্ত খানের একমাত্র বউ তার মেয়ে হতে যাচ্ছে সেইটা ভাবতেই খুশিতে নেচে উঠছে নাসিমা ।
_’ আস্তে মা কেউ শুনতে পারবেন । ‘
জিসা মায়ের কথায় ফিক করে হেঁসে ফেলে । সে সম্পদের মোহে তার বিবেক যেন বহু আগেই নির্বাসনে গেছে। অর্থলোভের বিষাক্ত উত্তাপ ধীরে ধীরে তার সমগ্র সত্তাকে গ্রাস করেছে। শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে অবৈধ প্রাপ্তির এক বিভ্রমময় সুখানুভূতি। তার হাসির প্রতিটি রেখায় ফুটে উঠছে দখলদারিত্বের উদ্ধত ঘোষণা, আর প্রতিটি পদক্ষেপে প্রকাশ পাচ্ছে সীমাহীন লালসার নগ্ন উল্লাস।
কিন্তু সে জানেই না— তার আড়ালে চলছে এক বিরাট আলোচনার সভা ‌। এক রহস্যের দুনিয়া রয়েছে তার আড়ালে। সে জানতেই পারলো না , যার কথার তাগিদে এতো নির্মম কাজ করে যাচ্ছে এতো স্বপ্ন বুনে যাচ্ছে সে করছে আরেক পরিকল্পনার।

মেয়েকে আর জারুলকে নিয়ে দিগন্ত ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে । সাথে করে মাকেও নিয়ে এসেছে । ধানমন্ডির এই ফ্ল্যাট টা দিগন্ত নিজেরাই ব্যক্তিগত কাজের জন্য কিনেছে, এই ফ্ল্যাটের কথা বাড়ি বা অফিসে কেউ জানে না । দিগন্ত মেয়েকে কোলে নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করতেই দিয়ার চোখেমুখে জ্বলে ওঠে খুশিতে । বিশাল বড় বাড়ি তার সাথে দামি আর সুন্দর নকশায় করা দেয়াল আর ফার্নিচার দেখে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে দিয়া ‌। ডাগর ডাগর চোখ দুইটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাড়ির চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে । আস্তে করে বলে।
_’ পাপা এতা কি আমাদের বাসা ?’
_’ হে মা এইটা তোমার বাসা ‌।’
দিয়া বোকার মতো তাকিয়ে থেকে বলে ।
_’ আমার বাসা ? ‘
দিগন্ত একটু খানি হাসে । মেয়েকে নিয়ে সোফায় বসতে বসতে বলে।
_’ ইয়েস প্রিন্সেস ইউর । ‘
কথা শেষ করার আগে দিগন্তের ফোনটা রিসিভ বিকট শব্দ বেজে উঠল । ফোনের শব্দে বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে ফেলে । গালি দিতে গিয়েও মেয়ের উপস্থিতি টের পেয়ে গিলে ফেলে । প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনে নাম দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেলে ‌ । ফোনটা কানে ধরে নিচু স্বরে বলল।‌

_’ হে দাদি বলো । ‘
অপর পাশ থেকে জহুরা ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে ।
_’ কোথায় তুমি ‌? বাড়িতে আসছো না কেনো ? আগামী আধঘণ্টার ভেতর আমার রুমে উপস্থিত দেখতে চাই তোমায় । ‘
কথা শেষ করেই সশব্দে কল কেটে দেয় জহুরা । দিগন্ত মেয়েকে সোফায় বসিয়ে। দৃঢ় পায়ে জারুল এর পাশে দাঁড়ায় ।
শান্ত চোখে এক তাকিয়ে আছে ।
জারুল মায়ের লালা পড়া মুখটা পরিষ্কার করতে করতে শান্ত চোখে তাকিয়ে বলে ।‌
_’ কিছু বলবেন ? ‘
_’ যাচ্ছি আমি । সাবধানে থেকো ‌। ‘
_’ নাহহহহ পাপা । আজকে থাকবে তুমি এখন থেকে রোজ রাতে থাকবে । ‘
জারুল কিছু বলার আগেই মেয়ে কান্না জুড়ে দেয় । ফ্লোরে চিৎ হয়ে শুয়ে চিৎকার করতে শুরু করে । জারুল দাঁত কিড়মিয়ে মেয়ের কাছে এগোতে গেলেই বাঁধা দেয় দিগন্ত গরম চোখে তাকায় জারুল এর পানে। নিম্ন স্বরে বলল ।
_’ খবরদার আমার মেয়ের গাঁয়ে যেনো হাত না উঠে । ”
জারুল দাঁত কিড়মিয়ে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে বলল ।
_’ বাপ মেয়ে দুটোর উপরেই উঠবে ।’
দিগন্ত একটা ফাঁকা ঢোঁক গিলে ভয় পাওয়ার অভিনয় করে বলল ।

_’ ভয় পাইছি বউ । ‘
জারুল আবারও ধস করে বসে পড়ে । তাদের দুইজনের কথোপকথনের মাঝে দিয়া আগের চেয়েও জোরে কান্না করতে থাকে । দিগন্ত মেয়েকে কোলে নিতে নিতে বলে ।‌
_’ না মা যাবো না । থাকবো এইখানেই ।‌ কান্না করে না । ‘
মেয়েকে নিয়ে রুমে প্রবেশ করে। বাহির থেকে খেয়ে এসেছে তাড়া , তাই রান্না বা খাওয়ার প্রয়োজন পড়েনি । দিগন্ত মেয়েকে বুকের উপর নিয়ে শুয়ে পড়ে ।
তার কিছু ক্ষণ পর জারুল প্রবেশ করে রুমে। সে সোজা বেলকনিতে চলে যায় ।
দিগন্ত মেয়ের সাথে গল্প করছে ‌ দিয়া বাবার বানানো গল্প মনোযোগ দিয়ে শুনতে শুনতে দুই চোঁখের পাতা এক করে দেয় ।

বেলকনির রেলিং এ হাত চেপে দূরে ব্যস্ত শহরে চোখ রেখে তাকিয়ে আছে জারুল ।
মনের ভিতর খেলে যাচ্ছে অজানা এক সুখের ধাক্কা । শান্ত আর নরম কিছু অনুভূতি । বাহির থেকে আসা হালকা বাতাসে লম্বা চুলগুলো মৃদু উড়ে চোখে মুখে আঁচড়ে পড়ছে । দিগন্ত মেয়েকে বুক থেকে নামিয়ে পাশে শুইয়ে মৃদু পায়ে বেলকনিতে প্রবেশ করে । পিছন থেকে জাপটে ধরে , জারুল এর দৃষ্টি অনুসরণ করে সেও বাহিরে তাকায় ।
হঠাৎ করে এইভাবে ধরায় হকচকিয়ে উঠে জারুল । পরে যেতে চাইলে দিগন্ত শক্ত করে হাতের বাঁধন ‌। জারুল এইবার সামনের দিকে ঘুরে বুকের কাছে খামচে ধরে কিছু বলতে যাবে তার আগেই হাতে কিছু লাগার কারণে দিগন্তের বুকের উপর শার্টটা সরিয়ে
ফেলতে চাই ব্যস্ত হাতে ‌। দিগন্ত জারুল এর হাত সরিয়ে দেয় । জারুল রাগান্বিত মুখে তাকিয়ে ঝাঁজালো স্বরে বলে ।
_’ কি আছে এইখানে দেখি । কি লুকাচ্ছো ?’

শরীরের শক্তি দিয়ে শার্ট টা বুক থেকে সরিয়ে ফেলে। বুকের বাঁ পাশে খুদায় করে লেখা #প্রিয়_জারুলফুল । চামড়া সরিয়ে মাংসে সুন্দর করে গভীর ভাবে খূদায় করা হয়েছে । জারুল এর রাগান্বিত চোখ জোড়া নিমিষেই আধার নেমে আসে । ছলছল করে উঠে চোখ দুইটা।
(গল্প পড়েন লেখিকার মেইন পেইজ Sadia sadu – সাদিয়া সাদু থেকে )
কাঁপা কাঁপা হাতে ক্ষত স্থানে আঙ্গুল ছুঁয়ায় জারুল ‌ যেইখানে গভীর ভাবে খূদায় করা প্রিয় জারুলফুল নামটা ‌ । চোখে পানি চিকচিক করছে । পলক ফেললেই টুপ করে গড়িয়ে পড়বে পানি । অনবরত ঠোঁট কাপছে ।
দিগন্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হেঁসে আবারো কালো শার্টের আড়ালে নিতে চাইলে জারুল শক্ত হাতে শার্ট খামচে ধরে বুকের বাঁ পাশে ক্ষত স্থানটাই কাঁপা অধর ছুঁয়ে দেয় । দিগন্ত পরম আবেশে চোখ দুইটা বন্ধ করে ফেললো জারুল কান্নারত মুখটা তুলে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে বলল ‌ ।
_’ আমি যদি জানতাম আমার অনুপস্থিতিতে তুমি এতোটা উন্মাদ হবে , আমার বিরহ তোমাকে এতোটা পুড়াবে তাহলে আমি তোমাকে না ছেড়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিতাম । ‘
দিগন্ত নিজের হাতে চোখ দুইটা মুছতে মুছতে আদরমাখা গলায় বলল ।
_’ কান্না করলে তোমাকে ভয়ংকর লাগে প্রিয় । আমার কিছমিছু করতে ইচ্ছে করছে । ‘
জারুল দিগন্তের কথা কর্ণপাত না করে ভাঙ্গা গলায় আবারো বলল ।

_’ আমি অপরাধী তোমার এই ক্ষতের জন্য আমি দায়ী ‌ । যদি আমার চোখের সব অশ্রু দিয়ে এই দাগটা মুছে দিতে পারতাম তবে আমি সারাজীবন কেঁদে যেতাম ।
তোমার এই ক্ষত দেখে আমার কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে তুমি বোঝাতে পারছো না ? আমি শ্বাস নিতে পারছি না । কেনো করলে এমনটা ? কতটা আঘাত সহ্য করে তুমি এই নামটা খূদায় করলে বলো ? ‘
নিম্ন কণ্ঠে থেকে একটু জোড়ে বলে ফেলে জারুল। দিগন্তকে অনবরত ঝাঁকাতে শুরু করলে । দিগন্ত বলিষ্ঠ খসখসে হাতের বন্ধন টা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল ।‌
_’ শান্ত হও। আমার ভুল হয়েছে , কান্না ছাড়া যে কোনো শাস্তি দিতে পারো জান । আমি সব মাথা পেতে নিবো ।‌’
_’ কেনো করলে এমনটা বলো ?’
_’ ভুল হয়ে গেছে আমার ।শান্ত হও মেয়ে উঠে যাবে ।‌ কানে ধরে ওঠবস করবো ? ‘
জারুল আর কথা বলতে পারলো না । বিড়াল চানার ন্যায় গুটিসুটি মেরে দিগন্তের বুকে মুখ লুকিয়ে হেঁচকি তুলছে ।
দিগন্ত লম্বা একটা শ্বাস ফেলে জারুল এর মাথায় চুমু খেয়ে বলল ।
_’ দিয়ার একটা ভাই বোন হলে মন্দ হয় ….
কথা শেষ করার আগেই ফোনটা বেজে উঠল ।‌ দিগন্ত দাঁতে দাঁত চেপে গালি ছুঁড়ে ফোনটা বের করে মায়ের ফোন দেখে তাড়াতাড়ি ফোন ধরে।

_’ হে আম্মা । বলো ।‌’
_’ কোথায় তুই ? বাড়িতে আয় ,তোর সাথে কথা আছে আমার । তাড়াতাড়ি আসবি । ‘
দিগন্ত অসহায় মুখে জারুল এর দিক তাকিয়ে বলে ।
_’ আজ রাতে না আসলে হয় না ।‌’
_’ যদি কাল বিয়ের পিঁড়িতে বসতে চাস তাহলে আসতে হবে না। ‘
দীনা খুবই স্বাভাবিক ভাবেই কথাটা বলে ।
দিগন্ত মায়ের কথায় ডোরা সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করছে । খটমট করে বলে ।
_’ আমার অনুপস্থিতিতে কে বিয়ে ঠিক করেছে ? আসছি আমি । ‘
দিগন্ত কল টা কেটে জারুলকে নিজের বাহু থেকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সরিয়ে রুমে প্রবেশ করে । জারুল সব কথা শুনলেও শান্তভাবেই তাকিয়ে আছে । নির্বাক শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ভাঙ্গা গলায় বলে ।

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৮

_’ বিয়ে করে ফেলবে ? ‘
দিগন্ত পা বাড়াতে গিয়েও থেমে গেল।
পিছু ফিরে দাঁতে দাঁত চেপে ধরে বলে ।
_’এই দেহে নিঃশ্বাস থাকতে বিয়ে হবে না । ‘
দিগন্ত আর দাঁড়ায় না , মেয়ের কপালে শব্দ করে চুমু খেয়ে বেরিয়ে আসে ।

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here