তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৭
নীতি জাহিদ
” কি নিয়ে ভাবছো বলতো?”
” মাইশা চলে যাওয়ার পর থেকেই মেয়েটাকে আগলে রেখেছি। আমার মেয়েটা রাতে কাঁদে নয়ন। গত একটা বছর ওর মধ্যে আমি অনেক পরিবর্তন দেখেছি। ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে আমার কাছে এসে গতকাল বলে, বাবা রাতে কেউ আমার গলা চে পে, মুখ চে পে ধরেছে। প্রায় ধরে। আমার খুব কষ্ট হয়”
” একটু সময় দাও মেয়েটাকে। মা ছাড়া বড় হওয়াটা মেয়েদের জন্য অনেক কষ্টের। ঘুরে আসো মেয়েকে নিয়ে। বছর প্রায় শেষ হয়ে এলো। ওর ফাইনাল এক্সাম তো শেষ তাই না। আর একজন ভালো সাইকিয়াট্রিস্ট এর সাথে কথা বলো।এই বয়সী মেয়েদের মন মানসিকতার যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। ”
মাথা নাড়লো মিনহাজ। নিজেও ভেবেছে মেয়েকে নিয়ে ঘুরে আসবে। মায়ার বিয়ের পর থেকে মোনা বড্ড একা হয়ে গিয়েছে। সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত।মেয়েকে দেখার কেউ নেই বললেই চলে। উঠতি বয়সী মেয়েদের অনেক কেয়ার প্রয়োজন। সব কাজ থেকে ছুটি নিতে অফিসের দায়িত্ব সোহানকে বুঝিয়ে দিলো এক সপ্তাহের জন্য।
আজ রাতেই ওরা কক্সবাজার যাবে। বাবা মেয়ের ট্যুর। মিনহাজ যখন বললো ট্যুরে যাবে সেই থেকে মোনার লাফালাফি শুরু। হাসিনা বেগম দুবার এসে বকা দিয়ে গিয়েছে এত লাফালাফির জন্য। মোনা ব্যাগ গুছিয়ে ফেললো, মিনহাজের টাও গুছিয়ে দিলো। দীর্ঘ ১৪ ঘন্টা জার্নি। তাই কিছু খাবার নিয়ে উঠলো। বাড়ির সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রওয়ানা হলো কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। শ্যামলী থেকে নাইট কোচে যাবে। বাস ছাড়ে রাত সাড়ে ১১ টায়। গাড়ি নেয় নি সাথে, মোনার আবদার সাধারণ ভাবে যাবে ওরা।
রাত ২ টায় কুমিল্লা এসে হোটেলে দাঁড়ায়। বাবা- মেয়ে ডিনার সেরে নেয়। মিনহাজ ভেবেছিলো মোনা ঘুমাবে গাড়িতে কিন্তু মোনা অবাক করে দিয়ে ঘুমায় নি।বাইরের পরিবেশ দেখতে দেখতে এসেছে। হোটেল থেকে গাড়ি ছাড়ার পর বাস থামবে চট্টগ্রাম তাও ভোরে। তার আগেই কিছু খেয়ে নেওয়া উচিত ভেবে ডিনার করা। এবার ঘুমিয়ে রাত কা টি য়ে দিলো দুজনই। হোটেলে যখন বাস থামলো তখন প্রায় সাড়ে সাতটা বাজে। তার মানে এখনো আরো অনেকটা পথ। রাস্তায় পানি চিঁকচিঁক করছে। বৃষ্টি হয়েছে রাতে, পানি ও জমেছে হালকা। বাস থেকে নামার পর ঠান্ডা শিরশিরে বাতাসে শরীর মন দুটোই ভালো হয়ে গেলো। মোনা হোটেলের বাম পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়ালো। বাতাসের ঝাপটায় গাছ, পাতা বেয়ে ঝরে পড়া পানি মোনাকে ভিজিয়ে দিলো। মোনা চারদিকের ছবি তুলছে। মিনহাজ দূর থেকে মেয়ের কাজ দেখে খুশি। যাক একঘেয়ে জীবন থেকে বেরিয়ে এসে মেয়েটা শান্তি পাচ্ছে।
ডলফিন মোড় এসে বাস থামে। সেখান থেকে একটা অটো নিয়ে সোজা কলাতলী রিসোর্টে উঠবে। ১০ মিনিটের মধ্যে কলাতলী এসে সাড়ে এগারোটায় রিসোর্টে চেক ইন করে বাবা – মেয়ে। সি ভিউ রুম নিয়েছে যেন বেলকনি থেকেই রিফ্রেশমেন্ট টা পায়। সাগরের কলতান শব্দ রুমেও এসে কানে বাঁজছে।ফ্রেশ হয়ে নাস্তা খেতে গেলো। নাস্তার আইটেম ব্যুফে হলেও মোনা সন্তুষ্ট নয়, মজার আইসক্রিম, চকলেট তো দেয় নি। এত খাবার কোনো উন্নত প্রজাতির মানুষ রুপী খাদকই খেতে পারবে।
” কেমন আছেন মিনহাজ সাহেব?”
পরিচিত আওয়াজ শুনে মিনহাজ কান থেকে ফোন একপাশে রেখে উঠে দাঁড়ালো। মুখের ভাব পরিবর্তন করলো না কারণ সামনে মেয়ে আছে। মেয়ের নিরাপত্তার কথাও ভাবতে হবে।
“সাথে কে মেয়ে নাকি আপনার? বাহ মামনি বেশ বড় হয়েছো তো। দেখতেও নায়িকাদের মত।”
” জব্বার ওইদিকে চলো।”
মোনা বাবার দিকে তাকিয়ে আবার নিজের খাবারে মন দিলো। হঠাৎ ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখে ডিসপ্লে জ্বলে উঠলো।
মিনহাজ মেয়ের পাশে এসে বসে পানি খেল। মেয়েকে নিয়ে রুমে গেলো। বাবা-মেয়ে ঠিক করলো কোথায় ঘুরতে যাবে। রিসোর্ট থেকে ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম আছে।
দুপুরে লাঞ্চ করেই বেরিয়ে পড়ে গন্তব্যে। প্রথমে মেরিন ড্রাইভ রোড হয়ে সেনাবাহিনী স্পটে বিচ এর সামনে দাঁড়ালো ওদের গাড়ি। মেরিন ড্রাইভ রোড কক্সবাজার এর ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রোড যা কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত। এক পাশে সমুদ্র অন্য পাশে পাহাড়। এত কাছ থেকে সমুদ্র মোনা কখনো দেখেনি। সমুদ্রের গর্জন দূর থেকে আসছে। পুরো কক্সবাজার মাঝে আর চারপাশে পানি। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে এসেছে, মোনার মনে হলো নিজের দেশের সৌন্দর্য্য ছেড়ে মানুষ বাইরে কি পায়।
তবে পার্থক্য হচ্ছে বাইরে পর্যটনটাকে শিল্প হিসেবে নিয়ে সেই সাথে আয়ের ব্যবস্থা পাকাপোক্ত ভাবে নিলেও আমাদের দেশে সব হেলাফেলা করে। এই প্রথম কাছ থেকে সমুদ্র দেখে মন নেচে উঠলো। আশে পাশে অনেক পর্যটক। লং শার্ট আর জিন্স পরিহিত মায়াবতী মোনাকে দেখলেই আদর লাগে। যেখানেই যায় কেউ না কেউ গালটা টেনে দেয়। মাঝে মাঝে আনন্দ লাগে, কিন্তু এখন রাগ লাগে। বড় ছোট বুঝেনা মানুষজন গালটা টেনে এরা কি মজা পায়!! মোনাটাও যে তেমন গোলুমলু আদর করাটাই স্বাভাবিক। কে বলবে এই মেয়ে ক্লাস টেনে পড়ে। দেখলে মনে হয় সিক্স বা সেভেনে পড়ে।
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৬
একেবারে মায়ের গায়ের রঙ পেয়েছে মোনা। নারীরা ফর্সা হলেই সুন্দর হয় না। উজ্জ্বল শ্যামা বর্নের মেয়েরা মারাত্মক সুন্দরীর কাতারে পড়ে বলেই কবিরা মনে করেন। উঁচু করে রাবার ব্যান্ড দিয়ে চুল বাঁধার পর ও চুল ঘাড়ের নিচে পড়েছে। আশে পাশের লোকজনের চাহনী দেখে মিনহাজ মেয়েকে নিয়ে গাড়িতে উঠে গেলো। মিনহাজকে দেখেও বুঝার উপায় নেই তার মেয়ে এত বড়। বয়স তো কম হলো না। বিয়েটা একটু আগেই করেছিলো। মায়ের ইচ্ছাতেই বিয়েটা করেছিলো খালাতো বোনকে, কিন্তু বিয়ের পরই এত ভালোবাসা মাইশার কপালে সইলো না। সব ছেড়ে একা করে দিয়ে গেলো মেয়েটা। এসব এখন ভেবে কাজ নেই। খুশিটা উদযাপন করবে আজ মেয়েকে নিয়ে। বাবা- মেয়ে আজ ম্যাচিং ড্রেস পরেছে। গাড়িতে উঠেই রওয়ানা হলো কাকড়া ব্রিজ এর উদ্দেশ্যে।
