Home তুমি আমার শেষবেলা তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৮

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৮

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৮
নীতি জাহিদ

কাঁকড়া ব্রিজ বা সালসা ব্রিজ কেনো বলে জানা নেই। তবে স্থানীয়রা এই জায়গাটিকে এই দুই নামেই চিনে। এখানে ছোট একটা ব্রিজ আছে ওটা পার হলেই সমুদ্র দেখা যায়। এই ছোট্ট ব্রিজটি কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো। বেশ সুন্দর। ব্রিজ পার হলেই ঝাউ বন। মোনা তো ভীষণ খুশি। মিনহাজ মেয়ের হাত ধরে ব্রিজ পার করিয়ে দিলো। বাবা মেয়ে অনেক রকম পোজ দিয়ে ছবি তুলছে। পাশ থেকে একটি বিদেশী কাপল এসে জিজ্ঞেস করলো,

‘ আর ইউ খাপল??’
মিনহাজ হেসে উত্তর দিলো, শী ইজ মাই ডঠার এন্ড আ’ম হার ফাদার?সো উই আর ফাদার – ডঠার কাপল’
‘ ইউ আর সো ইয়াং’
মিনহাজ লজ্জা পেলো। এবার মেইল ফরেনার বলে উঠলো,
‘থোমাদের দেখে খুব কুশি হলাম।
বুঝলাম ভা ঙ্গা ভা ঙ্গা বাংলা পারে।
মেয়েটা জিজ্ঞেস করলো,
‘ হ্যালো বেবি, থোমার নাম কি?’
‘ মোনাশা ইকবাল’
বিদেশী রিপিট করলো,
‘ মওওনশাআয়া”
মেয়েটা এমন অদ্ভুত এক্সেন্টে নাম উচ্চারন করলো মোনার খুব হাসি পেলো। মনে হলো যেন মশা বলেছে। মিনহাজ মোনা ডাকতে বললে ওরা ডাকলো ‘ মনা’। তাও বাবাহ মশা থেকে হাজার গুণ ভালো। ওই কাপলটা আর মিনহাজ’ রা বীচ এর সামনে কিছুক্ষন বসলো। এখানের বীচ টা নামার জন্য উপযুক্ত নয়। ওরা কিছুক্ষন থেকে চলে আসার প্রস্তুতি নিলো।
আবার ব্রিজ পার হয়ে এলে মোনা কিছু একটা দেখে বাবার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো। সবুজ টমেটো আকৃতির এই ফল খাওয়ার বায়না ধরলো। মিনহাজ ভ্রু কুচকে ধৈর্য্য ধরে দেখছে এটা কি জিনিস। ফলটা কেটে এতে লবন,মরিচ,চিনি,কাসুন্দি দিয়ে দিলো। সব মিশিয়ে মোনার হাতে দিলো। দাম নিলো পঞ্চাশ টাকা। মিনহাজ মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,

“আম্মাজান,একটা টমেটো পঞ্চাশ টাকা,বাপরে।”
” বাবা! এটা প্যাশন ফ্রুট, স্থানীয়রা ট্যাং ফল,আনার কলি বলে। তুমি টমেটো বলছো কেনো? একটু টেস্ট করবে, ইয়াম্মি।”
মোনা বাবার মুখে ছোট্ট প্লাস্টিকের চামচ দিয়ে এক চামচ দিতেই নাক মুখ কুচকে গিরগির করে সারা শরীর কাঁপুনি দিয়ে উঠলো মিনহাজের। মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
” হোয়াট ইজ দিস আম্মা? এটা আর খেয়ো না। এমন কেনো স্বাদ? আর এটাকে ইয়াম্মি বলছো?”
” এজন্যই বলি তোমরা ভালো জিনিস চিনো না। বিস্বাদ ব্ল্যাক কফি তো খাও। এনিওয়ে আমাকে যতদিন এখানে আছি প্রতিদিন খাওয়াবে এটা কেমন?”
মিনহাজ একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেললো, কারণ সে জানে মেয়েটা মায়ের মত টক খায়। অবশ্য ফল টা এতটাও খারাপ না হয়তো। প্রথম মুখে দেওয়াতে এমন লেগেছে। মেয়ের দিকে ফিরে আশ্বাস দিয়ে বললো,
” ঠিক আছে, আরেকবার খেলে আমাকে দিও। অন্যটা কেমন দেখবো।”
মোনা অধর প্রসারিত হাসি দেয়।আবার বেরিয়ে পড়লো মিনি বান্দরবান এর উদ্দেশ্যে। স্থানীয়রা এটাকে মিনি বান্দরবান ডাকে। হিমছড়ি যাওয়ার পথে পড়ে এই জায়গাটি। পাহাড় কেটে রাস্তা বানানোতে জায়গাটির নামকরণ করা হয়েছে মিনি বান্দরবান। দেখতে বান্দরবান এর মতোই। সবুজে ঘেরা সৌন্দর্য্য চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। মোনা খুশিতে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
‘ বাবা জানো, আমার আর কোনো মন খারাপ নেই। এত সুন্দর কেনো বাংলাদেশ। আমরা সময় পেলে এখানে আসবো কেমন।’

‘ মাই প্রিন্সেস আসল সৌন্দর্য্যতো এখনো দেখোই নি। দেখতে থাকো চোখ জুড়িয়ে যাবে।’
এখানে ছোট ছোট পাহাড় গুলোতে উঠতে ভালোই বেগ পেতে হয়েছে বাবা – মেয়েকে। আশে পাশে ফটোগ্রাফাররা ঘুরঘুর করছে। মিনহাজ সাথে নিজের ডিএসএলআর নিয়ে আসাতে কাউকে প্রয়োজন হয়নি। সাথে হোটেল থেকে দেওয়া গাড়ির ড্রাইভার তন্ময় ছিলো। সে ছবি তুলে দিচ্ছে আর বর্ণনা দিচ্ছে মিনি বান্দরবান এর। মিনি বান্দরবান এর প্রকৃত লোকেশন হচ্ছে কক্সবাজার ডলফিল মোড় থেকে ইনানি বিচ যাওয়ার পথে রেজুখাল ব্রিজের সামনে থেকে ১কিলোমিটার বামে যেতে হবে। এরপরই সেই পাহাড়ে ঘেরা,সবুজে মাতোয়ারা মিনি বান্দরবান।
ওরা পাহাড় থেকে নেমে আবার গাড়িতে চেপে বসলো। এখন গন্তব্য হিমছড়ির ঝরনা। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি হিমছড়ি। ছোট ছোট সুরেলা ঝর্ণার পানি প্রবাহ অবলোকন করতে চাইলে পর্যটকদের ভরা পর্যটন মৌসুম ব্যতীত বর্ষা মৌসুমে আসতে হবে। কিন্তু এখন শীতকাল হওয়াতে পানি কম। চারপাশটা এত মোহনীয়। ইট পাথরের শহর ছেড়ে এত কাছ থেকে প্রকৃতির সান্নিধ্যে পেয়ে মন আজ খুবই সতেজ। ভিজতে পারলে হয়তো আরো ভালো লাগতো কিন্তু অতিরিক্ত কাপড় নিয়ে আসেনি। তাই ভেজার কথা মাথা থেকে বাদ দিয়ে দিলো।মোনার চোখ বন্ধ করে মনে হলো কত দিনের পিপাসার্ত মানবী প্রকৃতিতে সুখ সন্ধানে বের হয়েছে। মোনা চোখ খুলে বাবাকে বললো,

‘ বাবা সুখী হতে কি লাগে?’
মিনহাজ মেয়ের কথা মৃদু হেসে বলে,
‘ তোমার মত একটা লিটেল ফেইরী, তোমার মায়ের মত কুইন, আর আমার মত একটা অসুন্দর বাবা।’
” বাবা, কি বলো এসব। আমি ওটা শুনতে চাইনি। আচ্ছা বাবা, আমি জানি আমার সুখ কিসে, কিন্তু সেই সুখ অধরা, স্পর্শের বাইরে, কাছে পেতে অনেক দ্বিধা। কারো কোনো ক্ষতি না করে সেই সুখ যদি আমি অর্জন করি সেটা কি খুব অন্যায় হবে।”
মেয়ের কথায় মিনহাজ তড়াক করে তাকালো। কারণ এই মেয়ে ভয়ংকর পথে পা বাড়াবে বলে জানতো মিনহাজ কিন্তু আন্দাজ করতে পারছেনা। আবার পরক্ষনে মাথায় এলো টিনএইজ সামলাতে গেলে অনেক নমনীয় হয়ে বুঝাতে হবে। এমন সময় কতো উদ্ভট চিন্তা মাথায় আসবে এটাই যেন স্বাভাবিক বরং না আসাটা স্বাভাবিক। মেয়েকে আশ্বাস দিয়ে বললো,

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৭

” যদি কারো কোনো ক্ষতি নাহয়, তবে তোমার সুখ শুধুই তোমার।এটা তোমার অধিকার। অন্যায় কেনো হবে?”
” রাগ করবে নাতো?”
” আমি রাগ করার মত কিছু?”
” ওই যে বললাম অধরা,অনেক দ্বিধা কিন্তু ক্ষতিকর না।”
মেয়ের মাথায় হাত রেখে মিনহাজ মুচকি হেসে দুপাশে না করে মাথা নাড়ালো। বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বের করে বাবাকে জড়িয়ে ধরলো মোনা। চোখ দিয়ে দু ফোঁটা অশ্রু কেনো ঝরলো বুঝতেই পারলো না। মোনা জানে কিছু জিনিস নিষিদ্ধ, সে যদি চাওয়ার পর না পায় কি করে সামলাবে নিজেকে। নিজের গন্ডি থেকে বের হয়ে অনেকটা ফ্রেশ লাগছে।

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here