মৌটুসী পর্ব ১৭
ঋতস্বিনী মাহবিশ
“হোয়াট আ পারফেক্ট সিমিলারিটি, ম্যান! জাস্ট লাইক আ ভেরি আইডিয়ালি স্যুটেড নেম— সানবার্ড।”
“আঙ্কেল!”
চড়ুইয়ের ডাকে বোরাক তার আপন চিন্তার জগত থেকে বেরিয়ে এল। মাথা ঘুরিয়ে চড়ুইয়ের দিকে তাকাল সে, “হুম, স্পেরো!”
“তোমার পাপা আছে, আঙ্কেল?”
বোরাক কিছুটা সময় চুপ থেকে অল্প হেঁসে বলল, “না মামনি। নেই। আল্লাহর কাছে চলে গিয়েছে।”
চড়ুই এবার নিষ্পাপ গলায় খুব সাবলীলভাবেই বলে দিল, “অহ! তোমার মতো আমারও পাপা নেই!”
চড়ুইয়ের মুখে কথাটা শোনামাত্রই বোরাকের হৃদপিণ্ড থমকে গেল কিছু মুহূর্তের জন্য। এটা তার কাছে একেবারে নতুন কোনো তথ্য নয়, বরং চড়ুইয়ের বাবাকে না পাওয়ার রূঢ় সত্যটা তার পূর্ববিদিতই ছিল। কিন্তু একটা চার-পাঁচ বছরের নিষ্পাপ বাচ্চার মুখ থেকে এই করুণ বাক্যটি সরাসরি শোনার তীব্রতা যে এত বেশি হতে পারে, তা সে আগে অনুভব করেনি। বোরাক যেন তার জবানের ভাষা হারিয়ে ফেলল। বুকের বাঁ পাশে কোথায় যেন এক চিনচিনে ব্যথা একা একা অনুভূত হচ্ছে, যা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।
বোরাককে গভীর নিস্তব্ধতার মধ্যে ডুবিয়ে রেখেই চড়ুই এবার এক আবদার পেশ করে বসল, “বীরের মতো আমিও তোমাকে যদি পাপা ডাকি, তুমি কি রাগ করবে, আঙ্কেল?”
বোরাকের সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে চড়ুই এবার একখান আবদার পেশ করে ধরল তার নিকট- “বীরের মতো আমিও তোমাকে যদি পাপা ডাকি, তুমি কি রাগ করবে, আঙ্কেল?
বোরাক আবারো থমকাল। এবারও কোনো কথা বলতে পারল না সে, কেবল স্থির দৃষ্টিতে চড়ুইয়ের ওই নিষ্পাপ আদুরে মুখপানে চেয়ে রইল অপলকভাবে। সেখানে যেন এক পৃথিবী সমমানের আকুতি।
ছোট্ট চড়ুই বোরাকের অনুমতির অপেক্ষা করল না। তার বাদামী চোখ জোড়ার দিকে সরাসরি তাকিয়ে, কিছুটা আড়ষ্টতা আর পাহাড়সম মায়া নিয়ে খুব আস্তে করে ডেকে উঠল, “পাপা!”
এই মুহূর্তে বোরাকের পৃথিবীটা যেন এক বিন্দুতে এসে স্থির হয়ে গেছে। অনুভূতিগুলো মস্তিষ্কের কোথাও গভীরভাবে জট পাকিয়ে যাচ্ছে, কোনো নির্দিষ্ট আবেগই সে আলাদা করতে পারছে না—এটা কি অপার স্নেহ, নাকি কোনো অব্যক্ত ব্যথা? বোরাক এবার মাথাটা হালকা ঝাঁকিয়ে নিজেকে সামলে নিল। ধীরস্থিরভাবে চড়ুইয়ের দুগাল নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে পরম আদরে বলল, “আবার ডাকো তো মা!”
চড়ুই একই ভাবে বোরাকের চোখের দিকে চেয়ে আবারও ডেকে উঠল, “পাপা!”
বোরাক আর সময় নিল না। চড়ুইয়েকে টেনে নিজের বুকে জড়িয়ে নিল। ওর কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস কন্ঠে বলল, “ইয়েস প্রিন্সেস!”
বোরাকের মা, মিসেস শাইলি শিকদার, যখন তৃতীয় সন্তান আরোয়ার জন্ম দেন, বোরাক তখন সদ্য কৈশোরে পা রেখেছে। প্রসবকালীন কিছু জটিলতায় ভদ্রমহিলা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সেই অসুস্থতা আর কাটল না। বিছানা নেওয়ার মাস ছয়েকের মাথায় তিনি চিরবিদায় নিলেন পৃথিবী থেকে। স্ত্রীর স্মৃতি আর তিন সন্তানের কথা ভেবে আযান উদ্দিন শিকদার দ্বিতীয়বিয়ে করেননি। বোরাকের জীবনে তার মায়ের অস্তিত্ব এভাবেই সীমাবদ্ধ ছিল। মা বলে ডাকার জন্য তথাকথিত সৎ মা-টাও ছিল না।
পরবর্তী জীবনে বাবা হওয়ার সংবাদ তাকে নতুন আলো দিয়েছিল। স্ত্রীর গর্ভকালীন চার মাসের আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে ডাক্তার জানালেন তার কোল আলো করে কন্যা সন্তান আসছে।এই নীরব পৃথিবী সাক্ষী, সেদিন বোরাকের খুশি আকাশ পাতাল এক করেছিল। সন্তান হয়ে তার মা ফিরে আসছেন তার পৃথিবীতে। সে এবার ‘মা’ বলে ডাকতে পারবে কাউকে, তার ডাক শোনার জন্য, আগলে নেওয়ার জন্য কেউ আসছে। কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা নিশ্চয়ই সর্ব উত্তম পরিকল্পনাকারী। সন্তান পৃথিবীতে আসার মাস দুয়েক আগেই বোরাক প্রিয় বাবাকে চিরতরে হারাল।
বাবা হারানোর শোক যখন তার পৃথিবীকে গ্রাস করতে বসেছিল, তখনই মহান আল্লাহ তাকে উপহার দিলেন ‘বাবা’ রূপী এক ছেলেকে। বীরের আগমন বাবার শোক কাটিয়ে উঠতে অনেকখানি ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু মায়ের স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে গেল বোরাকের।
নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলায় অবস্থিত পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার বা সোমপুর মহাবিহার, বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম। অষ্টম শতকের শেষভাগে বা নবম শতকের শুরুতে পাল বংশীয় রাজা ধর্মপাল এই বিশাল বিহারটি নির্মাণ করেন। এটি তৎকালীন সময়ে বৌদ্ধ ধর্ম ও শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে এশিয়াজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছিল।১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয়। দেশ বিদেশ থেকে নানান পর্যটক এখানে আসেন ইতিহাসের সাক্ষী হতে। অথচ বাড়ির এত কাছে হলেও মৌটুসীর কখনো আসা হয় নি।
এতদিন সে কেবল বইয়ের পাতাতেই এর মাধুর্যতা পড়েছে আর লোকমুখে বর্ণনা শুনে এসেছে, কখনো এই ঐতিহাসিক নিদর্শন নিজের চোখে দেখার সুযোগ হয়। তবে আজ মেয়ের অছিলায় সেও এই ইতিহাসের সাক্ষী হতে যাচ্ছে।
রাস্তার বিট পার হওয়ার সময় বাসের ঝটকায় তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল মৌটুসীর। সিট থেকে মাথা তুলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল সে, বুঝল গন্তব্যের খুব কাছে তারা। পরিত্যক্ত বিহারটি পাখির চোখে দৃশ্যমান হচ্ছে। মৌটুসী মাথা নামিয়ে কোলের দিকে তাকাল। বীর তার বাহুর ভাঁজে মাথা রেখে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন—প্রায় পুরোটা রাস্তাই সে এভাবে ঘুমিয়ে এসেছে। মৌটুসী এবার আলতো করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে ডাকল, “বীর! বাবা! ওঠো, দেখো আমরা পিকনিকে চলে এসেছি!”
বীর ঘুমের ঘোরেই একটু নড়েচড়ে উঠল। বুকে মুখ ঘষে অস্পষ্ট স্বরে বিড়বিড় করল, “পাপা!”
মৌটুসী মুচকি হেঁসে এবার বীরের মাথাটা বাহুর ভাঁজ থেকে সরিয়ে সোজা করে বসিয়ে দিল। “ওঠো সোনা, দেখো আমরা কোথায় এসেছি! পাহাড়পুর, পিকনিকে!একটু পরেই নামতে হবে।”
কিছুক্ষণ পর বীর চোখ কচলে সোজা হয়ে বসল। বড় বড় চোখে জানালার দিকে তাকিয়ে দেখল। দূরের বিশাল কারুকার্যময় বিহার আর সবুজ চত্বর দেখে তার বিস্ময়ের শেষ নেই। তারপর ডানে-বামে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “পাপা কোথায়?”
মৌটুসী বলল,“পাপা পেছনে বসে আছে বাবা, চড়ুই পাখির সাথে।”
বাস থামার সাথে সাথেই প্রতিটি বাচ্চার মধ্যে এক ধরনের চঞ্চল উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়ল। একে একে সকল অবিভাবক নিজ নিজ বাচ্চাদের হাত ধরে নামতে শুরু করলেন। মৌটুসী ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে বীরের হাত ধরল। এমন সময় বোরাকও চড়ুইয়ের হাত ধরে তাদের সিটের দিকে এগিয়ে এল।
বীর বোরাককে দেখামাত্রই খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে হাত বাড়িয়ে ডাকল, “পাপা! এসো পাপা!”
বোরাক মৃদু হেসে বীরের হাতটাও নিজের হাতের মুঠোয় নিল। বাস থেকে নামতেই আরও কয়েকটি স্কুল থেকে পিকনিকে আসা বাচ্চাদের দল চোখে পড়ল। পাহাড়পুরের ঐতিহাসিক আঙিনা খুদে শিক্ষার্থীদের কোলাহলে মুখর হয়ে উঠেছে যেন।
ভেতরে ঢুকার আগে বোরাক সেখানকার একটা দোকান থেকে পানি, চকলেট, চিপস কিনে নিল। প্রবেশপথের কাছেই দাঁড়িয়ে আছেন শিক্ষকরা। প্রত্যেকের হাতে একটি করে টিকেট ধরিয়ে দেওয়া হলো। সেই টিকেটগুলো দেখিয়েই মূল গেইট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল সবাই। গেইট দিয়ে প্রবেশ করে প্রথমেই কিছু বড় বড় গাছের ছায়া অঞ্চল। সেখানে আবার বাচ্চাদের নানা প্রকার রাইড, যেমন -দোলনা, স্লিপার, সি-স ইত্যাদি। অন্য বাচ্চাদের মতো বীর আর চড়ুইও ভীষণ ভীষণ খুশি। এসেছে পর্যন্ত দুই বন্ধু দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো এরিয়া।
গাছের নিচে বেশ কিছু চেয়ার পাতা হয়েছে। কেউ কেউ সেখানে গিয়ে বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছে, তো কেউ আবার ইতিমধ্যেই ঘুরাঘুরি শুরু করে দিয়েছে। বোরাক, মৌটুসী উভয়ই বেশ খানেকটা দুরত্ব রেখে বসল। বোরাক পকেট থেকে ফোনটা বের করে ওপেন করতেই একটা ইমেইলের নোটিফিকেশন ভেসে উঠল স্ক্রিনে। সে ইমেইলটা ওপেন করে পরতে লাগল। এদিকে মৌটুসী কোলের উপর ভ্যানেটি ব্যগটা রেখে চুপচাপ বসে আছে, তাকিয়ে দেখছে একটু দূরে সি-সসের দুইপ্রান্তে উঠে দোলতে থাকা বীর আর চড়ুইকে।
কিছুক্ষণ পর চড়ুই আর বীর দৌড়ে বোরাকের কাছে এল। চড়ুই বোরাকের হাত টেনে বলল,”পাপা দোলনা ফাঁকা হয়েছে। এসো, দোল দিবে। আমরা দোল খাব।”
তাদের থেকে অল্প দূরে বসে থাকা মৌটুসী স্পষ্ট শুনল চড়ুইয়ের কথাগুলো। বোরাককে সম্মোধন করে পাপা ডাকটা কানে যেতেই ভ্রূ কুঁচকে চট করে পিঠ সোজা করে বসল সে। কন্ঠে কাঠিন্য এনে চড়ুইকে ডাকল, “চড়ুই পাখি?”
মায়ের শক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ঘাবড়ে গেল চড়ুই। বুঝল, ভুল জায়গায় মুখ দিয়ে ভুল শব্দ বেরিয়ে গেছে।চরুই এবার মুখ কাচুমাচু করে বোরাকের আড়ালে গিয়ে একটুখানি মাথা বের করে বলল,”বিশ্বাস করো মাম্মা আমি কিছু বলিনি।আঙ্কেল নিজেই আমাকে পাপা বলে ডাকতে বলেছে।”
পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে বোরাক চড়ুইকে আগলে নিয়ে মৌটুসীর দিকে তাকাল। বলল, “জ্বি মিস! আমিই বলেছি। মানে, ওর নতুন পাপা না আসা পর্যন্ত আমাকেই ডাকল! সমস্যা কোনো?”
মৌটুসী কিছুই বলল না, কেবল ফাঁকা একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে নিল। মৌটুসির এই নীর্লিপ্ততা দেখে চড়ুই খুশি হলো বেজায়। এবার সে বীরের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল,”বীর বন্ধু এখন তুমিও আমার মামাকে মাম্মা ডাকতে পারো। আমি এখন আর কিছু বলবো না।”
চরুইয়ের এই কথা শুনে এবার বোরাকও অবাক হলো বেশ। তার মানে এসব এই দুই খুদে বিচ্ছুর পূর্বপরিকল্পিত? তবে বীর মিস মৌটুসীকে মা ডাকলে তার কোনো সমস্যা নেই! তার ছেলের ইচ্ছে, খুশির প্রাধান্য তার কাছে সবার আগে।
চড়ুই আবার বোরাকের হাত ধরে তাড়া দিল, “পাপা এসো তাড়াতাড়ি, নাহলে অন্য কেউ বসে যাবে দোলনাতে।”
“চুলুই পালি তুমি দোল খাও, আমি খাব না।” বলেই বীর মৌটুসীর কাছে দৌড় দিল। কাছাকাছি আসতেই ডেকে উঠল,” মাম্মা! ”
মৌটুসী মিষ্টি হেঁসে হাত বাড়িয়ে বীরকে কোলে তুলে নিল।
বোরাক সেদিকে একনজর তাকিয়ে চড়ুইকে নিয়ে হাঁটা দিল দোলনার দিকে ।
আধা ঘণ্টা পার হয়ে গেল, কিন্তু বোরাক আর চড়ুইয়ের কোনো পাত্তা নেই। তবে বীরের তাতে কোনোই মাথাব্যথা নেই; বরং মৌটুসীর সঙ্গে এই একান্ত সময়টা সে দারুণভাবে উপভোগ করছে। এরই মধ্যে মাম্মার সঙ্গে সে কত গল্প করেছে, স্লিপারে স্লিপ খেয়েছে, দোলনায় মাম্মার কোলে বসে দোল খেয়েছে, এমনকি বন্ধুদের সঙ্গে মাঠময় দৌড়াদৌড়ি করে বেশ ধকলও গেছে। আর এখন কিছুটা ক্লান্ত হয়ে বীর চুপচাপ মৌটুসীর কোলে দোলনায় বসে আছে।
মৌটুসী বীরকে কোলে নিয়ে বসে দোলনায় মৃদু দোলা দিচ্ছে।কিছুক্ষন পর বীর সোজা হয়ে বসে অস্বস্তিতে নড়াচড়া করতে করতে অস্থির কণ্ঠে বলে উঠল, “মাম্মা, পাপা কোথায়? পাপাকে ডাকো!”
মৌটুসী কপাল কুঁচকে চিন্তিত স্বরে বলল, “কী হয়েছে বাবা? আমাকে বলো!”
“পেটে ব্যথা কলছে। পাপা!” বীরের মুখভঙ্গি আর অস্বস্তি দেখে মৌটুসীর বুঝতে বাকি রইল না আসলে কী হয়েছে। এদিক-ওদিক তাকাল সে, কিন্তু বোরাকের কোনো চিহ্ন নেই। হঠাৎ নজর গেল হাতের ডানদিকে, মেইন গেটের পাশ ঘেঁষে থাকা দেয়ালটির দিকে—সেখানে নেমপ্লেটে লেখা ‘পাবলিক টয়লেট’।
বীর ততক্ষণে ঠোঁট উল্টে কান্না শুরু করে দিয়েছে, “পাপা…. পাপা!”
মৌটুসী আর দেরি করল না। দ্রুত উঠে বীরকে কোলে তুলে নিয়ে আদরে বলল, “সোনা বাবা, কান্না করতে হয় না। পাপা নেই তো কি হয়েছে? আমি আছি তো! আমরা এখনই ওয়াশরুমে যাব, চলো!”
মৌটুসী দ্রুত পায়ে বীরকে নিয়ে টয়লেটের দিকে এগিয়ে গেল। প্রবেশপথের সামনে একটি টেবিল পেতে বসে আছে একজন লোক। মৌটুসী কাছে পৌঁছাতেই লোকটির দৃষ্টি তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত এক লহমায় নেমে এল—দৃষ্টির মধ্যে কুৎসিত এক লালসা। মুখটা বিশ্রীভাবে বিকৃত করে বলল, “এক না দুই, সুন্দরী আপা?”
লোকটার নোংরা চাহনিতে রাগে শক্ত হয়ে এল মৌটুসীর চোয়াল। তবে এই মুহূর্তে নিজের অস্বস্তি আড়াল করে যতটা সম্ভব শান্ত-তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল সে, “দুই।”
আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না মৌটুসী। ধুপধাপ পা লেডিস জোনের ভেতরে ঢুকে গেল। কিন্তু তাতেও রেহায় মিলল না, পেছন থেকে আবারও লোকটার অসভ্য গলার স্বর ভেসে এল, “দুইয়ের ভাড়াটা একটু বেশিই আপা, আপনার নাহান। সময় নিয়ে আস্তে ধীরে করতে হয় তো! কাম হয়ে গেলে মনে কইরা মালটা দিয়া যাইয়েন, দশ টেকা।”
কথাগুলোর অশ্লীলতা মৌটুসীর কানে বিষের মতো বিঁধছে। তবুও সে নিজেকে সংবরণ করে এগিয়ে চলছে। নিজের নারীত্বের প্রতি তীব্র অসম্মানজনক জবান শোনেও না শোনার ভান করে পালন করছে কথাতথিত নারীধর্ম।
করিডোরের একেবারে শেষ প্রান্তে থাকা টয়লেট প্যানে মৌ বীরকে বসিয়ে দিল। হাসিমুখে বলল,
“তুমি আরাম করে পটি করো বাবা। আমি এখানেই আছি।”
বলেই দরজাটা অর্ধেক খোলা রেখে বাইরে এসে দরজার সরাসরি দাঁড়াল মৌ। গোটা ওয়াশরুম চত্বরে কেবল তারা ব্যতিত আর কেউ নেই। গেটের কাছে বসে থাকা সেই লোকটা বারবার ঘাড় বাঁকিয়ে করিডোরের দিকে উঁকি দিচ্ছে, লোকটার লোলুপ, নোংরা দৃষ্টি যেন তার শরীরের চামড়া ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যেতে চাইছে। মৌটুসীর শরীর রি রি করে উঠল, অসহ্য বিশ্রী এক শিহরণ খেলে যাচ্ছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে । মৌটুসী দ্রুত হাত বাড়িয়ে গলার ওড়নাটা দুই পাশে আরও ভালোভাবে ছড়িয়ে দিল। যেন সমাজের নিকৃষ্ট কীটের নারীত্ব-নাশক দৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়াল করবার বৃথা চেষ্টা।
বীরের হয়ে গেলে ওকে ফ্রেশ করিয়ে বের হতেই মৌয়ের ব্যগের ফোনটা বেজে উঠল।চটজলদি সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করল সে। নাম্বারটা সেভ করা নেই, তবে পরিচিত। মৌ রিসিভ করে কানে ধরল। ওপাশ থেকে ভেসে এল স্বল্প পরিচিত একটি কন্ঠস্বর,
” হ্যালো মিস, কোথায় আপনি?”
মৌটুসী কন্ঠে স্বাভাবিকতা বজায় রেখে বলল,
“বীরকে ওয়াশরুমে নিয়ে এসেছিলাম। আগের জায়গাতেই দাঁড়ান, এখুনি আসছি আমরা।”
“ওকে।” কল কেটে চড়ুইকে নিয়ে এবার দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটা দিল বোরাক। না-জানি কি প্রয়োজনে বীরকে ওয়াশরুমে নিয়ে যেতে হয়েছে। অস্বস্তি হচ্ছে তার। এভাবে ছেলেকে রেখে যাওয়া ঠিক হয় নি। রমনী নিশ্চয়ই খুব বিরক্ত হয়েছেন। হওয়ারই কথা!
ফোনটা ব্যগে রেখে পার্স থেকে একশ টাকার একটা নোট বের করে তা শক্ত করে হাতের মুঠোয় রাখল মৌ।তারপর বীরের হাত ধরে করিডোর পেরিয়ে বেরিয়ে এল। লোকটার সামনে টেবিলের উপর একশ টাকার নোটটা আছড়ে দিয়ে তীব্র স্বরে বলল,”মানুষের গর্ভ থেকে জন্ম নিয়ে থাকলে এই একশো টাকার বিনিময়ে হলেও পরবর্তীতে আসা অন্তত দশজন নারীকে গর্ভধারী সেই মায়ের নজরে দেখবেন! আশা করি, আবারো নিজেরকে নিকৃষ্ট পশুর বাচ্চা প্রমাণ করবেন না।
মৌটুসীর তীক্ষ্ণ বাক্যগুলো কানে যেতেই লোকটার লালসাউজ্জ্বল চেহারার উজ্জ্বলতা দপ করে নিভে গেল। কঠিন হয়ে উঠল মুখমণ্ডল। এবার বেশ দাপট দেখিয়ে টেবিল চাপড়ে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল সে, “এই শালী, এই! কত্ত বড় সাহস! কারে কি কইতাছস তুই? আবার টেকার গরমও দেখায়, হাহ্?”
মৌটুসী চরম ঘৃণার দৃষ্টিতে লোকটাকে একলহমা পরখ করে নিল, বিরক্তি এবং ঘৃণায় চোখমুখ কুঁচকে মৃদু স্বরে বিড়বিড় করে উঠল, “জানোয়ার একটা, কদর্য কীট!” বলেই বীরকে নিয়ে উল্টো ঘুরে চলে আসতে উদ্যত হলো সে।
”এই থাম, কইতাছি! টেকা যদি আমি তোর পি*ছনে না ঢুকাইতে পারি আজকা!” লোকটা এবার টেবিল টপকে পার হশে এসে পেছন তেকে মৌটুসীর কাধের দিকে হাত বাড়াল।
মৌটুসী একেবারে শেষ মুহূর্তে পেছন থেকে আসন্ন আক্রমণ আঁচ করতে পেরে তৎক্ষনাৎ আত্নরক্ষা হিসেবে চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিল। শরীর সিটিয়ে একপাশে অল্প হেলে পড়ল তার। বীরের হাত ধরে থাকা মুষ্টিটা দিগুণ দৃঢ় হয়ে উঠল। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল মৃদু আর্তনাদ -“আল্লাহ!”
মৌটুসী পর্ব ১৬
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড যাবার পরেও কোনো স্পর্শ বা আঘাত টের না পেয়ে এবার আস্তে করে চোখ মেলে দিল সে। তার সামনে এখন দণ্ডায়মান এক প্রশস্ত বুক, নাকের খুব কাছে বাতাসে ঘুরঘুর করছে কফি-ভ্যানিলার সেই নেশাগ্রস্ত ঘ্রাণ।মৌটুসী হতবিহ্বল হয়ে মাথাটা সামান্য উঁচু করতেই বোরাকের পৌরুষদীপ্ত শক্ত চোয়াল তার দৃষ্টি গোচর হলো, যার দুপাশের সুগঠিত হাড়গুলো যেন চামড়া ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে এক্ষুনি। ভ্রূ যুগলের সন্ধিস্থলে পরপর তিনটি ভাজ সুস্পষ্ট। চেনা বাদামী চোখের এই দৃষ্টি মৌটুসীর একেবারেই অচেনা, তার দেখা বিগত দিনগুলোর চেয়ে একেবারেই অন্যরকম।
