তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৪
noorayn
গতকাল রাতের শেষ প্রহরটুকু বিদায় নিয়ে শুরু হলো নতুন আরেকটি দিন। ভোরের কোমল আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি – সেই নিস্তব্ধ মুহূর্তেই আরহাম চুপিচুপি বেরিয়ে গেলো। ঘুমে বিভোর থাকা আলিশা এবং ডোরা টেরও পেলোনা তার গমনের। আরহাম শান্ত মুখ দুটোর দিকে এক পলক তাকিয়ে নিঃশব্দে দরজাটা টেনে বের হয়ে গেলো কামরা থেকে।
–এ.এম.কে স্টুডিওতে সকলে একসাথে উপস্থিত হয়েছে। আজ অনেক বড় প্রেস কনফারেন্স আছে। সব যেন ঠিকঠাকভাবে হয় তারই প্রস্তুতি চলছে। চারপাশে সবাই নিজ নিজ কাছে মগ্ন; অথচ আরাফের মুখজুড়ে যেন দ্বিধার স্পষ্ট ছাপ।
–আরাফ বরাবরই বয়সের তুলনায় ভীষণ পরিণত। অল্প বয়সেই মা-বাবার ছায়া হারিয়েছে সে। জীবনের নির্মম বাস্তবতা খুব ছোটবেলাতেই তার কাঁধে দায়িত্বের ভার তুলে দিয়েছিল। সেই থেকেই যেন সময়ের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে হাঁটতে শিখেছে ছেলেটা। হাসতে জানে; তবে প্রতিটি হাসির আড়ালেই লুকিয়ে থাকে অসংখ্য না-বলা কথা।
রক্তের সম্পর্ক বলতে রয়েছে শুধু চাচা-চাচি। তারাও এখন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হয়েছেন। ছোটবেলায় চাচা নিয়মিত টাকার ব্যবস্থা করলেও স্নেহের হাতটা খুব একটা বাড়িয়ে দেননি। খোঁজখবর নেওয়ার অবসরও যেন কখনো হয়নি তাদের। তাই আজ পরিবার বলতে আরাফ শুধু খান পরিবারকেই বোঝে – এই বাড়ির প্রতিটি মানুষ তার আপন, তার আশ্রয়, তার অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আর আলিশা…
মেয়েটার নামটা নিঃশব্দে মনের দরজায় কড়া নাড়তেই আরাফের ঠোঁটের কোণে ভেসে উঠল একরাশ বিষাদমাখা হাসি। কিছু অনুভূতি শব্দের মুখ দেখে না; বুকের গভীরে নীরবেই বেঁচে থাকে, ঠিক অপূর্ণ কোনো গল্পের মতো।
আজ আরহাম যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে – সেটার সাথেআরাফের মন কোনোভাবেই একমত নয়। তবুও বাস্তবতার কঠিন দেয়ালের সামনে তার সব আপত্তি যেন অসহায় হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে; যেখানে চাইলেও তার পক্ষে কিছু বলা সম্ভব নয়।
আরাফের ভাবনার মাঝেই তার কাধে কারও হাতের উপস্থিতি টের পেলো – সে পিছু না ফিরলেও বুঝে গেলো এটি আরহামের হাত। কিছু বলার আগেই কানে এসে ঠেকলো আরহামের প্রশ্ন – “এই আবুল? সেই কবে থেকে তোকে ডাকছি, খেয়াল কই থাকে তোর?”
“খেয়াল করিনি।”
আরাফের নিরস আওয়াজ শুনে আরহাম ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলো –
” Hey, is everything alright?”
“হুম”
“মিথ্যা বলছিস কেন? তোকে ছোট থেকে চিনি। বলে ফেল কি হয়েছে?”
এবার আরাফ পিছু ফিরে আরহামের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শক্ত কন্ঠে বললো – “না, কিছুই ঠিক নেই। আজকের পর কি আদৌ ঠিক থাকবে?”
“কি ঠিক থাকবে? কিসের কথা বলছিস?”
“প্রেস কনফারেন্সের কথা বলছি। মিথ্যা বলা কি খুব দরকার?”
“উফফ, জাস্ট চিল। তুই এই নিয়ে এতো চিন্তা করছিস? সিরিয়াসলি আরাফ!”
“যা প্রশ্ন করেছি তার উত্তর দে আগে।”
” কি প্রশ্ন?”
“মিথ্যা না বললে কি হয়না? এতে করে তোর সংসার জীবনে ঝামেলা হতে পারে। বাড়িতে যদি কেউ মেনে না নেয় তখন?”
“মিথ্যা কেন বলবো? যা বলবো সত্যিই তো বলবো কেবল কিছু সত্যি আড়াল করে। এখানে আমি খারাপ কিছু দেখছিনা।”
“বাড়ির সবাইকে কি বলে ম্যানেজ করবি?”
“ম্যানেজ করার প্রসঙ্গ আসছে কেন? কেউ এই নিয়ে কিছু বলবেনা। বিয়ের ব্যাপারটা শুরুতে বড়রা মিলেই লুকিয়েছে এরপর বাচ্চার বিষয়টাও। আমি প্রথমেই বলেছিলাম কোনো ফ্যামিলি ড্রামাতে যেন আমায় না টানে। সো রিলেক্স আরাফ। কিছুই হবেনা।”
“আলিশা যদি কষ্ট পায়?”
“কে লিশা? একদমই না। ও নিজেই তো চায়না কোনোকিছু সামনে আনতে।”
আরহামের যুক্তি শুনে আরাফের আর কিছুই বলার রইলোনা।
সকাল ১০ টা….
আলিশার ঘুম ভেঙেছে একটু আগে। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলো আশেপাশে কোথাও আরহাম নেই ; নিশ্চয়ই বাহিরে চলে গিয়েছে তাকে না বলে – এটা আর নতুন কিছুনা তাই আলিশাও এই নিয়ে আর মাথা ঘামালোনা। সে এক পলক তাকিয়ে দেখলো মায়ের বুকের সাথে লেপ্টে থাকা ঘুমন্ত ডোরাকে ; তারপর উঠে চলে গেলো ফ্রেশ হতে।
আলিশা উঠে চলে যাওয়াতে ডোরার ঘুমের বিগ্ন ঘটলেও সে উঠলোনা বরং ঘুমের মধ্যেই গড়িয়ে গড়িয়ে চলে গেলো বাবার সাইডে কিন্তু সেখানেও যখন বাবার ছোয়া পেলানা তখনই শুরু হলো তার গলা উঁচিয়ে কান্না।
আলিশা ছেলের কান্না শুনে ব্রাশ হাতেই বেরিয়ে আসলো ওয়াশরুম থেকে। ডোরা হাত-পা ছুড়ে কান্না করছে যেন অভিযোগ জানাচ্ছে এই সকালে মাম্মা-পাপা তাকে ছেড়ে কেন গেলো?
আলিশা তড়িঘড়ি ছেলের কাছে এসে বসলো।
“এই বড় গন্ডারের ছানা মিনি গন্ডার? তোর জন্য কি শান্তিমতো একটু ব্রাশ ও করতে পারবোনা?”
মায়ের আওয়াজ শুনে ডোরা কান্না থামিয়ে পিটপিট চোখে তাকালো – তার নজর এখন আলিশার হাতে থাকা ব্রাশের দিকে। মাম্মা এসেছে তার এখন সেদিকে খেয়াল নেই তার এখন ব্রাশটা চায় তাই সে হামাগুড়ি দিয়ে মায়ের কাছে এসে যেই না ব্রাশটা টান দিতে যাবে তখনই আলিশা তা সরিয়ে নিলো।
“তুই ব্রাশ দিয়ে কি করবি হ্যাঁ? তোর কি ব্রাশ করার মতো দাঁত হয়েছে?”
ডোরা ব্রাশ হাতে নিতে না পেরে মায়ের চুল শক্ত করে টেনে ধরলো। তার জেদ হয়েছে কেন মা তাকে ব্রাশ দিলোনা?
“ডোরা ছাড় বলছি। ব্যাথা পাচ্ছি আমি।”
“বাশ ডাও বাশ।”
“দিবোনা। কি করবি হ্যাঁ?”
‘দিবেনা’ শুনে আরশান আবারও হাত-পা ছুড়ে কান্না শুরু করলো। সে বারবার এদিক সেদিক তাকাচ্ছে যেন বাবাকে খুজছে মায়ের নামে নালিশ দেওয়ার জন্য।
“তোর বাপ এখানে নেই। খুজে কোনো লাভ নেই মিনি গন্ডার।”
“বা..ব্বা দাই।”
আলিশা ছেলেকে কোলে নিয়ে ওয়াশরুম যেতে যেতে বললো – “এখন বাবা যেতে হবেনা। চলো আমরা ফ্রেশ হয়ে আসি। তারপর মাম্মা তোমাকে ইয়াম ইয়াম দিবো।”
“ইয়াম ইয়াম” শুনে ডোরার চোখ চকচক করে উঠলো কারন সে ইয়াম ইয়াম বলতে মায়ের থেকে তুত্ত খাওয়া বোঝে। তাই আর কোনো তালবাহানা না করে সেও চুপচাপ গুড বয়ের মতো ফ্রেশ হয়ে নিলো।
বিশাল হলরুমজুড়ে আয়োজন করা হয়েছে এক জমকালো প্রেস কনফারেন্সের। দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর সাংবাদিকে ভরে উঠেছে পুরো প্রাঙ্গণ। কারও হাতে মাইক্রোফোন, কারও হাতে নোটপ্যাড, আবার কারও কাঁধে ঝুলছে ভারী ক্যামেরা। চারদিকে চাপা গুঞ্জন, ফিসফাস আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশের ঝলকানিতে যেন পরিবেশ আরও ভারী হয়ে উঠেছে। সবাই অপেক্ষায় – একটি মাত্র নামের।
ঠিক তখনই হলরুমের বিশাল দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো রকস্টার – আরহাম মেহতাব খান।
মুহূর্তেই অসংখ্য ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একসঙ্গে ঝলসে উঠল। উপস্থিত সবার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো তার ওপর।
আরহামের দুপাশে রয়েছে আরাফ ও কাহাফ আর এ.এম.কে ব্যান্ডের বাকি সদস্যরা অবস্থান করছে স্টেজের পেছনে। তাদের সঙ্গে রয়েছেন এ.এম.কে ব্যান্ডের সর্ববৃহৎ ইনভেস্টার আসাদ জামান। তার উপস্থিতি যেন আজকের আয়োজনের গুরুত্ব আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ধীরস্থির পদক্ষেপে তারা মঞ্চের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো।
সবাই নিজ নিজ আসন গ্রহণ করতেই চারদিক যেন একসঙ্গে সরব হয়ে উঠলো। একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিতে লাগলেন উপস্থিত সাংবাদিকরা। অসংখ্য কণ্ঠের শব্দে মুহূর্তেই হলরুম ভারী হয়ে উঠলো; যেন প্রত্যেকে সবার আগে উত্তর আদায় করার যুদ্ধে নেমেছে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করলো নিধি – তার দৃঢ় কণ্ঠে মুহূর্তেই কোলাহল চিরে ভেসে উঠলো – “প্লিজ, সবাই একটু শান্ত হোন। আপনাদের প্রত্যেককেই প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হবে। তবে অনুরোধ থাকবে, একজন একজন করে প্রশ্ন করবেন এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখবেন।”
নিধির কথায় ধীরে ধীরে হলরুমের উত্তেজনা কমতে শুরু করলো। চারপাশের গুঞ্জন মিলিয়ে যেতেই আবারও নেমে এলো এক চাপা, প্রত্যাশাময় নীরবতা।
আরহাম স্টেজে নিজের বরাদ্দকৃত আসনে বসে চারপাশে একবার শান্ত দৃষ্টিতে পরখ করে নিলো। তারপর সামনে রাখা মাইক্রোফোনটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে গম্ভীর অথচ স্থির কণ্ঠে বলল – “আজ এখানে উপস্থিত থাকার জন্য আপনাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আমি আশা করি, আজকের প্রেস কনফারেন্সে আপনারা নিজেদের সকল প্রশ্ন করার সুযোগ পাবেন। তবে একটি বিষয় আগেই পরিষ্কার করে দিতে চাই – প্রশ্ন অবশ্যই করবেন তবে কেউ নিজের সীমা অতিক্রম করবেন না। পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখেই আমরা পুরো আলোচনা শেষ করতে চাই। এখন আপনারা প্রশ্ন শুরু করতে পারেন।”
তার কথা শেষ হতে দেরি তবে সাংবাদিকদের প্রশ্ন শুরু হতে দেরি হয়নি। প্রথম সারিতে বসা একজন ছেলে জার্নালিস্ট প্রশ্ন করলো – “ইতিমধ্যে, আপনার কিছু ছবি, নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছে এই নিয়ে আপনি কি বলতে চান?”
আরহাম ঠোঁটের কোণে হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে নির্বিকার কণ্ঠে শুধালো – “আমার ছবি তো প্রায়ই সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোড়ন তোলে। আপনি ঠিক কোন ছবিটার কথা বলছেন তা যদি স্পষ্ট করে বলেন তবে উত্তর দেওয়া আমার জন্য সহজ হবে।”
সাংবাদিক মাইক্রোফোনটা একটু সামনে এগিয়ে নিয়ে শান্ত গলায় বললেন – “আমি সম্ভবত দার্জিলিংয়ে তোলা একটি ছবির কথা বলছি, যেখানে আপনাকে এক তরুণীর সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা গিয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, মেয়েটির নাম সম্ভবত আলিশা। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?”
“আমার জানা মতে কোনো তরুনীর সাথে আমার কোনো ঘনিষ্ঠ ছবি প্রকাশ পায়নি।”
“কিন্তু স্যার…”
সাংবাদিক ছেলেটি আবারও কোনো প্রশ্ন করতে গেলে তাকে কাহাফ হাতের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে বলে – “একজনকে কেবল একটা সুযোগ দেওয়া হবে প্রশ্ন করার।”
তার কথায় ছেলেটি থেমে যায়।
এরপর প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হলো দেশের অন্যতম জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী সাংবাদিক রণক শাহকে। সেলিব্রেটিদের নানা বিতর্ক ও গোপন তথ্য সামনে আনার জন্য তার সুনাম যেমন – তেমনি তার প্রশ্নের ধার নিয়েও সবাই কমবেশি পরিচিত।
রণক ধীর ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে হাতে থাকা মাইক্রোফোনটা ঠিক করলো। তারপর টেবিলের ওপর রাখা একটি খাম থেকে কয়েকটি প্রিন্ট করা ছবি বের করে সেগুলো সবার সামনে উঁচিয়ে ধরে বললো – “স্যার, একটু আগেই আপনি বললেন, আপনার সঙ্গে কোনো তরুণীর ঘনিষ্ঠ ছবি ভাইরাল হয়নি। তবে এগুলো কী?”
কথা শেষ করেই সে একে একে ছবিগুলো ক্যামেরার সামনে তুলে ধরলো। মুহূর্তেই হলরুমজুড়ে ফ্ল্যাশলাইটের ঝলকানি আরও বেড়ে গেল।
ছবিগুলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে – পাহাড়ি প্রাকৃতিক পরিবেশে দাঁড়িয়ে আরহাম এক হাতে আলিশার কোমর জড়িয়ে রেখেছে আর আলিশার দুই হাত স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই আরহামের গলায় রাখা। দু’জনের মুখেই ছিল হাসির আভাস ; যা ছবিগুলোকে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
ছবিগুলো সামনে আসতেই পুরো হলরুমে চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লো। একের পর এক ক্যামেরার শাটারের শব্দে যেন মুহূর্তটা আরও ভারী হয়ে উঠল। সকলের দৃষ্টি তখন স্থির হয়ে রইলো আরহামের দিকে – তার উত্তরের অপেক্ষায়।
আরহাম ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে একবার ছবিগুলোর দিকে তাকালো তারপর সম্পূর্ণ নির্বিকার ভঙ্গিতে মাইক্রোফোনের দিকে ঝুঁকে বললো – “আমি একটু আগেও যা বলেছি এখনও তাই বলছি। আমার সঙ্গে কোনো তরুণীর ঘনিষ্ঠ ছবি প্রকাশ পায়নি। আর আপনি যে ছবিগুলো দেখাচ্ছেন, সেগুলো আমার কাছে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছবি। আমি ব্যক্তিগতভাবে এগুলোকে কোনো ঘনিষ্ঠ ছবি বলে গন্য করি না।”
আরহামের এমন দৃঢ় ও কাটকাট উত্তরে হলরুমে আবারও চাপা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেলো। তবে রণক শাহ এত সহজে থামার পাত্র নয়। সে নিজের চশমাটা ঠিক করে আবার মাইক্রোফোন তুলে নিলো – “স্বাভাবিক বলছেন? কিন্তু এমন ক্লোজ ছবি সাধারণত কাপলদের মধ্যেই দেখা যায়। এর আগে আপনাকে কোনো নারীর সঙ্গে এভাবে দেখা যায়নি। তাহলে কে এই তরুনী? আপনার গার্লফ্রেন্ড নাকি কোনো…”
প্রশ্নটা শেষ হওয়ার আগেই আরহাম ধীরেসুস্থে এক হাত উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিলো – তার চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ না থাকলেও কণ্ঠস্বর ছিল শীতল ও কর্তৃত্বপূর্ণ।
“যেহেতু এতো গবেষণা করেই এসেছেন তাই আশা করছি এই নারীর পরিচয় সম্পর্কেও জেনে এসেছেন।”
রণক শাহ ঠোঁট নাড়িয়ে পাল্টা কিছু বলতে উদ্যত হতেই আরহামের রাশভারী কণ্ঠস্বর পুরো হলরুমে প্রতিধ্বনিত হলো – “নেক্সট।”
হঠাৎ করেই প্রশ্নের মাঝপথে থামিয়ে দেওয়ায় রণক শাহর মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তেই বদলে গেলো। পেশাদারিত্ব বজায় রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও চোখেমুখে অপমানবোধ আর দমিয়ে রাখা ক্ষোভ স্পষ্ট ফুটে উঠেছিলো।
নিজের প্রশ্নের উত্তর সম্পূর্ণ করার সুযোগ না পাওয়া, তার ওপর দেশের শীর্ষ সাংবাদিকদের সামনে এক শব্দে এভাবে এড়িয়ে যাওয়া – এই বিষয়টা তার আত্মসম্মানে বেশ আঘাত হানলো। কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থেকে সে নিঃশব্দে হাতে থাকা ছবিগুলো গুছিয়ে নিয়ে তারপর কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়েই চোয়াল শক্ত করে নিজের আসনে গিয়ে বসে পড়লো। বাইরে থেকে শান্ত দেখালেও ভেতরে ভেতরে ক্ষোভে ফুঁসছিল সে। তার দৃষ্টি তখনও স্থির ছিল আরহামের দিকেই। যেন সুযোগ পেলে আবারও এমন একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেবে – যার উত্তর এড়িয়ে যাওয়া এতটা সহজ হবে না।
–এভাবেই একের পর এক সাংবাদিক একই প্রসঙ্গ টেনে আনলেও কেউই আরহামের কাছ থেকে প্রত্যাশিত উত্তর আদায় করতে পারেনি। প্রতিটি প্রশ্নের জবাব সে এমন কৌশলে দিয়েছে যাতে প্রশ্নকারীর আর পাল্টা কিছু বলার সুযোগই রইলোনা। হলরুমে উপস্থিত অনেকেই বিস্মিত হয়ে দেখছিলো – এভাবেও কি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায়? সম্ভবত “আরহাম মেহরাব খান” কে না দেখলে সেটা বিশ্বাস করা কঠিন হতো।
আরও কয়েকজন সাংবাদিকের প্রশ্ন শেষ হতেই আরহাম নিজেই মাইক্রোফোনের দিকে ঝুঁকে শান্ত অথচ কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে বললো – “আপনাদের যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়েছে প্রশ্ন করার। এবার আমি কিছু বলতে চাই।”
এক মুহূর্ত থেমে সে চারপাশে তাকালো।
— “ইতোমধ্যে যে ছবিগুলো নিয়ে এতো তোলপাড় চলছে, যেগুলো নিয়ে আপনাদের কৌতূহলের শেষ নেই। সে বিষয়টা আমি এবার ক্লিয়ার করে দিচ্ছি।”
কথাটা বলতেই পুরো হলরুম নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।
আরহাম ধীরস্বরে বললো – “সত্যি বলতে আপনাদের বিচারবুদ্ধি দেখে আমি অবাক হয়েছি। যে তরুণীকে নিয়ে এতো প্রশ্ন করছেন। তার পরিচয় না জেনেই আপনারা এখানে ইন্টারভিউ নিতে চলে এসেছেন! ব্যাপারটা কি একটু হাস্যকর হয়ে গেলো না?”
সাংবাদিকদের কেউই কোনো জবাব দিলো না।
আরহাম আবারও বলা শুরু করলো – “আপনাদের সবার একটাই প্রশ্ন – এই নারী কে? কেন তার সঙ্গে আমার এত ক্লোজ ছবি?”
তারপর হালকা ঝুঁকে মাইক্রোফোনের সামনে স্পষ্ট উচ্চারণে শুধালো – “এই মেয়েটির নাম আলিশা। সেটা তো ইতোমধ্যেই আপনাদের সকলের জানা হয়ে গেছে। কিন্তু, তার সারনেমটা কি কেউ জানেন?”
প্রশ্নটা শুনেই উপস্থিত সাংবাদিকদের মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
আসলেই তো, আলিশার পুরো নাম কেউ জানে না।
তার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টেও শুধু ‘Alisha’ নামটুকুই ছিলো। কোনো পদবি ছিল না। আর ছবিগুলো ভাইরাল হওয়ার পর যখন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তার পরিচয় খুঁজতে শুরু করে ঠিক তখনই যেন রহস্যজনকভাবে সেই অ্যাকাউন্টটিও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। যতই অনুসন্ধান করা হোক না কেনো – আলিশার অনলাইন উপস্থিতির যেন কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট ছিলো না।
হলরুমের নিস্তব্ধতা আরও ঘনীভূত হতেই আরহাম আবার বললো – “আমি বলছি, এই মেয়েটির সারনেম কী?”
সে একবার গভীর দৃষ্টিতে উপস্থিত সবাইকে দেখে নিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করলো – “She is a Khan”
কয়েক সেকেন্ড থেমে আবার উচ্চারন করলো –
“খান বংশের মেয়ে সে। আমার নাম তো আপনারা জানেনই ‘আরহাম মেহরাব খান’। আর এই মেয়েটিও একজন খান। অর্থাৎ, সে আমার পরিবারেরই একজন।”
শেষ কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠে ছিলো অটল দৃঢ়তা।
–“She is Alisha Khan”
–“আমার পরিবারেরই সদস্যা আলিশা। আমার কাজিন।”
আরহামের শেষ কথাটা উচ্চারিত হতেই যেন পুরো হলরুমে অদৃশ্য এক বিস্ফোরণ ঘটলো।
এক মুহূর্ত আগেও যেখানে ফিসফিস শব্দে মুখোরিত ছিলো চারপাশ – সেখানে এখন নেমে এসেছে পিনপিন নীরবতা। সারি-সারি ক্যামেরার লেন্স স্থির হয়ে আছে আরহামের দিকে। সাংবাদিকরা কেউ বিস্ময়ে, কেউ অবিশ্বাসে, আবার কেউ গভীর চিন্তায় তার দিকে তাকিয়ে রইলো।
তারা ভেবেছিল একরকম অথচ সামনে প্রকাশ পেলো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সত্য!
সেই স্তব্ধতার মাঝেই ‘রণক শাহ’ আবারও মাইক্রোফোন হাতে তুলে নিলো। কণ্ঠে আগের মতোই দৃঢ়তা থাকলেও এবার তাতে মিশে ছিলো চ্যালেঞ্জের সুর।
— “কাজিন বলেই কি এভাবে ছবি তোলা যায়? এমন কাপলদের মতো করে?”
প্রশ্নটা শেষ হতেই আরহাম ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালো। তার শানিত দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা যেন মুহূর্তেই রণকের দিকে ছুটে গেলো। কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে সে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো – “নিজ পরিবারের সদস্যের সাথে আমি কীভাবে ছবি তুলবো ; তার কৈফিয়ত আমি কাউকে দিতে বাধ্য নয়।”
কথাটা বলেই সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা টেকনিক্যাল টিমের দিকে ইশারা করলো।
পরক্ষণেই হলরুমের বিশাল এলইডি স্ক্রিনে ভেসে উঠলো আরেকটি ছবি।
ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে – আরহাম ও এক তরুণী একে অপরকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ভঙ্গিটা প্রায় সেই ভাইরাল ছবির মতোই।
ছবিটি দেখামাত্রই আবারও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল পুরো হলজুড়ে।
আরহাম স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বললো –
— “এই মেয়েটির নাম নীলিমা খান। আমার আপন বড় বোন।”
সে আবার সাংবাদিকদের দিকে ফিরে তাকালো।
— “তার সঙ্গেও আমার প্রায় একই ধরনের অসংখ্য ছবি রয়েছে। এখন এটা নিয়েও কি আপনারা কিছু বলতে চান?”
কেউই কোনো উত্তর দিতে পারলোনা।
আরহাম আবারও বললো – “আলিশা আমার কাজিন। আমার পরিবারের সদস্য। ছোটবেলা থেকে আমরা একসাথেই বড় হয়েছি। তাই তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ বা স্বাভাবিক পারিবারিক ছবি থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না। আপনারা সেটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন তা আপনাদের বিষয়। কিন্তু এতে বাস্তবতা বদলে যাবে না।”
কথাগুলো শেষ হতেই হলরুমজুড়ে নেমে এলো দীর্ঘ নীরবতা।
তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৩
কয়েক মিনিট আগেও যারা একই ছবিকে কেন্দ্র করে একের পর এক অভিযোগের তীর ছুড়ে দিচ্ছিলো। তারাই এখন একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি ছাড়া আর কিছুই করতে পারছে না। যেন মুহূর্তের মধ্যেই তাদের বহু প্রশ্নের ধার ভোঁতা হয়ে গেছে।
