শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৩
সুমাইয়া ইসলাম নূর
রেদোয়ান ফোন কেটে দেওয়ার পর ইনায়া, পিয়াসা আর তুবা তখনও মন্টু চাচার দোকানে বসে ছিল। পুরান ঢাকার সেই চিরচেনা ছোট্ট দোকানটাও আজ যেন তাদের উপস্থিতিতে অন্যরকম প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
পিয়াসা কিছুক্ষণ তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল—
— “তুমি এখানে?”
তন্ময় সঙ্গে সঙ্গে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়ের দিকে ইশারা করে বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল“একটু বের হয়েছি। কথাটা বলেই সে আর সেখানে দাঁড়াল না। তন্ময় চলে যাওয়ার পর ইনায়া কোনো কথা বলল না। শুধু পিয়াসার দিকে তাকিয়ে এমনভাবে চোখ ছোট করল, যেন তার ভেতরে ভেতরে অনেক কিছুই বুঝে গেছে।পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল।এরই মধ্যে মন্টু চাচা তিনজনের সামনে ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের কাপ আর তিনটি আইসক্রিম এনে রাখলেন। গামছা দিয়ে মুখ ঢেকে রাখছে মন্টু চাচা ইনায়া অনেক বার বলা সত্বেও মুখ দেখাইনি
মন্টু চাচা চলে যেতেই তিনজনই এক সাথে হেসে উঠলে
ইনায়া কিছুক্ষণ চুপচাপ আইসক্রিমের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে আমতা আমতা করে বলল বেবি…পিয়াসা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে তার দিকে তাকাল।
— “হুম?”
ইনায়া এবার একটু নিচু গলায় বলল তোর ভাইয়া তো সব জেনে গেল! আমার ভীষণ ভয় করছে।”
কথাটা শুনে তুবা মুচকি হেসে বলল শোন, এখান থেকে দ্রুত অফিসে চলে যা। আজ তোদের মিটিং আছে। আর ইউভি ভাইয়া যদি জানতে পারে, তুই মিটিং বাদ দিয়ে এখানে বসে আইসক্রিম খাচ্ছিস, তাহলে তোর কী হবে—সেটা ভাবতেই আমার ভয় করছে! ইনায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।তারপর ধীরে ধীরে তুবার কাঁধে মাথা রেখে বলল “ঠিক আছে। আজকের মতো চলে যাই, বেবি। কাল ক্লাস শেষ করে আবার সবার সঙ্গে দেখা করব।”
পিয়াসা আর তুবা মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।
এরপর তিনজন নিজেদের মধ্যে গল্প করতে করতে চায়ের মধ্যে আইসক্রিম ডুবিয়ে খেতে শুরু করল।
ইনায়া খেতে খেতে বললো এই খাবার টার নাম কী জানিস? তুবা পলটা প্রশ্ন করলো কী? ইনায়া মুচকি হেসে বললো এই টা হচ্ছে অমরিতো কটকটির সেই অমরিতো পানিয় । কথা টা শুনে একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে গড়িয়ে পড়লো।।
মন্টু চাচা দোকানের ভেতর থেকে তিনজনের কাণ্ডকারখানা দেখছিলেন।তার মুখে ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত অভিব্যক্তি ফুটে উঠল।তিনি মনে মনে ভাবলেন—
“এই জন্যই কি ইউভি বাবা বারবার কইয়া গেছে চাচা, ওদের একটু সামলাইয়া রাখবেন? সত্যিই তো… এই তিনজনকে সামলাইতে গেলে আমি কী জানি আর কতদিন টিকব।তবে তিন সয়তানের আনন্দ দেখে তিনিও শেষ পর্যন্ত মুচকি না হেসে পারলেন না
বেশ কিছুক্ষণ পর ইনায়া, পিয়াসা আর তুবা মন্টু চাচার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
তারা বেশ কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর পেছন থেকে ইণায়ার গলা ভেসে এল এই যে মন্টু চা কাল কিন্তু ইসে দেখবো মুখে কি হইছে। তারপর তিনজন আরও দ্রুত পা চালিয়ে সেখান থেকে চলে গেল।
অন্যদিকে, ASU Group-এর অফিসরুমে তখনও ভারী নীরবতা বিরাজ করছে ইউভির মুখ তখন পাথরের মতো কঠিন হয়ে আছে রেদোয়ান ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে এবার স্পষ্ট উদ্বেগ।ভাইয়া… কাজটা করলে বোনুর ওপর অনেক চাপ পড়বে। ইউভির চোখ ধীরে ধীরে রেদোয়ানের দিকে গেল তারপর হঠাৎই সে গর্জে উঠল—
— “আমি সেটাই চাই!”রেদোয়ান চমকে উঠল।
ইউভি দাঁত চেপে বলল তোর বোনকে এখন নিজের দায়িত্ব নিতে হবে। তুই আর আমি আর কতদিন ওকে সামলে রাখব? রেদোয়ান কিছু বলার চেষ্টা করল।কিন্তু ইউভি তাকে থামিয়ে দিয়ে আরও কঠিন গলায় বলল আর ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যে… সব ডিলিট করে দিবি।রেদোয়ান কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ হয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর ধীরে ধীরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ইনায়া আর পিয়াসা IVA Group-এর প্রধান কার্যালয়ে এসে পৌঁছাল।কাঁচে ঘেরা বিশাল ভবনটির সামনে গাড়ি থামতেই দুজন একসঙ্গে গাড়ি থেকে নামল। IVA Group—দেশের অন্যতম বৃহৎ ও প্রভাবশালী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এর একটা ফ্যাশন, লাইফস্টাইল, কসমেটিকস থেকে শুরু করে নানা ধরনের ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করে এই প্রতিষ্ঠান।
ভবনের বিশাল কাঁচের দরজা পেরিয়ে ইনায়া আর পিয়াসা ভেতরে প্রবেশ করতেই চারপাশের ব্যস্ততা যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।দুজনের পরনে ছিল পরিপাটি, মার্জিত অথচ অভিজাত পোশাক। তাদের হাঁটার ভঙ্গিতে ছিল আত্মবিশ্বাস, চোখেমুখে ছিল গম্ভীর পেশাদারিত্ব।রিসেপশন থেকে শুরু করে আশেপাশে থাকা কর্মীরা একে একে সম্মানের সঙ্গে তাদের অভিবাদন জানাতে লাগল।
— “গুড মর্নিং, ম্যাম।”
— “গুড মর্নিং, সিইও ম্যাম।”
ইনায়া আর পিয়াসাও সংক্ষিপ্তভাবে মাথা নেড়ে সবার অভিবাদনের উত্তর দিল।তাদের উপস্থিতিই যেন পুরো অফিসের পরিবেশ বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।দুজনকে সামনে দিয়ে যেতে দেখে কয়েকজন কর্মী নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলে উঠল এত কম বয়সে সিইও হওয়া কীভাবে সম্ভব?”
ইনায়া ম্যাম তো IVA Group-এর সিইও, তাই না?”
—হ্যাঁ। আর পিয়াসা ম্যামও তো গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। সত্যিই অবিশ্বাস্য!তাদের ফিসফাসে অবাক হওয়ার চেয়ে মুগ্ধতাই বেশি ছিল।
ইনায়া আর পিয়াসা অবশ্য এসবের দিকে কোনো মনোযোগ দিল না। তারা সরাসরি মিটিং রুমের দিকে এগিয়ে গেল।
ঠিক তখনই IVA Group-এর একজন সিনিয়র ম্যানেজার দ্রুত তাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
— “গুড মর্নিং, ম্যাম।।ইনায়া তার দিকে তাকাতেই তিনি সম্মানের সঙ্গে বললেন মিস ইনায়া, মিটিং রুম প্রস্তুত। আপনি চাইলে আমি আপনাদের নিয়ে যেতে পারি। ইনায়া সংক্ষিপ্তভাবে মাথা নাড়ল।
— “চলুন।”
সিনিয়র ম্যানেজার পথ দেখিয়ে তাদের মিটিং রুমে নিয়ে গেলেন।মিটিং রুমে ঢুকেই ইনায়া আর পিয়াসা নিজেদের ফাইল খুলে বসল। আগামী মিটিংয়ের সমস্ত রিপোর্ট, প্রোডাক্টের তথ্য, প্রেজেন্টেশন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একে একে যাচাই করতে শুরু করল তারা।
অন্যদিকে—
ASU Group-এর অফিসরুমে বসে ল্যাপটপের পর্দায় পুরো বিষয়টি দেখছিল ইউভি।তার পাশে বসে থাকা রেদোয়ানও স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল দুই ইডিয় দেখতে দেখতে কত বড় হয়ে গেল, তাই না ভাইয়া? ইউভির দৃষ্টি তখনও ল্যাপটপের পর্দায় স্থির।গম্ভীর কণ্ঠে সে বলল—আগে আজকের মিটিংটা হ্যান্ডেল করতে দে। তারপর দেখি, ঠিক কতটা বড় হয়েছে। রেদোয়ান ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে আবার স্ক্রিনের দিকে তাকাল।তাদের দুজনের মুখেই তখন অদ্ভুত এক শান্ত ভাব প্রকাশ পাচ্ছে
কারণ—
আজকের বিপদটা ইনায়া আর পিয়াসার জন্য কোনো দুর্ঘটনা নয় এটা হচ্ছে তাদের সাজানো শাস্তি। ইনায়া আর পিয়াসাকে একটু শিক্ষা দেওয়ার জন্যই IVA Group-এর সমস্ত ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরের ছবি ইচ্ছা করে ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে।
ঠিক তখনই মিটিং রুমের ভেতর পিয়াসার মৃদু চিৎকার শোনা গেল ইনায়া!”ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল। কী হয়েছে? পিয়াসা দ্রুত ল্যাপটপটা তার দিকে ঘুরিয়ে দিল।আমাদের সব ওয়েবসাইট থেকে পুরোনো ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরদের সব ছবি ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে! ইনায়া কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
— “কী? সব ছবি! একটাও নেই! ইনায়া দ্রুত ল্যাপটপটা নিজের কোলে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখতে শুরু করল।একটার পর একটা ওয়েবসাইট খুলে দেখল সে।সত্যিই—কোথাও কোনো ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরের ছবি নেই।ইনায়া চিন্তায় নিজের চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে ফেলল।না… এটা হতে পারে না।
পিয়াসা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল এখন আমরা কী প্রেজেন্ট করব? ইনায়া ঘড়ির দিকে তাকাল।
মিটিং শুরু হতে আর মাত্র এক ঘণ্টা।
তার মুখ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল।আমাদের আরও অনেক আগেই নতুন ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ঠিক করা উচিত ছিল। আমি কেন আগে থেকে বিষয়টা নিয়ে ভাবলাম না? পিয়াসা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল এখন কী হবে, বেবি? ইনায়া কোনো উত্তর দিতে পারল না।সে দ্রুত ল্যাপটপটা সরাতে গিয়ে পাশে রাখা কলমটি মেঝেতে ফেলে দিল।
রাগে গজগজ করতে করতে সে নিচু হয়ে কলমটি তুলতে গেল।আর তখনই।টেবিলের সঙ্গে তার মাথায় ধাক্কা খেল।পিয়াসা চমকে উঠে বললো
— “বেবি!”ইনায়া দাঁতে দাঁত চেপে ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল।কিন্তু রাগের মাথায় এক পা পিছিয়ে যেতেই এবার টেবিলের পায়ায় তার পা গিয়ে ধাক্কা খেল।অন্যদিকে ল্যাপটপের পর্দায় পুরো দৃশ্যটি দেখছিল ইউভি।ইনায়ার কাণ্ড দেখে তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।সে শান্ত গলায় বলল—
ঠান্ডা মাথায় কাজ কর, বেয়াদব।রেদোয়ান সঙ্গে সঙ্গে ভাইয়ের দিকে তাকাল।এত মিষ্টি শাস্তি কেউ দেয়, ভাইয়া? ইউভি মৃদু হেসে বলল
— “ভালোবেসে তো কূল পাই না। রাগ করব কখন?
এদিকে ইনায়া দ্রুত ঘড়ির দিকে তাকাল।
মিটিং শুরু হতে আর মাত্র এক ঘণ্টা।
সে সঙ্গে সঙ্গে IVA Group-এর সেই সিনিয়র ম্যানেজারকে ডাকল।এক্সকিউজ মি।”
লোকটি দ্রুত এগিয়ে এলেন।জি, ম্যাম?”
ইনায়া কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে বলল “মিটিংটা কি এক ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব?।সিনিয়র ম্যানেজার এক মুহূর্তের জন্য অবাক হলেও সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লেন। অবশ্যই, ম্যাম। মিটিং এক ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া হলো।
ইনায়া চেয়ারে বসে দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরল।
এখন কী করব?।সে হতাশ গলায় বলল আমার আরও অনেক আগেই ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ঠিক করা উচিত ছিল। পিয়াসা তার পাশে এসে দাঁড়াল।কিছুক্ষণ ভেবে সে বলল ভাইয়াকে বলি?”
ইনায়া ধীরে ধীরে মাথা তুলল।পিয়াসা আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল ভাইয়ার কাছে সব সমস্যার সমাধান আছে। ইনায়া এক মুহূর্তও দেরি করল না।
সঙ্গে সঙ্গে ইউভিকে ফোন দিল।
কিন্তু ইউভি ফোন ধরল না।
অন্যদিকে, ইউভির ল্যাপটপের পর্দায় তখন ইনায়া আর পিয়াসার সমস্ত অস্থিরতা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
ইউভি এক হাতে কফির কাপ ধরে অত্যন্ত শান্তভাবে তার আদরের বউ আর বোনের নষ্ট হওয়া পরিকল্পনা দেখছিল।হঠাৎ সে উচ্চস্বরে হেসে উঠল।
রেদোয়ান ভ্রু তুলে তাকাল।কী হলো, ভাইয়া?”
ইউভি হাসতে হাসতেই বলল।দেখ, তোর বোন কত বড় ইডিয়ট!”ইনায়া আবার ফোন করল।
কিন্তু ইউভি এবারও ফোন ধরল না।ইনায়ার মুখ ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।সে পিয়াসার দিকে তাকিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলল।তোর ভাইয়া মনে হয় অনেক রেগে আছে।”পিয়াসাও চিন্তিত হয়ে গেল।
— “এখন কী হবে?”
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
হঠাৎ ইনায়ার মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল।
সে সঙ্গে সঙ্গে ইউভিকে একটি মেসেজ পাঠাল আমাদের হেল্প করো। আমরা বিপদে পড়েছি।
ইউভির ফোনে মেসেজটি পৌঁছাতেই সে স্ক্রিনের দিকে তাকাল।কিন্তু কোনো রিপ্লাই দিল না।
এদিকে ইনায়া বেশ কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।কোনো রিপ্লাই নেই।শেষ পর্যন্ত সে ধীরে ধীরে বলল না… অনেক বেশি রেগে গেছে মনে হয়।”
তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ইনায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।যা করার, আমাদের নিজেদেরই করতে হবে।
ইনায়া আর পিয়াসা দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।মিটিং শুরু হতে আর মাত্র দুই ঘণ্টা।
তাদের হাতে সময় কম, অথচ কাজের তালিকা যেন শেষই হচ্ছে না।পিয়াসা ধীরে ধীরে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল বেবি… আমরা নিজেরাই যদি ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হয়ে যাই? ইনায়া কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর ধীরে ধীরে তার চোখ দুটো চকচক করে উঠল।
— “মানে?”পিয়াসা এবার আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল মানে, আমাদের ব্র্যান্ডের প্রোডাক্টের প্রচারের জন্য অন্য কাউকে কেন দরকার? আমরা নিজেরাই তো মডেল হতে পারি! ইনায়ার মুখে মুহূর্তেই হাসি ফুটে উঠল।
— “তুই জিনিয়াস!”
— “জানি।”
— “বেশি জানিস। তবুও জিনিয়াস।”
দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল।
এরপর শুরু হলো তাদের দৌড়ঝাঁপ।
প্রথমেই তারা নিজেদের ব্র্যান্ডের জন্য উপযুক্ত পোশাক বেছে নিতে বসে গেল। কোন প্রোডাক্টের সঙ্গে কোন পোশাক মানাবে, কোন রঙে প্রোডাক্টের সৌন্দর্য আরও ফুটে উঠবে সবকিছু তারা নিজেরাই ঠিক করতে লাগল।একদিকে ডিজাইনারদের সঙ্গে কথা বলা, অন্যদিকে ফটোগ্রাফারদের নির্দেশ দেওয়া, আবার একই সঙ্গে প্রোডাক্টের প্যাকেজিং আর প্রচারের পরিকল্পনা করা সবকিছু যেন একসঙ্গে চলতে লাগল।মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও যে দুজন মিটিংয়ের আগে নিজেদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরদের ছবি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল, তারাই এখন নিজেদের পুরো প্রচারণার দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছে।
একসময় পুরো অফিসের সবাই যেন তাদের কাজের গতিতে অবাক হয়ে গেল।যে কাজ সাধারণত কয়েক দিন সময় নিয়ে করা হয়, ইনায়া আর পিয়াসা সেটাই প্রায় অসম্ভব গতিতে এগিয়ে নিয়ে চলল।এক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের সমস্ত প্রোডাক্টের ফটোশুট শেষ হয়ে গেল।ছবিগুলো দ্রুত সম্পাদনার জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হলো।
এরপর আবার শুরু হলো মিটিংয়ের প্রস্তুতি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজন নিজেদের আগেরপেশাদার পোশাকে ফিরে এল।
অন্যদিকে, এতক্ষণ ধরে পুরো বিষয়টি ল্যাপটপের পর্দায় দেখছিল ইউভি।ইনায়া আর পিয়াসার প্রতিটি দৌড়ঝাঁপ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি ফটোশুট সবকিছুই তার চোখ এড়ায়নি।শেষ পর্যন্ত যখন সে দেখল, মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে দুজন নিজেরাই মডেল হয়ে পুরো ব্র্যান্ডের ফটোশুট শেষ করে ফেলেছে এবং আবার মিটিংয়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে—
তখন ইউভি ধীরে ধীরে ল্যাপটপটা টেবিলের ওপর রেখে দিল।
তারপর—
সে হাততালি দিতে দিতে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
রেদোয়ান অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
— “কী হলো, ভাইয়া? ইউভি কোনো উত্তর না দিয়ে সরাসরি রেদোয়ানের কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।রেদোয়ান আরও অবাক।
ইউভি গর্বিত গলায় বলল I’m proud of my wife!
রেদোয়ান কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
ঠিক তখনই ইউভি শান্ত গলায় বলল—
এখন চল। রেদোয়ান থমকে গেল।।কোথায়?”
ইউভি মুচকি হেসে বলল ওদের শাস্তি দিতে।”
রেদোয়ান চোখ বড় বড় করে তাকাল।কিন্তু ওরা তো সফল হয়েছে! তাই তো। তাহলে?”
ইউভি ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বলল—
সফল হওয়ার জন্য পুরস্কার তো দিতে হবে।”
ইউভি আর রেদোয়ান IVA গ্রুপে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই মিটিং শেষ হয়ে গিয়েছিল। দুজন গাড়ি থেকে নেমে মিটিং রুমের দিকে এগিয়ে যেতেই দেখতে পেল, সেখানে উপস্থিত সকলেই ইনায়া ও পিয়াসাকে ঘিরে অভিনন্দন জানাচ্ছে। এতক্ষণে যে পরিকল্পনাটি নিয়ে সবাই ব্যস্ত ছিল, তার সফল পরিণতিতে চারপাশে যেন আনন্দের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে।মিটিং রুম থেকে বেরিয়ে আসতেই দূর থেকে কয়েকজন কর্মী ইউভি ও রেদোয়ানকে দেখতে পেয়ে সম্মান জানিয়ে সরে দাঁড়াল।
—স্যার আসছেন!
কথাটা কানে যেতেই ইনায়া আচমকাই ছুটে গেল রেদোয়ান এর দিকে । ইউভির বুকের ভেতরটা মুহূর্তেই নরম হয়ে এলো। সে মনে মনে ধরে নিল, ইনায়া নিশ্চয়ই তার কাছেই ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরবে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার সেই ধারণা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।ইনায়া সোজা গিয়ে রেদোয়ানকে জড়িয়ে ধরল।
—ভাইয়া!
ইউভির চোখ মুহূর্তেই বিস্ফারিত হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে রেদোয়ানের দিকে তাকাল। তার চোখেমুখে স্পষ্ট প্রশ্ন—এটা কী হলো?রেদোয়ানও ইউভির দৃষ্টি বুঝতে পেরে নিরীহ মুখে ইশারা করল—আমি কী করেছি?ইউভি ভ্রু কুঁচকে হাতের ইশারায় বুঝিয়ে দিল—তোকে মেরে ফেলব।রেদোয়ান মুখ চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল।এদিকে পিয়াসার দিকে এগিয়ে গিয়ে ইউভি তাকে সস্নেহ ভরা বুকে জড়িয়ে ধরল। তারপর তার কপালে ভালোবাসার পরশ এঁকে মৃদু হেসে বলল,ওয়েল ডান, বোনু। এভাবেই এগিয়ে যা। ভাইয়া সবসময় তোর পাশে আছে।
কথাটা বলেই ইউভি পিয়াসাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল। রেদোয়ানের কাছে যাওয়ার কোনো সুযোগই দিল না তাকে।
রেদোয়ান দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে মাথা নেড়ে মুচকি হাসল।কিছুক্ষণ পর সবাই পার্কিং এরিয়াই এসে পৌঁছাল। ইউভির রাগের আঁচ বুঝতে পেরে রেদোয়ান এক মুহূর্তও দেরি করল না। পিয়াসা যে গাড়িতে উঠছে, সে দ্রুত সেই গাড়িতে গিয়ে বসে পড়ল।আমরা যাচ্ছি, ব্রো। তোমরা এসো।
রেদোয়ানের কথা শেষ হওয়ার আগেই ইনায়া ছুটে গিয়ে গাড়ির পেছনের সিটে বসে পড়ল। ইউভির দিকে তাকানোর সাহস পর্যন্ত হলো না তার। মনে মনে তার একটাই ভয় পাচ্ছে ইউভি নিশ্চয়ই তার ওপর ভীষণ রেগে আছে।রেদোয়ান কয়েকবার ইনায়াকে ইউভির গাড়িতে যাওয়ার কথা বললেও ইনায়া একগুঁয়েভাবে মাথা নেড়ে প্রত্যাখ্যান করল। শেষ পর্যন্ত সে রেদোয়ান আর পিয়াসার সঙ্গেই বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিল।অন্যদিকে ইউভি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। তার হাত দুটো ধীরে ধীরে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো।
এত বড় বেয়াদবি!ইনায়া যে তার সঙ্গে এমনটা করতে পারে, সেটা যেন এখনো ইউভি বিশ্বাসই করতে পারছে না।সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল,এর প্রতিক্রিয়া কী হবে, তুই নিজেও জানিস না, বিয়াদোব চিবিয়ে খাব তোকে।
কিছুক্ষণ পর গাড়িগুলো চৌধুরী ভিলার সামনে এসে থামল।রেদোয়ান, পিয়াসা আর ইনায়া একসঙ্গে ভিলার ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখতে পেল, হলরুমে সবাই রিমঝিমকে ঘিরে বসে আছে। বেশ কিছুদিন পর একসঙ্গে হওয়ায় সবাই গল্পে মেতে উঠেছে।ইনায়া আর পিয়াসা কোনো কিছু না ভেবেই ছুটে গিয়ে রিমঝিমকে জড়িয়ে ধরল।রিমঝিমও দুজনকে নিজের বাহুডোরে টেনে নিয়ে হেসে বলল,এখন থেকে আগামী পাঁচ মাস আমি এখানেই থাকব। তাই এখন আমাকে ছাড় তো! তোরা সবাই মিলে গল্প কর আমি একটু শান্তিতে বসি পুচকু টা কিক মারছে রিমঝিমের কথায় চারপাশেসবার মাঝে হাসির রোল পরলো । সবাই আবার নিজেদের গল্পে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই—
দ্রুত পায়ে চৌধুরী ভিলায় প্রবেশ করল ইউভি।
তার মুখের অভিব্যক্তি এতটাই কঠিন যে, তাকে দেখেই আশেপাশের হাসি-আনন্দ মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। প্রবেশপথের কাছে অসাবধানতাবশত পড়ে থাকা একটি ফুলদানি তার পায়ের কাছে এসে পড়তেই ইউভি বিরক্ত হয়ে এক লাথিতে সেটিকে দূরে সরিয়ে দিল।হলরুমে উপস্থিত কারও সঙ্গে কোনো কথা না বলেই সে সোজা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতেই একে একে নিজের শার্টের বোতাম খুলতে লাগল।
তার হাঁটার ভঙ্গি, মুখের কঠোরতা আর নীরব রাগ—সবকিছুতেই স্পষ্ট ছিল, তার মেজাজ এখন ভীষণ খারাপ।ইনায়া ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে ধীরে ধীরে পিয়াসার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর খুব নিচু স্বরে বলল,
—দেখেছিস? এই রাগটা এখন আমার ওপর ঝাড়বে।পিয়াসা কিছু বলার আগেই ইনায়া ভয়ে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল।
বেশ কিছুক্ষণ পর ইউভি আবার নিচে নেমে এল। তার পরনে ছিল পরিপাটি জিমের পোশাক। কানে ব্লুটুথ ইয়ারফোন, চুল সামান্য এলোমেলো, মুখে কঠিন গাম্ভীর্য—পুরো অবয়বেই যেন এক অদ্ভুত আকর্ষণীয়, অথচ ভয়ংকর ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠেছে।
তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে পৃথিবীর কারও সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা তার নেই।ইউভি সোজা হলরুমের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে রিমঝিমের কাছে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে কথা বলল। তারপর জিমের দিকে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই রেসমা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল মা, আমি আমার খাবার নিজেই তৈরি করে নেব। আমার জন্য কেউ অপেক্ষা করবে না। আর কেউ আমাকে বিরক্তও করবে না।কথাটা বলেই ইউভি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না।
বাগানের ভেতরে অবস্থিত বিলাসবহুল জিমরুমটির দিকে এগিয়ে গেল সে। বিশাল কাচঘেরা সেই জিমরুমটি ছিল আধুনিক সব যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত। চকচকে মেঝে, সারি সারি অত্যাধুনিক ব্যায়ামের সরঞ্জাম, দেয়ালজুড়ে বিশাল আয়না আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা নরম আলো—সব মিলিয়ে জায়গাটি ছিল একেবারেই রাজকীয়।কিন্তু সেই বিলাসবহুল পরিবেশের সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো মানসিক অবস্থায় ইউভি ছিল না।তার ভেতরে তখনো জ্বলছিল রাগ।
আর সেই রাগের একমাত্র কারণ—
ইনায়া।
হলরুমে বসে থাকা ইনায়া ইউভির চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল হঠাৎ বুকের মাঝে অদ্ভুত এক খারাপ লাগা কাজ করলো তার। ইউভির এমন রুপ সে আগে কখনো দেখেনি তারপর ধীরে ধীরে পিয়াসার হাত আঁকড়ে ধরে ফিসফিস করে বলল,
—আমি কি সত্যিই আজ অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি।
জিমরুমে প্রবেশ করেই ইউভি এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে দাঁড়াল।তার বুকের ভেতর তখনো রাগের আগুন জ্বলছে। ইনায়ার সেই বেয়াদবি,পুরো ঘটনাটা বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।ইউভির চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।পরের মুহূর্তেই সে কোনো রকম ওয়ার্ম-আপের তোয়াক্কা না করে সরাসরি বক্সিং ব্যাগের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
ইউভি রাগে বক্সিং ব্যাগে একের পর এক ঘুষি মারতে লাগল। তার প্রতিটি আঘাতে বক্সিং ব্যাগটি প্রচণ্ড জোরে দুলে উঠছে। কিন্তু ইউভির রাগ যেন কিছুতেই কমছে না। বরং প্রতিটি ঘুষির সঙ্গে তার ভেতরের ক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে উঠছে
তার মুষ্টির গাঁটের চামড়া ধীরে ধীরে ছিঁড়ে গেল। রক্ত ঝরতে শুরু করল। কিন্তু ইউভি থামল না। ব্যথার প্রতি যেন তার কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। সে একের পর এক ঘুষি মারতেই থাকল, যতক্ষণ না তার হাত পুরোপুরি রক্তাক্ত হয়ে গেল।শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত হয়ে নয়, বরং নিজের রাগকে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে এনে ইউভি থামল। বুক দ্রুত ওঠানামা করছে, কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে, আর তার রক্তাক্ত হাত দুটো থেকে টুপটুপ করে রক্ত ঝরছে।
ইউভি নিজের হাতের দিকে একবার তাকাল। তারপর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত, তাচ্ছিল্যভরা হাসি।যেন এই রক্ত, এই ব্যথা—কোনোটাই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।সে ধীরে ধীরে পাশে রাখা পানির বোতলটি তুলে নিল। এক নিঃশ্বাসে প্রায় পুরো বোতল পানি পান করে বোতলটি পাশে রেখে দিল।তারপর কোনো বিশ্রাম না নিয়েই মেঝের দিকে এগিয়ে গেল।ইউভি মেঝেতে দুটো হাত শক্ত করে রাখল। তারপর শরীরের সমস্ত ভার হাতের ওপর নিয়ে ধীরে ধীরে পা দুটো ওপরে তুলে দিল।
হেডস্ট্যান্ড।মাথা ও দুটো হাত মেঝেতে রেখে শরীরকে সম্পূর্ণ উল্টো করে পা দুটো সোজা আকাশের দিকে তুলে ধরে স্থির হয়ে রইল সেতারপর শুরু হলো কঠিন ব্যায়াম।তার শরীরের প্রতিটি পেশি টানটান হয়ে উঠছিল। রক্তাক্ত হাতের গাঁট থেকে এখনো রক্ত ঝরছে, তবু সে থামছে না।
ইউভি যেন নিজেকেই শাস্তি দিচ্ছে।দুশো বার।
হ্যাঁ, টানা দুশো বার সেই কঠিন হেডস্ট্যান্ড পুশ-আপ করার সিদ্ধান্ত নিল সে।প্রতিবার শরীর নিচে নামছে, আবার শক্তির সঙ্গে ওপরে উঠছে।তার শ্বাস ভারী হয়ে উঠছে।কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে।হাতের ক্ষত থেকে রক্ত মেঝেতে পড়ছে।কিন্তু ইউভির মুখে কোনো দুর্বলতা নেই।বরং প্রতিটি ওঠানামার সঙ্গে তার মুখের কঠোরতা আরও গভীর হয়ে উঠছে।
গভীর রাত।
চৌধুরী ভিলার চারপাশে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতার চাদর। রাতের আকাশে চাঁদটা মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলছে। দ মাঝে মাঝে হালকা বাতাসে গাছের পাতার মৃদু মর্মর শব্দ—সব মিলিয়ে পুরো ভিলাটাকে যেন এক অদ্ভুত নীরবতা ঘিরে রেখেছে।
ইনায়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।বাগানের এক পাশে অবস্থিত বিলাসবহুল জিমরুমটির কাচের দেয়াল দিয়ে ভেতরের আলো এখনো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ইউভি এখনো বের হয়নি।
রাত অনেক হয়ে গেছে।ইউভিখাবার খায়নি। দেখে আর ইনায়া ও খেতে যাই নি সারাদিনের ধকলেই শরীরটা ভীষণ খারাপ লাগছে তার। মাথাটা ভার হয়ে আছে, পা দুটোও যেন আর চলতে চাইছে না। এতক্ষণে বিছানায় শুয়ে থাকার কথা ছিল তার।
কিন্তু ইউভিকে ছাড়া তার নিজেরও যে ভালো লাগছে না!ইনায়া অসহায়ের মতো জিমরুমটির দিকে তাকিয়ে রইল।এখন আমি কী করব?
নিজেকেই প্রশ্ন করল সে।কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকার পর হঠাৎ করেই নিজের ভেতর একটু সাহস জোগাড় করল ইনায়া যে শাস্তিই দাও, মাথা পেতে নেব। আমি জানি, আমি তোমার কাছে গেলে তুমি আমার ওপর বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারবে না।আমার শেহেজাদা
নিজের জন্য বরাদ্দ করা আলমারি খুলে ইনায়া ভেতর থেকে একটি জিমের পোশাক বের করল।
সম্পূর্ণ কালো পোশাক।শুধু পায়ের জুতাজোড়া সাদা।পোশাকটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ নিজের দিকে তাকিয়ে রইল সে।তারপর মুখটা কুঁচকে গেল।
এটা পরে নিচে যাব কীভাবে?একবার পোশাকের দিকে তাকাল।আবার দরজার দিকে তাকাল।
কিন্তু পোশাকটা তো একটু বেশিই খোলামেলা!
শেষ পর্যন্ত ইউভির কাছে যাওয়ার ইচ্ছেটাই জয়ী হলো।। তারপর দরজা খুলে পা টিপে টিপে করিডোরে বেরিয়ে এলো।নিচে একবার উঁকি দিল সে।ভিলার কোথাও কোনো শব্দ নেই।সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।ইনায়া একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
তারপর অত্যন্ত সাবধানে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করল।
হঠাৎ তার পেট থেকে অদ্ভুত এক শব্দ বেরিয়ে এলো গরররররর…ইনায়া মাঝ সিঁড়িতে থেমে গেল।
চোখ বড় বড় করে নিজের পেটের দিকে তাকাল।—এই! এত রাতে এখন ক্ষুধা পেতে হলো?পেট যেন জবাব দিল—
গরররররর!
ইনায়া চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল।
নিজের পেটের ওপর হাত রেখে সে গম্ভীর গলায় বলল,
—তুমি একটু ধৈর্য ধরো।কথাটা বলে আবার জিমরুমের দিকে হাঁটতে শুরু করল সে।কিন্তু রান্নাঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ তার পা থেমে গেল।মুখটা ধীরে ধীরে রান্নাঘরের দিকে ঘুরল।
তার চোখে এক অদ্ভুত আলো জ্বলে উঠল।একটা আইসক্রিম তো খেতেই পারি!কথাটা বলেই আর এক মুহূর্ত দেরি করল না ইনায়া।চুপিচুপি রান্নাঘরে ঢুকে ফ্রিজ খুলল। ভেতর থেকে নিজের পছন্দের একটি আইসক্রিম বের করে নিল।
ঠিক তখনই রান্নাঘরের বাইরে থেকে সাবিহা চৌধুরীর কণ্ঠ ভেসে এলো কে রান্নাঘরে?
ইনায়ার হাত থেকে প্রায় আইসক্রিম পড়ে যাচ্ছিল।
সে ভয়ে এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।তারপর সম্পূর্ণ অন্যমনস্কভাবে বলে ফেলল,
—কেউ না।
কথাটা মুখ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইনায়া পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল।তারপর ধীরে ধীরে নিজের মুখে হাত চাপা দিল।এ মা কী বললাম আমি!দরজার বাইরে সাবিহা চৌধুরীও থমকে গেলেন।কেউ না?
তিনি ধীরে ধীরে রান্নাঘরের ভেতরে উঁকি দিলেন।
কেউ নেই।একেবারেই কেউ নেই।সাবিহা চৌধুরীর মুখের রং বদলে গেল।আল্লাহ!তিনি দ্রুত চারপাশে তাকালেন।কেউ তো নেই!ঠিক তখনই পেছন থেকে হালকা একটা শব্দ হলো।সাবিহা চৌধুরী ঘুরে তাকালেন।কেউ নেই।আবার সামনে তাকালেন।
সেখানে ও কেউ নেই।তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
কিন্তু কথা বলল কে?তারপর নিজের মনেই উত্তর দিলেন,না, না! নিশ্চয়ই আমি ভুল শুনেছি!
কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে আবার ফিসফিস করে বললেন,কিন্তু ‘কেউ না’ বলল তো কেউ!
তারপর আর এক মুহূর্তও রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস হলো না তার।সাবিহা চৌধুরী দ্রুত পা চালিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন।
আর রান্নাঘরের এক কোণে লুকিয়ে থাকা ইনায়া তখন মুখে হাত চেপে হাসি আটকানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছে।তার কাঁধ কাঁপছে।চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসার উপক্রম।
সাবিহা চৌধুরীর পায়ের শব্দ পুরোপুরি মিলিয়ে যেতেই ইনায়া ধীরে ধীরে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো।হাতে আইসক্রিমের কাপ।মুখে চিরচেনা সেই দুষ্টু হাসি।তারপর আইসক্রিম খেতে খেতে আবার জিমরুমের দিকে এগিয়ে গেল সে।
জিমরুমের দরজার কাছে এসে ইনায়া পা টিপে টিপে ভেতরে উঁকি দিল।আর তারপরই তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।ইউভি মেঝেতে বসে নিজের হাত ব্যান্ডেজ করছে।তার হাতের গাঁটগুলো রক্তাক্ত।
কিছু জায়গায় চামড়া উঠে গেছে।
ইনায়ার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকল না।দ্রুত ইউভির কাছে গিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
—কী হয়েছে তোমার? তোমার হাত এমন হলো কীভাবে?ইউভি ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাল।
আর ঠিক তখনই তার চোখ আটকে গেল ইনায়ার ওপর।ইনায়ার পরনে কালো রঙের টাইট জিমের পোশাক। তার সঙ্গে সাদা স্পোর্টস শু। পোশাকটি ইনায়ার শরীরের গড়নকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।ইউভি কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা না বলে তাকিয়ে রইল।তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝার উপায় নেই, সে রাগ করবে, নাকি অবাক হবে, নাকি অন্যদিকে তাকিয়ে যাবে।শেষ পর্যন্ত ইউভি খুব ধীরে মুখ ঘুরিয়ে নিল।মনে মনে বিড়বিড় করল,
সাধে কি আর বেয়াদব বলি! আমার দুর্বলতা বেশ ভালো করেই জানে। ইডিয়েট!
ইনায়ার দিকে কোনো পাত্তাই না দিয়ে সে আবার পানির বোতল তুলে নিল।এক ঢোকে পানি খেতে শুরু করল।ইনায়া কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর একটু এগিয়ে গেল।ইউভি সঙ্গে সঙ্গে উঠে অন্যদিকে চলে গেল।তারপর নিচু হয়ে নিজের জুতার ফিতা বাঁধতে শুরু করল।
ইউভি মনে মনে প্রায় কাকুতি-মিনতি করতে লাগল,
প্লিজ, আদর, চলে যা। চলে যা, আদর । আর কাছে আসিস না।কিন্তু ইনায়া তো ইউভির সাথে কথা বলেই ছারবে সে এত সহজে হাল ছাড়ার মেয়ে নয়।
ইনায়া আবারও তার দিকে এগিয়ে আসতেই ইউভি তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে মেঝেতে হাত রেখে পুশ-আপ শুরু করে দিল।
ইনায়া অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই মানুষটা কি সত্যিই আমার সঙ্গে কথা বলবে না?
ইউভি যেন কিছুই শুনছে না।সে একের পর এক পুশ-আপ করেই যাচ্ছে।ইনায়া ধীরে ধীরে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।ইউভি তখনো পুশ-আপ করছে।
ইনায়া তার মুখের দিকে তাকাল।
কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।তারপর ইউভির শক্ত, পেশিবহুল বাহু আর রাগে টানটান হয়ে থাকা শরীরের দিকে তাকিয়ে ইনায়ার মাথায় হঠাৎ একটি দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল।তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল রহস্যময় এক হাসি।
ইনায়া মনে মনে বলল,
—আচ্ছা… এবার দেখি, আমার শেহেজাদা কতক্ষণ রাগ করে থাকতে পারে!
ইউভি পুশ-আপ দিচ্ছে। আর তার পিঠের ওপর দিব্যি আরাম করে বসে আইসক্রিম খাচ্ছে ইনায়া।
ইউভির কপালে বিরক্তির ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে উঠল। পুশ-আপের মাঝেই সে গম্ভীর গলায় বলল—
— “কেন এসেছিস এখানে? মরার পাখা গজিয়েছে নাকি? নিলজ্জের মতো আবার আমার পিঠে এসে বসেছিস! তোর চাচা জানে, দিন দিন তুই কতটা বেয়াদব হয়ে যাচ্ছিস? পরপুরুষের সঙ্গে ঢোলাঢোলি করিস, তার ওপর ড্রেসিং সেন্সেও বেশ পরিবর্তন এসেছে। বলেছিলাম না, তোর শরীরের প্রতিটি অংশ আমার আমানত?
ইনায়া তার কথায় বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। বরং আইসক্রিমে চামচ চালাতে চালাতেই শান্ত গলায় বলল মিস্টার, এখন রাত দুটো বাজে। সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এই ড্রেসে আমাকে কেউ দেখেনি। আর আপনার আমানত আমি বেশ যত্ন করেই রেখেছি। ইউভি এক মুহূর্তের জন্য পুশ-আপ থামিয়ে তার দিকে তাকানোর চেষ্টা করল। কিন্তু পিঠে বসে থাকা ইনায়ার কারণে সেই চেষ্টা খুব একটা সফল হলো না। বিরক্ত মুখে আবার পুশ-আপ দিতে দিতে বলল—তাহলে এখানে এসেছিস কেন?”
ইনায়া আবারও এক চামচ আইসক্রিম মুখে তুলে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিল—
বড্ড ক্লান্ত লাগছে। তাই একটু আইসক্রিম খেতে এসেছি। ইউভির পুশ-আপ দেওয়া হাত দুটো মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।সে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে রইল।তারপর ধীরে ধীরে বলল—
— “What the fuck! জিমরুমে আইসক্রিম খেতে এসেছিস? ইনায়া ভ্রু উঁচিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল—
জিমে সবাই কেন আসে?”ইউভি এবার দাঁতে দাঁত চেপে উত্তর দিল—“জিম করতে।”
ইনায়া যেন এইমাত্র পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো যুক্তি আবিষ্কার করেছে মাথা নেড়ে বলল ঠিক। আমিও তাই করতে এসেছি
— “তুই কী এক্সারসাইজ করছিস?”
ইনায়া নির্বিকার মুখে আবারও আইসক্রিমে চামচ চালাল। তারপর মিষ্টি গলায় বলল আপনি করছেন। আমি তো আপনাকে সাহায্য করছি।”
ইউভির ভ্রু আরও কুঁচকে গেল।সাহায্য?
ইনায়া এবার ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল হুম। আপনার পুশ-আপের লেভেল বাড়িয়ে দিচ্ছি। এত বুদ্ধিমান হয়েও এইটুকু বুঝতে পারছেন না?”
কথাটা শুনে ইউভি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল
ইউভি খুব শান্ত গলায় বলল—
— “বেশ। যেহেতু তুই আমার এক্সারসাইজের লেভেল বাড়াতে এসেছিস সেহেতু আজ তুইও আমার সঙ্গে পুরো ওয়ার্কআউট করবি।”
ইনায়ার মুখের হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
মানে?”
শেহেজাদার আদর পর্ব ৭২
মানে, রাত দুটোয় আমার জিমরুমে এসে, আমার পিঠে বসে, আমার এক্সারসাইজের লেভেল বাড়ানোর যে মহান উদ্যোগ নিয়েছিস
— “সেই অবৈধ জিম-অভিযানের শাস্তি তো পেতেই হবে।
