মেজর কারদার পর্ব ২৯
ফিনারা ঝুমুর
শ্রাবণের প্রথম দিনটি বেশ থমথমে আর নমনম ভাবেই কেটে গেল। রাতে খাবার টেবিলে পরিবারের সবাই সমবেত হয়েছে। শিউলি বেগম আর পিংকি বেগম প্লেটে প্লেটে খাবার সার্ভ করছেন। বিকেলে মেঘের বাবা-মা নিজেদের গ্রামে ফিরে গেছেন, তাই মেঘের মনটাও একটু ভার হয়ে ছিল।হঠাৎ ডিনার প্লেটে চামচের শব্দ থামিয়ে শীর্ষ গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,
“তোমাদের একটা কথা বলার ছিল।”
খাবার টেবিলের সবাই খাওয়া থামিয়ে একযোগে শীর্ষর পানে তাকায়। জুবায়ের কারদার কৌতূহলী চোখে প্রশ্ন করেন,
“কী কথা, শীর্ষ?”
“কাল সকালেই আমি চট্টগ্রাম রামু ক্যান্টনমেন্টে ফিরে যাচ্ছি।”
শীর্ষর মুখে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘোষণার কথা শুনে কারদার বাড়ির টেবিলে বসা মেঘ ছাড়া বাকি কেউ খুব একটা অবাক হলো না। যেন এই আর্মি অফিসারের এমন হুটহাট সিদ্ধান্তেই তারা অভ্যস্ত। জুবায়ের কারদার শুধু শান্ত গলায় শুধালেন,
“সাতদিনও তো হয়নি তুই এলি, এর মাঝে আবার ফিরে যাবি?”
“হ্যাঁ। একপ্রকার ইমার্জেন্সি ছুটিতে এসেছিলাম। তবে এবার জয়েন করলে, আগামী এক বছরেও হয়তো আর ব্যাক করতে পারব না।”
কথাটা শোনামাত্রই যেন মেঘের মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ল! বুকের অন্দরটা এক লহমায় ভীষণ ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল ওর। আজ কেবল বিয়ের দুটো দিন পার হলো না, আর এর মাঝেই পুরো এক বছরের দীর্ঘ বিচ্ছেদ?জোবায়েদা খাতুন কপালে ভাঁজ ফেলে শুধালেন,
“সামনে তো তোর ছোট বোম কিঞ্জার বিয়ে, ওতেও আসতে পারবি না?”
“না!”
একদম নিরেট ও স্পষ্ট জবাব দিয়ে শীর্ষ শান্তভাবে নিজের খাবারে মনোনিবেশ করল।ওদিকে শিউলি বেগম সেই যে দুপুরের পর থেকে ছেলের সাথে কথা বলা বন্ধ করেছেন, এখনও নীরব। শীর্ষ কাল সকালেই ঢাকা ছেড়ে চলে যাবে শুনেও উনি একটা শব্দও উচ্চারণ করলেন না। তবে খাওয়ার টেবিল থেকে ওঠার আগে একরাশ জ্বলন্ত ও তিক্ত চোখে মেঘকে দেখে গেলেন, যেন সব দোষ এই একরত্তি মেয়েটারই!
সবাই খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ধীরপায়ে যার যার ঘরের পানে পা বাড়াল। শীর্ষও নিজের শয়নকক্ষের দিকে যেতে যেতে রান্নাঘরের দিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমায় এক কাপ স্ট্রং ব্ল্যাক কফি দিয়ে যেও তো, মা।”
শিউলি বেগম মুখ ফিরিয়ে অত্যন্ত রুক্ষ কণ্ঠে জবাব দিলেন,
“যার বউ ঘরে বসে আছে, তাকে গিয়ে কফি বানিয়ে দিতে বলো! আমি আর কোনো বাহানা সইতে পারব না, পারব না কফি করতে!”
শিউলি বেগমের এমন উল্টো ও রূঢ় জবাবে শীর্ষ কোনো তর্ক জুড়ল না। কেবল নিঃশব্দে এক নজর মেঘের দিকে তাকিয়ে ওকে ঘরে আসার হালকা ইশারা দিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। মেঘও নিজের ভেতরের কষ্টটা চেপে ধীরপায়ে শীর্ষর পেছন পেছন সেই পরিচিত শয়নকক্ষে গিয়ে প্রবেশ করল।
বারান্দার গ্রিল ধরে শ্রাবণের রাতের আকাশে চেয়ে আছে মেঘ। বিষাদের গভীর কালো ছায়া নেমে এসেছে ওর বাদামি অক্ষিপটে।
শীর্ষ নিজের ট্রাভেল ব্যাগটা নিখুঁতভাবে গুছিয়ে র্যাকের ওপর রেখে ধীরে ধীরপায়ে এগিয়ে আসে বারান্দায়। পেছন থেকে পরম নিবিড়তায় জড়িয়ে ধরে মেঘকে। নিজের মুখটা গুজে দেয় মেঘের ঘাড়ের সুবাসিত কেশের ভাঁজে, ওষ্ঠাধর ঠেকায় উন্মুক্ত ঘাড়ের ওপর।
“মন বড্ড খারাপ, প্রিয়া?”
মেঘ পেছনে ঘুরে দাঁড়ায় না, বরং দৃষ্টি আকাশে রেখেই অভিমানভরা ও বিষাদমাখা কণ্ঠে উল্টো প্রশ্ন করে,
“আপনি কি সত্যিই কাল সকালেই চলে যাবেন, মেজর সাহেব?”
শীর্ষ ওর কোমরের ওপর দু-হাতের বাঁধন আরও একটু শক্ত করে মেঘকে নিজের সুগঠিত শরীরের সাথে মিশিয়ে নেয়। তারপর এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“আমার কর্তব্য যে এটাই, প্রিয়া। যে পেশায় আমি আছি, চাইলেও তা অবহেলা করতে পারি না। আসলে তুমি এমন একজন সামরিক পুরুষকে নিজের স্বামী হিসেবে বেছে নিয়েছ, যে হয়তো তোমায় প্রতিদিন সময় দিতে পারবে না, পারবে না তোমার ছোট ছোট সাধারণ শখগুলো পূরণ করতে। সারাটা জীবন হয়তো এই বিরহ আর দূরত্বের কষ্টটাই আমাদের বয়ে বেড়াতে হবে!”
শীর্ষ এবার আলতো হাতে মেঘকে নিজের মুখোমুখি ফেরায়। মেঘের টলটলে বাদামী ডাগর দুটো চোখের পানে চেয়ে এক চিলতে ফিকে ও বিষাদময় হাসি ফোটায়। বড্ড স্বাভাবিক ভঙ্গিতে শোনায় সেই নির্মম সত্যিটা,
“আমরা তো জীবনটা হাতের তালুতে নিয়ে ঘুরি, মেঘালয়া। আজ আছি তো কাল নেই। যেকোনো সময় চট্টগ্রাম বা যেকোনো মিশন থেকে তোমাদের কাছে এমন খবরও আসতে পারে’মেজর শীর্ষ কারদার মিশনে থাকা অবস্থায় শত্রুর হামলায় শহীদ হয়েছেন’”
শীর্ষর মুখ থেকে এই চরম ও ভয়াল বাক্যটা শোনামাত্রই মেঘ থরোথরো করে কেঁপে উঠল! ওর রক্ত হিম হয়ে গেল এক লহমায়! জীবনে এই প্রথমবার নিজের সমস্ত দ্বিধা-সংকোচ বিসর্জন দিয়ে দু-হাতে শীর্ষর শক্ত পিঠটা খামচে ধরে ওকে জড়িয়ে ধরল সে! ওর চওড়া বুকের মাঝে নিজের মুখটা গুঁজে দিয়ে এক অবরুদ্ধ আর্তনাদে চিৎকার করে উঠল,
“দোহাই আপনার! নিজের মুখে এমন অলক্ষুণে কথা আর ভুলেও আনবেন না! যদি আপনার মরণ আসতেই হয়, তবে তার পূর্বে নিজ হাতে আমায় মেরে দিয়ে যাবেন!”
আঁধারের আড়ালে শীর্ষর ঠোঁটের কোণে এক অপরূপ প্রাপ্তির হাসি ফুটে উঠল! এই শ্যামবর্ণা মেয়েটা যে এখন ওকে হারানোর ভয়ে এভাবে আকুল হয়ে কেঁদে উঠছে। এটাই তো এই মেজরের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনকথা!
শীর্ষ আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। এক ঝটকায় মেঘকে পাঁজাকোলে তুলে নিয়ে ঘরের পানে পা বাড়াল। পরম যত্নে ওকে নরম বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজে নেমে এলো ওর তপ্ত তনুর ওপর—হালকা ভর দিয়ে। নিজের বৃদ্ধা আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় মেঘের চোখের টলটলে জলটুকু পরম মমতায় মুছে দিল। তারপর ওর মায়াবী চোখের গভীরে নিজের প্রখর গ্রে দৃষ্টি স্থির রেখে বিড়বিড় করে উঠল,
“আজকে থেকে এই জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাসে, এমনকি মরণেও; আমি স্রেফ তোমার, মেঘালয়া!”
শীর্ষর তপ্ত ওষ্ঠাধর ধীরপায়ে নেমে এসে স্পর্শ করল মেঘের সেই কোমল, কাঁপা কাপাঁ গোলাপী ঠোঁট দুটোকে! শ্রাবণের নিঝুম রাতে ধীরশ্বাসের তালে তালে সেই ভালোবাসার গভীরতা ও মাদকতা ক্রমেই বাড়তে লাগল। তবে এই উত্তাপের মাঝেও আজ শীর্ষর এক সুনির্দিষ্ট ও পবিত্র সীমাবদ্ধতা ছিল। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, মেঘ এখনও এই শারীরিক ও পূর্ণাঙ্গ সম্পর্কের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। আর এক প্রকৃত পুরুষ হিসেবে নিজের সীমারেখা লঙ্ঘন করার পাত্র শীর্ষ কারদার নয়!
সেই পবিত্র ও মধুর ওষ্ঠের ভালোবাসা আদান-প্রদান শেষে, শীর্ষ পরম আদরে মেঘকে নিজের বুকের বাম পাশের ওপর আগলে রেখে ঘুমের দেশে পাড়ি দিল।
শীর্ষর ক্লান্ত দেহটা ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেও, মেঘের দুই চোখে আজ বিন্দুমাত্র ঘুমের দেখা নেই। ঘরের জানালা দিয়ে গড়িয়ে আসা ফুটফুটে চাঁদের আবছায়ায় শান্তভাবে ঘুমানো জাঁদরেল মেজরকে প্রাণ ভরে অপলক দেখতে লাগল সে… দেখার বুঝি আজ কোনো আঁশই মেটছে না ওর!
“আপনাকে দেখার আঁশ কখনও না মিটুক। সারাজীবন আপনার বুকের বাঁ পাশটা আমার থাকুক।”
সামনে কঠিন মক টেস্ট। টেবিল ল্যাম্পের ঘেরাটোপ আলোয় গভীর মনোযোগে পড়াশোনায় ব্যস্ত কিঞ্জা। ডাক্তারি পড়াটা যে বড্ড ঝক্কির কাজ, তা হাড়হাড়ে টের পাচ্ছে সে। একের পর এক উইটনেসে ভরা জটিল ওষুধের নাম উচ্চারণ করতে করতে দাঁত ভাঙার জোগাড়! তার ওপর বিভিন্ন ধরণের ক্লিনিক্যাল টেস্ট, প্যাথলজিক্যাল রিপোর্ট আর জটিল এক্সপেরিমেন্টের পাহাড় তো আলাদা করে তুলেই রাখা আছে।
ঠিক তখনই ওর সেই নিখাদ মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটিয়ে হঠাৎ বেজে ওঠে টেবিলের কোণে রাখা যান্ত্রিক মোবাইল ফোনটি। কিঞ্জা পড়ার ধ্যান ভেঙে পাশ থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে ডিসপ্লের নাম্বারের দিকে তাকায়। স্ক্রিনে ‘সামী’ নামটা ভেসে উঠছে। চোখের ওপর নেমে আসা হালকা চশমাটা আঙুলের ডগায় একটু ওপরের দিকে ঠেলে দিয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও কলটা রিসিভ করে ও।
“কেমন আছো, কুঞ্জ?”
ফোন কানে তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে সামীর এক চরম সুমিষ্ট ও মায়াবী পুরুষালী গলা। ‘কুঞ্জ’ ডাকটা কানে আসতেই কিঞ্জা অদ্ভুত এক অস্বস্তিতে পড়ে যায়। ভেতরের সেই ইতস্তত ভাবটা চেপে কোনোমতে ঠোঁটের কোণে কৃত্রিম এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে উত্তর দেয়,
“আলহামদুলিল্লাহ, ভালো সামী। তুমি কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ, আমিও বেশ ভালো আছি। রাতদুপুরে খুব পড়ছিলে বুঝি?”
“হুম।”
মেজর কারদার পর্ব ২৮
কিঞ্জার এই বড্ড সংক্ষিপ্ত ও কাঠখোট্টা জবাব সামী খুব ভালো করেই অনুধাবন করল। ওপাশ থেকে খানিকটা নিস্তব্ধতা ছেয়ে যায়। এরপরই সামী এক বুক গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বড্ড দ্বিধা ও আকুলতাভরা কণ্ঠে এক অনাকাঙ্ক্ষিত পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
“বর হিসেবে আমায় নিজের জীবনে পেয়ে তুমি কি একেবারেই খুশি নও, কুঞ্জ? আমার ইদানীং কেন যেন বড্ড মনে হচ্ছে তুমি আমায় সত্যি মন থেকে ভালোবাসো না!”
