তোমাতেই আসক্ত সিজন ২ পর্ব ৪৮
তানিশা সুলতানা
আদ্রিতা যখন চোখ খুলল তখন বুঝতে পারলো সে নরম ভেজা মাটির ওপর শুয়ে আছে। অনুভব করলো তার শরীরে, হাত পায়ে কাঁদা লেগে আছে। আর বেশ ঠান্ডা মাটি।
চারিদিক অন্ধকারে ছেঁয়ে আছে। কোথাও একটুখানি আলোর ছিঁটা ফোঁটার দেখা মিলছে না। নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দের অস্তিত্ব অনুভব করা যাচ্ছে না।
আদ্রিতা কোনো রকমে উঠে বসলো। মাথাটা বড্ড ভাড়ি ভাড়ি মনে হচ্ছে। কতক্ষণ এভাবে অবচেতন ছিলো বুঝতে পারছে না। বা এখন রাত না কি দিন তারও কোনো ধারণা পাচ্ছে না। চোখ খুললেই অন্ধকার তাই চোখ দুটো বন্ধ করে হাতের সাহায্যে এদিক ওদিক দরজা জানালা খুঁজতে থাকে।
কিন্তু দেওয়াল ছাড়া আর কোনো কিছুই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কাদামাটির ঘরে কি দেয়াল থাকে? এটা কোন জায়গা? আর এমনই বা কেনো?
কপালে ভাজ ফেলে শান্ত মস্তিষ্কে খানিকক্ষণ চিন্তা করলো তারপর আর শান্ত থাকতে পারলো না পাগলের মতো দীর্ঘক্ষণ এদিক ওদিক পায়চারি করে অতঃপর হতাশ হয়ে বসে পড়ে। দুই হাতে মুখ ঢেকে উচ্চস্বরে কেঁদে ওঠে। তবে তার কান্না সে ছাড়া আর কেউ শুনতে পারছে না বোধহয়। দেয়ালে বাড়ি খেয়ে নিজের কাছেই ফিরে আসছে শব্দ।
বরাবরই অন্ধকারে বেশ ভয় পায় মেয়েটা।
আজকেও ভয় করছে। হাত-পা কাঁপছে।
তাকে এমন স্থান থেকে উদ্ধার করতে পারবে একমাত্র আবরার। কিন্তু ওই মানুষটা বাংলাদেশ নেই।
তাহলে কি হবে ওর?
কে বাঁচাবে?
কিভাবে বা মুক্তি পাবে?
তবে কি এই অন্ধকার কুটিরেই মৃত্যু হবে তার।
আর কখনো দেখা হবে না এ্যানিকে। কখনো বাবা মাকে দেখতে পাবে না।
আবরার
তাকেও দেখা হবে না।
ওরাও বোধহয় জানতে পারবে না আদ্রিতা কোথায় এবং কিভাবে মারা গেলো।
কেউ বুঝতে পারবে না।
আচ্ছা
আবরার যখন জানতে পারবে আদ্রিতা নিখোঁজ হয়ে গেছে বা মা/রা গেছে তখন কি মানুষটা কাঁদবে?
তার কি কষ্ট হবে?
আরেহহ না
একদমই কষ্ট হবে না তার। বরং ভালোই থাকবে।
কান্না থেমে যায় অদ্রিতার। হাতের উল্টো পিঠে মুছে নেয় চোখের পানি।
তারপর মনকে শক্ত করে পুনরায় দরজা জানালা খোঁজার কাজে লেগে পরে।
খুব বেশিক্ষণ কষ্ট করতে হলো না তাকে।
কেউ একজন খুলে দিলো দরজা। এক ফালি আলো ঢুকে পড়লো কক্ষে। আদ্রিতা দু হাতে চোখ আড়াল করলো। কেনোনা এই আলো তার সহ্য হচ্ছে না।
একটা ছেলে ঢুকেছে কক্ষে। তার সঙ্গে বোধহয় একটা মেয়েও আছে।
দুজনের পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। আর পারফিউমের ঘ্রাণে মনে হচ্ছে একটা মেয়ে আছে।
চোখ খুলে ওদের দেখার চেষ্টা করে মেয়েটা তবে এবারও ব্যর্থ হয়।
ছেলেটা এগিয়ে এসে বসলো আদ্রিতার মুখোমুখি।
তাচ্ছিল হেসে কোরিয়ান ভাষায় বলে
“এইটুকু বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে এতো কাহিনী?
মেয়েটা খাঁটি বাংলা ভাষায় বলল
“দেখতে সুন্দর।
আর পুরুষ মানুষ সুন্দরের পূজারী
“ভুল বললে মনা
পুরুষ সুন্দরের পূজারী হলে ইয়াংইউ রিজেক্ট হতো না।
বাই দ্যা ওয়ে এই মেয়েটাকে নিয়ে কি করব?
মেরে দেবো?
মনা কিছু একটা চিন্তা করে বলে
“থাকুক এভাবে
যতদিন বাঁচে।
এবার আদ্রিতা চোখ খুলে তাকালো। কারোরই মুখ দেখতে পারলো না। কেননা ওরা আলোর দিকে পিছনে ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু দুজনের উচ্চতা আর পোশাক বোঝা যাচ্ছে।
আদ্রিতা কাঁপাকাঁপা ঠোঁট নারিয়ে বললো
“আমার এ্যানি কোথায়?
মনা নামের মেয়েটি বলল
” এ্যানি কে?
“ছোট্ট একটা ক্যাট।
আমার সাথে ছিলো। ওকে এনেছেন?
তখনই এ্যানি মিউ মিউ আওয়াজ তুলে কক্ষে ঢুকলো। আদ্রিতার কোলে এসে উঠলো।
মনা এবং ছেলেটি ভ্রু কুঁচকালো। কেনোনা ওরা তো কোনো বিড়াল আনে নি। তাহলে এই বিড়ালটি আসলো কোথা থেকে?
মূলত
আদ্রিতাকে ওরা যখন কিডন্যাপ করে নিয়ে আসছিলো এ্যানিও লুকিয়ে গাড়িতে উঠে পড়েছিলো।
তারপর ওকে এই কক্ষে বন্দি করার পর চালাক বিড়ালটি দরজার পাশে ঘাপটি মেরে বসে ছিলো।
কখন দরজাটা খোলা হবে আর কখন সে ভিতরে ঢুকবে এটারই অপেক্ষায় ছিলো।
অতঃপর তার অপেক্ষার অবসান ঘটে।
সে তার মালিকের কাছে পৌঁছতে সক্ষম হয়।
আদ্রিতা হাজারটা চুমুতে ভরিয়ে দেয় এ্যানির ছোট্ট দেহখানা।
বুকের সঙ্গে চেপে ধরে জোরে জোরে শ্বাস টানতে থাকে।
মনার মনে পড়লো এই বিড়ালটিকেই সে আবরারের সঙ্গে দেখেছিলো। এবং আবরার বিড়ালটিকে নিজের বাচ্চা বলে পরিচয় দিয়েছিলো।
তারমানে বিড়ালটির আসল মালিকই হচ্ছে এই মেয়ে।
“মনা চলো তাহলে
এই মেয়ে এখানেই পঁচে মরুক। বড্ড ইচ্ছে ছিলো তাকে এক পলক দেখার। দেখে নিলাম
এবার আমাদের যাওয়ার পালা।
ওরা চলে যেতে নিলে আদ্রিতা শক্ত কণ্ঠে বলে ওঠে
“আমি এখানে পঁচে মরবো না।
আবরার আসবে।
আমাকে আর এ্যানি কে নিয়ে যাবে এখান থেকে।
আর আপনাদের শাস্তি দিবে।
আদ্রিতা এমন কথা কেনো বললো জানা নেই। তবে কেনো জানি মুখ থেকে আপনাআপনি বেরিয়ে গেলো।
মনা পেছন ফিরে তাকালো।
তাচ্ছিল হেসে বলে
“শোন ছোট্ট মেয়ে
তুমি বোধহয় ভুলে যাচ্ছো আবরার তাসনিন এখন সুইজারল্যান্ড।
“উনি যেখানেই থাকুক।
আসবেই আমার কাছে।
ওনাকে আসতেই হবে।
“কনফিডেন্স ভালো
তবে ওভার কনফিডেন্স ভালো নয়।
তোমার উপর আমার কোন রাগ নেই। তুমি কোনো অন্যায় করনি।
তবে তুমি আবরার তাসনিনের উইক পয়েন্ট। তাকে হারাতে গেলে তোমাকে মা/রতেই হবে।
চলে গেলো ওরা দুজন। পুনরায় কক্ষটা অন্ধকারে ছেয়ে গেলো। শুধু জ্বলতে থাকলো এ্যানির চোখ দুটো।
গতকাল রাতে বাইক এক্সিডেন্ট করেছিলো আবরার। নাকের উপর জখম হয়ে গেছে। তাছাড়া গোটা মুখে ছোট ছোট ক্ষতস্থান।
ডান পায়ে প্রচন্ড আঘাত পেয়ে যখন বাসায় ফিরলো তখনই কল আসলো আতিয়ার বেগমের। তিনি জানালেন আদ্রিতাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
পাগল পাগল হয়ে যায় ছেলেটা। পরনে থাকা রক্তে ভেজা সাদা রঙের শার্ট, এবং হাঁটুর নিয়ে ছিঁড়ে যাওয়া প্যান্ট পড়েই বেরিয়ে যায় বাসা থেকে।
সিয়াম আমান পাসপোর্ট ফোন এবং ডেবিট কার্ড ক্রেডিট কার্ড নিয়ে পেছন পেছন ছুটে।
মাত্র ৫ ঘণ্টার মধ্যে ওরা বাংলাদেশ পৌঁছে যায়। তখন ভোর ৪ টা বেজে আটান্ন মিনিট।
প্লেন থেকে নাকের উপর একটা ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিয়েছিলো সিয়াম।
ব্যাস এতোটুকুই।
ঢাকা শহরে ভোরের আলো ফুটতে ফুটতে পুলিশ এবং আর্মি গোয়েন্দা দিয়ে ভরে যায়।
যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ। গোটা বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে খোঁজ চলছে আদ্রিতা চৌধুরীর। বর্ষা ইতোমধ্যে কয়েকবার সেন্সলেস হয়ে গিয়েছে। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে সে পাগল প্রায়।
আরিফের আহাজারি থামছে না। আতিয়া বেগম কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে যাচ্ছে আদ্রিতাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য।
আসিফ ইতোমধ্যেই পুলিশ ফোর্স নিয়ে আশেপাশের সব জায়গায় খুঁজে দেখেছে।
আব্দুর রহমান এবং হাফিজুর চৌধুরী দিশেহারা। উনারা কি করবেন বা কি করা উচিত কিছুই বুঝতে পারছে না।
অহনার শ্বশুরবাড়ির লোকেরাও চিন্তিত। বিয়ে বাড়ি আর বিয়ে বাড়ি নেই।
সবার চোখে মুখে চিন্তার ছাপ এবং হতাশা।
অহনা শ্বশুরবাড়ির ড্রয়িং রুমে বসে সবাই যখন আলাপ আলোচনা করছিল কোথায় খোঁজা যায়। তখনই সেখানে প্রবেশ করে আবরার।
অতিয়া বেগম দাঁড়িয়ে পড়ে। এগিয়ে যায় নিজের ছেলের কাছে।
চোখে মুখে হাত বুলিয়ে কান্না মিশ্রিত কন্ঠের স্বরে বলে
“আব্বা তোর কি অবস্থা?
কিভাবে এতো আঘাত পেলি
আসিফ চোখ মুখ শক্ত করে জিজ্ঞেস করে
তোমাতেই আসক্ত সিজন ২ পর্ব ৪৭
“এখানে কি চাই?
আবরার সবাইকে উপেক্ষা করে দোতালায় ছুটে। সিয়াম এবং আমানও ওর পাশেই রয়েছে।
আসিফ এবং আব্দুর রহমান পিছন পিছন ছুটে।
আবরার কোথায় যাচ্ছে ওরাও এটাই দেখতে চায়।
