Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৩

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৩

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৩
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

—’ ও তোর বড় ভাইয়ে’র বউ নয়ন। তাকে ভালোবাসার কথা বলে, এমন পাগলামি করতে তুই দু’বার ভাবলি না? ‘
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা হতভম্ব মুখটা’র ব্যাক্তি কোনোমতে ভাঙা গলায় এই একটা বাক্যই প্রয়োগ করতে পারলো এই মূহুর্তে। শুনশান চার-দেয়ালের এই কামড়ার মধ্যে দক্ষিণের দেয়ালের সাথে লেপটে হুমড়ি খেয়ে পরে আছে নয়ন। তিতির এদিকটায় দু’হাতে মুখ চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। আচমকা এহেন অনাকাঙ্ক্ষিত কন্ঠস্বরে চমকে উঠলো দুজনেই। বিস্ফরিত দৃষ্টিতে দরজার দিকে আলোকপাত করতেই, চোখে পরলো রিক্তা দেওয়ানকে। নিচেই ছিলেন তিনি, রান্নাঘরে। নয়ন যখন বাড়ি ফেরে, তখনই ছেলের মুখচোখ সুবিধার লাগেনি তার। শরীর খারাপ কি-না সেটা পরখ করতে পিছু পিছু এসেই এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সাক্ষী হলেন তিনি। নয়ন তখনো সম্ভবত বাস্তবতার কিছুই সজ্ঞানে ঠাহর করে উঠতে পারছে না। নেশার ঘোর তখনো তুঙ্গে। মা’কে দেখে চমকানো তো দূর, কোনো অনুশোচনাই হলো না। উল্টো ছোট বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে উঠলো ছেলে’টা। মা’য়ের দিকে তাকিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো। আকুল হয়ে বলে উঠলো,

—’ মণি আমার কেনো হলো না, মা? দিদা কেনো ওকে আমার হতে দিলো না? আমি তো ওকে আগে ভালোবেসেছিলাম বলো। বাসিনি?’
ছেলের মুখের এমন লাগামহীন কথায় শ্বাস আঁটকে আসে দেওয়ান গিন্নির। ছলছল চোখে আশপাশে নজর বুলিয়ে দ্রুত পায়ে ঢুকে আসে ঘরের মধ্যে। ছিটকিনি তুলে দেয় দরজাখানার। তিতিরের দিকে একবার অসহায় দৃষ্টি তাক করে, ছুটে এসে দু’হাতে তুলতে চায় ছেলেকে।
—’ আব্বা, ওঠ। কি পাগলামি হচ্ছে এটা? বাড়িতে তোর বাপ, চাচা রা সবাই আছে। এর মধ্যে মাতলামি করে বড় ভাইয়ের ঘরে ঢুকে এসেছিস! ‘
নয়ন অবুঝ বালক আজকে। মা’য়ের হাতের বাঁধন ছাড়িয়ে, নিজ হাতে আঁকড়ে ধরলো তার বাহু। কান্না গিলে কোনোমতে বললো,
—’ আমি ওকে ভালোবাসি, আর কেউ টের না পেলেও তুমি তো পেতে। বলো জানতে না? জানতে না, আমি মণিকে কতটা ভালোবাসি? জানতে না বলো?’
রিক্তা বড্ড অসহায়বোধ করে। ঈশান যেকোনো সময় চলে আসবে। তাছাড়া আর কারোর নজরে এসব পরলে একটা বিচ্ছিরি ঘটনা ঘটবে। নয়ন তিতিরকে ভালোবাসে, এই তিক্ত সত্যিটা একবার কেউ জানলে– তাদের সুখের, সাজানো-গোছানো সংসারের খুঁটি নড়বড়ে হয়ে আসবে। রিক্তা নরম হলেন না আর। ছেলের দিকে অগ্নিদৃষ্টি তাক করে, কঠিন গলায় বললেন,

—’ যাকে বেহায়ার মতো ভালোবাসি, ভালোবাসি করছো– সে এখন তোমার বড় ভাইয়ের বউ, নয়ন। সম্পর্কগুলোর সম্মান করা শেখো। ম দ খেয়ে এসে, ভাই বউয়ের সাথে এ-সব নিয়ে অশান্তি করছো? ছিহ্! এই শিক্ষা দিয়েছি তোমাকে? ‘
নয়ন ততক্ষণে ঢুলে পরেছে মা’য়ের কাঁধের ওপর। সম্ভবত অতিরিক্ত নে শার ঘোরে জ্ঞান হারিয়েছে বেচারা। রিক্তা স্থির হয়ে বসে রইলেন মিনিটখানেক। ঘাড় বাঁকিয়ে তিতির কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
—’ আমাকে ক্ষমা করিস, মা। ও এমন পাগলামি করে বসবে, ক্ষুনাক্ষরেও টের পাইনি। তোদের বিয়ের এতগুলো দিন পার হয়ে গিয়েছে, কখনো এমন করেনি। আজ কেনো হঠাৎ… ‘
ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন ভদ্রমহিলা। তিতিরও কাঁদছে। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কল্পনাতেও আসেনি তার। নয়ন কে আজীবন নিজের ভাইয়ের থেকে কম মনে করেনি। আজকে হঠাৎ করেই এমন মূহুর্ত তৈরি হবে ভাবতেও পারে নি সে। ছেলের ঢুলতে থাকা শরীরটা নিজেই কাঁধে ভর করে বয়ে নিয়ে গেলেন রিক্তা। পেছনে ফেলে গেলো ক্রন্দনরত এক কিশোরী কে।
রাত গভীর হচ্ছে। গোটা বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে আছে। বসার ঘরের দেয়ালে টাঙানো বিশাল দেয়াল ঘড়িটার টিকটিক শব্দ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। বদ্ধ দরজার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে ঈশানের ফেরার অপেক্ষা করছে তিতির। দেয়াল ঘড়িটাতে সবেই ঢংঢং শব্দ করে উঠলো। রাড বারোটা বাজে। সন্ধ্যা রাতে ঘটে যাওয়া সেই বিশ্রী ঘটনার জের ধরে এখনো পাথর বনে আছে তিতির। রাতের খাওয়াটাও খাওয়া হয়নি। স্বামীর বুকে মাথা রেখে অশান্ত বুকটা শান্ত করা প্রয়োজন।
এরইমধ্যে গোটা চারেক ফোন করেছে ঈশানকে। শুরুর দু’বার রিং হয়ে কেটে গিয়েছে কল, তারপর থেকে সংযোগই পাওয়া যাচ্ছে না। তিতিরের হাতের মুঠোতে সেলফোনটা। মানুষটা এতো দেরি করছে কেনো জানা নেই তার। বাড়ির কেউ-ই জানে না ঈশানের দেরি হওয়ার কারণ। রাইসুল দেওয়ানের থেকে জেনেছে, অফিস জনিত কোনো কারণেও আটকে নেই, নিয়াজ- নাঈম রা জানিয়েছে তাদের সাথেও নেই। তাহলে! দিনে নাঈমের সাথে ছিলো মানুষটা। তারপর বাইক নিয়ে তো সোজা বাড়িই ফেরার কথা, এখনে কেনো ফিরছে না!

এলাকার সেই পোড়ো বাড়ির ভাঙা এক কামড়ায় বসে গম্ভীর মুখে সিগারেট টানতে ব্যাস্ত ঈশান আরশাদ দেওয়ান। এটা সেই জায়গা যেটা কয়েকদিন আগে, পুলিশ সুবর্ণা নামের মেয়েটির লা শ উদ্ধার করেছিলো। বর্তমানে পুলিশের সিজ করা জায়গা এটা। গোটা ভাঙাচোরা ভবনের আশেপাশে লাল ফিতে দিয়ে মোড়ানো, কঠোর ভাবে বাইরের মানুষ ভিতরে প্রবেশ করা নিষেধ। একটা সময় তার কিছু লোকজনের ঘাঁটিও ছিলো এটা, যদিও বর্তমানে তা নেই। চারিদিকে ঘোর অন্ধকার, শুধুমাত্র এই ঘরের ভিতরে এককোনায় টিমটিমে আলো জ্বেলে রাখা। ঈশানের ফোনটি ক্রমাগত বেজেই যাচ্ছে। আঙুলের ফাঁকে চেপে রাখা আধখাওয়া সিগারেটের অংশটুকুতে উদাসীন টান দিলো ছেলেটা। বড্ড অনিহার সাথে তাকালো সেলফোনের দিকে। ফোনটা খানিক আগেই চালু করেছে, একের পর এক মেয়েটার কল এসেই যাচ্ছে।

—’ ঈশান আরশাদ? ‘
ভারি পায়ের আওয়াজের সাথে সাথে একটা পরিচিত কন্ঠস্বরও শুনতে পাওয়া গেলো। মূলত এই কন্ঠস্বরের মালিকের জন্যই এই অসময়ে এখানে এসে বসে আছে সে। ঈশান জবাব দিলো না। ততক্ষণে আগন্তুক নড়বড়ে দরজাখানা ঠেলে প্রবেশ করেছে ঘরের মধ্যে। ঈশান সহাস্যে স্বাগতম জানালো তাকে।
—’ ইনস্পেকটর তাহমিদ কায়েস! নাকি প্রফেসর তাহমিদ কায়েস! কোনটা বলে স্বাগতম জানানো উচিত। ‘
তাহমিদের মুখের হাসি প্রস্যস্ত হলো খানিকটা। বরাবরের মতোই সিভিলে এসেছে সে। সুদর্শন পুরুষের চোখমুখে আজকে একটু অন্যরকম দ্যুতিই কাজ করছে। হাতের জ্বেলে রাখা সেলফোনের আলো টুকু নিভিয়ে, কদম ফেলে দুরত্ব ঘুচিয়ে মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো সে। স্বাভাবিক গলায় বললো,

—’ আমি কোনটা বলে সম্বোধন করবো? বিজনেসম্যান ঈশান আরশাদ দেওয়ান, নাকি ক্রি মিনাল, রে পিস্ট ঈশান আরশাদ দেওয়ান? ‘
ঈশানের সরু ভ্রু জোড়ার মাঝে দু’খানা ভাজ পরলো এ যাত্রায়। হাতের ফুরিয়ে আসা সিগারেটের অংশটুকুন ছুঁড়ে ফেলে বাঁ পায়ের ওপর ডান পা টা তুলে, আয়েশ করে বসতে বসতে বললো,
—’ পুলিশ অফিসার হয়ে নে শা ধরেছেন নাকি! উল্টাপাল্টা বকেন, উল্টাপাল্টা করেন। কাহিনি কি?’
ঈশানের সুক্ষ্ম অপমানটুকুন গিলে নিলো সে। বুকে আড়াআড়ি হাত ভাজ করতে করতে বললো,
—’ জানতে চান না কেনো ডাকলাম এখানে? ‘
—’ আগ্রহ আছে বলেই তো এলাম। করিৎকর্মা লোক আপনি। নিশ্চয় কাজের জন্যই জরুরি তলব।’
—’ অবশ্যই। তা আর বলতে। কাজ ছাড়া, আপনার সাথে চায়ের আড্ডা বসানোর মতো সময় আমার নেই। আপনারও নেই নিশ্চয়। ‘
ঈশান বাঁকা হাসে। ফিচেল কন্ঠে বলে,

—’ নেই বলছেন? অথচ আমি জানতাম আছে। মনে নেই? চায়ের আড্ডা হয়েছিলো কিন্তু আমাদের। ওই যে, বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আমার বাড়ি এসে হাজির হয়েছিলেন। তা বিয়ে টা করার কি ইচ্ছে এখনো আছে?’
—’ আপনার কৃতকর্মের সাথে আপানার পরিবার জড়িত নয়। সে তথ্য আমার জানা। সুতরাং, আপনার কোনো কাজের প্রভাব আমি নিশ্চয় আপনার পরিবার এর ওপর ফেলবো না। ‘
শব্দ করে হেসে উঠলো ঈশান। তাহমিদ কায়েশের মতো বুদ্ধিমান একজন ব্যাক্তির সে হাসির মানে বুঝতে খুব একটা বেগ পেতে হলো না। গম্ভীর মুখ করে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো ঈশানের প্রতুত্তোরের আশায়। ঈশান দু’হাতে মাথার চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করে শীতল কন্ঠে বললো,
—’ এখনো দেওয়ান বাড়ির জামাই হওয়ার আশায় আছেন?’
—’ আশা? আশা বলছেন কেনো! বাড়ির ছেলে যখন ধ র্ষন মামলায় জেলে যাবে, সে বাড়ির মেয়ের পাত্র খুঁজতে নিশ্চয় বেগ পেতে হবে। আমার মতো সুযোগ্য পাত্র আর কয়টা মিলবে?’
—’ যে ব্যাক্তির জন্য দেওয়ানদের সম্মানে আঁচড় লাগবে, সে-ই ব্যাক্তির কাছে বাড়ির মেয়ে দেওয়া উচিত কি?
—’ যে মেয়ের ভাই, ঈশান আরশাদ দেওয়ান সয়ং ধ র্ষনকারী, সেই হেতুতে উচিত হতেই পারে।’
তাহমিদ যে এখনো অবধি ঈশান -তিতিরের সম্পর্কে অবগত নয়, এটা বুঝতেই পেট ফেটে হাসি পেলো ঈশানের। তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটলো চোখেমুখে। বাঁকা কন্ঠে বললো,

—’ আপনাকে যতটা তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অফিসার ভেবেছিলাম ততটা নন। আপনাদের চাকরিতে নজর সবদিকে থাকা উচিত। ওপরের জিনিস যতটা স্পষ্ট দেখা উচিত, ভিতরটাও ততটা খেয়াল করা উচিত বোধহয়। হতাশ, বড্ড হতাশ। আপনার কাছে বাড়ির মেয়ে দেওয়া যাবে না। অসম্ভব। এরকম ভোঁতা বুদ্ধির পুলিশ অফিসার চলবে না পাত্র হিসেবে। ‘
অপমান টুকু সন্তর্পণে হজম করলো অফিসার। নিজের হাতের হ্যান্ডকাফ টা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে বললো,
—’ আপনার বন্ধু’কে সাসপেন্ড করা হয়েছে, জানা আছে কি?’
ঈশান হাসিমুখে মাথা ঝাকায়। জানা আছে তার। সাজিদ কে আজকেই সাসপেন্ড করা হয়েছে। প্রমান লোপাটের অভিযোগে। যদিও এখন অবধি সেটা প্রমান হয়নি ।
—’ আমাকে কি নিজের মতো ভাবছেন? ‘
—’ মানে? ‘
—’ মানে কিছু না। বলুন, কি বলতে এতো আয়োজন করে ডেকেছেন। ঘরে আমার বউ আছে, এতো রাতে বাড়ির বাইরে কি মন বসে?’
ঈশান বিবাহিত, এই তথ্য অজানা তাহমিদের। সুতরাং, এই কথাটাকে সে ঈশানের মশকরা হিসেবেই ধরে নিলো। নরম গলায় বললো,

—’ সেটা তো হচ্ছে না, দেওয়ান সাহেব। বউ’কে সম্ভবত আর বু কে জড়াতে পারবেন না। ‘
—’ কেনো কেনো?’
—’ আপনাকে এখন হাজতে যেতে হবে।’
শব্দ করে হেসে উঠলো ঈশান। এমন ভারি আওয়াজে, তাচ্ছিল্যের হাসির রেশ, বেশ টের পায় তাহমিদ। ভ্রু জোড়া কুঁচকে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়। হাতের মধ্যে ধরে রাখা, ধাতবের হাতকড়া খানা শক্ত করে চেপে ধরে। একজন ধ র্ষ কের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। অথচ সেই ব্যাক্তি কি-ই অমায়িক হেসে যাচ্ছে, পুলিশকেই রীতিমতো চোখ রাঙাচ্ছে। ঈশান এ যাত্রায় চেয়ার খানা শব্দ করে ঠেলে পেছনে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। দু’হাতে শার্টের অংশটুকু টেনে ঠিক করতে করতে ফিচেল গলায় শুধায়,

—’ আপনার কিন্তু সাহস বেশ। ‘’
—’ তা আছে, বলতে পারেন।’
মাথা ঝাঁকালো ঈশান। প্যান্টের পকেটে হাত দু’খানা গুঁজে বললো,
—’ না হলে কি আর ঈশান আরশাদ’কে এরেস্ট এর হুমকি দেন। ‘
—’ হুমকি নয়। ‘
—’ তা গ্রেফতার করবেন কোন অপরাধে ? ‘
—’ সেটাও মুখে আলাদা করে বলে দিতে হবে?’
—’ খু ন, নাকি ডা কাতি ? ‘
একপেশে হাসলো তাহমিদ। হাতের ওয়াকি-টকি খানা মুখের কাছে ধরে, বাইরে অপেক্ষাকৃত পুলিশদের আদেশ ছুড়লো গোটা বাড়িটা ঘেরাও করে ফেলতে। নিজেও পকেট হাতড়ে, গুপ্ত অ স্ত্রটা পরখ করে নিলো। গম্ভীর গলায় বললো,
—’ রে প এবং মা র্ডার। তাও একটা নয়, দেওয়ান সাহেব। পাঁচ পাঁচটা। ‘
—’ প্রমান? ‘
—’ শুরু থেকে শেষ অবধি, সব। ‘
—’ ওয়ারেন্ট? ‘

—’ আপনার নামে এরেস্ট ওয়ারেন্ট আছে, দেওয়ান সাহেব। আমাকে বোকা মনে হয়? এতো বড় একটা কেসের জন্য ওয়ারেন্ট ছাড়াই আপনার হাতে হাতকড়া পরাতে ছুটে আসবো? ‘
ঈশান খানিকটা সময় ভাবলো কিছু একটা। তাহমিদ কায়েস কে বিশ্বাস করা যায়না। একদম যায়না। এর জায়গায় আজকে হয়তো সাজিদ থাকতো। কিন্তু এই লোকটা নিজহাতে সরিয়েছে সাজিদ’কে। এলোমেলো করে ফেলেছে ঈশান আরশাদের সকল পরিকল্পনা। মাঠে মা রা যাচ্ছে সব। ঈশানের মুখের হাসিটুকুন মিলিয়েছে এরই মধ্যে। হাতে হাতকড়া পরে সাময়িক সময়ের জন্য হাজত অবধি যেতে মোটেই আপত্তি নেই তার। কিন্তু তার পরিবার, তিতির? তারা! বুঝবে কি সবটা? মানতে পারবে তো! বারংবার কানে এসে বারি দিলো তিতিরের বলা সেই কথা, “ নারীঘটিত কিছু হলে, কৈফিয়ত দেওয়ার আগে ডি ভোর্স লেটার হাতে করে আনবেন।’ মেয়েটা যা জেদি, শেষ অবধি কৈফিয়ত শোনার প্রয়োজন বোধ করবে তো? আবার এমনও তো হতে পারে, তিতিরও অপেক্ষা করলো কৈফিয়ত শোনার– কিন্তু সে সঠিক সময় কৈফিয়ত টা দিতে পারলো না। তখন? তাছাড়া তার পরিকল্পনা মাফিক সব ঘটাতে চাইলে, এখন স্ব-ইচ্ছায় হাজত বাস করতেই হবে।
তাহমিদের গম্ভীর অথচ জ্বলজ্বল করতে থাকা মুখপানে তাকিয়ে ঈশান হালকা গলায় বললো,

—’ সাজিদ কে কখন অব্যহতি দেওয়া হয়েছে? ‘
—’ সন্ধ্যায়। ‘
—’ এর মধ্যেই আপনি চার্জ বুঝে পেলেন? ‘
—’ আমি দিনের পর দিন নজরে রাখছিলাম আপনাদের দু বন্ধুকে। সেটা নিশ্চয় টের পেয়েছেন এতক্ষণে?’
—’ তা পেয়েছি। ‘
—’ আপনি এ-সবের পিছন, এটার প্রমাণ আমার হাতে এসেছিলো বহু আগে। অপেক্ষা করছিলাম, আপনার বন্ধুর কি পদক্ষেপ হয়। যা ভেবেছিলাম, হয়েছেও তাই। আপনার বন্ধু, আপনার বিরুদ্ধে প্রধান গুলো লোপাট করতে রীতিমতো মরিয়া।’
সন্তুষ্টির হাসি হাসলো ঈশান। সে কিন্তু শেষ পর্যন্ত জানতো, সাজিদ কখনোই তার হাতে হাতকড়া পরাতে পারবে না। কখনো না। ঈশান নিজের সেলফোনের ওয়ালপেপারে থাকা হস্যজ্জল রমনীর দিকে গভীর এক দৃষ্টি তাক করলো। সেদিকে দৃষ্টি রেখেই তাহমিদ কে উদ্দেশ্য করে বললো,
—’ চাকরি, জান কোনোটারই পরোয়া করলেন না, মিস্টার তাহমিদ কায়েস! ইট’স ওকে, ইট’স ওকে। আপনার জান, আপনার সিদ্ধান্ত। গ্রেফতারের সময়, আমাকে একটা উপকার করে দিন তাহলে। আমার জানে’র কাছে একটা বার্তা পৌছে দিন।’
তখন থেকে একেরপর এক হেয়ালির সামনে পরছে তাহমিদ। ঈশান মুখে ‘জান’ শব্টা শুনে ভ্রু কুঁচকে শুধালো,

— ‘ আপনার জান?’
—’ আমার বউ। ‘
তাহমিদ কায়েসর মুখে ফিচেল হাসির রেখা ফুটে উঠলো। হাসি প্রস্যস্ত করে বললো,
–- ‘ আপনি বিবাহিত? ‘
—’ নিঃসন্দেহে। একেবারে হালাল ভাবে, ত্রিশ লাখ টাকা নগদ কাবিনে। কালেমা পরে, বা সর সেরে ফেলা বিবাহিত যাকে বলে।’
তাহমিদ সম্ভবত বিশ্বাস করলো না এবারেও। বাঁকা গলায় বললো,
—’ ধ র্ষ ‘ন মামলা! স্ত্রী কে কি বলতে চান ? ‘
—’ অনেক কিছুই অজানা আপনার। শুনুন অফিসার, আমার তিতির — মানে আমার স্ত্রী কে গিয়ে বলবেন, আমি ওকে উন্মাদের মতো ভালোবাসি। ওকে ছাড়া দ্বিতীয় কোনো নারীকে গভীর স্পর্শ তো দূর, তাকিয়েও দেখিনি। আমাকে যেনো কৈফিয়ত দেওয়ার সুযোগ দেয়। আমি ফেরা অবধি অপেক্ষা করে। ‘
“আমার তিতির “ শব্দটুকু কানে এসে বিধলো তাহমিদের। সঠিকই শুনলো কি-না সেটা বুঝতে পুনরায় গম্ভীর গলায় শুধালো,

—’ কে, কাকে বলবো?’
ঈশান নিঃশব্দ হাসে। শান্ত সুরে বলে,
—’ বিবাহিত একজন মেয়ের জন্য, বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসেন। তাও মেয়েটা আবার দেওয়ান বাড়ির পুত্রবধূ৷ সয়ং ঈশান আরশাদ দেওয়ানের বউ। সামান্য এতটুকুন সত্যি আপনার ছানি পরা চোখে পরে না। আর আপনি নাকি আমাকে ধ র্ষন মামলায় এরেস্ট করতে চান? ইজেন্ট ইট ফানি, তাহমিদ কায়েস? ‘
তাহমিদ কায়েস চমকেছে ভীষন ভাবে। গলার স্বর খাদে নামিয়ে বললো,
—’ তিতির বিবাহিত? ‘
ঈশান দু কদম এগিয়ে আছে। মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়েছে। ভ্রু জোড়া উঁচিয়ে দৃঢ় গলায় বলে ওঠে,
—’ তিতির কি আবার? মিসেস ঈশান আরশাদ দেওয়ান বলুন। বউ ও আমার। তিন কবুলে বিয়ে করা বউ। আমার অস্তিত্ব, আমার অর্ধাঙ্গিনী। সম্মান দিয়ে সম্মোধন করবেন। যতই বয়সে সে আপনার ছোট হোক, সে একজন বিবাহিত নারী। ও ঈশান আরশাদের । পুরোটা আমার। ‘
মাথায় আকাশ ভেঙে পরার মতো স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে আছে বেচারা। এই হিসেবটা তার মেলেনি কেনো? ঈশান বিবাহিত, তিতির তার বউ। এত বড় একটা ঘটনা অজানা তার! রুষাও জানায়নি। উল্টো তাকে ক্রমাগত আশকারা দিয়ে গিয়েছে। নাকি রুষারও অজানা! তা তো হওয়ার কথা নয়। তাহমিদ কে বজ্রাহত অবস্থায় দেখেও ঈশানের মুখাবয়বের পরিবর্তন হলো না খুব একটা। খুব সহজেই এই লোকটার হাত গলিয়ে বের হয়ে যেতে পারবে সে, তাতে অবশ্য তার সুবিধা কিচ্ছু হবে না। পরিকল্পনার মাঝপথে এমন বাঁধা পরায়, রীতিমতো বিরক্ত সে। হাতে গোনা আর এই এক সপ্তাহ। তারপরেই সবটা তার নিয়ন্ত্রণে থাকতো, অথচ এই লোকটা ঘেটে দিলো সবটা। কানে বাজলো দুপুরে রুষার বলা কথাগুলো। এই মূহুর্তে ঘটতে থাকা ঘটনাগুলোতে যে রুষা বা ইয়াজ মির্জার হাত আছে, তার হিসেব মেলাতে দেরি হয় না।

খোলা জানালা গলিয়ে হুড়মুড়িয়ে ঘরের ভিতর প্রবেশ করা ভেজা বাতাসে ঘুম হালকা হয়ে এলো তিতিরের। ঈশানের জন্য অপেক্ষা করতে করতে জানালা লাগোয়া কাউচে কখন চোখ লেগে এসেছিলো বুঝতেই পারেনি মেয়েটা। ভোর হচ্ছে সম্ভবত। তবে বাইরের মেঘলা আবহাওয়ার কারণে বেলা কত হয়েছে, সেটা ঠাহর করা যায়না। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। সেটারই ঝাপটা এসে লাগছে। ঘুম ভাঙতেই হুড়মুড় করে উঠে বসলো মেয়েটা। দু’হাতে চোখ ডলতেই নিজেকে আবিষ্কার করলো এখানটায়। বিছানার দিকে তাকাতেই চিন্তিত হলো মুখটা। রাতে যেমনটা ছিলো একদম সেরকমই এখনো। গোটা রাতে যে, বিছানায় কেউ গা ঠেকায়নি সেটা স্পষ্টত বুঝতে পারা যাচ্ছে। তিতির ভ্রু কুঁচকে উঠে দাঁড়ালো। তরি ঘড়ি করে ফোন হাতড়ালো। নাহ্, ঈশানের একটা ফোন বা মেসেজ কিচ্ছু আসেনি। বেলা সবে ছ’টা বাজে। বাড়ির গিন্নি, কর্তারা সবাই উঠে পরেছে নিশ্চিত। দ্রুত পায়ে নিচে নেমে আসতেই সত্যতা মিললো। রান্নাঘরে ব্যাস্ত শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। বসার ঘরের সোফায় চা খাচ্ছেন রাইসুল দেওয়ান। বাকিরা সম্ভবত এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি। আজকে শুক্রবার। হিসেব মতে সব্বাই বাড়িতেই থাকবে আজকে। এতো সকালে তিতিরকে সিঁড়ি ভেঙে দ্রুত পায়ে নেমে আসতে দেখেই সহাস্যে বউমাকে কাছে ডাকলেন দেওয়ান কর্তা। তিতির এগিয়ে গেলো। মামাকে উদ্দেশ্য করে শুধালো,

—’ ঈশান ভাই এসেছে এখানে ?’
—’ এ কি কথা, মা? ভাই কিসের? এখনো ভাই হয় তোর? হুম? আমার ছেলেটাকে তুই এই করে করেই রাগিয়ে দিস।’
হাসতে হাসতে কথাগুলো আউরাতে আওরাতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন রাহেলা। হাতের চায়ের কাপটা স্বামীর দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে পুনরায় বললেন,
—’ নাম ধরে ডাকবি প্রয়োজন হলে। তবুও, ভাই আবার কি?’
শশুর, শাশুড়ির এমন কথায় সামান্য আড়ষ্টই হলো মেয়েটা। তবে সে লাজুকতা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারলো না। চিন্তিত গলায় বললো,
—’ তোমার ছেলে কোথায়, মামনী? ‘
রাইসুল দেওয়ান ভ্রু কোঁচকায়। ওপরের দিকে তাকিয়ে শুধায়,
—’ কেনো? ঘরে নেই? এতো সকালে সে-কি ওঠে কখনো? ‘

তিতিরের খেয়াল হয়, ঈশান সম্ভবত গতরাতে বাড়িতেই ফেরেনি। কথাটা জানাতেই দু’জন ব্যাস্ত হলো বেশ। দারোয়ান কে ডেকে জানা গেলো রাতে ঈশান সত্যিই ফেরেনি। গোটা রাত গেটে তালা ঝুলেছে। ভদ্রলোক ক্রমাগত ফোন করে গেলো ছেলেকে। বন্ধ সেটা। ছেলের বন্ধু বান্ধবের থেকেও খোঁজ পাওয়া গেলো না কিছু। সাজিদ ঢাকা গিয়েছে গতরাতে। তার হদিসের নাগালও পাওয়া অসম্ভব এখন। বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে। চিন্তার পাহাড় জমা হচ্ছে তত। গোটা বাড়ির সবাই শুনেছে আচমকা ঈশানের হাওয়া হয়ে যাওয়ার কথা। একে ওকে ফোন করে লাগাতার খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছে। গতরাতে বেশ ঝড়-ঝঞ্ঝা গিয়েছে। এর মধ্যে কোথাও আটকা পরেছে কি-না!
একপ্রকার উতলা সময় পার করছে দেওয়ান বাড়ির সকলে। নিয়াজ, নাঈম’রা সারাটাদিন ঈশানের খোঁজ করতে ছোটাছুটি করেছে। সাজিদকে চাকরির প্রয়োজনে তলব করা হয়েছে ওপর মহল থেকে। সুতরাং এদিকে ঘটে যাওয়া ঘটনা সম্পর্কে সে অবহত নয় মোটেই। তার সাথেও যোগাযোগ করতে পারা সম্ভব হয়ে উঠছে না। মফস্বলের সরু রাস্তা পার হয়ে নাঈমদের গাড়ি এসে উঠেছে মেইন সড়কে। ড্রাইভ করছে নাঈম, পাশে নূরি বসা। একে ঈশানের খোঁজ নেই, তার ওপর নয়নের শরীর কাঁপিয়ে জ্বর। বড্ড এলোমেলো অবস্থা। বৃষ্টি মাথায় নূরি বেরিয়েছিলো ওষুধ আনতে। নাঈমকে সঙ্গে পাঠিয়েছে রাসেদ দেওয়ান।
দুই ভাইয়ের চিন্তায় একপ্রকার ছন্নছাড়া অবস্থা মেয়েটার। ক্রমাগত হাতের চাপে দলিতমথিত হচ্ছে ওড়ানা খানা। নাঈম নিজেও আজকে স্তব্ধ হয়ে আছে। সে যা ভাবছে সেটাই ঘটেছে কি-না, সেটাও বুঝতে পারছে না। আর না তো নূরিকে সে-ই বিষয়টা নিয়ে কিছু শুধাতে পারছে!তবে নাঈমের সে-ই জড়তা কাটিয়ে দিলো নূরিই। সামনের ভেজা পিচ ঢালাই করা পথের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় শুধালো,

—’ ইয়াজ মির্জা সম্পর্কে কতটা জানেন আপনি?’
নূরির মুখে ইয়াজের আলোচনা শুনতে পাবে, এমনটা আশা করেনি নাঈম। প্রশ্নটা শোনা মাত্র কিয়ৎক্ষন থমকে থাকলেও, জবাব দিলো।
—’ জানি কিছু টা।’
—’ কিছুটা?’
—’ কেনো?’
—’ প্রশ্নের উত্তর কখনো প্রশ্ন হয়না।’
স্টেয়ারিং খানা ঘুরিয়ে গাড়ি মোড় নিলো রাস্তায়। সেদিকেই মনযোগ দিয়ে নাঈম বললো,
—’ ঈশানের আচমকা নিখোঁজ হওয়ার পিছনে ইয়াজ মির্জা রিলেটেড কিছু আছে। সেটা ধারনা আমার। তোমারও কি তাই? ‘
—’ নিখোঁজ হয়েছে বলেছেন কেনো? কোনো কাজে তো আটকেও যেতে পারে।’
—’ তা তো পারেই। তবুও।’
নূরি চুপ করে থাকে সামান্য মূহুর্তের জন্য। হাজার একটা সন্দেহ মাথায় ঘুরছে তার। গতরাতে আরেকদফা ইয়াজের হেয়ালিপূর্ণ কথা শুনতে হয়েছে তার।
—’ আপনাকে ভাইয়া সত্যিই কিছু জানায় নি?’
—’ মিথ্যা বলছি আমি?’
—’ বার্বি কতটা আপসেট হয়ে আছে দেখতেই পাচ্ছেন। খোঁজ পেলে জানাবেন ঝটপট। ‘

নাঈম মাথা ঝাকায়। শ্যামবরন মুখটা অন্ধকার হয়ে আছে। ঈশানের চিন্তায় গতরাত থেকে মাথা ছিড়ে যাচ্ছে একপ্রকার। সাজিদের সাথেও কথা বলে উঠতে পারেনি। ছেলেটা আচমকা কোথায় গিয়ে আটকে আছে কে জানে! ব্যাস্ত রাস্তায় সারি সারি গাড়িগুলোকে পিছনে ফেলে দ্রুত গতিতে চলছে তাদের গাড়ি। নূরিকে ওষুধ গুলো নিয়ে বাড়ি ফিরিয়ে দিয়ে এসে, ঢাকার উদ্দেশ্যে বের হবে। আর এর মধ্যে ঈশানের কল আসলে তো হলোই।
খানিকটা সময় ইতস্তত করে নূরিকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন ছুড়লো নাঈম।
—’ ইয়াজ মির্জার সাথে এখনো যোগাযোগ আছে তোমার?’
নূরি তৎক্ষনাৎ জবাব দেয় না। বিরক্ত মুখে তাকায় নাঈমের দিকে। তেঁতো গলায় বলে ওঠে,
—’ আমার ব্যাক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলা কবে থেকে বন্ধ করবেন, নাঈম ভাই?’
নাঈম মৃদু হাসে। নূরি সামান্য তম অনূভুতি নিয়ে সে দিকে তাকালে, খেয়াল করতো পাশের শ্যামবরণ পুরুষটার ব্যাথাতুর হাসি। নাঈম হালকা স্বরে বললো,

—’ ইয়াজ মির্জার বিষয়টা তুমিই তুলেছিলে, নূরি। আমি নই। ‘
—’ ভুল হয়েছে আমারই। আমারই দোষ।’
—’ আমি তোমার ব্যাক্তিগত পুরুষ হতে মরিয়া, নূরি। তাই তোমার ব্যাক্তিগত বিষয়ে নাক গলিয়ে ফেলি।’
—’ আপনাকে আর কতবার বললে এসব বলা বন্ধ করবেন? ‘
—’ এ জীবনে তো সম্ভব নয় বোধহয়। ‘
নূরি দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এসির মধ্যে বসে থেকেও তীব্র গরম অনুভব করে। গলার ওড়না’টা সামান্য আলগা করে কঠিন গলায় বলে,
—’ আমার ক্ষেত্রেও একই জিনিস প্রযোজ্য। ‘
—’ কি?’
—’ আপনাকে ভালোবাসা।’
—’ কতটা অসম্ভব। ‘
—’ পুরোটা।’
—’ তুমি যে আস্ত একটা বোকা, সেটা মানো?’
নূরির মুখের ভাব পরিবর্তন হয় না। বরং আগের থেকে কঠিন হয় আরও।
—’ হলে হলাম। তো?’
আহত হাসলো নাঈম। হাত বাড়িয়ে এসির পাওয়ার আরও খানিকটা বাড়িয়ে দিয়ে নরম সুরে বললো,
—’ এভাবে জীবন চলতে পারে না। যদি না তুমি এখনো ইয়াজ মির্জা কে ভালোবাসো বা তার কাছে ফিরতে চাও।’
—’ আপনি পাগল?’

একপ্রকার চেঁচিয়ে উঠলো নূরি। নাঈমের দিকে ঘুরে বসলো বেশ খানিকটা। চোখেমুখে রাজ্যের বিরক্তি। স্পষ্ট বুঝতে পারা যায়, এই মূহুর্তে নাঈম যা বলেছে সেটা মোটেই মানতে নারাজ সে। নাঈম কিন্তু কোনো সাড়া দিলো না। নূরি তৎক্ষনাৎ বলে উঠলো,
—’ ও একটা চরিত্রহীন। বে ইমান। শুধুমাত্র প্র তিশোধ নিতে এতো কাহিনি করে যাচ্ছে। দিনের পর দিন আমাকে ঠকিয়েছে। একবিন্দুও ভালোবাসেনি। ওই জা নো য়ার লোকটার সন্তান তারই বাড়ির কাজের মেয়ের গর্ভে। অনৈতিক ভাবে। বুঝতে পারছেন? কতটা নোং রা একটা লোকের মায়ায় আটকে ছিলাম আমি? আরও? কিভাবে ভাবলেন, আমি এখনো তাকে ভালোবাসি বা ফিরতে চাইবো তার কাছে?’
—’ তাহলে দ্বিতীয় বার জীবন নিয়ে ভাবছো না কেনো?’
—’এতো সহজে ক্ষত সারে? আর যদি বলি পুরুষজাতির ওপর আমার এক আকাশ সম ঘৃনা জন্মেছে। তাহলে? কি বলবেন তার জবাবে।’
—’ জন্মানোই স্বাভাবিক। তবে নিজের বোকামি আর অন্য একজনের ছলনায় জীবনে একবার যে ভুলটা হয়ে গিয়েছে, সেটা আঁকড়ে পরে থেকে, তোমাকে যে সত্যিকারের ভালোবেসেছে– তাকে ফিরিয়ে দেওয়া কি যুক্তিযোগ্য?’

নূরি গোটা’টা রাস্তা আর একটা শব্দও উচ্চারণ করলো না। গন্তব্যে পৌছে নয়নের জন্য ওষুধ কিনে বাড়ি ফেরার পথেও না। দু’টো মানব মানবীর নিরব যুদ্ধ চললো একপ্রকার। নাঈম হয়তো আরও কিছু বলতো। তবে পাশের মানুষ’টির আগ্রহ যে তাতে নেই, সেটা বোধগম্য হতে সময় লাগলো না খুব একটা। দেওয়ান বাড়ির সামনে এসে থামিয়েছে গাড়িখানা। নূরি, নিঃশব্দে নেমে যেতে উদ্ব্যত হতেই আচমকা একটা কাজ করে বসলো নাঈম। মেয়েটা সবেই হাত বাড়িয়েছিলো দরজা খুলতে। তার আগেই কবজিতে টান পরলো তার। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেয়েটা টের পেলো তার পেলব গাল গিয়ে বারি খেয়েছে একটা শক্তপোক্ত বুকের সাথে। যেখানে রীতিমতো ঝড় উঠেছে। হৃদপিণ্ডের উথাল-পাতাল শব্দ বোঝা যাচ্ছে স্পষ্ট ভাবে। মেয়েটা হতভম্ব হয়ে সরে আসার আগেই নাঈম বাঁ হাতে বুকের ওপর চেপে ধরলো আলতো হাতে। ভীষন ব্যাকুল গলায় বললো,

—’ আজকেই প্রথম আজকেই শেষ। একটু থাকো।’
নূরি নিজের হতভম্বতা কাটতেই, আচমকা ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো। জড়ানো গলায় বললো,
—’ জোর করে স্পর্শ করা আপনাদের পুরুষদের জন্মগত অধিকার বুঝি?’
মেয়েটার কান্নামাখা এই অভিমানী কন্ঠ কানে আসতেই, এক সেকেন্ডর মধ্যে হুশ ফিরলো নাঈমের। সে এই মাত্র আবেগের বশে কি করে ফেলেছে টের পেতেই দু’হাতে মেয়েটার বাহু আঁকড়ে সরিয়ে ফেলতে চাইলো। ব্যাস্ত গলায় বললো,
—’ অ্যাম সরি। সরি, নূরি। আমি তোমার অনুমতি ছাড়া স্পর্শ করতে চাইনি। আমি…’
—’ এক মিনিট চুপ থাকুন।’
বাক্য শেষ করার আগেই নূরির কথাটায় থমকালো নাঈম। সে আর ধরে নেই নূরিকে। তবে মেয়েটা নিজ থেকে সরে নি। বুকের ওপরই মাথাটা ঠেকিয়ে রেখেছে। নাঈম তীব্র অপরাধবোধে জর্জরিত হচ্ছে এখন। দু’টো মানুষ কেউ কাউকে দু’হাতে স্পর্শ করে নেই। বদ্ধ গাড়ির ভিতরে ক্রমাগত চাপা মেয়েলি কান্নার আওয়াজ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে শুধু। সেকেন্ডের কাটা ঘুরে মিনিটে গিয়ে ঠেকতেই শোনা গেলো মেয়েটার মিহি কন্ঠস্বর। কান্না গিলে কোনোমতে বললো,

—’ আমার কাছ থেকে আপনি কোনো আশা রাখবেন না, নাঈম ভাই। আমি নিজের মনকে আর নতুন করে কিচ্ছু বোঝাতে পারবো না। সম্ভবই নয়। আপনি অত্যন্ত ভালো একজন মানুষ। কিন্তু আমি আপনাকে ভালোবাসতে অপারগ। ‘
নাঈম একপেশে হাসলো। হাতজোড়া রীতিমতো কাপছে মেয়েটাকে একটাবার ছুঁয়ে দিতে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে। তবে দ্বিতীয় বার এই ভুল সে করলো না। নরম গলায় শুধালো,
—’ এতটাই অযোগ্য? ‘
—’ আপনি নন। আমি।’
—’ কে বলেছে?’
—’ আমি।’
—’ বিন্দুমাত্র অনূভুতি নেই, আমার প্রতি? ‘
—’ এখনো অবধি নয়।’
—’ তৈরি হবে না বলছো?’
—’ বোধহয় না।’
—’ তাহলে বুকে মাথা রেখেছো যে।’
—’ জানি না।’
—’ আমি কিন্তু আর স্পর্শ করে নেই।’
—’ তার জন্যই মাথাটা রেখেছি।’

নাঈম চোখ বুজে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মেয়েটার চোখের পানিতে শার্টের অংশ ভিজে উঠেছে। একটাবার মাথায় হাত বুলিয়ে, আদুরে শান্তনা দিতে পারলে বুকটার হাহাকার ফুরাতো বোধহয়। দেওয়ান বাড়ির সদর দরজায় মানুষ জনের আনাগোনা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। বাড়ির মানুষ বের হচ্ছে, অথবা বাইরের কেউ যাচ্ছে ভিতরে। নূরি কে আর কিছু বলতে হলো না। মেয়েটা মাথা তুললো বুকের থেকে। দু’হাতে চোখজোড়া মুছে, গাড়ি থেকে বের হতে পা বাড়িয়ে দিতে দিতে বললো,
—’ আমি প্রচুর স্বার্থপর আজকাল। এই যে প্রমান দিলাম কিন্তু। ভালোবাসিনা আপনাকে, অথচ নিজের মনকে শান্ত করতে ঠিক বুকে মাথা রাখলাম। ভবিষ্যতেও এমনটাই হবে। ‘
ওষুধের ব্যাগগুলো নূরির দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে একগাল হেসে নাঈম বললো,
—’ মানুষ কার বুকে মাথা রাখে, সেটা বদ্ধ ঘরে গিয়ে মন দিয়ে ভাবতে বসো গিয়ে। কেনো ভালো না বাসা সত্ত্বেও এতগুলো সেকেন্ড আমার হৃদপিন্ডের ধুকপুকুনির শব্দগুলো এতো নিদারুণ ভাবে অনূভব করলে, সেটার প্রশ্ন করো নিজেকে। কে জানে, মুখে মানা করলেও–তোমার অবচেতন মন নিজের অজান্তেই পুনরায় আরেক মনে বাঁধা পরতে চাচ্ছে না তো?’

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬২

নূরির জবাবের আশা করে না নাঈম। মেয়েটা থমকে দাঁড়িয়েছে। ফিরেও তাকাচ্ছে না। থমকে যাওয়া হৃদয় খানা কখন যে পুনরায় ছোটাছুটি শুরু করবে কে জানে! নাঈম অমায়িক হাসলো নিঃশব্দে। আদুরে গলায় বললো,
–’ আর শোনো, আমি স্বার্থপর মেয়েটাকেই গ্রহন করতে রাজি। স্ব-ইচ্ছায়। তুমি না বললে কখনো ছুঁয়েও দেখবো না তোমাকে। তবুও, আমাদের শুধু একটা সংসার হোক। যে সংসার স্বার্থপর ওই মেয়েটা নিজের সুখ খুঁজবে আমার বুকে। সেই সংসারে তিনবেলা ভাতের সাথে একবেলা তোমাকে মন ভরে দেখার সৌভাগ্য হোক। ‘

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here