মেজর কারদার পর্ব ৩০
ফিনারা ঝুমুর
দিবালোকের সূর্য তখন মধ্যগগনে উঁকি দিচ্ছে। শ্রাবণের রোদ আর মেঘের লুকোচুরিতে সূর্যের তেজ কখনও কমতি, তো পরক্ষণেই তীব্র বাড়তি! কারোর যেন কোনো বিশ্রাম নেই। ক্লাস শেষে একে একে উৎসুক শিক্ষার্থীরা হৈ-হৈ করে বিদ্যাপিঠ ত্যাগ করছে। এই ছুটির মিষ্টি সময়টার জন্য প্রহর গোণা শেষ করে তাদের সঙ্গ প্রদান করে মেঘও ভিড় ঠেলে বাইরে বের হয়ে এলো।
ক্লান্ত পায়ে কলেজের চত্বর আর পোর্টিকোর সীমানা পার হয়ে প্রধান গেইটের সংলগ্ন হতেই সে একেবারে মুখোমুখি হয়ে গেল মিসির হাওলাদারের সাথে! মেঘকে অতর্কিতে সামনে দেখতে পেয়ে মিসিরের শ্যামলা মুখে এক চিলতে অমায়িক মিষ্টি হাসি খেলে গেল।
“কেমন আছো, মেঘালয়া?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো, মিসির ভাই। আপনি কেমন আছেন?”
ওদের স্বাভাবিক কথোপকথন দেখে মনেই হবে না যে সেদিনের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো ঘটেছিল। যেন সব বিষাক্ত রেশ বহু পূর্বেই মিটে গিয়ে সব শান্ত হয়ে এসেছে।
“আছি, আলহামদুলিল্লাহ বেশ ভালো। তা তোমার পরীক্ষা কি সব শেষ হলো আজ?”
মেঘ শান্ত ভঙ্গিতে উপর-নিচে মাথা নাড়ায়। মিসির মৃদু হাসে। মেঘের এইচএসসি পরীক্ষা অবশেষে আজকেই সমাপ্ত হয়েছে। মিসির এবার একটু ইতস্তত করে গলার স্বর নিচু করে বলল—
“শুনলাম তোমার সেই দুই বান্ধবীফাতিমা আর তানিয়াদের নাকি বড্ড খারাপ অবস্থা! রাতারাতি কোনো অদৃশ্য ক্ষমতার ছোঁয়ায় ওদের বাবার ব্যবসা একেবারে ধ্বসে মাটির সাথে মিশে গেছে! তোমার সাথে কি ওদের আজকাল কোনো কথাবার্তা বা যোগাযোগ হয় না?”
সেই দুই কালনাগিনী আর চরম বিশ্বাসঘাতক বান্ধবীদের নাম কানে পৌঁছানো মাত্রই মেঘের শ্যামা মুখে যেন একরাশ বিরক্তি আর গাঢ় আঁধার নেমে এলো! ও একদম তেতো ও বিষাক্ত মুখ করে সংক্ষেপে জবাব দিল,
“ওদের সাথে আমার কোনোদিন কোনো ফ্রেন্ডশিপ ছিল না, আর ভবিষ্যতেও থাকবে না!”
কথাটা বলেই মেঘ আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। মিসিরকে পাশ কাটিয়ে গেইট পার হয়ে হনহন করে সামনের দিকে পা বাড়াল। আজ বাড়ি যাওয়ার তাড়া ওর বড্ড বেশি! মিসিরও ছাড়ার পাত্র নয়, সেও দ্রুত বড় বড় পায়ে মেঘের পাশাপাশি হাঁটা শুরু করে বলল,
“আরেহ! সামান্য কথায় রাগ করলে নাকি, মেঘালয়া? রাগ করো না প্লিজ! চলো, রাস্তায় এভাবে একা না গিয়ে আমার সাথে চলো, আমি তোমায় নিরাপদে পৌঁছে দিয়ে আসছি।”
“আমি একাই নিজের বাড়ি যেতে পারব, মিসির ভাই! আপনাকে অযথা কষ্ট করে আমার সাথে ছায়ার মতো আসতে হবে না।”
কিন্তু মিসির মেঘের সেই স্পষ্ট ও কঠোর বারণে বিন্দুমাত্র কান দিল না। ও উল্টো হাসিমুখে মেঘের তালে তাল মিলিয়ে পা চালিয়ে চলতে লাগল।
“আমার পিছু নেওয়া বন্ধ করুন, মিসির ভাই। আমায় আপনি কোনোদিনও পাবেন না!”
“পাওয়া আর না-পাওয়াটা পরের ব্যাপার, মেঘালয়া!”
মিসিরের এমন নাছোড়বান্দা কথায় মেঘের ভেতর থেকে এক দীর্ঘ ও ভারী নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। সামনের রাস্তার ধারে ফুটে থাকা এক রক্তিম জারুল গাছের দিকে নিজের ক্লান্ত দৃষ্টি স্থির রেখে ও মিসিরকে বড্ড শান্ত গলায় বলে,
“আমার আশা এবার ত্যাগ করুন, মিসির ভাই। আজ বা কাল নয়, এই জন্মে কেন কোনো জন্মেই আপনি আর আমায় পাবেন না।”
এক লহমায় তীব্র বেদনা ও হতাশা ফুটে ওঠে মিসিরের আননে। বিষাদে মোড়ানো ভাঙা কণ্ঠে সে মেঘের দিকে চেয়ে আকুল হয়ে শুধায়,
“তোমায় যে আমি আমার মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি, মেঘালয়া! তবে কি তোমায় ভালোবাসার কিংবা কাছে পাওয়ার কোনো অধিকারই আমার নেই?”
“আমি বিবাহিত, মিসির ভাই!”
মেঘের মুখ থেকে ছিটকে আসা মাত্র এই দুটো শব্দের আঘাত মিসিরের বুকে যেন পাহাড় সমান ভার চেপে বসাল! আচমকা বুকজুড়ে অক্সিজেনের চরম অভাবে হাসফাঁস করতে লাগল সে। এক বিভ্রান্তিকর ও দিশেহারা নয়নে চারপাশটায় চেয়ে মেঘের দিকে দু-কদম এগিয়ে এসে থরথর কণ্ঠে বলে,
“আমার সাথে এমন নিদারুণ ঠাট্টা করছ কেন, মেঘ? ভেবেছ বিয়ের এই মিথ্যা নাটক সাজালেই আমি তোমায় এভাবে ছেড়ে চলে যাব?”
“আজ থেকে ঠিক পাঁচদিন আঠারো ঘণ্টা পূর্বে আমার শুভ বিবাহ সম্পূর্ণ হয়েছে। আমি আপনার কাছে বিন্দুমাত্র মিথ্যে কিছুই বলিনি, মিসির ভাই!”
“তবে কেন এত যাতনা দিচ্ছ আমায়, মেঘমালা? আমায় নিজের জীবন থেকে এড়াতে এত বড় আর জঘন্য একটা মিথ্যে বলতে পারলে তুমি?”
আবেগ সামলাতে না পেরে মেঘের ফর্সা নরম হাতখানা নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে মিসির। তার দুটি চোখে উপচে পড়ছে পরম কাতরতা, শরীর আতঙ্কে কাঁপছে তীব্রভাবে যেন যেকোনো পলকে সে নিজের শারীরিক ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়বে!
মেঘের রূপোলী চোখে তখন এক অচেনা কঠোরতা ফুটে উঠল। গম্ভীর ও বরফশীতল কণ্ঠে ও তাগাদা দিল,
“আমি এখন অন্য পুরুষের পরনারী, পরস্ত্রী! দয়া করে এভাবে আমায় স্পর্শ করবেন না, মিসির ভাই!
”
এক তীব্র ধাক্কায় জোরপূর্বক নিজের হাতখানা মিসিরের মুঠো থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত পা চালায় মেঘ। মিসির যেন মেঘের সেই চাউনি আর স্পর্শেই সব উত্তর পেয়ে গেল! মেঘ সত্যি বলছে।কোনো মিথ্যে নয়! ওর বাদামি চোখের মণি জোড়ায় আজ অন্য কারোর অস্তিত্বের অপার ঝিলিক বড্ড স্পষ্ট!
ভাঙা ও রুদ্ধ গলায় দূর হতে থাকা মেঘের পিছু ডেকে শুধাল,
“কে সে পুরুষ, মেঘালয়া? কার পরম ভাগ্যলিপিতে তুমি বিধাতার হাতে লেখা হলে?”
মেঘ এক মুহূর্ত থামল, কিন্তু মিসিরের দিকে না ঘুরে সোজা হাঁটতে হাঁটতেই স্পষ্ট ও অহংকারভরা গলায় উচ্চারণ করল,
“আর্মি মেজর শীর্ষ কারদার অঙ্কন!”
কথাটা শেষ করেই বাঁকের মুখে নিজেকে আড়াল করে মিসিরের চোখের সম্মুখ হতে চিরতরে অদৃশ্য হয়ে গেল মেঘ।
রাস্তার ওপর স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল মিসির। বৃষ্টির জলে ভিজে যাওয়া পিচ্ছিল কাদার্ত রাস্তায় এবার দু-হাটু গেড়ে ধপাস করে বসে পড়ল সে! দু-গাল বেয়ে অঝোর ধারায় না-পাওয়ার বিষাক্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। পরনের বস্ত্র আর দেহের অর্ধেকাংশ ততক্ষণে কাদায় একাকার হয়ে গেছে। শ্রাবণের বারিধারা টিপটিপ করে ঝরে পড়ছে পৃথিবীর বুকে, যেন মৃত্তিকার গন্ধের সাথে সই পাতিয়ে পেখম মেলে নাচছে চারপাশ।
ক্লান্তি আর তীব্র হাহাকারে মাথা নিচু করে সেই পিচ্ছিল মাটিতে বসে পড়ে মিসির। নিজের দু-হাতে কাদা-পানি মুঠোবদ্ধ করে আকাশের পানে মুখ তুলে চিৎকার করে হু-হু করে কেঁদে ওঠে,
“যার সাথে ভাগ্য লিখোনি, তার স্থান হিয়ায় কেন দিলে? যাকে মন-প্রাণ দিয়ে চাইলাম, তাকেই দূরে সরালে? কি পাপ করেছি আমি? ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার আমার নেই?”
শ্রাবণের প্রখর বারিধারায় স্নান করে গোটা প্রকৃতি আজ সজীব আর তরতাজা রূপ ধারণ করেছে। প্রকৃতি যেন অকৃত্রিম মেঘধারার কাছে চরম ঋণী। তবে সেই তুমুল বর্ষণকে তোয়াক্কা না করে পাহাড়ি বাংলোর ছাদে ইজি চেয়ারে বসে প্রকৃতির এই রূপ দেখছিল মেজর শীর্ষ কারদার। মাঝে মাঝেই বিকট শব্দে বিজলী চমকে উঠে চিরে দিচ্ছে আকাশের বুক, আর ঠিক তেমনি এক হাহাকারের ফাঁটল ধরেছে শীর্ষর নিজের হৃদেও!
গত তিনটি দিন ধরে সেই অতি অভিমানী রমণী তার সাথে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। শীর্ষ শতবার কল করলেও ওপাশ থেকে কোনো ফিরতি সাড়া আসেনি। হেতু? রামু ব্যারাকে আসার পূর্বে সকালে ঘুমন্ত রমণীকে না জানিয়েই হুট করে চলে এসেছিল শীর্ষ। তাতেই কারদার বাড়ির মহারানীর মনে চরম মান জমেছে!
নেত্রপল্লব বুজে ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে রইল শীর্ষ। ওর শ্যামল বর্ণের চওড়া মুখশ্রী আর হালকা কালচে ঠোঁটের ওপর ঝিরিঝিরি বৃষ্টির জলবিন্দু পড়ে এক অপূর্ব আবেদনময়ী ভঙ্গি তৈরি করেছে। সেই ভেজা ওষ্ঠাধর সামান্য নাড়িয়ে ছন্দ মেলাতে লাগল ও,
“বৃষ্টি কন্যা ডানা মেলতে নাহি কোনো মানা,
দু’হাত ভরে আঁজলায় নিতে নেই তো কোনো বাঁধা।
চাহি তোমায় জনম-জনম আমার তপ্ত হিয়ামাঝে,
শ্রাবণ হয়ে ঝরে পড়ো আমার হৃদয়-সাঁঝে।
জ্বলন্ত এই বদন আমার জুড়িয়ে দাও হে প্রিয়,
তোমার ঝরঝর বরষায় মোরে আপন করে নিয়ো।”
আঁখিপট নিভাতেই শীর্ষর মানসপটে ভেসে উঠল সেই পাহাড়ি সফরের অভিমানী রমণীর এক অপরূপা রূপ! পাহাড়ি কন্যাদের নিজ হস্তে বোনা লাল-হলুদ তাঁতের শাড়ি, গাত্রে ঐতিহ্যবাহী রূপোলী অলংকার, আর মাথায় চওড়া ঘোমটা টানা। হরিণীর মতো সেই কাজলা চাউনি যেন এক লহমায় বিদ্ধ করেছিল শীর্ষর চওড়া বক্ষ!
স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠল সেই কুখ্যাত দিনের কথা। পাহাড়ি ঝুপড়ির ভেতরে ওদের দুজনকে একসাথে এভাবে ঘুমাতে দেখে স্থানীয় পাহাড়ি জনগণ বেজায় সন্দেহ করে বসেছিল। মেঘের পরনে তখন ছিল শীর্ষর ঢোলা জলপাই রঙা আর্মি শার্ট, আর শীর্ষর গায়ে স্রেফ একটা কালো প্যান্ট আর ট্যাংক টপ। শীর্ষর চওড়া ছাতিপ্রান্তে একরত্তি মেঘকে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাতে দেখে তারা ওদের চরিত্রে নির্বিচারে কাদা ছেটাতে শুরু করেছিল,
“এ মা! লাজ-লজ্জার বিন্দুমাত্র বালাই নাই রে! দেখ দেখ, পোলা-মাইয়া দুইডা মাঝরাইতে কেমতে এক লগে লেপ্টাইয়া শুইয়া আছে!”
“ছিঃ ছিঃ ছিঃ! এ কি জঘন্য দিনকাল আসলো গো! এদের বাপ-মা কি এদের ন্যূনতম নীতিশিক্ষা দেয় নাই?”
ওদের সেই উচ্চবাচ্য আর কটু আওয়াজে শীর্ষ ও মেঘ দুজনেরই ঘুম চটে যায়। মেঘ ঘুমভাঙা চোখে কিচ্ছু না বুঝলেও তুখড় মিলিটারি অফিসার শীর্ষর বুঝতে এক সেকেন্ডও বাকি রইল না যে পাহাড়িরা ওদের চরম ভুল বুঝে বসেছে। কিন্তু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে শীর্ষ আপাতত চুপটি করে রইল।
মেজর কারদার পর্ব ২৯
ওদের এই নিরবতা দেখে ক্ষিপ্ত পাহাড়ি জনতা আরও উত্তাল হয়ে উঠল। ভিড়ের মধ্য থেকে এক বয়স্কা রগচটা নারী তর্জনী উঁচিয়ে গর্জে উঠল,
“একদম নষ্ট মেয়ে-ছেলে! শরীরের এতোই জ্বালা যে রাতের অন্ধকারে একসাথে— ছিঃ!”
