রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৩
ইয়ুশরা রিমু
কাদামাটি ছুঁড়ে মা’রার পর আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ায়নি বেলা। যেন পেছনে কোনো ভ’য়ংকর বিপদ তাড়া করছে, সেভাবেই এক দৌড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়লো। দৌড়াতে দৌড়াতে তার শ্বাস অস্বাভাবিক দ্রুততায় ওঠানামা করছে, কিন্তু সেই অস্থিরতার মধ্যেও এক ধরনের তৃপ্তি কাজ করছে। কারণ যত রাগই হোক, আজ অন্তত লোকটার শার্টটাকে কাদামাটি দিয়ে ভরিয়ে দিতে পেরেছে সে।পেছন থেকে এখনও সায়রের গর্জন ভেসে আসছে,
—বেলা! দাঁড়া বলছি!
কিন্তু বেলা দাঁড়ানোর মেয়ে না। সে আরও দ্রুত পায়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়লো।ড্রয়িংরুমে তখন সায়রের বাবা সারোয়ার খান খবরের খবরের কাগজ পড়ছিলেন। বেলার মা আর বড় চাচি রান্না ঘরে নাস্তা তৈরি করছিলো।হঠাৎ বেলাকে দৌড়ে আসতে দেখে দুজনেই অবাক হয়ে বললেন,
— কী হয়েছে তোর? এভাবে দৌড়ে আসলি কেন?
কিন্তু বেলা কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ পেল না। তার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দরজার সামনে এসে উপস্থিত হলো সায়র। শার্টের একপাশে কাদামাটির দাগ স্পস্ট, চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ, আর কপালের ভাঁজ দেখে স্পষ্ট ।বোঝা যাচ্ছে তার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙার উপক্রম হয়েছে। বেলার মনে হলো এখনই হয়তো তার বিরুদ্ধে একগাদা অভিযোগের তালিকা জমা দেওয়া হবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ভ’য় পাওয়ার বদলে তার ভেতরের জেদটাই যেন আরও মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো।সায়রকে এই অবস্থায় দেখে বেলার মা ভ্রু কুঁচকে বললেন,
—এ কী অবস্থা তোমার বাবা?
সায়র সরাসরি বেলার দিকে তাকালো।তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
—আপনার মেয়েকে একটু জিজ্ঞেস করেন এই বিষয়ে চাচি।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলো,
—আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে কথা বলবেন না।
সায়র কপাল কুঁচকে বলে,
—কেন? তোর দিকে তাকিয়ে কথা বলা নিষেধ?
ড্রয়িংরুমে থাকা বড় চাচা সারোয়ার খানের দিকে তাকিয়ে বেলা বলে,
— দেখছো চাচ্চু। তোমার ছেলে সবসময় আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করে। আমার দোষ ধরে প্রতি সেকেন্ডে।
তর্জনীর আঙ্গুল তাক করে সায়র বলে,
—কারণ সবসময় দোষ তোরই থাকে।
— দেখলে চাচ্চু? শুরু হয়ে গেছে আবার।
সায়র এবার এক কদম এগিয়ে এসে বলে,
—আমি শুরু করেছি? তুই একটু আগে কী করেছিস মনে আছে?
—কিছু করিনি।
—কাদামাটি ছুঁড়ে মা’রা কিছু না?
বেলা নিজের দোষ ঢাকতে বলে,
— ওটা ভুলে করে ফেলেছি।
—ভুল??
— হ্যাঁ ।
—- ইচ্ছে করে এক মুঠো কাদামাটি হাতে তুলে ছুঁড়ে মা’রাকে ভুল বলে?
এই প্রশ্নে বেলা কিছু বলতে পারলো না। ওর কাচুমাচু চেহারা দেখে ড্রয়িংরুমে থাকা সবাই হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করছে।
সায়র কপালে হাত ঠেকিয়ে বিরবির করে বলে উঠে,
—আল্লাহ্! এই বাঁদরটার হাত থেকে আমাকে রক্ষা করো।
বেলা নিজের নামে কটাক্ষ শুনে বলে,
— আমি বাঁদর?
— হান্ড্রেড পার্সেন্ট। কোনো ডাউট আছে তোর?
— আমি মানুষ আমি বাঁদর না।
—-না, তুই বাঁদর।
বেলা মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠে,
—আমি বাঁদর হলে আপনি চিড়িয়াখানার দারোয়ান। আমাকে সব সময় চিড়িয়াখানার দারোয়ানের মতো পাহারা দেন।সারাক্ষণ আমার পেছনেই লেগে থাকেন, যেন আমি খাঁচা ভেঙে পালিয়ে যাব!
বেলার কথা শুনে সারোয়ার খান হো হো করে হেসে উঠলেন।সায়র অসহায়ের মতো তার দিকে তাকালো।
— আব্বু, তুমি এই ইডিয়টার কথায় হাসছো?
সারোয়ার খান নিজের হাসি কন্ট্রোল করে বলে,
— কোথায় না তো।
ঠিক সে সময়ে বেলার বাবা বাশার খান দুতলার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে। সে ঘুমিয়ে ছিলো কিন্তু ড্রয়িং রুমে হইচই শুনে ঘুম উবে গেলো ।কি হয়েছে দেখতে দ্রুত নিচে নামলো।
সায়র চাচাকে দেখতেই বলে উঠে,
— তোমার এই ইডিয়েট মেয়েটাকে আজ থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমার কাছে পড়তে পাঠাবে। অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট দেখছো? ইংরেজি তে পেয়েছে মাএ সতেরো নাম্বার। যেখানে পাশই মাএ তেত্রিশে। সামনে টেস্ট পরীক্ষা।তোমার মেয়েকে বলো সে যদি পরীক্ষায় পাশ করার ইচ্ছা থাকে। আজ থেকে যেন আমার কাছে পড়তে আসে । পরে ফেল করলে আমাকে কিছু বলতে এসো না এই আমি বলে দিলাম।
বাশার খান আশ্চর্য হয়ে বলে,
— ওর রেজাল্ট দিল কবে? আমাকে তো কিছু জানিয়নি।
সায়র বেলার পানে চেয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দাঁত চেপে বলে,
— ওর সেই মুখ আছে রেজাল্ট বলার। তোমার ফেলটুস মেয়েকে বলে দিও । পড়ার ইচ্ছা থাকলে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে যেন আসে।বাক্য সম্পূর্ণ করেই গদগদ পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে তলায় উঠে গেলো।
ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়ও বেলার ভেতরের রাগটা একটুও কমলো না। বরং সায়র চলে যাওয়ার পর যেন আরও বেড়ে গেলো। লোকটার এমন একটা স্বভাব আছে, যা বেলার ভীষণ অপছন্দ। ঝগড়া করবে, বকাঝকা করবে, রাগ দেখাবে, তারপর এমন ভাব নিয়ে চলে যাবে যেন পৃথিবীর সব ভুল একা বেলাই করেছে। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাড়ির সবাইও যেন অদ্ভুতভাবে সায়রের পক্ষ নিয়েই কথা বলে। ব্যাপারটা ভাবলেই বেলার গা জ্ব’লে যায়।
মুখ গোমড়া করে সে নিজের রুমে চলে এলো। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে বিছানার ওপর ধপাস করে বসে পড়লো। কিছুক্ষণ আগেও চোখে পানি ছিলো, কিন্তু এখন কান্নার জায়গাটা পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে অভিমান। কেন যে এত রাগ হয় লোকটার ওপর, সেটাও ঠিক বুঝতে পারে না সে। অথচ এই মানুষটাকেই দিনের মধ্যে একবার না দেখলে অদ্ভুত অস্থির লাগে। নিজের মনকে নিজেই বোঝে না বেলা। তাই বিরক্ত হয়ে বালিশটা টেনে নিয়ে মুখ গুঁজে শুয়ে রইলো বেশ কিছুক্ষণ।
মায়ের কয়েকবার ডাকার পর অবশেষে গোসল করতে বাথরুমে ঢুকলো সে। মাথার ওপর দিয়ে ঠান্ডা পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো, কিন্তু মনটা তবুও ঠান্ডা হলো না। বরং কাঠগোলাপ গাছের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রুপসা আর সায়রের দৃশ্যটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো। মেয়েটা কী সুন্দর করে হাসছিল! আর সায়রও কী স্বাভাবিকভাবে কথা বলছিল তার সাথে!সায়র কেন রুপসার পক্ষ নিলো?কেন সবসময় তাকে বকা দেয়?আর কেন অন্য মেয়েদের সাথে এত স্বাভাবিকভাবে কথা বলে? সেই দৃশ্যটা মনে হতেই আবার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা জ্বা’লা অনুভব করলো বেলা। মনে হলো যেন কেউ তার খুব প্রিয় কোনো জিনিস ছিনিয়ে নিতে চাইছে।
গোসল শেষ করে নিচে নামতেই খাবার প্রস্তুত। ডাইনিং টেবিলে বসে সবাই গল্প করতে করতে খাচ্ছে। শুধু বেলাই চুপচাপ। তার বাবা দু-একবার মজা করার চেষ্টা করলেন, কিন্তু বিশেষ কোনো লাভ হলো না। সে শুধু মাথা নিচু করে খেয়ে গেলো। তবে খাওয়ার মাঝখানে যখন সায়রের নাম উঠলো, তখনই তার কান দুটো অদ্ভুতভাবে খাড়া হয়ে গেলো। নিজেকে যতই স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করুক, লোকটার প্রসঙ্গ এলে তার মনোযোগ সেদিকেই চলে যায়।
খাওয়া শেষ করে রুমে ফিরেই প্রথম কাজ হিসেবে ফোনটা হাতে নিল বেলা। মেসেঞ্জার খুলে ফেক আইডিটায় ঢুকে কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলো। এখনো কোনো রিপ্লাই নেই। বিষয়টা তার অহংকারে আ’ঘাত করলো। একজন মানুষ এত ব্যস্ত কীভাবে হতে পারে? নাকি ইচ্ছে করেই উত্তর দিচ্ছে না? যত ভাবছে ততই বিরক্ত লাগছে।
কিছুক্ষণ পর ঠোঁট কা’মড়ে নতুন একটা মেসেজ লিখলো সে,
—স্যার, আপনার সন্তানের মা আজকে খুব কষ্ট পেয়েছে।
মেসেজটা পাঠিয়ে দুই মিনিট অপেক্ষা করলো। কোনো উত্তর নেই।আবার লিখলো,
— একজন দায়িত্বশীল বাবা কখনো সন্তানের মাকে এভাবে অবহেলা করে না।
এবারও কোনো উত্তর এলো না।বেলা ভ্রু কুঁচকে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর আরও একটা মেসেজ পাঠালো,
—আপনার সন্তান জন্মের আগেই বুঝে গেছে তার বাবা খুব নি’ষ্ঠুর মানুষ।
মেসেজ পাঠিয়ে নিজেই হেসে ফেললো। সায়র যদি সত্যিই এইসব পড়ে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই রেগে ফা’য়ার হয়ে বসে আছে।ভাবতেই মজা লাগলো তার।
রাতের খাবার শেষ করে বই-খাতা হাতে নেওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না বেলার। বরং তার ইচ্ছে করছিলো সারারাত নিজের রুমে দরজা বন্ধ করে শুয়ে থাকতে। কিন্তু ওই বদমেজাজি লোকটার জন্য এখন আবার বইখাতা হাতে নিতে হবে। বারান্দার দরজাটা বন্ধ করে বিছানার ওপর ধপাস করে বসে পড়লো। তারপর একটা বালিশ টেনে নিয়ে কোলে রাখলো। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর হঠাৎ করেই বালিশটাকে দুমদাম কয়েকটা ঘুষি মা’রলো।বিরক্ত স্বরে বললো সে,
— বদমেজাজি একটা মানুষ! সারাক্ষণ শুধু ধমকানো আর বকাঝকা। মনে হয় পৃথিবীর সবাই ভুল, শুধু উনিই ঠিক।
বিছানার পাশে রাখা ফোনটা হাতে নিয়ে আবার নামিয়ে রাখলো। তারপর জানালার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।আজকে বিকেলের ঘটনাটা যত মনে পড়ছে, ততই তার মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে।সায়র কি একবারও বুঝলো না যে তার খারাপ লাগছিলো?একবারও জিজ্ঞেস করলো না কেন সে এমন আচরণ করছে?না উল্টো সবার সামনে শুধু বকলো।সবসময়ই তাই।যখনই কোনো সমস্যা হয়, দোষটা আগে বেলার ঘাড়েই পড়ে।বালিশের ওপর থুতনি রেখে শুয়ে পড়লো সে।
মনে পড়ে গেল কয়েক বছর আগের কথা। ছোটবেলায় সামান্য কোথাও পড়ে গিয়েও যদি চা’মড়া ছড়িয়ে ফেলতো, সবার আগে ছুটে আসতো সায়র। আর এখন?এখন সারাদিন শুধু ধমক , বকা আর রাগ দেখায়।যেন সে বড় হওয়ার সাথে সাথে সায়রের কাছে বিরক্তিকর একটা মানুষে পরিণত হয়েছে।ভাবতেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।হয়তো সত্যিই সে বিরক্তিকর।হয়তো সত্যিই সায়র তাকে সহ্য করতে পারে না।নাহলে অন্যদের সাথে এত সুন্দরভাবে কথা বলতে পারে, আর তার বেলায় এলেই কপালে ভাঁজ পড়ে যায় কেন?চোখের কোণে হালকা পানি জমে উঠতেই বিরক্ত হয়ে মুখ ডেকে নিল বেলা।সে কাঁদবে না।একদমই না।ওই হিটলারের জন্য তো নয়ই।ঠিক তখনই বাইরে থেকে মায়ের ডাক ভেসে এলো।
—বেলা! পড়তে বসবি না?
বেলা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
— আজকে পড়বো না।
বেলার মা নাজনীন সুলতানা বললেন,
— কেন?
—-ইচ্ছে করছে না।
—ইচ্ছে না করলে হবে?
—হবে।
বেলার মা রাগী স্বরে বললেন
— হবে না। বই নিয়ে নিচে আয়। তোর বাবা কিছু বলেনি দেখে আমি বলবো না সেটা ভুলেও ভাবিস না। মা’র খেতে না চাইলে দ্রুত সায়রের রুমে যা।
বেলা বিরক্ত মুখে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলো।কেউ যেন তার ইচ্ছার কোনো মূল্যই দেয় না।আরও পাঁচ মিনিট বিছানায় গড়াগড়ি করার পর অবশেষে বই-খাতা হাতে নিলো সে। তবে পড়ার জন্য নয়, গিয়ে কিছুক্ষণ ঝগড়া করার জন্য।রুমে ঢুকতেই দেখলো সায়র টেবিলের সামনে বসে আছে। সামনে বই খোলা। হাতে কলম। মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব।বেলাকে দেখেও বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না।শুধু একবার চোখ তুলে তাকিয়ে বললো,
— বস।
বেলার মনোযোগের অবস্থা করুণ। বইটা সামনে খোলা, খাতাও বের করা, হাতে কলমও আছে।কিন্তু তার দৃষ্টি বারবার বইয়ের লাইন ছেড়ে সায়রের মুখের দিকে চলে যাচ্ছে। আর সায়রও যেন বিষয়টা টের পাচ্ছে। টেবিলের ওপাশে বসে সে শান্তভাবে পড়া বুঝিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু মাঝেমধ্যে চোখ তুলে এমনভাবে তাকাচ্ছে যে বেলা বাধ্য হয়ে আবার বইয়ের দিকে তাকিয়ে নিচ্ছে। সায়র বললো,
— এই চ্যাপ্টারটা পড়।
সায়রের কণ্ঠ শুনে বেলা বইয়ের দিকে তাকালো ঠিকই, কিন্তু পড়ার বদলে বিরক্ত গলায় বললো,
—-আপনি মানুষকে এত পড়ান কীভাবে?
— মানে?
—মানে সারাদিন ক্লাস নেন, তারপর বাসায় এসে আবার পড়ান। বিরক্ত লাগে না?
সায়র ছোট করে বলে,
— না।
বেলা মন খারাপ স্বরে বলে,
— কিন্তু আমার লাগে। কলেজে এতো ক্লাস করে এসে বাসায় আর পড়ার মুড থাকে না ।
সায়র কলমটা টেবিলে রেখে কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইলো।
—পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত যুক্তিগুলোর তোর মাথায় ঘুরপাক খায় কেন সারাদিন বল তো।
— কারন আমি অদ্ভুতই।
—সেটা তো পুরো এলাকাই জানে।
বেলা চোখ কুঁচকে তাকিয়ে বলে,
— আপনি আমাকে অপমান করছেন?
— না। সত্য কথা বলছি।
— আপনি জানেন না? সত্য কথা সব সময় বলতে হয় না।
—তাহলে মিথ্যা বলবো?
—মাঝে মাঝে বলতে হয়।
— তোর তো মিথ্যা বলার পিএইচডি আছে। আমি এইসব মিথ্যা কথা বলতে পারিনা।
বেলা কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে,
—আপনি আমাকে একটুও সম্মান করে কথা বলেন।
সায়র গম্ভীর কন্ঠে বলে,
— তুই কি সংসদের স্পিকার?
বেলা অবাক স্বরে বলে,
— আমি সংসদের স্পিকার হতে যাব কেন?
—- তাহলে এত সম্মান দিয়ে কি করবি তুই?
বেলা মাথা চুলকিয়ে বিরবির করে বলে,
—মানুষ হিসেবে একটু সম্মান দিলেই হয় ।
কিছুক্ষণ আগ পর্যন্ত বকবক, তর্ক আর খুনসুটিতে ভরা ছিল পুরো পড়ার সময়টা। বেলা ইচ্ছে করেই একটার পর একটা অপ্রয়োজনীয় কথা বলে সায়রকে বিরক্ত করছিলো। কখনো কলম ঘুরাচ্ছে, কখনো খাতার কোণায় ফুল আঁকছে, কখনো আবার পড়ার মাঝখানে হঠাৎ উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করছে। সায়রও মাঝেমধ্যে বিরক্ত হচ্ছে, মাঝেমধ্যে ধমক দিচ্ছে, আবার কখনো কখনো তার উদ্ভট প্রশ্নগুলো শুনে হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করছে।কিন্তু সময় যত এগোতে লাগলো, ততই বেলার ভেতরের সেই চাপা অভিমানটা আবার মাথা তুলতে শুরু করলো।সারাদিন ধরে যতটা স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করেছে, ততটাই ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেয়েছে সে।বইয়ের একটা অধ্যায় শেষ করে সায়র যখন পরের টপিকটা বুঝিয়ে দিচ্ছিল, তখন হঠাৎ করেই বেলা খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
—আচ্ছা, রুপসা আপু কি কালও আসবে?
প্রশ্নটা শুনে সায়র বিশেষ গুরুত্ব দিল না।খাতার দিকে তাকিয়েই বললো,
— হয়তো ।
বেলার হাতের কলমটা থেমে গেল।তবুও মুখে স্বাভাবিক ভাব ধরে রেখে বললো,
— ও আচ্ছা।
সায়র এবার বইয়ের একটা অংশ দেখিয়ে বলতে লাগলো,
— এই অংশটা ইম্পর্ট্যান্ট। এটা ভালো করে পড়ে রাখবি।
বেলা শুনছিল, কিন্তু মনোযোগ ছিল না। কিছুক্ষণ পর আবার বললো,
— আপনাদের তো অনেক ভালো বন্ধুত্ব। কতদিন ধরে পরিচয়?
— কলেজ লাইফ থেকে ।
খুব স্বাভাবিকভাবে উওর দিলো সায়র।তবুও কেন জানি কথাগুলো শুনে বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে ভারী হয়ে গেল বেলার।সে মাথা নিচু করে খাতার দিকে তাকিয়ে রইলো।
সায়র বিষয়টা খেয়াল না করেই বললো,
—আচ্ছা, এবার পড়ায় মন দে।
কিন্তু বেলা আর আগের মতো কথা বললো না।আর কোনো অদ্ভুত প্রশ্ন করলো না।আর কোনো তর্কও করলো না।
সায়রের কথাগুলো শুনে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলেও বেলার স্বভাব এমন না যে সে বেশিক্ষণ মন খারাপ করে থাকবে। কষ্ট পেলে সে কাঁদে, রাগ হলে ঝগড়া করে, আর অভিমান জমে গেলে মাথার ভেতর এমন সব উদ্ভট পরিকল্পনা তৈরি করতে শুরু করে যে সেগুলো শুনলে সুস্থ মানুষও মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়বে।
খাতার ওপর চোখ রাখলেও তার মাথায় তখন পড়াশোনার একটা শব্দও ঢুকছে না।বরং বারবার একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে।রুপসা আবার আসবে।হয়তো কাল।হয়তো বা পরশু।ভাবতেই বেলার ভেতরে অদ্ভুত একটা বিরক্তি কাজ করতে শুরু করলো।কলমের ঢাকনাটা দাঁতের ফাঁকে চেপে ধরে সে গভীর চিন্তায় ডুবে গেল।রুপসাকে তার কোনোদিনই বিশেষ খারাপ লাগতো না। বরং আগে বেশ ভালোই লাগতো। কিন্তু মেয়েটার একটাই সমস্যা । সে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি সময় সায়রের আশেপাশে থাকে। চিপকে থাকার চেষ্টা করে।আর এই একটা কারণেই বর্তমানে বেলার অপছন্দের তালিকায় রুপসা বেশ ভালো অবস্থানে চলে এসেছে।
সায়র তখনও কিছু একটা বুঝিয়ে যাচ্ছে।কিন্তু বেলার মাথায় অন্য হিসাব।সে মনে মনে ভাবলো,
—-না, এভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না।এতবার কেন আসবে এবাড়িতে । তার বাড়ি নেই নাকি?আত্মীয়স্বজন নেই?বন্ধুবান্ধব নেই আর?পৃথিবীতে কি শুধু সায়রই একমাত্র বন্ধু?যার বাসায় মাসে চৌদ্দ বার আসা লাগে। না ওকে কিছু একটা করতেই হবে যাতে রুপসা টুপসা এই বাড়িতে ভুলেও না আসে।
কিছুক্ষন ভাবতেই তার মাথায় একটা প্ল্যান এলো।যে চোখ দুটো কয়েক মিনিট আগেও কষ্টে ভরা ছিল, সেখানে এখন নতুন এক দুষ্টু ঝিলিক দেখা যাচ্ছে।তবে সঙ্গে সঙ্গেই আবার আরেকটা চিন্তা মাথায় এলো।যদি কিছু করতে গিয়ে সায়র রেগে যায়?যদি আবার সবার সামনে বকা দেয়?ভাবনাটা আসতেই মুখটা আবার একটু মলিন হয়ে যায়।কারণ পৃথিবীতে অনেক কিছু সে সহ্য করতে পারে।কিন্তু সায়র যখন অন্যদের সামনে তাকে ধমকায়, তখন অদ্ভুতভাবে তার খুব খারাপ লাগে।তবুও পরের মুহূর্তেই নিজের জেদি মনকে বোঝালো,
—না, যা হবে পরে দেখা যাবে।
সায়র বিষয়টা লক্ষ্য করে সন্দেহভরা গলায় বললো,
—তুই আবার কী ভাবছিস?
বেলা চমকে উঠে বলে,
—কিছু না।
—তোর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে কিছু একটা ভাবছিস।
—আমি খুব নিরীহ বাচ্চা। সবসময় আমার দোষ খুজবেন না।
হায়রে চোখ বাঁকিয়ে বলে,
—তোর চোখ বলছে তুই কোনো ঝামেলা করার পরিকল্পনা করছিস।
বেলা নির্দোষ মুখ বানিয়ে বললো,
রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ২
— আমি এত ভালো একটা মেয়ে, আমি কেন ঝামেলা করবো?
সায়র শুকনো গলায় বললো,
—এই কথাটা শুনেই আমার সবচেয়ে বেশি সন্দেহ হয়।
বেলা মুখ ঘুরিয়ে হাসি চেপে রাখলো।কারণ লোকটা হয়তো জানে না, কিন্তু তার সন্দেহ একদম ভুলও না।মাথার ভেতর ইতোমধ্যে ছোটখাটো একটা সভা বসে গেছে।সেই সভার একমাত্র আলোচ্য বিষয়,
— রুপসা। আগামীকাল আসুক মেয়েটা, তারপর মজা বুঝাবে সে। তখন বুঝবে, বেলা কী জিনিস!
