আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৪৯
সুরভী আক্তার
রৌদ্রের এহেন পাল্টিবাজি কথায় মেঘা থেমে রগরগে দৃষ্টিতে তাকায় । আড়চোখে তা অবলোকন করে রৌদ্র । ফের ইনিয়ে বিনিয়ে মিনমিন করে বলে…..
” বজ্জাত ছেলে ,,, না তেলে না ঝোলে । দূরে সর আমার থেকে । আমার কোলে আমার বউ বসবে । এসো বউ , কোলে বসো আমার । ওকে দেখিয়ে দাও , তুমিই আমার বউ । আমার কোলে ওঠার অধিকার শুধু তোমার ।
মেঘা কিড়মিড় করে এবার একটা সোয়েটার ছুড়ে মারলো রৌদ্রের দিকে । তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে আলমারি থেকে নতুন একটা ড্রেস বের করলো ।
ফ্যাসাদে পড়লো রৌদ্র । মুখ শুকনো করে বললো…
” তোর কি হিংসে হচ্ছে সানি ?
একটু থেমে জাবিরের দিকে ফিরলো । রেগে মেগে চোখ পাকিয়ে তাকালো । দুহাত দিয়ে শক্ত করে বাচ্চাটার তুলতুলে দুগাল টেনে ধরলো । মৃদুমন্দ ব্যাথায় কুকিয়ে উঠলো ছেলেটা । রৌদ্র চিবিয়ে বলে বিপরীতে….
” নাগিনের বাচ্চা ,, তোর মাকে কাজে লাগিয়ে একটা সংসার পেয়েছি । এখন দেখি তোর জন্য আমার সেই সংসার টাও ভাঙবে । যা এখান থেকে ,,,
ধমকালো শেষে । কুকিয়ে উঠলেও কাঁদলো না জাবির । সরে এসে কাঁদো কাঁদো হয়ে তাকালো । গুলুমুলু বাচ্চাটা কেমন মায়াবি ছলছলে চোখে চেয়ে আছে । রৌদ্রের মায়া লাগে । উপর উপর রাগ দেখালেও সে বাচ্চা প্রিয় ।
তবুও মেঘার সামনে মায়া দেখালো না এই মুহুর্তে । একেই চটে আছে রমনী । বাড়াবাড়ি করলে হিতে বিপরীত হয়ে যাবে ।
রৌদ্র ফ্যাল ফ্যাল করে হাসলো । জাবিরের কানের কাছে ঝুঁকে বিড়বিড় করলো….
” আব্বা ,, তোরে দুইটা চিমটি কাটমু , হ্যাঁ ? প্লিজ ব্যাথা না পেলেও একটু কান্না করিস বাপ আমার । তোর জন্য আমার বউ চটে গেছে । যদি তোকে দিয়েই ওর রাগ ভাঙাতে পারি , তাহলে দুটো চিমটির বদলে দুটো চকলেট পাবি আমার থেকে । শুধু ন্যাকা কান্না কাঁদতে হবে তোকে…
বাচ্চা টা কি ওর কথার অর্থ বুঝলো নাকি ? নিষ্পাপ শিশুটার নরম নরম দুই বাহুতে কচাত করে দুটো চিমটি বসালো রৌদ্র । মুহুর্তেই চোখ মুখ খিচে ঝাইঝাই করে কান্না জুড়ে বসলো ছেলেটা । আগাগোড়া লাল হয়ে উঠলো নিমিষেই ।
মেঘা ভড়কে তাকায় । ছুটে আসে । তব্দা খায় রৌদ্র । মেঘা জাবির কে নিজের দিকে ফেরায় । আতঙ্কিত হয়ে শরীরে হাত বোলাতে বোলাতে বলে….
” কি হলো বাবু ,, কাঁদছো কেনো ? কি করেছে উনি তোমায় ? এইই রাইনো মুখো ,, কি করলেন ওকে ? হঠাৎ কাঁদছে কেনো এভাবে ?
রৌদ্র হাঁ বনে বলে….
” ইডিয়ট ,, এখন মায়া দেখাচ্ছিস কেনো এতো ? একটু আগে তো জেলাস হচ্ছিলি !
” আপনাকে কে বলল আমি জেলাস হচ্ছিলাম ?
” ইডিয়ট ,, এখন আমি জেলাস হচ্ছি , ছাড় ওকে ।
অবিরাম কান্নারত বাচ্চা টাকে টেনে দূরে সরালো রৌদ্র । মেঘা আর কিছু বলার আগেই জাবির কে কোলে তুলে একেবারে দরজার চৌকাঠের বাইরে বের করে দিলো । ইভা ফিরেছে । বাচ্চার কান্নার আওয়াজ পেয়ে এদিকেই আসছিলো । রৌদ্র ওকে দেখেই জাবির কে কোল থেকে নামালো । ভ্যাঙানো স্বরে বললো…
” এইই নাগিন ,, তোর এই ব্যাঙের ছানা কে দূরে সরা আমাদের থেকে । খবরদার যদি ডিস্টার্ব করেছে বা তুই করেছিস, তাহলে ছাদের রেলিংয়ে উল্টো করে লটকায় রাখবো তোরে । তোর ঐ ঊনসত্তর বছরের বুইড়া ব্যাটাও কিছু করতে পারবে না । যাহ এখান থেকে…
বলেই ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিলো মুখের উপর । ছেলের কান্নার আওয়াজ তুচ্ছ লাগলেও রৌদ্রের এমন বিহেভিয়ার গায়ে জ্বলন বাড়ালো ইভার । কটমট করে তাকালো সে । এ দুটোর মাখো মাখো আদিখ্যেতা দেখলে গা জ্বলে যাচ্ছে পুরো ।
মেঘা এখনো ক্ষুব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে রৌদ্রের দিকে । রৌদ্র ঠোঁট চেপে হাসলো । এগোতে এগোতে বললো…
” বেইবি ,, আমার বেবি চাই !
রাগান্বিত অবস্থায় থতমত খায় মেঘা । চোখ মুখ পাকিয়ে একটা কুশন ছুড়ে মারে ওর দিকে….
” আমার চোখের সামনে থেকে চলে যান রাইনো মুখো ।
” ওও জান পাখি ,, কতক্ষন পর চোখের সামনে এসেছি আর এভাবে চলে যেতে বলছিস ? কষ্ট হয় তো এভাবে বললে ।
” রুম থেকে বের হন । আমি চেঞ্জ করবো ।
” আমার সামনে কর । ক্ষতি কি ? বরং লাভ আছে ।
” অসভ্য লোক ,, বেরোন রুম থেকে ।
” সভ্য মেয়ে,, আর চেঞ্জ করবি কেনো ? ঠিকঠাক লাগছে তো ।
” শিশিরের বিয়েতে যাবো আমি । এভাবে নরমাল ড্রেসে যাবো ?
” ওওও শিট ,,, আমি ভুলেই গেছিলাম । আজ তো তোর ঐ ফ্রেন্ডের বিয়ে । শুনেছিলাম । বাই দ্যা ওয়ে ,,, আমিও রেডি হয়ে নিই ?
” আপনি যাবেন ?
” হুম । নয়তো কার সাথে যাবি ?
” আদ্র ভাইয়া আসছে ,, ড্রপ করে নেবে আমায় ।
মুহুর্তেই চোয়াল খিচে আসে রৌদ্রের । তড়তড় করে জাগে হিংসাত্মক সত্তা । চোখে ক্ষুব্ধতা নিয়ে কিড়মিড় করে তাকায় । মেঘা তোয়াক্কা করে না ।
রেগে মেগে কিছু বলার আগেই পকেটে থাকা ফোন ভাইব্রেট হয় রৌদ্রের । রৌদ্রের সাথে সাথে মেঘাও সচকিতে চায় । পকেট থেকে ফোন বের করে রৌদ্র । চেনা নাম্বার । কপাল কুঁচকায় । এ সময় ফোন রিসিভের প্রয়োজন বোধ করলো না ।
ফোন কাটলো । পকেটে ঢোকানোর আগেই টুং টুং করে মেসেজ এলো একটা । লক স্ক্রিনে ভেসে ওঠা মেসেজ দেখেই চোখ কপালে ওঠে রৌদ্রের । মুখে ফোঁটে আতঙ্কিত রেশ । এক ধাপ পেছায় । তড়িঘড়ি করে নিজেই ফোন কল ব্যাক করে । দ্বিতীয় বার রমনীর পানে খেয়াল না দিয়ে দরজা খুলে এলোমেলো পায়ে বেরিয়ে যায় ।
রমনীর কানে কেবল পৌঁছালো রৌদ্রের ব্যাতিব্যস্ত ভড়কানো স্বর….
” আমি এক্ষুনি আসছি ….
ব্যস , এটুকুই । রৌদ্র চোখের আড়াল হওয়া মাত্রই নাকের পাটা ফুলিয়ে ওষ্ঠ উল্টায় মেঘা । চোখ ছলছল করে ভুলভাল কিছু আন্দাজে ।
সূর্যাস্ত হয়েছে সেই কবে । চারদিক এখন অন্ধকার আর ঝিরিঝিরি শীতে ধোঁয়াশাছন্ন । আঁধারের বুকে তলিয়েছে ধরিত্রী ।
শিশির দের ছোট্ট বাড়িটা আজ মৃদুমন্দ আলোয় আলোকিত । বাইরে থেকেই ঝকঝক করছে । বউ সেজেছে দুবোন । সাজগোজ সব শেষ । শুধু বর আসার প্রতিক্ষায় ।
শিশিরের রুমে মেঘা আর শাফাহ্ আছে ওর সাথে । সারা কে এতো করে আসতে বললো মেঘা । লাস্ট মোমেন্টে এসে আটকে পড়লো মেয়েটা । আসতে পারলো না আর ।
আদ্র মেঘা আর শাফাহ্ কে এ বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে বেরিয়েছে আবার । ভেতরে ঢোকে নি ।
সেই থেকে দুই রমনী শিশিরের রুমে আসর বসিয়েছে । শিশিরের মুখে শুনলো , আদ্র নাকি ইকরার হবু স্বামী অর্থাৎ আবিদের ফ্রেন্ড । অথচ ওদের দুজনের মনে পড়ছে না । আবিদ নামে আদ্রের আদৌও কোনো ফ্রেন্ড আছে বলে জানা নেই । ইনফ্যাক্ট আদ্রের ফ্রেন্ড সার্কেলে তেমন কেউই নেই । দু একজন আছে । তারা মেঘা আর শাফাহ্’র আধো পরিচিত । চেনা জানার মধ্যেই । তবে আবিদ কে , এটা এই প্রথম শুনলো ওরা । পরোয়া করলো না বেশি একটা । হবে হয়তো ওদের অপরিচিত কোনো বন্ধু ।
বর আসার সময় হয়ে গেছে ।
বউ বেশে ভারী সুন্দর লাগছে শিশির কে । পুরো স্নিগ্ধ কোমল শ্যামলিনী । ভারী কাজের মেরুন রঙের টকটকে শাড়ি পড়নে । মাথায় স্টোন বসানো ঝিকঝিকে পাতলা মেরুন দোপাট্টা । মেকআপ হালকা পাতলা । গহনাও আছে টুকটাক । ঠোঁটে রক্তিম ঠোঁট রঞ্জন ।
সব মিলে এ যেনো নতুন কোনো শিশির । কি সুন্দর মাধুর্যময়ী লাগছে মেয়েটাকে । পলকে পলকে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে । সরানো দায় হয়ে পড়েছে দৃষ্টি ।
মেঘা, শাফাহ্ অপলক চেয়ে দেখেছে বহুক্ষণ । লজ্জা লজ্জা ভাবে চোখ নামিয়ে হাঁটু জড়িয়ে বসে আছে নতুন বউ । এখনো বউ হয় নি ঠিক । তবে হতে দেরি নেই ।
বর পক্ষ এই আসলো বলে । ইকরা আছে ওর নিজের ঘরে । বাইরে থেকে হইচই শোনা যায় । গাড়ির শব্দ শোনা যায় । এসে গেছে তার মানে । তিনটে গাড়ি পরপর এসে থামলো শিশির দের বাড়ির সামনে । অনেকটা পথ ঘুরে এসেছে । নতুবা গলির পথে গাড়ি ঢুকতো না । প্রথম গাড়িটা সাজানো টাটকা তাজা সুগন্ধি ফুলে । এটাতে বর আছে , বুঝতে বাকি নেই । মেঘা আর শাফাহ্ জানালা দিয়ে উঁকি দিলো । বাইরে বেরোবে না ওরা । সেদিনের ঐ আয়ানের ব্যাবহারের পর থেকে আজ আর ওর সামনে যাওয়ার বিন্দুমাত্র অভিরুচি নেই । বরং শিশিরের ভবিষ্যত পরিনতি ভেবে ক্ষণে ক্ষণে আফসোস হচ্ছে ওদের । কিন্তু কিছুই করার নেই । ভাগ্যের লিখন খন্ডায় কে ?
ফুলে সজ্জিত গাড়িটার একপাশ দিয়ে নামলো আবিদ । অন্যপাশ দিয়ে আদ্র । অতঃপর পাশাপাশি দাঁড়ালো দুজন । আবিদ বর বেশে , পড়নে শেরোয়ানি । আদ্র ফর্মাল ড্রেসে । পেছনের বাকি দুটো গাড়ি থেকে একে একে বর পক্ষের গুটি কয়েক অতিথি নামলেন । আজমিরা বেগম আবিদ কে মিষ্টি খাইয়ে বরন করে নিলেন ।
তবে অন্য ভাইয়ের দেখা নেই ।
মেঘা আর শাফাহ্ খুব তীক্ষ্ণ চোখে আয়ান কে খুঁজলো পেলো না । উদ্বিগ্ন হয়ে মুখ ফসকে বললো শাফাহ্…..
” শিশির ,,, তোর ঐ বখাটে হবু স্বামী টাকে দেখছি না তো । আসে নি নাকি ? না আসলেই বেঁচে যাস তুই । ঐ বজ্জাত টা যেনো না আসে আজ ।
মেঘা ইশারা করে চোখ রাঙানি দিতেই চুপ করলো ।
বাইরেও শোরগোল । বরের একটা গাড়ি এসেছে । অন্যটা এসে পৌঁছায় নি এখনো ।
আজমিরা বেগম এই নিয়ে প্রশ্ন করলেন । আবিদের মা বেশ চিন্তিত । বাড়ি থেকে দুই ছেলের দুটো গাড়ি একসাথে বেরিয়েছিলো । তাহলে দ্বিতীয় টা গেলো কোথায় ? তিনিও ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন বড় ছেলেকে…..
” আবিদ ,,আয়ান কে একবার ফোন করে দেখ তো,, এখনো কোথায় ওরা ? গাড়ি ওভারটেক হয়েছে কখন ?
আবিদ শান্ত জবাব করে কেবলই….
” ডোন্ট ওয়ারি মা ,, আয়ান ছোট বাচ্চা নয় । এসে যাবে ঠিক । আমরা ভেতরে যাই আপাতত !
অতিরিক্ত চিন্তা আসলো না কারোর মাথায় । বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন সকলে ।
এদিকে রৌদ্র হসপিটালে ।
আইসিইউ এর কেবিনে ওদের বন্ধু মহলের সবাই । শোকের ছায়া সবার চেহারায় ।
কেবিনের বেডে সটান শুয়ে আছে সৌভিক । ডান হাত , পা , মাথা , সবখানে মোটা মোটা ব্যান্ডেজ । ছিলে যাওয়া ক্ষত পুরো শরীর জুড়ে ।
কাল সন্ধ্যায় এক্সিডেন্ট করেছিলো । জ্ঞান হীন নিথর ছিলো সারারাত । রক্ত দেওয়া হয়েছে পরপর দু ব্যাগ । অক্সিজেন চলেছে সারারাত থেকে দুপুর অবধি । অবস্থা ক্রিটিক্যাল ছিলো । জ্ঞান ফিরেছে আজ দুপুরের পর । তখন থেকেই রৌদ্র এখানে । জ্ঞান ফেরার খবর পেয়ে ছুটে এসেছে । তবে দেখা করতে পারে নি । ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি কাউকে । এখন পারমিশন দেওয়া হয়েছে । প্রথমে সৌভিকের ফ্যামিলি মেম্বার, ওয়াইফ , দেখা করেছে ওর সাথে । অতঃপর ঢুকেছে ওর বন্ধুমহল ।
চিন্তিত হয়ে ওকে ঘেরাউ করে নিয়েছে সবাই । রৌদ্র বসেছে পাশে একটা তুল টেনে ।
অবস্থা নাজেহাল ছেলেটার । কথা বলা বারন । কেবলই পিটপিট করে চেয়ে চেয়ে দেখছে সবাই কে । আরো অবাক হয়ে দেখছে রৌদ্র কে । নিজের স্ত্রীর থেকে জানতে পেরেছে , ওর বন্ধুরা কম ছোটাছুটি করে নি কাল থেকে । রৌদ্র বেশি । নিজের শরীর থেকে এক ব্যাগ রক্ত দিয়েছে সে । এমনকি এ যাবৎ সব চিকিৎসার খরচ ও নিজে বহন করেছে ।
সৌভিক দের টাকার কমতি নেই । কিন্তু রৌদ্র ওদের কিচ্ছুটি করতে দেয় নি । কেউ কিছু করার আগেই সবটা বুঝে নিয়েছে ও । ভোরের দিকে রোহানের এপার্টমেন্টে গিয়ে রেস্ট করেছে একটু ।
অতঃপর একবিংশীর কাছে যেতে না যেতেই আবারো ডাক পড়েছে এখানে ।
সৌভিক আপ্লুত । রৌদ্র বেপরোয়া , ছন্নছাড়া । বন্ধুত্বেও অনুভুতি প্রকাশ করে নি কখনো । কাজে দেখিয়েছে ।
মুখ খোলার চেষ্টা করলো সৌভিক….
” রুডি….
” চুপ । কথা বলবি না । ডক্টর কথা বলতে বারন করেছে তোকে । শুধু বল ,, কেমন লাগছে এখন ?
মাথা ঝাঁকায় সৌভিক ।
কখন থেকে ফোন ভাইব্রেট হচ্ছে পকেটে । রোহান খেয়াল করিয়ে দিলো….
” রুডি ,, ফোন আসছে তোর । দেখ আগে ।
ফোন বের করে রৌদ্র । চার বার কল মিসড হয়েছে । এবার পঞ্চম বারও কেটে গেলো । পাল্টা কল করলো সে । ওপাশ থেকে তৎক্ষণাৎ রিসিভ হয় । বাচ্চার আদুরে স্বর ভেসে আসে…
” পাপা ,,, আই মিস ইউ ,, এন্ড আ’ম অ্যাংগ্রি ।
রৌদ্র মুচকি হাসে । উত্তর করে….
” আই মিস ইউ ঠু মাম্মা ,, বাট অ্যাংগ্রি কেনো ?
” তুমি আমাল ফোন ধলো নি কেনো ? আমাল থাতে কথাও বলো নি । কোতায় তুমি ?
” আমি তো বাইরে আছি মাম্মা । ইউ নো ,, পাপার কাজ পড়ে গেছে । অনেক দূর আসতে হয়েছে পাপা কে । পাপা কাজ শেষ করে খুব তাড়াতাড়ি ফিরবে তোমার কাছে ।
” প্লমিচ ?
” পাক্কা প্রমিস !
” মিনি মিস কলতে তোমায় ।
” পাপা’ও ভীষণ মিস করছে মিনি কে । এবার ফিরলে পাপার ফোনে অনেকক্ষণ গেমস খেলবে মিনি , ওকে ?
” ইয়াহ পাপা ।
হাস্যোজ্জ্বল উত্তর আসলো এবার । রৌদ্র মুচকি হাসে । বাকিরা অবাক লোচনে বিমূর্ত বনে রৌদ্রের কথা বলার ভঙ্গিমা দেখছে । বুঝতে পারছে না কিছু । কিসের পাপা , আর কিসেরই বা মাম্মা ? কার সাথে এভাবে কথা বলছে রৌদ্র ? কে পাপা ডাকছে ওকে ?
রৌদ্র আবার বলে ফোনের ওপারের উদ্দেশ্যে….
” মাম্মা কোথায় ?
” আচে !
” জ্বালাচ্ছো খুব ?
” উহু ,,, মিনি গুড গাল । জ্বালায় না ।
” আচ্ছা ,,, আমার মিনি গুড গার্ল । আই নো । পাপা না আসা অবধি গুড গার্ল হয়েই থাকবে । মাম্মা কে ডিস্টার্ব করবে না বেশি । মাহির আংকেল ঘুরতে নিয়ে যায় তোমায় ? ঘুরতে যাবে আংকেলের সাথে ,,, ওকে ?
” ওকে পাপা ।
ফোন কাটলো রৌদ্র । সবার কতগুলো থমকানো আশ্চর্য দৃষ্টিতেও একটুও পরিবর্তন আসলো না ওর মাঝে । বরং শ্বাস ফেলে সৌভিকের উদ্দেশ্যে বললো….
” রেস্ট কর । আমি আসছি এখন । পরে আরেকবার আসার চেষ্টা করবো । এখন বেরোতে হবে ।
” কার সাথে কথা বললি ?
রোহানের অযাচিত প্রশ্ন । বিব্রত হয় রৌদ্র । উত্তর করার প্রয়োজন না করে উঠে দাঁড়ায় । প্রশ্ন আসে আবার…..
” রুডি ,, কে পাপা ডাকলো তোকে ? কার পাপা তুই ? ঐ বাচ্চা টা কে ? দেখ ব্রো ,,, তুই তো মেঘার প্রতি অবসেসড । তাহলে ঐ বাচ্চাটা ??
রৌদ্র শান্ত রইলো । কিয়ৎ কাল বাদ তপ্ত দম ফেলে বললো…
” আরাফ কে মনে আছে ?
সব বন্ধুদের কপালে ভাঁজ পড়ে । সচকিতে প্রশ্ন করে তুহিন….
” কোন আরাফ ?
” নাম শুনে যার কথা প্রথমেই মনে পড়লো , তার কথাই বলছি । আরাফ তালুকদার । মনে আছে নিশ্চয়ই ?
” ঐ আরাফ ? বরিশাইল্লা ?
” হু ।
” ওর কথা হঠাৎ বলছিস যে । ভার্সিটি লাইফে ও তো তোর দুশমন ছিলো । ওকে মনে থাকবে না আবার । টপকাতে চাইতো তোকে সবসময় । কত কি হয়েছে তোদের মাঝে । কিন্তু শেষের দিকে তোরা ভালোই বন্ধু হয়ে উঠেছিলি । আরাফ যখন দেশ ছাড়লো তখন । বহুদিন দেখি না ওকে । সেই যে দেশ ছাড়লো ,, আট নয় বছর হতে চললো । আর ফেরে নি ?
রোহানের পরপর কথা গুলো শুনে মৃদু অবসন্ন ভেজা স্বরে জবান খোলে রৌদ্র….
” আর ফিরবেও না কখনো । ও আমার দুশমন ছিলো ,, বন্ধু ও ছিলো । কিন্তু ওর বাচ্চা আমার প্রাণ । প্রাণের অংশ আমার ।
” মানে ?
” মানে ,, আরাফ আর নেই ।
এটুকুনি বলে ধুপধাপ পা ফেলে কেবিন থেকে বেরিয়ে আসলো সে । ফেলে আসলো মূর্ত সব বন্ধুদের ।
রাত বাড়তেই বিয়ে বাড়ির সবার কথার রোল বাড়ছে । আয়ান এখনো অবধি এসে পৌঁছায় নি । এদিকে ঘড়ির কাঁটা আটটার দোরে ।
প্রায় ঘন্টা দুয়েক পেরোতে চললো বাড়ি থেকে বেরোনোর । ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না ওকে । মার্জিয়া বেগম এদিক ওদিক চিন্তিত মুখে পায়চারি করছেন । আবিদের বাবা লাগাতার ফোন লাগাচ্ছেন ছোট ছেলের ফোনে । আয়ানের বন্ধুদের ও কল করা হচ্ছে । কাউকেই পাওয়া যাচ্ছে না । এদিকে আবিদ বেশ ঠান্ডা হয়ে বসে আছে । পাশে আদ্র বসে পায়ে পা তুলে । দুজনে ক্ষণে ক্ষণে একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করছে , আর হাসছে ঠোঁট কামড়ে । সবাই চিন্তিত এখানে । একমাত্র ওরা ব্যতীত । বউ দুটোর মুখ দেখা হয় নি এখনো । কাজি,মৌলভি এসে বসে আছেন । দ্বিতীয় বরের পাত্তা নেই ।
আদ্র তর সইতে না পেরে আবিদের দিকে ঝুঁকে বলে….
” হোয়াট হ্যাপেন্ড আবিদ । তুমি এতো শান্ত আছো কি করে বলতো ? বউকে দেখতে ইচ্ছে করছে না ?
” কুল ডাউন ব্রো ! তুমি এতো উতলা হচ্ছো কেনো ? দেখতে ইচ্ছে করছে ?
” ভীষণ !
আবেশিত সোজাসাপ্টা উত্তরে হেসে ফেলে আবিদ ।
” প্রফেসর হিসেবে তোমার সাথে একেবারেই মানাচ্ছে না এটা ।
” নাউ , আ’ম নট প্রফেসর ।
” প্রফেসর হিসেবেই যাও । দেখে আসো গিয়ে ।
” এখানকার নাটক শেষ করো জলদি । আমি আসছি….
উঠে দাঁড়ায় আদ্র । শিশির, মেঘা আর শাফাহ্ কোন ঘরে আছে , তা এতক্ষণে নখদর্পণে নিয়ে নিয়েছে । সোজাসুজি সেদিকে এগোলো সে ।
এ বাড়িতে মোটে তিনটে ঘর । সবচেয়ে কর্নারের ঘরটা শিশিরের । আদ্র বিনা দ্বিধায় ঘরের দরজায় টোকা দেয় । মেঘা আর শাফাহ্ আছে , তাই দ্বিধা নেই ।
চাপানো দরজা খুলে দিলো শাফাহ্ । সবসময় এ ঘরে এর ওর আনাগোনা লেগেই চলেছে । বিরক্ত ওরা । ভাবলো বর পক্ষের কেউ । রেগে মেগে তাকানো মাত্রই আদ্র কে দেখে শিথিল হলো শাফাহ্ ।
” ভাইয়া ,, তুমি !
চোখের ইশারায় ভেতরে ঢোকার অনুমতি চায় আদ্র । শাফাহ্ তাগাদা দিয়ে বলে….
” এসো ।
ভেতরে পা বাড়ায় সে । খাটের উপর মাঝ বরাবর বসে বধু সাজে সজ্জিত টুকটুকে রমনী । আদ্রের উপস্থিতি বুঝে খানিক জড়তায় মুখ ফিরিয়ে নিলো । আকুল হয়ে সোজাসুজি ওর দিকেই চাইলো আদ্র । তবে আকুলতা বাড়লো বই কমলো না । মুখ দেখার তীব্র তৃষ্ণা জাগলো । কদম বাড়াতেই তড়াক করে অন্ধকারে ঢেকে গেলো পুরো ঘর ,, শুধু ঘর নয় , পুরো বাড়ি । আকস্মিক বিদ্যুৎ চলে গেছে এই অসময়ে । মুহুর্তেই অন্ধকারে তলিয়ে গেলো পুরো ঘর । মেঘা বিছানায় বসে ছিলো । ভড়কালো না অন্ধকারে । শাফাহ্ চেঁচিয়ে উঠলো আকস্মিক ঘুটঘুটে অন্ধকার হতেই….
” ভাইয়াআআআআআ !
অন্ধকারেই ওর হাতটা খপ করে টেনে ধরলো আদ্র । আশ্বাস দিলো ঠান্ডা স্বরে……
” এইইই টুকটুকি ,,, আমি আছি তো ।
ঠাহর করে বিছানা থেকে পা নামায় শিশির ।
” শাফাহ্ ,, স্থির হয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাক । লোড শেডিং হলো কেনো এই অসময়ে ! দাঁড়া ,, আমি দেখছি । মোমবাতি আছে ঘরে ।
অন্ধকারেই নামলো সে । এগোলো টেবিলের দিকে । ড্রয়ারে মোমবাতি আছে । আদ্র ধীরে শাফাহ্’র হাত ছাড়লো ।
ফোন বের করলো পকেট থেকে । ফ্ল্যাশ অন করলো । ততক্ষণে শিশির ড্রয়ার খুলে মোমবাতি বের করেছে আঁধারেই ।
ফ্লাশের মৃদুমন্দ সাদাটে আলো তাক করা মাত্রই ঝিকঝিক করে জ্বলে উঠলো রমনীর বেনারসী জড়ানো বউ রূপি কায়া । আঁধারের মাঝে আলো পেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠলো । যেনো রাঙ্গিয়ে উঠলো পুরো ঘর ।
আদ্র ঢোক গেলে । ধীর পায়ে এগোয় আলো দেখানোর জন্য । পাশাপাশি দাঁড়ায় । ড্রয়ারে হাতড়ে লাইটার খুঁজছে শিশির । পাশে ফোনের ফ্লাশ দেখে এক পলক তাকালো । আদ্র কে দেখে বেখেয়ালে বললো….
” স্যার , ফোনটা দেখি ।
নিজেই আদ্রের হাত থেকে ফোনটা নিলো । লাইটার খুঁজে পেয়ে আবার আদ্রের হাতে ফিরিয়েও দিলো । বললো…
” আমি মোমবাতি জ্বালিয়ে দিচ্ছি ।
রমনীর মৃদুমন্দ নড়চড়ের সাথে সাথে ঝিনঝিন করে শব্দ হচ্ছে । হাতের চুড়ি গুলো একে অপরের সাথে ঠোকা খেয়ে ঝংকার তুলছে রিনিঝিনি ।
আদ্র মূর্ত । ঘোরের বশে এক ধ্যানে চেয়ে রয়েছে রমনীর পানে । সাদাটে আলো আঁধারির মাঝে রমনীর শুচি শুভ্র সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলো সে । খেই হারালো দু চোখের । পলক ফেলতে ভুলে গেলো । যেনো পলক ফেলতেই উবে যাবে রমনী । নিষ্পলক চেয়ে রইলো সে । এ কাকে দেখছে সে ? নতুন কেউ ? না তো ! এ তো সেই ভিজে বেড়াল ,, বেয়াদব !
মোমবাতি জ্বালালো শিশির । আদ্র নিজের খেয়ালে মশগুল ।
মোমবাতি হাতে তুলে পাশে ফিরলো আদ্রের পানে । দুজনার সামনাসামনি আগুনের ঝিলিকে হলদে আলো পড়লো । চোখ তুললেই রমনী সম্মুখীন হলো এক জোড়া খাদ যুক্ত স্থির দৃষ্টির । যে দৃষ্টি ওর পানে চেয়ে রয়েছে ভনীতা বিহীন । কম্পন নেই সে চোখে ।
বরং আরো ভালো ভাবে চোখের তৃষ্ণা মেটাতে সে লোকটা ফোনের ফ্লাশ সরাসরি তাক করলো রমনীর মুখ বরাবর । এতে মুখ কুঁচকে আসে শ্যামলিনীর ।
কিয়ৎ কাল সে চাহনির সাথে চোখাচোখি হলেও পরমুহুর্তে চোখ নামিয়ে নেয় । পাশ কাটিয়ে পা বাড়ানো মাত্রই ছলাৎ করে পুরো ঘরে আলো জ্বলে ওঠে আবার । কারেন্ট এসে গেছে । হাঁফ ছাড়ে মেয়েটা । ফু দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে বলে….
” নে ,, এসে গেছে কারেন্ট ।
আদ্র এখনো স্থবির । পাথরের ন্যায় জমে গেছে যেনো । চোখ জোড়া কে টেনে হিঁচড়েও নামাতে পারছে না । এ কেমন বিপত্তি ? থমকে গেছে সে । মনে হয় থেমে হৃৎস্পন্দন । ঠান্ডা হয়ে এসেছে বক্ষস্থল । কোথাও একটা খচখচে ভাব জ্বালাতন করছে তবুও ।
শিশির সরে এসেছে । আদ্রের দৃষ্টি সরে নি এক পলকেও । ওকে এমন কাঠ কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শাফাহ্ ডাকে…..
” ভাইয়া , কি হলো । ওভাবে কি দেখছো ?
ধ্যানে বিঘ্ন ঘটে । নড়েচড়ে ওঠে সে । দ্রুত চোখ নামায় । ফোনটা চেপে ধরে খিচে বন্ধ করে দুচোখ । হাঁসফাঁস লাগে এ বেলায় । ঢোক গেলে পরপর । মেঘা শুধোয়…..
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৪৮
” ভাইয়া ,, আর ইউ ওকে ? কি হলো ?
” ন….নাথিং ।
” এমন করছো কেনো ? কারেন্ট এসে গেছে । ফ্লাশ অফ করো ।
আদ্রের গলা ধরে আসে । হাঁসফাঁস করে চোখ তুলে উচ্চারণ করে…..
” টুকটুকি ,,, আমাকে কেউ এক গ্লাস পানি দিবি প্লিজজ !
