চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৪
আয়াত বিনতে নূর
চারদিকে এক অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা। এমন নিস্তব্ধতা, যা মুহূর্তের মধ্যেই যেকোনো সাধারণ মানুষের বুকের ভেতর অকারণ আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে পারে। বাইরে থেকে পুরোনো বাড়িটাকে যতটা না ভয়ংকর মনে হয়, ভেতরে পা রাখার পর বোঝা যায়—তার প্রকৃত রূপ আরও বহু গুণ ভয়াল।
রাত প্রায় বারোটা ছুঁইছুঁই। আকাশজুড়ে আজ চাঁদের কোনো অস্তিত্ব নেই। যেন এই বিভীষিকাময় রাতের সাক্ষী হতে সেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে। চারপাশে কেবল ঘন অন্ধকার আর নিস্তব্ধতার আধিপত্য।
সেই পুরোনো, গম্ভীর বাড়িটার ভেতরেই কিছুক্ষণ আগে নিভে গেছে একটি প্রাণ। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ছটফট করেছে মানুষটা। বাঁচার আকুতি জানিয়েছে, কেঁদেছে, প্রাণভিক্ষা চেয়েছে। কিন্তু তার আর্তনাদ পৌঁছায়নি কারও হৃদয়ে। করুণা আজ যেন বহু দূরের কোনো শব্দ।
নিজের পাপের কাছেই আজ পরাজিত হয়েছে সে।
কথায় আছে, পাপ কখনো তার হিসাব ভুলে যায় না। সময়ের ব্যবধানে হলেও একদিন সে ফিরে আসে—নিষ্ঠুর বিচারক হয়ে। যে শাস্তি কোনো আইন তাকে দিতে পারেনি, নিয়তি যেন আজ নিজের হাতে সেই রায় কার্যকর করেছে। হয়তো একটি সামান্য ভুলই তাকে ঠেলে দিয়েছে মৃত্যুর অনিবার্য পরিণতির দিকে।
হয়তো এটাই ছিল তার প্রাপ্য।
রক্তমাখা মিট ক্লিভারটি শক্ত করে হাতে নিয়ে নিশ্চুপ বসে আছে ফারিস।
মাকড়সার জালে ঢাকা ঘরের প্রতিটি কোণ ধুলো আর অন্ধকারে আচ্ছন্ন। ভাঙাচোরা আসবাবপত্রগুলো প্রায় দৃষ্টির আড়ালে। অথচ সেই অন্ধকার ভেদ করেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ফারিসের দুটো রক্তাভ চোখ। চোখের গভীরে জ্বলছে এক অদ্ভুত আগুন—যেন বহু বছরের জমে থাকা ক্রোধ আজও নিভে যায়নি। বরং প্রতিটি মুহূর্তে তা আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
তার সারা শরীর রক্তে মাখামাখি। জামা, হাত, মুখ—সবখানেই রক্তের ছোপ। হাতে ধরা মিট ক্লিভারের ধার বেয়ে ধীরে ধীরে টপ… টপ… করে ঝরে পড়ছে টাটকা লাল রক্ত। কিন্তু সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
মনে হচ্ছে, সে যেন এই পৃথিবীতে নেই। হারিয়ে গেছে নিজের ভেতরের এক অন্ধকার জগতে, যেখানে অনুশোচনা বলে কোনো শব্দের অস্তিত্ব নেই।
মেঝেজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে রক্ত। ধুলো, ময়লা আর তাজা রক্ত মিশে সৃষ্টি করেছে এক অসহ্য দুর্গন্ধ। সেই ভারী গন্ধে শ্বাস নেওয়াটাও যেন কঠিন হয়ে উঠেছে। সাধারণ কোনো মানুষ সেখানে কয়েক মুহূর্তও টিকে থাকতে পারত না।
বাইরে হালকা বাতাস বইছে। ভাঙা জানালার পাল্লায় বাতাসের ধাক্কায় মাঝেমধ্যে কিড়মিড় শব্দ উঠছে। সেই শব্দটুকুও যেন মৃত্যুর নীরবতাকে আরও গভীর করে তুলছে।
আর সেই নীরবতার মাঝখানে স্থির হয়ে বসে আছে ফারিস।
তার ঠোঁটের কোণে এখনো লেগে আছে সেই রহস্যময়, বাঁকা হাসি। হাসিটা আনন্দের নয়, উন্মাদনারও নয়—বরং এমন এক তৃপ্তির, যা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত।
কিছুক্ষণ আগের প্রতিটি মুহূর্ত যেন এখনো স্পষ্ট ভেসে উঠছে তার চোখের সামনে। আর প্রতিটি স্মৃতির সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁটের কোণের সেই শীতল হাসিটা আরও একটু প্রসারিত হয়ে উঠছে। যেন তার কাছে এই রাতের শেষ এখনো অনেক দূরে।
সেখানে ছেলেটা চিৎকার, আহাজারি, কষ্ট গুলো কে ফারিস ধ্যানেই নেয়নি। বরং তার পৈশাচিক ভাবে ছেলেটার দুটো হাত টুকরো টুকরো করেছে। আর ছেলেটার চিৎকার বন্ধ হয়ে ছিলো এই পুরনো বাড়িটার ভিতরে যা বাইরের কেউ শুনতে পায়নি আর না সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে কেউ।
সেই গলা শুকিয়ে কান্না, আহাজারি আর মিনতি গুলো ফারিসের চোখের সামনে ভাসছে তা সেই ভাবনায় তাকে পৈশাচিক আনন্দ এনে দিচ্ছে।
কতোটায় না প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছিলো ছেলেটা৷ তারপরও ফারিস তার কান্নারত একটা কথাও কানে নেয়নি। আস্তে আস্তে তা শরীর থেকে প্রত্যেকটা অঙ্গ আলাদা করে নিয়েছে। আর সেই মৃত্যু দায়ক ব্যাথায় কতোটায় না ছটফট করেছে ছেলেটা গলা কাটা,মুরগীর ন্যায়। এই পীড়াদায়ক ব্যাথা, কষ্ট, সেই চিৎকার থেকে ছেলেটার কাছে মৃত্যুই সহজ লেগেছিলো তখন।
কিন্তু জম কি আর এতো সহজে ছাড়ে..?
মাথার চুল পায়ের নখ ওব্দি সব কিছুই এখন আর ঠিক নেই৷ প্রত্যেকটা অংশই এখন কিমার ন্যায় হয়ে গেছে। এতোটা কষ্ট দায়ক মৃত্যু হয়তো কেউ পায়নি। সেখানে কি না হাড় থেকে মাংস তুলে তা মিট ক্লেভার দিয়ে কিমা করা হয়। সাধারণ মানুষের হয়তো ভাবতেই গা গুলিয়ে উঠবে। এই মৃত্যু কান্ড কোনো শক্ত হৃদয়ের কেউ দেখলেও তার রুহ ওব্দি কেঁপে উঠতো হয়তো।
আর সেখানে ফারিস এতোটা ভয়ঙ্কর একটা খুন করার পরও চোখে তার বিন্দু মাত্র অনুসূচনা নেই। আর না আছে কোনো মায়া। হয়তো শুধু থেকেই দ্যা গ্রেইট ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরী এমন। শক্ত, কঠিন, পাথর হৃদয়ের এক ছন্নছাড়া, বেপরোয়া পুরুষ।
ফারিস চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। মিট ক্লেভার টা দিকে একবার চোখ বোলালো তারপর নিজের দিকে দেখলো। সাদা শার্ট রা রক্তে মাখামাখি অবস্থা। সাথে হাতে, গলায় সহ মুখেও রক্তের ছোপ জানো রক্ত দিয়ে তাকে কেউ গোসল করিয়েছে। তারপরও সেসব দিকে বিন্দু মাত্র খুঁটিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করলো।
এক পা এগোতে গিয়েই আবারও পিছনে ফিরলো। পিছনে দিকে ফিরে বাঁকা এক বিদ্রুপ মাখা পৈশাচিক হাসলো। চারিদিকের নীরবতা এখনও স্হায়ী। গাছের সামান্য পাতা নড়ার শব্দ টাও স্পষ্ট কাছে বিধছিলো এতোটায় নীরব। আর সেই অন্ধকার রাতের আধারেই ধড়ে গেলো একটা প্রাণ৷ পৃথিবী থেকে মুছে গেলো আরও একটা মানব। মানব..? ” না মানুষ বললে ভুল হবে। মানব রুপী জানোয়ার। যে কি এতোগুলা বাচ্চা আর কিশোরীদের উপর কেনো দয়া দেখায়নি। নিজের লালসা মেটাতে কুকুরের মতো ছেড়ে খেয়েছে তাকে মানুষ বললে মনুষ্যত্ব থাকবে না হয়তো। সব পাপের শেষ থাকে হয়তো আজও তার পাপেরই শেষ টা এভাবেই ভয়ঙ্কর আর এতোটা কষ্ট দায়ক ভাবেই লেখা হয়েছিলো। কথায় আছে না পাপীকে মারতেও হাত কাপে না হয়তো আজ ফারিসেও আজ এভাবে এতোটা ভয়ঙ্কর মৃত্যু দিতেও হাত কাপেনি।
ফারিস সামনের দিকে তাকালো। নীরবতা ভেদ করে আসছিলো ফুটন্ত গরম পানির শব্দ। শব্দ অল্প হলেও তা ভয়ঙ্কর লাগছিলো নীরবতার মাঝে।
জানো কানে বাজছিলো প্রতিটা ফুটন্ত গরম পানির বিন্দু কণা গুলো।
ফারিস তা দেখে পৈশাচিক বাঁকা হাসি দিলো।
বিড় বিড় করে আওড়ালো… ” ভেবেছিলাম শুধু হাত দুটোই কাটবো তোর জানুয়ার। কিন্তু তুই যা করেছিস এতো ভয়ঙ্কর মৃত্যু দেওয়ার পরও আমার শান্তি লাগছে না।
শেষের কথাটা দাঁতে দাঁত চেপে বলল ফারিস। শরীরে গরম রক্ত জানো কিছুতেই ঠান্ডা হচ্ছে না ফারিসের৷ এই মুহূর্তে শাওয়ার না নিলে জানো রাগে আর গরমে মাথা টা ফেটে যাবে। ফারিস জোরে জোরে বেশ কয়েকবার শ্বাস ফেলল। নিজেকে শান্ত করার অপ্রাণ চেষ্টা করলো। তারপর হাতে মিট ক্লেভার টা রেখেই বেড়িয়ে গেলো পরিত্যক্ত ভাঙাচোরা বাড়িটা থেকে। বাইরে বের হতেই মনে হলো রাতের নির্জনতা না অন্ধকার কার কেও গ্রাস করে নিচ্ছে। চারদিকে জনবসতির কোনো চিহ্ন নেই। এক অদ্ভুত নীরতা। ফারিস কোনো দিকে না তাকিয়ে রক্ত ভেজা শরীর নিয়েই গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে পড়লো ।
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৩
রাতের অন্ধকার পেরিয়ে টয়ারের ঘর্ষণের শব্দ আর গাড়ির হেড লাইন সকল অন্ধকার কে পিছনে ফিরে এগিয়ে গেলো ব্ল্যাক মার্সিডিস টা। পিছনে পড়ে রইলো ভয়ঙ্কর কিছু স্মৃতি আর এক পাপ বিনাসের কালো রাত৷ যা বাচিয়ে নিলো কতোশত নারীর সম্মান আর ঝরে গেলো এক প্রাণ। যা শেষ হওয়ারই ছিলো তা হয়ে গেলো।
