রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৬
সুহাসিনি ফাতেহা
“উমমম কন্ট্রোল! এখনো এসবের সময় আসেনি!”
বিড়বিড় করে রুঢ় মানব তক্ষুনি সে স্থান ত্যাগ করতে চাই। নয়তো এইমুহর্তে নিজেকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে তার কাছে। তাকে বেসামাল করে দিয়ে পিচ্চি মেয়েটা কি আরাম করে ঘুমাচ্ছে।
আশ্চর্য! এসির পাওয়ার হাইপে থাকা সত্ত্বেও তার মুখে বিন্দুবিন্দু ঘাম জমেছে। নারী দেহের ওমন নজরকাড়া রুপ দেখে যুবকের সম্পূর্ণ দেহে অজানা তোলপাড় শুরু হয়েছে। মেয়েটা যদি জানতো ঘুমের ঘোরে তার গায়ের জামা এভাবে বুকের ভাঁজের উপর উঠে ছিলো তখন তার মুখশ্রী দেখতে ঠিক কেমন হতো? নির্ঘাত লজ্জায় কয়দিন তার সামনে পড়তো না। তিতলি ঘুমের ঘোরে ফের নড়েচড়ে উঠল। ঢিলেঢালা লেডিস টি-শার্ট টা এবার আবার সরে গিয়ে চোখ ধাঁধানো গোল নাভি দেখা যাচ্ছে। রমণী নিশ্বাস নেওয়ার সাথে সাথে সে গোল অংশটা তালে তালে ওঠানামা করছে। ফারাজ হাতমুষ্টি বদ্ধ করে ঢোক গিলে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। এই বউ তাকে শান্তিতে রুমেও থাকতে দিবে না। রুমে থাকাও এখন তার জন্য দুষ্কর। যেতে যেতে বাদামী ঠোঁটজোড়া কেমন আনমনে বিড়বিড়ালো,
“আজকে যদি অসুস্থ না থাকতে! আই সোয়ার, আমাকে এভাবে ভেতর থেকে জাগিয়ে তোলার জন্য তোমাকে নাচিয়ে ছাড়তাম? ব্যাপার না। সময়ের সঠিক ব্যবহার নিবো আমি। মাইন্ড ইট!”
সকাল হয়েছে অনেক আগে। ভোর থেকেই আকাশে মেঘ জমে আছে। হয়তো বৃষ্টি নামবে হয়তো বা না। জানালার পর্দা ভেদ করে আসছে মৃদু বাতাস। দেয়াল ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে আটটা পঞ্চান্ন’তে। তিতলির ঘুম ভেঙেছে আধাঘন্টা আগে। এখনো বিছানায় শুয়ে আছে। ফারাজ কলেজে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে। প্যান্ট চেঞ্জ করছে তাই তিতলি অন্যদিকে মুখ করে শুয়ে আছে। মিনিট খানেক পর ফারাজের গম্ভীর কন্ঠের হুকুম শোনা গেলো,
“কোনো কিছু লাগলে আমাকে কল করবে ওকে? টেবিলে নাস্তা এনে রেখেছি। উঠে খেয়ে নিবে। ক’দিন রুম ছেড়ে বের হওয়ার প্রয়োজন নেই।”
তিতলি ফারাজের কথা শুনে ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে সোজা হয়ে শুলো। আড়চোখে টেবিলের দিকে তাকালো। রাত থেকে দেখে আসছে ফারাজ তাকে কেয়ার করছে। সামান্য কেয়ারেই তার সব অভিমান গলে পানি হয়ে গেছে। এভাবে যদি সবসময় তাকে কেয়ার করতো? ভালো হয়ে গেলেই আবার আগের মতো হয়ে যাবে। সপ্তদশী দুঃখ পায় সেটা ভেবে। তবে এখন এত নাস্তা সে কি করে খাবে? মুখ ভেংচি কেটে সন্দেহের গলায় বলে বসল,
“এত খাতির যত্ন করছেন কেন ভাল্লুক কোথাকার!”
অলক্ষ্যে ঠোঁট কামড়ে হাসল ফারাজ। শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত ভাঁজ করতে করতে তিতলির পাশে এসে বসল। তৎক্ষণাৎ মাথাটা সামান্য ঝুঁকিয়ে এনে পাহাড়সম বলিষ্ঠ পুরুষ কেমন গভীর দৃষ্টে তাকিয়ে গোটা বউয়ের মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখল। অতঃপর বাঁকা কন্ঠে শুধালো,
“এত খুশি হওয়ার কিছু নেই। সুস্থ হলে তোমাকে ভাল্লুকের ইয়াম্মি খাবার বানাবো। তাই একটু খাতির যত্ন করে মোটা বানাচ্ছি। শিকার খাওয়ার আগে একটু মোটা বানালে খেতে সুবিধা হবে..”
পথিমধ্যেই কথা কেড়ে নিলো তিতলি,
“না! মোটা হলে আমাকে দেখতে কোমড়ো পটাশ লাগবে। আমি মোটা হবো না।”
পরপরই আবার অবাক হওয়ার ভান ধরে বলল,
“তারমানে আপনি মেনে নিয়েছেন আপনি ভাল্লুক?”
ফারাজের ভ্রু জোড়া কুঁচকে এলো কৌতুকে। তিতলির এলোমেলো ঘনকালো সিল্কি চুল গুলো আচমকা আলগোছে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে সামান্য পেঁচায়। গ্রীবাটা নিচে নামিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
“অসুস্থ শরীর নিয়েও কথার তেজ কমেনি দেখছি।”
তিতলি বেঘোরে দাঁত কেলিয়ে বলল,
“আপনাকে আমি এমনি, এমনি ভাল্লুক বলি না বুঝলেন? কারণ আছে।”
“যেমন?”
“যেমন—–কথা বলার সময় মাঝে মাঝে ভাল্লুকের মতো গর্জন দিয়ে উঠেন। ভাল্লুকের মতো দেখতে আস্ত বড় মাংস গড়া একটা শরীর। হাত পা লোহার রডের মতো শক্তিশালী যেখানে হাত দেন সেখানে শুধু ব্যাথা পায়।”
ফারাজের অভিব্যক্তি একটুও বদলায় না। শুধু একটু নাক কুঁচকে তিতলির কানের কাছে মুখ নামিয়ে আনলো। অতঃপর মৃদু গলায় বলল,
“উঁহু! আরো একটা জিনিস আছে, যেটা তুমি নিজেই লোহার রড করে দিচ্ছো। কি করা যায় বলোতো?”
তিতলি আমতা আমতা করলো। ফারাজের কথার মানে বুঝে উঠতে পারছে না সে। ফারাজ তখনো উত্তরের আশায় চোখ ছোট করে চেয়ে।
তিতলি কাচুমাচু হয়ে বলল,
“সেটা আমি কি জানি?”
ফারাজ ঠোঁট কামড়ে ক্ষীণ নাচাতে নাচাতে বলল,
“জানবে, জানবে। ওসব বিষয়ে মুখে বলে বোঝানো যায় না। দেখিয়ে, করিয়ে বোঝাতে হয়।”
ফারাজের কথা বুঝে উঠতে তিতলির কয়েক মিনিট সময় লেগে গেলো। বোকা মানবীর নরম গাল দুটো লজ্জায় রক্তিম হয়ে এসেছে। খাটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে মনে হয়। মুখ এসে ঠেকেছে গলায়।
ফারাজ এবার তিতলির মাথার চুল ছেড়ে দিয়ে কথা ঘুরিয়ে কেমন দুষ্ট সুরে আওড়ালো,
“খাবার সব খেয়ে নিও। একটু মোটা হতে হবে।
নয়তো কষ্ট তোমার-ই হবে। ভবিষ্যতে তোমার উপর-ভেতর দিয়ে অনেক ধকল যাবে, অন্তত সেগুলোর লোড নেওয়ার জন্য হলেও শরীরে একটু জোর বাড়াও।”
তিতলি ঠিক বুঝে উঠতে পারে না ফারাজের ঘুরানো প্যাচানো কথাগুলো। তার উপর আবার ধকল কেন যাবে? মুখাবয়বে হতভম্বতার রেশ ধরে আচমকা নিষ্পাপ ভঙ্গিতে বলল,
“মা–মানে?”
“মানে খুঁজতে হবে না তোমায়। পিচ্চি মেয়ে পিচ্চির মেয়ের মতো থাকো।”
তিতলি জেদ ধরে রয়েছে। সে সম্পূর্ণ কথা শুনতে চাই,
“যে কথা কথা বুঝিয়ে বলতে পারবেন না সে কথা বলেন কেন? হুহ!”
“এতকিছুর মানে এখনই বুঝা তোমার জন্য বিপদ। সময় বুঝে আমি প্র্যাকটিক্যালি লাইভ দেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ব। এখন চুপচাপ যা বলছি তা করে নিয়ো হুমম।”
বলে ফারাজ হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ায়। তক্ষুনি তিতলি হঠাৎ মুখ ফস্কে বলে উঠে,
“আমি অসুস্থ হলে আপনি যদি আমাকে এভাবে কেয়ার করেন তাহলে আমি এভাবে অসুস্থ শরীর নিয়ে গোটা জনম কাটিয়ে দিবো।”
ফারাজ থমকে দাঁড়িয়ে কপাল কুঁচকালো। তিতলি নিজে থেকেই নিজের কথার ভুল বুঝতে পেরে জিভ কাটছে। ফারাজ ঠোঁট কামড়ে হাসল। ফের ঘাড় ঘুরিয়ে তিতলির মুখোমুখি এলো। মেরুদণ্ডের হাড় সামান্য বাঁকিয়ে তিতলির উপর যতটা ঝুঁকা যায় ঠিক ততটাই ঝুঁকে এলো। তিতলির কম্পিত ঠোঁটের উপর পরপর ঘনঘন নিশ্বাস ছাড়ল যুবক। রমণী কাঁপে থরথর করে। ফারাজের শরীর থেকে আসা কড়া পারফিউমের সুবাসের সাথে পুরুষালী ঘ্রাণে তার নিশ্বাস আটকে আসে। ফারাজ কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তিতলির দুপাশে নিজের পেশিবহুল দু’হাত রেখে প্রশ্নের জবাব দিল একেবারে নিজের ঢঙে,
“বউ যদি গোটা জনম এভাবে অসুস্থ শরীর নিয়েই পড়ে থাকে। তাহলে তো আমার আর তোমার সাথে টুনাটুনিদের আম্মু বানানোর কাজগুলো করা লাগবে না বোধহয়। বউ গোটা জনম পিরিয়ডের অসুখ নিয়েই কাটিয়ে দিবে? ভালোই তো!”
তলপেটে মোচড় দিয়ে উঠল লাজুকময়ী সপ্তদশীর। লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া মেয়েটা জোরে মুষ্টি বসাল ফারাজের বুকে।
“আপনি… আপনি যান কলেজে। অসভ্য লোক!”
ফারাজ ভ্রু নাচায়। সে তো যাচ্ছিলো আবার মাঝপথে ডেকে এনে তাকে বলা হচ্ছে আপনি কলেজে যান। এতক্ষণ সব বউকে জ্বালানোর ভাবনা মাথায় খেলেছিলো তাকে ভাল্লুক বলায়। তবে এবার তাকে গম্ভীর দেখাল। আচমকা যুবক করে বসে আরেক কান্ড। তিতলির নরম গালে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে। শব্দ করে চুমও খেলো। হাস্কি সুরে বলল,
“পেটে আর ব্যাথা করলে ড্রয়ারে ওষুধ রেখেছি ওখান থেকে একটা খেয়ে নিও। নাহয় আম্মুকে ডাকবে ওকে।”
তিতলি ফারাজের দিকে তাকায় না। পা মেলে রেখে বুকে দুহাত গুঁজে রেখেছে। ফারাজের ঠোঁটের ছোঁয়ায় গাল এখনো শিরশির করছে। চোখ মুখ কুচকে জানাল,
“না আমি ওষুধ খাব না। বমি আসে আমার।”
“ওকে। তবে নাস্তা সব গুলো খাওয়া চাই। নয়তো আমি এসে অন্য কিছু খাওয়ানোর প্রস্তুতি নিবো।”
বলে ফারাজ স্টাডি টেবিলের দিকে এগোয়। ম্যাকবুক নিয়ে বউকে আরো কিছু হুকুম দিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো। এমনিতে লেট হয়ে গিয়েছে।
এর মাঝেই আরো তিনদিন চলে গিয়েছে। এই তিনদিন ফারাজের খুব ব্যস্ততায় কেটেছে। কলেজে অনেক চাপ কাজের। অন্যঅন্য ইয়ারের পরিক্ষা চলছে। তিতলি অসুস্থ থাকায় কলেজে যায় নি। অবশ্যই সে যেতে চেয়েছিল কিন্তু ফারাজ একদম ভালো হওয়া পর্যন্ত নিয়ে যাবে না বলছে।
ঝিলিকের সাথে তুষারের আজকে তিনদিন ধরে যোগাযোগ নেই। জিসা বেগম অনেক আত্ম মর্যাদাশীল মহিলা। কখনো কারো থেকে ছোট হয়ে কথা শুনলে ওনি সেগুলো সহ্য করতে পারেন না। এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেন নি সেদিন পাত্রপক্ষদের বলা কথাগুলো। ঝিলিক নিজেও তুষারকে ফোন দিয়ে পাচ্ছে না। তাহলে সেদিন কেন পাত্রপক্ষের সামনে এসে এসব কাহিনী করছিলো। ভাবতে ভাবতে আজকে ঝিলিকের মনে আশা জাগিয়ে মোবাইল টা বেজে চলছে। ঝিলিক ফোন হাতে নিয়েই ছিলো বুকটা ধক করে উঠে। ফোন রিসিভ করে কানে গুঁজল। ওপাশ থেকে ভেসে এলো চিরচেনা কন্ঠ,
“কেমন আছো?”
ঝিলিক কিছু না বলে চুপ হয়ে থাকে। মানুষটা মাঝেমধ্যে তাকে তুমি বলে বসে। ঝিলিকের চোখের কোণ ভিজে এসেছে। কথা বলবে কি করে? একদম বলতে চাই না। এতদিন কল দেই নি। এখন সে কেন বলবে?
তু্ষার আবার বলল,
প্লিজ প্লিজ রাগ করবেন না ট্রাস্ট মি, আমি অনেক ব্যস্ত ছিলাম। আমাকে ভুল বুঝবেন না ঝিলিক।
ঝিলিক: কি বলতে কল করেছেন?
তুষার: মনের শান্তি আনতে।
ঝিলিক: “আমি কবে থেকে আপনার মনের শান্তির কারণ হলাম?”
তুষার অফিসে বসে। এতক্ষণ জরুরী মিটিং ছিলো। সব একাই সামলাতে হয়েছে। বাবার অফিসের পাশাপাশি নিজেও একটা অফিস খুলেছে।
ঝিলিকের কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“যবে থেকে নিজের পাশে আপনাকে ভেবেছি।”
ঝিলিক: “আপনি যখন সেদিন চলে গিয়েছেন আর একবার কল করেছিলেন? আমি খুব ভয় পেয়েছি!”
জিসা বেগস দরজায় দাঁড়িয়ে সব কথা শুনলেন। এগিয়ে এসে মেয়ের থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে কল কেটে দিলেন। কড়া গলায় বললেন,
“যেদিন তুষার পুরো পরিবার নিয়ে আবার বিয়ের প্রস্তাব রাখবে সেদিন আমি তোকে মা হিসেবে নিজ দায়িত্বে তুষারের হাতে তুলে দিবো। তার আগে ফোনে কথা বলার ভুলে যা। পুরুষ মানুষের মন বদলাতে সময় লাগে না।”নাছিমা বেগম কার সাথে যেন ফোনে কথা বলছেন ফিসফিস করে,
“আমার এই মেয়েকে ফারাজের পাশে সহ্য হয় না রোহান। কিছু একটা ব্যবস্থা কর। তুই আয় খালার বাড়ি। মান সম্মান আঘাত দিলে ঠিকই ফারাজ এই মেয়েকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আমাদের নীলাকে বিয়ে করবে।”
ওপাশ থেকে কথা বলছেন নাছিমা বেগমের ছেলে রোহান,
“আমি কালকে আসতেছি আম্মু। কিছু একটা করেই ছাড়বো।
“মেয়েটা বোকাসোকা। তুই এসে কয়দিন সুন্দর করে দুইটা কথা বলবি। দেখবি তোর সাথে মিশে গেছে। যা করার আস্তে ধীরে করতে হবে না হলে ফারাজ বুঝে যাবে। আমি না হয় ফারাজকে ভুলিয়ে বালিয়ে নীলার দিকে মন আনার চেষ্টা করবো।”
“ফারাজ ভাইয়ের সাথে নীলাকে বিয়ে দিতে পারলে বিশাল সম্পত্তির ভাগিদারী হতে পারবো আমরা। নীলাকে ফারাজ ভাইয়ের আশেপাশে থাকতে বলো আম্মু। বিয়েটা দিতে পারলে সম্পত্তি গুলো নীলার নামে হয়ে যাবে।”
বলি তো তোর বোন শুনতেছে না। শুনলে কি আর এই দিন দেখা লাগতো? কবেই ফারাজের সাথে বিয়ে দিয়ে দিতাম। আমি যেভাবেই হোক এই মেয়েকে ফারাজের থেকে আলাদা করবো তুই আসলে কাজটা করতে সুবিধা হবে।
“আচ্ছা রাখ! আমি এখন থেকে মেয়েটাকে বশে আনার চেষ্টা করবো ভালো ব্যবহার করে। দেখে আসি কি করে।”
বলে নাছিমা বেগম ফোন কেটে দিয়ে ডেবিল হাসি দিলেন। উদ্দেশ্য হাসিল না করে তিনি যাচ্ছেন না।
তিতলি শাশুড়ির সাথে কিচেনে এসেছে। তার কিশোরী মনে খুব ইচ্ছে হয়েছে ফারাজরের জন্য নিজের হাতে রান্না করবে। ভাবতেই কেমন জানি খুশি খুশি লাগছে তার। কখনো কিচেনের ধারে কাছে না যাওয়া মেয়েটা এসেছে রান্না করবে বলে তাও গুরুর মাংস ভাবা যায়? ফারিন বেগম পুত্রবধুকে বললেন,
“তুমি রান্না করা লাগবে না তুমি শুধু পাশে দাঁড়িয়ে দেখো তিতলি।”
তিতলি পাতিল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইতিমধ্যেই। কিভাবে যেন নাকে কালিও লেগেছে। সেদিকে কোনো খেয়াল নেই তার। সে রাঁধবে মানে রাঁধবে।
“রান্না করি প্লিজ আম্মু। আপনি শুধু দেখিয়ে দেন। আমি সব পারি আমার রান্না খেলে প্রত্যেকবার বলবেন হ্যাঁ তিতলি রান্নাটা তুমি করো।”
কথা গুলো খুব সহজে বলে দিলেও তিতলি নিজেই জানে না কিভাবে রান্না করে। কখনো তো কিচেনে গিয়ে পাতিলেও হাত দিয়ে দেখিনি। মা রান্না করেছে আর সে টাইমে টাইমে খেয়েছে।
“ফারাজ এসে তোমাকে কিচেনে দেখলে চিল্লাবে। তুমি না অসুস্থ রুমে গিয়ে গোসল করে নাও।”
“আমার ঘুম আসে না।”
ফারিন বেগম শেষ পর্যন্ত তিতলির জেদের কাছে হার মেনে রান্না করতে সাহায্য করলেন তিতলিকে।
নাছিমা বেগম এসেছেন কিচেনে। এসেই মুখ বাঁকিয়ে বললেন,
“ফারাজের বউ একটু এদিকে আসো তো। অনেক তো রান্না করলে।”
তিতলি আড়চোখে শাশুড়ির দিকে তাকায়। আবার নাছিমা বেগমের দিকে। এই ডাইনী মহিলা তাকে এত সুন্দর ভাবে ডাকছে কেন? তিতলির ভাবনার মাঝেই সহসা গম্ভীর কন্ঠসুর ভেসে এলো,
“আমার বউ কারো কাছে যেতে পারবে না।”
কথাটা বলে যুবক আড়চোখে বুকে ওড়না গুঁজে পাতিল হাতে নেওয়া রমণীর পানে তাকাল। তিতলি ফারাজকে দেখে লাজুক ভঙ্গিতে পেল্লব ঝাপটে কানের পিঠে চুল গুঁজল। ফারাজ সেটা দেখে চোখের চাউনি তীক্ষ্ণ করে মায়ের উদ্দেশ্য বলল,
“আম্মু তোমার বৌমাকে এক্ষুনি রুমে আসতে বলো। দ্বিতীয়বার যেন ডাকতে না হয়।”
তিতলি মুখ ভেংচি কাটে। রান্না করতে সে কার জন্য এসেছে? যার জন্য ভালোবেসে রান্না করতে এসেছে সেই বলে, এক্ষুনি রুমে আসো। এই ভাল্লুক কিছু বুঝে না একদম। তিতলি বুকে হাত গুঁজে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে।
নাছিমা বেগম ফারাজকে হাতের মুঠোয় আনার জন্য বললেন,
“তোর কিছু লাগবে আমাকে বল ফারাজ নীলাকে দিয়ে পাঠাচ্ছি। দেখছিস তো তোর বউ রান্না করছে।”
ফারাজ চলে যাচ্ছিলো খালার কথা শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে কপাল কুঁচকে তাকালো। গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“আমি কোনো নীলাকে ডাকছি না। আমার বউকে রুমে ডাকছি!”
“তোর বউকে দিয়ে এখন কি করবি? মাত্রই তো কলেজ থেকে এসেছিস?”
“ওর সাথে আমার দরকারি কাজ আছে, ইটস ভেরী পার্সোনাল!”
বলে ফারাজ তিতলির মুখখানার পানে গভীর দৃষ্টে তাকিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায়।
ফারাজ বললেও তিতলি প্রায় আধাঘন্টা সময় ব্যায় করে রুমে এসেছে। বুকের দ্রিমদ্রিম আওয়াজ বেড়েছে। দরজায় দাঁড়িয়ে ভাবুক হয়ে দাঁতে নখ কাটছে। কেন তাকে রুমে ডাকছে সে চিন্তায় পাগল প্রায়। একবার দরজা সামান্য ঠেলে চোরাপথে ভেতরে উঁকি দিতে গেলো। খালি গায়ে বিছানায় পা দুলিয়ে বসে আছে ফারাজ। উদোম দেহ দেখে লজ্জায় তিতলি চোখ নামিয়ে নেয়। শোনা গেলো ফারাজের কন্ঠ,
“আমি কখন ডেকেছিলাম? ডাকার সাথে সাথে না আসলে মোড চেঞ্জ হয়ে যায়।”
তিতলি ধরা পড়ে যাওয়ায় চোখ বড়বড় করে তাকায়। তার দিকে না তাকিয়ে বুঝলো কিভাবে সে এসেছে? কিসের মোডের কথা বলছে?
সে ব্যাগ্র কন্ঠে বলল,
“আপনি তো গোসল করছিলেন।”
“তো? এখন দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি ভেতরে আসবে?”
তিতলি কিছু না বলে ত্রস্ত পায়ে চুপচাপ রুমের ভেতর ঢুকলো। অর্ধেক ঢুকতেই ফারাজ পুনরায় হুকুম করলো,
“দরজা লাগিয়ে আসো!”
তিতলি আমতাআমতা করে বললো,
“ইয়ে মানে…দদরজা লাগাবো কেন?”
“আমি বলছি তাই।”
তিতলি দরজা লাগাতে যায়। লোকটার মতলব সুবিধার লাগছে না, কি করতে চাইছে কে জানে? দরজা লাগিয়ে সে ফারাজের দিকে না গিয়ে কাপড় নিতে যায় ওয়াশরুমে গোসল করতে যাবে বলে। তখন ফারাজ কপাল কুঁচকে রাখে। সে কি গোসল করতে যাওয়ার জন্য,রুমে ডেকেছে? তিতলিকে ডাকলো,
“কাছে আসো!”
তিতলি একটা শুষ্ক ঢোক গিলে শুধালো,
“কাছে এলে কি করবেন?”
“আমার যা খুশি তাই করবো, এখন চুপচাপ কাছে আসবে, নাকি আমি উঠে টেনে হিঁ’চড়ে কাছে টেনে আনবো সেটা তোমার ইচ্ছে। ডিপেন্ডস অন ইউ।”
এটা বলে ফারাজ তিতলির উপর গভীর দৃষ্টে তাকিয়ে তিতলিকে নজরবন্ধি করলো।
তিতলি দুরুদুরু চিত্তে পা টিপে টিপে বিছানার দিকে এগিয়ে আসলো। ফারাজের থেকে দুরুত্ব রেখে একেবারে কর্ণারে গিয়ে বসলো।
“কাছে এসে বসতে বলেছি। আমাকে উঠালে কিন্তু ফল ভালো নাও হতে পারে। যা চাচ্ছি তার থেকে বেশিবেশি কিছু হয়ে যাবে।”
আশ্চর্য এমন করছেন কেন ওনি? তিতলি নাক মুখ কুঁচকে আরেকটু এগালো এবার। এবার ফারাজ বিরক্ত হয়। দাঁত কটমটিয়ে পেশিবহুল হাতের সাহায্য তিতলিকে টেনে এনে নিজের গা ঘেঁষে বসিয়ে গভীর নিচু স্বরে বসল,
“বড্ড খিদে খিদে পেয়েছে।”
তিতলি খুশি হলো অনেক। সে তো আজকে ভাল্লুকের জন্য মাংস রান্না করেছে। তাহলে সেগুলো বাটি করে এনে দিবে। তাই খুশি মনে বলল,
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৫
“আপনার জন্য আজকে শাশুড়ি আম্মুর সাহায্য নিজের হাতে গরুর মাংস রান্না করেছি। সেগুলো এনে দিই ভাল্লুক মশাই?”
“না! গরুর মাংস মহিষের মাংস কোনোটাই এখন আমার পোষাবে না। আমার তোমার মতো ইয়াম্মি পিচ্চিকে-ই খেতে ইচ্ছে করছে। ভাল্লুকার শিকার না তুমি? তোমাকেই তো টেস্ট করবো তাই না। সো,কাম ক্লোজার!”
