Home তুমি আমার শেষবেলা তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২৮

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২৮

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২৮
নীতি জাহি

গাড়ি এসে থামে “ঔশান প্যালেস” এ। এই বাড়িটা ইমরান নিজের বিজনেস এর প্রফিট দিয়ে গড়ে তোলে।বাড়ি বললে ভুল হবে। একটা সাম্রাজ্য গড়ে তোলেছে সে। সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিকার গুটি কয়েক মানুষ। সেই উইল ও করে ফেলেছিলো বছর কয়েক আগে।
ইশান এগিয়ে আসে ফুলের মালা নিয়ে। গাড়ি থেকে মিনহাজ ধরে মোনাকে নামায়। ইমরানের অনুরোধে মিনহাজ,মনসুর এবং নয়ন এসেছে ওদের সাথে। বাকিরা রিসিপশনের অনুষ্ঠানে আসবে বলে জানিয়েছে। গাড়ি থেকে নেমে বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে মোনা। সামনে দাঁড়ানো মহলতুল্য বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। নেমপ্লেটে নামটা মনে মনে দুবার উচ্চারণ করলো, “ঔশান প্যালেস”। সামনে গুটি পায়ে এগিয়ে আসতেই বাড়ির ভেতর থেকে সবাই বের হলো।ইশান বাবা-মাকে ফুলের মালা পরিয়ে দিলো। মোনা লজ্জা পেয়ে মাথা নামিয়ে রেখেছে। ইমরান ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে,

‘ বাবা আমার কি এখন মালা লাগানোর বয়স আছে।এসব কেনো?’
‘ পাপা, মালা তো আমি লাগিয়েছি এখন তোমরা মালা বদল করবে, প্লিজ। ‘
‘ এই ছেলে বকা খাবে, মোনা উইক দেখছোনা এসব করোনা বাবা।’
আইরিন এসে এক ধমক দিলো ইমরানকে,
‘তুই না হয় বুড়া হয়েছিস,মেয়েটা তো এখনো ছোট ওর কি মনের খায়েস নেই। হাসপাতালে ধরে বেঁধে বিয়ে করলি কান্ডজ্ঞানহীন এর মত।’
বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে মুখ লটকে গিয়েছে ইমরানের। মিনহাজ নিজেও মাথা নত করে রেখেছে। এমন অপ্রস্তুত সিচুয়েশনে পড়বে। ইমরান মিনহাজ এর দিকে করুন চোখে তাকিয়ে আছে যার মানে সাহায্য কর। নয়ন বলে উঠলো,
‘ বেটা ভাই তোর শ্বশুর। উনি কি বলবে।এভাবে তাকায় আছিস কেনো?’
‘ নয়ন তুই কি শুরু করলি বলতো,হসপিটাল থেকে এই কাহিনী শুরু করছিস।’ মিনহাজ ধমক দিলো নয়নকে।
সামান্তা বললো,

‘মামা মামীর দিকে তাকালেই বুঝা যাচ্ছে শরীর বেশি উইক,তাড়াতাড়ি মালা পরাও।’
অগত্যা বাধ্য হয়ে লটকানো মুখ নিয়ে মোনার গলায় মালা পরিয়ে দিলো ইমরান। মোনা ও অন্যদিকে তাকিয়ে ইমরানের গলায় মালা পরাতে যাবে। কিন্তু নাগাল পেলোনা। ইমরান তখনই হাঁটুগেড়ে মোনার সামনে বসে। সাথে সাথে সোহান,ইশান,নয়ন চিৎকার দিয়ে চিয়ার আপ করতে লাগলো। ইমরান এতক্ষনে মুচকি হাসি দিয়ে মোনার দিকে তাকালো। মোনার লজ্জায় দু পাশের গাল গুলো গোলাপি আভা ধারণ করেছে। পুরো সময়টা ইশান ভিডিও করেছে। মালা বদল শেষে মোনাকে নিয়ে বাড়িতে ঢুকলো সবাই। ড্রইং রুমে বসিয়ে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে মোনাকে। আইরিন স্বর্ণের বালা দিয়ে মোনাকে মিষ্টি খাওয়ালো। ইশতিয়াক যেহেতু পেশায় পুলিশ। ডিউটি থাকায় আসতে লেট হয়েছে। বাড়িতে ঢুকেই মোনাকে বড় করে এক সালাম দিলো,
‘ আসসালামু আলাইকুম ভাবী, ওয়েলকাম টু আওয়ার ঔশান প্যালেস।’
মোনা মিষ্টি একটা লজ্জা মাখা হাসি দিলো। ইমরান উপরে নিজের রুমে গিয়েছিলো। ড্রেস চেঞ্জ করে সবাইকে তাড়া দেয় মোনাকে রুমে নিতে। আপাতত ডাক্তার সিড়ি ব্যবহার করতে নিষেধ করাতে ইমরান মোনাকে কোলে তুলে নেয়। মোনা না পারতে ইমরানের গলা জড়িয়ে ধরে লজ্জায় মুখ লুকিয়ে। ইমরান মোনাকে সোজা ওর বাবা মায়ের রুমে নিয়ে যায়। আচমকা এই কান্ডে আইরিন ধমক দিয়ে বলে,

‘তোর রুমে না নিয়ে এখানে কেনো?’
‘এতক্ষন যা যা বলেছো সব কথা শুনেছি।এখন আর কথা বাড়াবে না। এটা মোনা আর আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমাদের সামলে নিতে দাও। ও এখানেই থাকবে।’
মোনা অবাক হয়নি। মিনহাজের দিকে তাকিয়ে ইমরান বললো,
‘ আমাকে এই ব্যাপারটা সামলে নিতে দাও,অনুরোধ আমার। আমার মোনার সাথে বোঝাপড়া আছে।’
মিনহাজ সম্মতি দিয়ে হেসে বললো,
‘মেয়ে দিয়েছি,বাকিটা মেয়ের জামাই এবং মেয়ের ব্যক্তিগত সমস্যা। তারা মিটিয়ে নিলেই ভালো। আমি এসবে নাক গলানোর মানেই হয় না।’
ইমরান মিনহাজের কথায় খুশি হলো। এবার নয়ন বলে উঠলো,
‘অনুমতি দে,আমরা বের হই। বাসার দিকে যাই।বাসার মানুষ গুলো অপেক্ষা করছে। আগামীকাল আসবো।’
‘এই একদম না.. খেয়ে যাবে সবাই।বিরিয়ানি রেঁধেছি আমি।’
অগত্যা আইরিনের কথায় সবাই নিচে গিয়ে বসলো, মিনহাজ ব্যাতিত।মিনহাজ মেয়ের কাছে বসলে সবাই তাদের একা ছেড়ে দেয়।

‘আম্মা, তুমি কি খুশি বিয়েতে?’
মোনা বাবার দিকে অপলক তাকিয়ে আছে।কি উত্তর দিবে। এভাবে তো চায় নি। ভুল বোঝাবুঝি দিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে হবে। আদৌ কি নতুন জীবন!!! ইমরানের কথায় স্পষ্ট ক্রোধ,ক্ষোভ বুঝা যাচ্ছে। ইমরান মোনালিসা বলা ছেড়ে দিয়েছে। এত ঝড়-ঝাপটা এর আগে গিয়েছে কিন্তু মোনালিসা ব্যাতিত অন্য নাম উচ্চারণ করেনি। আজ প্রতিবারই মোনা ডাকছে। কি বোঝাপড়া করবে ওর সাথে???
বাবার পুনরায় ডাকে সম্বিত ফিরে,
‘ হ্যাঁ বাবা, আল্লাহ যা করেন অবশ্যই তা কল্যান কর।বাবা উনাকে একটু ডেকে দিবা।’
মিনহাজ মৃদু হেসে রুম থেকে বেরিয়ে ইমরানের রুমের দরজায় নক করলো। দরজা খুলতেই ইমরানকে বলল মোনা ডাকে। ইমরান তাড়াতাড়ি করে রুম থেকে বেরিয়ে মোনার দরজার নব ঘুরালো। রুম ঘুটঘুটে অন্ধকার। বাইরের ল্যাম্পপোস্টের আলোর ঝাপসা ছিটা রুমে আসছে। ইমরান দরজা লাগিয়ে সোফায় বসলো। বাবা পেপার পড়ার জন্য সোফাটা ইমরান প্রথম টিউশনি পড়িয়ে কিনে দিয়েছিলো। স্মৃতি হিসেবে এখনো আছে এটা। মোনা জানালার গ্রিল ধরে বাইরে তাকিয়ে আছে। রুমের নিগূঢ়তা প্রথমে ইমরানই ভাঙলো।

‘ কিছু বলবে?’
মোনা চুপ। ইমরান বসে ওকে এক নজরে দেখছে। পুনরায় বলায় ইমরানের গলাটা একটু রাগত শুনালো,
‘কথা শুনতে পারছোনা!! রেস্ট নাও।ঠান্ডা লাগবে, জানালার কাছে কি? ডেকেছো কেনো?’
মোনা জানালার কাছ থেকে সরে গুটি পায়ে এক কদম করে ফেলে ইমরানের সামনে এসে দাঁড়ায়। আবছা আলোতে ইমরানের মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মোনা আর কিছু না ভেবে ইমরানের মাথাটা বুকে চেপে ধরলো। আকস্মিক ঘটনায় ইমরান হতচকিত হয়ে ভাষা হারিয়ে ফেললো। শরীর প্রবল বেগে কম্পিত হলো। এই অনুভূতি অন্য রকম।তার ছোট্ট প্রেমিকা লজ্জা ভেঙ্গে কি কাজ করলো এটা। ওর কি ভয় হচ্ছে না এত বড় একজন পুরুষ কে বুকে চেপে ধরতে! ওর থেকে বয়সে বড়রাও তো ইমরানের কাছে আসলে কাঁপাকাঁপি শুরু করে দেয়। অথচ এই মেয়ে আনায়াসে বুকে চেপে ধরে রেখেছে!! নাকি নিজের পুরুষ বলে ভ!য় ভুলে গিয়েছে।
ভেবেছে নিজেকে ছাড়িয়ে নিবে কিন্তু পারলোনা।এই মুহুর্তে মোনাকে প্রত্যাখ্যান করার কোনো ক্ষমতা ইমরানের নেই। মেয়েটা কাঁদছে। এবার ইমরান নিজেকে আর সামলাতে পারলোনা, মোনাকে চেপে ধরলো। মোনার কান্নার গতি বেড়ে গেলো। নিশ্বাসের গতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এলোমেলো চুমু খেলো ইমরানের চুলে। মাথায়। মোনা হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২৭

‘স্যরি, অনেক গুলা স্যরি, পৃথিবীর সব সব স্যরি আপনার জন্য। আমার সাথে একটু কথা বলুন আগের মত।আবার মোনালিসা বলে ডাকুন।’
ইমরান নিরব। মনের মধ্যে তুমুল ঝড়। মোনার বুকের ধুক ধুক আওয়াজ ওর কানে লাগছে। হার্ট বিট ১২০ পার মিনিট। মোনা ইমরানের উত্তরের জন্য অপেক্ষা করছে। হঠাৎ করে ইমরান নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় মোনা থেকে। মোনাকে রেখে রুম ছেড়ে সোজা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। এমন হন্তদন্ত হয়ে নামা দেখে ড্রইং রুমে বাকিরা দাঁড়িয়ে পরে। কি হয়েছিলো রুমে সবার মনে এই প্রশ্ন!!! মোনা নির্বাক,নিস্তব্ধ, আর কত শাস্তি পেতে হবে মোনাকে!!!

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২৯