Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১০

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১০

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১০
মারিয়াম ফুল

“আমি বি… বিবাহিত! আমি প্রেগন্যান্ট ক্যাপ্টেন সাহেব! আমি মা হতে চলেছি!”
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্রর কানে এই ‘ব্রেকিং নিউজ’ পৌঁছাতেই সে পকেট থেকে লাইটার বের করে একটা সিগারেট ধরাল। আগুনের শিখায় তার ধারালো চোয়াল আর ঠোঁটের কোণের বাঁকা হাসিটা ক্ষণিকের জন্য স্পষ্ট হলো। দৃশ্যটা তার কাছে বেশ ‘সিনেমাটিক’ মনে হচ্ছে। সে আসলে বিয়েটা করেছে জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে একটা নতুন অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে, কিন্তু প্রথম রাতেই যে এমন ‘টুইস্ট’ পাবে সেটা ভাবেনি।
হঠাৎ সিলেটের আকাশ ভেঙে শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। খোলা জানালা দিয়ে আসা ঝোড়ো বাতাসে মেহেরের মাথার পাতলা ওড়নাটা খসে পড়ল। রুদ্র তাকে এক পলক দেখেই চিনে ফেলল—বিমানের সেই মেয়েটা! কিন্তু মেহেরের কাছে রুদ্র এখনো সেই শত্রু, যে শুধু কাগজের এক সইয়ের জোরে তাকে দখল করতে এসেছে।
রুদ্র ধীর পায়ে মেহেরের সামনে এসে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল—

“ওয়াও! ইন্ডিয়ান টিভি সিরিয়ালকে তো হার মানিয়ে দিলে সুইটহার্ট।বাসর রাতেই ঘোষণা করছ… তুমি বিবাহিত তার উপর আবার প্রেগন্যান্ট? তা তোমার সেই ‘রোমিও’ এখন কোথায়? তাকে ছেড়ে আমার কাছে কেন?”
মেহেরের চড়া গলা মুহূর্তেই আর্তনাদে রূপ নিল। সে ফিসফিস করে বলল— “নেই… সে আর এই পৃথিবীতে নেই।”
রুদ্র ভ্রু কুঁচকে একদম নির্বিকার গলায় বলল—
“ওহ, সো স্যাড। তো এতে আমার কী করার আছে? আমি কি এখন টিস্যু এগিয়ে দেব নাকি?”
মেহের এবার মরিয়া হয়ে রুদ্রর সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। “ক্যাপ্টেন সাহেব, আমি আমার বাচ্চার প্রাণ ভিক্ষা চাইছি। আমি মাত্র ছয়টা মাস সময় চাই। তারপর ডিভোর্স দিয়ে চলে যাব। প্লিজ আমাকে সাহায্য করুন!”
ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চলে এল। ঘরটা আলোয় ঝলমল করতেই রুদ্র একদিকের ভ্রু তুলে মেহেরের দিকে তাকাল। সে তার হাতের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বলল— “দেখো, ক্যাপ্টেন রুদ্র লাভের গুড় ছাড়া পিঁপড়েও ধরে না। তোমাকে শেল্টার দেব, আমার বাড়িতে নাটক করবে, তাতে আমার লাভ কী?”

মেহের তড়িঘড়ি করে বলল— “আমার সব সম্পত্তির ৫১ পার্সেন্ট আপনাকে লিখে দেব।”
রুদ্র মনে মনে হাসল। যার নিজের কয়েকটা মাল্টি-মিলিয়ন ডলারের বিজনেস আছে, তার কাছে ৫১ পার্সেন্ট সম্পত্তি একটা কৌতুক মাত্র। কিন্তু মেহেরের জেদটা তাকে বেশ আমোদ দিচ্ছে। সে গাম্ভীর্য ধরে রেখে বলল— “তা ওই মাল-কড়ি কবে পাব?”
“২১ বছর বয়স হলে অটোমেটিক আমার নামে হয়ে যাবে তখন আমি আপনাকে দিয়ে দিব। আর এই কয়েকমাস আমার পেছনে আপনার যা খরচ হবে, সব শোধ করে দেব।” মেহের জানে তার মেজো ভাই মাশফি তাকে নিশ্চয়ই উদ্ধার করবে। ভিসা হলেই সে বিদেশে পাড়ি দেবে, শুধু এই কটা দিন একটু সেফ জোন দরকার।
রুদ্রর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে শয়তানি হাসি ফুটল। সে সোফায় হেলান দিয়ে বলল—
“ওকে, ডিল। তবে সম্পত্তির ৫১ না, ৭০ পার্সেন্ট লাগবে। বেশি হয়ে গেল? আচ্ছা যাও, ডিসকাউন্ট দিলাম—৬৫ পার্সেন্ট। রাজি?”

মেহের দমে গিয়ে মাথা নাড়ল। রাজি না হয়ে উপায় নেই। সে বিছানার ওপর রাখা একটা ‘বাটার নাইফ’ হাতে নিয়ে রুদ্রর দিকে তাক করল। “আপনি সোফায় শোবেন, আমি বেডে। এক কদমও এগোবেন না!”
রুদ্র অট্টহাসি দিয়ে মেহেরের হাত থেকে তুড়ি মেরে ছুরিটা কেড়ে নিল। “আগে অস্ত্র ধরা শিখুন মিসেস ক্যাপ্টেন। এই খেলনা দিয়ে একটা রগও কাটা যাবে না। আর শোনো, আমাকে দেখে কি ফুটপাথের লোক মনে হয়? আমি বেডেই শোব।”
মেহেরের চোখ দুটো গোল গোল হয়ে গেল। রুদ্র ছুরিটা দূরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে হাই তুলে বলল—

“আরে বাবা, ভয় পেও না। আমি মাউন্ট এভারেস্ট জয় করার টার্গেটে আছি, তোমার এই ছোটখাটো… মেহেরের রক্তচক্ষু দেখে কথা মুহূর্তের মধ্যে ঘুরিয়ে ফেলল। তুমি ওই পাশে ঘুমাও, আমি এপাশে। মাঝখানে বালিশের দেয়াল তুলে দিচ্ছি, খুশি?”মেহের জেদ ধরে সোফাতেই জড়োসড়ো হয়ে বসে রইল। রুদ্রর সাথে একই বিছানায় শোয়া তো দূর, তার ছায়া মাড়াতেও মেহেরের ঘৃণা হচ্ছে। রুদ্র নির্বিকার ভঙ্গিতে বিছানায় গা এলিয়ে দিলেও মেহেরের অস্থিরতা তার নজর এড়ালো না। আধো-অন্ধকারে মেহের দেখল রুদ্র চোখ বুজে আছে, যেন দুনিয়ার কোনো দুশ্চিন্তা তাকে স্পর্শ করে না।
রাত তখন প্রায় আড়াইটা। মেহের সোফার এক কোণে মাথা রেখে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল, কিন্তু পেটের ভেতর এক অদ্ভুত অস্বস্তি আর পিঠের ব্যথায় তার বারবার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল। ওদিকে রুদ্রর হঠাৎ ঘুমটা পাতলা হয়ে এল। পাইলটদের একটা সহজাত গুণ থাকে—চারপাশের সামান্যতম নড়াচড়াও তারা টের পায়।
রুদ্র চোখ খুলে দেখল মেহের সোফায় গুটিসুটি মেরে পড়ে আছে। তার লাল বেনারসিটা সোফার হাতলে আটকে গেছে, আর মুখটা যন্ত্রণায় কুঁচকে আছে। রুদ্র উঠে বসল। তার চোখেমুখে সেই চিরচেনা তাচ্ছিল্য থাকলেও মনের কোথাও একটা খচখচানি বিঁধল।
সে ধীরপায়ে মেহেরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মেহেরের ফ্যাকাসে মুখ আর চোখের নিচে জমে থাকা শুকনো জলের দাগ দেখে রুদ্রর মনে হলো এই মেয়েটা আসলেই এক অদ্ভুত জেদি। এই ‘অ্যারোফোবিয়া গার্ল’ সে নিচু হয়ে মেহেরের কাঁধে হাত রাখল।
মেহের চমকে চোখ মেলল। সামনে রুদ্রকে দেখে সে সোফায় আরও সেঁটে গেল। কাঁপা গলায় বলল,

“খবরদার! আমি বলেছি না আমি এখানেই শোব!”
রুদ্র একদিকের ভ্রু কুঁচকে একটা শীতল হাসি দিল। “শোনোন মিসেস জেদি মহিলা ,আমার সোফাটা বেশ দামি। তোমার ওই কান্নাকাটি আর ছটফটানিতে সোফার স্প্রিং নষ্ট করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। আর প্রেগন্যান্ট অবস্থায় এভাবে বাঁকা হয়ে শুলে তোমার বাচ্চার হাড়গোড়ও তো বাঁকা হয়ে যেতে পারে। তখন তো আমার ৬৫ পার্সেন্ট সম্পত্তি উদ্ধার করা মুশকিল হয়ে যাবে, তাই না?”
মেহের রাগে গজগজ করে উঠল। “আপনার ওই সম্পত্তির চিন্তা ছাড়া আর কোনো চিন্তা নেই? আমি এখানেই ঠিক আছি।”
রুদ্র এবার মেহেরের হাতটা শক্ত করে ধরল। তার স্পর্শে এক অদ্ভুত জোর ছিল, কিন্তু কোনো রুক্ষতা ছিল না। সে মেহেরকে প্রায় টেনে দাঁড় করিয়ে দিল।

“যাও, বিছানায় গিয়ে শোও। আমি সোফাতেই ঘুমাব। আমার ট্রেনিং পিরিয়ডে আমি এর চেয়েও বাজে জায়গায় রাত কাটিয়েছি। তোমার মতো সফট জন্য সোফা নয়।”
মেহের অবাক হয়ে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে রইল। এই লোকটা কি তাকে পরোয়া করছে? নাকি এটা তার নতুন কোনো চাল? রুদ্র তাকে একরকম ঠেলে বিছানার দিকে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেই সোফায় গিয়ে গা এলিয়ে দিল। মেহের বিছানায় গিয়ে বসল, কিন্তু তার চোখ রুদ্রর ওপর আটকে রইল।
রুদ্র হাত দিয়ে মেহেরকে ইশারা করল শুয়ে পড়ার জন্য। তারপর চোখ বুজে নিস্পৃহ গলায় বলল—

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৯

“বেশি ভেবো না। কাল সকাল থেকে কিন্তু অনেক বড় অভিনয় করতে হবে। ‘পারফেক্ট কাপল’ সাজতে হবে সবার সামনে। এনার্জি বাঁচিয়ে রাখো সুইটহার্ট।”
মেহের বালিশে মাথা রাখল। বাইরে বৃষ্টির শব্দ তখনো থামেনি। মেহের ভাবল, এই মানুষটা আসলে কী? এক মুহূর্তে সে সম্পত্তির ভাগ চায়, অন্য মুহূর্তে সে নিজের আরাম ত্যাগ করে সোফায় শোয়। ক্যাপ্টেন রুদ্র আসলেই এক রহস্যময় ধ্রুবতারা, যার কক্ষপথ বোঝা মেহেরের সাধ্যের বাইরে।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১১