Home প্রিয় জারুলফুল প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১২

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১২

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১২
সাদিয়া সাদু

‘বাড়ির কাজের মেয়ের সাথে এতো‌ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক করার মানে কি দিগন্ত । জারুল এর সাথে তোর কি সম্পর্ক? ওই মেয়ের একটা বাচ্চা আছে তুই জানোস। তারপরও তুই অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করছিস । এই শিক্ষা দিয়েছি আমি ।‌’
দিগন্ত মায়ের কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে ।
তার মা তাকে কি বলছে ‘অবৈধ সম্পদ স্থাপন করছে ‘ তার নিজের বিয়ে করা স্ত্রীর সাথে কথা বলা ও অবৈধ!
_’ আমার সাথে তার কোনো অবৈধ সম্পর্ক নেই সে আমার বিয়ে করা বৈধ স্ত্রী । আর মেয়েটাও আমার , আমার বাচ্চা আর স্ত্রীকে নিয়ে কোনো উল্টাপাল্টা কথা বলবা না আম্মু । ‘
দীনা বেগম স্তব্ধ হয়ে যায় ‌। নির্বাক পলকহীন দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ছেলের পানে।জিভ গিয়ে তালুতে ঠেকেছে ।‌ মগজে ঘুরপাক খাচ্ছে দিগন্ত বলা কথা গুলো দীনা
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে শুকনো ঠোঁট জোড়া বহু কষ্টে খোলে অস্পষ্ট স্বরে বলল ।

_’ তোদের বিয়ে হয়েছে ! ‘
_’ হে , আর তুমি বললে না এই বাড়ির কাজের লোক । পরিস্থিতি আজ এইখানে নিয়ে এসেছে আম্মু। মানুষ জন্ম থেকে কারো দাসত্বে বেড়ে উঠে না , সমাজ আর পরিস্থিতি এমন নির্মম জায়গাই ঠেলে দেয় ।’
দিগন্তের কাট কাট উত্তরে চরম অবাক হলো দীনা কোনো দ্বিধা দ্বন্দ্ব নেই । কোনো সংকোচ নেই একদম স্পষ্ট ভাষায় সব বলে দিচ্ছে । তাহলে এই সম্পর্ক লুকিয়ে রাখার মানে কি ? দীনা নিজের মনের প্রশ্নটা উগলে দেয় ।
‘আমার কাছে সব শিখার করছিস তাহলে এইভাবে লুকিয়ে রেখেছিস কেনো ? তোর সামনে কি করে তোর স্ত্রী তোর রাজত্বে দাসী হয়ে থাকতে পারে ? ‘
‘ অনেক কিছু আছে আম্মু যা তুমি আমি জানি না শুধু মাত্র জারুল জানে । কিন্তু এইটা বলতে পারবো আজ থেকে ছয় বছর আগে আমাদের বাড়ির একজন না বহুজন জানি না কিন্তু আমাদের বাড়ির মানুষজন আমাদের আজ এই পরিস্থিতে নিয়ে এসেছে। ‘
দীনা কপালের দুই পাশের শিরায় চেপে ধরে বিছানায় বসে পড়ে ‌।

‘ এতো কাহিনী আমার অজানা ! আমার ছেলে বিয়ে করেছে আমি জানলাম না ।
এবং কি তার একটা ছয় বছরের মেয়েও আছে ‌! ‘
অভিমানে পুড়ছে মনটা । তার ছেলে তাকে না জানিয়ে বিয়ে করে নিয়েছে এইটা যেনো তিনি মানতে পারছে না ।
দিগন্ত এস্ত পায়ে মায়ের দিকে এগিয়ে যায় ।
কাঁধ ছুঁয়ে ধরতেই দীনা নিজে মুচড়ে সরে পড়ে ‌। মায়ের এহেম কাণ্ডে ব্যথাতুর দৃষ্টিতে
তাকায়। সেও মুখটা কাঁদো কাঁদো করে ফেলল ‌। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল ।‌
_’ আম্মু শুনো না‌ । তোমার নাতনি একদম তোমার মতো হয়েছে জানো । তার দিকে তাকিয়ে আমাদের মাফ করে দাও নাহহহ ।‌ও আম্মুওওওও শুনো না । ও হাফিজ সাহেবের তিন নাম্বার ছাগলের বাচ্চা শুনো নাহহহ। ‘
তাৎক্ষণিক তেতে উঠল দীনা । কিড়মিরিয়ে ছেলের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল । আগের সকল কথা ভুলে পায়ে থাকা স্যান্ডেল খুলতে খুলতে দিগন্ত হরবরিয়ে বের হতে নেয় ‌ । দীনা প্রাণপণ জোরে জুতাটা নিক্ষেপ করলো দিগন্তের দিকে ‌ । রাগে খটমট করতে করতে বলল ।

_’ তুই পাগলের বাচ্চা ছাগলের বাচ্চা ‌ । তোর চৌদ্দ গুষ্টি ছাগলদের বাচ্চা সাহস কত্ত আমার বাবারে ছাগল বলে । দাঁড়া তুই । ‘
দিগন্ত আর দাঁড়ায় না বড় বড় পায়ে হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসে ‌ । যাক অপারেশন সাকসেসফুল । বেরিয়ে দুই কক্ষ পেরিয়ে আসতেই মনে পড়ে মা যদি কাউকে বলে দেয় ‌! সর্বনাশ । দিগন্ত আবারো দৃঢ় পায়ে মায়ের রুমের দিকে এগিয়ে যায় চৌকাঠ পেরিয়েছে একটু জ্বালাতন করে দুষ্টমি করে
‘ আসসালামুয়ালাইকুম মাননীয় স্পিকার আপনার কাছে আমার বিনীত অনুরোধ আজকের কথাগুলো কাউকে বলবেন না।
যদি না বলেন তাহলে আজ থেকে আমি
আপনাকেও জ্বালাব না ‘
দিগন্ত আর দাঁড়ায় না , দাঁড়ি কমা ব্যবহার না করে এক শ্বাসে কথাগুলো বলে এক দৌড় । দীনাও ছেলের দিকে তাকিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে বিছানায় বসে পড়ে । একটু আগের কথা অর্ধেক তার মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে ।

রাতের খাবার বানাতে ব্যস্ত জারুল।
এক হাতেই রান্নার কাজ করছে সে । দীনা সন্ধ্যা থেকে ঘরে খিল দিয়েছে । তাই জারুল কেই একা হাতে করতে হচ্ছে সব ।
দিগন্তের পছন্দের খিচুড়ি আর ডিম ভাজা , ইলিশ ভাজা করতে বলে গিয়েছে জহুরা তার সাথে জহুরা খানের জন্য ভুনা মাংস আর পরোটা । জারুল গরম পানী প্যানে বসিয়ে পরোটার জন্য ডো তৈরি করতে ব্যস্ত ঠিক সেই সময় জিসা হুড়মুড়িয়ে প্রবেশ করে জারুল এর হাত চেপে ধরে । বলল
‘ তুই এই বাড়ির কাজের মেয়ে হয়ে মালিকের সাথে এতো ঢলাঢলি করিস কেন ? এতো জ্বালাপোড়া কেন শরীরে ? ”
হঠাৎ কারো উপস্থিতি আর হাত চেপে ধরায় হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে জারুল ।
রিয়েকশন দিতেও ভুলে গেছে সে ।
রুটির থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সামনে কটমট করে তাকিয়ে থাকা জিসার দিকে এক পলক শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবারো আগের ন্যায় রুটি বানানো যে মনযোগ দেয় ‌।
জারুল এর এমন নির্লিপ্ততা দেখে আগের থেকে দিগুন রাগে কাঁপতে শরীর ।
সে আবারো জারুল এর ব্যস্ত হাত ধরে ধাক্কা মারে , জারুল আগের ন্যায় শান্ত মুখাবয়ব ।
কিছু বলছেও না করছেও না সে চুপচাপ জিসা কে দেখে যাচ্ছে ।
জিসা এইবার জারুল এর দিকে তাকিয়ে রাগে হিসহিসিয়ে বলল ।

_’ তুই দিগন্তের সাথে এতো ঢলাঢলি করিস কেন ? তুই এই বাড়ির কাজের লোক , চাকরানি নট আ রাজরানী । সেই স্থান ভুলে মনিবের সাথে ঢলাঢলি করিস । লজ্জা লাগে না তোর ? প্রেমিকের বাসায় কাজের লোক হয়ে আছিস । সবার পায়ের নিচে স্থান তোর । পায়ের নিচেই থাকবি । ফারদার যদি দেখেছি তোদের একসাথে তো খবর আছে বলে দিলাম । ‘
জারুল এবার অত্যন্ত শান্ত মুখে নিচু স্বরে বলল ।
— “কাজের লোক? হ্যাঁ, আজ আমি এই বাড়ির কাজের লোক। তবে মনে রাখিস , এটি আমার পরিচয় নয়, এটি আমার জীবনের সাময়িক এক অধ্যায় মাত্র। মানুষের ভাগ্যকে কখনো তার বর্তমান অবস্থান দিয়ে বিচার করতে নেই।
ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখ। হুররাম সুলতানা একদিন সুলতান সুলেমানের প্রাসাদে একজন দাসী ছিলেন। কেউ তার নাম জানত না, কেউ তার ভবিষ্যৎ কল্পনাও করতে পারেনি। কিন্তু সেই দাসীই একদিন সুলতানের হৃদয়ের সবচেয়ে মূল্যবান মানুষ হয়ে উঠেছিলেন, সাম্রাজ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারীদের একজন হয়েছিলেন।
তাই আজ আমাকে ‘কাজের লোক’ বলে তুচ্ছ করছিস । আজ আমি খান পরিবারের চোখে একজন সামান্য পরিচারিকা, কিন্তু আগামীকাল কী লেখা আছে আমার ভাগ্যে, তা তুই, আমি কিংবা এই পৃথিবীর কেউ জানে না।

সময় বড়ই অদ্ভুত জিনিস। সে রাজাকে ভিখারি বানাতে পারে, আবার ভিখারিকেও সম্মানের আসনে বসাতে পারে। তাই আমার আজকের অবস্থান দেখে অহংকার কোরো না।
হয়তো আজ আমি এই বাড়ির মেঝে মুছি, সবার প্রয়োজন পূরণ করি, নীরবে অপমান সহ্য করি। কিন্তু এমন একদিনও আসতে পারে, যেদিন এই বাড়ির মানুষগুলো আমার নাম ধরে বাঁচার প্রার্থনা করবে। যেদিন আমি এই পরিবারের প্রয়োজন হয়ে উঠব, তাদের ভরসা হয়ে উঠব, তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কারণ হয়ে উঠব।
কারণ মানুষকে তার পোশাক, কাজ কিংবা অবস্থান দিয়ে বিচার করা যায় না; বিচার করতে হয় তার ধৈর্য, তার আত্মসম্মান এবং তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা শক্তি দিয়ে।
তাই আবার বলছি, হ্যাঁ, আজ আমি এই বাড়ির কাজের লোক। কিন্তু কাল আমি কী হব, তা নির্ধারণ করার অধিকার তোর নেই। সেই অধিকার একমাত্র সময়ের। আর সময় যখন উত্তর দেয়, তখন সবচেয়ে উঁচু মাথাগুলোও নত হয়ে যায়। এমন ও হতে পারে আমার থেকে ভয়ংকর অবস্থা তোর হতে পারে তাই সাবধান ভালো কাজ কর । ‘
হুঁশিয়ার স্বরুপে কথা বলে জায়গা থেকে প্রস্থান করে জারুল । জহুরার চায়ের কাপ হাতে নিয়ে নিরবে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে ।

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১১

‘ওই মেয়েকে আর তার নানী সালমা খাতুনকে দুইজনকে মেরে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দে । কোনো প্রকার চিহ্ন যেনো না থাকে সাবধান আর এই কথাটা জিসাও যেনো জানতে না পারে । কালকের ভিতর আমি যেনো কাজ স সাকসেসফুল দেখি
এই বান্দির বাচ্চার জন্ম দেওয়া খান কোনো বংশ বেড়ে উঠবে ন’
বাকি কথা বলায় আগেই বাড়ির থেকে বিকট শব্দে ঝনঝনিয় কাঁচের কাফ পড়ায় শব্দে হকচকিয়ে যায় জহুরা বেগম ।

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৩