আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২০ (২)
সাবিলা সাবি
হিয়া ডিভানের এক কোণায় গিয়ে ধপ করে বসে পড়ল। সারাদিনের ক্লান্তি শরীরে থাকলেও চোখেমুখে তার চিরচেনা দুষ্টুমি এখনও অটুট। দুই হাঁটু ভাঁজ করে বসে আঙুলের ডগা দিয়ে ডিভানের হাতলে অন্যমনস্কভাবে টোকা দিতে লাগল। লিওন কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ওর প্রতিটি ভঙ্গি নীরবে লক্ষ্য করছিল। কক্ষের ভেতর কয়েক মুহূর্ত নীরবতা বিরাজ করল। তারপর হিয়া ঠোঁট গোল করে গম্ভীর মুখে বলল,
— “আই’ম হাংরি।”
লিওন ভ্রু কুঁচকে তাকাল। চোখে স্পষ্ট বিস্ময়।
— “কী?”
হিয়া মুখটা আরও একটু ফুলিয়ে শান্ত গলায় বলল,
— “রাতে ডিনার করিনি আমি।”
কথাটা বলেই সে সরাসরি লিওনের চোখে চোখ রাখল। অভিযোগের সুর আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
— “কেমন মানুষ তুমি! একবারও জিজ্ঞেস করলে না আমি রাতে খেয়েছি কি না।”
লিওন চোখ বন্ধ করে ধীরে একটা নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর কপালে হাত বুলিয়ে অসহায় গলায় বলল,
— “এত রাতে আমি খাবার কোথা থেকে আনব?”
হিয়া চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে আবার তার দিকে ফিরল। ভঙ্গিটা এতটাই স্বাভাবিক, মনে হলো প্রশ্নটার উত্তর খুব সহজ।
— “কেন? তোমাদের বাড়ির কিচেনে কি খাবার নেই?”
— “আছে।”
— “তাহলে?”
— “ফ্রিজে রাখা। সব ঠান্ডা হয়ে গেছে।”
হিয়া কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্বিকার গলায় বলল,
— “তাহলে গরম করে আনো।”
লিওন এবার দু’হাত বুকের ওপর ভাঁজ করল। চোখেমুখে বিরক্তি ফুটে উঠলেও গলাটা শান্তই রইল।
— “আমাকে কি তোমার সার্ভেন্ট মনে হয়?”
— “আমি নিজের জন্য এক গ্লাস পানিও ঢেলে খাই না।”
হিয়ার ঠোঁটের কোণে সঙ্গে সঙ্গে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। সে একটু সামনে ঝুঁকে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
— “হাহ! আমার ওই টানেলের আস্তানায় তোমাকে কী রাজকীয় আপ্যায়নটাই না করেছি! একদম প্রিন্স ট্রিটমেন্ট দিয়েছিলাম।”
তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে মাথা সামান্য নত করে ডান হাতটা সামনে বাড়িয়ে দিল।
— “আর আমার জন্য সামান্য একটু খাবারও আনতে পারবে না?”
সে কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলল,
— “আচ্ছা, শাহজাদা… আপনি বসুন। আমি নিজেই নিয়ে আসছি।”
কথা শেষ করেই ডিভান থেকে উঠে দাঁড়াতে গেল হিয়া।
লিওন মুহূর্তের মধ্যেই এগিয়ে এল। আলতো কিন্তু দৃঢ়ভাবে হিয়ার কব্জি চেপে ধরে তাকে আবার বসিয়ে দিল। কণ্ঠস্বর নিচু, কিন্তু সতর্কতা স্পষ্ট।
— “পাগল হয়ে গেছ?”
হিয়া বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
লিওন দরজার দিকে একবার তাকিয়ে গলা আরও নামিয়ে বলল, “আমার বড় আপু এখনো জেগে আছে।”
একটু থেমে আবার বলল,
— “এই সময় তুমি বাইরে বের হলে যদি আপু দেখে ফেলেন, তাহলে এমন কাণ্ড হবে যে তোমাকে ধরার আগে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে।”
হিয়া চোখ টিপে দুষ্টু হেসে বলল, “তাহলে কী করবে, অফিসার?”
লিওন কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বিরক্তি ধরে রাখার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “বসে থাকো।”
ঘুরে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে নিচু স্বরে বিড়বিড় করল, “নিয়ে আসছি খাবার।”
দরজা খুলে লিওন বাইরে বেরিয়ে যেতেই হিয়া ঠোঁট কামড়ে হাসিটা চাপার চেষ্টা করল। তারপর আরাম করে ডিভানের পিঠে হেলান দিয়ে বসে দুই হাত মাথার পেছনে গুঁজে দিল। চোখেমুখে দুষ্টু তৃপ্তি স্পষ্ট।
“বাজপাখিটা যতই রাগ দেখাক… শেষ পর্যন্ত আমার কথাই শুনল।”
রুম থেকে বেরিয়ে দরজাটা আলতো করে টেনে বন্ধ করতেই লিওন সতর্ক দৃষ্টিতে করিডোরের দুই পাশ একবার দেখে নিল। চারপাশ নিস্তব্ধ। নিচতলা থেকে ক্ষীণ আলো ভেসে আসছে। ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে সোজা কিচেনের দিকে এগিয়ে গেল সে।
কিচেনে ঢুকেই ফ্রিজ খুলে একে একে খাবারের বক্সগুলো বের করল। ঠান্ডায় জমে থাকা খাবারগুলো মাইক্রোওভেনের ভেতরে ঢুকিয়ে বোতাম চাপতেই যন্ত্রটা মৃদু গুঞ্জন তুলে চলতে শুরু করল। দুই হাত রান্নাঘরের কাউন্টারে রেখে দাঁড়িয়ে লিওন বিরক্ত মুখে নিজের সঙ্গেই বিড়বিড় করে উঠল,
— “জীবনে কোনোদিন কিচেনে পা রাখিনি।”
একটু থেমে ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা হাসে বললো “সিআইডি অফিসার হয়ে এখন একজন ক্রিমিনালের জন্য আমাকে খাবার গরম করতে হচ্ছে। পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য বললে ভুল হবে, এটা পৃথিবীর নবম আশ্চর্যের মধ্যে একটা।”
মাইক্রোওভেনের ভেতরে খাবার ঘুরতে থাকল। লিওন মাথা নেড়ে অসহায় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “আর কী কী করতে হবে ইন ফিউচারে, কে জানে!”
কয়েক মুহূর্ত পর বিপ শব্দ হতেই সে গরম খাবারগুলো বের করে সাবধানে প্লেটে সাজিয়ে নিল। পানি ভরা গ্লাস, চামচসহ সবকিছু পরিপাটি করে একটি ট্রেতে গুছিয়ে রাখল। ট্রেটা হাতে তুলে আবার নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে নিজের রুমের সামনে এসে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল।
ডিভানে আধশোয়া হয়ে থাকা হিয়া খাবারের গন্ধ পেতেই মুহূর্তে সোজা হয়ে বসল। চোখ দুটো চিকচিক করে উঠল, মুখে ফুটে উঠল চাপা উচ্ছ্বাস। তার সমস্ত মনোযোগ গিয়ে আটকালো লিওনের হাতে ধরা ট্রের দিকে।
লিওন ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ডিভানের সামনে রাখা ছোট টেবিলের ওপর ট্রেটা নামিয়ে রাখল। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দুই হাত কোমরে রেখে ক্লান্ত গলায় বলল,— “নাও, এবার খেয়ে আমাকে উদ্ধার করো তাড়াতাড়ি।”
হিয়া ট্রেটা নিজের দিকে একটু টেনে নিল। তারপর একটি প্লেট হাতে তুলে নিয়ে আরাম করে ডিভানে হেলান দিল। দুই পা তুলে সামনের সেন্টার টেবিলের ওপর রাখল। এভাবেই বসতে তার স্বস্তি লাগে। প্লেট থেকে এক চামচ খাবার তুলে মুখে দিতেই লিওনের চোখ বড় হয়ে গেল।
এক পা এগিয়ে কপাল কুঁচকে বলল,
—”হেই ইউ! পা নামাও, বেয়াদব! খাবারের সময় কেউ এভাবে খায়? টেবিলে কেনো পা রেখেছ? সুন্দর করে বসো।”
হিয়া ধীরেসুস্থে খাবার চিবিয়ে গিলে নিল। তারপর মাথা তুলে লিওনের দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি।
— “কেনো? আমি তো পার্সোনাল টাইমে এভাবেই খাই। এটাই আমি। তোমার সামনে ভণিতা করার কী আছে? আমি এভাবেই কমফোর্টেবল।”
লিওন গভীর শ্বাস ফেলল।বিরক্তিতে চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। আঙুল তুলে বললো
— “আমার সামনে এসব ম্যানারলেস কাহিনী চলবে না। সুন্দর করে পা নামিয়ে বসো। টেবিলে খাবার রেখে তারপর খাও।”
হিয়া এক ভুরু উঁচু করল। চোখে দুষ্টু ঝিলিক। চামচটা আঙুলের ফাঁকে ঘুরিয়ে একবার নিজের পায়ের দিকে, আরেকবার লিওনের মুখের দিকে তাকাল।
অবশেষে লিওনের কথা রাখতে সে সোজা হয়ে বলো আর খ বার টেবিলে রাখলো। হিয়া ধীরেসুস্থে খেতে শুরু করল। প্রথম লোকমাটা মুখে দিয়েই তার চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে এল। গরম ভাতের সঙ্গে মসলার ঘ্রাণ, ঘরোয়া রান্নার সেই পরিচিত স্বাদ—সবকিছু বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে নরম একটা অনুভূতি ছুঁয়ে দিল। চামচটা নামিয়ে হালকা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
— “উফ… কতদিন পর… কত বছর পর বাড়ির খাবার খাচ্ছি।”
কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠে আগের সেই দুষ্টুমি ছিল না। ছিল একরাশ প্রশান্তি।
আরেক চামচ খাবার তুলে মুখে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— “এগুলো কে রান্না করেছে?”
লিওন দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। শান্ত গলায় উত্তর দিল,— “আমার মা।”
হিয়ার হাত থেমে গেল। বিস্ময়ে চোখ বড় করে লিওনের দিকে তাকিয়ে হাসল।— “আন্টি রান্না করেছেন? তাই তো বলি এত ইয়াম্মি কীভাবে! সাত বছর পর কোনো এক মায়ের হাতের রান্না খাচ্ছি।”
শেষ কথাটা বলেই কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল সে। তারপর নিজের অস্বস্তিটা হালকা করতে ঠোঁটে আবার হাসি টেনে আনল।
— “সবসময় কিনে আনা খাবারই খাই। তবে এই খাবার যদিও ঝাল একটু বেশি… তবে হ্যাঁ, বলতে হবে এত ডিলিশিয়াস!”
বলতে বলতেই সে আর থামল না। একটার পর একটা পদ চেখে দেখল। প্লেটের ভাত, তরকারি, সবজি কিছুই আর অবশিষ্ট রইল না। লিওনের মা বাঙালি তাই সে বাড়িতে বাঙালিয়ানা পদের রান্নাবান্না করে বেশিরভাগ সময়ে। এদিকে হিয়া যে মেয়েটা প্রতিদিন হিসেব করে খায়, ডায়েটের বাইরে এক চামচ খাবারও বাড়ায় না, সেই মেয়েটাই আজ কোনো নিয়মের কথা মনে রাখল না।
সবশেষে গ্লাসভর্তি পানি এক নিঃশ্বাসে শেষ করে তৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে লিওনের দিকে তাকাল।
— “এতো ভালো খাবারের জন্য থ্যাংকস।”
হিয়া পানির গ্লাসটা টেবিলে রাখতেই হঠাৎ—রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে দরজায় নক করার শব্দ ভেসে এল।
লিওনের মুখের রঙ মুহূর্তেই পাল্টে গেল। সে দ্রুত দরজার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,
— “শিট…”
বাইর থেকে পরিচিত নারীকণ্ঠ শোনা গেল।
— “লিওন? দরজা খোল?”
অ্যামেলিয়া।
এক সেকেন্ডও দেরি করল না লিওন। দ্রুত হিয়ার দিকে ফিরে ফিসফিস করে বলল,— “লুকাও। এখনই!”
হিয়া চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে সোজা বারান্দার দিকে পা বাড়াল। ঠিক তখনই লিওন তার কব্জি চেপে ধরে থামিয়ে দিল।
— “বারান্দায় নয়। ভুলেও না।”
হিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল।— “তাহলে?”
— “এদিকে এসো।”
আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে লিওন তাকে প্রায় টেনে নিয়ে গেল বিশাল কাঠের আলমারিটার সামনে। দরজা খুলে ভেতরে একটু জায়গা করে দিল।
— “এখানে ঢোকো।”
— “আমি আলমারির ভেতরে—”
— “পরে তর্ক কোরো। এখন ঢোকো।”
কথা শেষ হওয়ার আগেই লিওন হিয়াকে আলতো জোরে ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। হিয়া কিছু বলার আগেই আলমারির দরজাটা আস্তে করে বন্ধ হয়ে গেল।
চারদিকটা অন্ধকার আলমারির। বদ্ধ জায়গাটায় প্রথম কয়েক মুহূর্ত হিয়ার অস্বস্তি লাগল। শ্বাসটা একটু ভারী হয়ে এল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই অনুভূতির জায়গা দখল করল অন্য কিছু।
আলমারির প্রতিটি তাকজুড়ে লিওনের জামাকাপড় সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা। ধোয়া কাপড়ের পরিষ্কার গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে তার পরিচিত পারফিউমের মৃদু সুবাস। গন্ধটা এতটাই স্পষ্ট যে মনে হচ্ছে লিওন নিজেই খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে।
অজান্তেই হিয়া পাশ থেকে একটা সাদা শার্ট টেনে নিল। নরম কাপড়টা আঙুলের ফাঁকে চেপে ধরে ধীরে নাকের কাছে আনল। পরিচিত সেই ঘ্রাণ বুকভরে টেনে নিয়ে চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ করল।
ঠিক তখনই বাইরে দরজার লক খোলার শব্দ ভেসে এল। লিওন দরজা খুলে দাঁড়াতেই অ্যামেলিয়া কোনো আনুষ্ঠানিকতার অপেক্ষা না করে সোজা ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল।
দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ হতেই অ্যামেলিয়া উৎকণ্ঠিত মুখে লিওনের দিকে তাকাল। রাত অনেক হয়েছে, তবু তার চোখে ঘুমের কোনো চিহ্ন নেই। কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট।
— “আপু, কী হয়েছে? এত রাতে তুমি আমার রুমে?”
অ্যামেলিয়া ঠোঁট ভিজিয়ে ধীরে বলল,
— “লিওন… রুদ্রনীল এখনো বাড়ি ফেরেনি। ওকে ফোনেও পাচ্ছি না। তুই একটু দেখ না, ভাই।”
রুদ্রনীল।
নামটা কানে পৌঁছাতেই আলমারির ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা হিয়ার শরীর শক্ত হয়ে গেল। আঙুলের ফাঁক থেকে শার্টটা প্রায় পিছলে যাচ্ছিল। বুকের ভেতর ধুকপুকানি আচমকা বেড়ে উঠল। এই একটি নাম তার অতীতের বহু অন্ধকার একটা স্মৃতি, ঘৃণা আর অস্বস্তিকে একসঙ্গে জাগিয়ে তোলে।
সে নিঃশ্বাস আটকে কান খাড়া করে রইল।
লিওন শান্ত থাকার চেষ্টা করল।
— “রুদ্র ব্রো হয়তো কোনো মিটিংয়ে আছে।”
হিয়া চোখ বন্ধ করল। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ ভাবল।
রুদ্রনীল… তাহলে এটা হয়তো লিওনের বোনের জামাই। পৃথিবীতে একই নামের মানুষ তো অনেকই থাকে। অকারণে আতঙ্কের কোনো মানে হয় না।নিজেকেই এই বলে শান্ত করার চেষ্টা করল সে।
এদিকে অ্যামেলিয়ার উদ্বেগ একটুও কমল না।
— “সেদিনও বাড়ি ফেরেনি। বলল, তোকে খোঁজার জন্য নাকি দৌড়াদৌড়ি করছে। আজকে তাহলে কোথায় গেল? আর তাছাড়া আমি ওকে বললাম, চলো বাংলাদেশ ফিরে যাই। কিন্তু ওই বলছে না, আরো কিছুদিন থাকবে।”
লিওন হালকা নিঃশ্বাস ফেলল।
— “সমস্যা কী তাতে? থাক কিছুদিন। কত মাস পরে এসেছো, এখনই চলে যাবে নাকি? আর লন্ডনে এত চিন্তা কিসের? সিআইডি অফিসারের বোন জামাইয়ের গায়ে কে হাত দেবে বলো? কার এত সাহস?”
আলমারির ভেতরে দাঁড়িয়ে হিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে ফিসফিস করল,—”উফ… এই ম্যাগনেসিয়ামটা যাচ্ছে না কেন!”
কথাটা মুখ ফসকে বেরোতেই নিজের জিভে নিজেই হালকা কামড় বসাল।
— “ছিঃ, ছিঃ, হিয়া! ওটা তোর হবু ননাস। তাকে এভাবে গালি দেওয়া মোটেও ঠিক হয়নি… কিন্তু এই মালটা যাবে কখন?”
নিজের কথাতেই মুখ কুঁচকে বিরক্তি সামলানোর চেষ্টা করল হিয়া।
বাইরে লিওন একের পর এক রুদ্রনীলের নম্বরে কল দিল। প্রতিবারই একই ফল। ফোনটা নামিয়ে অ্যামেলিয়ার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,
— “তুমি ঘরে যাও আপু। আমি দেখছি।”
অ্যামেলিয়া অসহায় দৃষ্টিতে একবার ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাল। তারপর ধীরে মাথা নেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দরজাটা আবার বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো ঘর নীরবতায় ডুবে গেল।
অ্যামেলিয়ার পায়ের শব্দ করিডোরের শেষ প্রান্তে মিলিয়ে যেতেই লিওন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কয়েক সেকেন্ড দরজার পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থেকে নিশ্চিত হলো, আশপাশে আর কেউ নেই। তারপর আস্তে করে দরজাটা লক করে ঘুরে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি সোজা গিয়ে থামল আলমারির দিকে।
— “বেরিয়ে আসো।”
কথাটা বলেই সে নিজেই আলমারির হাতলে হাত রাখল খোলার উদ্দেশ্য। ঠিক সেই মুহূর্তেই ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা হিয়াও বুঝে গেল, বিপদ আপাতত কেটে গেছে। আর এক সেকেন্ডও ওই অন্ধকার জায়গায় থাকতে ইচ্ছে করছিল না তার। সেও ভেতর থেকে দরজাটা ঠেলে খুলে দিল। ফলাফল যা হওয়ার, তাই হলো।
দুজনের টানে আলমারির দরজা একসঙ্গে খুলে গেল। হিয়া সামনের দিকে ভারসাম্য হারিয়ে প্রায় আছড়ে পড়ল। লিওনের প্রতিক্রিয়া ছিল বিদ্যুতের মতো দ্রুত। সে এক ঝটকায় দু’হাত বাড়িয়ে হিয়াকে সামলে নিল।
পরের মুহূর্তেই দুজনের মাঝখানের দূরত্ব সম্পূর্ণ হারিয়ে গেল।
হিয়ার কপাল এসে ঠেকল লিওনের কাঁধে। দুই হাত অজান্তেই শক্ত করে চেপে ধরল তার শার্টের কাপড়। আর লিওনের একটি হাত হিয়ার পিঠে, অন্য হাত কোমরের পাশে তাকে পড়ে যাওয়া থেকে আগলে রেখেছে।
কয়েকটি দীর্ঘ মুহূর্ত কেউই নড়ল না।শুধু দুজনের দ্রুত ওঠানামা করা শ্বাস একই নীরবতায় মিশে রইল।
হিয়া ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল। এত কাছ থেকে লিওনের মুখ সে খুব কমই দেখতে পায় ভাগ্যের জোরে।
এদিকে লিওনের চোখে বিরক্তির ছাপ থাকলেও স্বস্তিটাও স্পষ্ট—হিয়াকে পড়তে দেয়নি।
লিওন ধীরে ধীরে হিয়ার কোমর থেকে হাত সরিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। নিজের শার্টটা ঠিক করতে করতে বিরক্ত মুখে তার দিকে তাকাল।
— “খালি আমাকে টাচ করার বাহানা খুঁজে বেরাও তুমি।”
হিয়া ভ্রু উঁচু করল। তারপর দুই হাত বুকের কাছে গুটিয়ে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু এক হাসি টেনে বলল,
— “অ্যাকসিডেন্টলি তোমার ওপর পড়েছি।”
একটু থেমে মাথাটা সামান্য কাত করল। চোখদুটো সরাসরি লিওনের চোখে স্থির।
— “তবে হ্যাঁ… এমন অ্যাকসিডেন্টলি যদি তোমার গায়ের ওপর… ঠোঁটের ওপর পড়া যায়, তাহলে আমি বারবার এমন দুর্ঘটনায় পড়তে রাজি আছি।”
কথাটা শেষ করেই সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল, পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক কথাটাই বলেছে এমন ভাব করলো।
লিওন কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে, অথচ চোখের গভীরে এক ঝলক অপ্রস্তুত ভাব স্পষ্ট। এই মেয়েটা কীভাবে প্রতিবার এত স্বাভাবিক মুখে এমন সব কথা বলে ফেলে, তার কোনো উত্তর আজও খুঁজে পায়নি সে।
শেষ পর্যন্ত গলা খাঁকারি দিয়ে দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে বলল,— “তোমার মুখে কোনো ব্রেক নেই?”
হিয়া হেসে ফেলল। — “তোমার সামনে তো একদমই কাজ করে না।”
লিওন বিরক্তির ভান করে মাথা নাড়ল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপালে হাত ঠেকাল।
— “হে আল্লাহ.. এই মেয়েটাকে সামলানোর জন্য আলাদা ট্রেনিং দেওয়া উচিত ছিল।”
হিয়ার হাসি আরও গাঢ় হয়ে উঠল। লিওনের মুখের বিরক্তি যত বাড়ে, তাকে খোঁচা দেওয়ার আনন্দও তত বেড়ে যায়।
অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। সোফার এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে ছিল হিয়া। ঘরজুড়ে নীরবতা। দূরে দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে লিওন বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে ল্যাপটপে কাজ করে চলেছে। আঙুলের ছোঁয়ায় দ্রুত কিবোর্ডের বোতামগুলো চাপা পড়ছে, মাঝেমধ্যে ভ্রু কুঁচকে কোনো রিপোর্ট পড়ছে, আবার কিছু টাইপ করছে। রাত যত গভীর হয়েছে, চোখের ক্লান্তিও তত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
একসময় কাজ করতে করতেই তার মাথাটা ধীরে ধীরে একপাশে হেলে পড়ল। খোলা ল্যাপটপটা এখনও কোলে, কিন্তু মানুষটা ঘুমিয়ে গেছে।
হিয়া অনেকক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল। জানালার কাঁচ ভেদ করে ভোরের ম্লান আলো ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকছে। তার এবার চলে যাওয়ার সময় হয়েছে। কিন্তু বারান্দা দিয়েবের হওয়া যাবেনা এখন আর। আবার লিওনের ঘুমও ভাঙাতে ইচ্ছে করছে না তার।
কিছুক্ষণ ইতস্তত করে শেষ পর্যন্ত ধীরে ধীরে বিছানার কাছে এগিয়ে এল সে। ঘুমন্ত লিওনকে দেখলে হিয়ার ভেতরটা নরম হয়ে যায়। জেগে থাকলে এই মানুষটা তার সামান্য স্পর্শেও আপত্তি জানায়, বিরক্ত হয়, চোখ রাঙায়। কিন্তু ঘুমের মধ্যে সেই কঠিন মুখটাতেও একরাশ শান্তি নেমে আসে।
জেগে থাকলে যে মানুষটা তাকে সামান্য স্পর্শ করতে দেয় না চুমু তো দূরের কথা, কাছেও ঘেঁষতে দেয় ন সেটাই এই ঘুমন্ত লিওনের কাছে এসে পুরোপুরি বদলে যায়। অচেতন লিওন তার সব কঠোরতা ভুলে হিয়ার দেওয়া সেই মিষ্টি চুমুগুলো অত্যন্ত সাদরে, কোনো বাধা ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজের করে নীরবে গ্রহণ করে নেয়।
আর এই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া না করে হিয়া একটু নিচু হয়ে এল। মুখের কোণে ছোট্ট এক চিলতে হাসি।
ঠিক তখনই লিওনের চোখ হঠাৎ খুলে গেল। দুজনের মুখের দূরত্ব ছিল মাত্র কয়েক ইঞ্চি। চমকে উঠে লিওন দ্রুত সোজা হয়ে বসে বলল,— “কি করতে যাচ্ছিলে?”
ধরা পড়েও হিয়ার মুখে লেশমাত্র অস্বস্তি নেই।
সে নির্বিকার গলায় বলল,— “রিল্যাক্স। শুধু একটু আলতো চুমু খেতে চেয়েছিলাম।”
লিওনের কপাল কুঁচকে গেল।— “লিসেন, যখন তখন এভাবে তুমি আমাকে চুমু দেবে না। বলে দিলাম।”
হিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা হাসল।— “বুঝেছি।”
তারপর জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,— “ভোর হয়ে গেছে। আমাকে ফিরতে হবে।”
কথাটা শুনেই লিওনের ঘুম একেবারে কেটে গেল। সে দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। শার্টটা ঠিকমতো গায়ে চড়িয়ে নিল। রাতেই টাওয়েলের বদলে প্যান্ট পরে নিয়েছিল, তাই তৈরি হতে আর সময় লাগল না।
নিচু গলায় বলল,— “চলো। তোমাকে বের করতে হবে।”
দুজন নিঃশব্দে কক্ষ থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল। বাড়ির সবাই তখনও ঘুমিয়ে। প্রধান ফটকের কাছে পৌঁছে লিওন হিয়াকে দেয়ালের আড়ালে দাঁড়াতে ইশারা করল।— “এখানেই থাকো।”
হিয়া মাথা নাড়ল শুধু।
লিওন কয়েক কদম এগিয়ে গার্ডদের ডাকল। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আলাদা কিছু নির্দেশ দিতে লাগল, যেন অন্য কোনো কাজের কথাই বলছে। কথা বলার ফাঁকেই খুব সূক্ষ্মভাবে হাত নাড়ল।
ইশারাটা বুঝতে হিয়ার এক মুহূর্তও লাগল না।
সে নিঃশব্দে গেট পেরিয়ে রাস্তায় চলে এল। খানিকটা দূরে গিয়ে দাঁড়াল। ইভানা আশপাশেই ছিল রাত থেকে, যে কোনো মুহূর্তে বাইক নিয়ে পৌঁছে যাবে। ঠিক সেই সময় একটি কালো গাড়ি ধীরে ধীরে লিওনদের বাড়ির ভেতরে ঢুকল।
গাড়ির কাঁচ অর্ধেক নামানো। ভেতরে বসা মানুষের মুখ পুরোপুরি দেখা গেল না। শুধু আবছা এক ঝলক।
সেই এক ঝলকই হিয়ার বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।তার চোখ বড় হয়ে গেল।
মুখের রক্ত মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে এলো। মনে হলো… এই গাড়ির মানুষটাকে সে চেনে।
কিন্তু সে কিভাবে হবে ?
ভাবনাটা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই বুকের ভেতর অকারণ এক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। বহুদিনের চাপা পড়ে থাকা কোনো অশুভ স্মৃতি মনে হলো হঠাৎ তার সামনে দিয়ে হেঁটে গেল। সে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল গাড়িটার দিকে।
ঠিক তখনই পেছন থেকে মোটরবাইকের পরিচিত শব্দ ভেসে এলো। ইভানা এসে তার পাশে ব্রেক কষল।
রাতভর সে আশপাশেই নজর রাখছিল। হিয়াকে দেখেই হেলমেটটা সামান্য খুলে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
— “চলুন মিস্ট্রেস। এখান থেকে এখনই বের হতে হবে।”
হিয়াকে নিরাপদে বের করে দিয়ে লিওন ধীর পায়ে বাড়ির ভেতরে ফিরলো। বুকের ভেতর জমে থাকা চাপা টানটা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। আর একটু হলেই আজ বড় ধরনের বিপত্তি ঘটে যেত।
প্রধান দরজা পেরিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই সে দেখল, রুদ্রনীল সবেমাত্র সোফায় বসেছে। ভ্রমণের ক্লান্তি স্পষ্ট হলেও মুখে সেই চেনা শান্ত হাসি। পাশে ট্রাভেল ব্যাগটা রাখা।
লিওন এগিয়ে গিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
— “রুদ্র ব্রো! কোথায় ছিলেন আপনি? আপু সারারাত টেনশনে ছিল। এভাবে রাতে বাইরে না থাকলে হয় না?”
রুদ্রনীল মৃদু হেসে কাঁধে আলতো চাপ দিল। — “সরি, লিওনার্দো। হঠাৎ নতুন একটা প্রজেক্ট পেয়ে গেলাম। পুরো রাত সেটার কাজ নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। ফোনটা সাইলেন্টে ছিল, তাই কারও কলও দেখতে পারিনি।”
একটু থেমে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
— “আমি অ্যামেলিয়াকে সব বুঝিয়ে বলব। চিন্তা কোরো না।”
তার ঠোঁটে আশ্বাসের কোমল হাসি ফুটে উঠল।
—”তোমার বোনকে আমি কখনো কষ্ট দেব না।”
লিওনের মুখের টান কিছুটা নরম হলো। সে মাথা নেড়ে বলল,— “জানি, ব্রো। কিন্তু আপু আপনাকে নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করে। তাই একটু রাগও হয়েছে।”
রুদ্রনীল হালকা হেসে ব্যাগটা তুলে নিল। — “রাগ করার অধিকার ওর আছে। এবার আগে ওকে গিয়ে শান্ত করি।”
কথা শেষ করে সে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। লিওন কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে নিজের কক্ষের দিকে হাঁটতে লাগল।
তার মাথায় তখনও ঘুরছে ভোরের সেই কয়েকটা মিনিট… আর সেই একরোখা মেয়েটার মুখ, যে বিদায় নেওয়ার আগমুহূর্তেও তাকে চুমু খাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল।
নিজের কক্ষে ফিরে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করল লিওন। ঘরটা আগের মতোই আছে। বিছানা, ডিভাইন, টেবিল, খোলা ল্যাপটপ সবকিছু ঠিক একই জায়গায়। তবু মনে হচ্ছে কিছু একটা বদলে গেছে।
সে ধীরে ধীরে বিছানায় গিয়ে বসল। ল্যাপটপের স্ক্রিন এখনও জ্বলছে। কাজের ফাইল খোলা, কিন্তু সেদিকে আর মন বসল না। ক্লান্ত শরীর বিছানায় হেলান দিলেও চোখে একফোঁটা ঘুম নেই।
রাতের প্রতিটি মুহূর্ত বারবার ভেসে উঠছে।
হিয়ার অবিরাম বকবক, বিনা অনুমতিতে পা তুলে বসে খাবার খাওয়া, জেদ করে খাবার আদায় করা, আলমারির ভেতরে লুকিয়ে থাকা… আর তার চেয়েও বড় কথা, বিছানায় ঠিক যেভাবে সে নিজের পুরো শরীরের ওজন লিওনের ওপর ছেড়ে দিয়েছিল। মনে পড়ছে সেই তীব্র মুহূর্তগুলো হিয়া তার ওপর পুরোপুরি চেপে শুয়ে লিওনের মাথার দুপাশে দুই হাত রেখে নিজের আঙুলের ভাঁজে তার আঙুলগুলো শক্ত করে গুঁজে দিয়েছিল। গালের খাঁজে সেই দীর্ঘ, উষ্ণ চুমু, আলতো কামড়ের আবেশ আর নিখুঁত শরীরী খেলায় সিডিউস করার চেষ্টা… সবকিছু এখনও তার ত্বকে স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছে।
লিওন বিরক্ত হয়ে চোখ বন্ধ করল।
— “ইম্পসিবল গার্ল…”
বিড়বিড় করে কথাটা বলেই কপালে হাত বুলিয়ে নিল।
ঘরের চারদিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখল সে।
কেন জানি সবকিছু আজ অস্বাভাবিক রকমের নিস্তব্ধ লাগছে। কয়েক ঘণ্টা আগেও এই ঘরেই একটানা কারো কথার শব্দ ছিলোআর এখন চারদিকে শুধু নীরবতা। তার বুকের ভেতর অকারণ এক শূন্যতা এসে বসে আছে।
ভাবনাটা মাথায় আসতেই লিওন বিরক্ত হয়ে সোজা হয়ে বসল।— “হোয়াট দ্য হেল, লিওনার্দো!”
নিজেকেই ধমক দিল সে।
মাত্র কয়েক ঘণ্টা। তাও সেই কয়েক ঘণ্টায় মেয়েটা তাকে শান্তিতে এক মিনিটও থাকতে দেয়নি। উল্টো বিরক্ত করেছে, জ্বালিয়েছে, মাথা খারাপ করে দিয়েছে।
আর কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে অ্যারেস্টও করা হবে।
একজন কুখ্যাত অপরাধীকে নিয়ে তার মাথায় এসব উদ্ভট চিন্তা আসছে কেন? চোয়াল শক্ত হয়ে গেল লিওনের।
না…এটা স্বাভাবিক কিছু নয়। ওর মানসিক অবস্থায় কোনো সমস্যা হচ্ছে। ওই ধূর্ত মেয়েটা ইচ্ছা করেই সারাক্ষণ স্পর্শ আর অদ্ভুত আচরণ দিয়ে তার মনোযোগ নষ্ট করেছে। এটাই ছিল ওর কৌশল মানুষকে ম্যানিপুলেট করা।
কিন্তু লিওনের সমস্যাটা কেবল মস্তিষ্কের ছিল না—তার নিজের শরীরটাই মনে হচ্ছে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। হিয়ার সেই উন্মাদ মাদকতাময় স্পর্শের স্মৃতি লিওনের পেশিতে এমন এক গভীর ঘোরে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, যা সে কিছুতেই মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছিল না। হিয়াকে নিয়ে মনের ভেতর তৈরি হওয়া সেই তীব্র আর উত্তপ্ত অনুভূতিগুলো বারবার তার পুরুষত্বকে নাড়া দিচ্ছিল, এক ধরনের শিহরণ জাগানো শারীরিক চাহিদা তার সত্ত্বাকে গ্রাস করতে চাইছিল। অথচ একজন কঠোর পেশাদার সিআইডি অফিসার হিসেবে সে কিছুতেই স্বীকার করতে চাইছিল না যে, ওই খ্যাপাটে মেয়েটার প্রতি তার শরীর আর মন হর্নি আকর্ষণে ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছে। নিজের ভেতরের এই অবচেতন দুর্বলতাকে সে জোর করে চেপে রাখতে চাইল।
লিওন গভীর শ্বাস নিয়ে মাথা ঝাঁকাল। — “তুমি একজন সিআইডি অফিসার। আর সে একজন ক্রিমিনাল। এর বাইরে আর কিছুই নয়।”
কথাটা কয়েকবার মনে মনে আওড়াল সে।
কিন্তু সেই কথাগুলোও আজ নিজের কাছেই খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না।
ভোরের আলো মিলিয়ে যেতে না যেতেই আবার সন্ধ্যা নেমে এলো।
শহরের আকাশ ধূসর অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে। একে একে জ্বলে উঠছে রাস্তার লাইট। বাইরে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও, আড়ালে শুরু হয়ে গেছে আরেকটি খেলার প্রস্তুতি।
হিয়া টাউন হাউসের কন্ট্রোল রুমে বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ স্থির করে রেখেছে। তার সামনে ছড়িয়ে আছে কয়েকটি মনিটর, ডিজিটাল ম্যাপ আর লাইভ ট্র্যাকিং সিস্টেম।
সেদিন ওই মেয়েটার মাধ্যমে ওই গেস্টের গাড়িতে লাগিয়ে দেওয়া ক্ষুদ্র ট্র্যাকারটি এখনও নিখুঁতভাবে কাজ করছে।
ট্র্যাকারের সঙ্গে সংযুক্ত মাইক্রো অডিও ডিভাইস থেকে ভেসে আসা প্রতিটি শব্দ মনোযোগ দিয়ে শুনছিল হিয়া।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটি তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
— “অবশেষে…”
সে নিচু স্বরে বিড়বিড় করল। আসাদ খান তার নারীপাচার চক্রের জন্য কোন রুট ব্যবহার করছে, কোথা থেকে মেয়েদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, কোন কোন গাড়ি ব্যবহার হবে, কোথায় গাড়ি বদলানো হবে—একটার পর একটা তথ্য পরিষ্কার হয়ে উঠতে লাগল। এই রুটের সঙ্গে যুক্ত আছে সেই গেস্ট নিজেও।
একটি গুরুত্বপূর্ণ চালান আজ রাতেই সীমান্তের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। হিয়া সঙ্গে সঙ্গে ল্যাপটপের স্ক্রিন ঘুরিয়ে দানিয়েলের দিকে তাকাল।
দানিয়েল ইতিমধ্যেই টেবিলের ওপর লন্ডনের ডিজিটাল ম্যাপ খুলে রেখেছে। পাশে বসে আছে ইভানা, মার্ক, জ্যাক আর সংগঠনের আরও কয়েকজন সদস্য।
রুমের পরিবেশ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে উঠল।
দানিয়েল ম্যাপের নির্দিষ্ট কয়েকটি জায়গায় লেজার পয়েন্টার ছুঁইয়ে শান্ত গলায় বলতে শুরু করল,
— “এটাই ওদের প্রথম রুট। এখান থেকে কনভয় বের হবে।”
লাল বিন্দুটা একটু সরিয়ে সে আবার বলল,
— “এই জায়গায় প্রথম গাড়ি বদলাবে। তারপর এই রাস্তা ধরে ডকইয়ার্ডে পৌঁছাবে।”
আরেকটি পয়েন্টে থেমে তার কণ্ঠ আরও দৃঢ় হয়ে উঠল। — “আমাদের প্রথম টিম এখানে রাস্তা ব্লক করবে। সেই টিমের লিডার হবে মার্ক আর জ্যাক। আর দ্বিতীয় টিম পেছনের সব বিকল্প পথ বন্ধ করবে সেখানে লিডার থাকবে ইভানা। তৃতীয় টিম সরাসরি কন্টেইনার ইয়ার্ডে ঢুকে মেয়েদের নিরাপদে বের করে আনবে আর তৃতীয় টিমের লিডার হিসেবে থাকবে ভাইপার নিজেই।”
ঘরের সবাই মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি নির্দেশ শুনছে।
দানিয়েল একে একে পুরো অপারেশনের ধাপগুলো ব্যাখ্যা করতে লাগল। কে কোথায় থাকবে, কখন আক্রমণ শুরু হবে, কোন সংকেতের পর পরবর্তী টিম এগোবে—সবকিছু নিখুঁতভাবে সাজানো।
হিয়া একটিও কথা বলল না। দুই হাত বুকের সামনে ভাঁজ করে শুধু ম্যাপটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার চোখে তখন এক ধরনের ঠান্ডা দৃঢ়তা। আজকের রাত শুধু কয়েকজন নিরীহ মেয়েকে উদ্ধার করার রাত নয়। আজকের রাত আসাদ খানের সাম্রাজ্যে প্রথম বড় আঘাত হানার রাত।
এক রাতেই তার কোটি কোটি টাকার চালান ধ্বংস হয়ে যাবে।শুধু তাই নয়…
অপারেশন সফল হলে তার নারীপাচার চক্রের গোপন তথ্যও পৌঁছে যাবে সংবাদমাধ্যমের হাতে।আগামী সকালের প্রতিটি সংবাদমাধ্যমে একটাই নাম ঘুরে বেড়াবে—আসাদ খান।
হিয়া ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।তার চোখে কঠিন দীপ্তি। — “আজকের রাতের পর আসাদ খান বুঝবে… একজন শিকার যখন শিকারি হয়ে ফিরে আসে, তখন হিসাবটা কতটা ভয়ংকর হতে পারে।”
একই সময়ে লন্ডন সিআইডি হেডকোয়ার্টারের কনফারেন্স রুমে জরুরি বৈঠক চলছে।
দীর্ঘ টেবিলের চারপাশে বসে আছেন একাধিক সিনিয়র অফিসার। দেয়ালের বিশাল ডিজিটাল স্ক্রিনে ভেসে আছে বিভিন্ন অপরাধচক্রের তথ্য, লোকেশন ম্যাপ, সন্দেহভাজনদের ছবি আর অপারেশনাল রিপোর্ট।
কক্ষের পরিবেশ গম্ভীর। প্রত্যেকের চোখ স্থির হয়ে আছে লিওনের দিকে। লিওন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। হাতে থাকা রিমোটের একটি বোতাম চাপতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল ভাইপার, আয়মান খান এবং দানিয়েলের ফাইল।
তার কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু আত্মবিশ্বাসে ভরপুর।
— “আয়মান খান আর ভাইপারের সংযোগ খুব কাছাকাছি। আমি নিশ্চিত, ওরা বড় কিছু পরিকল্পনা করবে।”
সে স্ক্রিনের দিকে একবার তাকিয়ে আবার সহকর্মীদের দিকে ফিরে বলল,— “আমাদের শুধু ওদের পরবর্তী একটা চাল জানতে হবে। মাত্র একটা।”
লিওন টেবিলের ওপর দুই হাত রেখে দৃঢ় গলায় যোগ করল, — “ওদের পরবর্তী মুভ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পেলেই আমি আয়মান খান আর ভাইপার দুজনকেই গ্রেপ্তার করাতে পারব।”
কয়েক সেকেন্ড থেমে স্ক্রিনে হিয়ার ছবির দিকে তাকাল সে। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।— “আর হিয়া ওরফে ভাইপার! গ্রেপ্তার হলেই দানিয়েলকে ধরতে আমাদের আর কোনো সমস্যাই হবে না।”
একজন সিনিয়র অফিসার প্রশ্ন করলেন,— “তোমার কি মনে হয়, ওরা খুব শিগগিরই আবার কোনো অপারেশনে নামবে?”
লিওন বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে উত্তর দিল,— “অবশ্যই। ভাইপার কখনো দীর্ঘদিন চুপচাপ বসে থাকে না। ও যতক্ষণ নীরব থাকে, ততক্ষণ আরও বড় কিছু পরিকল্পনা করে।”
সে স্ক্রিনে ভেসে থাকা লাল চিহ্নিত কয়েকটি লোকেশনের দিকে ইশারা করল।— “সব ইউনিটকে হাই অ্যালার্টে রাখা হয়েছে। ইনফর্মাররাও মাঠে কাজ করছে। এবার ওরা যতই সতর্ক থাকুক… একটা না একটা ভুল করবেই।”
তার চোখে কঠিন দৃঢ়তা ফুটে উঠল।— “আর সেই একটিমাত্র ভুলই হবে ওদের পতনের শুরু।”
মিটিং শেষ হওয়ার পরও লিওনের মাথা থেকে সাত বছর আগের কেসটা এক মুহূর্তের জন্যও সরল না।
ফাইলটা সে আগেই ঘেঁটেছিল। দুপুরের দিকেই বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে হিয়াদের পুরোনো ঠিকানায় কয়েকজন কর্মকর্তাকে পাঠিয়েছিল প্রাথমিক অনুসন্ধানের জন্য।
কিছুক্ষণ পর ভিডিও কলে রিপোর্ট আসে। লিওন মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি তথ্য শুনছিল।
ওপাশ থেকে জানানো হলো, হিয়াদের বাড়িটি বহু বছর ধরেই পরিত্যক্ত। সাত বছর আগে পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর পর আর কেউ সেখানে বসবাস করেনি। সময়ের সঙ্গে বাড়িটা ধীরে ধীরে জীর্ণ হয়ে গেছে। চারপাশে আগাছা জন্মেছে, দরজা-জানালাও প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল অন্যটি। বাড়ির পাশেই ছোট একটি পারিবারিক কবরস্থান রয়েছে।
সেখানে পাশাপাশি চারটি কবর। রিপোর্ট শুনে লিওনের দৃষ্টি ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠল।
সে কয়েক সেকেন্ড নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে বলল,
— “আমি পরবর্তী ধাপের অনুমতি দিচ্ছি।”
ওপাশের কর্মকর্তা বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
— “স্যার… আপনি কি নিশ্চিত?”
লিওনের উত্তর এলো একদম স্থির স্বরে।— “হ্যাঁ। আইনগত সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কবরগুলো খননের ব্যবস্থা করুন। প্রতিটি কঙ্কালের ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে।”
কথা শেষ করে সে টেবিলের ওপর রাখা হিয়ার পুরোনো ছবিটার দিকে তাকাল। তার চোখে তখন তদন্তকারীর নির্মম স্থিরতা।— “যদি হিয়ার ডিএনএ ওই কবরগুলোর কোনো একটির সঙ্গে মিলে যায়… তাহলে এতদিন ধরে পৃথিবী একজন মৃত মানুষকে খুঁজছে।”
এক মুহূর্ত থেমে আবার বলল,— “আর যদি না মেলে…”
তার কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে এল।— “তাহলে প্রমাণ হয়ে যাবে, সাত বছর আগে যাকে মৃ/ত ঘোষণা করা হয়েছিল… সে এখনও জীবিত। আর সেই সত্য প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই কেসের সবচেয়ে বড় রহস্যের পর্দা সরে যাবে।”
কক্ষের ভেতর নীরবতা নেমে এলো। লিওন ধীরে ধীরে ফাইলটা বন্ধ করল। তার তদন্ত এখন এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখান থেকে হয় সাত বছর আগের ইতিহাস নতুন করে লেখা হবে… নয়তো সাত বছরের সবচেয়ে বড় মিথ্যেটা প্রকাশ্যে চলে আসবে।
রিপোর্টের পর রিপোর্ট চোখ বুলাতে বুলাতে হঠাৎ একটি ফাইলের ওপর এসে থেমে গেল লিওনের দৃষ্টি।
ফাইলের প্রথম পাতায় স্পষ্ট অক্ষরে লেখা—ইশতিয়াক খান।
নামটার নিচে সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে অসংখ্য সফল অপারেশনের বিবরণ, সম্মাননা, পদক এবং প্রশংসাপত্র।
লিওন ধীরে ধীরে ফাইলের পাতাগুলো উল্টাতে লাগল। যতই পড়ছে, তার ভ্রূ ততই কুঁচকে আসছে।
ইশতিয়াক খান শুধু একজন সিআইডি অফিসার ছিলেন না, বাংলাদেশের অন্যতম দক্ষ ও সম্মানিত সিআইডি কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন। দেশের সবচেয়ে জটিল অপারেশনগুলোর নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। বহু দুর্ধর্ষ অপরাধীকে আইনের আওতায় এনেছেন। অসংখ্য হাই-প্রোফাইল কেস অবিশ্বাস্য দ্রুততার সঙ্গে সমাধান করার রেকর্ড রয়েছে তার। অফিসিয়াল নথির প্রায় প্রতিটি মূল্যায়নেই একই কথা লেখা—”তিনি কখনো কোনো মিশনে ব্যর্থ হননি।”
লিওন চেয়ারের পিঠে হেলান দিয়ে কয়েক মুহূর্ত নীরবে বসে রইল।তারপর নিচু স্বরে নিজেকেই বলল,
— “এমন একজন মানুষ… যার পুরো ক্যারিয়ার সততা, দক্ষতা আর সাফল্যে ভরা… তিনি কীভাবে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন?”
প্রশ্নটার কোনো উত্তর মিলল না।সে আবার পরের পাতায় চোখ রাখল।সেখানে বড় করে লেখা—
“আসাদ খান।”
ইশতিয়াক খানের আপন বড় ভাই।
নামটা পড়তেই লিওনের চোখে চিন্তার ছায়া আরও গাঢ় হয়ে উঠল।সে কয়েক মুহূর্ত নীরবে সবকিছু মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করল।
— “আসাদ খান বহু বছর ধরে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যুক্ত আছেন…”
বাকিটুকু নিজের মনেই শেষ করল সে।
হয়তো ভাইয়ের কারণেই ইশতিয়াক খান কোনো একসময় এই অন্ধকার জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন।
অথবা…
নিজের আপন ভাইকে রক্ষা করার জন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ তদন্তে তিনি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন।
লিওন ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
না।
এ মুহূর্তে এগুলো শুধু সম্ভাবনা। কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট প্রমাণ এখনো তার হাতে নেই।
একজন সিআইডি অফিসার হিসেবে প্রমাণের আগেই কাউকে দোষী ভাবার সুযোগ নেই।
তবু একটি প্রশ্ন বারবার তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে—
একজন কিংবদন্তি সিআইডি অফিসারের জীবন কীভাবে এমন এক রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে গেল, যার ছায়া সাত বছর পরও এতগুলো মানুষের জীবনকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে?
সেই উত্তরই হয়তো এই কেসের সবচেয়ে বড় সত্য উন্মোচন করবে।
ফাইলটা বন্ধ করেই লিওন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কয়েক মুহূর্ত এদিক-সেদিক হাঁটার পর হঠাৎ রওশনের ডেস্কের সামনে এসে থামল। রওশন তখন কম্পিউটারে একটি রিপোর্ট টাইপ করতে ব্যস্ত।
লিওন শান্ত গলায় বলল,— “রওশন, তোমার পরিচিত কোনো ভালো সাইকিয়াট্রিস্ট আছে?”
কীবোর্ডে চলতে থাকা রওশনের আঙুল হঠাৎ থেমে গেল। সে ধীরে ধীরে মুখ তুলে লিওনের দিকে তাকাল। তারপর চোখ দুটো গোল করে এমন ভঙ্গি করল, যেন জীবনের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য কথাটা এইমাত্র শুনেছে।
ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল,— “কেন স্যার… আপনার আবার মাথায় গণ্ডগোল হলো নাকি?”
লিওনের ভ্রু কুঁচকে গেল। রওশন থামল না।
— “ওই ক্রিমিনাল লাভার গার্লের চিন্তায় আবার মানসিক অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন নাকি? নাকি প্রেম রোগে পড়েছেন?”
কথা শেষ হতেই লিওন কড়া দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল।
— “রওশন।”
একটা শব্দই যথেষ্ট ছিল।
রওশন সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর মুখ করার চেষ্টা করল, যদিও ঠোঁটের কোণে চাপা হাসিটা তখনও রয়ে গেছে।
লিওন দৃঢ় স্বরে বলল,— “তোমাকে যা জিজ্ঞেস করেছি, সেটার উত্তর দাও।”
রওশন আর মজা না করে ডেস্কের ড্রয়ার খুলে একটি ভিজিটিং কার্ড বের করল। কার্ডটা লিওনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
— “উনি আমার খুব ক্লোজ বন্ধু। দেশের অন্যতম ভালো সাইকিয়াট্রিস্ট। চাইলে ওনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।”
লিওন কার্ডটা হাতে নিয়ে একবার চোখ বুলাল। তারপর নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, — “আমার জন্য নয়। আমি একদম ঠিক আছি।”
একটু থেমে কার্ডটা কোটের ভেতরের পকেটে রেখে যোগ করল,— “এটা অন্য কারও জন্য।”
লিওনের শেষ কথাটা শুনে রওশনের কৌতূহল আরও বেড়ে গেল।তবে এবার সে আর কোনো প্রশ্ন করল না।
কারণ সে জানে, লিওন নিজে থেকে যতটুকু বলে, তার বেশি কিছু জোর করে বের করা যায় না।
রাত নেমেছে অনেক আগেই।
শহরের এক নির্জন শিল্পাঞ্চলের পরিত্যক্ত গুদামঘরের ভেতর টানটান উত্তেজনা। বিশাল হলঘরজুড়ে বড় বড় এলইডি স্ক্রিনে ভেসে উঠছে বিভিন্ন লোকেশন, রুট ম্যাপ, স্যাটেলাইট ইমেজ আর লাইভ ট্র্যাকিং ডেটা। একের পর এক অস্ত্র, কমিউনিকেশন ডিভাইস ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম শেষবারের মতো পরীক্ষা করছে সবাই।
হলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে হিয়া।
কালো ট্যাকটিক্যাল পোশাকে তাকে আজ আরও দৃঢ়, আরও অপ্রতিরোধ্য লাগছে। কোমরে গুঁজে রাখা আগ্নেয়াস্ত্র, কানে ক্ষুদ্র ইয়ারপিস, হাতে ডিজিটাল ট্যাব—সবকিছুই জানিয়ে দিচ্ছে, আজকের রাতটা অন্যরকম হবেই।
তার সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে সম্পূর্ণ টিম।
বস দানিয়েল, ইভানা এবং বাকি সদস্যদের চোখেমুখে একই রকম কঠোর মনোযোগ। কারও ঠোঁটে হাসি নেই, কারও ভঙ্গিতে একটুও শৈথিল্য নেই। প্রত্যেকেই জানে, আজকের মিশনের একটি ভুল পদক্ষেপ অসংখ্য নিরপরাধ নারীদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
হিয়া ধীরে ধীরে সবার দিকে তাকাল। তার দৃষ্টিতে ছিল অদম্য আত্মবিশ্বাস, আর কণ্ঠে কঠিন দৃঢ়তা।
— “সবাই প্রস্তুত?”
একসঙ্গে ভেসে এল দৃঢ় উত্তর—— “ইয়েস, মিস্ট্রেস।”
হিয়া শেষবারের মতো ডিজিটাল স্ক্রিনে রুট ম্যাপের দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটি হাসি ফুটে উঠল।
আজকের রাতেই আসাদ খানের বহু বছরের সাজানো সাম্রাজ্যে প্রথম বড় আঘাত হানার সময় এসে গেছে।
এদিকে সিআইডি হেডকোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে সরাসরি গাড়ি চালিয়ে একটি আধুনিক মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে এসে থামল লিওন।
রওশনের দেওয়া ভিজিটিং কার্ডে লেখা ঠিকানার সঙ্গে মিলিয়ে একবার ভবনটার দিকে তাকিয়ে সে ভেতরে প্রবেশ করল।
রিসেপশন পেরিয়ে নির্দিষ্ট কেবিনের সামনে পৌঁছাতেই দরজা খুলে ভেতর থেকে একজন ভদ্রলোক মৃদু হেসে বললেন,
— “অফিসার লিওন, কাম ইন।”
লিওন খানিকটা অবাক হয়ে ভেতরে ঢুকল।চেয়ারে বসতে বসতেই প্রশ্ন করল, — “ডক্টর, আপনি কীভাবে জানলেন আমি আসছি?”
ডাক্তার হালকা হেসে বললেন,— “রওশন একটু আগেই ফোন করেছিল। আপনার কথা জানিয়েছে।”
লিওন মাথা নাড়ল। ডাক্তার সামনে রাখা নোটপ্যাড বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালেন।
— “আচ্ছা, শুরু থেকেই শুরু করি। ওখানে আরাম করে শুয়ে পড়ুন।”
লিওন ভ্রু কুঁচকে তাকাল।— “শুতে হবে?”
— “রিল্যাক্সেশন থেরাপির সময় অনেকেই শুয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অবশ্য আপনি চাইলে বসেও বলতে পারেন।”
কয়েক সেকেন্ড ভেবে লিওন গিয়ে বেডে শুয়ে পড়ল।
ডাক্তার চেয়ার টেনে তার কাছাকাছি বসলেন।
— “বলুন, কী নিয়ে কথা বলতে চান?”
লিওন কিছুক্ষণ নীরব রইল। চোখ ছাদের দিকে স্থির। ঠোঁট শক্ত করে চেপে রেখেছে।
ডাক্তার শান্ত স্বরে বললেন,— “আপনি একজন সিআইডি অফিসার, জানি। কিন্তু এই মুহূর্তে আপনি আমার পেশেন্ট। আপনার ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখা আমার পেশাগত দায়িত্ব। আপনি যা বলবেন, তা এই কক্ষের বাইরের কেউ জানবে না। রওশনও না। তাই নির্দ্বিধায় বলতে পারেন।”
লিওন ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিল।তারপর নিচু স্বরে বলল,— “একটা মেয়েকে নিয়ে…”
ডাক্তার কোনো মন্তব্য করলেন না। শুধু মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলেন।
লিওন আবার বলল,— “সে একজন ক্রিমিনাল। দেশের ওয়ান্টেড অপরাধীদের একজন। আমার দায়িত্ব তাকে গ্রেপ্তার করানো।”
একটু থেমে নিজের কথাগুলো গুছিয়ে নিল সে।
— “ওকে দেখলেই আমার রাগ হয়। ভীষণ রাগ। ও যা-ই করে, সবকিছুতেই আমাকে বিরক্ত করে। ইচ্ছে করে আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়।”
তার চোখের সামনে ভেসে উঠল রাতের সেই দৃশ্যগুলো।
হিয়ার দুষ্টুমি ভরা হাসি… চুমু দেয়া, ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে অস্বস্তিতে ফেলে দেওয়া… অবাধ্য মেয়ের মতো জেদ ধরা…আর সেই অনবরত লজ্জাহীন কথার বন্যা।
লিওন কপালে হাত রাখল।— “ওর প্রতিটা কাজ আমাকে বিরক্ত করে। কিন্তু…”
ডাক্তার শান্ত কণ্ঠে বললেন,— “কিন্তু?”
লিওন চোখ বন্ধ করল।
— “কিন্তু আজ সকালে ও চলে যাওয়ার পর আমার ঘরটা অস্বাভাবিক ফাঁকা লাগছিল। বারবার মনে হচ্ছিল… কিছু একটা নেই। কাজের মাঝেও ওর কথাগুলো মনে পড়ছে। গত রাতের প্রতিটা মুহূর্ত মাথায় ঘুরছে।”
সে বিরক্ত মুখে হালকা হাসল।— “এটা আমাকে আরও বেশি বিরক্ত করছে। কারণ এর কোনো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না।”
ডাক্তার একদৃষ্টে লিওনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তিনি কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন না, কোনো মন্তব্যও করলেন না। শুধু নোটপ্যাডে কয়েকটি শব্দ লিখে শান্ত গলায় বললেন,
— “ঠিক আছে, অফিসার লিওন। এবার আমি আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করব। উত্তরগুলো মন দিয়ে দেবেন। তারপর আমরা বুঝতে পারব, আসলে আপনার সঙ্গে কী ঘটছে।”
ডাক্তার কিছুক্ষণ নীরবে লিওনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার অভ্যাসই এমন—রোগী কথা শেষ না করা পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান না।
টেবিলের ওপর রাখা কলমটা আলতো ঘুরিয়ে তিনি বললেন,— “অফিসার লিওন, আমি আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করব। উত্তরগুলো যতটা সম্ভব সৎভাবে দেবেন।”
লিওন মাথা নাড়ল।— “জি।”
— “মেয়েটি যখন আপনাকে স্পর্শ করেছিল, তখন আপনার প্রথম প্রতিক্রিয়া কী ছিল?”
লিওন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,— “রাগ। প্রচণ্ড রাগ।”
— “শুধু রাগ?”
লিওন এবার চোখ নামিয়ে ফেলল।— “না… শুধু রাগ না। হার্টবিট বেড়ে গিয়েছিল। মাথা কাজ করছিল, কিন্তু শরীর স্বাভাবিক ছিল না। ও খুব কাছে এলে আমি অস্বস্তি অনুভব করছিলাম। আবার… দূরে ঠেলে দিতেও পারছিলাম না।”
ডাক্তার নোট নিলেন।— “এরপর?”
— “ও আমাকে কিস করেছে.. আমার ওপর শুয়েছিল… ইচ্ছা করেই আমাকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টাও করছিল। আমি বারবার নিজেকে সামলেছি।”
একটু থেমে গম্ভীর কণ্ঠে যোগ করল,— “এখনও ঘটনাগুলো মাথা থেকে বের করতে পারছি না।”
ডাক্তার আবার প্রশ্ন করলেন,— “অন্য কোনো নারী যদি একইভাবে আপনার ব্যক্তিগত পরিসরে আসে, একই অনুভূতি হয়?”
— “না।”
— “আপনার জীবনে এমন কেউ আছে, ধরুন গার্লফ্রেন্ড?”
— “না তবে আমার কাজিন আছে ওর নাম মায়া যার সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছিলো।”
— “তার হাত ধরলে, কাছে এলে, আপনার ভেতরে একই প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়?”
লিওন দৃঢ় গলায় বলল,— “কখনোই না।”
ডাক্তার মাথা নাড়লেন।— “ঠিক আছে। তাহলে বিষয়টা একটু ব্যাখ্যা করি।”
তিনি চেয়ারে আরাম করে বসলেন।
— “মানুষের মস্তিষ্কে আকর্ষণ তৈরি হওয়ার পেছনে একাধিক জৈবিক ও মানসিক প্রক্রিয়া কাজ করে। কাউকে দেখেই প্রেম হয়ে যায় বিষয়টা বিজ্ঞান এভাবে ব্যাখ্যা করে না। প্রথমে আসে দৃষ্টি আকর্ষণ, তারপর কৌতূহল, তারপর শারীরিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া। অনেক সময় বিপজ্জনক, রহস্যময় বা মানসিকভাবে চ্যালেঞ্জিং কোনো মানুষও কারও মনোযোগ অস্বাভাবিকভাবে দখল করে নিতে পারে।”
লিওন ভ্রু কুঁচকে শুনছিল।
ডাক্তার বললেন,
— “আপনার বর্ণনা অনুযায়ী আমি এখনই এটাকে ভালোবাসা বলব না। তবে ওই নির্দিষ্ট মেয়েটির প্রতি আপনার ফিজিক্যাল ডিজায়ার তৈরি হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে sexual attraction বলা হয়। এটা স্বয়ংক্রিয় মানসিক ও শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া।”
লিওনের মুখ শক্ত হয়ে গেল।— “অসম্ভব। সে একজন ক্রিমিনাল।”
— “আকর্ষণ মানুষের নৈতিক বিচার মেনে চলে না। মস্তিষ্ক আগে অনুভব করে, পরে যুক্তি খোঁজে।”
ডাক্তার একটু থামলেন।
— “তবে একটা বিষয় পরিষ্কার করে বলি। সেক্সুয়াল ডিজায়ার, ভালো লাগা, আবেগের বন্ধন আর ভালোবাসা চারটি আলাদা বিষয়। অনেক মানুষের প্রতি সাময়িক আকর্ষণ তৈরি হয়, পরে সেটা সম্পূর্ণ মিলিয়েও যায়। আবার দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকতে থাকতে বিশ্বাস আর দায়িত্ববোধ থেকে ভালোবাসা জন্মায়।”
লিওন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।— “আমার নিজের প্রতিই ঘৃণা হচ্ছে।”
ডাক্তার সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লেন।— “নিজেকে ঘৃণা করবেন না। অনুভূতি তৈরি হওয়া আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু সেই অনুভূতি অনুযায়ী কী করবেন, সেটার দায়িত্ব আপনার। মানুষকে তার অনুভূতি নয়, সিদ্ধান্ত সংজ্ঞায়িত করে।”
লিওন নীরব হয়ে রইলো।
ডাক্তার আবার বললেন,— “আপনি একজন সিআইডি অফিসার। আর তিনি আপনার তদন্তাধীন একজন অপরাধী। এই অবস্থায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো emotional bias অর্থাৎ আবেগ আপনার পেশাগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।”
— “তাহলে আমার কী করা উচিত?” লিওন প্রশ্ন করলো।
ডক্টর সরাসরি তাকে উত্তর দিলো।
— “প্রথমত, কাজের বাইরে তার সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ করবেন না।”
— “দ্বিতীয়ত, ইচ্ছাকৃত ভাবে তাকে আপনার আশপাশে থাকার কারণ তৈরি করতে দিবেন না।”
— “তৃতীয়ত, যখনই তাকে নিয়ে অকারণে ভাববেন, নিজের মনোযোগ অন্য কাজে ফেরানোর চেষ্টা করবেন।”
— “চতুর্থত, যদি দেখেন এই অনুভূতি আরও তীব্র হচ্ছে বা আপনার কাজকে প্রভাবিত করছে, তাহলে আবার থেরাপিতে আসবেন। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও নিয়মিত কাজ করা দুর্বলতার নয়, পরিণত মানুষের লক্ষণ।”
লিওন ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।— “তাহলে… আপাতত আমাকে ওকে সম্পুর্ন এড়িয়ে চলতে হবে?”
ডাক্তার শান্তভাবে উত্তর দিলেন,— “হ্যাঁ। পেশাগত প্রয়োজন ছাড়া দূরত্ব বজায় রাখুন। সময় নিন। আপনার অনুভূতিটা স্থায়ী, সাময়িক, নাকি শুধুই পরিস্থিতির প্রভাব সেটা সময় হলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।”
কক্ষজুড়ে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে এল।
আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২০
লিওন চুপচাপ উঠে দাঁড়াল। দরজার হাতলে হাত রাখার আগে একবার পেছনে তাকাল।
ডাক্তার শুধু একটি কথাই বললেন,— “অফিসার, অনুভূতির জন্য নিজেকে দোষ দেবেন না। কিন্তু অনুভূতির দায়িত্ব অবশ্যই নেবেন।”
কথাটা বুকের ভেতর গিয়ে আটকে রইল। প্রথমবারের মতো লিওনের মনে হলো, সবচেয়ে কঠিন তদন্তটা কোনো অপরাধীকে নিয়ে নয়—নিজের মনকে নিয়ে।
