Home আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২০

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২০

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২০
সাবিলা সাবি

রাত হয়ে গেছে।
টাউন হাউসের বড় গেট পেরিয়ে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল হিয়া। আজ বাড়িটা অস্বাভাবিক নিরব। দানিয়েলও হাউসে নেই। স্নিকার্স জোড়া খুলে সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমে উঠে দরজাটা বন্ধ কর হিয়া।
কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে শহরের আলো ঝলমল করছে, কিন্তু আজ সেদিকে তার মন নেই।
আজ বারবার শুধু বাবা, মা আর ছোট ভাইয়ের মুখটাই চোখের সামনে ভেসে উঠছে। অজান্তেই ঠোঁটে হালকা একটা হাসি ফুটল।
কতটা বদলে গেছে সে।
কলেজ-ভার্সিটির সেই হিয়া আর আজকের ভাইপার—দুজন একেবারে সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ।
তখন সে খুবই শান্ত স্বভাবের ছিল। একটু জোরে কেউ কথা বললেই চমকে উঠত। অচেনা মানুষের সঙ্গে কথা বলতে লজ্জা লাগত। কোনো সমস্যায় পড়লেই প্রথমে যার কথা মনে পড়ত, তিনি ছিলেন তার বাবা।
ইশতিয়াক খান।

লম্বা, সুদর্শন আর দারুণ ব্যক্তিত্বের একজন মানুষ।
একসময় তিনি বেকার ছিলেন। অনেকেই বলত, শুধু আশেপাশের না পরিবারের মানুষষও বলতো এই ছেলেকে দিয়ে কিছু হবে না। কিন্তু একজন মানুষ সবসময় তার পাশে ছিলো।
ফারহানা আহমেদ।
সবাই যখন ইশতিয়াক খানের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল, তখন সেই তার হাত ছেড়ে যায়নি।
ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন তারা। সব কঠিন সময়ে একসঙ্গে থেকেছেন। আর সেই মানুষটিই একদিন নিজের মেধা, পরিশ্রম আর সাহস দিয়ে বাংলাদেশ সিআইডির অন্যতম সেরা অফিসার হয়ে ওঠেন।
দেশজুড়ে তার পরিচয় ছিল একজন সাহসী, সৎ আর বুদ্ধিমান কর্মকর্তা হিসেবে। কিন্তু হিয়ার কাছে তিনি শুধু একজন সিআইডি অফিসার ছিলেন না।
তিনি ছিলেন তার আব্বু।
যার পাশে দাঁড়ালেই মনে হতো, পৃথিবীর কোনো ভয় তাকে ছুঁতে পারবে না। হিয়ার সবচেয়ে বড় আইডল ছিল তার বাবা।

সে সবসময় চাইত, একদিন যেন ঠিক তার বাবার মতো হতে পারে। তার হাঁটা, কথা বলা, ব্যক্তিত্ব—সবকিছুতেই যেন ইশতিয়াক খানের ছাপ থাকে।
হিয়ার একটাই স্বপ্ন ছিল—একদিন সে-ও একজন সৎ, সাহসী সিআইডি অফিসার হবে।
তখন তার উচ্চতা ছিল অনেকটাই বেশি ৫.৮ ইঞ্চির একজন মেয়ে মানুষের জন্য এটাই পর্যাপ্তের বাইরে হাইট। তাই স্কুল-কলেজের শিক্ষক থেকে শুরু করে আত্মীয়-স্বজন—অনেকেই বলতেন,
“তোমাকে আর্মিতে দারুণ মানাবে।”
কিন্তু হিয়া প্রতিবারই হেসে একটাই উত্তর দিত,
“না… আমি আমার আব্বুর মতো সিআইডি অফিসার হব।”
একদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফিরতেই ইশতিয়াক খান বুঝতে পারলেন, মেয়েটা অস্বাভাবিক চুপচাপ।
তিনি পাশে বসে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে, আম্মু?”
হিয়া অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর জানাল, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সিনিয়র তাকে র‍্যাগিং করেছে।
কিন্তু সে কোনো প্রতিবাদই করতে পারেনি।
কথাটা শুনে ইশতিয়াক খান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর মেয়ের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে বললেন,
“নূজহাত… তুমি এতটা দুর্বল কবে থেকে হলে?”
হিয়া মাথা নিচু করে রইল।
ইশতিয়াক খান আবার বললেন,
“তুমি একজন সিআইডি অফিসারের মেয়ে। শুধু তাই নয়, তুমি নিজেই বলেছ—একদিন আমার মতো অফিসার হবে।”

“তাহলে সামান্য অন্যায়ের প্রতিবাদই যদি করতে না পারো, বড় অন্যায়ের সামনে দাঁড়াবে কীভাবে?”
তিনি ধীরে ধীরে হিয়ার মাথায় হাত রাখলেন।
“মনে রেখো, একজন অফিসারের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ইউনিফর্ম নয়… তার সাহস।”
“কলিজা দশ হাত রাখতে হয়, নূজহাত।”
“লড়াই করার সাহসের কোনো জেন্ডার হয় না।”
“তুমি মেয়ে বলে কেউ যদি তোমাকে দুর্বল ভাবে, তাহলে ভুলটা তাদের। তুমি কোনোদিন নিজেকে দুর্বল ভাববে না।”
তিনি হিয়ার থুতনি আলতো করে উঁচু করলেন।

“মাথা উঁচু করে হাঁটবে।”
“কারণ তুমি শুধু নূজহাত নও…”
“তুমি সিআইডি অফিসার ইশতিয়াক খানের মেয়ে ‘নুজহাত খান হিয়া’।”
“আর একদিন, মানুষ আমাকে নয়—আমাকে চিনবে তোমার পরিচয়ে।”
সেদিন বাবার প্রতিটি কথা হিয়ার মনে গেঁথে গিয়েছিল।
হয়তো সেদিনই প্রথম, ভীতু মেয়েটার ভেতরে সাহস নামের বীজটা জন্ম নিতে শুরু করেছিল।
হিয়ার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে তাচ্ছিল্যের এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
কী অদ্ভুত!
যে মানুষটা সারাজীবন আইনকে সবচেয়ে বেশি সম্মান করেছেন, সেই মানুষটার সঙ্গেই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অন্যায়টাই করল আইন।
তার বাবা প্রায়ই বলতেন,

“আইন কখনো কারও শত্রু হয় না, আম্মু। সত্য একদিন না একদিন নিজের পথ খুঁজে নেয়।”
ছোটবেলায় হিয়া মুগ্ধ হয়ে শুনত সেই কথাগুলো।
বিশ্বাস করত। আইনের ওপর, ন্যায়বিচারের ওপর, মানুষের ওপর—সবকিছুর ওপর বিশ্বাস ছিল তার।
কিন্তু সেই আইনই কী করল?
তার বাবার মৃ*ত্যুর পর সত্যটা খুঁজে বের করার বদলে, তার কাঁধে চাপিয়ে দিল বিশ্বাসঘাতকের তকমা।
একজন সৎ, সাহসী সিআইডি অফিসারকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরল আন্ডারওয়ার্ল্ডের দালাল হিসেবে।
মানুষ বিশ্বাস করল—ইশতিয়াক খান নাকি অপরাধীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন।
আর সেই বিশ্বাসের আড়ালেই চাপা পড়ে গেল সত্য।
হারিয়ে গেল একটি পরিবারের জীবন। হিয়ার চোখের কোণে জমে ওঠা জল সে এক ঝটকায় মুছে ফেলল।
হিয়া ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। ঠোঁট নড়ল খানিকটা। খুব নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলল,

“হ্যাঁ, আব্বু…”
“আমি এখন আর আগের সেই নূজহাত নই।”
“এখন আমি আর ভয় পাই না। অন্যায়ের সামনে মাথাও নিচু করি না।”
তার ঠোঁটে তিক্ত একটা হাসি ফুটে উঠল।
“তুমি বলেছিলে, কলিজা দশ হাত রাখতে হয়। দেখো বাবা… তোমার সেই ভীতু মেয়েটা সত্যিই বদলে গেছে।”
“হয়তো আজ আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সাহসী নারীদের একজন।”
একটু থেমে সে গভীর শ্বাস নিল।
“কিন্তু আমি তোমার আদর্শে বড় হতে পারিনি।”
“আমি তোমার মতো হতে পারিনি, বাবা।”
হিয়া জানালার বাইরের অন্ধকারে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“তুমি চেয়েছিলে, আমি একদিন সৎ সিআইডি অফিসার হব।”
“কিন্তু তোমার মেয়ে আজ এই পৃথিবীর মানুষের চোখে একজন ঘৃণিত ক্রিমিনাল।”
“যে আইনকে রক্ষা করার স্বপ্ন দেখত, আজ সেই আইনের কাছেই সবচেয়ে বড় অপরাধী।”
তার চোখ বেয়ে নিঃশব্দে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।

“আব্বু… যদি কোথাও থেকে আমাকে দেখতে পাও…”
“তাহলে হয়তো আজ আমায় চিনতেই পারবে না।”
বাইরে গাড়ি এসে থামার শব্দ ভেসে আসতেই হিয়া জানালার দিক থেকে সরে দাঁড়াল।
শব্দটা তার চেনা। দানিয়েল ফিরে এসেছে।
কয়েক মুহূর্ত পরই মূল দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল দানিয়েল। হিয়ার মুখের দিকে একবার তাকিয়েই তার কপাল কুঁচকে গেল। বছরের অভিজ্ঞতায় সে বুঝে ফেলেছে—
আজ হিয়ার মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক নেই। কোনো প্রশ্ন না করেই সে শান্ত গলায় বলল,
“আমার সঙ্গে এসো।”
হিয়া নীরবে তার পিছু নিল। টাউন হাউসের ভেতরের গোপন করিডর পেরিয়ে তারা ঢুকল দানিয়েলের ব্যক্তিগত কেবিনে।
ঘরটা সাধারণ অফিসের মতো নয়। সেখানে নরম আলো, বুকশেলফ, কয়েকটি গাছ আর একপাশে রাখা থেরাপি কাউচ! সবটা মিলিয়ে প্রশান্ত একটা পরিবেশ।
দানিয়েল পেশায় একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন এক সময়। বহু বছর ধরে মানুষের মানসিক আঘাত, ভয় আর ট্রমা নিয়ে কাজ করছেন।
সে কাউচের দিকে ইশারা করে বলল,

“শুয়ে পড়ো হিয়া।”
হিয়া কোনো কথা না বলে শুয়ে পড়ল। দানিয়েল কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করল,
“আজ কী হয়েছে?”
হিয়া ধীরে ধীরে সব বলল। আন্ডারগ্রাউন্ড ক্লাবে সেই লোকটার সঙ্গে দেখা…লোকটার কণ্ঠ…
তার স্পর্শ…
আর তারপর থেকেই বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়।
সব কথা শেষ করে হিয়া নিচু স্বরে বলল,
“ওকে দেখলেই আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে বস। মনে হয় আমি আবার সেই পুরোনো ওই দিনে ফিরে গেছি। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়… মাথা কাজ করে না।”
দানিয়েল মন দিয়ে শুনল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
“এটা দুর্বলতা নয়, হিয়া। এটা ট্রমার প্রতিক্রিয়া।”
সে টেবিল থেকে একটি নোটপ্যাড তুলে রেখে আবার বলল,
“মানুষ যখন জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়, তখন মস্তিষ্ক সেই স্মৃতিটাকে বিপদের সংকেত হিসেবে ধরে রাখে। পরে একই মানুষ, একই কণ্ঠ, একই গন্ধ বা একই ধরনের কোনো পরিস্থিতি সামনে এলে শরীর আবারও সেই পুরোনো আতঙ্ক অনুভব করে।”
দানিয়েল কিছুক্ষণ থামল।

“তুমি এখনো তাকে নয়… সেই দিনের স্মৃতিকে ভয় পাচ্ছ।”
হিয়া চুপচাপ শুনতে লাগল।
দানিয়েল আবার বলল,
“এই ভয় থেকে পালিয়ে বাঁচা যাবে না। ধীরে ধীরে এটাকে মোকাবিলা করতে হবে। প্রতিবার নিজেকে মনে করিয়ে দেবে—সেই অসহায় মেয়েটা এখন আর তুমি নও।”
সে হিয়ার দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,
“তুমি যদি ওই মানুষটার সামনে দাঁড়াতে চাও, তাহলে আগে নিজের ভেতরের ভয়টাকে হারাতে হবে।”
“শয়তানকে হারানোর আগে, শয়তান যে ক্ষত রেখে গেছে সেটাকে জয় করতে হবে।”
হিয়া ধীরে ধীরে চোখ খুলল।
দানিয়েলের কথাগুলো তার বুকের ভেতর গভীরভাবে গেঁথে গেল। দানিয়েল কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ হিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল,
“আজও আগের মতোই ট্রিগার হয়েছে, তাই না?”
হিয়া মাথা নিচু করে সম্মতি জানাল।
দানিয়েল দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

গত সাত বছর ধরে এই মেয়েটার প্রতিটি ভাঙা মুহূর্ত, প্রতিটি প্যানিক অ্যাটাক, প্রতিটি দুঃস্বপ্নের সাক্ষী সে।
সাত বছর ধরে সে শুধু হিয়ার বস নয়—তার চিকিৎসকও।
হিয়ার মানসিক ক্ষতগুলোকে ধীরে ধীরে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে এতদিন। টেবিলের ওপর রাখা প্রেসক্রিপশন প্যাডে কয়েকটি ওষুধের নাম লিখে হিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিল।
“আগের মতোই নিয়ম করে খাবে।”
“আর মনে রেখো, ওষুধ তোমার শরীরকে শান্ত রাখবে, কিন্তু ভয়টাকে শেষ করবে না।”
হিয়া চুপচাপ শুনছিল। দানিয়েল আবার বলল,
“তোমার সবচেয়ে বড় যুদ্ধ ওই বাস্টার্ডের সঙ্গে নয়, হিয়া। তোমার সবচেয়ে বড় যুদ্ধ তোমার নিজের মস্তিষ্কের সঙ্গে।”
“ও সামনে আসলে তোমার মাথা এখনো বিশ্বাস করে, তুমি সেই সাত বছর আগের ওই রাতের মেয়েটাই।”
“কিন্তু বাস্তবটা ভিন্ন।”
সে হিয়ার চোখের দিকে গভীর ভাবে তাকাল।
“আজ তুমি আগের সেই নূজহাত নও। তুমি নিজেকে রক্ষা করতে জানো এটা মাথায় রাখো।”
“যেদিন ওই মানুষটার সামনে দাঁড়িয়ে তোমার বুক কাঁপবে না, হাত কাঁপবে না, সেদিন বুঝবে তুমি সত্যিই ট্রমাকে হারিয়ে ফেলেছ।”
হিয়া ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। এই কথাগুলো গত সাত বছরে দানিয়েল তাকে বহুবার বলেছে।
তবু আজও প্রতিবারের মতো সে মন দিয়ে শুনল।
কারণ এই পৃথিবীতে দানিয়েলের চেয়ে তার ভাঙা মনকে আর কেউ ভালো করে চেনে না।

গভীর রাতে, হায়াস ম্যানশনের প্রধান দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল অ্যামেলিয়া।
সারাদিনের দুশ্চিন্তার ছাপ এখনো স্পষ্ট তার মুখে।
রুদ্রনীলকে দেখেই সে বলল,
“তুমি কোথায় ছিলে? জানো আমি কতটা চিন্তায় ছিলাম?”
রুদ্রনীল কোট খুলতে খুলতে মুচকি হেসে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“আরে ডার্লিং… আমি কোথায় যাই, সেটা কি তোমার অজানা?”
সে হালকা ক্লান্ত গলায় যোগ করল,
“তোমার ভাই লিওনের জন্য কত দৌড়াদৌড়ি করেছি, সেটা যদি জানতে!”
অ্যামেলিয়ার চোখজোড়া আবেগে ভরে উঠলো সে বললো
“আমার ওপর রাগ করোনা আমিতো তোমাকে নিয়ে চিন্তা করা সবসময়।”
রুদ্রনীলের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল।

“সেটা কি আমার চেয়ে ভালো কেউ জানে বলো, আমিতো জানি তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো।”
“যাক… অবশেষে আমার শ্যালকটা ফিরেছে। এটাই এখন সবচেয়ে বড় স্বস্তি আমাদের জন্য বলো।”
তারপর আলতো করে অ্যামেলিয়ার দুই হাত নিজের হাতে নিয়ে বলল, “আর সত্যিই দুঃখিত, বেবি।”
“তোমাকে এত দুশ্চিন্তায় রাখার জন্য।”
“পরেরবার অন্তত একটা ফোন করে জানিয়ে দেব।”
অ্যামেলিয়ার মুখের উদ্বেগ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
সে শুধু চুপচাপ রুদ্রনীলের দিকে তাকিয়ে রইল। তার কাছে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় স্বস্তি এটাই যে—তার স্বামী আর তার আদরের ভাই নিরাপদে ফিরে এসেছে।

পরদিন সকাল।
সিআইডি সদর দপ্তরে পৌঁছেই কাজে ডুবে গেল লিওন।
কনফারেন্স রুমে ইতোমধ্যেই জরুরি বৈঠক শুরু হয়েছে।
এসিপি টেবিলের ওপর রাখা হিয়ার স্কেচের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আমার মনে হয়, আর দেরি করা ঠিক হবে না। ভাইপারের ছবি আর তথ্য আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশ করে দেওয়া উচিত। এতে ওর পালানোর পথ অনেকটাই সংকুচিত হবে।”
কথা শেষ হতেই লিওন আপত্তি জানাল।
“না, স্যার। এখনই নয়।”
এসিপি ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। “কেন?”
লিওন শান্ত গলায় বলল, “আমাকে বাহাত্তর ঘণ্টা সময় দিন।”
“এই সময়ের মধ্যে আমি সাত বছর আগের কেসটা আবার খতিয়ে দেখতে চাই।”
এসিপি চেয়ারে হেলান দিলেন। তারপর বললেন
“বাংলাদেশ প্রশাসনের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা কেসটা পুনরায় তদন্তের অনুমতি দিয়েছে। সেটা তুমি দেখবে।”

“কিন্তু ভাইপারের ছবি প্রকাশ করতে সমস্যা কোথায়?”
লিওন কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, “কারণ এখনই ওর পরিচয় প্রকাশ করলে আসল অপরাধীরা লুকিয়ে পড়বে। যাদের আমি খুঁজছি, তারা সঙ্গে সঙ্গে সব প্রমাণ মুছে ফেলবে।”
সে টেবিলের ওপর রাখা ফাইলের দিকে তাকাল।
“এই মুহূর্তে ওদের ধারণা, আমরা এখনো অন্ধকারে আছি। আমি চাই, ওরা সেটাই বিশ্বাস করুক।”
“প্লিজ স্যার… আমাকে শুধু বাহাত্তর ঘণ্টা সময় দিন।”
কিছুক্ষণ ভেবে এসিপি মাথা নাড়লেন।
“ওকে। বাহাত্তর ঘণ্টা। এর এক মিনিটও বেশি নয়।”
লিওন আর সময় নষ্ট করল না। নিজের কেবিনে ফিরে সাত বছর আগের কেস ফাইল খুলে বসল। একের পর এক পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল সন্দেহভাজনদের তালিকায়। আগের তদন্তের তুলনায় নতুন করে তিনটি নাম যুক্ত করা হয়েছে।
আয়মান খান।
আসাদ খান।

প্রথম নামটা দেখে সে বিশেষ অবাক হলো না।
কিন্তু দ্বিতীয় নামটা পড়তেই তার চোখ সরু হয়ে এল।
আসাদ খান…এই লোকটা ইশতিয়াক খানের আপন বড় ভাই। অর্থাৎ হিয়ার চাচা।
ফাইলে স্পষ্ট লেখা—আন্ডারওয়ার্ল্ড সিন্ডিকেটের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের যোগাযোগের সন্দেহ রয়েছে।
লিওন দ্রুত পরের পাতায় গেল। সেখানে আরেকটি নাম।
রুদ্রনীল। নামটা পড়তেই তার হাত থেমে গেল।
কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো…এই নামের পাশে কোনো ছবি নেই।
লিওনের বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন একটা অস্বস্তি কাজ করল। মনে পড়ে গেল তার বোন জামাই রুদ্রনীলের কথা।
পরক্ষণেই সে মাথা ঝাঁকাল।

“না… এক নামের অনেক মানুষই পৃথিবীতে থাকতে পারে।”
নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করল সে। তবু অজানা এক অস্বস্তি তার মন থেকে আর সরল না।
সারাদিনের কাজ শেষ করে বিকেলের দিকে হায়াস ম্যানশনে ফিরল লিওন। ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই দেখল সবাই একসঙ্গে বসে চা খাচ্ছে।
আর্থার হায়াস, শিরিন হায়াস, অ্যামেলিয়া আর রুদ্রনীল—সবাই আড্ডায় মশগুল। মায়া তখন তার রুমেই ছিলো।
লিওন এসে সোফায় বসতেই শিরিন হায়াস হেসে এক কাপ চা এগিয়ে দিয়ে বললেন “আজ খুব ক্লান্ত লাগছে তোকে বাবা।”
লিওন কাপটা হাতে নিয়ে হালকা হাসল।
“আজ একটা পুরোনো কেস হাতে নিয়েছি মা।”
কথাটা শুনেই রুদ্রনীল চোখ তুলে তাকাল।
লিওন চায়ে এক চুমুক দিয়ে বলল, “সাত বছর আগের একটা কেস।”
“অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ফাইলে একটা নাম দেখে আমি একটু থেমে গিয়েছিলাম।”
“রুদ্রনীল।”

মুহূর্তের জন্য চারপাশে নীরবতা নেমে এল। রুদ্রনীল খুব সূক্ষ্মভাবে লিওনের দিকে তাকাল। অ্যামেলিয়া হেসে বলল,
“আরে, এক নামে তো পৃথিবীতে কত মানুষই থাকে!”
রুদ্রনীল স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই কাপটা টেবিলে রেখে জিজ্ঞেস করল, “কোন কেস, লিওনার্দো?”
লিওন মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।
“সরি, ব্রো।”
“এটা আমার প্রফেশনের বিষয়। এখনই এই বিষয়ে পুরো তথ্য বলা যাবে না।”
তারপর লিওন উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“তোমরা আড্ডা দাও। আমি ভীষণ ক্লান্ত। একটু রুমে গিয়ে রেস্ট নিই।”
কথা শেষ করে লিওন সিঁড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।
আর সোফায় বসে থাকা রুদ্রনীল, একদৃষ্টিতে তার চলে যাওয়া দেখতেই থাকল।
সন্ধ্যা নামতেই বাসা বেরিয়ে পড়ল লিওন।
আজ তার লক্ষ্য একটাই—
তদন্তকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়া।
সিসিটিভি ফুটেজ বারবার দেখে সে নিশ্চিত হয়েছে, আয়মানকে শেষবার শহরের একটি নির্দিষ্ট বারে দেখা গিয়েছিল।

আজ সেখানেই যাবে সে।
আয়মানকে খুঁজে বের করতে পারলে হয়তো সাত বছর আগের কেসের অনেক অজানা তথ্য সামনে চলে আসবে।
আর তার থেকেও বেশি দরকার…
হিয়াকে।
এখনই তাকে খুঁজে বের করে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি।
অনেক প্রশ্নের উত্তর এখন শুধু হিয়াই দিতে পারবে।
চিন্তায় ডুবে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল লিওন।
রাস্তা প্রায় ফাঁকা।
স্টিয়ারিং সামলে অভ্যাসবশত রিয়ার ভিউ মিররে একবার চোখ বুলাতেই একটি কালো স্পোর্টস বাইক নজরে এল।
প্রথমে বিষয়টা গুরুত্ব দিল না সে। একই রাস্তায় অনেক গাড়ি-বাইক চলতেই পারে। কিন্তু কয়েক মিনিট পর আবার মিররে তাকাতেই দেখল—বাইকটা এখনও একই দূরত্ব বজায় রেখে তার পেছনেই রয়েছে।
লিওনের চোখ সরু হয়ে এল। সে ইচ্ছে করেই একবার লেন বদলাল। কয়েক সেকেন্ড পর বাইকটাও লেন বদলে নিল।

এবার সন্দেহটা আরও গাঢ় হলো। মনের ভেতর শান্ত স্বরে বলল লিওন,
“আমাকে ফলো করছে… নাকি কাকতালীয়?”
উত্তর জানার জন্য লিওন গাড়ির গতি সামান্য বাড়িয়ে দিল।
পেছনের বাইকটাও নীরবে গতি বাড়াল।
অনেকটা পথ এগিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ ব্রেক কষে রাস্তার একপাশে গাড়ি থামাল লিওন।
প্রায় একই সঙ্গে পেছনের স্পোর্টস বাইকটাও থেমে গেল।
লিওন ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। বাইকের আরোহী হেলমেট খুলতেই পরিচিত মুখটা স্পষ্ট হয়ে উঠল।
হিয়া।
আজ তার পরনে ছিল ঢিলেঢালা কালো ব্যাগি জিন্স। গায়ে কালো রঙের ক্রু-নেক টি-শার্ট, যা তার অ্যাথলেটিক গড়নকে আরও ফুটিয়ে তুলেছিল। মাথায় খয়েরি রঙের প্রিন্টেড রুমাল দিয়ে বাঁধা ব্যান্ডানা, আর তার নিচ থেকে বেরিয়ে আসা কয়েক গোছা চুল বাতাসে দুলছিল। পুরো সাজে ছিল একরাশ বেপরোয়া আত্মবিশ্বাস।
বাইক থেকে নেমে সে নির্বিকার ভঙ্গিতে হেলমেটটা রেখে দিলো তারপর ধীরে ধীরে লিওনের দিকে এগিয়ে এল।
এদিকে এক মুহূর্তও দেরি করল না লিওন। দ্রুত এগিয়ে এসে হিয়ার বাহু শক্ত করে চেপে ধরল।

“কী চাই তোমার?”
“আমাকে ফলো করছো কেন?”
হিয়া একবার নিজের বাহুর দিকে তাকাল, তারপর নির্বিকার চোখে লিওনের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“তুমি ৩১.৫ কিলোমিটার পথ এসেছো। গাড়ির গড় স্পিড ছিলো ঘন্টায় ৯২ কিলোমিটার ।একান্ত পৌঁছাতে তোমার প্রায় ২.২ লিটার ফুয়েল পুড়েছে।”
“আর আমি ৩১.৫ কিলোমিটার তোমার পেছনে ঘন্টায় ১১২ কিলোমিটার স্পিড ধরে ছুটেছি। আমার বাইকের প্রায় ২.৪ লিটার অকটেন পুড়েছে, শুধু তজামকে দেখায় জন্য এখন বলো দিলবার আমার এই পাগলামির দাম কি দিয়ে মাপবে?”
একটু থেমে হিয়া লিওনের চোখের গভীরে তাকিয়ে বললো
“শুধু তোমাকে একবার দেখার জন্য। এখন বলো, দিলবার… আমার এই পাগলামির দাম কী দিয়ে মাপবে?”
কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলতে পারল না লিওন।
তার বিস্ময়ের কারণ ভালোবাসার স্বীকারোক্তি নয়…
কতটা পথের দূরত্ব, অথচ গতি আর জ্বালানির হিসাব যেভাবে মিলিয়ে বলল হিয়া, সেটা সত্যিই অবিশ্বাস্য।
সে আবার হিয়ার বাহু শক্ত করে ধরল।

“এই মেধাটা যদি ভালো কাজে লাগাতে… তাহলে আজ তুমি অন্য জায়গায় থাকতে।”
হিয়ার ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। “এখনও দেরি হয়নি, ডার্লিং।”
লিওন আর কোনো উত্তর দিল না। পকেট থেকে এক জোড়া হ্যান্ডকাফ বের করল। এক প্রান্ত নিজের বাঁ হাতে পরিয়ে অন্য প্রান্তটা আটকে দিল হিয়ার ডান হাতে।
হ্যান্ডকাফের ধাতব শব্দটা চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল।
হিয়া বিস্ময়ে হ্যান্ডকাফের দিকে তাকিয়ে রইল।
লিওন শান্ত গলায় বলল,
“আমি এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ তদন্তে যাচ্ছি।”
“সেই তদন্তে তোমাকেও দরকার।”
“তাই আপাতত তুমি আমার আইনের শেকলেই থাকবে। পালানোর কোনো সুযোগ নেই তোমার আজকে।”
“আর তোমাকে অনেক জেরা করাও বাকি।”
হিয়া কয়েক সেকেন্ড হ্যান্ডকাফটার দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলল।
“সরাসরি বললেই পারতে হ্যান্ডকাফ ডেটিং করবে আমাকে নিয়ে।”
লিওন বিরক্ত হয়ে তাকাল।

“সাট-আপ।”
তারপর গাড়ির দিকে ইশারা করল।
“উঠো গাড়িতে।”
হ্যান্ডকাফে দুজনের হাত বাঁধা থাকায় গাড়িতে ওঠাটাই হয়ে গেল এক ঝামেলা।
আগে হিয়াকে ড্রাইভিং সিট পার করে তারপর পাশের আসনে বসতে হলো। তারপর হাতের অবস্থান সামলে লিওন নিজেও ড্রাইভিং সিটে বসল।
দুজনের হাত তখনও একই হ্যান্ডকাফে বাঁধা।
স্টিয়ারিংয়ে এক হাত রেখেই ইঞ্জিন স্টার্ট করল লিওন।
গাড়ি আবার ধীরে সন্ধার আবছা অন্ধকার রাস্তা ধরে এগিয়ে চলল।
হ্যান্ডকাফে বাঁধা হাতটার দিকে তাকিয়ে হিয়ার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।তার মাথায় এখন তদন্ত, জেরা বা কেসের কোনো চিন্তাই নেই।
শুধু একটাই ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে—লিওন নিজ হাতে তাকে আটকে রেখেছে। এটুকুই যেন তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আনন্দ।
অন্যদিকে লিওন সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে।
হ্যান্ডকাফের কারণে স্টিয়ারিং ধরতে একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। রাস্তার ছোট ছোট বাঁক আর ব্রেকের সময় দুজনের বাঁধা হাত নড়ে উঠছিল।
একবার গাড়ি সামান্য ঝাঁকুনি খেতেই হিয়া অনিচ্ছাকৃতভাবে লিওনের গায়ের ওপর হেলে পড়ল।
লিওন বিরক্ত হয়ে বলল,

“ঠিক হয়ে বসতে পারোনা রাবিশ।”
হিয়া নিজের বাঁধা হাতটার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “ঠিক হয়ে বসব কীভাবে? আমার হাতটা তো তোমার হাতের সাথেই বাঁধা ।”
একটু থেমে দুষ্টু হেসে যোগ করল,
“তাহলে একটা কাজ করি?”
লিওন চোখ না সরিয়েই বলল,
“হোয়াট?”
“আমি তোমার কোলে বসি? তাহলে আমারও আরাম হবে, তোমারও ড্রাইভিং করতে সুবিধা হবে। এইভাবে হাত বাঁধা থাকলে ব্যালেন্স রাখা খুব কঠিন।”
লিওন কটমট করে একবার তার দিকে তাকাল।
“অসভ্য আরেকটাও বাজে কথা বলবেনা।”
হিয়া ঠোঁট চেপে হেসে বললো “আইডিয়াটা কিন্তু খারাপ ছিল না।”
গাড়িটা এসে থামল সেই বারের সামনে।
ইঞ্জিন বন্ধ করতেই লিওন দরজা খুলে নামলো আর তার সাথে সাথে হিয়াও গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে একবার তাকাল।
বারটা দেখেই তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
এই জায়গায় আবার কেন?
সে ভ্রু তুলে লিওনের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল।

“বাই এনি চান্স… আমাকে নিয়ে এখানে ড্রিংকস করতে এসেছ?”
লিওন নির্বিকার গলায় উত্তর দিল,
“না।”
“আমি আয়মান খানকে খুঁজতে এসেছি।”
কথাটা শুনেই হিয়ার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। মুহূর্তেই সে গম্ভীর হয়ে উঠল। লিওন তার মুখের পরিবর্তনটা লক্ষ করল।
ধীরে ধীরে এক পা এগিয়ে এসে বলল,
“ওহ… আয়মানের নাম শুনতেই সিরিয়াস হয়ে গেলে?”
তার চোখ সরাসরি হিয়ার চোখে স্থির। “আয়মানকে তুমি খুব ভালো করেই চেনো, তাই না?”
হিয়া নীরব। লিওন একে একে নিজের সন্দেহগুলো সাজিয়ে বলতে লাগল।
“ও এই বারে আছে এখন, আর সেটা তুমি নিশ্চিত জানো।”
একটু থেমে আবার বলল,
“যেদিন প্রথম আমি অচেতন হয়েছিলাম, আমাকে তুমি হোটেল রুমে নিয়ে গিয়েছিলে, সেদিন তুমি ছদ্মবেশে আয়মান খানের সাথেই দেখা করতে এসেছিলে, এমনকি পরেরবারও ফ্রেন্ডের ফিয়ন্সির পরিচয় দিয়েছিলে মনে আছে নিশ্চয়ই?”

চারপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে এল।
হিয়া কোনো উত্তর দিল না।কিন্তু তার ভেতরে ভেতরে সব হিসাব পাল্টে যাচ্ছে। লিওন তদন্তের সুতোটা ঠিক দিকেই টানছে। এভাবে এগোতে থাকলে খুব শিগগিরই সে আয়মান পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। আর আয়মান ধরা পড়লেই…
সবচেয়ে বড় সত্যিটাও সামনে চলে আসবে।
ভাইপারই হিয়া।
না…
এটা কোনোভাবেই হতে দেওয়া যাবে না।
আয়মানকে আগে থেকেই সতর্ক করতে হবে। আর তার জন্য যেভাবেই হোক, এখনই লিওনের নজর এড়িয়ে বেরিয়ে যেতে হবে।হিয়ার চোখে আবার সেই পরিচিত স্থিরতা ফিরে এল।
মনের ভেতর সে ইতোমধ্যেই পালানোর পরিকল্পনা সাজাতে শুরু করেছে।
দুজনের হাতে একই হ্যান্ডকাফ বাঁধা অবস্থায় বারের ভেতরে ঢুকতেই চারপাশের মানুষের দৃষ্টি একসঙ্গে তাদের ওপর গিয়ে পড়ল।মুহূর্তের মধ্যেই ফিসফাস শুরু হয়ে গেল।

“ওদের দেখেছ?”
“এমন কাপল তো আগে কখনো দেখিনি!”
“ছেলেটা মনে হয় ভীষণ পজেসিভ। তাই গার্লফ্রেন্ডকে হাতকড়া পরিয়েই নিয়ে ঘুরছে!”
“কিন্তু মানতেই হবে… ব্যাপারটা বেশ ইউনিক!”
প্রতিটি কথাই স্পষ্টভাবে লিওনের কানে পৌঁছাল।
তার মুখ বিরক্তিতে শক্ত হয়ে গেল।
দাঁত চেপে নিচু গলায় বলল,
“একেকটা রাবিশ কিসব বলছে!”
পাশ থেকে হিয়া মুচকি হেসে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“ভালোই তো বলছে।”
লিওন কটমট করে তার দিকে তাকাল। হিয়া ঠোঁট চেপে হাসিটা লুকিয়ে সামনে হাঁটতে লাগল।
লিওনের চোখ চারদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে।
বারের প্রতিটি টেবিল, প্রতিটি কর্নার সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে।
আয়মান যে আজ এখানেই আছে—এটা হিয়া নিশ্চিত।
আর সেই কারণেই তার ভেতরে অস্থিরতা বাড়ছে।কোনোভাবেই আয়মানকে আজ লিওনের সামনে পড়তে দেওয়া যাবে না।
হঠাৎ হিয়া মুখ কুঁচকে বলল, “আমি পি করবো।”
তখন হঠাৎ বারের ভেতরের তীব্র মিউজিকের শব্দে কিছুই শুনতে পেল না লিওন। সে ভ্রু কুঁচকে বলল,

“কী বললে? কিছুই শুনতে পাচ্ছি না।”
হিয়া বিরক্ত হয়ে নিজের খোলা হাতের কনিষ্ঠ আঙুলটা তুলে ইশারায় বোঝাল।
লিওন বুঝতে পেরে তার কানের কাছে মুখ এনে জোরে বলল,
“চেপে রাখো।”
হিয়া সঙ্গে সঙ্গে একইভাবে লিওনের কানের কাছে ঝুঁকে বলল, “চেপে রাখতে পারব না। আর এক মিনিট দেরি হলে এখানেই সেরে ফেলবো।”
লিওন বিরক্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“চলো।”
সে হিয়ার হাত ধরে দ্রুত ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
লেডিস ওয়াশরুমের সামনে এসে দাঁড়াতেই হিয়া হাত তুলে দেখাল।
“আমার হাতটা তো এখনো তোমার সঙ্গে বাঁধা।”
“এই অবস্থায় ভেতরে যাব কীভাবে?”
এক মুহূর্ত ভেবে লিওন নিজের হাতের হ্যান্ডকাফ খুলে দিল। অন্য প্রান্তটা অবশ্য হিয়ার হাতেই রয়ে গেল। কারন হিয়া ভেন্টিলেটর দিয়ে পালাতে চাইলে এই হ্যান্ডকাফের আওয়াজটা অন্তত আসবে।
লিওন দরজার একেবারে পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

“যাও এবার।”
“আমি এখানেই আছি। একদম পালানোর চেষ্টা করবে না।”
হিয়া নিরীহ মুখে মাথা নাড়ল।
“কোথায় আর পালাব, দিলবার?”
কথাটা বলে ভেতরে ঢুকতেই তার মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তে বদলে গেল।
ওয়াশবেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে সে দ্রুত জ্যাকেটের ভেতরের গোপন পকেট থেকে সূচের মতো চিকন একটি ধাতব পিন আর ক্ষুদ্র একটি ফ্ল্যাট ব্লেড বের করল।
দু’টি জিনিস নিখুঁতভাবে হ্যান্ডকাফের লকের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দক্ষ হাতে চাপ দিল।
মৃদু একটা শব্দ করে হ্যান্ডকাফের লক খুলে গেল।
হিয়া ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি টেনে ফিসফিস করে বলল,

“সরি, বাজপাখি.. এই খেলায় এখনো আমি এক ধাপ এগিয়ে আছি।”
ঠিক তখনই লেডিস ওয়াশরুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল বারের এক নারী ওয়েটার।
হিয়া ওয়াশবেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাত ধুচ্ছিল। মেয়েটি পাশ কাটিয়ে যেতেই মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে গেল।
হিয়া দ্রুত চারপাশে একবার তাকিয়ে নিশ্চিত হলো, আশেপাশে আর কেউ নেই। পরের মুহূর্তেই নিখুঁত দক্ষতায় মেয়েটির ঘাড়ের নির্দিষ্ট স্থানে আঘাত করল।
মেয়েটি কোনো চিৎকার করার সুযোগ না পেয়েই অচেতন হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। হিয়া তাকে টেনে একটি বন্ধ কিউবিকলের ভেতরে নিয়ে গেল।
নিজের পোশাক খুলে অচেতন মেয়েটির গায়ে পরিয়ে দিল, আর মেয়েটির ওয়েটারের ইউনিফর্ম নিজে পরে নিল খুব দ্রুত। মাথায় ক্যাপ পড়ে চুলগুলো ক্যাপের মধ্য গুঁজে নিলো চারপাশের। তারপর মুখটা নিচু করে আয়নায় শেষবারের মতো নিজেকে দেখে নিল।
সবকিছু ঠিক আছে।
গভীর শ্বাস নিয়ে দরজা খুলে একেবারে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বাইরে বেরিয়ে এল।
দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল লিওন।
কিন্তু মাথা নিচু করে দ্রুত হেঁটে যাওয়া সেই ওয়েটারের দিকে তার বিন্দুমাত্র সন্দেহ হলো না। মনে হলো কোনো পুরুষ ওয়েটার।
হিয়া সোজা ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল।
বারের বাইরে বেরিয়েই প্রথম কাজ হিসেবে আয়মানকে একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা পাঠাল—

“এখনই বেরিয়ে যাও বার থেকে। সিআইডি অফিসার তোমাকে খুঁজছে।”
বার্তাটি পাঠানোর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আয়মান নীরবে সেখান থেকে সরে গেল।
এদিকে অনেকক্ষণ কোনো শব্দ না পেয়ে লিওনের সন্দেহ হলো। সে দরজা ঠেলে লেডিস ওয়াশরুমে ঢুকে চারদিকে তাকাতেই থমকে গেল।
মেঝেতে পড়ে আছে একজন অচেতন নারী।
তার গায়ে…হিয়ার পোশাক।
এক মুহূর্তেই সবকিছু বুঝে গেল লিওন। দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল,

“ডিসগাইজ…”
আর এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে ছুটে বেরিয়ে এল বারের বাইরে।
ঠিক তখনই রাস্তা দিয়ে একটি মোটরবাইক যাচ্ছিল।
হিয়া দ্রুত এগিয়ে গিয়ে চালককে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে বাইকটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিল নিজের কাছে, তারপর মুহূর্তের মধ্যেই ইঞ্জিন গর্জে উঠল।
লিওন বাইরে বেরোতেই দেখল, বাইকটি দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে। সে দৌড়েও আর নাগাল পেল না।
রাগে মুঠি শক্ত করে দাঁড়িয়ে বলল,
“ড্যাম ইট!”
রাগে লিওনের বুক ওঠানামা করছে। দূরে মিলিয়ে যাওয়া বাইকটার দিকে তাকিয়ে দাঁত চেপে বলল,
“ইউ ব্লাডি ক্রিমিনাল…”
তার মুঠো শক্ত হয়ে উঠল।
“একবার… শুধু একবার তোমাকে জেলের ভেতরে নিতে পারি…”
চোয়াল শক্ত করে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আজকের প্রতিটা চালাকি, প্রতিটা পালিয়ে যাওয়া আর প্রতিটা ঝামেলার হিসাব একে একে নেব আমি লিওনার্দো হায়াস।”
কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থেকে সে ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিল।তার চোখে তখন একটাই প্রতিজ্ঞা—
যতদিন লাগুক, ভাইপারকে সে ধরবেই।

এদিকে হিয়া টাউন হাউসে ফিরতেই ইভানা দ্রুত এগিয়ে এল।
তার মুখের গম্ভীর ভাব দেখেই হিয়া বুঝে গেল, ভালো কোনো খবর নয়।
ইভানা নিচু গলায় বলল,
“সেদিন বারের যে মেয়েটাকে আপনি ওই লোকটার গাড়িতে ট্র্যাকার আর হিডেন ক্যামেরা লাগাতে পাঠিয়েছিলে… সে এখন হসপিটালে।”
এক মুহূর্তও দেরি করল না হিয়া।
৩০ মিনিটের মধ্যেই সে হাসপাতালে পৌঁছে গেল।
কেবিনে ঢুকতেই বিছানায় শুয়ে থাকা তরুণীটিকে দেখে তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। মেয়েটির মুখে আতঙ্কের ছাপ, চোখ দুটো কান্নায় ফুলে গেছে। আর ঠোঁটের অবস্থা আর চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে তার ওপর কতটা অত্যচার করা হয়েছে।
হিয়াকে দেখেই সে ভেঙে পড়ল। কাঁপা গলায় বলল,

“সেদিন… ও… সারারাত আমাকে নিষ্ঠুর পিশাচের মতো রে/ইপ করেছে…”
বাকিটা আর বলতে পারল না। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
হিয়ার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। এই পৃথিবীতে যাদের সে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে, তারা হলো রেপি*স্ট।
এমন অসংখ্য ধর্ষককে সে নিজের হাতে নি/র্মমভাবে শা/স্তি দিয়েছে।
কিন্তু এবার প্রতিপক্ষ অন্যরকম। ক্ষমতাবান।
প্রভাবশালী। তাকে ছোঁয়া সহজ নয়।
হিয়া ধীরে ধীরে মেয়েটির হাত নিজের হাতে নিল।
শান্ত গলায় বলল, “তোমার সঙ্গে যা হয়েছে… তার বিচার চাই?”
মেয়েটি চোখ মুছে ফিসফিস করে বলল,
“চাই… কিন্তু আমারতো সেই ক্ষমতা নেই।”
হিয়ার চোখে কঠিন দৃঢ়তা ফুটে উঠল।
“ক্ষমতা তোমার লাগবে না।”
“আমার হয়ে কাজ করবে।”
“আমি যখন যা বলব, শুধু সেটুকুই করবে।”
“পারবে?”
মেয়েটি কয়েক সেকেন্ড হিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

“যদি ওই শয়তান তার শা/স্তি পায়… আমি সব করব।”
হিয়া পকেট থেকে একটি সিগারেট বের করল। নিজের ঠোঁটে ধরিয়ে লাইটার জ্বালাল।
আরেকটি সিগারেট বের করে মেয়েটির দিকে বাড়িয়ে দিতেই পাশ থেকে এক নার্স বিস্মিত হয়ে বলে উঠল,
“ম্যাম! আপনি কী করছেন? এটা হাসপাতাল। এখানে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আর একজন রোগীকেও—”
নার্সের কথা শেষ হওয়ার আগেই হিয়া ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল। তার ঠান্ডা, কঠিন দৃষ্টিতে নার্স থেমে গেল।
হিয়া নিচু, নিয়ন্ত্রিত গলায় বলল,
“আমরা পার্সোনাল কথা বলছি।”
“দয়া করে বাইরে যান নাহলে আপনাকেও চেপে ধরে স্মোক করিয়ে ছাড়বো।”
নার্স আর একটি কথাও বলল না। হিয়ার চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়িয়ে নিঃশব্দে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
অনেক্ষণ হয় কেবিন থেকে বেরিয়ে করিডোরে এসে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল হিয়া। তার চোখে আর আগের সেই আতঙ্ক নেই। বরং ধীরে ধীরে জায়গা নিচ্ছে এক অদম্য দৃঢ়তা।
নিজের মনে বিড়বিড় করে বলল,

“আর ভয় নয়…”
“অনেক হয়েছে।”
তার প্রথম লক্ষ্য—আয়মান আর আসাদ খানকে নিঃস্ব করে তাদের দুনিয় থেকে সরিয়ে দেয়া।
ওরা মরলেই সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটার সবচেয়ে বড় দুইটি ঢাল ভেঙে পড়বে।
তারপর…
হিয়া ধীরে ধীরে মুঠো শক্ত করল।
চোখে ফুটে উঠল শীতল আগুন।
“এরপর শুধু তুমি আর আমি…”
“সাত বছর ধরে যে দুঃস্বপ্ন আর আতঙ্ক আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে, এবার সেই হিসাব মিটবে।”
“তোমার প্রতিটি নির্মম অত্যাচারের জবাব তোমাকেই দিতে হবে।”
তার কণ্ঠ ছিল শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির আড়ালে লুকিয়ে ছিল অটল প্রতিজ্ঞা। সে জানে, পথটা সহজ নয়। তবু এবার আর সে পিছিয়ে যাবে না।

রাত হয়ে এসেছে অনেকটা। লিওন গাড়ি চালিয়ে হায়াস ম্যানশনের দিকে ফিরছিল।
হঠাৎ গাড়ির ইঞ্জিন অস্বাভাবিক শব্দ করে থেমে গেল।
স্টিয়ারিং সামলে রাস্তার পাশে গাড়িটা দাঁড় করিয়ে সে নিচে নেমে বনেট খুলল।
ঠিক তখনই দূর থেকে প্রচণ্ড গতিতে একটা মোটরবাইক তার দিকে ছুটে আসতে দেখা গেল।
প্রথমে সাধারণ পথচারী ভেবেছিল লিওন।
কিন্তু এক সেকেন্ডের মধ্যেই তার প্রশিক্ষিত চোখে ধরা পড়ল—
বাইক আরোহীর হাতে উঁচিয়ে ধরা রয়েছে ভারী ধারালো একটি অস্ত্র।
লোকটার লক্ষ্য একটাই…সোজা লিওনকে কো/প মারা।
বজ্রগতিতে বনেটের আড়াল ছেড়ে একপাশে সরে গেল লিওন। পরের মুহূর্তেই প্রচণ্ড শক্তিতে ঘু/ষি বসিয়ে দিল বাইক আরোহীর হেলমেট পরিহিত মুখে।
আঘাতের চোটে লোকটা বাইক থেকে ছিটকে পড়ে কয়েক গজ দূরে গিয়ে আছড়ে পড়ল।
লিওন মুহূর্ত নষ্ট না করে কোমর থেকে পিস্তল বের করল।
দ্রুত এগিয়ে গিয়ে লোকটার কলার চেপে মাটিতে ঠেসে ধরল। পিস্তলের নল তার কপালে ঠেকিয়ে গর্জে উঠল,

“কে পাঠিয়েছে তোকে?”
“বল!”
“নাহলে এখানেই গু/লি করে দেব!”
লোকটা কাঁপতে কাঁপতে মুখ খুলতেই—
দূর থেকে ভেসে এল সাইলেন্সার লাগানো বন্দুকের ক্ষীণ শব্দ। পরের মুহূর্তেই লোকটার কপাল ঝাঁকুনি খেল।
নিস্তেজ হয়ে গেল তার শরীর। লিওন সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে চারপাশে তাকাল।
“স্নাইপার!”
সে দৌড়ে রাস্তার দুই পাশ, গাছের আড়াল আর উঁচু ভবনের দিকগুলো খুঁজতে লাগল। কিন্তু কোথাও কাউকে দেখা গেল না। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আততায়ী অন্ধকারের সঙ্গে মিলিয়ে গেছে।
লিওন ফিরে এসে মৃ/ত লোকটার দিকে তাকাল।
দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল, “কেউ তো চায় না সত্যিটা আমার সামনে আসুক…”
এক মুহূর্তও দেরি করল না লিওন। সে সঙ্গে সঙ্গে সিআইডি কন্ট্রোল রুমে ফোন করল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফরেনসিক টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে মৃ/তদেহটি উদ্ধার করে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে নিয়ে গেল। প্রাথমিক তদন্ত শেষে এসিপি গম্ভীর মুখে বললেন,

“লিওন, তুমি লন্ডনে সিআইডিতে যোগ দেওয়ার পর এই প্রথম তোমার ওপর এভাবে পরিকল্পিত হা/মলা হলো।”
তিনি টেবিলে আঙুল ঠুকলেন।
“এর মানে একটাই… ভাইপার জেনে গেছে তুমি ওর মুখ দেখেছ। তাই তোমাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।”
লিওন সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বললো।
“ইম্পসিবল, স্যার।”
রুমের সবাই তখন তার দিকে তাকাল। লিওন দৃঢ় গলায় বলল,
“এটা হিয়া হতে পারে না।”
“ও কখনোই আমাকে মে/রে ফেলার জন্য কাউকে পাঠাবে না।”
এসিপি ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলেন ,”এতটা নিশ্চিত হয়ে বলছ কীভাবে?”
প্রশ্নটা শুনে, না ভেবেই উত্তর দিয়ে ফেলল লিওন।
“কারণ… আমাকে সামান্য আঘাত করার কারনে ও নিজেরই টিমের পাঁচজনকে আমার চোখের সামনে মেরে ফেলেছিল।”

“ও আমাকে আঘাত করা তো দূরের কথা… আমার গায়ে আঁচড়ও লাগতে দেবে না।”
কথাগুলো মুখ থেকে বেরোতেই পুরো কনফারেন্স রুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। অফিসাররা বিস্ময়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
অফিসার রওশন তো চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গেছে।
এসিপিও কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলতে পারলেন না।
আর তখনই নিজের বলা কথাগুলো যেন লিওনের কানে ফিরে এলো। সে নিজেই থমকে গেল।
মনে মনে ফিসফিস করে বলল, “আমি… এসব কী বলে ফেললাম?”
নিজেকে সামলে নিয়ে লিওন গলা পরিষ্কার করল।
“স্যার, আমার মনে হয় না এই হা/মলার সঙ্গে ভাইপারের কোনো সম্পর্ক আছে।”
একটু থেমে টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো কেস ফাইলটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই ফাইলে যাদের নাম আছে… তাদের মধ্যেই কেউ এটা করিয়েছে। কেসটা অন্যদিকে যাচ্ছে আর যে করেছে সেই শুধুমাত্র আমাকে ওয়ার্ন করলো কারন আমাকে মারার হলে স্নাইপারের গু/লি আমার দিকেই ছুড়তো ওই ব্যাক্তির দিকে নয়।”
এসিপি ধীরে মাথা নাড়লেন।

“সমস্যা নেই।”
“মৃতদেহ থেকে উদ্ধার হওয়া বুলেট আর ব্যালিস্টিক রিপোর্ট এলেই অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে।”
রুমের পরিবেশ আবার কিছুটা স্বাভাবিক হতেই অফিসার রওশন কৌতূহলী গলায় বলল,
“স্যার… একটা প্রশ্ন করব?”
লিওন বিরক্ত চোখে তাকাল।
“কী?”
রওশন ইতস্তত করে বলল,
“ওই ক্রিমিনাল আপনাকে কিডন্যাপ করে… আসলে কী করেছিল?”
লিওন সংক্ষেপে বলল, “কেন?”
রওশন অপ্রস্তুত হাসি দিয়ে বলল,
“না মানে… আপনার প্রতি ওর একটা অদ্ভুত অবসেশন আছে। তাই ভাবছিলাম… আপনার ইজ্জত লুটে নেয় নি তো?”
কথাটা শেষ হতেই লিওনের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
সে ঠান্ডা গলায় বলল,
“শাট আপ, রওশন।”
“এটা কাজের সময় ঠাট্টা করার নয়। আর একজন অফিসার হয়ে কিসব ভাষা বলছো।”
রওশন সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে বলল,
“সরি, স্যার।”
রুমে আবার তদন্তের নীরবতা নেমে এল।

রাত তখন প্রায় আড়াইটা। লিওন বাড়িতে ফিরলো কিছুক্ষণ আগেই। শাওয়ার শেষ করে কোমরে তোয়ালে জড়িয়ে আরেকটি তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে বেডরুমে বেরিয়ে এল লিওন।
সারা দিনের ক্লান্তি এখনও শরীর ছেড়ে যায়নি।
ঠিক তখনই—
বারান্দার দিক থেকে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ ভেসে এল।
লিওনের চোখ মুহূর্তেই সতর্ক হয়ে উঠল। তোয়ালেটা পাশে ছুড়ে রেখে ড্রয়ারের ভেতর থেকে পিস্তল বের করল।
সাইলেন্সার লাগানো অস্ত্রটা সামনে তাক করে ধীরে ধীরে বারান্দার দিকে এগোতে লাগল।
এক পা…
দুই পা…
দরজার কাছে পৌঁছে আচমকাই বারান্দার দরজা খুলে পিস্তলের নল সামনের মানুষের কপালে ঠেকিয়ে দিল।
“ডোন্ট মুভ!”
সামনের মানুষটি সঙ্গে সঙ্গে দু’হাত ওপরে তুলে দিল।
অ্যাশ-গ্রে রঙের হুডি পরা সেই পরিচিত অবয়বটাকে দেখেই লিওনের চোখ সরু হয়ে এল। হুডটা ধীরে ধীরে সরিয়ে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল—

“ওয়াও… দিলবার।”
“এভাবে মাঝরাতে গেস্টদের ওয়েলকাম জানাও?”
সে আর কেউ নয়…
হিয়া।
লিওন পিস্তলটা নামালেও চোখের সতর্কতা একটুও কমল না। কঠিন গলায় বলল,
“তুমি এত রাতে এখানে কী করছ?”
একটু থেমে চারদিকে তাকিয়ে আবার বলল,
“আর এলে কীভাবে? নিচের গার্ডগুলো কী করছিল? কেউ তোমাকে আটকায়নি?”
হিয়া দু’হাত তুলে নির্দোষ মুখে বলল,
“রিল্যাক্স, বাজপাখি।”
“কেউ আমাকে ঢুকতে দেয়নি। আমি কৌশলে এসেছি।”
লিওন ভ্রু কুঁচকাল।
“কৌশল?”
হিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল।

“তোমাকে দেখতে প্রথমে শ্যাডোকে পাঠিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম মনিটরেই তোমাকে দেখবো।”
“কিন্তু আজকাল তুমি বারান্দার দরজাটাই বন্ধ রাখো।”
“তাই বাধ্য হয়ে নিজেই চলে এলাম।”
সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলতে লাগল, “আর আমার লোকেরা নিচে তোমার গার্ডদের সঙ্গে ইচ্ছে করেই একটু ঝামেলা বাঁধিয়ে দিলো যে।”
“সবাই ওদিকে ছুটে যেতেই আমি সুযোগ নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লাম।”
লিওনের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। “তারপর?”
হিয়া এক আঙুল তুলে বারান্দার পাশের মোটা পাইপটা দেখাল।
“ওটা বেয়ে উঠে এসেছি।”
লিওন অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইল।
“কী?”
হিয়া বিরক্ত মুখে পিস্তলটা আলতো করে নিচের দিকে সরিয়ে দিয়ে বলল,
“উফ! আগে বন্দুকটা সরাও তো।”
“তারপর নিচে তাকাও।”

লিওন বারান্দার রেলিংয়ের কাছে গিয়ে নিচে তাকাতেই চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
দোতলার বারান্দা পর্যন্ত উঠে এসেছে মোটা ধাতব পাইপটা।
সে আবার হিয়ার দিকে তাকাল। “তুমি… এই পাইপ বেয়ে ওপরে উঠেছ?”
হিয়া গর্বের সঙ্গে মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ।”
লিওন কয়েক সেকেন্ড কোনো কথাই বলতে পারল না।
তার মাথায় একটাই কথা ঘুরছে—এই মেয়েটা সত্যিই পাগল… নাহলে মাঝরাতে এমন ঝুঁকি নিয়ে কেউ শুধু একজন মানুষকে দেখতে আসে?
লিওন কপাল কুঁচকে বলল, “কিন্তু কেন এসেছ?”
“সবে তো আমাকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেলে।”
হিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উত্তর দিল,”উফ! সেই কারণেই তো এসেছি।”
“তোমাকে রেখে চলে যেতে হয়েছে। তুমি তো আমার সঙ্গে সময় কাটাতে চেয়েছিলে। তাই ভাবলাম… এবার নিজেই চলে আসি।”
লিওন বিরক্ত গলায় বলল, “গেট লস্ট।”
হিয়া চারপাশে একবার তাকিয়ে নিরীহ মুখে বলল,

“কীভাবে যাব? নিচে তো তোমার গার্ডরা আছে। এখন বের হলেই ধরা পড়ব।”
কথা শেষ করেই সে নিজের ইচ্ছামতো বারান্দা পেরিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। লিওন শুধু বিস্মিত চোখে তার কাণ্ডকারখানা দেখছে।
হঠাৎ হিয়ার দৃষ্টি গিয়ে থামল লিওনের ওপর।
সদ্য গোসল করে এসেছে সে। কোমরে শুধু একটা তোয়ালে, ভেজা চুল থেকে এখনো পানির ফোঁটা ঝরছে। জলীয় বাষ্পে ভেজা প্রশস্ত বুক, সুগঠিত পেশির চওড়া কাঁধ আর ড্রিল করা অ্যাবসের ওপর দিয়ে গড়িয়ে পড়া জলের ফোঁটা—সব মিলিয়ে তার শরীরের সেই হট ও মাসকুলার গড়ন হিয়ার চোখ আটকে দিল আকর্ষণে। হিয়া চোখের পলক না ফেলে লুব্ধ দৃষ্টিতে লিওনের সম্পূর্ণ বডি ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত চষে বেড়াল।
কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে থাকল হিয়া।
লিওন অস্বস্তি নিয়ে বলল,

“এইভাবে নজর দিচ্ছো কেনো?”
“চোখের দৃষ্টি ঠিক করো।”
“লজ্জা বলতে কিছু নেই তোমার?”
হিয়া ধীরে ধীরে মুচকি হাসল। তার দৃষ্টি তখনো লিওনের ওই উন্মুক্ত, উত্তপ্ত শরীরের ওপর স্থির।
“আমার ভবিষ্যৎ সম্পদের দিকে একটু নজর দিচ্ছি।”
“এখানে লজ্জা পাওয়ার কি আছে ?”
লিওন ভ্রু কুঁচকে বলল,”কীসব আজেবাজে কথা বলছ?”
হিয়া দুষ্টু চোখে আরও একটু কাছে এগিয়ে এসে উত্তর দিল,
“আজেবাজে না, দিলবার…”

“এমন হট গেটআপ আর র-মাসল নিয়ে চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে… কারোর পক্ষেই কি না তাকিয়ে থাকা সম্ভব? সেখানে নজর তো ভালো কথা ইচ্ছে করবে খেয়ে ফেলতে।”
লিওন অসস্থি আর বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল।
“অসভ্য মেয়ে মানুষ কোথাকার।”
লিওন আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। দ্রুত আলমারির সামনে গিয়ে একটি ডেনিম শার্ট বের করে গায়ে চাপাল। বোতাম লাগানোর আগেই তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
কয়েক সেকেন্ড আগের বিরক্তি বা খুনসুটির কোনো ছাপ নেই। এখন সে পুরোপুরি একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা।
শার্টের বোতাম না লাগিয়েই হিয়ার দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
কঠিন, স্থির দৃষ্টিতে বলল,

“এবার কাজের কথায় আসি।”
“সাত বছর আগে তোমার বাবা, সিআইডি অফিসার ইশতিয়াক খান আসলে কী করেছিলেন?”
“কোন ঘটনার কারণে তোমাদের পুরো পরিবারকে হ/ত্যা করা হলো?”
এক পা এগিয়ে এসে আবার প্রশ্ন করল,
“আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন…”
“সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী তোমাদের পুরো পরিবার মারা গিয়েছিল।”
“তাহলে তুমি বেঁচে ফিরলে কীভাবে?”
“কীভাবে সম্ভব হলো সবকিছু?”
লিওনের কণ্ঠে ছিল না কোনো আবেগ। শুধু ছিলো একজন তদন্তকারীর শীতল দৃঢ়তা।
হিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর…কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই এক ঝটকায় দু’হাত দিয়ে লিওনের বুকে ধাক্কা দিল। অপ্রস্তুত লিওন ভারসাম্য হারিয়ে সোজা বিছানার ওপর পড়ে গেল।
লিওন ধাক্কা সামলে বিছানায় পড়তেই হিয়া তার ওপর চেপে বসল। বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সে নিজের দুই হাত লিওনের মাথার দুপাশে রেখে তার হাতের আঙুলগুলোর ফাঁকে নিজের আঙুলগুলো শক্ত করে গুঁজে দিল।

লিওনকে নড়ার কোনো সুযোগ না দিয়ে হিয়ার শরীরের সম্পূর্ণ ওজন তার ওপর এসে পড়ল।
লিওন বিছানায় পুরোপুরি শুয়ে ছিল। কোমরে জড়ানো শুধুমাত্র সাদা টাওয়েল, আর গায়ে ডেনিম শার্ট—যার একটিও বোতাম লাগানো নেই।
হিয়া পুরোপুরি তার ওপর শুয়ে ছিল।
লিওন সম্পূর্ণভাবে তার উপস্থিতির বৃত্তে আবদ্ধ। তাদের মাঝখানের দূরত্ব এতটাই ক্ষীণ যে একে অপরের উষ্ণ নিঃশ্বাসও স্পষ্ট অনুভব করা যায়।
হিয়ার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। চোখে ফিরে এল সেই চেনা দুর্বোধ্য দীপ্তি। নরম, প্রায় ফিসফিসে স্বরে সে বলল,
— “এভাবে… শান্তভাবে প্রশ্ন করলে তোমার সব প্রশ্নের উত্তর দেব। কিন্তু অফিসারসুলভ রাগ দেখিয়ে বা জেরা করার ভঙ্গিতে প্রশ্ন করলে… একটা উত্তরও পাবে না।”
লিওন বিরক্ত হয়ে চোখ বন্ধ করল। দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ফেলে বুকের ভেতরের অস্থিরতাকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করল। এই মেয়েটার সঙ্গে যুক্তি দেখিয়ে কোনো লাভ নেই—সেটা সে অনেক আগেই বুঝে গেছে।
নিজেকে সংযত করে শান্ত গলায় বলল,

— “ওকে… ফাইন।”
মুহূর্তের মধ্যেই তার চোখের দৃষ্টি পাল্টে গেল। কণ্ঠে ফিরে এল একজন তদন্তকারীর স্বভাবসুলভ কঠোরতা।
—”তোমার বাবা আন্ডারওয়ার্ল্ডের কাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন?”
— “যাহ!”
বিরক্ত হওয়ার ভান করে হিয়া হালকা মাথা নাড়ল। তারপর আর কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে লিওনের গালের কাছে মুখ নিয়ে এল। নিজের নাকের ডগা আলতো করে ছুঁইয়ে দিল তার গালে। পরমুহূর্তেই নরম ঠোঁটের স্পর্শে ধীরে ধীরে গাল বেয়ে নামতে লাগল কিন্তু চুমু দিলো না। তার প্রতিটি ছোঁয়া ছিল সচেতন, প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি ছিল নিখুঁতভাবে হিসেব করা—লিওনের আত্মসংযমে সূক্ষ্ম ফাটল ধরানোর এক নীরব প্রচেষ্টা।
চোয়ালের খাঁজে পৌঁছে সে এক মুহূর্ত থামল। তারপর আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে খুব হালকা একটা কামড় বসাল। উষ্ণ নিঃশ্বাস ছড়িয়ে পড়ল লিওনের গলার কাছে। একের পর এক অপ্রত্যাশিত অঙ্গভঙ্গিতে লিওনকে আরও কোণঠাসা করে সিডিউস করতে করতে, প্রায় ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,
— “আমার আব্বু কোনো আন্ডারওয়ার্ল্ডের ক্রিমিনালের সঙ্গে হাত মেলাননি।”
কয়েক সেকেন্ড থেমে আবার বলল,

— “বরং একজন ডিটেকটিভ হিসেবে আন্ডারকাভারে তাদের ভেতরে ছিলেন।”
লিওনের চোখ মুহূর্তেই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
— “তাহলে কেস ফাইলে অন্য কথা লেখা আছে কেন? সারা পৃথিবী তো সেটাই জানে।”
হিয়ার ঠোঁটে ধীরে ধীরে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে এখন আর সাধারণ কোনো মৃদু চুমুতে থামল না। ধীরে ঝুঁকে এসে লিওনের গালে দীর্ঘক্ষণ ঠোঁট ছুঁইয়ে রাখল। সেই উষ্ণ স্পর্শের রেশ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই আলতো করে পুনরায় কামড়ে দিল গালের কিনারা। মুহূর্তের জন্য লিওনের শরীরের প্রতিটি পেশি টানটান হয়ে উঠল।
তারপর হিয়া আরও একটু ঝুঁকে মুখটা লিওনের কানের কাছে নিয়ে এল। এতটাই কাছে যে তার প্রতিটি উষ্ণ নিঃশ্বাস ছুঁয়ে যাচ্ছিল লিওনের কান আর গলার ত্বক। কয়েক মুহূর্ত সে নীরব রইল। তারপর কানের লতির ঠিক পাশে মুখ রেখে খুব নিচু, মায়াবী স্বরে ফিসফিস করে বলল,
— “পৃথিবীকে যা দেখানো হয়…”
এক মুহূর্ত থেমে সে আবার বলল,
— “…পৃথিবী ঠিক সেটাই বিশ্বাস করে।”

হিয়ার উষ্ণ স্পর্শ, শরীর থেকে ভেসে আসা মাদকতাময় সুবাস, আর এতটা কাছাকাছি যেখানে দুজনের নিঃশ্বাস একে অপরকে ছুঁয়ে যাচ্ছে—সব মিলিয়ে লিওনের বহু যত্নে গড়ে তোলা আত্মসংযম ভেঙে পড়ার উপক্রম হচ্ছিল। তার অবস্থা তখন নাজেহাল। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছিল যে মনে হচ্ছিল, পাঁজর ভেদ করেই বাইরে বেরিয়ে আসবে। ভেতরের সেই ছটফটানিকে আড়াল করতে গিয়ে তাকে নিজের সঙ্গেই নিরন্তর লড়াই করে যেতে হচ্ছিল।
শরীরের ভেতর তাণ্ডব চালানো ঝড়টাকে ইস্পাতকঠিন সংযমে আটকে রেখে সে চোখের পলক না ফেলে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল হিয়ার চোখের দিকে।
আজ তার একটাই লক্ষ্য—
সাত বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা সত্যটা… হিয়ার মুখ থেকেই বের করে আনা।
লিওনের গলার স্বর এবার পুরোপুরি শীতল ও ইস্পাতকঠিন হয়ে উঠল। হিয়ার এই চতুর শরীরী খেলায় কাবু না হয়ে সে কড়া গলায় প্রশ্ন ছুড়ে দিল,

— “তুমি কিভাবে ফিরে এলে বেঁচে? আর ঠিক কী হয়েছিল সাত বছর আগে? ওই ঘটনার সাথে আর কে কে জড়িত আছে, সব বলো আমাকে।”
হিয়া কোনো উত্তর দিল না। উল্টো তার দুষ্টু হাসিটা আরও গাঢ় হলো। সে তার হাতের একটি আঙুল দিয়ে খুব ধীরেসুস্থে লিওনের গালে ও ঠোঁটের কোণে আলতো করে বুলিয়ে দিতে লাগল একেবারে নিখুঁত সিডিউসিং ভঙ্গিতে। তারপর লিওনের কানের কাছে মুখ এনে আরও বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে ফিসফিসাল,
— “এত লম্বা কাহিনী… বলতে গেলে তো পুরো রাত পার হয়ে যাবে, ডার্লিং। তবে হ্যাঁ… এই গল্প শুনতে হলে একটা শর্ত আছে।”
হিয়া একটু থেমে লিওনের মুখের দিকে আরও কিছুটা ঝুঁকে এল। তার চোখের চাউনিতে তখন উন্মাদ মাদকতা।
— “এই কাহিনীর প্রতিটা পাতা শুনতে হলে… আমাকে আমার মতো করে তোমাকে ছুঁতে দিতে হবে। আমি তোমায় আরও তীব্র আর গভীর ভাবে স্পর্শ করব… তোমার এই ঠোঁটে আমার ঠোঁট রাখব, তীব্র ভাবে চুম্বন করবো ঠোঁটজোড়ায় সহ্য করতে পারবে তো?”

কথাটা শেষ করেই হিয়া আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে সোজা নিজের ঠোঁট নামিয়ে আনল লিওনের ঠোঁটের ঠিক ওপর। ঠিক সেই মুহূর্তেই লিওনের ভেতরকার সমস্ত আত্মসংযমের বাঁধ এক ঝটকায় ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। এই চরম প্রলোভন আর শরীরের ভেতর বয়ে যাওয়া অসহ্য আগুন তাকে দিয়ে এক ভুল করিয়ে দিতে পারত, যা সে কোনোভাবেই হতে দিতে পারে না।
হিয়া ঠোঁট ছোঁয়ানোর ঠিক আগের পলকে লিওন নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে এক ধাক্কায় হিয়াকে একপাশে ঠেলে সরিয়ে দিল। বিছানা থেকে ছিটকে মেঝেতে পা রেখে সে এক লাফে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
তার বুক তখন হাপরের মতো উঠছে-নামছে; কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। নিজের অস্থির শ্বাসপ্রশ্বাসকে কোনোমতে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে করতে সে বুঝতে পারল—এই চতুর মেয়েটার সাথে এভাবে এক বিছানায় বেশিক্ষণ কাটালে সে শুধু নিজের প্রফেশনালিজমই হারাবে না, বরং যেকোনো মুহূর্তে নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণও হারিয়ে বসবে।
লিওন কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর গভীর শ্বাস নিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,

“তোমাকে কিছুই বলতে হবে না।”
“ভোর হলেই আমার বাড়ি থেকে চলে যাবে।”
হিয়া কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে কাঁধ ঝাঁকাল।
“ওকে, বেবি।”
লিওন আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ড্রেসিং টেবিল থেকে সিরামের বোতল তুলে মুখে লাগাতে লাগল। নিজের মনকে অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে সে। এদিকে হিয়া পকেট থেকে একটি সিগারেট বের করে ঠোঁটে চেপে ধরল।
লাইটার জ্বালাতে যাবে, ঠিক তখনই আয়নায় তার প্রতিচ্ছবি দেখে লিওন তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠল,
“হেই, স্টপ!”
হিয়া ভ্রু তুলে তাকাল।
লিওন ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “এটা আমার বাড়ি। আমার রুম।”
“এখানে স্মোকিং করা যাবে না।”
“আমি নিজেও ধূমপান করি না। আমার রুমে ধোঁয়ার গন্ধও চাই না।”
হিয়া সিগারেটটা ঠোঁটেই রেখে মৃদু হেসে বলল,
“কিন্তু আমার এখন ভীষণ স্মোকিংয়ের ক্রেভিং হচ্ছে।”
“না করলে ভেতরে অস্বস্তি লাগবে।”
লিওন বিরক্ত হয়ে ড্রয়ার খুলল। ভেতর থেকে একটা ললিপপ বের করে তার দিকে ছুড়ে দিল।

“এটা খাও।”
“কিন্তু এই রুমে স্মোকিং করা যাবেনা।”
হিয়া ললিপপটা হাতে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিগারেটটা পকেটে রেখে দিল।
“ঠিক আছে আপনার আদেশই শেষ কথা,অফিসার।”
হিয়া ললিপপটা হাতে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সিগারেট না পাওয়ার রাগে ভেতরটা ফুঁসে উঠলেও সে তা মুখে প্রকাশ করল না বরং নিজেকে শান্ত রাখার ভান করে মোড়কটা ছিঁড়ল আর একরকম জোর করেই ললিপপটা মুখে পুরে দিল। তার সেই চাপা ক্ষোভ, কিছুটা বাঁকা চাহনি আর মুখে ক্যান্ডি নিয়ে বিরক্তিতে হালকা ঠোঁট গোল করার অবচেতন ভঙ্গিটা কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই অদ্ভুত একটা অনিচ্ছাকৃত আকর্ষণে ভরপুর ছিল।

কক্ষে আবার নীরবতা নেমে এল। লিওন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও অজান্তেই তার চোখ চলে গেল হিয়ার দিকে। সিগারেটের বদলে মুখে ওই ললিপপ গুঁজিয়ে বসে থাকা হিয়ার এই অভিমানী অথচ শান্ত রাখার চেষ্টা করা কাণ্ডটা দেখতে দেখতে লিওনের সমস্ত পেশি টানটান হয়ে উঠল। তার ওই চাপা রাগ আর ললিপপের স্টিকটার মন্থর নড়াচড়া এমন একটা তীব্র শরীরী আবেদন তৈরি করল, যা হিয়ার বিন্দুমাত্র ধারণার বাইরে থেকে লিওনের আত্মসংযমের ওপর একটা বড় ধাক্কা দিল।
লিওনের বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তিকর টান অনুভূত হলো; তার শ্বাস ভারী হয়ে এল। পরক্ষণেই নিজের ঘোর কাটানোর জন্য দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে সে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাল। মনে মনে নিজেকেই ধমক দিল—

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১৯

“ফোকাস, লিওন… ফোকাস।”
আর হিয়া সিগারেট না পাওয়ার বিরক্তিতে মনে মনে মুখ ফুলিয়ে নিঃশব্দে ললিপপ খেয়ে যাচ্ছে, বিন্দুমাত্র ধারণা ছাড়াই যে তার এই উদাসীন ভঙ্গিতে ললিপপ খাওয়া লিওনকে ভেতর থেকে কতটা নাজেহাল করে তুলছে।

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here