Home আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৩৩

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৩৩

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৩৩
সাবিলা সাবি

হাসপাতালের পেছনের গেট পেরিয়ে বাইরে আসতেই হিয়া কয়েক মুহূর্ত থেমে দাঁড়াল। দীর্ঘ চব্বিশ ঘণ্টা অচেতন থাকার পর জ্ঞান ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু শরীরটা এখনও পুরোপুরি তার সঙ্গ দিচ্ছে না। মাথার ভেতর হালকা ঝিমঝিম করছে, পায়ের নিচের মাটিটাও মাঝে মাঝে দুলে উঠছে বলে মনে হচ্ছে। তবু ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত আত্মবিশ্বাসী হাসিটা ফিরে এসেছে। হাসপাতালের সেই চার দেয়াল, অসংখ্য পরীক্ষা আর কড়া নিরাপত্তার বেষ্টনী পেরিয়ে নিজের ইচ্ছায় বাইরে দাঁড়াতে পারাটাই এই মুহূর্তে তার কাছে যথেষ্ট।
ঠিক তখনই ওপর থেকে ডানা ঝাপটানোর শব্দ ভেসে এলো। হিয়া মাথা তুলে তাকাতেই কালো-সোনালি ডানার বিশাল ছায়াটা নিচে নেমে এল। পরের মুহূর্তেই তার পোষা গোল্ডেন ঈগল ‘শ্যাডো’ নিখুঁত ভারসাম্যে হিয়ার কাঁধের ওপর বসে পড়ল।
হিয়া একবার তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

— তুইও খবর পেয়ে গেছিস?
শ্যাডো নিচু স্বরে ডাকতেই হিয়া তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল।
— চল। আমার এখনও একটা কাজ বাকি।
তার শরীর যতই দুর্বল হোক, সিদ্ধান্তটা পরিষ্কার—লিওনকে তাকে দেখতেই হবে।
অন্যদিকে হাসপাতালের ভেতরে ততক্ষণে হিয়ার পালিয়ে যাওয়ার খবর পৌঁছে গেছে ইভানা আর মার্কের কাছে। দুজন দ্রুত কেবিনে এসে দেখল, বিছানাটা খালি পড়ে আছে। জানালাটা খোলা, আর জানালার পাশের পানির পাইপটা দেখেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল।
মার্ক জানালার দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাসের সঙ্গে বলল,
— উনি কি সত্যিই এখান দিয়ে পালিয়ে গেছে?
ইভানা কিছুক্ষণ খোলা জানালাটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথা নাড়ল।

— হ্যাঁ।
মার্কের চোখে তখনও অবিশ্বাস কাটেনি। সে জানালার কাছে গিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
— কিন্তু তার তো সবেমাত্র জ্ঞান ফিরে পেল! এই অবস্থায়ও কীভাবে—
ইভানা এবার ধীরে ধীরে মার্কের দিকে ফিরল। তার চোখেমুখে বিস্ময়ের চেয়ে হিয়ার স্বভাব সম্পর্কে পুরোনো পরিচিতির ছাপটাই বেশি ছিল।
—মিস্ট্রেসকে তুমি যতটা দুর্বল ভাবছ, সে নিজেকে তার চেয়ে অনেক বেশি শক্ত মনে করে। আর সে যখন কোনো কিছু করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন শরীরের অবস্থা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না। এটা কি তুমি ভুলে গেছো, মার্ক?
মার্ক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। হিয়ার স্বভাবের কথা মনে পড়তেই তার মুখের বিস্ময়টা ধীরে ধীরে অসহায়তায় বদলে গেল। শেষ পর্যন্ত সে ইভানার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তাহলে এখন কী করবে, ইভানা?
ইভানা কিছু বলার আগেই তার ফোনটা বেজে উঠল। সে পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই চোখ আটকে গেল। স্ক্রিনে ‘মিস্ট্রেস’ নামটা ভেসে উঠছে।
হিয়া।
ইভানার ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য একটা হাসি ফুটে উঠল। হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরও হিয়া নিজেই যোগাযোগ করছে—এটা তার কাছে খুব একটা আশ্চর্যের বিষয় নয়। সে কলটা রিসিভ করে ফোনটা কানের কাছে তুলল।

— কোথায় আপনি?
ওপাশ থেকে হিয়ার শান্ত কণ্ঠ ভেসে এলো,
— বাইরে।
ইভানা চোখ নামিয়ে মেঝের দিকে তাকাল। হিয়ার গলায় সেই স্বাভাবিক দৃঢ়তা শুনেই সে বুঝে গেল, এই মুহূর্তে তাকে ফিরিয়ে আনার কোনো কথাই হিয়া শুনবে না। তবু দায়িত্ববোধ থেকে আবার জানতে চাইল,
— সেটা বুঝতে পারছি। কিন্তু কোথায় যাচ্ছেন?
হিয়া কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল,— আমার দিলবারকে দেখতে।
লিওনের নাম শুনে ইভানার চোখের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। সে হিয়ার স্বভাব জানে, আর হিয়ার এই অবস্থায় হাসপাতাল থেকে পালানোর একমাত্র সম্ভাব্য কারণটাও এখন তার কাছে পরিষ্কার। তাই আর তাকে বোঝানোর চেষ্টা না করে একটু নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,

— একা যাচ্ছেন?
ওপাশ থেকে হিয়া খুব স্বাভাবিকভাবেই বলল,
— শ্যাডো আছে।
ইভানার ঠোঁটে এবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও হালকা হাসি ফুটে উঠল। হিয়ার উত্তরের মধ্যেই যেন তার নিজের একটা যুক্তি লুকিয়ে আছে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইভানা আবার বলল,
— আপনার শরীরের অবস্থা জানেন তো?
— জানি।
ইভানা ফোনটা কানের কাছে ধরে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর শেষবারের মতো বোঝানোর চেষ্টা করে বলল,
— তাহলে ফিরে আসুন।
হিয়া নিজের কণ্ঠে এবার হালকা হাসি মিশিয়ে বলল,
— পারব না।
ইভানা বুঝতে পারল, কথায় আর লাভ নেই। তবু অভ্যাসবশত তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল,
— মিস্ট্রেস…

ওপাশ থেকে কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে হিয়া বলল,
— আমার বাইকটা নিয়ে আয় ইভানা।
ইভানা এবার আর আপত্তি করল না। শুধু স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জানতে চাইল,
— কোথায় আসতে হবে?
হিয়া তার অবস্থান জানিয়ে দিল। তারপর সোজা কলটা কেটে দিল।
মার্ক এতক্ষণে ইভানার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। ফোনটা নামাতেই সে জিজ্ঞেস করল,
— কে ছিল?
ইভানা ফোনটা পকেটে রেখে বলল,
— মিস্ট্রেস।
মার্কের ভ্রু কুঁচকে গেল।
— কী বলল?
ইভানা শান্ত গলায় উত্তর দিল,

— অফিসার লিওনকে দেখতে যাচ্ছে। আর আমাকে ওনার বাইক নিয়ে যেতে বলেছে।
মার্ক হতাশ হয়ে মাথা নাড়ল। তারপর খোলা জানালাটার দিকে তাকিয়ে বলল,
— ওনাকে আটকানোর কোনো উপায় নেই, তাই না?
ইভানা এবার কিছুক্ষণ চুপ করে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি নিয়ে বলল,
— ভাইপারকে আটকানো সম্ভব না আর এখন তো অফিসার লিওনের হিয়াকে আরো সম্ভব না।
মার্ক কৌতূহলী চোখে তার দিকে তাকাল।
— পার্থক্যটা কী?
ইভানা বাইকের চাবিটা হাতে তুলে নিয়ে ধীর গলায় বলল,
— ভাইপার নিজের নিয়মে চলে। আর হিয়া নামের নারীটা নিজের মানুষটার জন্য।
কথাটা বলেই ইভানা বেরিয়ে যাওয়ার জন্য এগিয়ে গেল। সে জানে, এবার তাকে শুধু হিয়ার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। কারণ হিয়াকে থামানোর দায়িত্ব নেওয়ার মতো বোকামি সে করবে না।

হাসপাতালের অন্য প্রান্তে ততক্ষণে খবরটা পৌঁছে গেছে দানিয়েলের কাছেও। সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করেই হাসপাতালে চলে এসেছে।
খবরটা শোনার পর থেকে অন্ধকারের সম্রাট কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে হিয়ার খালি কেবিনের দিকে গিয়ে থামল। বিছানার ওপর পড়ে থাকা চাদর, খোলা জানালা আর জানালার নিচে থাকা পানির পাইপ—সবকিছু মিলিয়ে পালানোর পদ্ধতিটা বুঝতে তার বেশি সময় লাগল না।
তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
— কীভাবে বের হলো ও?
কেউ উত্তর দেওয়ার সাহস পেল না।
দানিয়েলের দৃষ্টি এবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ডাক্তার আর নার্সের ওপর গিয়ে থামল। দুজনের মুখেই আতঙ্ক স্পষ্ট। ডাক্তার কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।

— স্যার, আমরা…
দানিয়েল হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। তার কণ্ঠ ছিল আশ্চর্যরকম শান্ত।
— আপনাদের কারও কোনো দোষ নেই।
ডাক্তার ও নার্স দুজনেই বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকালেন।
দানিয়েল জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
— ভাইপার যদি বের হতে চায়, হাসপাতালের দরজা বন্ধ করে তাকে আটকে রাখা সম্ভব নয়। আর তাকে আটকাতে গিয়ে আপনারা নিজেদের বিপদে ফেলবেন, সেটা আমি চাই না।
ডাক্তার যেন কিছুটা স্বস্তি পেলেন। দানিয়েল পকেট থেকে ফোন বের করে নিজের লোককে কল করল।
— ভাইপারকে খুঁজে বের করো।
ওপাশ থেকে কিছু জিজ্ঞেস করা হলো। দানিয়েল কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল,
— ওকে থামাবে না। শুধু নজরে রাখবে। ও যেন নিরাপদে থাকে, সেটা নিশ্চিত করবে।
বাক্যটা সম্পুর্ন করেই কল কেটে দিল সে। তারপর ধীরে ধীরে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো। কিন্তু করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে তার মুখের কঠোরতা আর ধরে রাখা গেল না। হিয়া কোথায় গেছে, সেটা সে এখন অন্তত বুঝতে পারছে।

অফিসার লিওনের কাছে।
এই একটা কথাই অন্ধকারের সম্রাটের ভেতরে এমন একটা অস্থিরতা তৈরি করেছে, যার কোনো নাম সে নিজেও দিতে চাইছে না।
হসপিটালের করিডোর তখন অনেকটাই শান্ত। রাত হওয়ায় রোগীদের স্বজনদের আনাগোনাও কমে এসেছে। মৃদু আলোয় লম্বা করিডোরটা প্রায় ফাঁকা। দানিয়েল হিয়ার খালি কেবিন থেকে বেরিয়ে ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল। কয়েক মুহূর্ত আগেও তার চোখের সামনে ছিল খালি বিছানা, খোলা জানালা আর জানালার পাশে থাকা পানির পাইপটা। হিয়া আবারও নিজের ইচ্ছেমতো সবকিছু করে ফেলেছে—এই সত্যিটা মেনে নেওয়া ছাড়া তার সামনে আপাতত আর কোনো পথ নেই।
করিডোরের মাঝামাঝি আসতেই পেছন থেকে পরিচিত একটা নারীকণ্ঠ ভেসে এলো,
— তুমি চার্চে গিয়েছিলে?
দানিয়েলের পায়ের গতি থেমে গেল। পরিচিত কণ্ঠটা শুনে সে ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল। করিডোরের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে লেডি ভিক্টোরিয়া। তার ইয়াং সৎ ফুপি। মুখে সেই চিরচেনা স্থিরতা থাকলেও চোখের দৃষ্টিতে আজ স্পষ্ট কৌতূহল।
দানিয়েল কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত স্বরে বলল,

— তুমি লন্ডনে কখন এলে? আর এসেই তুমি আমাকে ফলো করেছো?
ভিক্টোরিয়ার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
— করেছি। তবে তোমাকে ফলো করার চেয়েও একটা বিষয় আমাকে বেশি অবাক করেছে।
দানিয়েল ভ্রু সামান্য উঁচু করল — কী?
ভিক্টোরিয়া ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এসে বলল,
— তুমি সত্যিই কি ওই মেয়েটার প্রতি অবসেসড?
প্রশ্নটা শুনে দানিয়েল সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর দিল না। তার চোখে অস্বস্তির ছাপ নেই, আবার প্রশ্নটা অস্বীকার করার তাড়নাও নেই। বরং ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য একটা হাসি ফুটিয়ে সে পাল্টা প্রশ্ন করল,

— কী মনে হয়?
ভিক্টোরিয়া কয়েক মুহূর্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। দানিয়েলের এই স্বভাব তার অজানা নয়। নিজের কথা সরাসরি বলার বদলে প্রশ্নের উত্তরও সে অনেক সময় প্রশ্ন দিয়েই দেয়। তাই এবার ভিক্টোরিয়া নিজের কথাটাই আরও পরিষ্কার করে বললেন,
— তুমি তো কখনোই হিয়ার এতটা ঘনিষ্ঠভাবে কাছে ছিলে না, দানি। তাহলে আমি বুঝব কী করে তুমি সত্যিই ওর প্রতি অবসেসড কি না?
দানিয়েলের ঠোঁটের কোণের হাসিটা এবার সামান্য গভীর হলো। সে ধীর পায়ে ভিক্টোরিয়ার আরও কাছে এসে দাঁড়াল।
— অবসেসড হতে হলে শারীরিকভাবে কাছে থাকতে হয়, বুঝি?
ভিক্টোরিয়া আর কিছু বললো না। দানিয়েলও তার দৃষ্টি সরাল না। তার ল্যাভেন্ডার চোখের মণির দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল ভিক্টোরিয়ার চোখের মণিতে। কয়েক মুহূর্ত পর দানিয়েল খুব শান্ত স্বরে বলল,
— আমার ল্যাভেন্ডার চোখের মণির দৃষ্টি তার ব্রাউনিশ চোখের মণিতে এই পর্যন্ত সতেরো হাজার চারশ বত্রিশ বার মিলিত হয়েছে।

কথাটা শুনে ভিক্টোরিয়ার চোখে বিস্ময় স্পষ্ট হয়ে উঠল। সংখ্যাটা যে দানিয়েল শুধু বলার জন্য বলছে না, সেটা তার স্বরের নিশ্চয়তাতেই বোঝা যাচ্ছে। একজন মানুষের চোখের দিকে কতবার তাকিয়েছে, সেই হিসাব পর্যন্ত যে মানুষটা নিজের ভেতরে ধরে রেখেছে, তার অনুভূতিকে আর সাধারণ কোনো আকর্ষণ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
দানিয়েল তার বিস্মিত মুখের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল, — আশা করি, এটুকুই যথেষ্ট তোমার বোঝার জন্য।
কথাটা শেষ করেই সে আর কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন বোধ করল না। ভিক্টোরিয়াকে পাশ কাটিয়ে আবারও করিডোর ধরে এগিয়ে গেল।
লেডি ভিক্টোরিয়া তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। দানিয়েলকে সে বহু বছর ধরে চেনে। অন্ধকার জগতের এই সম্রাট নিজের দুর্বলতা কাউকে দেখায় না; মানুষের জীবন, মৃত্যু কিংবা বিশ্বাসঘাতকতা—সবকিছুর হিসাব সে ঠান্ডা মাথায় করতে পারে। অথচ একজন মেয়ের সঙ্গে তার চোখ কতবার মিলেছে, সেই সংখ্যাটাও সে মনে রেখেছে।
ভিক্টোরিয়ার ঠোঁটে ধীরে ধীরে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। মাথা সামান্য নেড়ে নিজের মনেই বললো,
— তুমি সত্যিই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পথে, দানি।

কিছুক্ষণ পরেই রাতের নীরবতা ভেঙে দূর থেকে ভেসে এলো বাইকের ইঞ্জিনের শব্দ। শব্দটা ধীরে ধীরে কাছে আসতেই ইভানা বাইক নিয়ে এসে হিয়ার সামনে থামল।
হিয়া কোনো কথা বলল না। শুধু একবার ইভানার দিকে তাকিয়ে বাইকের কাছে এগিয়ে গেল। শ্যাডো তখনও তার কাঁধে নিশ্চুপ বসে আছে।
হিয়া বাইকে উঠে বসল। ইঞ্জিন স্টার্ট করতেই গর্জে উঠল বাইকটা। রাতের ফাঁকা রাস্তায় সেই শব্দ ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে।
তার গন্তব্য একটাই—লিওন।
বাইকটা নিয়ে হিয়া এগিয়ে যেতে শুরু করল। ঠান্ডা বাতাস তার এলোমেলো চুলগুলো উড়িয়ে দিচ্ছিল। হাসপাতালের পোশাকটা শরীরের সঙ্গে অস্বস্তিকরভাবে লেগে ছিল। তবু কিছুদূর যাওয়ার আগ পর্যন্ত সেসব নিয়ে ভাবেনি সে।
কিন্তু হঠাৎই বাইকের ব্রেক চেপে ধরল হিয়া বাইকটা রাস্তার মাঝখানে থেমে গেল। কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে থেকে সে ধীরে ধীরে বাইকের আয়নার দিকে তাকাল।
আয়নায় ভেসে উঠল তার নিজের মুখ।
কেমন একটা ফ্যাকাশে হয়ে আছে আর সারা মুখ জুড়ে ক্লান্তির ছাপ। চোখেমুখে এখনো হাসপাতালের রাতগুলোর ছাপ স্পষ্ট।
অন্ধকারের সম্রাজ্ঞী কয়েক সেকেন্ড নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা একটা হাসি দিল।

না।
এভাবে লিওনের সামনে যাওয়া যাবে না।
লিওন তাকে যখন দেখবে, তখন তার চোখে যেন প্রথমেই এই ফ্যাকাশে মুখটা না পড়ে। হাসপাতালের পোশাক পরা, ক্লান্ত আর দুর্বল একটা মেয়েকে সে দেখতে পাবে—এটা হিয়া চায় না।
সে চায়, লিওন যখন তার দিকে তাকাবে, তখন কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও তার চোখ আটকে যাক।
পরিপাটি পোশাকে, সুন্দর করে সাজানো চুলে, নিজের স্বাভাবিক আকর্ষণ আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে সে লিওনের সামনে দাঁড়াতে চায়। এমনভাবে, যেন লিওন একবার তাকিয়েই বুঝতে পারে—হিয়া এখনো ভাইপার হয়েই আছে।
তার অসুস্থতা, দুর্বলতা কিংবা এই ফ্যাকাশে মুখটা লিওনের সামনে নিয়ে যেতে রাজি নয় সে। হিয়ার ঠোঁটের কোণে এবার হাসিটা আরও স্পষ্ট হলো।
— না… আজ না” কণ্ঠটা নিচু শোনালেও সিদ্ধান্তটা ছিলো দৃঢ়। সে আবার আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

— কাল যাব। একদম পরিপাটি হয়ে।
কাল সে লিওনের সামনে এমনভাবে দাঁড়াবে, যেভাবে দাঁড়ালে তার চোখে হিয়াকে ছাড়া আর কিছুই ধরা পড়বে না।
আজ বাড়ি ফিরবে সে। তারপর শ্যাডোর মাধ্যমে লিওনের কাছে পাঠাবে একটা চিরকুট। সেখানে থাকবে একটি নির্দিষ্ট সময় আর একটি নির্দিষ্ট লোকেশন।
কোনো নাম নয়। কোনো বাড়তি ব্যাখ্যাও নয়। শুধু দেখা করার সময় আর জায়গা। হিয়া জানে, চিরকুটটা লিওনের হাতে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই সে বুঝে যাবে এটা কার কাছ থেকে এসেছে।
আর এবার হিয়া তার কাছে যাবে না। এবার লিওনকেই তার কাছে আসতে হবে। হিয়া বাইকটা ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে নিল। কাঁধের ওপর বসে থাকা শ্যাডো ডানা মেলল, তারপর আবার স্থির হয়ে বসে রইল। রাতের অন্ধকার ভেদ করে দুর্ধর্ষ মানবী টাউন হাউসের দিকে রওনা হলো।
আজ সে লিওনের কাছে যাবে না।কিন্তু কাল— কাল তার দিলবারকে তার সামনে আসতেই হবে।

টাউন হাউসে ফিরে নিজের ব্যাক্তিগত কক্ষে ঢুকেই হিয়া কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। শরীরটা এখনও দুর্বল। হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আসার পর এতক্ষণ বাইক চালানোর ক্লান্তি এখন যেন একসঙ্গে এসে শরীরের ওপর চেপে বসেছে।
তবু তার চোখে ক্লান্তির চেয়ে অন্য কিছু বেশি স্পষ্ট—একটা অন্যরকম উত্তেজনা। কাল সে লিওনের সঙ্গে দেখা করবে।
হিয়া ধীরে ধীরে টেবিলের সামনে গিয়ে বসল। ড্রয়ার খুলে একটা ছোট সাদা কাগজ বের করল। কলমটা হাতে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে লিখতে শুরু করল।
কয়েক লাইন লেখার পর আবার পড়ে দেখল। কোথাও একটা শব্দ পছন্দ না হওয়ায় কেটে দিল। তারপর নতুন করে লিখল।
শেষ পর্যন্ত কাগজটা ভাঁজ করে খুব যত্ন করে ছোট একটা চিরকুট বানিয়ে ফেলল। হিয়া চিরকুটটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর মৃদু স্বরে বলল,

— এবার তোর কাজ, শ্যাডো।
কাঁধে বসে থাকা বিশাল গোল্ডেন ঈগলটা মাথা কাত করে তার দিকে তাকাল। হিয়া চিরকুটটা তার ঠোঁটের কাছে ধরে বলল,
— দিলবারকে এটা দিয়ে আসবি। ওকে বাড়িতে ঢুকতে দেখার পর। তার আগে না কিন্তু।
শ্যাডো যেন কথাটা বুঝতে পারলো তাই এমনভাবেই নিচু স্বরে ডাকল। হিয়া মৃদু হেসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
— আর সাবধানে। চিরকুটটা কিন্তু আমার প্রাণের থেকেও দামি যদিও তোর ওপর আমার অগাধ বিশ্বাস আছে।

রাত আরও গভীর হলো। লন্ডনের আকাশে তখন মেঘের আড়ালে চাঁদ দেখা যাচ্ছে। শহরের আলোয় রাস্তা জ্বলজ্বল করছে। সেই আলো পেরিয়ে কিছুক্ষণ পর একটা গাড়ি এসে থামল হায়াস ম্যানসনের সামনে।
সিআইডি হেডকোয়ার্টারে দীর্ঘ একটা দিন কাটিয়ে অবশেষে বাড়ি ফিরেছে অফিসার লিওন।
গাড়ি থেকে নেমে সে ক্লান্ত পায়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকল। সারাদিনের কাজের চাপ মাথার মধ্যে এখনও ঘুরছে। বাড়ির ভেতরের নিস্তব্ধতাটাই এই মুহূর্তে তার কাছে সবচেয়ে স্বস্তির।
নিজের রুমে ঢুকে জ্যাকেটটা খুলে চেয়ারের ওপর রাখল। তারপর ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলল।
ঠিক তখনই—বারান্দার দিক থেকে ডানা ঝাপটানোর একটা শব্দ ভেসে এলো। লিওনের হাত থেমে গেল। শব্দটা আবার হলো। এই শব্দ চিনতে তার এক মুহূর্তও লাগল না। তার চোখে সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়ের ছায়া নেমে এলো।
শ্যাডো।

এই শব্দ সে ভুলতে পারে না। কতবার এই বিশাল গোল্ডেন ঈগলটা তার বারান্দায় এসে বসেছে! হিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক যতই অন্যরকম হোক, শ্যাডোর উপস্থিতিটা তার কাছে এখন আর অপরিচিত নয়।
লিওন দ্রুত বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল।দরজা খুলতেই তার চোখ থমকে গেল। বারান্দার রেলিংয়ের ওপর বসে আছে শ্যাডো। আর তার ঠোঁটে ধরা একটা ছোট্ট সাদা চিরকুট।
লিওনের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন একটা করে উঠল।
সে আর কোনো প্রশ্ন করার প্রয়োজন বোধ করল না।
শ্যাডো এখানে এসেছে মানেই—হিয়া।
তারমানে হিয়ার জ্ঞান ফিরেছে! লিওন দ্রুত শ্যাডোর কাছ থেকে চিরকুটটা নিয়ে নিল। তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য কাগজটার ওপর স্থির হয়ে রইল। তারপর সাবধানে ভাঁজ খুলল।
প্রথম লাইনটা পড়তেই তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
চিরকুটে লেখা—“আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় দিলবার!
ওরা বাইরে সিকিউরিটি দিয়ে রেখেছিল। জ্ঞান ফিরেই তোমাকে দেখার জন্য হাসপাতালের জানালা দিয়ে পালিয়েছি। তোমার কাছে আসতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু এই অবস্থায় তোমার কাছে যেতে চাইনি। তাই বাড়িতে ফিরে এসেছি। কালকে The Monocle Cafe-তে চলে আসবে। ওটা পুরোটা কালকের জন্য আমি বুক করে নিয়েছি শুধু তোমার আর আমার জন্য। আমি অপেক্ষা করবো সময় মতো চলে আসবে আর যদি না আসো, এরপর কী হবে—তা আমি নিজেও এখন বলতে পারছি না। বাজপাখি।”

শেষ শব্দটার দিকে তাকিয়ে লিওন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে হেসে ফেলল।
— এই মেয়েটা আসলেই একটা সাইকো…
সে আবার চিরকুটটার দিকে তাকাল। হাসপাতালের জানালা দিয়ে পালিয়েছে! মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে জ্ঞান ফিরেছে, শরীর এখনও পুরোপুরি সুস্থ নয়—তারপরও হাসপাতালের নিরাপত্তা ভেঙে পালিয়ে বেরিয়ে এসেছে শুধু তাকে দেখতে।
লিওন মাথা নেড়ে হালকা হাসল।
— আসলেই মেয়েটা পাগল।
কিন্তু কথাটা বলার পরও তার হাসিটা মিলিয়ে গেল না।
বরং চিরকুটটা আবারও চোখের সামনে তুলে ধরল সে।
হিয়া তাকে দেখতে চেয়েছে। এই একটা কথাই অদ্ভুতভাবে তার ভেতরটা নরম করে দিচ্ছে। হিয়া তার জীবন বাঁচিয়েছে।

নিজের জীবন বিপন্ন করে তাকে বাঁচিয়েছে।সেই ঋণ শুধু কথায় শোধ করার নয়। আর হিয়া যতই বিপজ্জনক হোক, যতই উন্মাদসুলভ সিদ্ধান্ত নিক—এই সত্যিটা লিওন অস্বীকার করতে পারবে না।
তাকে যেতেই হবে। হিয়ার সঙ্গে দেখা করতেই হবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও লিওনের মনে হলো— সে শুধু ঋণ শোধ করার জন্য যেতে চাইছে না। কোথাও একটা অন্য কারণও আছে।
হয়তো হিয়ার জ্ঞান ফিরেছে—এই খবরটা জানার পর থেকেই নিজের অজান্তে সে মেয়েটাকে দেখতে চাইছে খুব করে।
লিওন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিজের অজান্তেই আবার চিরকুটটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

— কাল দেখা হচ্ছে তাহলে, হর্নি ফক্স।
তারপর চিরকুটটা ভাঁজ করে বুকপকেটে রেখে দিল।
শ্যাডো তখনও বারান্দার রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। লিওন তার দিকে তাকিয়ে হালকা মাথা নাড়ল।
—হেই ইডিয়ট শ্যাডো! ওকে বলে দিস, আমি আসব।
শ্যাডো ডানা মেলে আকাশে উড়ে গেল। লিওন অনেকক্ষণ সেই অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে নিজের কক্ষের ভেতরে ফিরে গেল।
কিন্তু আজ বহুদিন পর, ক্লান্ত একটা দিনের শেষে তার মাথায় কোনো কেসের চিন্তা নেই। আছে শুধু একটা উন্মাদ, বেপরোয়া, বিপজ্জনক নারী।
একজন সাইকো, ক্রিমিনাল অসম্ভব জেদি নারী—যে হাসপাতালের জানালা দিয়ে পালিয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত তাকে দেখতে না এসে বাড়ি ফিরে গেছে।
কারণ সে চায়নি, লিওন তাকে দুর্বল অবস্থায় দেখুক।
অদ্ভুত বিষয় হলো। হিয়ার এই পাগলামিটা এতদিন তার কাছে বিরক্তিকর লাগত।
আজ কেন যেন— ভীষণ ভালো লাগছে।
সকালটা টাউন হাউসের ওপর ধীরে ধীরে নেমে এসেছে। রাতের অন্ধকার সরে গিয়ে বড় বড় জানালাগুলো দিয়ে নরম রোদের আলো ভেতরে ঢুকছে। অথচ বাড়ির ভেতরের পরিবেশে সকালের সেই স্বাভাবিক ব্যস্ততার কোনো ছাপ নেই।

হিয়া সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামছিল। হাসপাতাল থেকে ফিরে রাতটা প্রায় জেগেই কাটিয়েছে সে। শরীর এখনও পুরোপুরি সুস্থ নয়, কিন্তু মুখে তার কোনো দুর্বলতার ছাপ নেই। বরং আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারা দেখে বেশ সন্তুষ্টই হয়েছে সে।
আজ তাকে লিওনের সঙ্গে দেখা করতে হবে। ঠিক তখনই মূল দরজা খুলে দানিয়েল ভেতরে ঢুকল।
সারারাত হাসপাতাল আর নিজের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার পর তার মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু হিয়াকে সিঁড়ির কাছে দেখতে পেয়েই তার পা থেমে গেল।
দুজনের চোখাচোখি হলো। দানিয়েল কয়েক সেকেন্ড হিয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত গলায় বলল,
— হাসপাতাল থেকে পালিয়েছো কেন?
হিয়া সিঁড়ির শেষ ধাপটায় এসে দাঁড়াল। মুখে একটুও অপরাধবোধ নেই। বরং স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

— বস, আমার ওখানে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। তাই চলে এসেছি।
দানিয়েলের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। — এটাই কারণ?
হিয়া চোখ তুলে তার দিকে তাকাল। — হ্যাঁ। এটা ছাড়া আর কী হবে?
দানিয়েল কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। হিয়াকে সে চেনে। এই মেয়ের কাছ থেকে সত্যি বের করার জন্য জেরা করার কোনো মানে নেই, যদি সে নিজেই কথা বলতে না চায়।
তবু তার কণ্ঠ এবার কিছুটা কঠিন হলো। — তোমার সুস্থ হওয়া প্রয়োজন। সামনে আরও বড় বড় মিশন আছে। সেটা জানো তো?
হিয়া সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,— সমস্যা নেই। আমি সুস্থ আছি। এখন অনেকটাই ভালো লাগছে।
দানিয়েলের দৃষ্টি একবার হিয়ার মুখ থেকে তার হাতে, তারপর পুরো শরীরের দিকে গেল। চোখে স্পষ্ট বোঝা গেল—সে হিয়ার কথাটা পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি।
কিন্তু আর কিছু বলল না। কয়েক মুহূর্ত নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে শুধু বলল,

— ঠিক আছে।
তারপর হিয়াকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।
হিয়া ঘুরে তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। দানিয়েল সিঁড়ির কাছে পৌঁছে একবার থামল। যেন কিছু বলতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত বলল না। তারপর সোজা উপরের দিকে চলে গেল।
হিয়া ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে নিজের মনে বলল,
— এত চিন্তা করেন কেন, বস?
তারপর ঘড়ির দিকে তাকাল। সময় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
আজ তার একটা দেখা করার কথা আছে। আর সেই দেখা—
তার দিলবারের সঙ্গে।
নিজের কক্ষে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করতেই দানিয়েল কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ইজি চেয়ারটায় গিয়ে বসে মাথাটা পেছনে ঠেকাল।
চোখজোড়া বন্ধ করল সে। কিন্তু কিছুতেই শান্তি পেল না। বরং চোখ বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গেই একটা দৃশ্য বারবার তার সামনে ফিরে আসতে লাগল।
হিয়ার গাড়িটা। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই গাড়িটা।
আর তার সামনে মৃত্যুকে উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকা হিয়া। তাও একজন সিআইডি অফিসারকে বাঁচানোর জন্য। দানিয়েলের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে চোখ খুলে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল।

— কেন?
এই একটা মাত্র প্রশ্ন। কিন্তু সেই প্রশ্নটাই তার মাথার ভেতর হাতুড়ির মতো আঘাত করতে লাগল।
কেন হিয়া? কেন ওই অফিসার লিওন?
দানিয়েল জানে হিয়া কেমন মেয়ে। হিয়া কাউকে সহজে নিজের কাছে আসতে দেয় না। নিজের জীবন তো দূরের কথা, নিজের অনুভূতিগুলোও সে কাউকে দেখায় না।
কিন্তু সেই মেয়েটাই নিজের জীবন বাজি রেখে একজন সিআইডি অফিসারকে বাঁচিয়েছে। তারপর আবার জ্ঞান ফেরার পর হাসপাতাল থেকে পালিয়ে গেছে।
দানিয়েলের আঙুলগুলো ধীরে ধীরে মুঠো হয়ে গেল।
তার মাথায় এবার আরও ভয়ংকর একটা চিন্তা ঢুকে পড়ল।
হিয়া কি লিওনকে ভালোবাসে? সে কি ওই লিওনের প্রতি অবসেসড?
প্রশ্নটা মনে আসতেই তার বুকের ভেতরটা জ্বলেপুড়ে উঠল।

— না।
সে নিজেই নিজেকেই উত্তর দিল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর আবার মনে হলো—
যদি হয়?
দানিয়েলের শ্বাস ভারী হয়ে উঠল। সে সামনে ঝুঁকে দুহাতের কনুই হাঁটুর ওপর রাখল।
তারপর খুব নিচু স্বরে বলল,— তাহলে এতদিন আমি কী ছিলাম?
প্রশ্নটার উত্তর তার কাছে নেই। সে হিয়ার জন্য কত কিছু করেছে। কতবার তার বিপদ নিজের ওপর নিয়েছে।
কতবার তাকে মৃ/ত্যুর মুখ থেকে টেনে এনেছে। হিয়াকে সে নিয়ে আসার পর কতবার হিয়া সুই/সাইড করতে চেয়েছিলো, কখনো বাথটাবের পানিতে নিজেকে ডুবিয়ে কখনো আবার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে মরতে চেয়েছিলো কিন্তু দানিয়েল তাকে মরতে দেয়নি।
কতটা অধিকার নিয়ে সে হিয়াকে নিজের সাম্রাজ্যের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় রেখেছে—অথচ হিয়া?
সে নিজের জীবন দিতে চাইলো একজন সিআইডি অফিসারের জন্য। দানিয়েলের ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল।
তার ভেতরের ঈর্ষাটা এবার যুক্তির সীমা ছাড়িয়ে গেল।
লিওনের মুখটা তার কল্পনায় ভেসে উঠতেই তার চোখের দৃষ্টি বদলে গেল।
একজন সাধারণ অফিসার। একজন সিআইডি অফিসার।
যে তার সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে। আর সেই মানুষটার জন্য হিয়া নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছে!
দানিয়েল হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। টেবিলের ওপর রাখা একটা ক্রিস্টালের গ্লাস তুলে নিল। কয়েক সেকেন্ড সেটার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার নামিয়ে রাখল।

না।
সে রাগ দেখাতে চায় না। সে শুধু জানতে চায়। হিয়ার চোখে ওই মানুষটার জন্য ঠিক কী আছে?
এই প্রশ্নটাই তাকে পাগল করে দিচ্ছে। দানিয়েল নিজের ব্যক্তিগত ক্যাবিনেট খুলে হুইস্কির বোতল বের করল।
একটা গ্লাসে ঢালল। এক ঢোকে শেষ করে আবার ঢালল।
তারপর আবার। প্রতিটা চুমুকের সঙ্গে তার ভেতরের অস্থিরতা যেন আরও তীব্র হয়ে উঠল।
হঠাৎ সে থেমে গেল। গ্লাসটা হাতে নিয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল।
অন্ধকারের সম্রাট। ফ্যান্টম কিং! যার নাম শুনলেই মানুষ ভয় পায়। যে কখনো কোনো মানুষের কাছে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে না। অথচ আজ একজন মেয়ের জন্য সে ঈর্ষায় পুড়ে যাচ্ছে।
আর সেই মেয়েটা হয়তো জানেই না—তার একটা সিদ্ধান্ত তাকে ভেতর থেকে কতটা অস্থির করে দিয়েছে।
দানিয়েল তিক্তভাবে হেসে ফেলল — তুমি সত্যিই এবার আমাকে পাগল করে দিচ্ছো, হিয়া।
তারপর হঠাৎ তার চোখ সরু হয়ে এলো। লিওনের কথা আবার মনে পড়ল।
হিয়ার মুখ তারপর আবার লিওনের মুখ। দুটো মুখ পাশাপাশি কল্পনা করতেই তার হাতের গ্লাসটা শক্ত হয়ে উঠল।

— ওই অফিসারটার জন্য তুমি নিজের জীবন দিতে পারো?
কণ্ঠটা এবার ভারী শোনালো অনেকটা।
— তাহলে আমার জন্য কী?
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো । তারপর দানিয়েল ধীরে ধীরে গ্লাসটা টেবিলের ওপর রাখল।
তার চোখের দৃষ্টি এখন বরফের মতো ঠান্ডা। ঈর্ষা এখনও আছে। কিন্তু তার সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে সিদ্ধান্ত।
সে হিয়াকে জেরা করবে না। হিয়াকে কিছু জিজ্ঞেসও করবে না। সে নিজেই সত্যিটা খুঁজে বের করবে।
হিয়া লিওনের জন্য কী অনুভব করে—এবার সেটা দানিয়েল নিজের চোখে দেখবে।
আর যদি তার সন্দেহ সত্যি হয়…
দানিয়েলের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা বিপজ্জনক হাসি ফুটে উঠল।
— তাহলে খেলাটা আর আগের মতো থাকবে না।
সে আবার হুইস্কির বোতলটা হাতে তুলে নিল। কিন্তু এবার তার চোখে শুধু ঈর্ষা নেই। আছে এমন এক অধিকারবোধ, যেটা তাকে নিজের কাছেই অপরিচিত মনে হচ্ছে।
হিয়াকে সে হারাতে চায় না। আর তার থেকেও বেশি—হিয়ার জীবনে অন্য কোনো পুরুষকে জায়গা নিতে দেখতে সে একদমই প্রস্তুত নয়। যে পুরুষ তাদের সাম্রাজ্য এর একদম বিপরীতে, যে হতে পারে হিয়ার জন্য বিপদজনক।

সকালটা শুরু হতেই লন্ডনের সিআইডি হেডকোয়ার্টার আবারও ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু আজকের ব্যস্ততা অন্য দিনের মতো নয়। হেডকোয়ার্টারের সবচেয়ে সুরক্ষিত অংশের একটি সিক্রেট কনফারেন্স রুমে আজকের বৈঠকটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রুমের ভেতরে ইতোমধ্যে উপস্থিত অফিসার নোভা, অফিসার রওশন আর এসিপি। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল লিওন।
তার মুখে স্বাভাবিক গাম্ভীর্য। হাতে কয়েকটা ফাইল। রুমে ঢুকেই সে সবার দিকে একবার তাকিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল। রওশন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
— আর কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে স্যার?
এসিপি তখন একটা ফাইল টেবিলের ওপর রেখে শান্ত গলায় বলল, — বেশি না। ও আসছে।
আজকের মিশনটা সাধারণ কোনো মিশন নয়। ভাইপারের সাম্রাজ্যের ভেতরে ঢোকার জন্য একজন অফিসারকে নতুন পরিচয়ে পাঠানো হবে। আর সেই কাজের জন্য নির্বাচিত হয়েছে সদ্য যোগ দেওয়া অফিসার—ইথান ব্লেক।
লন্ডনেরই অধিবাসী ইথান। সিআইডিতে সদ্য যোগ দিয়েছে সে। কিন্তু তার আসল পরিচয় এখনো হেডকোয়ার্টারের এই চারজন ছাড়া আর কেউ জানে না। মিশনের স্বার্থে তার অস্তিত্বই আপাতত একটা গোপন তথ্য।
আজ থেকে ইথান ব্লেক আর থাকবে না।
আজ জন্ম নেবে—নিকো।
হঠাৎ দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল। রুমের সবাই স্বাভাবিকভাবেই দরজার দিকে তাকাল। দরজাটা খুলে গেল।

আর পরের মুহূর্তেই—রুমের ভেতর কয়েক সেকেন্ডের জন্য নীরবতা নেমে এলো।
অফিসার ইথান ব্লেক ভেতরে ঢুকেছে।
কিন্তু তাকে দেখে মনে হচ্ছে না, এই মানুষটিই সেই অফিসার যে গতকালকেও নিখুঁত সিআইডি অফিসারের পোশাকে সবার সামনে দাঁড়িয়েছিল।
আজ তাকে দেখে মনে হচ্ছে—একজন গ্যাংস্টার ঢুকেছে।
তার পরনে মেরুন শাটিন-সিল্কের শার্ট। আর শার্টের উপরের তিনটা বোতাম খোলা। গলার কাছে চেইন। কালো ফিটেড প্যান্ট। আর ডান হাতের পুরোটা জুড়ে বিশাল ইগলের ট্যাটু।
ডান কানে গোল রিংয়ের মতো দুল। আর চুলগুলো হাইলাইটস করা ব্লন্ড। আজ তার হাঁটার ভঙ্গি বদলে গেছে।
চোখের দৃষ্টিও বদলে গেছে। এমনকি মুখের সেই ভদ্র, নিয়ন্ত্রিত অভিব্যক্তিটাও যেন কোথাও নেই। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে রওশনের সামনে দাঁড়াল।
রওশন কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সত্যিই অবাক হয়ে মুখ হাঁ করে তাকিয়ে থাকল।
ইথান ভ্রু তুলে বলল, — অফিসার রওশন, মুখ বন্ধ করুন। এভাবে রাখলে মশা ঢুকে যাবে।
নোভা সঙ্গে সঙ্গে হেসে ফেলল। রওশন মুখ বন্ধ করে বিরক্ত চোখে তার দিকে তাকাল। তারপর এসিপি অবাক হয়ে তাকিয়ে বললেন — ইথান, তোমাকে সত্যি সত্যি চেনাই যাচ্ছে না।
ইথান ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল,

— সেটাই তো দরকার স্যার।
লিওন এতক্ষণ চুপচাপ তাকে পর্যবেক্ষণ করছিল। তার দৃষ্টি ইথানের পোশাক থেকে শুরু করে হাঁটার ধরন পর্যন্ত একবার ঘুরে গেল। তারপর শান্ত গলায় বলল,— লুক পারফেক্ট।
একটু থেমে সে ইথানের চোখের দিকে তাকাল।
— কিন্তু পারফরম্যান্সও পারফেক্ট হতে হবে।
ইথানের মুখের হাসিটা এবার আরও গভীর হলো। সে চেয়ারের পেছনে হাত রেখে সামান্য ঝুঁকে দাঁড়াল। তারপর আগের ইথানের সম্পূর্ণ বিপরীত একটা কণ্ঠে বলল,
— চিন্তা করবেন না, সিনিয়র অফিসার লিওন।
সে একবার নিজের শার্টের কলার ঠিক করল।
— ক্যারেক্টার প্লে আমি ঠিকভাবেই করব।
তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,— আজ থেকে ইথান ব্লেক নামে কাউকে চিনবেন না।
এক মুহূর্ত থেমে তার চোখে দুষ্টু ঝিলিক ফুটে উঠল।

— নিকো।
রওশন চুপচাপ তাকিয়ে রইল। ইথান এবার ধীর পায়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে এসে একটা চেয়ার টেনে বসল।
তারপর দুহাত টেবিলের ওপর রেখে গ্যাংস্টারসুলভ স্বরে বলল,— নিকো! নামটা মনে রাখবেন।
ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি।
— অসম্ভবকে সম্ভব করাই যার কাজ।
এসিপির চোখে এবার ক্ষীণ একটা সন্তুষ্টির ছাপ ফুটে উঠল।
সে ফাইলটা খুলে বলল, — তাহলে শুরু করা যাক।
রুমের পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে গেল। কারণ আজ এখানে বসে থাকা মানুষটা শুধু ইথান ব্লেক নয়।আজ থেকে সে ভাইপারের রাজত্বে ঢোকার জন্য তৈরি হওয়া এক নতুন পরিচয়—নিকো।
আর এই নিকোর আসল পরিচয় জানবে মাত্র চারজন।
বাকিদের কাছে সে শুধু একজন গ্যাংস্টার। একজন রহস্যময় অপরাধী।যার কাজ—অসম্ভবকে সম্ভব করা।
দিনের কাজ শেষ করে বিকেলেই সিআইডি হেডকোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে গেল লিওন। আজ তাকে একটু আগেই বের হতে হয়েছে। সন্ধ্যায় তার একটা গুরুত্বপূর্ণ দেখা করার কথা আছে।

হিয়ার সঙ্গে।
কফিশপে সিআইডি অফিসারের পোশাকে যাওয়া যাবে না। সেখানে তাকে কোনো অফিসিয়াল পরিচয় নিয়ে যেতে হবে না। তাই বাড়ি ফিরে নিজেকে একটু গুছিয়ে নেওয়ার জন্য হাতে কয়েক ঘণ্টা সময় রেখেই বেরিয়েছে সে।
কিন্তু বাড়িতে ফিরতেই অন্য একটা ঘটনা অপেক্ষা করছিল।
দরজার কাছে পৌঁছাতেই মায়াকে দেখতে পেল লিওন।
মেয়েটার চোখেমুখে আজ অন্যরকম একটা আগ্রহ।
লিওন জুতো খুলতে খুলতেই জিজ্ঞেস করল,

— কী হয়েছে মায়া?
মায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,— লিও ভাইয়া, আজকে আমি বাইরে যাব।
লিওন থেমে তার দিকে তাকাল। — আজ?
— হ্যাঁ। অনেকদিন তো কোথাও যাওয়া হয় না।
মায়ার গলায় এমন একটা আবদার ছিল যে লিওন আর না বলতে পারল না। সে ঘড়ির দিকে তাকাল। হাতে এখনও দু-এক ঘণ্টা সময় আছে।
— ঠিক আছে। তবে বেশি সময় বাইরে থাকা যাবে না।
মায়ার মুখটা সঙ্গে সঙ্গে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। — সত্যি?
লিওন হেসে মাথা নাড়ল — হ্যাঁ, সত্যি।
তারপর নিজের কক্ষের দিকে চলে গেল সে। দ্রুত শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে এসে পোশাক বেছে নিতে শুরু করল লিওন।

আজ কেন যেন নিজেকে একটু বেশি পরিপাটি করতে ইচ্ছে করছে। সাধারণত পোশাকের ব্যাপারে খুব একটা ভাবনা থাকে না তার। কিন্তু আজ শার্টের রং থেকে শুরু করে ঘড়ি, চুল—সবকিছুই একটু বেশি যত্ন নিয়ে ঠিক করল।
শেষ পর্যন্ত আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। চুলগুলো ঠিক করল। শার্টের কলারটা সামান্য গুছিয়ে নিল। তারপর নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাতেই কয়েক সেকেন্ড থেমে গেল।
আজ তাকে সত্যিই বেশ সুদর্শন লাগছে।
হয়তো একটু বেশিই। নিজের এই উপলব্ধিতে নিজেই হালকা হাসল লিওন।
— এত সাজগোজ করার কী আছে?
কিন্তু উত্তরটা সে নিজেও জানে। কিছুক্ষণ পর মায়াও তৈরি হয়ে এল। গত কয়েকদিনের চিকিৎসায় এখন সে হুইলচেয়ার ছেড়ে ক্রাচের সাহায্যে হাঁটার চেষ্টা করছে। চিকিৎসা এখনও চলছে। সামনে তার পায়ের একটা বড় সার্জারি হওয়ার কথা।
তবু আজকের দিনে মায়ার মুখে অনেকদিন পর স্বাভাবিক আনন্দ দেখা যাচ্ছে। লিওন এগিয়ে গিয়ে তার পাশে দাঁড়াল।

— সাবধানে।
— “আমি পারছি তো” বলেই মায়া মৃদু হেসে ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটতে লাগল।
দুজন একসঙ্গে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। গাড়ির কাছে পৌঁছানোর আগেই মায়ার চোখ কয়েকবার লিওনের দিকে চলে গেল।আজ তাকে কেন যেন অন্যরকম লাগছে।
লিওন সবসময়ই সুদর্শন। এটা নতুন কোনো বিষয় নয়।
কিন্তু আজ…আজ যেন তাকে একটু বেশিই সুদর্শন লাগছে।
মায়া কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থেকে অবশেষে বলেই ফেলল,
— লিও ভাইয়া?
— হুম?
— আজ তোমাকে কেমন যেন অন্যরকম লাগছে।
লিওন ভ্রু তুলে জিজ্ঞেস করলো— অন্যরকম মানে?
মায়া হেসে বলল,— বুঝতে পারছি না। তবে একটু বেশি সুদর্শন লাগছে।
লিওন হেসে মাথা নাড়ল।— তুই এসব কখন থেকে লক্ষ্য করা শুরু করলি?
মায়া কিছু না বলে হাসল। ঠিক তখনই তার চোখ গিয়ে থামল লিওনের কবজিতে।
একটা ঘড়ি। ঘড়িটা অন্যরকম। গাঢ় নীলের ভেতর আলো পড়লে যেন অন্যরকম একটা ঝিলিক দেখা যাচ্ছে। নকশাটাও সাধারণ কোনো ঘড়ির মতো নয়। মায়া হাতটা একটু কাছে এনে দেখল।

— তোমার ঘড়িটা কিন্তু খুব সুন্দর?
লিওন নিজের কবজির দিকে তাকাল। আজ বাড়ি ফেরার পথে দোকান থেকে ঘড়িটা নিয়ে এসেছে। গতকাল ঠিক করতে দিয়েছিল।
আর ঘড়িটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন একটা গল্প, যেটা সে মায়াকে বলতে পারবে না।
কারণ এই ঘড়িটা তাকে দিয়েছে—হিয়া।
ব্লু স্টার ডায়মন্ডের ঘড়ি।
মায়া মুগ্ধ হয়ে বলল,— লিও ভাইয়া, তোমার ফ্রেন্ডের চয়েস কিন্তু দারুণ!
লিওন কিছু বলল না। মায়া ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে আবার বলল,— ঘড়িটা অনেক ইউনিক। এমন ঘড়ি আগে দেখিনি।
লিওন নিজের কবজির দিকে তাকাল। নীল পাথরটার ভেতর বিকেলের আলো আটকে আছে। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে পড়ে গেল হিয়ার মুখ।
সেই আত্মবিশ্বাসী হাসি। সেই উন্মাদ চোখ। আর তার নিজের জন্য বানানো এই ঘড়িটা। মায়া তখনও অপেক্ষা করছে তার উত্তরের জন্য। লিওন খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল,

— হ্যাঁ… ওর চয়েসটা খারাপ না।
মায়া হেসে বলল,— শুধু খারাপ না, বেশ ভালো।
লিওন আর কিছু বলল না। কিন্তু নিজের অজান্তেই একবার ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল।আজ সন্ধ্যায় সে কোথায় যাবে, কার সঙ্গে দেখা করবে—সেটা মায়া জানে না।
আর লিওনও জানে না, কয়েক ঘণ্টা পর সেই মানুষটার সামনে দাঁড়ালে তার এই ঘড়িটাই হয়তো প্রথমে হিয়ার চোখে পড়বে।
মায়ার সঙ্গে বাইরে বেরোনোর পর সময়টা যে কখন নিজের অজান্তেই বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যার গাঢ় আলোয় ঢুকে পড়েছে, লিওন তা বুঝতেই পারেনি। মায়া অনেকদিন পর বাইরে বেরিয়েছে, তাই তার আনন্দের যেন কোনো শেষ নেই। কখনো কোথায় যাবে, কখনো কী খাবে, আবার কখনো ছোটখাটো কোনো বিষয় নিয়ে এমনভাবে কথা বলছিল যে লিওনও অজান্তেই কথাগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছিল।
একসময় গাড়ির জানালার বাইরে তাকিয়ে লিওনের মনে হলো, আকাশের রং বদলে গেছে। বিকেলের ম্লান সোনালি আলো সরে গিয়ে লন্ডনের রাস্তাগুলোতে একে একে জ্বলে উঠেছে কৃত্রিম আলোর সারি।
তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধক করে উঠল।

হিয়া।
কফিশপে যাওয়ার কথা তার মনে ছিল, কিন্তু সময়টা যে এতটা গড়িয়ে গেছে, সেটা একেবারেই খেয়াল করেনি।
অন্যদিকে, লন্ডনের ব্যস্ত শহরের মাঝখানে আলো-ছায়ায় ঘেরা The Monocle Café-এর ভেতর বসে ছিল হিয়া।
আজ পুরো ক্যাফেটাই সে নিজের জন্য বুক করে রেখেছে।
বাইরে থেকে দেখলে জায়গাটা মনে হবে স্বাভাবিক একটা সন্ধ্যার মতোই সাজানো। কাঁচের বিশাল জানালার ওপারে লন্ডনের রাস্তা ধীরে ধীরে রাতের সাজে সেজে উঠছে। গাড়ির হেডলাইটগুলো ভেজা রাস্তার ওপর লম্বা রেখা এঁকে ছুটে যাচ্ছে, পথচারীদের ছায়া আলো পেরিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে শহরের ভিড়ে। অথচ ক্যাফের ভেতরটা অস্বাভাবিক রকম শান্ত।
কারণ এখানে আজ আর কেউ নেই।
শুধু হিয়া। আর একজন মানুষের জন্য অপেক্ষা।
হিয়া টেবিলের পাশে রাখা ঘড়িটার দিকে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে চোখ তুলল সামনের দরজার দিকে। কাঁচের দরজার ওপাশে প্রতিবার কোনো ছায়া নড়লেই তার চোখ অনিচ্ছায় সেদিকে চলে যাচ্ছিল। প্রত্যেকবারই মনে হচ্ছিল, এই বুঝি লিওন।

কিন্তু প্রতিবারই ভুল। সময় এগিয়ে যাচ্ছিল।
হিয়ার সামনে রাখা কফির কাপটাও অনেকক্ষণ আগে ঠান্ডা হয়ে গেছে। সে তবু কাপটা স্পর্শ করল না। তার আঙুলগুলো টেবিলের ওপর স্থির থাকলেও মনের ভেতরটা ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছিল।
সে আবার ঘড়ির দিকে তাকাল। তারপর দরজার দিকে।
লিওন এল না। হিয়ার ঠোঁটের কোণে ফুটে থাকা অপেক্ষার কোমল হাসিটা ধীরে ধীরে মুছে গেল। ব্রাউনিশ চোখের উজ্জ্বলতায় নেমে এলো একরাশ অভিমান।
সে খুব নিচু স্বরে বলল, — লিওন কি আসবে না, তার মানে?
কেউ উত্তর দিল না। ক্যাফের নীরবতাই তার কথার একমাত্র সাক্ষী হয়ে রইল।
হিয়া কয়েক মুহূর্ত স্থির বসে থেকে ধীরে ধীরে চেয়ারে পিঠ ঠেকাল। চোখ দুটো বন্ধ করতেই অতীতের একটা মুহূর্ত স্পষ্ট হয়ে উঠল।

হাসপাতালের সেই কক্ষে। সাদা দেয়াল। তার কোমায় থাকা অচল শরীর। চারপাশে মানুষের ব্যস্ততা, যন্ত্রের শব্দ, অথচ সে নিজে যেন নিজের শরীরের ভেতর বন্দি হয়ে ছিল। চোখ খুলতে পারেনি, হাত নাড়াতে পারেনি, ঠোঁট খুলে একটা শব্দ পর্যন্ত করতে পারেনি।
কিন্তু শুনতে পেরেছিল। খুব কাছে থেকে একটা কণ্ঠস্বর শুনেছিল।
লিওনের কণ্ঠ। সেই কণ্ঠে ছিল এমন এক অসহায়তা, যা হিয়া তার জীবনে খুব কম মানুষের কাছেই দেখেছে।
“আরেকবার বাঁচবে? শুধুমাত্র আমার জন্য?।”
সেদিন সে উত্তর দিতে পারেনি। কিন্তু কথাটা শুনেছিল।
খুব গভীরভাবে শুনেছিল। এমনভাবে শুনেছিল যে, হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসার পরও সেই কয়েকটি শব্দ তার ভেতর থেকে মুছে যায়নি।
হিয়া ধীরে ধীরে চোখ খুলল। তার বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমানটা এবার আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
সে হাসপাতালের জানালা দিয়ে পালিয়েছে শুধু তাকে দেখবে বলে। নিজের দুর্বল শরীরটাকে কোনো রকমে সামলে বাড়ি ফিরেছে, কারণ লিওনের সামনে সেই ফ্যাকাশে, ক্লান্ত মুখ নিয়ে দাঁড়াতে চায়নি। তারপর নিজেই চিরকুট পাঠিয়েছে।

আর এখন? এত কিছুর পরেও লিওন আসছে না।
হিয়ার চোখের কোমলতা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে গেল।
সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো অভিযোগও নেই। শুধু তার হাঁটার ভঙ্গিতে এমন এক ঠান্ডা দৃঢ়তা ছিল, যেন নিজের অভিমানটাকে সে নিজেই নিজের ভেতর বন্দি করে ফেলেছে।
বারান্দার দরজা খুলতেই ঠান্ডা বাতাস এসে তার চুলগুলো এলোমেলো করে দিল। হিয়া গিয়ে রেলিংয়ের কাছে দাঁড়াল। ব্যাগ থেকে ধীরে ধীরে একটি সিগারেট বের করে ঠোঁটে রাখল এবং আগুন ধরিয়ে নিল।
প্রথম টানে ধোঁয়া বুকের ভেতর ঢুকে গেল।
সে ধীরে ধীরে ধোঁয়াটা ছেড়ে দিল। ধোঁয়ার সাদা রেখা ঠান্ডা বাতাসে ভেসে উঠে মুহূর্তের মধ্যেই মিলিয়ে গেল।
হিয়া নিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মুখে কোনো রাগ নেই। কিন্তু চোখের গভীরে জমে থাকা অভিমানটা লুকোনোর মতোও নয়।

— আমার বাজপাখি আসবে না?
নিজের মনেই প্রশ্নটা করল সে। তারপর সিগারেটে আরেকবার টান দিয়ে ঠোঁটের কোণে তিক্ত হাসি ফুটিয়ে খুব আস্তে বলল,
— ঠিক আছে, দিলবার। আমিও দেখে নেব কতক্ষণ আমাকে এড়িয়ে থাকতে পারো।
কথাটা বললেও তার চোখ বারবার রাস্তার দিকে চলে যাচ্ছিল। কারণ অভিমান যতই থাকুক, অপেক্ষাটা তখনও শেষ হয়নি।

অবশেষে মায়াকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে লিওন আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। গাড়ি থেকে নামার আগে মায়া হাসিমুখে বলল,
— আজকে অনেক ভালো লেগেছে, লিও ভাইয়া।
লিওনও মৃদু হেসে উত্তর দিল, — আমারও।
কিন্তু গাড়িতে ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখতেই তার মনে হলো, অনেক দেরি হয়ে গেছে।
হিয়া অপেক্ষা করছে। এই একটা চিন্তাই তার মাথার ভেতর বারবার ফিরে আসছিল।
সে জানে না হিয়া কতক্ষণ ধরে সেখানে আছে। জানে না সে রাগ করেছে কি না। শুধু জানে, আজ হিয়ার সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল এবং সে কথা রাখতে দেরি করে ফেলেছে।
গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল লিওন। লন্ডনের আলো পেছনে ফেলে গাড়ি যখন নির্দিষ্ট কফিশপের সামনে এসে থামল, তখন আকাশ পুরোপুরি সন্ধ্যার অন্ধকারে ঢেকে গেছে।
লিওন গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত ভেতরে ঢুকল। কিন্তু ভেতরে পা রাখতেই তার গতি থেমে গেল।
ক্যাফেটা প্রায় সম্পূর্ণ ফাঁকা।

চারপাশে সাজানো টেবিল, নরম আলো, কাউন্টারের পাশে কয়েকটি চেয়ার—সবকিছু ঠিকঠাক আছে, অথচ কোথাও হিয়াকে দেখা যাচ্ছে না।
লিওনের ভ্রু কুঁচকে গেল। সে একবার ডানদিকে তাকাল, তারপর বামদিকে। জানালার পাশের টেবিলগুলোও খালি।
তার বুকের ভেতর অস্বস্তি বাড়ল। হিয়া কি চলে গেছে?
এতক্ষণ অপেক্ষা করে রাগ করে চলে গেছে?
লিওনের ঠোঁট থেকে অনিচ্ছায় একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
— দেরি হয়ে গেল…
ঠিক তখনই একজন ওয়েটার এগিয়ে এল।
— Welcome, Sir.
লিওন সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— মিস হিয়া….?
লিওন পুরো বাক্যটা সম্পুর্ন করার আগেই ওয়েটার মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে বলে উঠলো — ম্যাম বারান্দায় আছেন, স্যার। আপনার জন্যই অপেক্ষা করছেন।
এক মুহূর্তের জন্য লিওনের মুখে কোনো অভিব্যক্তি রইল না।
তারপর চোখের দৃষ্টিটা নরম হয়ে গেল। সে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু ধীরে ধীরে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল।

কাঁচের দরজার কাছে পৌঁছাতেই ঠান্ডা বাতাস এসে তার মুখ ছুঁয়ে গেল। আর তারপরই তার চোখ থেমে গেল এক পরিচিত অবয়বে।
বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হিয়া।
লন্ডনের রাতের বাতাস তার চুলগুলো উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। শরীরে পরিপাটি পোশাক, গাঢ় কালো কুচকুচে ব্লেজার সুট আর মুখে সেই পরিচিত আত্মবিশ্বাস, ঠোঁটে কোনো কথা নেই। এক হাতে ধরা সিগারেটের আগুনটুকু অন্ধকারের মধ্যে ক্ষীণ লাল বিন্দুর মতো জ্বলছে।
লিওন দাঁড়িয়ে রইল। হিয়াকে সে এর আগে অসংখ্যবার দেখেছে। তবু আজ তাকে দেখে কেন যেন মনে হলো, এই নারীকে নতুন করে দেখছে।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা ফ্যাকাশে মুখটা তার মনে ছিল। অথচ সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হিয়ার মধ্যে সেই দুর্বলতার কোনো চিহ্ন নেই। যেন কিছুই হয়নি। যেনো একদিন আগেও সে হাসপাতালের রোগী ছিল না। মনে হলো সে সেই আগের হিয়াই—নিজের পৃথিবীর ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখা, চোখের এক দৃষ্টিতে মানুষকে থামিয়ে দিতে পারা সেই দুর্ধর্ষ নারী।
লিওনের দৃষ্টি ধীরে ধীরে তার মুখে এসে থামল। ঠিক তখনই হিয়া তার উপস্থিতি অনুভব করল। সে খুব ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।

আর সেই মুহূর্তে—দুজনের চোখ একে অপরের চোখে গিয়ে আটকে গেল।
হিয়ার চোখে প্রথমে বিস্ময় ফুটে উঠল। এতক্ষণ ধরে যার আসার সম্ভাবনাকে সে নিজের মনেই অস্বীকার করছিল, তাকে হঠাৎ সত্যি সত্যি সামনে দেখে বিশ্বাস করতে পারছে না। তারপর সেই বিস্ময়ের জায়গা নিল অবিশ্বাস।
আর সবশেষে ধীরে ধীরে নরম হয়ে এলো তার চোখের দৃষ্টি।
সে এসেছে। সত্যিই এসেছে।
এতক্ষণ ধরে বুকের মধ্যে জমে থাকা অভিমানটা সেই এক দৃষ্টিতেই একটু একটু করে গলে যেতে লাগল।
অন্যদিকে লিওনও কোনো কথা বলল না। তার চোখ হিয়ার মুখ থেকে ধীরে ধীরে চুল, পোশাক পেরিয়ে আবার তার চোখে ফিরে এল। হিয়ার ঠোঁটের কোণে তখন খুব সামান্য একটা হাসি জন্ম নিচ্ছে, লিওনকে দেখে সে স্বস্তি পেয়ে গেছে।
কিন্তু তাদের এই নীরব চোখাচোখির মাঝেই হিয়ার হাতে ধরা সিগারেটের আগুন ধীরে ধীরে আঙুলের কাছে চলে এসেছিল।
হিয়া সেটা খেয়াল করেনি। তার সমস্ত মনোযোগ তখন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে।
পরের মুহূর্তেই জ্বলন্ত আগুনটা তার আঙুলে ছুঁয়ে গেল।

— আহ!
হিয়া চমকে উঠে সিগারেটটা হাত থেকে ফেলে দিল। লিওনের মুখের কোমলতা মুহূর্তেই উদ্বেগে বদলে গেল। সে এক পা এগিয়ে এলো। কিন্তু হিয়া নিজের পোড়া আঙুলের দিকে তাকাল না। তার চোখ তখনও লিওনের চোখেই স্থির।
হিয়ার পোড়া আঙুলের দিকে একবার তাকিয়ে লিওন যখন আবার তার মুখের দিকে চোখ তুলল, তখন দেখল হিয়া ইতিমধ্যেই তার দিকে এগিয়ে আসছে। হাঁটার ভঙ্গিতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কিন্তু চোখের দৃষ্টিটা দেখে বোঝা যাচ্ছে, এতক্ষণ ধরে জমিয়ে রাখা অভিমান সে এবার একে একে আদায় করে ছাড়বে।
লিওন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
হিয়া তার একেবারে সামনে এসে থামল। দুজনের মাঝখানে দূরত্ব বলতে সামান্য কয়েক ইঞ্চি। সে কিছুক্ষণ লিওনের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীর, অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল,

— আপনি জানেন, আপনি কতটা লেট করেছেন?
লিওন ভ্রু তুলে তাকাল।
— কতটা?
হিয়া সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। বরং নিজের কবজির ঘড়িটার দিকে তাকাল, এতক্ষণ ধরে সে ঠিক এই হিসাবটাই করে রেখেছে।
তারপর চোখ তুলে বলল,— তিন ঘণ্টা উনচল্লিশ মিনিট।
লিওন কিছু বলার আগেই হিয়া যোগ করল,
— সাতচল্লিশ সেকেন্ড।
লিওনের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। হিয়া এবার আরও কাছে ঝুঁকে খুব গম্ভীর মুখে বলল, — আর সাতশো আটত্রিশ মিলিয়ন ন্যানোসেকেন্ড।
লিওন কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলল। — তুমি ন্যানোসেকেন্ড পর্যন্ত গুনেছ?

— অবশ্যই।
— এতটা সময় আমার জন্য অপেক্ষা করেছ?
হিয়ার চোখ সরু হয়ে গেল — অপেক্ষা করেছি বলেই তো হিসাব দিতে পারছি।
লিওনের হাসিটা এবার একটু নরম হলো।
হিয়া হাত দুটো বুকের সামনে ভাঁজ করে বলল,
— আর এই দেরির শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে।
— কী শাস্তি?
হিয়া বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বলল,— চব্বিশ ঘণ্টা আমার সঙ্গে থাকতে হবে।
লিওন কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,— শুধু চব্বিশ ঘণ্টা?
হিয়ার চোখে সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ী ঝিলিক ফুটে উঠল।
— দরকার হলে বাড়িয়ে দেব।
— না, চব্বিশ ঘণ্টাই থাক।
হিয়া একটু অবাক হলো। এত সহজে রাজি হয়ে গেল?
কিন্তু পরের মুহূর্তেই লিওন পাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
— তবে একটা সমস্যা আছে।
— কী?

— তোমার শাস্তি কীভাবে কার্যকর হবে, সেটা আগে ঠিক করতে হবে।
কথাটা বলে লিওন বারান্দা থেকে ভেতরে ফিরে গেল। হিয়া কিছুটা অবাক হয়ে তার পেছন পেছন হাঁটল।
ক্যাফেটার এক পাশ ঘুরতেই দেখা গেল, পুরো জায়গাটার সঙ্গে যুক্ত একটি আলাদা ট্রেনিং স্পেস। আধুনিক জিমের মতো সাজানো। এক পাশে পাঞ্চিং ব্যাগ, অন্যদিকে কিছু ফ্রি-ওয়েট, ট্রেনিং ম্যাট এবং ফাইটিং প্র্যাকটিসের জন্য খালি জায়গা রাখা হয়েছে।
হিয়া থেমে চারপাশে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে লিওনের দিকে চোখ তুলল।
সে হিয়ার দিকে তাকিয়ে মাথা সামান্য কাত করে বলল,
— এখানে আসো।
হিয়া কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে ভেতরে ঢুকল।
লিওন ট্রেনিং স্পেসের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর হিয়ার দিকে ফিরে দুহাত সামান্য ছড়িয়ে বলল,
— পারলে আমাকে হারিয়ে দেখাও।
হিয়ার চোখ মুহূর্তেই বদলে গেল।
লিওন আবার বলল,— তুমি উইন হলে, আগামী চব্বিশ ঘণ্টা তুমি আমাকে যা বলবে, আমি তাই করব।
হিয়ার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা হাসি ফুটল।
— আর তুমি জিতলে?
লিওন এবার মৃদু হেসে বলল, — তাহলে আগামী চব্বিশ ঘণ্টা তোমাকে আমি যা বলব, তুমি তাই করবে।
হিয়ার চোখের হাসিটা আরও গভীর হলো।

— ডিল?
— ডিল।
হিয়া এবার ধীরে ধীরে নিজের ব্লেজারটা খুলে পাশে রাখল।
কিন্তু লিওনের চোখ তখন তার মুখেই স্থির। হিয়া বুঝতে পারছিল, ব্যাপারটা এত সহজ নয়।
হিয়া কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে বলল,
— তুমি আমাকে তোমার সাথে ফাইট করতে বলছো?
হিয়ার চোখের দৃষ্টি এবার আরও ধারালো হয়ে উঠল। লিওনের নীরবতাই তার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়েছে। সে জানে, এই মুহূর্তে তার শরীর আগের মতো শক্তিশালী নয়, আর লিওনও সেটা খুব ভালো করেই জানে। তবু এমন একটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে, যার ফলাফল আগে থেকেই তার জানা।
হিয়া ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে হাসি ফুটিয়ে বলল,
— আমাকে এখন দুর্বল ভেবে ফাইট করতে বলছো দিলবার?
লিওন শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইল। হিয়া আরও এক পা এগিয়ে এসে তার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল।

— তাহলে রেডি?
লিওনের ঠোঁটের কোণে হাসিটা এবার স্পষ্ট হলো।
— অলওয়েজ।
দুজনেই নিজেদের প্রস্তুত করতে শুরু করল। লিওন ধীরে ধীরে শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিতে লাগল। প্রতিটি ভাঁজ ঠিক করে ওপরে তুলতে তুলতে তার দৃষ্টি একবারও হিয়ার ওপর থেকে সরল না। তার ভঙ্গিতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, বরং অন্যরকম একটা নিশ্চিন্ত আত্মবিশ্বাস ছড়িয়ে আছে।
হিয়া সেটা লক্ষ করছিল। এই মানুষটাকে সে চেনে।
লিওন যখন কোনো অপারেশনের আগে এমন শান্ত থাকে, তখন সাধারণত তার মাথায় একসঙ্গে দশটা পরিকল্পনা ঘুরতে থাকে। কিন্তু আজকের চোখের সেই ঝিলিকটা অন্যরকম।
এখানে কোনো মিশন নেই। কোনো অপরাধী ধরার পরিকল্পনা নেই। কোনো CID অপারেশনও নেই।
আজ শুধু তারা দুজন। হিয়া নিজের শর্ট উলফ কাট করা চুলগুলো পিছনে নিয়ে হালকা বাঁধল, যাতে লড়াইয়ের সময় মুখের সামনে এসে বিরক্ত না করে। তারপর ধীরে ধীরে হাতের কবজি ঘুরিয়ে নিল, শরীরটাকে একটু প্রস্তুত করে নিল।
লিওন সেটা দেখে বলল,— শরীর কেমন লাগছে?
হিয়া সঙ্গে সঙ্গে চোখ তুলে তাকাল।

— আমাকে ফাইটে ডেকে এখন আবার শরীরের খবর নিচ্ছো?
— আমি শুধু নিশ্চিত হতে চাইছি তুমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে কি না।
— আমাকে নিয়ে এত চিন্তা করার দরকার নেই।
— সেটা আমি ঠিক করব।
হিয়ার চোখে আবার সেই আগুন জ্বলে উঠল।
— ঠিক আছে। পরে কিন্তু বলবে না, সাবধান করিনি।
লিওন হেসে মাথা নাড়ল। তারপর দুজনেই ট্রেনিং স্পেসের মাঝখানে এসে দাঁড়াল।
চারপাশে নরম আলো। বাইরে কাঁচের জানালার ওপারে লন্ডনের সন্ধ্যা আরও গাঢ় হয়ে এসেছে। অথচ এই ছোট্ট জায়গাটার ভেতর সম্পূর্ণ আলাদা একটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
হিয়া ধীরে ধীরে নিজের দুই হাত প্রস্তুত অবস্থায় তুলল।
লিওনও একইভাবে অবস্থান নিল। কয়েক মুহূর্ত দুজনেই একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
হিয়ার চোখে ছিল চ্যালেঞ্জ। লিওনের চোখে ছিল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মিশে থাকা সেই দুষ্টু আনন্দ।
হিয়া সেটা দেখে বুঝতে পারল, লিওন আজ সত্যিই তাকে হারাতে চায় কি না, সেটা নিয়ে তার নিজেরই সন্দেহ হচ্ছে।

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৩২ (২)

কারণ লোকটার চোখে যুদ্ধের চেয়ে খেলাটার আনন্দই বেশি মনে হচ্ছে। আজকে লেইট করার জন্য হিয়া যে চব্বিশ ঘণ্টা তার সাথে থাকার শাস্তির কথা বলেছে। লিওন সেই শাস্তিটাকেই নিজের মতো করে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলতে চাইছে।
হিয়া ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,— তাহলে শুরু করা যাক, দিলবার।
লিওনও মৃদু হেসে উত্তর দিল—কাম অন হর্নি ফক্স!

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৩৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here