শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১৬
আয়েশা শেখ
ঝিলমিলের দিন একই ভাবেই কাটছে। সেই একই রুটিন। বিন্দুমাত্র হেরফের নেই তাতে। লোকটা তার ওপর এতটুকুও ছাড় দেওয়ার পক্ষে নয়। এখন সেই স্বামীর তৈরি করে দেওয়া কাজের রুটিনের পাশে এসে যুক্ত হয়েছে কলেজের আসন্ন পরীক্ষার রুটিন। পড়ার টেবিলে বসে দু’হাতে দুটো আলাদা রুটিন ধরে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা।
ওদিকে বিছানায় বসে ল্যাপটপের কি-বোর্ডে আঙুল চালাচ্ছিল বারিশ। ইদানিং কাজের চাপ তার মাথার ওপর পাহাড়ের মতো চেপে বসেছে। ইউনিভার্সিটিতে প্রফেসর হিসেবে জয়েন করার পর থেকে কানাডার মেহরাজের সাথে যৌথ প্রজেক্টগুলোতে ঠিকমতো সময় দিতে পারছে না সে। এতদিন মেহরাজই একহাতে সব সামলে এসেছে, যদিও এর জন্য রোজ ঘ্যানঘ্যান করে তার মাথা ঝালাপালা করে দিচ্ছে ছেলেটা। বারিশ অবশ্য সেসব কান দিয়ে শোনেও না, কিন্তু এবার তাকে সত্যিই কিছুটা মন দিতে হবে।
ঝিলমিল পড়ার টেবিল থেকে একপলক নজর ঘুরিয়ে তাকাল বারিশের দিকে। দেখতে দেখতে বিয়ের বিশটা দিন কেটে গেল, কিন্তু একটা দিনের জন্যও সে নিজের বাপের বাড়ি যেতে পারল না। দেয়ালের ওপাশেই তার নিজের ঘর, নিজের পরিবার। অথচ এই লোকটা তাকে একবারের জন্যও ওপাশে পা বাড়াতে দেয়নি। যাবেই বা কখন? বিকেল অব্দি কলেজ, আর তারপর বাকি সময়টা রান্নাঘর আর ঘরের কাজ সামলাতেই পার হয়ে যায়! মাঝখান থেকে শুধু দিনে একবার পরিবারের সবার সাথে ফোনে কথা বলার সুযোগ পায় সে।
পরীক্ষার জন্য আইসিটি সাবজেক্ট নিয়ে বেশি টেনশনে আছে ঝিলমিল। এখনও একটা চ্যাপ্টারও ভালোভাবে শেষ করতে পারেনি! কোনোভাবেই কলেজের আইসিটি ক্লাসটা করতে পারছে না সে। প্রতিবার কোনো না কোনো বাহানা তৈরি করে বারিশ তার আইসিটি ক্লাসটা ক্যানসেল করিয়ে দেয়। এর পেছনের রহস্যটা ঝিলমিলের পুরোপুরি অজানা। বহুবার জিজ্ঞেস করেও কোনো উত্তর মেলেনি। বাধ্য হয়ে এতদিন ধরে তাকে বারিশের কাছেই আইসিটি পড়তে হচ্ছে। লোকটা নিজে ইউটিউব দেখে দেখে তাকে আইসিটি পড়ায়! আবার বড় মুখে দাবিও করে, সে নাকি সব জানে!
ঝিলমিল হাতের রুটিন দুটো একটু উঁচিয়ে ধরে ক্ষোভ সামলে বলল,
—‘আপনার এই কাজের রুটিন কি এবার একটু কমানো যায় না?
পরীক্ষার জন্য পড়ব নাকি আপনার এসব কাজ করব?’
বারিশ কোনো জবাব দিল না। ল্যাপটপের স্ক্রিনে কাঙ্ক্ষিত কিছু একটা মেলাতে না পেরে তার কপালে বিরক্তির ভাঁজ। ঝিলমিল নাছোড়বান্দার মতো আবার ডেকে উঠল,
—‘কী হলো? শুনছেন? কমাবেন না?’
—‘না,’ ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই বরফশীতল সংক্ষেপ উত্তর বারিশের।
ঝিলমিল আড়ালে মুখ ভেঙচে বইয়ের দিকে মনোযোগ দিলো। সন্ধ্যা থেকে মেয়েটাকে ওই টেবিলের সামনে বসিয়ে রেখেছে বারিশ। ঘড়ির কাঁটা এখন রাত দশটার কাছাকাছি ছুঁইছুঁই। বারিশ একপলক ঘাড় ঘুরিয়ে ঝিলমিলের দিকে তাকাল। তারপর ল্যাপটপটা বন্ধ করে বেরিয়ে গেল রুম ছেড়ে।
বারিশকে ঘর ছেড়ে বের হতে দেখেই চকচক করে উঠল ঝিলমিলের চোখ দুটো! বইয়ের ভেতর লুকিয়ে রাখা ফোনটা চট করে টেনে বের করে স্ক্রিনে আঙুল চালাতে লাগল সে। ঠিক তখনই স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা অচেনা নম্বর। প্রথমবার ফোনটা কেটে দিল ঝিলমিল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই আবার রিং হতে শুরু করল। এবার না কেটে একটু বিরক্ত হয়েই রিসিভ করে কান ধরল সে,
—‘হ্যালো, কে?’
—‘কল রিসিভ করে প্রথমে সালাম দিতে হয়।’ ওপাশ থেকে ভেসে এলো চেনা অচেনা যুবকের কণ্ঠ।
—‘আচ্ছা, দিলাম! আসসালামু আলাইকুম। এবার বলুন কী চাই?’
—‘উমম… যদি বলি তোমাকে চাই…’
—‘শুনুন! ফালতু কথা বললে কিন্তু মুখে যা আসবে তা-ই দিয়ে গালি দেব!’ ওপাশের লোকটাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে কড়া গলায় হুমকি দিল ঝিলমিল।
ওপাশ থেকে মৃদু এক চিলতে হাসির শব্দ ভেসে এলো,
— ‘আরে সরি, সরি! গালি দিতে হবে না। আমি তোমার ফাহিম স্যার বলছিলাম।’
—‘ফাহিম স্যার?’
ঝিলমিলের গলার স্বর মুহূর্তেই বদলে গিয়ে তাতে যুক্ত হলো বিস্ময় আর খানিকটা জড়তা। চট করে সোজা হয়ে বসে বলল,
—‘ জি স্যার! আসসালামু আলাইকুম। ভালো আছেন? স্যার… আসলে আমি আপনাকে চিনতে পারিনি, সরি স্যার! আমি কিন্তু গালি-টালি দিই না, ভয়ে অমনি মুখ দিয়ে বের হয়ে গেছে। কিন্তু… আপনি হঠাৎ আমাকে কল করলেন?’
—‘ তুমি তো এতদিন ধরে একটা ক্লাসও করছ না, কোনো খোঁজখবরও নেই। তাই একটু খোঁজ নিতে ফোন করলাম। আর টিউশনের ব্যাপারেও কিছু জানালে না। পরীক্ষা তো চলে এলো।’ অপরপাশ হতে ফাহিম স্যার বললেন।
ঝিলমিল একটু তোতলালো,
—‘স্যার, আমি আব্বুকে বলেছিলাম। উনি বলেছেন আপাতত বাইরে টিউশন নেওয়ার দরকার নেই।’
—‘কিন্তু আমি তো সেদিন তোমার বাবার সঙ্গে এ নিয়েই কথা বললাম। তিনি তো আমাকে তোমাকে পড়াতে বললেন,’ ফাহিম জবাব দিল।
ঝিলমিলের কাশি চলে এলো। ওর মনেই নেই এই ফাহিম স্যার তার বাবার স্টুডেন্ট। আর সেদিন ক্যান্টিনে তার থেকে নাম্বারও নিয়েছিল। নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলতে শুরু করল ঝিলমিল,
—স্যার… আসলে আমার চাচ্চু! চাচ্চুও বলছিলেন এখন বাইরে পড়ার দরকার নেই। আমার ব্যাপারে চাচ্চু একটু বেশিই নাক গলায় তো… সে রাজি হলে আপনাকে জানাব।
—তোমার চাচ্চু? ওহ হ্যাঁ, মেহরাজ! ওকে তো আমি চিনি। আচ্ছা দাঁড়াও, আমিই ওর সাথে কথা বলে দেখছি। আমি বললে ঠিক রাজি হয়ে যাবে।
— না, না, স্যার! আপনাকে কিচ্ছু বলতে হবে না! আমি… আমি নিজেই বলব। আমি তাকে যেকোনোভাবে রাজি করিয়ে এই মাস থেকেই আপনার কাছে পড়া শুরু করব, স্যার!
পর পর দুটো কাঁচ ভাঙার বিকট শব্দে কেঁপে উঠল ঝিলমিল! চমকে উঠে পাশে তাকাতেই দেখল ঘরের দরজার মুখে মেঝের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সাদা দুধ আর গাঢ় কফি। কাচের ভাঙা টুকরোগুলোর ওপর চুইয়ে পড়ছে তরল। দৃষ্টি একটু ওপরের দিকে তুলতেই থমকে গেল ঝিলমিল। দরজার ফ্রেমে দাঁড়িয়ে আছে বারিশ। পুরো মুখাবয়ব তার থমথম করছে! যেন এখনই কোনো ধ্বংসাত্মক ঝড় নেমে আসতে চলেছে। কালো মনির চারপাশটা লাল রঙ ধারণ করেছে যুবকের। চোয়াল শক্ত হয়ে আটকে আছে এক হাড়হিম করা রগে।
বারিশ নিচে থেকে নিজের জন্য কফি আর ঝিলমিলের জন্য গরম দুধ নিয়ে আসছিল। কিন্তু ঘরের দরজার কাছে পৌঁছাতেই ঝিলমিল আর ফাহিমের পুরো কথোপকথন কানে আসে তার।
ওপাশ থেকে তখনও ফাহিম স্যারের গলার আওয়াজ স্পষ্ট ভেসে আসছে। কিন্তু ঝিলমিলের মুখে আর কোনো শব্দ ফুটল না। ভয়ে গলার কাছটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বারিশের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেওয়ার মতো ন্যূনতম সাহসও হারাল সে। কম্পিত আঙুলে আলগোছে ফোনটা কেটে দেওয়ার চেষ্টা করতেই, এক ঝটকায় হিংস্র চিতাবাঘের মতো এগিয়ে এলো বারিশ। ঝিলমিলের হাত থেকে ফোনটা এক টানে ছিনিয়ে নিয়ে পুরো শক্তি দিয়ে মেঝের ওপর আছাড় মারল সে! মুহূর্তেই দু’ভাগ হয়ে চুরমার হয়ে গেল ঝিলমিলের শখের আইফোনটা। হাত দুটি নিজের মুখের ওপর চেপে ধরে ভয়ে শিউরে উঠল মেয়েটা।
সে কোনো কিছু না ভেবেই এগিয়ে গেল ভাঙা ফোনটার দিকে। হাঁটু গেড়ে কাচের টুকরোর পাশ থেকে ফোনের টুকরো গুলো কুড়িয়ে হাতে নিল। চোখ তুলে দাঁতে দাঁত চেপে বারিশের দিকে তাকিয়ে শিস গর্জে উঠল ঝিলমিল,
—‘আপনি আমার ফোন ভাঙলেন কেন?’
এতদিন ধরে চেপে রাখা অপমান আর রাগ সব যেন এক লহমায় বাঁধ ভেঙে আসছে ঝিলমিলের।
বারিশ একচুলও নড়ল না। তার শরীরের প্রতিটি রগ রাগে টানটান হয়ে উঠেছে, চোখের মনি আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলছে।
—‘ওর কল রিসিভ করেছিস কেন তুই?’ হিমশীতল গলায় প্রতিটা শব্দ আলাদা করে উচ্চারণ করল সে।
—‘তাতে আপনার কী?’ ঝিলমিল এবার উঠে দাঁড়িয়ে সোজা বারিশের চোখের দিকে তাকাল। সপ্তদশী মেয়েটার কণ্ঠে তখন জেদ ছাড়া কিচ্ছু নেই,
— ‘উনি আমার টিচার! কী শুরু করেছেন এসব? তার ক্লাসে যেতে দেন না, কথা বলতে দেন না! এখন ঘরে ঢুকে হুট করে আমার ফোন ভেঙে ফেললেন! এত কিসের অধিকার দেখান আপনি আমার ওপর? আমি যা খুশি করব! যার কাছে ইচ্ছা পড়ব, যার সাথে ইচ্ছা কথা বলব! আপনার তাতে কী?’
শেষ কথাটা ঝিলমিলের মুখ থেকে শেষ হওয়ার আগেই সজোরে একটা থাপ্পড় এসে পড়ল ঝিলমিলের বাঁ গালে। চড়ের তীব্রতায় ঝিলমিলের মাথাটা একপাশে ঘুরে গেল, চোখের সামনে মুহূর্তের জন্য শর্ষে ফুল ফুটল। সে নিজেকে সামলে সোজা হওয়ার আগেই, কোনো রকম সুযোগ না দিয়ে বারিশ আবার তার হাতটা শূন্যে তুলে নেয়। দ্বিতীয় থাপ্পড়টা যেন প্রথমটার চেয়েও বেশি হিংস্র ঠেকল!
এবার ঝিলমিল ভারসাম্য রাখতে না পেরে যেই পড়ে যাবে ওমনি শিউলি বেগম এসে মেয়েটাকে জাপটে ধরল। তাতে লাভ হলো না, বারিশ ঝিলমিলকে তার থেকে টেনে এনে ঝিলমিলের মুখের একেবারে কাছে নিজের হিংস্র মুখটা এনে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল বারিশ,
—‘ শাট আপ! জাস্ট শাট দ্য ফা’ক আপ, ইউ লিটল বি’চ!’
বারিশকে আর কিছু বলতে দিলো না শিউলি বেগম। ঝিলমিলকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে বলল,
— কী করছো তুমি এগুলো তরঙ্গ! কেন মা’রছো ওকে?
বারিশের বিকট চিৎকারে ততক্ষণে বাসার সবাই দৌড়ে চলে এসেছে। চঞ্চল শেহরিয়ার দরজায় দাঁড়িয়ে ঝিলমিলের লাল হয়ে যাওয়া গালটার দিকে তাকাতেই যা বোঝার বুঝে গেলেন। শুধু তিনি একা নন ঝর্না শেহরিয়ার, আলতাফ শেহরিয়ার, সবাই পুরো ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরেছে। কারো কোনো কথা শোনার বা বলার অপেক্ষায় রইল না ঝিলমিল। সে শিউলি বেগমের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে সোজা দরজার দিকে পা বাড়াল। এক মুহূর্তও আর সে এই বাড়িতে থাকবে না! কিন্তু দুটো কদম ফেলার আগেই চঞ্চল সাহেব সামনে এসে তার পথ আটকে দাঁড়ালেন। গম্ভীর গলায় বললেন,
— ‘কোথায় যাচ্ছো তুমি?’
— ‘ থাকব না আমি আর এখানে!’ ঝিলমিলের গলা কাঁপছে। গাল দু’টো জ্বলছে।
— ‘নিশ্চয়ই… তুমি নিশ্চয়ই যাবে। আমি নিজে গিয়ে তোমাকে দিয়ে আসব। কিন্তু এখন নয়,’ চঞ্চল সাহেব শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বললেন।
— ‘না! আমি এখনই যাবো!’ ঝিলমিল যেন আর সইতে পারছে না। জীবনে কখনো কেউ তার ওপর হাত তোলেনি, আর আজ নিয়ে এই লোকটা তাকে দ্বিতীয়বার মারল!
চঞ্চল সাহেব এবারে শক্ত গলায় বললেন,
— ‘আমি বলেছি না, এখন কোথাও যাবে না!’
তারপর বড় ছেলের বউয়ের দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিলেন,
— ‘শিউলি, ওকে তোমাদের ঘরে নিয়ে যাও। আজ রাতটা তোমার কাছে রাখো, কাল সকালে আমি নিজে ওকে দিয়ে আসব। যার যোগ্য যে নয়, তার কাছে ওকে আর এক মুহূর্তও রাখব না!’ সে নিজের ছোট ছেলের দিকে তাকানোরও প্রয়োজন মনে করল না। চঞ্চল সাহেবের এই মহৎ কাজটা আরও অনেক আগেই করা উচিত ছিল। যেদিন থেকে তার ছেলে এই মেয়েটাকে দিয়ে এত কাজ করাচ্ছে, ঠিক সেদিন থেকে।
শ্বশুরের কথায় ঝিলমিলের পা দুটো যেন আটকে গেল। শিউলি বেগমও আর দেরি না করে ঝিলমিলের হাত ধরে তাদের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। ঠিক তখনই ঝড়ের বেগে ছুটে এলো বারিশ! শিউলি বেগমের কাছ থেকে ঝিলমিলকে হেঁচকা টানে ছাড়িয়ে সোজা ঘরের ভেতর নিয়ে গেল। পরমুহূর্তেই সবার মুখের ওপর সশব্দে বন্ধ করে দিল দরজাটা।
ঝিলমিল স্তব্ধ হয়ে কয়েক সেকেন্ড দরজার দিকে তাকিয়ে রইল,
পরক্ষণেই সে উন্মাদের মতো দরজার হাতল ধরে টানাটানি করতে লাগল।
— ‘দরজা খুলুন! ছেড়ে দিন আমাকে! আমি এক মুহূর্তও থাকব না আপনার সাথে! দরজা খুলে দিন বলছি!’
দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দুই হাত বুকের কাছে শক্ত করে বেঁধে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে বারিশ। তার চোয়াল শক্ত, চোখে এক ধরনের শীতল, উগ্র জেদ। ঝিলমিলের ছটফটানি আর কান্না যেন তাকে স্পর্শও করছে না। বাইরে থেকে ততক্ষণে দরজায় সজোরে থাপ্পড় পড়তে শুরু করেছে। চঞ্চল সাহেবের ভারী, গম্ভীর গলা দরজার ওপাশ থেকে ভেসে এল,
— ‘তরঙ্গ! দরজা খোলো! ওকে গায়ে আর একটা হাতও দেবে না!’
ভেতর থেকে বারিশের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে চঞ্চল সাহেবের গলার জোর আরও বেড়ে গেল,
— ‘তরঙ্গ, বেয়াদবির একটা সীমা আছে! মেয়েটার গায়ে হাত তুলেছ আবার তাকে ঘরে আটকে রাখছ? ভালোয় ভালোয় দরজা খোলো, নইলে আমি ধাক্কায় দরজা ভাঙব!’
ঝিলমিল আরও জোরে দরজায় ধাক্কা দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল,
— ‘বাবা! বের হতে দিতে বলুন আমায়। আমি বাসায় গিয়ে সবাইকে বলে দেব।’
শিউলি বেগমও ওপাশ থেকে আকুতি জানিয়ে বললেন,
— ‘তরঙ্গ, লক্ষ্মী ভাই আমার, দরজাটা খোলো!’
কয়েক মিনিট এভাবেই কেটে গেল। ঝিলমিল এখন ক্লান্ত হয়ে বেডে গিয়ে উল্টো দিক ঘুরে বসে আছে। গাল দুটো গরম এখনও। দরজার ওপাশ থেকে ডাকাডাকিও কমে গেছে। বারিশ এবার দরজা খুলে বাহিরে বের হয়ে এলো। দরজা খোলার শব্দ শুনে পেছনে ঘুরে দেখল ঝিলমিল। কিন্তু উঠে বাহিরে আসার আগেই বাহির থেকে লক করে দিলো বারিশ। লক করে পেছন ঘুরতেই নিজের বাবার থাপ্পড় এসে লাগল তার গালে। হঠাৎ পাওয়া চড়ের ধাক্কায় টানটান হয়ে উঠল তার চোয়াল। পলক না ফেলে রাগে গজগজ করে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল সে। ছেলেকে এভাবে হিংস্র চোখে তাকাতে দেখে চঞ্চল সাহেব আরও গর্জে উঠলেন,
— ‘কী হলো, এবার মারবে আমাকে? মারো! তোমার কাছে তো সবই সম্ভব! ভেবেছিলাম বিদেশে এতগুলো বছর কাটিয়ে ভদ্রতা-সভ্যতা শিখে এসেছো, কিন্তু তুমি দিন দিন আরও অমানুষ হয়ে উঠেছো!’
বারিশ একবিন্দু নড়ল না, একদম নিশ্চুপ। চেহারায় অনুশোচনা বা ভয়ের কোনো চিহ্নও নেই, বরং লেগে আছে চরম এক অবাধ্যতা।
— ‘কেন মেরেছো ওকে? কী এমন অন্যায় করেছে মেয়েটা?’
বারিশ থমথমে কণ্ঠে জবাব দিল,
— ‘সেই কৈফিয়ত আমি তোমায় দেব না বাবা! এটা আমার আর ওর ব্যক্তিগত ব্যাপার।’
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঝর্না বেগম ছেলের পক্ষে সুর মিলিয়ে নিজের স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বিরক্তির গলায় বলে উঠলেন,
— ‘নিশ্চয়ই মেয়েটা কোনো বড় অকাজ করেছে, তাই মেরেছে! এতে এত কাহিনি করার কী আছে?’
স্ত্রীর কথা কানেই তুললেন না চঞ্চল সাহেব। তিনি রক্তচক্ষে ছেলের দিকে তাকিয়ে ধমকের স্বরে বললেন,
— ‘বেরিয়ে যাও তুমি আমার বাড়ি থেকে! এ বাড়িতে তোমার আর কোনো জায়গা নেই। এখনই বের হও!’
বাবার মুখ থেকে কথাটা বের হতে যতখানি দেরি, বারিশের পদক্ষেপ নিতে ততটুকুও দেরি হলো না। কোনো কথা না বাড়িয়ে, হনহন করে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল সে।
বেশ বিনোদন পাচ্ছিল জারিফ। ঝিলমিলটা তাকে জ্বালাতে এসে নিজেই কীভাবে জ্বলেপুড়ে ছারখার হচ্ছে। এমন দৃশ্য ভিডিও করে রাখতে পারলে শান্তি লাগত। সে হাসিমুখে ঝর্না বেগমের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— ‘দাদীমা, চাচ্চু একা কেন গেল? ওই ঝিলমিলটাকেও তো সাথে করে বের করে দেওয়া দরকার!’
ঝর্না বেগম মুখ খুলে কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই ফরহাদ সাহেব ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিলেন জারিফের গালে। চোখ দুটো বড় বড় করে রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বললেন,
— ‘ নিজের চরকায় তেল দিতে পারিস না? তুই আরও বেশি বেয়াদব হচ্ছিস!’
জারিফ গাল চেপে ধরে অবিশ্বাস্য চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
ঝিলমিলের চোখের বর্ষণ থামছিলই না। কান্না যেন বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো উপচে আসছে। অপমানে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। ফোনটাও ওই জল্লাদটা ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিয়ে গেল! নইলে এখনই বাবাকে ফোন করে সব বলে দিত… বলে দিত এই বাড়িতে সে কী নরকযন্ত্রনার মধ্যে আছে! বিছানা থেকে উঠে দাড়াল ঝিলমিল। পা দুটো টলছিল, তবুও হেঁটে রুমের মধ্যে এদিক ওদিক গেল। তার ইচ্ছা করছে বেলকনি দিয়ে এক লাফে নিজের বাড়ি চলে যেতে। সে গিয়ে দাঁড়াল ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে। দু’গালে হাত রেখে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল মেয়েটা। চড়ের চোটে ফর্সা গাল দুটো লাল হয়ে ফুলে উঠেছে, চোখ দুটোও কান্নায় জবা ফুলের মতো লাল।
সে কাঁদছে, আর আয়নায় নিজেকে দেখছে। কাঁদলে তাকে বেশ সুন্দরই লাগে। ঝিলমিল এলিয়ে পড়া চুলগুলো টেনে এনে দুই কাঁধের দু’পাশে ছড়িয়ে দিল। চোখ মুছে আবার আয়নায় নিজেকে দেখতে লাগল। ধীরে ধীরে তার কান্নার বেগ হালকা হয়ে এল। চোখের দৃষ্টি থেকে কান্না মুছে সেখানে ফুটে উঠল গম্ভীর ভাব। নিজেকে দেখতে দেখতে নিজের অবচেতন মনেই তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ভেসে উঠল। কিন্তু সেই বেশি মুহূর্ত স্থায়ী হলো না সেই হাসি। আয়নায় নিজের গালে জখমটার দিকে নজর পড়তেই সেই হাসি উবে গিয়ে আবারও ডুকরে কেঁদে উঠল সে।
বারিশের উদ্দেশ্যে মুখে কয়েকটি গাালি ছুড়ে দিয়ে ঘরের সুইচে হাত দিয়ে ধুপ করে লাইটটা বন্ধ করে দিল। ঘোর অন্ধকারের মধ্যে বিছানায় এসে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে হয়ে শুয়ে পড়ল সে।
ইতিমধ্যেই দুটো বোতল খালি হয়ে পড়ে আছে টেবিলে, এখন তিন নম্বর বোতলটা ঢেলে গ্লাসে ঢালছে সে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, হালকা আলো-আঁধারির বার ঘরটা ভারী গন্ধে গমগম করছে। কাউন্টারের এক কোণে বসে একটার পর একটা গ্লাসে চুমুক দিয়ে যাচ্ছে বারিশ।
বারটা তার নিজেরই এক পুরনো বন্ধুর, তাই বাঁধসাধারও কেউ নেই।
একটু দূরে বন্ধুদের মাঝখানে বসে দৃশ্যটা উপভোগ করছিল নীল। বারিশের সোজা হয়ে বসার অক্ষমতা আর বেসামাল ভঙ্গিমা দেখে অবাক হবে নাকি আনন্দ পাবে বুঝে আসছিল না। বারিশ আগে যেমনই হোক, কানাডা থেকে আসার পর সিগারেট খেলেও মদ গিলেনি একবারও।
পকেট থেকে ফোনটা বের করে পাশে বসে থাকা বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল,
— ‘মেহরাজকে খবর দে। বল, এসে দেখে যাক তার প্রিয় ভাইজির জামাই কীভাবে মদ গিলে সাবাড় করছে!’
—‘ কোনো দরকার নেই এসবের। খাচ্ছে, খেতে দে।’ পাশ থেকে অন্য একজন বন্ধু বলল।
তিন নম্বর বোতলটার শেষ ফোঁটাটুকু গ্লাসে ঢেলে নিঃশেষ করে দিল বারিশ। অতিরিক্ত অ্যালকোহলের ধাক্কায় শরীরটা অবশ হয়ে আসছে এখন তার। মাথাটা ভারী হয়ে একদম টেবিলে ঝুঁকে পড়ল সে। বারিশকে ওভাবে ঢলে পড়তে দেখে আড্ডার মাঝখান থেকে এক বন্ধু এগিয়ে এল। কাধে হাত দিয়ে ডেকে বলল,
— ‘কীরে… এবার তো বল কী হয়েছে? তোর কচি বউয়ের সাথে ঝগড়া করেছিস নাকি?’
টেবিলে মাথা গুঁজে পড়ে থাকা বারিশের কানে কথাগুলো আবছাভাবে পৌঁছাচ্ছিল। তীব্র নেশার ঘোরে মগজে হঠাৎ করেই সপ্তদশীর মুখটা ভেসে উঠল। কান্না ভেজা সেই হ্যাজেল মনি দুটো চোখে ভেসে উঠতেই বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল বারিশের। স্তব্ধ মনে হলো পুরো পৃথিবীটা। কয়েক ঘন্টা হয়েছে সে বাড়ি থেকে এসেছে, মনে হচ্ছে কতবছর সে ঝিলমিলের কাছে নেই।
সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল বারিশ। টাল সামলাতে না পেরে পাশের চেয়ারটায় ধা’ক্কা খেল, তাও থামল না । এক ফোঁটা সময় নষ্ট না করে বেসামাল পায়ে বারের দরজার দিকে পা বাড়াল সে। তাকে যেন এখনই ফিরতে হবে… সেই অবাধ্য কিশরীর কাছে! উঠে দাঁড়াতেই নীল চট করে সামনে এসে হাত চেপে ধরল,
— ‘আরে ভাই, কোথায় যাচ্ছিস এই অবস্থায়? তুই তো সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছিস না!’
বারিশ নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে জড়িয়ে যাওয়া গলায় বলল,
— ‘আমাকে যেতে হবে… আমায় ছাড়…’
অবস্থা সুবিধার নয় দেখে বাকি বন্ধুরা দ্রুত এগিয়ে এসে বারিশকে দু’পাশ থেকে ধরে ফেলল। নীল পকেট থেকে গাড়ির চাবি বের করে চ্যাঁচাল,
— ‘হয়েছে, অনেক হয়েছে! এই হাল নিয়ে রাস্তায় নামলে অ্যাক্সিডেন্ট করে মরবি। চুপচাপ চল, তোকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি।’
প্রতিবাদ করার মতো কোনো জোর বারিশের গায়ে আর অবশিষ্ট ছিল না। মনে মনে তখনো কেবল ওই একটাই মুখ ঘুরপাক খাচ্ছে তার।
বন্ধুরা বারিশকে একদম বাড়ির মূল ফটকের সামনে এনে কোনোমতে নামিয়ে দিয়ে সটকে পড়ল। ভেতরে এনে দিয়ে যাওয়ার সাহস তাদের কারও নেই। কারণ তাদের সাথে ঘুরে বারিশ এভাবে মদ গিলেছে জানতে পারলে ঝর্ণা বেগম ঝাঁটা নিয়ে তাড়া করবেন। এ বিষয়ে তারা শতভাগ নিশ্চিত!
গেট পেরিয়ে টলমল পায়ে ভেতরের দিকে পা বাড়াল বারিশ। মেঝের ওপর নিজের পা দুটো ঠিকমতো ফেলতেও পারছিল না সে। কোনোমতে দেওয়াল ধরে ধরে হেঁটে গিয়ে নিজের বেডরুমের সামনে এসে দাঁড়াল। পকেট থেকে অনেক কসরত করে চাবিটা বের করে দরজার লকটা খুলল। দরজা খোলামাত্রই চোখে পড়ল পুরো ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকারে। অন্ধকারের ভেতরেই বেসামাল পায়ে এগিয়ে যেতে গিয়ে আচমকা বেডসাইড টেবিলটার সাথে হোঁচট খেল বারিশ। কাচের টুকরোগুলো এখনো ফ্লোরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। কাচের টুকরো তার পায়ের পাতায় ফুটে গেল কি না, সেদিকেও বারিশের কোনো তোয়াক্কা নেই। সে যেন একপ্রকার মাতাল টানে ছুটে গিয়ে বসল বিছানায়, একদম ঝিলমিলের গা ঘেঁষে। যেন কত শত বছর সে তাকে দেখেনি! বিছানায় একপাশ হয়ে শুয়ে আছে ঝিলমিল। ফর্সা গালে হাত রেখে কাথ হয়ে শুয়ে আছে কিশরী।
বারিশ কাঁপা কাঁপা হাতে ধীরে ধীরে ঝিলমিলের হাতটা গাল থেকে সরিয়ে দিল। তারপর নিজের তপ্ত, ভারী হাতের তালুটা আলতো করে এনে রাখল ঝিলমিলের ফোলা গালটার ওপর। আঙুল বুলাতে লাগল সেখানে। যেন সামান্য অসাবধানতায় এই স্পর্শেই মেয়েটা আবার কষ্ট পাবে। ঘোর লাগা চোখে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় আর শরীর সামলাতে পারল না সে। ক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে বারিশ ঝিলমিলের পাশে শুয়ে পড়ল।
শুয়ে থেকেও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ঝিলমিলের স্তব্ধ, নিষ্পাপ চেহারার দিকে। শেষমেশ চোখের পাতার তীব্র ক্লান্তি আর সইতে না পেরে ধীরে ধীরে সে চোখ দুটো বন্ধ করল। চোখের পাতা শতমন ভারি লাগছে তার। কিন্তু চোখের পাতা দুটো জুড়তেই বুজে আসা আঁধারে ভেসে উঠলো অদ্ভুত এক দৃশ্য! সেদিনের সেই দৃশ্য…তার আর দীঘির গায়ে হলুদের দিন নাচছিল মেয়েটা। নাচের উন্মাদনায় ঝিলমিলের অনাবৃত কটিদেশের মসৃণ শুভ্রতা কেমন ঝলসে উঠছিল বারবার। চোখ খুলে ফেলল যুবক। তপ্ত নিঃশ্বাসের ঝড়ে বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। এই দৃশ্য এখনই কেন মনে হতে হলো তার! নিজের ভেতরের এই অবাধ্য মোহকে দমন করতে শুষ্ক ঢোক গিলে বিড়বিড় করে নিজেকেই ধমকে উঠল,
— ‘নাহ, বারিশ! তুই মাতাল, আর ও বড্ড ছোট… ঘুমা তুই, ইডিয়ট!’
সে আবার চোখ বুজে নিজেকে শান্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা করল। কিন্তু মাতাল হৃদয়ের রক্তক্ষরণে নিস্তার মিলছিল না কোনোভাবেই। কিছুটা সময় কেটে গেল সেই থমথমে নীরবতায়। আবারও তাকাল সে। এক দুর্নিবার, প্রচ্ছন্ন আকর্ষণে বারিশ হাত বাড়াল। খুব সাবধানে, অতি সতর্কতায় ঝিলমিলের গায়ের চাদরটা ধীরে ধীরে একপাশে সরিয়ে দিল। চাদর সরে যেতেই তার চোখ গিয়ে আটকে গেল সপ্তদশীর কোমরের বাঁকে। অসাবধানী ঘুমে টি-শার্টটা গুটিয়ে অনেকটাই ওপরে উঠে গেছে; অনাবৃত হয়ে আছে তার মসৃণ, শ্বেতশুভ্র নরম কটিদেশ।
সেই দৃশ্যে চোখের মনি স্থির হয়ে গেল বারিশের। রক্তে চড়ে বসা মদের উন্মাদনা ছাপিয়ে তার দৃষ্টিতে তখন ধরা দিল পরম তৃষ্ণা, ব্যাকুল আবেশ আর মোহ। সে যেন এক অদৃশ্য জাদুবলে পুরোপুরি আচ্ছন্ন, পথহারা। ধীরে ধীরে নিজের তপ্ত মুখটা ঝিলমিলের শরীর ঘেঁষে নামিয়ে আনল সে। বারিশের থরথর করে কাঁপতে থাকা শুকনো ঠোঁট দুটি প্রথমবারের মতো আলতো করে গিয়ে ছোঁয়া দিল ঝিলমিলের সেই উন্মুক্ত, কোমল ত্বকের গভীরে। একটা… দুটো… তিনটা…প্রতিটি স্পর্শে বারিশের বুকের ভেতর জমা হওয়া তীব্র আকুলতা আর মাতাল নিঃশ্বাসের উত্তাপ যেন একটু একটু করে গলে মিশে যেতে লাগল ঝিলমিলের অবচেতন শরীরে।
বারিশের তপ্ত ঠোঁটের বারবার স্পর্শ আর মাতাল নিঃশ্বাসের উত্তাপ ত্বকে লাগতেই ঘুমের ঘোরে শিহরিত হয়ে উঠল ঝিলমিল। ধীরে ধীরে কাঁচা ঘুমটা ভেঙে আসতেই অসচ্ছলভাবে একটু নড়েচড়ে উঠল সে। ঝিলমিলের এই সামান্যতম নড়াচড়াতেই যেন বিদ্যুতের মতো সচেতনের ধাক্কা খেল বারিশ! চমকে উঠে তৎক্ষণাৎ নিজের মুখটা গুটিয়ে নিয়ে একটু দূরে সরে শুয়ে পড়ল সে। অন্ধকারের ছায়ায় একপাশে একদম স্থির হয়ে রইল, যেন নিঃশ্বাসটাও চেপে ধরেছে নিজের উপস্থিতি গোপন করার আপ্রাণ চেষ্টায়।
ঝিলমিল ঘুমের ঘোর কাটাতে কাটাতে চোখ পিটপিট করে তাকাল। পুরো ঘর ঘন অন্ধকারে ডুবে আছে, কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু ঘরের ভারী বাতাসে ভেসে থাকা এক তীব্র, পরিচিত গন্ধ তার নাসারন্ধ্রে এসে ধাক্কা মারতেই বুকের ভেতরটা এক নিমেষে হিম হয়ে গেল। ভয় আর সংশয়ে কাঁপতে থাকা গলায় অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে উঠল ঝিলমিল।
— ‘কে… কে এখানে?’
কোনো উত্তর এলো না। ঝিলমিল বিছানায় আধশোয়া হয়ে ওঠার চেষ্টা করতেই বারিশ অন্ধকারের ভেতরেই একটু গড়িয়ে ঝিলমিলের আরও কাছাকাছি সরে এলো। সে যত কাছে ঘেঁষে আসছে, মদের সেই ঝাঁঝালো গন্ধটা তত তীব্র হয়ে গ্রাস করছে ঝিলমিলকে। মেয়েটার শরীরের প্রতিটা লোমকূপ আতঙ্কে খাড়া হয়ে উঠেছে। হৃদপিণ্ড বুকের খাঁচায় যেন হাতুড়ি পিটতে লাগল পাগলের মতো!
সে জানে, এই গন্ধটা কার। এই অন্ধকার ঘরে, এত রাতে আর কে হতে পারে? যে মানুষটা একটু আগেই তাকে দু’দুটো চড় মেরে গিয়েছে, সে-ই এখন আস্তে আস্তে তার একদম ঘাড়ে এসে নিঃশ্বাস ফেলছে!
শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১৫
—‘ সরুন! আপনি কাছে আসছেন কেন?’
সরল না বারিশ। আরও কাছে গেল। ঝিলমিলের গলার কাছে মুখ রেখে ফিসফিসিয়ে আওড়াল,
— সরি…সিয়েনা!
— আমি সিয়েনা নই, আমি ঝিলমিল।
— উমম…সিয়েনা।
