প্রিয় জারুলফুল পর্ব ২৩
সাদিয়া সাদু
নূরুল হুদা কে দেখে নাসিরুদ্দিন এর মুখে হাসি ফুটে উঠল । দীর্ঘদিন পর তাঁদের দেখা হলো । নাসির এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল , নুরুল হুদাকে নিজের বাপের নজরেই দেখেন । আগে বেশ ভালোই সম্পর্ক ছিল তাঁদের মধ্যে প্রতিদিন যাতায়াত করত খান বাড়িতে , কিন্তু বছর বিশেক ধরে আর আসছে না , কয়েকবার নাসির দেখা করতে গিয়েও ব্যর্থ হয় । নুরুল হুদা কোনো কাজে বিদেশ চলে যায় ।
_’ কেমন আছেন চাচা ? অনেকদিন পর দেখা আপনার সাথে । ‘
নুরুল হুদা একটু হাসল । নাসিরের পিঠ চাপড়িয়ে হাসি হাসি মুখে বলল
_’ আলহামদুলিল্লাহ , তুই কেমন আছিস নাসির ? সেই বোকাই রয়ে গেলি তুই । কিন্তু ছেলে বানিয়েছিস বিড়ালের থেকে বাঘের বাচ্চার জন্ম। ”
নাসির ফিক করে হেসে ফেলে ।
দুইজন কিছু সময় কথা বলল ।
হলরুমের সবাই তাদের দুইজনের হাসিমুখে কথা বলাটা দেখল ।
জহুরা দুর্বল শরীরটা সোফা থেকে এলিয়ে দিল । মাথাটা ঝিমঝিম করছে , তার সাথে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীরটাও দুর্বল লাগছে ভীষণ । যতই স্টং দেখাক না কেনো বয়স আর শরীরের শক্তি কেউ আটকে রাখতে পারে না । বয়স বাড়ার সাথে সাথে যৌবন ফুরাবেই । জহুরা , মাথাটা নিচু করে বড় বড় কয়েকবার শ্বাস ফেলেছে । ভেতরের ভয়টা বাহির করতে চাই না সে , তাই মুখ টাকে শক্ত করে সোফা থেকে পায়ের উপর পা তুলে বসল । দিগন্ত দাদির কাছে বসতে গেলে বাঁধা সাধে দীনা । গায়ে রক্ত শুকিয়ে আছে , ভদ্রমহিলা চোখ পাকিয়ে শাসিয়ে বলে ।
_’চল তোকে ডেসিং করে দি । দেখ তো রক্ত শুকিয়ে চামড়ার সাথে লেগে আছে ।তোর ব্যথা লাগে না ? ‘
দিগন্ত মায়ের বাঁধা উপেক্ষা করে দাদির নিকট এগিয়ে যেতে যেতে বলল ।
_” শরীরের ক্ষত তো মনের ক্ষতের কাছে কিছুই না । ”
দীনা আর কথা বাড়াল না চুপচাপ এক কোণে দাঁড়িয়ে রইল , জিসা আর নাসিমাও এ কোণে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । ঘূর্ণিঝড় আসার পূর্বাভাস পাচ্ছে তারা ।
দিগন্ত দাদির কাছে এগিয়ে গিয়ে সোফায় বসল পায়ের উপর পা তুলে । জহুরার দিকে একটু ঝুঁকে বলল ।
_’ভালোই ভালোই সব বলে দেন ।নয়তো আমার স্ত্রী সন্তানকে মার্ডার করতে চাওয়ার অপরাধে পুলিশে দিব । আপনাকে ফাঁসির মঞ্চ পর্যন্ত নেওয়ার লোক কিন্তু এইখানেই পরিস্থিত । ‘
জহুরা ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখলে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নূরুল হুদা কে । এসির মাঝেও শরীর থরথর করে ঘামছে তার সাথে কলিজা কেমন ধরফর করছে । ভিতরে গজানো সেই বাঘের গর্জন টা এখন বিড়ালের ডাকে রূপান্তর দেখে দিগন্ত ঠোঁট চেপে ধরল । টেবিল থেকে পানি নিয়ে এগিয়ে দিল দাদির দিকে ।
_’নেন পানি খান । একটু শান্ত হোন । আগে সব বলেন পরে স্ট্রোক করেন , আগেই স্ট্রোক করলে কসম আপনার জানাযা পড়ার জন্যই আপনার শরীর থাকবে না ।”
_’ আজ রবিবার হলেও , ম্যামের কপালে শনিদশা লেগে গেছে । ”
পিছন থেকে আলিফের। ইয়ার্কিমূলক কথা শুনে দীনা ফিক করে এসে ফেলল ।
দীনার হাসির শব্দে । সবাই তার দিকে তাকায় , দীনা সবার চাহনি পরখ করে জিভ দিয়ে দাঁত কাটল ।নাসির কটমট চাহনি নিক্ষেপ করে স্ত্রীর দিকে । খানিকটা ধমকে উঠল মূহূতেই।
_’ কি হচ্ছে কি দীনা ?বাচ্চাদের কথা শুনে বাচ্চামি করছ । আদব কায়দা কি পানির সাথে গুলিয়ে খেয়ে ফেলেছ ? ”
নাসির এর এমন রুপ টাই লুফে নিতে হরহরিয়ে বলল জহুরা ।
_’ দেখ নাসির তোর ছেলে বউ আমার সাথে কি কি করছে । এই দিন দেখার জন্যই কি তোকে জন্ম দিয়েছি বাবা । আমাকে পালতে তোদের এতো সমস্যা হচ্ছে আমাকে বিদ্যাশ্রমে দিয়ে দে , তোদের গলার কাঁটা টা দূর কর বাবা । আমি চাই না আমাকে নিয়ে তোদের মধ্যে ঝামেলা হোক ।”
_’ নাটক কম করো পিও । তুমি যে তাকে জন্ম দাওনি তা তুমি খুব ভালো করেই জানো । ভুলভাল বোঝান রেখে লাইনে এসো নয়ত আমি পুলিশ কে কল দিচ্ছি এখনি দুইটা মার্ডার আরো দুইটা করতে চাওয়ার জন্যই ফাঁসি থেকে কেউ আটকাতে পারবে না । ”
নাসির সবে মুখ খোলেছে কিছু বলতে তার আগেই নুরুলহুদা কথাটা ছুঁড়ে দেয় ।
নাসির যেনো আকাশ থেকে এইমাত্র টপকে জমিনে পড়েছে । সে নির্বাক হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে নূরুল হুদার দিকে । অপর দিকে জহুরা যেন ভুলেই গেছে যে এইখানে বর্তমানে নুরুল হুদা উপস্থিত। তার ভয় বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে । থরথরিয়ে কাঁপছে শরীর । নাসিমা আর জিসা তো পারছে না এইখান থেকে পালিয়ে যেতে ।
জহুরা চুপচাপ বসে আছে সোফায় । পুরো হলরুম পিনপতন নীরবতা পালন করছে ।
আলিফ , নুরুল হুদা আর নজরুল এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে । এতো বড় রাজপ্রাসাদে মতো বাড়ি দেখে নজরুল উসখুস করছে , নুরুল হুদার দিকে এগিয়ে আস্তে করে বলল ।
_’ এইহান আমার কাম কি ভাইজান ? ”
_’ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক । কাজের সময় কাজ । ”
আবারো পিনপতন নীরবতা, তাদের নিরবতা ভাঙ্গে বাহির থেকে আসা পুলিশের গাড়ির হর্ণের শব্দ শুনে ।। তিনজন একসাথে ধরফরিয়ে উঠল মূহূর্তেই।
লাফিয়ে উঠল জহুরা ।
_’ আমি সব বলব। পুলিশে দিবে না কেউ ।”
বাঘের মুখে বিড়ালের ডাক শুনে মুচকি হাসল দিগন্ত । দিগন্ত নূরুল হুদার দিকে তাকিয়ে বলল ।
_’ পুলিশকে না করেন আসতে । ”
নুরুল হুদা সাথে সাথে ফোন কানে ধরে না করে দেয় । অপর পাশ থেকে কোনো উত্তর আসার উপেক্ষা না করেই কল কেটে দেয় ।
_’ বলেন ।’
জহুরা একটা শুকনো ঢোঁক গিলে ।
কিছুটা সময় বিরতি নিয়ে বলতে শুরু করল।
_”আলি আহমেদ খানের দ্বিতীয় বউ আমি ।
আলি আহমেদ খানের সাথে আমার দীর্ঘদিন প্রেমের সম্পর্ক ছিল । যখন তার সাথে আমার প্রেমের সম্পর্ক ছিলো তখন সে ছিল বেকার ,গ্ৰামের খেতে কামাড়ে কাজ করে বেড়াত । মাথা গুজার জন্য শুধু একটা বাঁশের ছোট্ট খুঁটির ছিল । তার কিছু না থাকার কারণে তার সাথে সম্পর্ক চলাখালিন তাকে না বলে আমি শহরের এক প্রভাবশালী মানুষ কে বিয়ে করি । বিয়ের পর আলি আহমেদ কে বিয়ের কথা বললে সে আমার সাথে আর কোনো যোগাযোগ রাখেনি । আমি আর তার কোনোকিছু জানি না , আমার সংসার ভালোই চলছিল। বিয়ের বছরের মাথায় নাসিমার জন্ম হয় , নাসিমার জন্ম টাই যেনো কাল হয়ে দাঁড়াল আমাদের সংসারে । তার জন্মের দুই মাস পড়ে আমার স্বামীর চাকরিটা চলে যায় । অভাব অনটন শুরু হয় সংসারে । আমি মানুষের গৃহে কাজ করতে শুরু করলাম সংসার বাঁচাতে। একদিন এই খান মহলে কাজের সূত্রে আসা আমার , তখন দিগন্তের দাদির নতুন বিয়ে হয়েছে , কিন্তু আমি জানতাম না এইটা আলি আহমেদ এর বাড়ি । আমি দুইদিন কাজ করার পর টের পেলাম আলি আহমেদ ইতালি থেকে বাংলাদেশ ফিরেছে , সে তখন প্রভাস থেকে এই বাড়ি তৈরি করে। তখন দেশে এসে সিদ্ধান্ত নেয় আর বিদেশ যাবে না এইখানে ব্যবসা দিবে । আমি আড়াল থেকে দাঁড়িয়ে সব কথা শুনলাম । তারপর থেকে আমি এক ঘণ্টা কাজ করে চলে যায়, আলি আহমেদ আমাকে কখনো দেখতে পাইনি এই বাড়িতে । তার ঠিক ১ মাসের ভেতর দিগন্ত তার মায়ের পেটে এল । আমি উঠেপড়ে লেগেছি দিগন্তের মাকে মারতে । কিন্তু কাজটা কোনোভাবেই করা যাচ্ছিল না নুরুল হুদার জন্য , সে তখন এই বাড়িতেই নিয়মিত যাতায়াত করত , আমি যতক্ষন থাকতাম নুরুল হুদা ও এই বাড়িতে থাকত তাই কোনোভাবেই মারা পসিবল হয় না ।
এইভাবে চলতে চলতে দিগন্তের জন্ম হয় ।
দিগন্তের জন্ম হয় হাসপাতালে ,তখন তার মাকে দেখার জন্য কেউ ছিল না ,আমি হাসপাতাল ছিলাম ওই সময় আলি আহমেদ ও দেশের বাহিরে ছিল । এই সুযোগটা আমি লুফে নিলাম , নার্সকে টাকা খাইয়ে বিষাক্ত ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলি । ”
একটু থামল জহুরা ।
নাসির মায়ের এমন স্বীকারোক্তিতে মাথায় হাত দিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল । যাকে এতো দিন মা ভেবে আসছে আজ দেখতে পেল সেই তার মায়ের আসল খুনি । ঝরঝর করে কাঁদতে শুরু করল নাসির ।
দিগন্ত বাবার অবস্থা একবার দেখে দাদির দিকে কটমট দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল ।
_’ বাকিগুলো বলো । ‘
_’ এতো টুকু থাক । বাকিগুলো তো তুমি জানো দিগন্ত। ‘
_’ আমি জানি , বাকিরা জানে না তুমি বলতে শুরু করো , পুশিল কিন্তু বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে ।”
_’ তারপর আলি আহমেদ কে আমি গ্ৰাম থেকে হুজুরের থেকে পানি পড়া খাইয়া আমার জন্য পাগল বানায়া । তাকে পাগল বানিয়ে আমি আমার প্রক্তন স্বামীকে ডিভোর্স দেয় । আমি ভেবে নিয়েছি আলি আহমেদ আমাকে তার সব লিখে দিবে । সবকিছু লিখে নিতে পারব আমার নামে । কিন্ত তার আগেই ওষুধের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। আর আহমেদ ও হুঁশে ফিরে আসে । নাসিরকে আমি প্রচুর অবহেলা করতাম তাই আলি আহমেদ নাসির এর নামে সব লিখে দেয় । নাসির এর বয়স আঠারো হওয়ার আগ পর্যন্ত যদি তার কিছু হয় তাহলে সব সম্পত্তি সরকারি হয়ে যাবে । এরকম নোটিশ দেখার পরে আমার প্ল্যান পরিবর্তন করে ফেললাম।
আলি আহমেদ কে মারার প্ল্যান করি ।সুযোগ খুঁজি , এই সুযোগ আসে দিগন্তের জন্মের চারদিন পর । সবাই তখন হাসপাতালে এই ফাঁকে বিষাক্ত ইনজেকশন দিয়ে মেরেছি, নাটক সাজিয়েছি স্ট্রোক করেছে । এরপর দিগন্তের সাথে জিসার বিয়ে দিতে উঠে পড়ে লাগি , এর ভেতর শুনি দিগন্ত আমাদের কারখানার ম্যানেজার জসীম এর মেয়েকে গুপনে বিয়ে করে নিয়েছে। জারুলকে দূরে সরাতে চুপ করাতে তার বাবা মাকে এক্সিডেন্ট করায় , দুর্ঘটনায় তার বাবা মারা যায় রয়েই যায় তার মা। তাকে হুমকি দিয়ে দিগন্তকে ডিভোর্স দিতে বলি । ডিভোর্স লেটার পাঠায় ও । কিন্তু আমি তখন জানতাম না দিগন্তের একটা মেয়ে জন্ম নিয়েছে । জানার আগেই জারুল এই বাড়িতে কাজ করতে ঢোকে পড়ে । ”
জহুলা কথা শেষ করে থামে ।
প্রিয় জারুলফুল পর্ব ২২
_’এইবার তো আমাকে ছেড়ে দাও দিগন্ত , আমি তো আমার ভুল স্বীকার করেছি । মাফ করা মহত গুণ। ”
দিগন্ত একটু হেঁসে বলল ।
_’ আরে দাদুউউ এটা তো ফোনের সাইরেন ছিল । ধুর বেড়ি ভয়ে সব বলে দিল । ”
