Home প্রিয় জারুলফুল প্রিয় জারুলফুল পর্ব ২৪

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ২৪

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ২৪
সাদিয়া সাদু

সত্যিটা শোনার পর নাসিরুদ্দিন যেন হঠাৎ করে নিজের চারপাশের সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। নির্বাক সে । ফ্লোরে স্থির হয়ে বসে রইল। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, চোখের দৃষ্টি থমকে আছে। তার হাত দুটো শক্ত হয়ে মুঠো করা, অথচ আঙুলের কাঁপুনি থরথর করে বেড়ে চলেছে । ৫৬ বছর ধরে যাকে সে নিজের মা বলে জেনে এসেছে, আজ জানতে পারল—জহুরা তার আপন মা নয়, সৎ মা। আরও ভয়ংকর সত্য হলো, তার জন্মদাত্রী মায়ের মৃত্যুর পেছনেও জহুরার হাত ছিল। কথাটা তার মাথায় ঢুকতেই বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেল। হু হু করে উঠল হৃদপিণ্ড।

সে তার নিজের মায়ের মুখটাও মনে করতে পারে না। মা তাকে পৃথিবীতে আনার মাত্র তিন দিন পরই মারা গিয়েছিলেন। এত ছোট ছিল নাসিরুদ্দিন যে মায়ের মুখ, কণ্ঠ, স্পর্শ—কোনো কিছুই তার স্মৃতিতে থাকার কথা নয়। মায়ের সঙ্গে তার কোনো স্মৃতি নেই, আছে শুধু এই মাত্র জহুরার মুখে শোনা কিছু কথা। তার কাছে মা মানেই জহুরা। মায়ের ভালোবাসা কেমন, মায়ের আঁচল কেমন—এসবের কোনো স্মৃতি তার ছিল না। তাই জহুরার দেওয়া পরিচয়, জহুরার বলা কথা, জহুরার ছায়াতেই সে নিজের শৈশব কাটিয়েছে।
আজ সেই ভিত্তিটাই ভেঙে গেল। নাসিরুদ্দিন মাথা নিচু করে বসে রইল। চোখের সামনে নিজের মায়ের কোনো মুখ ভেসে উঠছে না—কারণ সেই মুখ তার স্মৃতিতে কখনো ছিলই না। এই বিষয়টাই তাকে আরও বেশি অসহায় করে তুলল।যে মাকে সে মনে করতে পারে না, সেই মায়ের জন্য আজ তার বুক ভার হয়ে আছে।
অথচ যাকে মা ভেবে এত বছর বুকে জায়গা দিয়েছে, সেই মানুষটাকেই এখন খুনি হিসেবে দেখতে হচ্ছে। তার বাবা মায়ের খুনি। তার চোখ থেকে ধীরে ধীরে পানি গড়িয়ে পড়ল। সে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টটা যেন কোনোভাবেই বের হতে চাইছে না। মাথায় শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—

_’তাহলে তার জীবনের এতগুলো বছর আসলে কার ছায়ায় কেটেছে?’
বাইরে নাসিরুদ্দিন সম্পূর্ণ নীরব।
কিন্তু ভেতরে তার বিশ্বাস, ভালোবাসা আর পরিচয়—সবকিছু একসঙ্গে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ৫৬ বছর ধরে যে মানুষটাকে সে মা বলে ডেকেছে, আজ সেই ডাকটার অর্থই তার কাছে বদলে গেল। নির্বাক ফ্লোরে বসে আছে ‌ । চোখ দুইটা থেকে অঝোরে পানি গড়ি পড়ছে ।
এতোক্ষণ গুছিয়ে থাকা নাসির যেনো এক মূহূর্তেই এলোমেলো ছন্নছাড়া হয়ে গেল ।
দিগন্ত মায়ের দিকে এক পলক তাকিয়ে চোখ দুইটা বন্ধ করে দিল । মানুষটার মনের অবস্থা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে ।
একটা মানুষকে খুন করার থেকে বেশি কষ্ট বিশ্বাস ভাঙ্গা । তাও গোটা ৫৬ টা বছর ধরেই মিথ্যা বলা আর ঠকানো তার সাথে জন্মের পর মাকে কেড়ে নেওয়া , দিগন্ত আর ভাবতে পারল না ‌ ‌ । সোফা ছেঁড়ে সটান দাঁড়িয়ে পড়ল । রাগে হিসহিসিয়ে উঠল মুহুর্তেই।

_’ একে এই মুহূর্তে পুলিশে দাও । রাইট নাও , আলিফ কল’স দ্যা পুলিশ কমিশনার এন্ড টেলস হিম টু কাম ইমিডিয়েটলি ।‌”
_’ ইয়েস স্যার । ‘
আলিফ জায়গা ত্যাগ করে । জহুনা ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে দিগন্তের দিকে । শরীরটা নেতিয়ে পড়েছে । বাহ্যিক পরিস্থিতি এতোটা করুন হলেও ভেতরে ভেতরে সে এতো কাহিনীর জন্য অনুতপ্ত নয়।
জহুরা দিগন্তের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে মনে মনে কটমট করল ।
‘ দুনিয়ার যে প্রান্তেই থাকি তোকে না মারা ছাড়া আমার শান্তি নেই । ‘
দিগন্ত জহুরার দিকে তাকাল । দিগন্ত তাকানো দেখে দুই গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে ‌ । কান্না কান্না গলায় বলল ।
_”দিগন্ত তুমি তো বলেছিলে সব বললে মাফ করে দিবে‌ । ছেড়ে দিবে, আমি তো সব বলে দিলাম , আগা গোড়া সব স্বীকার করে নিলাম তাহলেও কেনো এমন করছ ।বাবা নাসির তুই আমাকে মাফ করে দে । জানি তোর কাছে মাফ চাওয়ার কোনো মুখ আমার নেই তাও বাবা তোকে এতো দিন আগলে রাখার প্রতিদান হিসেবে মাফ করে দে। ”

_’ একদম আপনার এই বিষাক্ত মুখে আমার নাম নিবেন না । এই দিগন্ত বের কর এই মহিলাকে । আমি এদের দেখতে চাই না ।‌”
জহুরা শব্দ করে কান্না করে দেয় । সোফা ছেড়ে মাটিতে বসে পড়ল । দূরে দাঁড়িয়ে তাকা নাসিমা আর জিসা এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল । হু হু করে উঠল মা মেয়ে এক সাথে , তাদের বুকে ঢলে পড়ল জহুরার নেতিয়ে পড়া শরীরটাও ।
_’ আল্লাহ আম্মা , আম্মা । আমার মা অজ্ঞেন হয়ে গেছে । দিগন্ত বাবা তুই আমার মাকে হাসপাতাল নিতে দে বাপ । ”
কথাটা বলতে বলতে নাসিমা পা জড়িয়ে ধরল দিগন্তের । দিগন্ত হতভম্ব হয়, ছিটকে দূরে সরে দাঁড়ায় ।
_’ নিয়ে যান , আমি আটকাব না । কিন্তু ছাড়বও না , শাস্তি কিন্তু আপনার মায়ের পেতে হবেই । ”
দিগন্তের অনুমতি পেয়ে দুই মা মেয়ে জহুরার নেতিয়ে পড়া ভারি শরীরটা টেনে বের করে নিল । অমনি দিগন্তের ফোনটা বেজে উঠলো, পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনে দিয়ার মুখটা দেখে এতো ঝামেলার মধ্যেও হাসল । ঘার ঘুরিয়ে পিছু ফিরে দিগন্ত, দূরে মাকে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইশারা করল বাবাকে ঘরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। দিগন্ত মাকে ইশারা করে ফোনে কানে ধরে বাহিরে চলে আসে ।

_’পাপা , কোই তুমি ? কখন আসবে ? ‘
ফোনে কানে ধরতেই মেয়ের আদুরে গলায় বলা কথা শুনে যেন দিনের সকল ক্লান্তি নিমিষেই দূর হয়ে যায় ।
দিগন্ত ও মেয়ের কথার তালে বলল ।
_’এইতো মা কিছুক্ষণ পর রওনা দিব । তোমার মায়ের কাছে ফোনটা দাও তো । ”
কথ টা বলার আগেই জারুল মেয়ের কাছ থেকে এক প্রকাল কেড়েই ফোন নিয়ে নেয় ।
অমনি গগন ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল দিয়া ।
জারুল মেয়ের চিৎকার উপেক্ষা করে ফোন কানে ধরে ঝাঁঝালো গলায় বলল ।
_’ কোথায় তুমি ? শরীরের এই অবস্থা নিয়ে কোথায় আছো ? ”
_’ রিল্যাক্স, আমার কিছু হয়নি । আমি বাসায় । ‘
কিছুটা নরম হয়ে এল জারুল এর কণ্ঠস্বর । মোলায়েম কণ্ঠে বলল‌।

_’ আসবে না ? ‘
_” আসব । তৈরি হয়ে থেকো । তোমাদের নিয়ে ফিরব ‌ ‌ । জহুরা খান নিজের সব ভুল শিখার করে নিয়েছে , এখন হাসপাতালে ভর্তি ‌ । জ্ঞান ফিরলেই পুলিশে দিব । ”
_’ কিহহ । এতো কিছু হয়ে গেল ! কখন ? ”
_’ একটু আগে । আমি আসছি তৈরি থেকে তোমরা। ‘
জারুল ‘হু’ বলে কল কেটে দিল ‌ ।
দিগন্ত ফোন করে আলিফকে কল দিয়ে হাসপাতালে নজর রাখতে বলল ‌ ।

হাসপাতালের ভিআইপি রুমে সটান হয়ে শুয়ে আছে জহুরা । মাথার কাছেই নাসিমা আর জিসা বসে আছে তিনজনের মুখ’ই কঠিন । জহুরা দাঁতে দাঁত ঘষে যাচ্ছে ‌ ,তার বর্তমান অবস্থা দেখে কখনোই বুঝা যাবে না একটু আগে মরার মতো খান মহলের মেঝেতে শুয়ে ছিল । খান মহল ত্যাগ করার পরেই ভেতরের হিংস্রতা প্রকাশ হয়েছে ‌ । রাগে হিসহিসি করতে করতে বলল ।

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ২৩

_”দুই দিনের ছেলে হয়ে আমার পিছু লাগতে আসছে ।নিজে মরলে সবাইকে নিয়েই মরব ‌ । এই দিগন্তকে তো আমি কুত্তা দিয়ে খাওয়াব । জাস্ট ওয়েট এন্ড সী ‌ । ‘
কথাৎবলতে বলতে কাউকে কল দিয়ে যাচ্ছে একনাগারে। ”

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ২৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here