Home প্রিয় জারুলফুল প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৩

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৩

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৩
সাদিয়া সাদু

জারুল ব্যস্ত পায়ে জহুরার রুমের দিকে এগিয়ে গেলো । হাতে সিরামিকের ট্রে তার উপর সবুজ রঙের সিরামিকের বড় কাপ ।
সে গুলো এক হাতে ধরে পেটে চেপে ধরে
দরজায় টোকা দিতে যাবে তার ঠিক আগ মুহূর্তে কানে এসে পৌঁছায় জহুরার ধারাল কিছু কথা ।
ভদ্র মহিলা রাগের তুপে কাঁপছে রিতিমত ।
বয়সের ভারে কপালে পড়া চারটে ভাঁজ কুঁচকে রয়েছে রাগের তুপে। কানে ধরে রাখা মাঝারি সাইজের অ্যাপল আইফোন ফোনটা শক্ত হাতে ধরে , দাঁত দিয়ে দাঁত চেপে ধরে দিকবেদিক হারিয়ে রাগে গলা উঁচু করে চেঁচিয়ে উঠলো তাৎক্ষণিক।
_’আমার এতো দিন যাবত পরিবারের রেপুটেশন ধরে রাখার সুক্ষ্ম পরিকল্পনা কখনোই একটা বাচ্চা মেয়ের জন্য বৃথা যাবে না । উপড়ে ফেলবো আমি ওই শিকড় । গোঁড়া থেকে টেনে উপড়ে ফেলবো ।
ফোনের অপর পাশের শান্ত কণ্ঠে ভেসে এল শান্ত কথা ‌ ‌।

_’ এখন কি করবো ম্যাম ?’
জহুরা কিছুটা সময় নীরব থেকে আবারও আগের ন্যায় বলল ।
_’ যতদিন ওই মেয়ে বেঁচে থাকবে , দিগন্তে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না ‌। বিয়েটাও করবে না , জারুল কেও ছেড়ে দিবে না । আমাদের আড়ালে তাদের সম্পর্ক আগের মতো পাকাপোক্ত । মেয়েকে দিয়েই তাদের সম্পর্ক ঘনিয়েছে । তাই মেয়েটাকে_ই আগে উপরে পাঠাতে হবে সাথে ওই সালমা কেও এই দুইজন ই জারুল এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ‌ ।
জহুরা এইবার আর একটু সতর্কতা অবলম্বন করে উঠে দাড়িয়ে জানালার কাছে দৃঢ় পায় এগোল । কাঁচের জানালা ভেদ করে দূরে ব্যস্ত শহরের দিকে শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে গম্ভীর কন্ঠে শুধাল।
_’ কাজটা এমনভাবে করতে হবে যেন সবাই দুর্ঘটনা বলে মনে করে । কোনো প্রমাণ রাখা যাবে না । মেয়ে আর মাকে হারিয়ে নিজেও পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে ।

কাজ…’
কথাটা জীভে এসে আটকে গেল বাহিরের বিকট শব্দ ‌।
জারুল জাহুরার বলা প্রতিটা কথাটায় শুনেছে। শরীর ঠান্ডা বরফ হয়ে আছে ‌ ।
শরীর এলোপাথাড়ি কাঁপছে। হাতে থাকা ট্রে টা কাপের সাথে টকটক শব্দে বারি খেয়ে পড়ে যায় । বিকট শব্দে কয়েক টুকরো হয়ে গেল । সে তড়িঘড়ি করে কাঁচের টুকরো তুলতে হাত চালায়। হাতের কয়েক জায়গায় কাঁচ লেগে কেটে র’ক্ত গড়িয়ে সাদা হাত লাল বর্ণ ধারন করেছে ।
দরজার অপর পাশ থেকে আসা জহুরার কর্কশ গলায় ‘কে?’ শুনে তড়িঘড়ি করে কাঁচের টুকরো হাতে নিয়ে জায়গা প্রস্থান করল ।

সময় গড়িয়েছে ঘন্টাখানেক। কিন্তু জারুল এর অবস্থা ঠিক আগের ন্যায় অস্থির । জহুরার মুখে নিজের মেয়ে আর মাকে হ’ত্যা
করার কথা নিজের কানে শুনে বুঝতে কোনো অসুবিধা হলো না যে এই সকল কিছুর মূল কারিগর জহুরা খান নিজে । সকল কিছু মাস্টারমাইন্ড পচাত্তোর বছরের একজন ভদ্র মহিলা ।
জারুল এখন কি করবে ? তার প্রতিটি র’ক্ত কণায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মুখে ফ্যাকাশে হয়ে আছে । ঠোঁট কাঁপছে তার সাথে দাঁতে দাঁত বারি খেয়ে আওয়াজ হচ্ছে মৃদু । শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়েছে ।
জারুল রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে বড় বড় নিঃশ্বাস ত্যাগ করছে। হাঁপানি রোগীদের ন্যায় উপরে মুখ ঘুড়িয়ে শ্বাসের উপর শ্বাস ফেলছে ‌।
চিন্তায় মাথা ব্যথায় ফেটে যাচ্ছে । কিভাবে মেয়েকে তাদের হাত থেকে বাঁচাবে ? জহুরা খানের ক্ষমতা সম্পর্কে তার অবগত রয়েছে । খান গ্ৰুপ অফ ইন্ডাস্ট্রি । বর্তমান এক নাম্বারে আছে ব্যবসার দিকে । তাদের ব্যবসা , ক্ষমতা পরিচিতি -এত বড় যে । চাইলেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খুঁজে বের করতে পারে । কোথায় লুকাবে সে মেয়েকে ?
চোখের সামনে শুধু মেয়ের হাসি মুখটা ভেসে উঠছে । নিষ্পাপ মুখ ট , মা বলে জড়িয়ে ধরাটাই তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে ।

‘ কি হয়েছে তোর ? এইভাবে শ্বাস ফেলছিস কেনো ?
দীনা বেগম সবে রান্না ঘরে এসেছে পানি নিতে এসেই জারুল এর এমন অবস্থা দেখে
চিন্তিত সরে শুধাল। জারুল দীনার দিকে তাকায়নি এক প্রকার দৌড়ে রান্নাঘর থেকে প্রস্থান করল । দীনাকে দেখে এতোক্ষণে তার দিগন্তের কথা মনে পড়ল । ব্যস্ত পায়ে সিড়ি বেয়ে উপরে এসে দিগন্তের রুমে এক প্রকার দৌড়ে প্রবেশ করল।
দিগন্ত সবেই ল্যাপটপে কাজ করছিল হঠাৎ জারুল এর এইভাবে প্রবেশ করায় সেও কিছুটা অবাক হলো । অস্বাভাবিক কাঁপছে তার শরীর ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছে। ঘেমে একাকার হয়ে গেছে শরীর । দিগন্ত জারুল এর অবস্থা দেখে বিছানা ছেড়ে উঠে জারুল এর দুই বাহু ধরে মোলায়েম কণ্ঠে শুধাল ।
_’ জারুল, কি হয়েছে ?’
জারুল এর কথা যেনো গলায় এসে আটকে যাচ্ছে । ফুঁপিয়ে উঠছে যেনো কথা বললেই কান্না করে দিবে । শরীর দুলছে যেনো এখনি পড়ে যাবে । দিগন্ত শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরে শুধাল ।

_’ নিজেকে সামলাও ,কি হয়েছে বলো আমাকে ? ‘
জারুল দিগন্তের বলিষ্ঠ বুকের মাঝে মাথা ঠেকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে শুধাল।
_’ আআমার মেয়ে । দদিগন্ত। ‘
জারুল কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেললো ।
কাঁদতে কাঁদতে বলল।
_’ এতো দিন লুকানো মানুষটা কে আমি খুঁজে পেয়েছি দিগন্ত । খুঁজে পেয়েছি। আজ আমি নিজের কানে শুনেছি আপনার দাদি আমার মেয়েকে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলছে । ‘
দিগন্ত যেনো বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ল ।
তার দাদি যে এমনটা করতে পারে সেইটা তার ভাবনতেও আস্তে পারে না ।

আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে তার নিজের মাঝেও কিন্তু এই মুহূর্তে জারুলকে শান্ত করতে হবে ‌। দিগন্ত জারুল এর মুখটা সামনে নিয়ে এসে দুই গালে হাত রেখে উঁচু করে ধরে শান্তনা স্বরুপ বলল ।
_’ আমি বেঁচে থাকতে কিচ্ছু হবে না আমার মেয়ের ট্রাস্ট মি । বিশ্বাস করো না আমায় ? ‘
জারুল উপর নিচ মাথা নাড়ায় ।
দিগন্ত এইবার জারুল এর মুখটা ছেড়ে দাঁত কিড়মিরিয়ে বলল ।

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১২

_’ আমিও দেখবো জহুরা খানের কতটা ক্ষমতা , যুদ্ধটা এইবার সমানে সমানে হবে ।
ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিবো আমি তার রেপুটেশন ।‌
উপড়ে ফেলবো আমি তার এই সাম্রাজ্য। ‘

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৪