Home প্রিয় জারুলফুল প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৪

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৪

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৪
সাদিয়া সাদু

জিসার চোখেমুখে উচ্ছ্বাসের ঝলক স্পষ্ট। আর দুই দিন পর বিয়ে কিনা ,
দিগন্তের সঙ্গে তার বিয়ের কথা পাকাপাকি হওয়ার পর থেকে সে যেন নিজেকে এই বাড়ির ভবিষ্যৎ গৃহকর্ত্রী হিসেবেই কল্পনা করতে শুরু করেছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গয়না মিলিয়ে দেখছে, আবার বিয়ের পোশাকের নকশা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। ঠোঁটের কোণে স্থায়ী হাসি, চোখে সীমাহীন প্রত্যাশার দীপ্তি। বিয়ের খুশিতে তার মন থেকে জারুল এর কথা যেনো হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। তার অন্তরাত্মা জোড়ে কেবল বিয়ের হাসি ,

তবে সেই হাসির অন্তরালে প্রেমের উষ্ণতা নেই ।আছে প্রাচুর্যের প্রতি অদম্য আকর্ষণ।
ক্ষমতার সিংহাসনে আরোহণের অদৃশ্য লালসা।
খান পরিবারের বিপুল ঐশ্বর্য, অগণিত সম্পদ, প্রতিষ্ঠানের পর প্রতিষ্ঠান, অঢেল অর্থ আর সামাজিক প্রভাব—এসবই জিসার কল্পনার জগৎকে ক্রমশ বিস্তৃত করে তুলছে। দিগন্তকে সে একজন মানুষ হিসেবে যতটা না ভাবছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ভাবছে সেই বিশাল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে।
তার মনে একটাই হিসাব—
এই বিয়ে সম্পন্ন হলেই বিলাসিতা, প্রভাব আর অঢেল সম্পদের দরজা তার জন্য চিরতরে উন্মুক্ত হয়ে যাবে।
সে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনছে, কিন্তু সেই স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে দিগন্ত নয় রয়েছে ক্ষমতা, অর্থ আর প্রভাবের মোহ।
অন্যদিকে জহুরা খানও নিজের কক্ষে নিশ্চুপ বসে আছেন । তাঁর মুখে প্রশান্তির ছাপ থাকলেও মনের ভেতর চলছিল নিখুঁত হিসাব-নিকাশ। জহুরার কাছে এই বিয়ে মানে নিজেরা পরিবারের রেপুটেশন ধরে রাখা , সমাজের মানুষের সামনে মাথা উঁচু করে বাঁচা । নিজেরা সকল সম্পত্তির উপর চিরস্থায়ী রাজত্ব করা ।
এটি ছিল একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত।

একটি পারিবারিক সমীকরণ।
একটি ক্ষমতার ভারসাম্য অক্ষুণ্ণ রাখার পরিকল্পনা।
তার কাছে দিগন্তের ব্যক্তিগত অনুভূতির চেয়ে বড় হলো খান পরিবারের ভবিষ্যৎ। তাই সম্পর্ক, আবেগ কিংবা ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে তিনি বারবার বাস্তবতার কঠিন অঙ্কে পরিণত করেছেন।
এই বিয়ের মাধ্যমে তিনি শুধু নাতির সংসার গড়তে চাচ্ছেন না তিনি পুরো পরিবারের ক্ষমতার কেন্দ্রকে নিজের নিয়ন্ত্রণের ভেতরেই ধরে রাখতে চাচ্ছে। তাঁর বহু বছরের গড়ে তোলা প্রভাববলয় যাতে টলে না যায়, সেই লক্ষ্যেই প্রতিটি সিদ্ধান্ত তিনি সুচারুভাবে সাজিয়ে নিচ্ছেন ।‌
জহুরার পরিবারের মানসম্মত, নিজের রাজত্ব আর জিসার এই রাজ্যে রাজত্ব করার লোভ , এই দুটোই তাদের মানুষ রুপে অমানুষ করে তুলছে প্রতিনিয়ত ।

রাত ১১ টা বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট । ঘড়ির কাটা ১২ টাই ছুঁই ছুঁই করছে । নিস্তব্ধ খান বাড়ি জিসা রুম থেকে বেরিয়ে উপরে সিঁড়িতে পা রাখে । উদ্দেশ্য নানীর রুম আজ বাদে কাল বিয়ে , এই বিয়েই নিয়েই তার সকল জল্পনা কল্পনা । সে কয়েক মিনিট হেঁটে জহুরার রুমের দরজায় দুইবার কড়া নাড়ে । ভেতর থেকে জহুরার চাপা স্বরে দরজা ঠেলে মৃদু পায়ে এগিয়ে যায় ।
_’ এতো রাতে এখনো ঘুমাও নি নানুমনি?’
কিছুটা বিস্মিত স্বরেই বলল জিসা ।
আহ্লাদে আটখানা হয়ে নানির গলা জড়িয়ে ধরল জিসা । ভদ্রমহিলা সোফায় বসেই ডান পায়ের হাঁটুতে মলম মালিশ করছে । নাতনির এমন আদরে গম্ভীর মুখটাই ভর করল এক চিলতে হাসির রেখা ।
_’ তোমার বিয়ের চিন্তায় তো ঘুম উড়ে গেছে নানুভাই । ‘
জহুরার কথায় জিসা ঘাড় নোয়ে কানের সামনের চুলগুলো কানের পিঠে গুজে লজ্জায় । জহুরা তার মুখশ্রীতে লজ্জার ভাব দেখে কুঁচকানো ঠোঁট দুই বাঁকিয়ে ফেলল ।
জিসা নানির সাথে কিছুটা ভাব জমাতেই গেল এই মহিলাকে তার বিশ্বাস নেই । নিজের স্বার্থে মানুষ মারতেও হাত কাঁপে না । এই বয়সে এসেও আল্লাহকে ভয় না করেই শয়তানী করে যাচ্ছে ।‌ জিসা সেও নানীর হাত থেকে মলমটা নিয়ে নিজের হাতে আস্তে করে মালিশ করে যাচ্ছে আর আদর মাখা স্বরে নানির সাথে রাজ্যের কথা আরম্ভ করে দিয়েছে । দুইজনের কথোপকথনের নীচে চাপা পড়ে গেলো দুইজনের মনের কথাগুলো ।

রাত ২ টা
গভীর রাত।
নিজের স্টাডি রুমে একা বসে আছে দিগন্ত।
ঘরের সমস্ত আলো জ্বলছে, অথচ চারপাশে এক অদ্ভুত নীরবতা। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক ফাইল, ল্যাপটপের স্ক্রিন এখনও জ্বলছে, ফোনে একের পর এক কল আর বার্তা এসে জমা হচ্ছে। কিন্তু সেদিকে একবারও তাকানোর প্রয়োজন বোধ করছে না সে।
চেয়ারে বসে দুই হাত একসঙ্গে জড়িয়ে মাথা নিচু করে আছে। চোখ দুটি স্থির, অথচ দৃষ্টি যেন বহু দূরে হারিয়ে গেছে।
আজ তার সমস্ত চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু একটিই—
দিয়া।
নিজের ছয় বছরের ছোট্ট মেয়ে।
ছয় বছর পর এক বিন্দু সুখের আশার মুখ দেখল সে । আবার সেই সুখেই নজর লেগেছে কারোর ভাবতেই
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
জীবনে অসংখ্য প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছে সে। ব্যবসার কঠিন সিদ্ধান্ত, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতিদ্বন্দ্বীদের ষড়যন্ত্র—সবকিছুর মোকাবিলা করেছে অবিচলভাবে। কিন্তু আজকের এই অসহায়তা তাকে সম্পূর্ণ ভেঙে দিচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি যেটা তাকে ভেতর থেকে ক্ষতবিক্ষত করছে, তা হলো—সে কখনো কল্পনাও করেনি, একদিন তাকে নিজের পরিবারের ভেতর থেকেই এমন আশঙ্কার মুখোমুখি হতে হবে।
যে মানুষটির হাত ধরে ছোটবেলায় হাঁটতে শিখেছে…
যার প্রশ্রয়ে বড় হয়েছে…
যার প্রতিটি সিদ্ধান্তকে এতদিন পরিবারের মঙ্গলের জন্য বলে বিশ্বাস করেছে…
আজ সেই মানুষটির বিরুদ্ধেই তাকে নিজের মেয়েকে রক্ষা করার কথা ভাবতে হচ্ছে।
এই বাস্তবতাই দিগন্তের কাছে সবচেয়ে নির্মম।
ছয় বছর আগে যা ঘটেছিল, সেই স্মৃতিগুলোও আজ একে একে ফিরে আসছে। সে ভেবেছিল, অতীতের কঠিন অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে। সময় হয়তো সব ক্ষত ধীরে ধীরে শুকিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, সেই অধ্যায় কখনো শেষই হয়নি।
বরং তার রেশ নীরবে বয়ে এসেছে আজ পর্যন্ত।
দিগন্ত অনুভব করল, ভাগ্য যেন আবারও তার সুখ, তার শান্তি, তার পরিবারকে কেড়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একজন মানুষ কতটা ক্ষমতার মোহে অন্ধ হলে নিজের নাতির হাসি, নিজের রক্তের উত্তরাধিকার, একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন—সবকিছুর চেয়ে নিজের সিদ্ধান্তকে বড় মনে করতে পারে?
প্রশ্নগুলোর উত্তর তার কাছে নেই।
আছে শুধু অসহনীয় নীরবতা।
সে ধীরে ধীরে টেবিলের ওপর রাখা দিয়ার ছোট্ট ছবিটা হাতে তুলে নিল। ছবির দিকে তাকিয়ে তার চোখের কঠোরতা ধীরে ধীরে এক বাবার গভীর বেদনায় রূপ নিল।
অত্যন্ত নিচু স্বরে দিনান্ত শুধাল

— ছয় বছর আগে আমি অনেক কিছু হারিয়েছি। ভেবেছিলাম, এবার হয়তো শান্তিতে বাঁচতে পারব। কিন্তু কেউ যদি আবার আমার জীবন থেকে আমার সুখ, আমার পরিবার, আমার মেয়েকে কেড়ে নিতে চায়… তাহলে এবার আমি নীরব থাকব না।
দৃঢ় পায়ে রুম ত্যাগ করে মায়ের রুমের দিকে এগিয়ে আসে । দুইবার কড়া নাড়তেই অপর পাশ থেকে দীনা দরজা খোলে দাঁড়ায় । রাত দুইটাই ছেলেকে নিজের রুমে দেখে ভরকে যায় দীনা
_ ‘ এতো রাতে তুই ? কি হয়েছে তোর চোখমুখে এমন লাল হয়ে আছে কেনো ?’
_’ রুমে আব্বু? ‘
দীনা ঘাড় বাকিয়ে রুমের দিকে তাকিয়ে উপর নিচ মাথায় নাড়িয়ে হ্যা বোঝায়।
_’ আমার সাথে আসো কথা আছে । ‘
দীনা ছেলের সাথে মৃদু পায়ে পা মিলিয়ে এগিয়ে যায় । দিগন্ত নিজের রুমে প্রবেশ করে নিঃশব্দে দরজা লাগিয়ে মায়ের দিকে ঘুরে তাকায় ।
_’ আমায় মেয়ের দিকে এই বাড়ির কর্ত্রী জহুরা খানের নজর লেগেছে । আমার সকল সুখ শান্তি কেড়ে দিতে উঠে পড়ে লেগেছে । ‘
দীনা ছেলের বিছানায় গা এলিয়ে আধ শোয়া হয়ে ছেলের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে। দিগন্ত শুরু থেকে সব বলে থামে ।
দীনা ছেলের কথায় যেনো মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে । তার সরল মাথায় তেমন কিছু ঢুকছে না

_’ এখন কি করবি তুই ? তোর দাদী ঠিক কতটা ভয়ংকর মানুষ আমি জানি । যা বলেছে তাই করবে । এর হাত থেকে তুই মেয়েকে কিভাবে বাচাবি ? ‘
দিগন্ত খানিকক্ষণ চুপ থেকে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে বলল ।
_’ কালকের ভেতর দুইজনকে লুকাতে হবে । ‘
_’ কোথায় লুকাবি তুই ? দেশের বাহিরে পাঠালে সময় লাগবে কাগজ পত্রিরাগবে এই মূহুর্তে লুকানো সম্ভব? ‘
দিগন্ত মায়ের কাছে বসে আস্তে করে মায়ের হাত টা নিজের হাতেই মুঠোয় নিয়ে বলল ।

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৩

_’ নানি বাড়ির দিকে তো কারোর নজর নেই কিছুদিনের জন্য ওই খানে পাঠিয়ে দিলে হয় না । তুমি ব্যবস্থা করবে আম্মু ? ‘
দীনা ছেলের অসহায় মুখটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ।

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৫