Home প্রিয় জারুলফুল প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৫

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৫

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৫
সাদিয়া সাদু

রাত যত গভীর হচ্ছে, জারুলের ভয় তত বেড়েছে। দরজার বাইরে সামান্য কোনো শব্দ হলেই সে চমকে উঠছে। দূরে কোনো গাড়ি থামার শব্দ শুনলেই বুক ধড়ফড় করে উঠেছে। কয়েকবার মনে হয়েছে, কেউ হয়তো তাদের খুঁজতে এসেছে। দরজার কোনো শব্দ হলেই কলিজা শুকিয়ে যাওয়াল উপক্রম, এক আতঙ্ক ভরা নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে জারুল ‌।
অবশেষে ভোরের দিকে জানালা দিয়ে আলো ঢুকতে শুরু করল।
সারারাত জেগে থাকার কারণে জারুলের চোখ দুটো ফুলে লাল হয়ে গেছে। মুখ বিবর্ণ, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। চুল এলোমেলো, শরীরটাও ভীষণ দুর্বল লাগছে। মাথার ভেতর ভারী একটা চাপ অনুভব করছে। তবুও বিশ্রামের কথা তার মনে আসছে না।
তারদিকে আযানের শব্দে চোখ দুইটা নিজ থেকেই বন্ধ হয়ে গেছে ‌।

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি।
রাতের গাঢ় অন্ধকার ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। পূর্ব আকাশের কালচে নীল রঙের বুক চিরে খুব মৃদু আলো ফুটে উঠছে। চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে একে একে ভেসে আসছে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি। খান বাড়ির বিশাল প্রাচীর পেরিয়ে সেই ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসা আজানের সঙ্গে কাছের মসজিদের আজানও মিলেমিশে পুরো পরিবেশকে এক গভীর, শান্ত আবেশে ঢেকে দিচ্ছে।
পাখিরা ধীরে ধীরে ডানা ঝাপটাতে শুরু করেছে। রাতভর নিস্তব্ধ থাকা গাছের পাতাগুলোয় জমে থাকা শিশির ভোরের ম্লান আলোয় চিকচিক করছে। বাতাসে রাতের শীতলতা এখনও রয়ে গেছে। খান বাড়ির বিশাল বাগানের ফুলগুলোও যেন নিদ্রা ভেঙে নতুন দিনের অপেক্ষায় স্থির হয়ে আছে।কিন্তু এত শান্ত সকালের মধ্যেও একজন মানুষের চোখে কোনো প্রশান্তি নেই। দিগন্তের চোখে একফোঁটা ঘুম নেই।
সারারাত স্টাডি রুমে একা বসে থাকার পরও সে বিছানায় যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। টেবিলের সামনে বসে থাকতে থাকতে কখন যে রাত গভীর থেকে আরও গভীর হয়েছে, কখন ঘড়ির কাঁটা ভোর ছুঁয়েছে—তার হিসাবও নেই।

চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। মুখে ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ। কয়েক ঘণ্টার অনিদ্রা তার কঠিন মুখাবয়বেও অবসাদের রেখা টেনে দিয়েছে। চুলগুলো এলোমেলো, শার্টের হাতা এখনও গোটানো। সারারাতের নির্ঘুম যন্ত্রণার পর দিগন্তের শরীর যেন নিজের ভারেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। চোখ দুটো লালচে ও ভারী, চোখের নিচে স্পষ্ট কালচে ছাপ। মুখের স্বাভাবিক দৃঢ়তা হারিয়ে সেখানে জমেছে গভীর অবসাদ। কয়েক ঘণ্টার অনিদ্রা তার চেহারায় এমন ক্লান্তির রেখা এঁকে দিয়েছে, যেন এক রাতেই বহুদিনের পরিশ্রম শরীরের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
চুল এলোমেলো, শার্টের কলার কিছুটা অগোছালো। দাড়ির হালকা ছাপ মুখের ক্লান্তিকে আরও প্রকট করে তুলেছে। বারবার কপালে হাত বুলিয়ে নিচ্ছে সে। কখনো চোখ বন্ধ করছে, কিন্তু বিশ্রাম নেওয়ার মতো শান্তি পাচ্ছে না। চোখ বন্ধ করলেই দিয়ার মুখ, জারুলের আতঙ্কিত চেহারা আর জহুরার কঠিন সিদ্ধান্ত একসঙ্গে মস্তিষ্কে ভেসে উঠছে।
মাথাটা ভার হয়ে আছে। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ যেন অবসন্ন, অথচ মনের অস্থিরতা তাকে এক মুহূর্তও স্থির থাকতে দিচ্ছে না।

গতরাতের দীর্ঘ চিন্তা তার শরীর থেকে সমস্ত স্বস্তি নিঃশেষ করে দিয়েছে।
চোখের নিচের কালচে ছাপ, বিবর্ণ মুখ, অবিন্যস্ত চেহারা—সবকিছুতেই সারারাতের অনিদ্রার নির্মম ছাপ স্পষ্ট।
তবুও চোখে ঘুম নেই।
কারণ তার ক্লান্ত শরীর বিশ্রাম চাইছে, আর তার অস্থির মন শুধু একটাই কথা বলছে—
দিয়াকে নিরাপদ রাখতে হবে।
আলো ফোটার আগেই খান মহল ত্যাগ করে দিগন্ত । ভোরের আলো এখনো ফুটেনি আবছা আলোয় । খান মহলের গেইট পেরিয়েছে সে ।

দিগন্ত ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে । সারারাত এক মুহূর্তও ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি সে। মাথার ভেতর শুধু দিয়া আর জারুলকে নিয়ে চিন্তা ঘুরছিল। শেষ পর্যন্ত আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। নিজের চোখে না দেখা পর্যন্ত যেন তার মন শান্ত হচ্ছিল না। বাসায় পৌঁছে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই চারপাশের নীরবতা তাকে কিছুটা স্বস্তি দিল। জারুল হয়তো ঘুমিয়ে আছে—এই আশাতেই ধীরে ধীরে পা টিপে ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
দরজা সামান্য খোলা ছিল।
ভেতরে তাকাতেই তার বুকের ওপর থেকে যেন একটা ভার নেমে গেল।
বিছানায় দিয়া মায়ের পাশে ঘুমিয়ে আছে। ছোট্ট মেয়েটা মায়ের হাত আঁকড়ে ধরে আছে। জারুলও ঘুমিয়ে পড়েছে, তবে সারারাতের দুশ্চিন্তার ছাপ তার মুখে স্পষ্ট। চোখের নিচে ক্লান্তির কালচে দাগ, মুখে অবসাদের ছাপ।
দিগন্ত কিছুক্ষণ দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে রইল। শান্ত চোখে তাকিয়ে রয় বিছানায় শুয়া মা মেয়ের দিকে।
তার চোখ স্থির হয়ে গেল দিয়ার মুখে।
সারা রাত যে আশঙ্কা তাকে অস্থির করে রেখেছিল, সেই আশঙ্কার মাঝেও এই দৃশ্যটা তার মনে অদ্ভুত এক শান্তি এনে দিল।

দিয়া নিরাপদে আছে।
জারুলও তার পাশে আছে।
এই মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি কিছু তার দরকার নেই। দিগন্ত ধীরে পায়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে বিছানার পাশে বসে পড়ল। হাত বাড়িয়ে দিয়ার মাথায় আলতো করে হাত রাখল। মেয়েটা ঘুমের মধ্যেই একটু নড়ে দিগন্তের হাত দুইটা আঁকড়ে ধরল ।
দিগন্তের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল।
সারারাতের ক্লান্তি যেন মুহূর্তের জন্য ভুলে গেল সে।
তারপর আর নিজেকে সামলাতে পারল না। বিছানার এক পাশে জায়গা করে নিয়ে জারুল আর দিয়ার পাশে শুয়ে পড়ল।
দিয়ার ছোট্ট হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে চোখ বন্ধ করল।
প্রথমবারের মতো মনে হলো, এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতা একটু একটু করে কমছে। জারুল ঘুমের ঘোরে। মেয়েকে জড়িয়ে ধরতে গেলে পাশে মেয়েকে না পেয়ে ধরফরিয়ে উঠে বসল ‌।
পাশে তাকাতেই দিগন্তের উপর চোখ পড়তেই ধরফরানি কিছুটা কমে আসল। অস্তির হৃদয়টা এক শীতল বাতাস বয়ে গেলো ‌ । দিগন্ত জারুলের অবস্থা বুঝতে পেরে চোখ দুইটা এক করে মেয়েকে নিজের সাথে জড়িয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল ।

_’ ঘুমাও । সারারাত নির্ঘুম ছিলে । ‘
খ্যাক করে উঠল জারুল ‌
_’ ঘুমাব মানে কি ? আমার মেয়েটা এখনো অনিরাপদে আছে । বিপদের মধ্যে তোমার ঘুম পাচ্ছে!’
দিগন্ত নির্ঘুম লালচে ভারী চোখ দুইটা খোলে অত্যন্ত শান্ত মুখে বলল ।
_’ ঘুমাও । কি করবো না করবো আমি ভেবে নিয়েছি । ‘
জারুল আর কথা বাড়াল না । তার বিশ্বাস হলো দিগন্তের কথা ‌ ‌। সেও চুপ চাপ দিগন্তের পাশে শুয়ে পড়ল । দিগন্ত মেয়েকে পারে শুয়ে আরেকটু এগোল জারুল এর দিকে বা হাতটা কোমড়ে রাখতেই জারুল চরক করে উঠে বসতে নিলেই শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরল দিগন্ত ‌ ।
_’ কি করছ ? মেয়ে পাশে । ‘
_’ কিছু করব না ঘুমাবো শান্তির দরকার এই মুহূর্তে । ‘
দিগন্ত জারুল কে নিয়ে শুয়ে পড়লো ।
কিছু মূহূর্ত পর দুইজন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল । ‘

খান মহলে সকাল থেকেই বিয়ের প্রস্তুতি চলছে। পুরো বাড়িটা ধীরে ধীরে নতুন সাজে সাজিয়ে তোলা হচ্ছে। সামনে ফুলের কাজ, বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় লাইট লাগানো আর ভেতরে বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছানোর ব্যস্ততা চলছে।
সবকিছুই জহুরা খান নিজের চোখে দেখছেন। কোথায় কীভাবে সাজানো হবে, কোন কাজটা আগে শেষ করতে হবে—সবকিছুতেই তার নির্দেশ চলছে। নাতির বিয়ে বলে আয়োজনের কোনো কমতি রাখতে চান না তিনি।
তার পাশেই জিসা ঘুরে ঘুরে সব দেখছে। নিজের বিয়ের কথা মনে পড়লেই তার মুখে আনন্দের হাসি ফুটে উঠছে। কখনো ফুলের সাজ দেখছে, কখনো বিয়ের মঞ্চের জায়গাটা দেখছে।

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৪

তার চোখেমুখে স্পষ্ট উত্তেজনা—দিগন্তের সঙ্গে বিয়ের স্বপ্নে সে যেন ইতোমধ্যেই ডুবে গেছে। এসব কিছু সহ্য করতে পারছে না দীনা । তার কাছে বৃষ লাগছে এসব ‌ ‌ । এই দুইটা নারীকেই তার এখন আর সহ্য হয় না তার উপর এসব সাজসজ্জা ,। তারপরও নীরব চোখে তাকিয়ে দেখছে । দিয়ার জন্য তার এসব সহ্য করা লাগছে , মেয়েটাকে না দেখেও তার কত টান অনুভব করছে দীনা। কাল রাতে সবাই নাসিরুদ্দিন কে সব বলে দিতেই চেয়েছিল কিছু একটা ভেবে আর বলেনি। মায়ের ছেলে নাসিরুদ্দিন যদি মায়ের মতোই হয় সেই জন্যই তিনি কিছু বলেন নি ।

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৬