মৌটুসী পর্ব ৩৪
ঋতস্বিনী মাহবিশ
— “না ভাই, হবে না। এখন কেবল একটাই ডাবল রুম খালি আছে।”
মৌটুসী-বোরাক একে অপরের দিকে তাকাল। মৌয়ের চোখে-মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি ফুটে উঠেছে। বোরাক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। এই পরিস্থিতিতে এখন দুটো আলাদা রুম পাওয়াটা প্রায় অনিশ্চিত।
অগত্যা বোরাক কিছুক্ষণ ভেবে একটু কৌশলে বলল,
— “ভাই, কোনোভাবে কি ম্যানেজ করা যায় না? ম্যাডামের সঙ্গে তো আমার ডাবল রুম শেয়ার করা সম্ভব নয়। আপনি একটু দেখুন, প্রয়োজনে আমি এক্সট্রা পে করব।”
রিসেপশনিস্ট কিছুক্ষণ চিন্তা করে কাউন্টারের পাশেই দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলতে থাকা এক ব্যক্তিকে ডাকলেন। ব্যক্তিটি কথা শেষ করে এগিয়ে এলে তিনি বললেন,
— “স্যার, একটা অনুরোধ ছিল। আপনি কি এই স্যারের সঙ্গে ডাবল রুম শেয়ার করতে পারবেন? তাহলে আপনার সিঙ্গেল রুমটা এই ম্যাডামকে দেওয়া যেত। আসলে আমাদের আর কোনো রুম খালি নেই।”
লোকটি একবার বোরাকের দিকে, একবার মৌয়ের দিকে তাকালেন।
বোরাকও বলল,
— “ভাই, একটু দেখবেন। আপনি যদি ডাবল রুমটা আমার সাথে শেয়ার করতে পারেন, তাহলে আমাদের উপকার হতো।”
লোকটি শেষ পর্যন্ত মাথা নাড়লেন।
— “আচ্ছা, সমস্যা নেই। এক রাতের ব্যাপার, ম্যানেজ করা যাবে।”
করিডোরের মুখোমুখি দুটো রুম। হোটেল স্টাফ সিঙ্গেল রুমটা খুলে দিল প্রথমে। বোরাক ইশারা করলে মৌটুসী প্রবেশ করে দরজাটা আলতো করে ভেজিয়ে দিল। খুব বেশি আধুনিক নয়। মোটামুটি পরিপাটি একটা সিঙ্গেল বেড, পাশে ছোট সাইড টেবিল। দেয়ালের একপাশে মাঝারি আকারের আয়না, একদিকে অ্যাটাচড ওয়াশরুম, এই তো—এক রাত কাটানোর মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আছে।
এগিয়ে বিছানার উপর গিয়ে বসতেই তীব্র অস্বস্তি টের পেল মৌ। তখন নদীর ধারে শোয়ার কারণে পুরো শরীরজুড়ে বালুর কণা লেগে আছে। স্কার্টটার অবস্থা আরও করুণ—বালিতে প্রায় মাখামাখি হয়ে গেছে। গোসল করা এখন তার জন্য একেবারেই জরুরি। কিন্তু পড়বে কি? অতিরিক্ত কোনো জামাকাপড় সঙ্গে নেই। বাইরেও দোকানপাট তো মনে হয় সব বন্ধ।
মৌটুসী নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
— “আল্লাহ! এখন কি এই কিচকিচে জামাকাপড় পরেই সারা রাত কাটাতে হবে?”
ভাবতেই তার মুখটা কুঁচকে গেল। তখনই দরজায় নক পড়ল। মৌটুসী অনুমতি দিলে বোরাক দরজা ঠেলে প্রবেশ করেই শাসনের সুরে বলে উঠল,
— “এই মেয়ে, দরজা আটকাও নি কেন তুমি?”
মৌটুসী অপরাধীর মতো মুখটা একটু কাচুমাচু করে বলল,
— “মাত্রই তো এলাম, তাই।”
— “দরজা আটকে রাখো। কেউ ডাকলে খুলবে না। রিসেপশনের কেউ হলেও না। আমার কণ্ঠ নিশ্চিত হয়ে তবেই খুলবে।”
— “ঠিক আছে, কিন্তু আপনি কি কোথাও যাচ্ছেন?”
— “হুম, দেখি তোমার জন্য জামাকাপড় কিছু ম্যানেজ করতে পারি কি-না! এই কিচকিচে কাপড়ে তো সারা রাত থাকতে পারবে না।”
কথাটা শুনে মৌটুসীর বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। ইশ! লোকটা তার ছোটখাটো সব বিষয়ই এত খেয়াল রাখে! অকারণেই পেটের ভেতর যেন একঝাঁক প্রজাপতি ডানা ঝাপটাল। মুখের আনন্দটা যতটা সম্ভব গোপন রেখে বলল,
— “ঠিক আছে। তবে দ্রুত ফিরবেন। বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই। পরিস্থিতি ভালো না।”
বোরাক মৃদু হেসে বলল,
— “ওকে, ওকে। তুমি দরজা লাগিয়ে দাও।”
বোরাক চলে গেল। মৌ দরজা লাগিয়ে দিয়ে এসে বসে ব্যাগ থেকে ফোন বের করে সাফওয়ানকে ভিডিও কল করল। চড়ুই আর বীরের সাথে কথা বলল বেশ কিছুক্ষণ ধরে। চড়ুই বোরাকদের বাড়িতেই সাফওয়ানের সঙ্গে আছে, মনও খারাপ করেনি। বীরের ঘরে মজা করে খেলছে তারা। ফোনের ক্যামেরা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খুব উৎসাহ নিয়ে খপলার ঘরটাও তারা মাম্মাকে দেখাল।
মেয়ের হাসিখুশি মুখ দেখে মৌটুসী কিছুটা নিশ্চিন্ত হলো। বাচ্চা দুটোর সঙ্গে কথা বলা শেষে সে বাড়িতেও ফোন করে সব জানিয়ে দিল। লাল বানু বেগমকে আশ্বস্ত করে বলল, পুরো টিমই রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে আটকে গেছে। কাল সকালে রওনা হবে। সঙ্গে কয়েকজন মেয়েও আছে, তাই যেন তিনি কোনো চিন্তা না করেন। আর চড়ুইও সেফ জায়গায় আছে।
লাল বানু বেগমও মেয়ের প্রতি অগাধ বিশ্বাস থেকে নিশ্চিত হলেন।মায়ের সঙ্গে কথা শেষ করে ফোনটা নামাতেই হঠাৎ স্ক্রিন নিভে গেল।মৌটুসী কয়েকবার পাওয়ার বাটন চাপল। কিছুই হলো না। ব্যাটারি শেষ।
— “ধুর!”
চার্জারটাও সঙ্গে নেই। এমন বিপদে পড়া বোধহয় জীবনে এই প্রথম। ফোনটা পাশে রেখে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল সে।
এর মধ্যেই আবার দরজায় নক। মৌটুসী উঠে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— “কে?”
ওপাশ থেকে চিরচেনা মধুর ডাকটা ভেসে এলো,
— “মৌটুসী পাখি, খোলো। আমি।”
মৌয়ের কণ্ঠটা চিনতে এক মুহূর্তও লাগল না। ঠোঁটে অজান্তেই মৃদু হাসি ফুটে উঠল তার। দরজা খুলে দিল সে। মাঝখানের দরজার পাল্লাটা সরে যেতেই বোরাক বলল,
— “এই তোমার ব্যাডলাক। জামাকাপড়ের কোনো দোকানই খোলা পেলাম না। শুধু দু-একটা গ্রোসারি শপ ছাড়া সব বন্ধ।”
মৌটুসীর মুখটা সঙ্গে সঙ্গে মলিন হয়ে গেল। ঠোঁট উল্টে বলল,
— “তাহলে এখন? সারারাত এভাবেই থাকব?”
বোরাক একটু ভেবে বলল,
— “আচ্ছা, শোনো, গাড়িতে আমার এক্সট্রা একটা ট্রাউজার আর শার্ট আছে। তুমি কি সেগুলো পরে রাতটা কোনোভাবে কাটাতে পারবে? তোমার জামাগুলো এখন ধুয়ে দিলে সকালে তো শুকিয়েই যাবে। শুধু রাতটা!”
মৌটুসী একবার নিজের বালুমাখা পোশাকের দিকে তাকাল। তারপর ফাঁকা শ্বাস ফেলে অসহায় গলায় বলল,
— “আচ্ছা, কী আর করার। নিয়ে আসুন।”
বোরাক ফের নিচে গ্যারেজে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর গাড়ি থেকে কাপড়ের ব্যাগ নিয়ে ফিরে এসে সেটা মৌটুসীর হাতে দিল।
মৌটুসী কাপড় দুটো নিয়ে আর দেরি করল না। ঘরের দরজা আটকে সঙ্গে সঙ্গে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
মৌটুসীকে কাপড়ের ব্যাগটা দিয়ে সোজা নিজের ঘরে চলে এলো বোরাক। দরজা খুলতেই তার চোখ গেল বিছানার দিকে। ডাবল বেডের বেশিরভাগটা জায়গা নিয়ে লোকটা হাত-পা ছড়িয়ে দিব্যি ঘুমিয়ে আছে। মৃদু শব্দে নাকও ডাকছে।
বোরাক কিছুক্ষণ নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল। আজ রাতে তার ঘুম হারাম। এমনিতেই অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে বেড শেয়ার করার অভ্যাস তার নেই। তার ওপর সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষ। তখনই ওর চোখ গেল দেয়ালের এক পাশের দুই সিটের সোফাটার দিকে। যাক! ঘুম না হলেও, শরীরটা এতে এলিয়ে দেওয়া যাবে।
বোরাক চাইলে তার আর্থিক ক্ষমতা ও রাজনৈতিক পরিচিতি দিয়ে অনায়াসেই রাতের মধ্যেই এই অবরুদ্ধ শহর থেকে বেরিয়ে যেতে পারত। তাছাড়া রাতটা কাটানোর জন্য এর চেয়ে ভালো, বিলাসবহুল কোনো ব্যবস্থা করাও তার জন্য অসম্ভব কিছু ছিল না। কিন্তু আজ সে নিজেই এই সাধারণ মুহূর্তটুকুতে কোনো কৃত্রিমতা চায়নি। কেন চায়নি, সেই প্রশ্নের উত্তর নেই।
অনেক দিন পর তার জীবনে এমন একটা অনিয়ন্ত্রিত, সুন্দর মুহূর্ত এসেছে—যেখানে পরিচয়, ক্ষমতা কিংবা প্রভাবের কোনো প্রয়োজন নেই। শহরের অচলাবস্থার ভেতর এক রমণীকে নিয়ে হঠাৎ আটকে পড়া এই রাতটাকে সে কেবল রাত হিসেবেই নিতে চায়। এই ছোট্ট সংগ্রাম ও সাধারণত্বটুকুই আজ তার ভীষণ ভালো লাগছে।
বোরাক ওয়াশরুম থেকে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এল। এরপর টিস্যু দিয়ে পানি মুছে ফোনটা হাতে নিয়ে চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোরের শেষ মাথার দিকে এগিয়ে গেল। এখানে ছোট একটা খোলা বারান্দা আছে। রাতের বাতাস সরাসরি এসে লাগছে সেখানে।
তারপর ফোনের কনট্যাক্ট লিস্ট থেকে সাফওয়ানের নাম বের করে কল দিল। কিছুক্ষণ পর ওপাশ থেকে সাফওয়ানের কণ্ঠ ভেসে এলো,
— “হ্যালো, ভাই?”
বোরাকের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
— “বাচ্চারা কী করছে, সাফওয়ান?”
— “ঘুমিয়ে পড়েছে, ভাই।”
বোরাক একটু অবাক হলো।
— “এত তাড়াতাড়ি?”
— “হুম। ঘুম-ঘুম খেলতে খেলতে টিনি হাউজের ভেতরই দুজন ঘুমিয়ে পড়েছে। সারাদিন যত দৌড়ঝাঁপ করেছে, ক্লান্ত শরীরে ঘুম চলে এসেছে।”
— “আচ্ছা, ভালো! খেয়েছে কিছু?”
— “হ্যাঁ, রাবেয়া আপা যাওয়ার সময় খাইয়ে দিয়ে গেছেন।”
— “আচ্ছা। আর ডাকিস না ওদের। আস্তে করে তুলে ঘরে নিয়ে শুইয়ে দে। রাতে আযান দুই-তিনবার উঠতে পারে, তখন মুখে ফিডার ধরবি ওর। আর যদি চড়ুই উঠে কান্নাকাটি করে, আমাকে বা মৌকে ফোন করবি।”
— “ঠিক আছে, ভাই। চিন্তা করো না তোমরা। আমি সর্বোচ্চ খেয়াল রাখব ওদের।”
বোরাক কল কেটে আরও কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ মনে পড়ল—রাত প্রায় দশটা বাজতে চলেছে, অথচ তাদের কারও ডিনারই করা হয়নি। অগত্যা ডিনারের কথা বলতেই করিডোর পেরিয়ে মৌটুসীর ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল সে।
দরজায় আলতো করে নক করল।ভেতর থেকে কোনো সাড়া এল না। আবারও নক করতেই কয়েক মুহূর্ত পর ভেতর থেকে ছিটকিনি খোলার ক্ষীণ শব্দ ভেসে এল। তারপর ধীর গতিতে দরজার পাল্লাটি সামান্য আলগা হয়ে খুলে গেল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই যুবকের বুকের ভেতর হৃদপিণ্ড নামক যন্ত্রটি যেন আচমকা একটা ঝটকা খেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল তার সমস্ত স্বাভাবিক ছন্দ।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে সিক্ত-স্নিগ্ধ এক রমণী—তারই পোশাকে আবৃত। তন্বী শরীরে জড়িয়ে থাকা নেভি-ব্লু চেকের ওভারসাইজ শার্টটি তার গড়নের তুলনায় এতটাই বিশাল যে কোমর ছাড়িয়ে উরু পর্যন্ত নেমে এসেছে তা। ট্রাউজারটিও গোড়ালির কাছে কয়েক পলট দিয়ে কোনো রকমে গুছিয়ে নিয়েছে সে।
সদ্য গোসল করা চুলগুলো এখনো ভেজা। অগোছালো কালো রাশিগুলো কাঁধ বেয়ে নেমে এসেছে; চুলের গোড়া থেকে টুপটাপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। কয়েকটি ভেজা কেশগুচ্ছ এসে আলতো করে আটকে আছে মুখের ওপর। হরিণচোখের পল্লবজোড়াও এখনো সিক্ত।
দরজার পাল্লাটা আঁকড়ে ধরে কেমন কাচুমাচু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে রমনী! তার মাখনের মতো মোলায়েম গালের ওপর কয়েকটা জলবিন্দু কী অবলীলায় বসে মুক্তাদানার ন্যায় জেল্লা ছড়াচ্ছে!
কী আশ্চর্য!
৩১ বছরের এই পরিণত সৌম্য যুবক তীব্রভাবে ঈর্ষান্বিত অনুভব করল ওই নগণ্য জলবিন্দুদের ওপর। যেখানে সে নিজেই ওই আরাধ্য ত্বক ছুঁয়ে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেনি, সেখানে সামান্য কয়েকটি জলবিন্দু কী না অনায়াসে নিজেদের অস্তিত্ব মিশিয়ে লেপ্টে আছে সেখানে!
বোরাকের এমন তীব্র নিবিড় দৃষ্টিতে আড়ষ্টিত হলো মৌ। শার্টের কলারের দিকটা অন্যমনস্কভাবেই একটু টেনে নিয়ে যেন নিজেকে আরেকটু গুটিয়ে নিল রমণী। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কম্পিত রক্তিম ঠোঁট জোড়া আলগা করে মৃদু স্বরে বলল,
— “কী দেখছেন এভাবে? খুব বাজে লাগছে, না? পাগল পাগল লাগছে?”
— “না।” কেমন ঘোর লাগা শান্ত কণ্ঠে জবাব দিল যুবক।
মৌটুসী আরও একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল।
— “ত… তাহলে?”
বোরাকের চোখ তখনও তার মুখে স্থির। মনের ভেতর অনুচ্চারিত কয়েকটি শব্দ একে একে ভেসে উঠল,
—আবেদনময়ী… দুর্বার আকর্ষণময়ী… এই পৌরুষচিত্তের হৃদয়হরিণী।
কিন্তু সেসব উচ্চারণ করার মতো দুঃসাহস সে নিজের জবানকে দিল না। বরং কণ্ঠটা নিচু করে, খানিকটা হিসহিসিয়ে বলল,
— “শুনতে চেয়ো না, মেয়ে। জিহ্বা লাগামহীন হয়ে যাবে। তোমার শ্রবণেন্দ্রিয় সহ্য করতে পারবে না।”
রমণীর দরজায় গিয়ে দাঁড়ানোর কারণটাই বেমালুম ভুলে নিজের ঘরে ফিরে এল বোরাক। ঘরে ঢুকেই ধপ করে সোফায় শরীরটা এলিয়ে দিল। মাথাটা পেছনে ঠেকিয়ে দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ছাড়ল। টানটান হয়ে থাকা কণ্ঠনালীর ওপর উঁচু হয়ে থাকা অ্যাডামস অ্যাপলটি একবার স্পষ্টভাবে নড়ে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে চোখ দুটো বন্ধ করে নিল যুবক।
বন্ধ দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দুই হাতে মুখ ঢেকে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে রইল মৌ। বুকের ভেতর কোথাও যেন অকারণে একঝাঁক প্রজাপতি ডানা ঝাপটাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ উঠে দাঁড়াল সে। প্রায় ছুটে গিয়ে দেয়ালে লাগানো আয়নাটার সামনে দাঁড়াল। ফর্সা গাল দুটো রাঙা টুকটুকে হয়ে উঠেছে। চোখেমুখে এক অন্যরকম উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে আছে। কিশোরী মেয়েদের মতো আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে নিজেই অধর চেপে মিটিমিটি হাসছে যুবতী। তারপর আচমকাই বুকের কাছের শার্টটা দু-আঙুলে টেনে নাকের কাছে নিয়ে এল। গভীর করে একটা শ্বাস নিল।
ইশ! এত সুখ-সুখ গন্ধ কেন?
মুহূর্তেই নিজের এমন কাণ্ডে নিজেই লজ্জা পেল রমনী। আয়নায় চোখাচোখি হতেই আবারও মৃদু হেসে ফেলল সে।অথচ সেই হাসির আড়ালেই কয়েকটা নির্বাক প্রশ্ন মনজুড়ে ঘুরপাক খেতে লাগল তার।
প্রায় আধঘন্টা পর হোটেল স্টাফ এসে মৌকে রাতের খাবার দিয়ে গেল। বোরাক রিসেপশনে ফোন করে বলেছে খাবার পাঠাতে। খাবারের গন্ধ নাকে যেতেই পেট জানান দিল তার ক্ষুধা পেয়েছে খুব করে, তাই মৌ আর দেরি করল না। মাথা থেকে সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে হাত ধুয়ে খেতে বসে গেল।
‘লোকটা খেয়েছে?’ প্রথম লোকমা মুখে তুলবার আগ মুহূর্তে প্রশ্ন করল মন।
এতক্ষণে খেয়েছে নিশ্চয়ই! আর নাহলে সময় করে খেয়ে নেবে। সে তো আর ছোট কিংবা অবুঝ নয় যে, কেউ তুলে না দিলে খেতে পারবে না। নিজের ভালো-মন্দের খেয়াল নিজেই রাখতে জানে নিশ্চয়ই।
মনকে এই বুঝ দিয়ে খেতে আরম্ভ করল মৌ। তবে খাওয়ার পুরোটা সময়ই মনের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি নিয়েই খাওয়া শেষ করল সে। এরপর সব গুছিয়ে রেখে বিছানার ওপর বসল। ছেলে-মেয়ে দুটো কী করছে কে জানে? একটা ফোন করা উচিত। ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনে চাপ দিতেই কালো ডিসপ্লেটা মনে করে দিল ফোন বন্ধ।
বাচ্চা দুটোর কথা মনে পড়তেই অস্থিরতা আরও বাড়ল মৌয়ের। একটু খোঁজ না নিলে আর কিছুতেই শান্তি আসবে না।
অগত্যা উঠে দাঁড়াল মৌ। শার্টের উপরের শেষ বোতামটাও লাগিয়ে, ট্রাউজারটাও ঠিকঠাক করে নিল। এরপর ঘর থেকে বেরিয়ে বোরাকের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নক করল। কিছুক্ষণের ব্যবধানে বোরাক দরজা খুলে প্রশ্নসূচক চাউনিতে তাকাল ওর দিকে।
মৌ মৃদু স্বরে বলল,
— “আপনার ফোনটা একটু নিতাম। বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলব।”
— “চিন্তা করো না। ওরা খাওয়াদাওয়া করে আরও ঘণ্টা খানেক আগে ঘুমিয়ে পড়েছে। এখন আর ঘুম ভাঙানোর দরকার নেই।”
— “ও… আচ্ছা।”
একটু থেমে আবার জিজ্ঞেস করল,
— “আপনি খেয়েছেন?”
— “হুম।” বোরাকের সংক্ষিপ্ত উত্তর।
— “সত্যি তো?”
বোরাকের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটল।
— “মিথ্যে মনে হচ্ছে কেন?”
— “না… মনে হচ্ছে না।”
মৌ আর কথা বাড়াল না। মাথা সামান্য নেড়ে বলল,
— “আচ্ছা, আসছি।”
বলেই ঘুরে নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। কয়েক কদম এগিয়ে যেতেই হঠাৎ পেছন থেকে বোরাকের কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “এই মৌটুসী পাখি!”
মৌ থমকে দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরল। বোরাক দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। স্বাভাবিক ভাবেই জিজ্ঞেস করল,
— “তোমার কি খুব ঘুম পাচ্ছে?”
মৌ মাথা নাড়ল।
— “না, তেমন না।”
— “ওপাশে একটা ছাদ বারান্দা আছে। যাবে?”
মৌ একটু থেমে উপর-নিচ মাথা নাড়ল।
— “চলুন।”
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে করিডোরের শেষ মাথার খোলা বারান্দাটায় এসে দাঁড়াল।
নিরিবিলি জায়গাটা। পাঁচতলার ওপর থেকে নিচের শহরটাকে বেশ ভালোই দেখা যাচ্ছে। দূরের কিছু আলো ছাড়া চারপাশ অনেকটাই নিস্তব্ধ। রাতের হাওয়া এসে মাঝেমধ্যে দুজনের গায়ে আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছে।
মৌটুসী রেলিংয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বোরাকের দিকে তাকাল। সন্দেহভরা কণ্ঠে বলল,
— “আচ্ছা, সত্যি করে বলেন তো, আপনি খেয়েছেন?”
বোরাক ভ্রু তুলল।
— “হুম।”
মৌয়ের কেন জানি বিশ্বাস হলো না তবুও। আবারও বলল,
— “কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আপনি রাতে কিছুই খাননি।”
বোরাকের ঠোঁটের কোণে একচিলতে বাঁকা হাসি ফুটল এবারে। মুখটা একটু এগিয়ে নিয়ে বলল,
— “না খেয়ে থাকলে এখন কি তুমি খাইয়ে দেবে, ডিয়ার জুনিয়র?”
মৌটুসী বিরক্ত চোখে তাকাল।
— “মজা করবেন না। আপনি সত্যিই খাননি, তাই না?”
বোরাক এবার হেসেই ফেলল।
এতে মৌ চরম বিরক্ত হয়ে একটু কড়া গলায় বলে উঠল,
— “এখনই যান। আগে খেয়ে আসবেন। আমি এখানে অপেক্ষা করছি। যান বলছি।”
বোরাক মাথা কাত করল, বুকের বাঁ পাশে এক হাত রেখে খুব আশ্চর্যান্বিত চেহারার ডং ধরে বলল,
— “আহ সুন্দরী! তুমি জান বলছ? আমাকে?”
মৌটুসীর চোখ বড় হয়ে গেল। মানুষের ধৈর্যের একটা সীমা থাকে, যা পার করে দিচ্ছে এই লোক। বিরক্ত ভরা কণ্ঠে খেঁকিয়ে উঠল মৌ,
— “অহ, অসহ্য! আমি কিন্তু চলে যাব।”
এবার বোরাক সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,
— “আচ্ছা, যাও। আমি খেয়ে এসে তোমাকে ডাকব। আবার ঘুমিয়ে পড়ো না যেন।”
মৌ মুখ গম্ভীর করে রেলিংয়ের দিকে তাকাল।
মৌটুসী পর্ব ৩৩
— “আচ্ছা। অপেক্ষা করব আমি।”
বোরাক আর কিছু না বলে ফিরে হাঁটতে শুরু করল। কয়েক পা গিয়ে আবার একবার পেছন ফিরে তাকাল।
মৌটুসী তখনও সেখানেই দাঁড়িয়ে। বোরাক বলল,
— “এখানে দাঁড়িয়ে থেকো না। রুমে যাও। আমি ডেকে নেব।”
